📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 কোরআনুল কারিমে হযরত হুদ আ.

📄 কোরআনুল কারিমে হযরত হুদ আ.


পবিত্র কোরআনুল কারিমের ৭ জায়গায় হযরত হূদ আ.-এর নাম এসেছে। সূরা আরাফ: ৬৫, সূরা হূদের ৫০, ৫৩, ৫৮, ৬০, ৮৯ নং আয়াতে এবং সূরা শুআরার ১২৪ নং আয়াতে।

পূর্বে বলা হয়েছে, হযরত হূদ আ.-এর সম্প্রদায়ের নাম ছিল আদ। এরা তাদের রাজত্বের জাঁকজমকে, দৈহিক শক্তির অহঙ্কারে এতই বিভোর মত্ত ছিল, আল্লাহ তাআলাকে সম্পূর্ণরূপে ভুলতে বসেছিল এবং নিজ হাতে গড়া মূর্তিসমূহকে মাবুদ [উপাস্য] মেনে সর্বপ্রকার শয়তানি কাজ নির্ভয়ে ও নিশ্চিন্তে করতে লাগল। হযরত নূহ আ.-এর মহা প্লাবনের পরে আদে উলা সর্বপ্রথম মূর্তিপূজা আরম্ভ করে। তাদের মূর্তি ছিল তিনটি। (১) সাদদা (২) সামুদা (৩) হাররা। আল্লাহ তাদের মাঝে হূদ আ.-কে নবীরূপে প্রেরণ করেন। তিনি তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেন। সূরা আরাফে নূহ আ.-এর ঘটনার শেষে আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আদ জাতির কাছে তাদের ভাই হুদকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ নেই। তোমরা কি সাবধান হবে না? তার সম্প্রদায়ের কাফের সর্দাররা বলল, আমরা তো দেখছি তুমি নির্বুদ্ধিতায় ডুবে রয়েছ আর তোমাকে তো আমরা মিথ্যাবাদী মনে করি। সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আমার মধ্যে কোনো নির্বুদ্ধিতা নেই, আমি তো রাব্বুল আলামিনের প্রেরিত রাসূল। আমি আমার প্রতিপালকের বাণী তোমাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি এবং আমি তোমাদের একজন বিশ্বস্ত হিতাকাঙ্ক্ষী। তোমরা কি বিস্মিত হচ্ছ, তোমাদের প্রভুর কাছ থেকে তোমাদেরই মধ্য থেকে একজনের মাধ্যমে তোমাদের সতর্ক করার জন্য উপদেশবাণী এসেছে? আর স্মরণ করো, আল্লাহ তোমাদের নূহের সম্প্রদায়ের পরে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন এবং তোমাদের অবয়বে অন্যলোক অপেক্ষা শক্তিতে অধিকতর সমৃদ্ধ করেছেন। অতএব তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর। হয়তো তোমরা সফলকাম হবে। তারা বলল, তুমি কি আমাদের কাছে এ উদ্দেশ্যে এসেছ যে, আমরা যেন শুধু এক আল্লাহর ইবাদত করি আর আমাদের পূর্ব-পুরুষগণ যাদের উপাসনা করত, তা বর্জন করি? সুতরাং তুমি সত্যবাদী হলে আমাদেরকে যে জিনিসের ভয় দেখাচ্ছ, তা নিয়ে এসো! সে বলল, তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তা তোমাদের জন্যে শাস্তি ও গযব নির্ধারিত হয়েই আছে; তবে কি তোমরা আমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হতে চাও এমন কতগুলো (দেব-দেবীর) নাম সম্বন্ধে যা তোমরা ও তোমাদের পূর্বপুরুষগণ সৃষ্টি করেছ! আল্লাহ এ সম্বন্ধে কোনো সনদ পাঠান নি। সুতরাং তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষা করছি। তারপর আমি তাকে ও তার সঙ্গীদেরকে আমার অনুগ্রহে উদ্ধার করি; আর যারা আমার নিদর্শনকে প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং মুমিন ছিল না, তাদেরকে নির্মূল করেছিলাম।" (সূরা আরাফ: ৬৫-৭২)

সূরা হূদে আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আদ জাতির প্রতি তাদের ভাই হূদকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোনো ইলাহ নেই। তোমরা তো কেবল মিথ্যা রচনাকারী। হে আমার সম্প্রদায়! এ জন্য আমি তোমাদের কাছে কোনো পারিশ্রমিক চাই না। আমার পারিশ্রমিক তো তাঁরই কাছে, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। তোমরা কি তবুও অনুধাবন করবে না? হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা চাও। তারপর তাঁর দিকেই ফিরে এসো। তিনি তোমাদের জন্যে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং আরো শক্তি দিয়ে তোমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দেবেন। অপরাধী হয়ে তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিও না।

তারা বলল, হে হূদ! তুমি আমাদের কাছে কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে আসো নি। তোমার কথায় আমরা আমাদের উপাস্যদের পরিত্যাগ করার নই। আর আমরা তোমার প্রতি বিশ্বাসী নই। আমরা তো এটাই বলি, তোমার উপর আমাদের কোনো উপাস্যের অশুভ নজর পড়েছে। হূদ বলল, আমি আল্লাহকে সাক্ষী রাখছি আর তোমরাও সাক্ষী থাকো যে, আল্লাহ ছাড়া তোমরা আর যেসব শরিক বানিয়ে রেখেছ, সে সবের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। তোমরা সকলে মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকাও এবং আমাকে মোটেই অবকাশ দিও না। আমি নির্ভর করি আল্লাহর ওপর, যিনি আমার এবং তোমাদের প্রতিপালক। কোনো জীব-যন্ত্র এমন নেই, যা তাঁর নিয়ন্ত্রণে নয়। নিঃসন্দেহে আমার প্রতিপালক সরল পথে আছেন। তারপর তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিলেও আমি যে পয়গামসহ তোমাদের কাছে প্রেরিত হয়েছি, তা আমি তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। আমার প্রতিপালক ভিন্ন কোনো সম্প্রদায়কে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন। আর তোমরা তাঁর কোনোই ক্ষতিসাধন করতে পারবে না। আমার প্রতিপালক নিশ্চয়ই সব কিছুর রক্ষণাবেক্ষণকারী। পরে যখন আমার ফরমান এসে পৌঁছল, তখন আমি আমার রহমতের দ্বারা হূদকে এবং তার সাথে যারা ঈমান এনেছিল, তাদেরকে রক্ষা করলাম এবং এক কঠিন আযাব থেকে তাদেরকে রক্ষা করলাম। এই হল আদ জাতি, তারা তাদের প্রতিপালকের নিদর্শনাবলী অস্বীকার করে এবং তাঁর নবী-রাসুলগণকে অমান্য করেছিল এবং তারা প্রত্যেক উদ্ধত স্বৈরাচারীর অনুসরণ করত। এই দুনিয়াতেও তাদের ওপর লানত হয়েছিল। আর তারা কিয়ামতের দিনও লানতগ্রস্ত হবে। জেনে রেখো, আদ সম্প্রদায় তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করেছিল। জেনে রেখো! ধ্বংসই হলো হূদের সম্প্রদায় আদ জাতি।" (সূরা হূদ : ৫০-৬০)

সূরা মুমিনূনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

"তারপর তাদের পরে অন্য এক সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছিলাম এবং তাদেরই একজনকে তাদের প্রতি রাসূল করে পাঠিয়েছিলাম। সে বলল, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ নেই। তবুও কি তোমরা সাবধান হবে না? তার সম্প্রদায়ের প্রধানরা যারা কুফরি করেছিল এবং আখেরাতের সাক্ষাৎকারকে অস্বীকার করেছিল এবং যাদেরকে আমি পার্থিব জীবনে প্রচুর ভোগ-সম্ভার দান করেছিলাম, তারা বলল: এ তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ। তোমরা যা খাও, সে-ও তাই খায় আর যা তোমরা পান কর, সে-ও তাই পান করে। যদি তোমরা তোমাদের মতোই একজন মানুষের আনুগত্য কর, তবে তোমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সে কি তোমাদের এই প্রতিশ্রুতি দেয় যে, তোমাদের মৃত্যু হলে এবং তোমরা মাটি ও হাড়ে পরিণত হয়ে গেলেও তোমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে? অসম্ভব! তোমাদেরকে যে বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, তা অসম্ভব! একমাত্র পার্থিব জীবনই আমাদের জীবন। আমরা মরি-বাঁচি এখানেই। আর কখনো আমরা পুনরুত্থিত হব না। সে তো এমন এক ব্যক্তি, যে আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করেছে এবং আমরা কখনোই তাকে বিশ্বাস করব না। সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য কর। কারণ, এরা আমাকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করে। আল্লাহ তাআলা বললেন, অচিরেই এরা অনুতপ্ত হবে। তারপর সত্য সত্যই বিকট আওয়াজ তাদেরকে আঘাত করবে এবং আমি তাদেরকে তরঙ্গ তাড়িত আবর্জনা সদৃশ করেছিলাম। সুতরাং ধ্বংস হয়ে গেল জালিম সম্প্রদায়।" (সূরা মুমিনুন: ৩১-৪১)

সূরা শুআরায় আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আদ সম্প্রদায় নবী-রাসূলগণকে অস্বীকার করেছে। যখন তাদের ভাই হূদ আ. তাদের বলল, তোমরা কি সাবধান হবে না? আমি তোমাদের জন্য একজন বিশ্বস্ত রাসূল। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার অনুগত্য কর। আমি এ জন্য তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না। আমার পুরস্কার তো রাব্বুল আলামিনের কাছে আছে। তোমরা কি প্রতিটি উচ্চ স্থানেই অর্থহীনভাবে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করছ? তোমরা কি প্রাসাদ নির্মাণ করছ এই মনে করে, তোমরা চিরস্থায়ী হবে? আর যখন তোমরা আঘাত হানো, তখন তোমরা আঘাত হেনে থাক কঠোরভাবে।

তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। ভয় কর তাঁকে যিনি তোমাদেরকে সেই সব কিছুই দিয়েছেন, যা তোমরা জান। তিনি তোমাদের দিয়েছেন জীব-জন্তু, সন্তান-সন্ততি, বাগ-বাগিচা এবং প্রস্রবণ। তোমাদের ব্যাপারে আমি এক মহাদিবসের আযাবের আশঙ্কা করছি। তারা জবাব দিল, তুমি নসিহত কর আর না-ই কর, আমাদের জন্য সবই সমান। এসব তো পূর্ববর্তীদেরই স্বভাব। আর আমরা শাস্তি প্রাপ্ত হওয়ার লোক নই। তারপর তারা তাকে প্রত্যাখ্যান করল এবং আমি তাদের ধ্বংস করলাম। নিঃসন্দেহে এতে একটি নিদর্শন রয়েছে। কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোকই মুমিন নয়। আর তোমার প্রতিপালক, তিনি তো প্রবল পরাক্রমশালী এবং পরম দয়ালুও।" (সূরা শুআরা: ১২৩-১৪০)

সূরা হা-মীম-সিজদায় আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আদ সম্প্রদায়ের ব্যাপার এই, তারা পৃথিবীতে অযথা অহঙ্কার করত এবং বলত, “আমাদের অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী আর কে আছে?” তারা অশুভ দিনসমূহকে কি লক্ষ করে নি, যে আল্লাহ তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি তাদের অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী। আর তারা আমার নিদর্শনাবলি অস্বীকার করত। তারপর আমি তাদের পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আস্বাদন করানোর জন্যে তাদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া তাদের উপর পাঠিয়েছিলাম। আর পরকালের আযাব তো এ থেকেও অধিক লাঞ্ছনাদায়ক এবং তাদেরকে সাহায্য করা হবে না।" (সূরা হা-মীম-সিজদা: ১৫-১৬)

সূরা আহকাফে আল্লাহ তাআলা বলেন:

"স্মরণ কর, আদ সম্প্রদায়ের ভাইয়ের কথা! যার পূর্বে এবং পরেও সতর্ককারীরা এসেছিল। সে তার আহকাফ বা বালুকাময় উচ্চ উপত্যকার অধিবাসী সম্প্রদায়কে এ মর্মে সতর্ক করেছিল, আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করো না। আমি তোমাদের ব্যাপারে এক ভয়াবহ দিনের আযাবের আশঙ্কা করছি। তারা বলেছিল, তুমি কি আমাদেরকে আমাদের উপাস্য দেব-দেবীদের থেকে নিবৃত্ত করতে এসেছ? তুমি সত্যবাদী হলে আমাদেরকে যে ব্যাপারে ভয় দেখাচ্ছ, তা নিয়ে আস। সে বলল, এর জ্ঞান তো আল্লাহর কাছেই রয়েছে! আমি যা সহ প্রেরিত হয়েছি, কেবল তা-ই তোমাদের কাছে প্রচার করি। কিন্তু আমি লক্ষ করছি, তোমরা একটি মূর্খ সম্প্রদায়। পরে তারা যখন তাদের উপত্যকার দিকে মেঘ আসতে দেখল, তখন তারা বলতে লাগল- এ তো মেঘপুঞ্জ, আমাদেরকে বৃষ্টি দেবে। না, বরং এটা তো তা-ই, যা তোমরা তাড়াতাড়ি চেয়েছিলে। এতে রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তিবাহী এক ঝড়। তার প্রতিপালকের নির্দেশে সে সবকিছু ধ্বংস করে দেবে। তারপর তারা এমন হয়ে গেল, তাদের বসতিগুলো ছাড়া আর কিছুই রইল না। বস্তুত অপরাধী সম্প্রদায়কে আমি এমনিভাবে প্রতিফল দিয়ে থাকি।" (সূরা আহকাফ : ২১-২৫)

সূরা যারিয়াতে আল্লাহ তাআলার বাণী: "আর নিদর্শন রয়েছে আদ জাতির ঘটনায়। যখন আমি তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলাম অকল্যাণকর বায়ু; তা যে জিনিসের ওপর দিয়েই প্রবাহিত হয়েছিল, তা-ই চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছিল।” (সূরা যারিয়াত: ৪১-৪২)

সূরা নাজমে আল্লাহ তাআলার বাণী: "প্রথম আদকে তিনিই ধ্বংস করেছেন। এবং ছামূদ সম্প্রদায়কেও। কাউকে তিনি বাকি রাখেন নি। আর তাদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায়কেও। তারা ছিল অতিশয় জালিম ও অবাধ্য। উৎপাটিত আবাসভূমিকে উল্টিয়ে নিক্ষেপ করেছিলেন। ওটাকে আচ্ছন্ন করে নিল কী সর্বগ্রাসী শাস্তি! তবে তুমি তোমার প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করবে?" (সূরা নাজ্ম: ৫০-৫৫)

সূরা কামারে আল্লাহ তাআলার বাণী: "আদ সম্প্রদায় সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল। ফলে কী কঠোর হয়েছিল আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী! তাদের উপর আমি প্রেরণ করেছিলাম ঝঞ্ঝা-বায়ু নিরবিচ্ছিন্ন দুর্ভোগের দিনে। মানুষকে তা উৎখাত করেছিল। উন্মেলিত খেজুর কাণ্ডের মতো। কী কঠোর ছিল আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী। কোরআন আমি সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য। অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?" (সূরা কামার: ১৮-২২)

সূরা আল-হাক্কায় আল্লাহ তাআলার বাণী: "আর আদ সম্প্রদায়- তাদের ধ্বংস করা হয়েছিল এক প্রচণ্ড ঝঞ্ঝা-বায়ু দ্বারা, যা তিনি ওদের উপর প্রবাহিত করেছিলেন সাত রাত ও আট দিন বিরামহীনভাবে। তখন (উক্ত সম্প্রদায়কে) দেখতে পেতে, তারা সেখানে লুটিয়ে পড়ে রয়েছে সারশূন্য বিদ্ধ খেজুর কাণ্ডের মতো। এরপর এদের কাউকে তুমি বিদ্যমান দেখতে পাও কি?" (সূরা হাক্কা : ৬-৮)

সূরা আল-ফাজরে আল্লাহ তাআলা বলেন:

"তুমি কি লক্ষ কর নি, তোমার প্রতিপালক আদ বংশের ইরাম গোত্রের সাথে কী করেছিলেন- যারা অধিকারী ছিল সুউচ্চ প্রাসাদের? যার সমতুল্য কোনো দেশে নির্মিত হয় নি এবং ছামূদের প্রতি- যারা উপত্যকায় পাথর কেটে ঘর নির্মাণ করেছিল এবং বহু সৈন্য শিবিরের অধিপতি ফেরাউনের প্রতি- যারা দেশে সীমালঙ্ঘন করেছিল এবং সেখানে প্রচুর অশান্তি সৃষ্টি করেছিল। এরপর তোমার প্রতিপালক তাদের ওপর শাস্তির কষাঘাত হানলেন। তোমার প্রতিপালক অবশ্যই সতর্ক দৃষ্টি রাখেন।" (সূরা ফাজর: ৭-১৪)

পবিত্র কোরআনুল কারিমের ৭ জায়গায় হযরত হূদ আ.-এর নাম এসেছে। সূরা আরাফ: ৬৫, সূরা হূদের ৫০, ৫৩, ৫৮, ৬০, ৮৯ নং আয়াতে এবং সূরা শুআরার ১২৪ নং আয়াতে।

পূর্বে বলা হয়েছে, হযরত হূদ আ.-এর সম্প্রদায়ের নাম ছিল আদ। এরা তাদের রাজত্বের জাঁকজমকে, দৈহিক শক্তির অহঙ্কারে এতই বিভোর মত্ত ছিল, আল্লাহ তাআলাকে সম্পূর্ণরূপে ভুলতে বসেছিল এবং নিজ হাতে গড়া মূর্তিসমূহকে মাবুদ [উপাস্য] মেনে সর্বপ্রকার শয়তানি কাজ নির্ভয়ে ও নিশ্চিন্তে করতে লাগল। হযরত নূহ আ.-এর মহা প্লাবনের পরে আদে উলা সর্বপ্রথম মূর্তিপূজা আরম্ভ করে। তাদের মূর্তি ছিল তিনটি। (১) সাদদা (২) সামুদা (৩) হাররা। আল্লাহ তাদের মাঝে হূদ আ.-কে নবীরূপে প্রেরণ করেন। তিনি তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেন। সূরা আরাফে নূহ আ.-এর ঘটনার শেষে আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আদ জাতির কাছে তাদের ভাই হুদকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ নেই। তোমরা কি সাবধান হবে না? তার সম্প্রদায়ের কাফের সর্দাররা বলল, আমরা তো দেখছি তুমি নির্বুদ্ধিতায় ডুবে রয়েছ আর তোমাকে তো আমরা মিথ্যাবাদী মনে করি। সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আমার মধ্যে কোনো নির্বুদ্ধিতা নেই, আমি তো রাব্বুল আলামিনের প্রেরিত রাসূল। আমি আমার প্রতিপালকের বাণী তোমাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি এবং আমি তোমাদের একজন বিশ্বস্ত হিতাকাঙ্ক্ষী। তোমরা কি বিস্মিত হচ্ছ, তোমাদের প্রভুর কাছ থেকে তোমাদেরই মধ্য থেকে একজনের মাধ্যমে তোমাদের সতর্ক করার জন্য উপদেশবাণী এসেছে? আর স্মরণ করো, আল্লাহ তোমাদের নূহের সম্প্রদায়ের পরে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন এবং তোমাদের অবয়বে অন্যলোক অপেক্ষা শক্তিতে অধিকতর সমৃদ্ধ করেছেন। অতএব তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর। হয়তো তোমরা সফলকাম হবে। তারা বলল, তুমি কি আমাদের কাছে এ উদ্দেশ্যে এসেছ যে, আমরা যেন শুধু এক আল্লাহর ইবাদত করি আর আমাদের পূর্ব-পুরুষগণ যাদের উপাসনা করত, তা বর্জন করি? সুতরাং তুমি সত্যবাদী হলে আমাদেরকে যে জিনিসের ভয় দেখাচ্ছ, তা নিয়ে এসো! সে বলল, তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তা তোমাদের জন্যে শাস্তি ও গযব নির্ধারিত হয়েই আছে; তবে কি তোমরা আমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হতে চাও এমন কতগুলো (দেব-দেবীর) নাম সম্বন্ধে যা তোমরা ও তোমাদের পূর্বপুরুষগণ সৃষ্টি করেছ! আল্লাহ এ সম্বন্ধে কোনো সনদ পাঠান নি। সুতরাং তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষা করছি। তারপর আমি তাকে ও তার সঙ্গীদেরকে আমার অনুগ্রহে উদ্ধার করি; আর যারা আমার নিদর্শনকে প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং মুমিন ছিল না, তাদেরকে নির্মূল করেছিলাম।" (সূরা আরাফ: ৬৫-৭২)

সূরা হূদে আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আদ জাতির প্রতি তাদের ভাই হূদকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোনো ইলাহ নেই। তোমরা তো কেবল মিথ্যা রচনাকারী। হে আমার সম্প্রদায়! এ জন্য আমি তোমাদের কাছে কোনো পারিশ্রমিক চাই না। আমার পারিশ্রমিক তো তাঁরই কাছে, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। তোমরা কি তবুও অনুধাবন করবে না? হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা চাও। তারপর তাঁর দিকেই ফিরে এসো। তিনি তোমাদের জন্যে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং আরো শক্তি দিয়ে তোমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দেবেন। অপরাধী হয়ে তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিও না।

তারা বলল, হে হূদ! তুমি আমাদের কাছে কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে আসো নি। তোমার কথায় আমরা আমাদের উপাস্যদের পরিত্যাগ করার নই। আর আমরা তোমার প্রতি বিশ্বাসী নই। আমরা তো এটাই বলি, তোমার উপর আমাদের কোনো উপাস্যের অশুভ নজর পড়েছে। হূদ বলল, আমি আল্লাহকে সাক্ষী রাখছি আর তোমরাও সাক্ষী থাকো যে, আল্লাহ ছাড়া তোমরা আর যেসব শরিক বানিয়ে রেখেছ, সে সবের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। তোমরা সকলে মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকাও এবং আমাকে মোটেই অবকাশ দিও না। আমি নির্ভর করি আল্লাহর ওপর, যিনি আমার এবং তোমাদের প্রতিপালক। কোনো জীব-যন্ত্র এমন নেই, যা তাঁর নিয়ন্ত্রণে নয়। নিঃসন্দেহে আমার প্রতিপালক সরল পথে আছেন। তারপর তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিলেও আমি যে পয়গামসহ তোমাদের কাছে প্রেরিত হয়েছি, তা আমি তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। আমার প্রতিপালক ভিন্ন কোনো সম্প্রদায়কে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন। আর তোমরা তাঁর কোনোই ক্ষতিসাধন করতে পারবে না। আমার প্রতিপালক নিশ্চয়ই সব কিছুর রক্ষণাবেক্ষণকারী। পরে যখন আমার ফরমান এসে পৌঁছল, তখন আমি আমার রহমতের দ্বারা হূদকে এবং তার সাথে যারা ঈমান এনেছিল, তাদেরকে রক্ষা করলাম এবং এক কঠিন আযাব থেকে তাদেরকে রক্ষা করলাম। এই হল আদ জাতি, তারা তাদের প্রতিপালকের নিদর্শনাবলী অস্বীকার করে এবং তাঁর নবী-রাসুলগণকে অমান্য করেছিল এবং তারা প্রত্যেক উদ্ধত স্বৈরাচারীর অনুসরণ করত। এই দুনিয়াতেও তাদের ওপর লানত হয়েছিল। আর তারা কিয়ামতের দিনও লানতগ্রস্ত হবে। জেনে রেখো, আদ সম্প্রদায় তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করেছিল। জেনে রেখো! ধ্বংসই হলো হূদের সম্প্রদায় আদ জাতি।" (সূরা হূদ : ৫০-৬০)

সূরা মুমিনূনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

"তারপর তাদের পরে অন্য এক সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছিলাম এবং তাদেরই একজনকে তাদের প্রতি রাসূল করে পাঠিয়েছিলাম। সে বলল, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ নেই। তবুও কি তোমরা সাবধান হবে না? তার সম্প্রদায়ের প্রধানরা যারা কুফরি করেছিল এবং আখেরাতের সাক্ষাৎকারকে অস্বীকার করেছিল এবং যাদেরকে আমি পার্থিব জীবনে প্রচুর ভোগ-সম্ভার দান করেছিলাম, তারা বলল: এ তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ। তোমরা যা খাও, সে-ও তাই খায় আর যা তোমরা পান কর, সে-ও তাই পান করে। যদি তোমরা তোমাদের মতোই একজন মানুষের আনুগত্য কর, তবে তোমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সে কি তোমাদের এই প্রতিশ্রুতি দেয় যে, তোমাদের মৃত্যু হলে এবং তোমরা মাটি ও হাড়ে পরিণত হয়ে গেলেও তোমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে? অসম্ভব! তোমাদেরকে যে বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, তা অসম্ভব! একমাত্র পার্থিব জীবনই আমাদের জীবন। আমরা মরি-বাঁচি এখানেই। আর কখনো আমরা পুনরুত্থিত হব না। সে তো এমন এক ব্যক্তি, যে আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করেছে এবং আমরা কখনোই তাকে বিশ্বাস করব না। সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য কর। কারণ, এরা আমাকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করে। আল্লাহ তাআলা বললেন, অচিরেই এরা অনুতপ্ত হবে। তারপর সত্য সত্যই বিকট আওয়াজ তাদেরকে আঘাত করবে এবং আমি তাদেরকে তরঙ্গ তাড়িত আবর্জনা সদৃশ করেছিলাম। সুতরাং ধ্বংস হয়ে গেল জালিম সম্প্রদায়।" (সূরা মুমিনুন: ৩১-৪১)

সূরা শুআরায় আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আদ সম্প্রদায় নবী-রাসূলগণকে অস্বীকার করেছে। যখন তাদের ভাই হূদ আ. তাদের বলল, তোমরা কি সাবধান হবে না? আমি তোমাদের জন্য একজন বিশ্বস্ত রাসূল। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার অনুগত্য কর। আমি এ জন্য তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না। আমার পুরস্কার তো রাব্বুল আলামিনের কাছে আছে। তোমরা কি প্রতিটি উচ্চ স্থানেই অর্থহীনভাবে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করছ? তোমরা কি প্রাসাদ নির্মাণ করছ এই মনে করে, তোমরা চিরস্থায়ী হবে? আর যখন তোমরা আঘাত হানো, তখন তোমরা আঘাত হেনে থাক কঠোরভাবে।

তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। ভয় কর তাঁকে যিনি তোমাদেরকে সেই সব কিছুই দিয়েছেন, যা তোমরা জান। তিনি তোমাদের দিয়েছেন জীব-জন্তু, সন্তান-সন্ততি, বাগ-বাগিচা এবং প্রস্রবণ। তোমাদের ব্যাপারে আমি এক মহাদিবসের আযাবের আশঙ্কা করছি। তারা জবাব দিল, তুমি নসিহত কর আর না-ই কর, আমাদের জন্য সবই সমান। এসব তো পূর্ববর্তীদেরই স্বভাব। আর আমরা শাস্তি প্রাপ্ত হওয়ার লোক নই। তারপর তারা তাকে প্রত্যাখ্যান করল এবং আমি তাদের ধ্বংস করলাম। নিঃসন্দেহে এতে একটি নিদর্শন রয়েছে। কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোকই মুমিন নয়। আর তোমার প্রতিপালক, তিনি তো প্রবল পরাক্রমশালী এবং পরম দয়ালুও।" (সূরা শুআরা: ১২৩-১৪০)

সূরা হা-মীম-সিজদায় আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আদ সম্প্রদায়ের ব্যাপার এই, তারা পৃথিবীতে অযথা অহঙ্কার করত এবং বলত, “আমাদের অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী আর কে আছে?” তারা অশুভ দিনসমূহকে কি লক্ষ করে নি, যে আল্লাহ তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি তাদের অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী। আর তারা আমার নিদর্শনাবলি অস্বীকার করত। তারপর আমি তাদের পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আস্বাদন করানোর জন্যে তাদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া তাদের উপর পাঠিয়েছিলাম। আর পরকালের আযাব তো এ থেকেও অধিক লাঞ্ছনাদায়ক এবং তাদেরকে সাহায্য করা হবে না।" (সূরা হা-মীম-সিজদা: ১৫-১৬)

সূরা আহকাফে আল্লাহ তাআলা বলেন:

"স্মরণ কর, আদ সম্প্রদায়ের ভাইয়ের কথা! যার পূর্বে এবং পরেও সতর্ককারীরা এসেছিল। সে তার আহকাফ বা বালুকাময় উচ্চ উপত্যকার অধিবাসী সম্প্রদায়কে এ মর্মে সতর্ক করেছিল, আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করো না। আমি তোমাদের ব্যাপারে এক ভয়াবহ দিনের আযাবের আশঙ্কা করছি। তারা বলেছিল, তুমি কি আমাদেরকে আমাদের উপাস্য দেব-দেবীদের থেকে নিবৃত্ত করতে এসেছ? তুমি সত্যবাদী হলে আমাদেরকে যে ব্যাপারে ভয় দেখাচ্ছ, তা নিয়ে আস। সে বলল, এর জ্ঞান তো আল্লাহর কাছেই রয়েছে! আমি যা সহ প্রেরিত হয়েছি, কেবল তা-ই তোমাদের কাছে প্রচার করি। কিন্তু আমি লক্ষ করছি, তোমরা একটি মূর্খ সম্প্রদায়। পরে তারা যখন তাদের উপত্যকার দিকে মেঘ আসতে দেখল, তখন তারা বলতে লাগল- এ তো মেঘপুঞ্জ, আমাদেরকে বৃষ্টি দেবে। না, বরং এটা তো তা-ই, যা তোমরা তাড়াতাড়ি চেয়েছিলে। এতে রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তিবাহী এক ঝড়। তার প্রতিপালকের নির্দেশে সে সবকিছু ধ্বংস করে দেবে। তারপর তারা এমন হয়ে গেল, তাদের বসতিগুলো ছাড়া আর কিছুই রইল না। বস্তুত অপরাধী সম্প্রদায়কে আমি এমনিভাবে প্রতিফল দিয়ে থাকি।" (সূরা আহকাফ : ২১-২৫)

সূরা যারিয়াতে আল্লাহ তাআলার বাণী: "আর নিদর্শন রয়েছে আদ জাতির ঘটনায়। যখন আমি তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলাম অকল্যাণকর বায়ু; তা যে জিনিসের ওপর দিয়েই প্রবাহিত হয়েছিল, তা-ই চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছিল।” (সূরা যারিয়াত: ৪১-৪২)

সূরা নাজমে আল্লাহ তাআলার বাণী: "প্রথম আদকে তিনিই ধ্বংস করেছেন। এবং ছামূদ সম্প্রদায়কেও। কাউকে তিনি বাকি রাখেন নি। আর তাদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায়কেও। তারা ছিল অতিশয় জালিম ও অবাধ্য। উৎপাটিত আবাসভূমিকে উল্টিয়ে নিক্ষেপ করেছিলেন। ওটাকে আচ্ছন্ন করে নিল কী সর্বগ্রাসী শাস্তি! তবে তুমি তোমার প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করবে?" (সূরা নাজ্ম: ৫০-৫৫)

সূরা কামারে আল্লাহ তাআলার বাণী: "আদ সম্প্রদায় সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল। ফলে কী কঠোর হয়েছিল আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী! তাদের উপর আমি প্রেরণ করেছিলাম ঝঞ্ঝা-বায়ু নিরবিচ্ছিন্ন দুর্ভোগের দিনে। মানুষকে তা উৎখাত করেছিল। উন্মেলিত খেজুর কাণ্ডের মতো। কী কঠোর ছিল আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী। কোরআন আমি সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য। অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?" (সূরা কামার: ১৮-২২)

সূরা আল-হাক্কায় আল্লাহ তাআলার বাণী: "আর আদ সম্প্রদায়- তাদের ধ্বংস করা হয়েছিল এক প্রচণ্ড ঝঞ্ঝা-বায়ু দ্বারা, যা তিনি ওদের উপর প্রবাহিত করেছিলেন সাত রাত ও আট দিন বিরামহীনভাবে। তখন (উক্ত সম্প্রদায়কে) দেখতে পেতে, তারা সেখানে লুটিয়ে পড়ে রয়েছে সারশূন্য বিদ্ধ খেজুর কাণ্ডের মতো। এরপর এদের কাউকে তুমি বিদ্যমান দেখতে পাও কি?" (সূরা হাক্কা : ৬-৮)

সূরা আল-ফাজরে আল্লাহ তাআলা বলেন:

"তুমি কি লক্ষ কর নি, তোমার প্রতিপালক আদ বংশের ইরাম গোত্রের সাথে কী করেছিলেন- যারা অধিকারী ছিল সুউচ্চ প্রাসাদের? যার সমতুল্য কোনো দেশে নির্মিত হয় নি এবং ছামূদের প্রতি- যারা উপত্যকায় পাথর কেটে ঘর নির্মাণ করেছিল এবং বহু সৈন্য শিবিরের অধিপতি ফেরাউনের প্রতি- যারা দেশে সীমালঙ্ঘন করেছিল এবং সেখানে প্রচুর অশান্তি সৃষ্টি করেছিল। এরপর তোমার প্রতিপালক তাদের ওপর শাস্তির কষাঘাত হানলেন। তোমার প্রতিপালক অবশ্যই সতর্ক দৃষ্টি রাখেন।" (সূরা ফাজর: ৭-১৪)

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 কওমে আদ

📄 কওমে আদ


কওমে আদ সম্পর্কে আলোচনা করার আগে জানা জরুরি, পবিত্র কোরআন মাজিদ কোনো ইতিহাস গ্রন্থ বা তাওরাত গ্রন্থ কওমে আদ সম্বন্ধে আলোকপাত করে নি। সুতরাং এ কওমের আলোচনা কেবল কোরআন মাজিদ দ্বারা করা সম্ভব। কোরআন মাজিদ যেহেতু নিশ্চিত সত্য, তাই তাতে বর্ণিত তথ্যাবলীও নিঃসন্দেহে সত্য। এ ছাড়া অনেক গ্রন্থতত্ত্ববিদ অনুমান নির্ভর তথ্য পরিবেশন করেছেন, যা সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়।

কওমে আদ আরব দেশের প্রাচীন গোত্র কিংবা 'সামের' সঙ্গে সম্পর্কিত সম্প্রদায় হতে বিশেষ শক্তি ও পরাক্রমশালী একটি দলের নাম। প্রাচীন ইতিহাসের কোনো কোনো ইউরোপীয় ঐতিহাসিক আদকে একটি কাল্পনিক কাহিনি বলে মনে করে। তাদের এ বিশ্বাস সম্পূর্ণ ভুল এবং অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়। কেননা নতুন গবেষণায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এরূপ, আরবের আদি অধিবাসীরা সংখ্যাধিক্য এবং বহুগোষ্ঠী হিসাবে এক মহৎ ও জাঁকালো দলরূপে বিদ্যমান ছিল। এরা আরব দেশ হতে বের হয়ে সিরিয়া, মিশর ও বাবেলের দিকে অগ্রসর হয়ে সেখানে শক্তিশালী রাজত্বের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। পার্থক্য শুধু এতটুকু, আরবরা এ সমস্ত অধিবাসীগণকে 'উমামে বায়েদাহ' বা ধ্বংসপ্রাপ্ত সম্প্রদায় কিংবা 'আরবে আরেবাহ' বা খাঁটি আরব বলত। আর এদের বিভিন্ন গোত্র বা দলকে আদ, সামুদ, তাসাম এবং জাদিস নামে আখ্যায়িত করত। কোরআন মাজিদে এদের বলা হয়েছে প্রথম আদ। যা দ্বারা একথা পরিষ্কার হয়ে যায়, আরবের প্রাচীন অধিবাসীরা 'সামের বংশধর এবং প্রথম আদ'। এটা একই মূল বস্তুর দুটি নাম।

কওমে আদ সম্পর্কে আলোচনা করার আগে জানা জরুরি, পবিত্র কোরআন মাজিদ কোনো ইতিহাস গ্রন্থ বা তাওরাত গ্রন্থ কওমে আদ সম্বন্ধে আলোকপাত করে নি। সুতরাং এ কওমের আলোচনা কেবল কোরআন মাজিদ দ্বারা করা সম্ভব। কোরআন মাজিদ যেহেতু নিশ্চিত সত্য, তাই তাতে বর্ণিত তথ্যাবলীও নিঃসন্দেহে সত্য। এ ছাড়া অনেক গ্রন্থতত্ত্ববিদ অনুমান নির্ভর তথ্য পরিবেশন করেছেন, যা সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়।

কওমে আদ আরব দেশের প্রাচীন গোত্র কিংবা 'সামের' সঙ্গে সম্পর্কিত সম্প্রদায় হতে বিশেষ শক্তি ও পরাক্রমশালী একটি দলের নাম। প্রাচীন ইতিহাসের কোনো কোনো ইউরোপীয় ঐতিহাসিক আদকে একটি কাল্পনিক কাহিনি বলে মনে করে। তাদের এ বিশ্বাস সম্পূর্ণ ভুল এবং অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়। কেননা নতুন গবেষণায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এরূপ, আরবের আদি অধিবাসীরা সংখ্যাধিক্য এবং বহুগোষ্ঠী হিসাবে এক মহৎ ও জাঁকালো দলরূপে বিদ্যমান ছিল। এরা আরব দেশ হতে বের হয়ে সিরিয়া, মিশর ও বাবেলের দিকে অগ্রসর হয়ে সেখানে শক্তিশালী রাজত্বের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। পার্থক্য শুধু এতটুকু, আরবরা এ সমস্ত অধিবাসীগণকে 'উমামে বায়েদাহ' বা ধ্বংসপ্রাপ্ত সম্প্রদায় কিংবা 'আরবে আরেবাহ' বা খাঁটি আরব বলত। আর এদের বিভিন্ন গোত্র বা দলকে আদ, সামুদ, তাসাম এবং জাদিস নামে আখ্যায়িত করত। কোরআন মাজিদে এদের বলা হয়েছে প্রথম আদ। যা দ্বারা একথা পরিষ্কার হয়ে যায়, আরবের প্রাচীন অধিবাসীরা 'সামের বংশধর এবং প্রথম আদ'। এটা একই মূল বস্তুর দুটি নাম।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 আদ সম্প্রদায়ের যামানা

📄 আদ সম্প্রদায়ের যামানা


অনুমান করা হয়, আদ সম্প্রদায়ের যুগ ছিল হযরত ঈসা আ.-এর প্রায় দুই হাজার বছর আগে। আর কোরআন মাজিদে আদ সম্প্রদায়কে ‘নূহের সম্প্রদায়ের পরে’ বলে উল্লেখ করা হয়। তাই আদ সম্প্রদায়কে নূহ আ.-এর পরবর্তী সম্প্রদায়গুলোর অন্যতম গণ্য করা হয়েছে। এ হতেও প্রমাণিত হয়, সিরিয়া অঞ্চলে দ্বিতীয়বার আবাদ হওয়ার পরে ‘উমামে সামিয়ার’ তথা সামের বংশধরদের উন্নতি আদ সম্প্রদায় হতেই আরম্ভ হয়।

অনুমান করা হয়, আদ সম্প্রদায়ের যুগ ছিল হযরত ঈসা আ.-এর প্রায় দুই হাজার বছর আগে। আর কোরআন মাজিদে আদ সম্প্রদায়কে ‘নূহের সম্প্রদায়ের পরে’ বলে উল্লেখ করা হয়। তাই আদ সম্প্রদায়কে নূহ আ.-এর পরবর্তী সম্প্রদায়গুলোর অন্যতম গণ্য করা হয়েছে। এ হতেও প্রমাণিত হয়, সিরিয়া অঞ্চলে দ্বিতীয়বার আবাদ হওয়ার পরে ‘উমামে সামিয়ার’ তথা সামের বংশধরদের উন্নতি আদ সম্প্রদায় হতেই আরম্ভ হয়।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 আদ সম্প্রদায়ের বাসস্থান

📄 আদ সম্প্রদায়ের বাসস্থান


আদ সম্প্রদায়ের কেন্দ্রস্থল ‘আহকাফ’ অঞ্চল। এ অঞ্চলটি হাযরামাউতের উত্তরে অবস্থিত। বর্তমানে এখানে বালুকাস্তূপ ছাড়া আর কিছু নেই। আর কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলেন, তাদের বসতি আরবের সর্বোৎকৃষ্ট অংশ হাযরামাউত ও ইয়ামানে পারস্য সাগরের তীরে ইরাকের সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ইয়ামান ছিল তাদের রাজধানী।

আদ সম্প্রদায়ের কেন্দ্রস্থল ‘আহকাফ’ অঞ্চল। এ অঞ্চলটি হাযরামাউতের উত্তরে অবস্থিত। বর্তমানে এখানে বালুকাস্তূপ ছাড়া আর কিছু নেই। আর কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলেন, তাদের বসতি আরবের সর্বোৎকৃষ্ট অংশ হাযরামাউত ও ইয়ামানে পারস্য সাগরের তীরে ইরাকের সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ইয়ামান ছিল তাদের রাজধানী।

ফন্ট সাইজ
15px
17px