📄 ছেলের প্রতি হযরত নূহ আ.-এর অসিয়ত
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি. বলেন, একবার আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে বসা ছিলাম। এ সময় এক বেদুঈন এসে সেখানে উপস্থিত হলো। তার পরনে ছিল ইবাদতকারীদের একটি জুব্বা। কিন্তু সে জুব্বাটি ছিল রেশমী কাপড়ের নকশাযুক্ত। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তোমরা কি জানো, তোমাদের এ সাথীটি অশ্বারোহীর পুত্র?
বর্ণনাকারী বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই বেদুঈন লোকটির জুব্বার আঁচল ধরে বললেন, হে বেদুঈন! আমি তোমার পরনে নির্বোধদের পোশাক দেখছি। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর নবী নূহ আ. ওফাতের পূর্বে তাঁর নিজ পুত্রকে বলেছিলেন, "আমি তোমাকে দুটি কাজ করার জন্য এবং দুটি কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য অসিয়ত করছি। আমি তোমাকে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এর (তাসবিহ পাঠ করার জন্য) আদেশ করছি। জেনে রেখো, যদি সাত আসমান ও সাত জমিন এক পাল্লায় রেখে অপর পাল্লায় কালিমা রাখা হয়, তবে কালিমা (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ) এর পাল্লাটি অবশ্যই ভারি হবে। আর যদি সাত আসমান ও সাত জমিন একটি লোহার গোলাকার ধনুকও হয়ে যায়, তবুও কালিমা (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ) তার উপর ভারি হয়ে যাবে। আর দ্বিতীয়ত আদেশ করছি 'সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী' বলতে। সব কিছু পাওয়ার জন্য এ তাসবিহই যথেষ্ট এবং এর উসিলায়ই গোটা সৃষ্টিজীব রিযিক লাভ করে থাকে। আর আমি তোমাকে দুটি বিষয় থেকে বিরত থাকার জন্য আদেশ করছি। একটি হচ্ছে শিরক। দ্বিতীয়টি হচ্ছে অহঙ্কার।
বর্ণনাকারী বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম, বা অন্য কেউ বলল, আল্লাহর রাসূল, শিরক সম্পর্কে তো আমাদের জানা আছে; কিন্তু অহঙ্কার কাকে বলে? আমাদের কারো কাছে সুন্দর জুতা এবং এর উপর সুন্দর চামড়ার ফিতা রয়েছে, এগুলো কি অহঙ্কার? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, না। (এরপর আরয করা হলো,) তবে কি আমাদের কারো কাছে যে সুন্দর পোশাক রয়েছে, যেগুলো তারা পরিধান করে থাকে, সেটা কি অহঙ্কার?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, না। এরপর আরজ করা হল, তবে কি কারো অনেক বন্ধু-বান্ধব ও সঙ্গী-সাথী হওয়া, যারা তার কাছে এসে বসে, সেটা কি অহঙ্কার? (অর্থাৎ নেতা হওয়ার কারণে তার চারপাশে বহু লোকের সমাগম হওয়াটা কি অহঙ্কার?) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, না। এরপর আরয করা হলো, আল্লাহর রাসূল, অহঙ্কার জিনিসটা কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে তুচ্ছ করা।"
📄 হযরত নূহ আ.-এর বয়স
হযরত নূহ আ.-এর বয়স সম্পর্কে আহলে কিতাবগণ বলেন: তিনি যখন নৌকায় আরোহণ করেছিলেন, তখন তাঁর বয়স ছিল ৬ শ বছর। হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকেও এরূপ একটি বর্ণনা রয়েছে। তবে সেসঙ্গে অতিরিক্ত আছে, নৌকা থেকে অবতরণের পর তিনি ৩ শ বছর বেঁচে ছিলেন। কিন্তু এ বক্তব্যটি যদি কোরআনের বর্ণনার সাথে সামঞ্জস্য বিধান করা না যায়, তবে অবশ্যই তা ভ্রান্ত। কোরআন বলে: فَلَبِثَ فِيهِمْ أَلْفَ سَنَةٍ إِلَّا خَمْسِينَ عَامًا "তিনি তাদের মধ্যে অবস্থান করেছিলেন পঞ্চাশ কম হাজার বছর। (সূরা আনকাবুত: ১৪)
কিন্তু নৌকা থেকে অবতরণের পর হযরত নূহ আ. কত বছর বেঁচে ছিলেন, তা আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। অবশ্য হযরত ইবনে আব্বাস রাযি.-এর বর্ণনাটি গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকলে হযরত নূহ আ. ১২৮০ বছর বয়সে নবুয়ত প্রাপ্ত হন এবং প্লাবনের পর তিনি ৩ শ পঞ্চাশ বছর বেঁচে থাকেন। তখন এ হিসাব মতে তাঁর বয়স ১৭৮০ বছর। আল্লাহ তাআলাই সর্বজ্ঞ।
📄 হযরত নূহ আ.-এর ওফাত লাভ
ইবনে জারির, আযরাকি, আবদুর রহমান ইবনে ছাবিত রহ. এবং অন্যান্য তাবেঈন থেকে বর্ণিত আছে, 'নূহ আ.-এর কবর মসজিদে হারামে'। এ বর্ণনাটি পরবর্তী যুগের অধিকাংশ আলেমগণের অভিমত অপেক্ষা জোরালো ও সুস্পষ্ট। তারা বলেন, নূহ আ. এর কবর 'বিকা' শহরে অবস্থিত। যেটি বর্তমানে 'কারক-ই-নূহ' নামে সুপরিচিত। এ কবর থাকার কারণে সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে।
📄 কতিপয় শিক্ষণীয় বিষয়
১। প্রত্যেক মানুষকে নিজের কার্যকলাপ ও আমলের জন্য নিজেকেই আল্লাহ পাকের দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। সুতরাং পিতার বুযুর্গী ও উচ্চ মর্যাদা দ্বারা পুত্রের পাপের প্রতিকার হতে পারে না এবং পুত্রের নেকআমল ও পারলৌকিক সৌভাগ্য পিতার অবাধ্যতাচরণের বিনিময় বা বদলাও হতে পারে না। হযরত নূহ আ.-এর নবুয়ত ও পয়গম্বরী পুত্র কেনানের কুফরের শাস্তি প্রতিরোধ করতে পারে নি এবং হযরত ইবরাহীম আ.-এর পয়গম্বরী ও উচ্চ মর্যাদা পিতা আযরের শিরকের জন্য মুক্তির কারণ হতে পারে না।
২। খারাপ সম্পর্ক বিষের চেয়েও মারাত্মক। এর প্রতিফল ও পরিণতি কেবলই অপমান, লাঞ্ছনা ও ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষের জন্য নেকআমল যেমনি অত্যন্ত জরুরি, তদপেক্ষা অধিক জরুরি নেককারদের সংশ্রব। পক্ষান্তরে মন্দকার্য থেকে আত্মরক্ষা করা মানুষের জীবনের উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য। তার চেয়ে অধিক প্রয়োজনীয় অসৎ সঙ্গ হতে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা।
* নূহের পুত্র পাপাচারীদের সাথে উঠাবসা করত। ফলে সে নবীবংশের মর্যাদা হারিয়ে ফেলে। (নবী বংশে জন্মলাভ তার কোনো কাজে আসে নি।)
* আসহাবে কাহাফের কুকুর কিছুদিন নেককারদের সংশ্রব লাভ করে মানব (এর মতো মর্যাদাশালী) হয়ে গেছে।
* নেককারের সংশ্রব তোমাকে নেককার বানিয়ে দেবে। বদকারের সঙ্গ তোমাকে বদকার বানিয়ে ছাড়বে।
৩। আল্লাহ তাআলার ওপর পূর্ণ নির্ভর ও ভরসা রাখার সাথে বাহ্যিক উপকরণের ব্যবহার তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়। বরং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের জন্য সঠিক কর্মপন্থা। সে কারণেই প্লাবন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নূহ আ.-এর নৌকার প্রয়োজন হয়েছিল।
৪। আল্লাহ তাআলার পয়গম্বর নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও মানবীয় স্বভাবসুলভ কারণে আম্বিয়া আলাইহিস সালামগণের পদস্খলন বা ত্রুটি-বিচ্যুতি সংঘটিত হতে পারে। কিন্তু তারা সেই ত্রুটি-বিচ্যুতির উপর স্থায়ী থাকেননা। বরং আল্লাহ পাকের তরফ হতে তাদেরকে সতর্ক করে দেওয়া হয়। এবং সেই ত্রুটি হতে তাঁদেরকে দূরে সরিয়ে নেওয়া হয়। হযরত আদম আ. ও হযরত নূহ আ.-এর ঘটনাগুলো এর সঠিক সাক্ষ্য। এতদ্ভিন্ন তাঁরা গায়েব সম্পর্কীয় জ্ঞানের অধিকারী নন। যেমন এ ঘটনায় নূহ আ.-কে আল্লাহ বলেছেন: "আমার নিকট এমন বিষয়ের সুপারিশ করো না, যা সম্বন্ধে তুমি অবহিত নও।" এতে পরিষ্কারভাবে উপর্যুক্ত কথাটি বুঝা যায়।
৫। 'কর্মফল' সম্বন্ধীয় আল্লাহ পাকের কানুন যদিও প্রত্যেক ক্ষেত্রেই নিজের কাজ করে যাচ্ছে, কিন্তু প্রত্যেক অপরাধের শাস্তি কিংবা প্রত্যেক নেককাজের বিনিময় দুনিয়াতেই পাওয়া যাওয়া জরুরি নয়। কেননা এ বিশ্বজগৎ কর্মক্ষেত্র। আর কর্মফলের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে পরকালকে। তথাপি জুলুম ও অহঙ্কার এ দুটি মন্দকর্মের শাস্তি কোনো না কোনো প্রকারে দুনিয়াতেও পাওয়া যায়।
ইমাম আবু হানিফা রহ. বলতেন, "জালিম ও অহঙ্কারী লোকেরা মৃত্যুর আগেই নিজেদের জুলুম ও অহঙ্কারের কিছু-না-কিছু শাস্তি পেয়ে থাকে এবং অপমান ও ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়। যেমন আল্লাহ পাকের সত্য পয়গম্বরগণকে কষ্ট প্রদানকারী সম্প্রদায়সমূহের এবং ইতিহাসে উল্লিখিত জালিম ও অহঙ্কারীদের উপদেশমূলক ধ্বংসলীলার ঘটনাসমূহ এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ।