📄 হযরত নূহ আ.-এর আবির্ভাবের সময়কাল
হযরত শীষ ও ইদরীস আ.-এর পরে পৃথিবীতে যখন মূর্তি ও শয়তানের পূজা শুরু হয়ে গেল, মানুষ যখন বিভ্রান্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেল, তখন আল্লাহ তাআলা মেহেরবানি করে মানুষের হেদায়াতের জন্য হযরত নূহ আ. কে 'রাসূল' হিসেবে পৃথিবীতে প্রেরণ করেন। বিশ্ববাসীর কাছে তিনিই সর্বপ্রথম রাসূল।
হযরত নূহ আ. যখন নবুয়তের দায়িত্ব লাভ করেন, তখন তাঁর বয়স কত ছিল, এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন, পঞ্চাশ বছর। কেউ বলেন, তিন শ পঞ্চাশ বছর। আবার কারো মতে চার শ আশি বছর। তৃতীয় অভিমতটি ইবনে জারির রহ. ও হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. এর।
হযরত শীষ ও ইদরীস আ.-এর পরে পৃথিবীতে যখন মূর্তি ও শয়তানের পূজা শুরু হয়ে গেল, মানুষ যখন বিভ্রান্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেল, তখন আল্লাহ তাআলা মেহেরবানি করে মানুষের হেদায়াতের জন্য হযরত নূহ আ. কে 'রাসূল' হিসেবে পৃথিবীতে প্রেরণ করেন। বিশ্ববাসীর কাছে তিনিই সর্বপ্রথম রাসূল।
হযরত নূহ আ. যখন নবুয়তের দায়িত্ব লাভ করেন, তখন তাঁর বয়স কত ছিল, এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন, পঞ্চাশ বছর। কেউ বলেন, তিন শ পঞ্চাশ বছর। আবার কারো মতে চার শ আশি বছর। তৃতীয় অভিমতটি ইবনে জারির রহ. ও হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. এর।
📄 পবিত্র কোরআনে হযরত নূহ আ.
পবিত্র কোরআনুল কারিমে হযরত নূহ আ.-এর ঘটনা সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিতভাবে মোট ৪৩ জায়গায় এসেছে। কিন্তু ঘটনার বিস্তারিত গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ শুধু সূরা আরাফ, সূরা হৃদ, সূরা মুমিনূন, সূরা শুআরা, সূরা কামার ও সূরা নূহের মধ্যে বর্ণনা করা হয়েছে। আর তা-ই আমাদের মূল আলোচ্য বিষয়।
সূরা আরাফে আল্লাহ তাআলা বলেন-
লক্কদ আরসালনা নূহান ইলা কওমিহী ফাকলা ইয়া কওমিউবুদুল্লাহা মা লাকুম মিন ইলাহিন গইরুহু ইন্নী আখাফু আলাইকুম আজাবা ইয়াওমিন আজীম (৫৯) কলাল মালাউ মিন কওমিহী ইন্না লানারাকা ফী দলািলন মুবীন (৬০) কলা ইয়া কওমি লাইসা বী দলালাতুন ওয়া লাকিন্নী রসূলুম মির রব্বিল আলামীন (৬১) উবাল্লিগুকুম রিসালাতি রব্বী ওয়া আনসাহু লাকুম ওয়া আলামু মিনাল্লাহি মা লা তালামুন (৬২) আওয়া জিবতুম আন জাআকুম জিকরুম মির রব্বিকুম আলা রজলিম মিনকুম লি ইউনজিরাকুম ওয়া লিতাত্তাকু ওয়া লাল্লাকুম তুরহামুন (৬৩) ফাকাজ্জাবুহু ফাআনজায়নাহু ওয়াল্লাজিনা মাআহু ফিল ফুলকি ওয়া আগ্রহনাল্লাজিনা কাজ্জাবু বিআয়াতিনা ইন্নাহুম কানূ কওমান আমীন
"আমি তো নূহকে পাঠিয়েছিলাম তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে এবং সে বলেছিল, 'হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ নেই। আমি তোমাদের জন্য মহা দিনের শাস্তির আশঙ্কা করছি।"
তাঁর সম্প্রদায়ের প্রধানরা বলল, আমরা তো তোমাকে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে দেখছি। তিনি বলেন, হে সম্প্রদায়! আমাতে কোনো ভ্রান্তি নেই। আমি তো জগতসমূহের প্রতিপালকের রাসূল। আমার প্রতিপালকের বাণী আমি তোমাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি এবং তোমাদের সৎ উপদেশ দিচ্ছি। আর তোমরা যা জানো না, আমি তা আল্লাহর কাছ থেকে জানি। তোমরা কি বিস্মিত হচ্ছ, তোমাদেরই একজনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমাদের কাছে উপদেশ এসেছে, যাতে সে তোমাদের সতর্ক করে। তোমরা সাবধান হও এবং তোমরা অনুকম্পা লাভ কর। এরপর তারা তাকে মিথ্যাবাদী বলে। তাকে ও তাঁর সঙ্গে যারা নৌকায় ছিল, আমি তাদের উদ্ধার করি এবং যারা আমার নির্দেশ প্রত্যাখান করেছিল তাদেরকে নিমজ্জিত করি। তারা ছিল এক অন্ধ সম্প্রদায়।" (সূরা আরাফ: ৫৯-৬৪)
সূরা হুদে আল্লাহ তাআলা বলেন- "আমি তো নূহকে তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, আমি তোমাদের জন্য প্রকাশ্য সতর্ককারী, যাতে তোমরা আল্লাহ ছাড়া অপর কিছুর ইবাদত না কর। আমি তোমাদের জন্য এক ভয়ঙ্কর দিবসের শাস্তির আশঙ্কা করি। তাঁর সম্প্রদায় প্রধানরা যারা ছিল কাফের, তারা বলল- আমরা তোমাকে তো আমাদের মতোই মানুষ দেখছি। আমরা তো দেখছি, অনুধাবন না করে তোমার অনুসরণ করছে তারাই, যারা আমাদের মধ্যে অধম (নীচ) এবং আমরা আমাদের ওপর তোমাদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব দেখছি না; বরং আমরা তোমাদের মিথ্যাবাদী মনে করি।
তিনি বললেন, হে আমার সম্প্রদায়। তোমরা আমাকে বল, আমি যদি আমার প্রতিপালক প্রেরিত স্পষ্ট নিদর্শনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকি এবং তিনি যদি আমাকে তাঁর নিজ অনুগ্রহ দান করে থাকেন, অথচ এ বিষয়ে তোমরা জ্ঞান শূন্য হও, আমি কি বিষয়ে তোমাদের বাধ্য করতে পারি, যখন তোমরা এটা অপছন্দ কর?
হে আমার সম্প্রদায়! এর পরিবর্তে আমি তোমাদের কাছে ধন-সম্পদ চাই না। আমার পারিশ্রমিক তো আল্লাহরই কাছে। মুমিনদেরকে তাড়িয়ে দেওয়া আমার কাজ নয়। তারা নিশ্চিতভাবে তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ লাভ করবে। কিন্তু আমি দেখছি তোমরা এক অজ্ঞ সম্প্রদায়!
হে আমার সম্প্রদায়! আমি যদি তাদের তাড়িয়ে দিই, তবে আল্লাহর শাস্তি থেকে আমাকে কে রক্ষা করবে? তবুও কি তোমরা চিন্তা কর না? আমি তোমাদের বলি না আমার কাছে আল্লাহর ধনভাণ্ডার আছে আর না অদৃশ্য সম্বন্ধে আমি অবগত এবং এও বলি না, আমি ফেরেশতা। তোমাদের দৃষ্টিতে যারা হেয় তাদের সম্বন্ধে আমি বলি না, আল্লাহ তাদের কখনোই কল্যাণ দান করবেন না। তাদের অন্তরে যা আছে, তা আল্লাহ ভালোভাবেই অবগত। তা হলে আমি অবশ্যই যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবো।
তারা বলল, হে নূহ! তুমি আমাদের সঙ্গে বিতণ্ডা করছ; তুমি বিতণ্ডা করছ আমাদের সঙ্গে অতিমাত্রায়। সুতরাং তুমি সত্যবাদী হলে আমাদেরকে যার ভয় দেখাচ্ছ তা আনয়ন কর। তিনি বললেন, ইচ্ছা করলে আল্লাহই তা তোমাদের কাছে উপস্থিত করবেন এবং তোমরা তাকে ব্যর্থ করতে পারবে না। আমি তোমাদের উপদেশ দিতে চাইলেও আমার উপদেশ তোমাদের উপকারে আসবে না, যদি আল্লাহ তোমাদেরকে বিভ্রান্ত করতে চান। তিনিই তোমাদের প্রতিপালক এবং তাঁরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তন করবে। তারা কি বলে, সে এটা রচনা করেছে? বলুন! আমি যদি এটা রচনা করে থাকি তবে আমিই আমার অপরাধের জন্য দায়ী হব। তোমরা যে অপরাধ করছ, তার জন্য আমরা দায়ী নই।
নূহের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছিল, যারা ইমান এনেছে তারা ছাড়া কোনো সম্প্রদায়ের অন্য কেউ কখনো ইমান আনবে না। সুতরাং তারা যা করে, তার জন্যে আপনি রাগ করবেন না। আপনি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার প্রত্যাদেশ অনুযায়ী নৌকা নির্মাণ করুন এবং যারা সীমালঙ্ঘন করেছে, তাদের সম্পর্কে আপনি আমাকে কিছু বলবেন না; তারা তো নিমজ্জিত হবে।
তিনি নৌকা নির্মাণ করতে লাগলেন এবং যখনই তাঁর সম্প্রদায়ের প্রধানরা তাঁর কাছ দিয়ে যেত, তাঁকে উপহাস করত। তিনি বলতেন: তোমরা যদি আমাকে উপহাস কর, তবে আমরাও তোমাদের উপহাস করব; যেমন তোমরা উপহাস করছ এবং তোমরা অচিরেই জানতে পারবে, কার ওপর আসবে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আর কার ওপর আপতিত হবে স্থায়ী শাস্তি।
অবশেষে যখন আমার আদেশ আসল এবং উনুন (চুলা) উথলে উঠল, আমি বললাম; এতে উঠিয়ে নাও প্রত্যেক শ্রেণীর যুগল, যাদের বিরুদ্ধে পূর্বে সিদ্ধান্ত হয়েছে তারা ছাড়া তোমার পরিবার-পরিজনকে এবং যারা ইমান এনেছে তাদেরকে। তাঁর সঙ্গে ঈমান এনেছিল অল্প কয়েকজন। তিনি বললেন, এতে আরোহণ কর! আল্লাহর নামে এর গতি ও স্থিতি। আমার প্রতিপালক অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। পর্বত-প্রমাণ তরঙ্গের মধ্যে তা তাদের নিয়ে বয়ে চলল।
নূহ আ. তাঁর পুত্র, যে তাদের থেকে পৃথক ছিল, তাকে আহ্বান করে বললেন- হে আমার পুত্র! আমাদের সঙ্গে আরোহণ কর এবং কাফেরদের সাথী হয়ো না। সে বলল, 'আমি এমন এক পর্বতে আশ্রয় নেব, যা আমাকে প্লাবন হতে রক্ষা করবে। তিনি (নূহ আ.) বললেন, আজ আল্লাহর বিধান থেকে রক্ষা করার কেউ নেই, যাকে আল্লাহ দয়া করবেন সে ছাড়া! এরপর তরঙ্গ তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দিল এবং সে নিমজ্জিতদের অন্তর্ভুক্ত হল। এরপর বলা হল, হে পৃথিবী! তুমি তোমার পানি গ্রাস করে লও; হে আকাশ! ক্ষান্ত হও। এরপর বন্যা প্রশমিত হল এবং কার্য সমাপ্ত হল।
নৌকা জুদী পাহাড়ের ওপর স্থির হল এবং বলা হল, যালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হোক! নূহ তাঁর প্রতিপালককে সম্বোধন করে বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমার পুত্র আমার পরিবারর্ভুক্ত এবং আপনার প্রতিশ্রুতি সত্য এবং আপনি বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক। তিনি বললেন, হে নূহ! সে তোমার পরিবারভূক্ত নয়। সে অসৎ কর্মপরায়ণ। সুতরাং যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে আমাকে অনুরোধ করো না। আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি, তুমি অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। তিনি বললেন, হে আমার প্রতিপালক! যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে যাতে আপনাকে অনুরোধ না করি- এ জন্য আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন এবং আমাকে দয়া না করেন, তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।
বলা হল, হে নূহ। আমার দেওয়া শান্তিসহ অবতরণ কর। এবং তোমার প্রতি ও যে সকল সম্প্রদায় তোমার সঙ্গে আছে তাদের প্রতি কল্যাণসহ। অপর সম্প্রদায়সমূহকে জীবন উপভোগ করতে দেব, পরে আমার পক্ষ হতে কঠিন শাস্তি তাদের স্পর্শ করবে। এ সকল অদৃশ্যলোকের সংবাদ আমি আপনাকে অহির দ্বারা জানিয়েছি। যা এর আগে আপনি জানতেন না এবং আপনার সম্প্রদায়ও জানত না। সুতরাং ধৈর্য ধারণ করুন, শুভ পরিণাম মুত্তাকিদের জন্য।" (সূরা হুদ: ২৫-৪৯)
সূরা মুমিনুনে আল্লাহ তাআলা বলেন- "আমি নূহকে পাঠিয়েছিলাম তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে। তিনি বলেছিলেন, হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ নেই। তবুও কি তোমরা সাবধান হবে না? তাঁর সম্প্রদায়ের প্রধানরা, যারা কুফরি করেছিল তারা বলল- এ তো তোমাদের মতো একজন মানুষই। সে তোমাদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে চাচ্ছে। আল্লাহ ইচ্ছা করলে ফেরেশতা পাঠাতেন। আমরা তো আমাদের পূর্বপুরুষদের সময়ে এরূপ ঘটেছে বলে শুনি নি। এ তো এমন এক লোক, যাকে পাগলামী পেয়ে বসেছে। সুতরাং এর সম্পর্কে কিছুকাল অপেক্ষা কর। নূহ আ. বলেছিলেন, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য করুন! কারণ, তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলছে। এরপর আমি তাঁর কাছে ওহি পাঠালাম, তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার অহি অনুযায়ী নৌযান নির্মাণ কর। এবং যখন আমার আদেশ আসবে ও উনুন (চুলা) উথলে উঠবে, তখন তাতে (নৌযানে) উঠিয়ে নিও প্রত্যেক জীবের এক এক জোড়া এবং তোমার পরিবার-পরিজনকে। তার মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে আগে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাদের সম্পর্কে তুমি আমাকে কিছু বল না। তারা তো নিমজ্জিত হবে। যখন তুমি ও তোমার সাথীরা নৌযানে আসন গ্রহণ করবে তখন বলবে- সকল প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি আমাদের উদ্ধার করেছেন যালেম সম্প্রদায় থেকে। আরো বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এমনভাবে অবতরণ করান যা হবে কল্যাণকর। আর আপনিই শ্রেষ্ঠ অবতরণকারী। এতে অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে। আমি তো তাদের পরীক্ষা করেছিলাম।" (সূরা মুমিনুন: ২৩-৩০)
সূরা শুআরায় আল্লাহ তাআলা বলেন- কাজ্জাবাত কওমু নূহিনিল মুরসালীনা (১০৫) ইজ কলা লাহুম আখূহুম নূহুন আলা তাত্তাকুন (১০৬) ইন্নী লাকুম রসূলুন আমীন (১০৭) ফাত্তাকুল্লাহা ওয়া আতীউন (১০৮) ওয়া মা আসআলুকুম আলাইহি মিন আজরিন ইন আজরিয়া ইল্লা আলা রব্বিল আলামীন (১০৯) ফাত্তাকুল্লাহা ওয়া আতীউন (১১০) কলু আনুমিনু লাকা ওয়াত্তাবাআকাল আরজালুন (১১১) কলা ওয়া মা ইলমী বিমা কানূ ইয়ামালুন (১১২) ইন হিসাবাহুম ইল্লা আলা রব্বী লাও তাশরুন (১১৩) ওয়া মা আনা বিতরিদিল মুমিনীন (১১৪) ইন আনা ইল্লা নাযীরুম মুবীন (১১৫) কলু লাইল লাম তানতাহি ইয়া নূহু লাতাকূনান্না মিনাল মারজূমীন (১১৬) কলা রব্বি ইন্না কওমী কাজ্জাবুন (১১৭) ফাফতাহ বাইনী ওয়া বাইনাহুম ফাতহাও ওয়া নাজ্জিনী ওয়া মাম মাঈয়া মিনাল মুমিনীন (১১৮) ফাআনজায়নাহু ওয়া মাম মাআহু ফিল ফুলকিল মাশহূন (১১৯) ছুম্মা আগ্রহনাল বাদিল বাকীন (১২০) ইন্না ফী যাালিকা লাআয়াতাও ওয়া মা কানা আকছারুহুম মুমিনীন (১২১) ওয়া ইন্না রব্বাকা লাহুয়াল আযীযুর রহীম (১২২)
"নূহের সম্প্রদায় রাসূলগণের প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছিল। যখন তাদের ভাই নূহ তাদের বললেন, তোমরা কি সাবধান হবে না? আমি তো তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রাসূল। অতএব আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। আমি তোমাদের কাছে এর জন্য কোনো প্রতিদান চাই না। আমার পুরস্কার তো জগতসমূহের প্রতিপালকের কাছেই আছে। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। তারা বলল, আমরা কি তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব, অথচ ইতরজনেরা তোমার অনুসরণ করছে? নূহ বললেন: তারা কি করত, তা আমার জানা নেই। তাদের হিসাব গ্রহণ তো আমার প্রতিপালকের কাজ; যদি তোমরা বুঝতে! মুমিনগণকে তাড়িয়ে দেওয়া আমার কাজ নয়। আমি তো কেবল একজন স্পষ্ট সতর্ককারী। তারা বলল, হে নূহ! তুমি যদি নিবৃত্ত না হও তবে তুমি অবশ্যই প্রস্তরাঘাতে নিহতদের শামিল হবে। নূহ বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায়তো আমাকে অস্বীকার করছে। সুতরাং আমার ও তাদের মধ্যে স্পষ্ট মীমাংসা করে দাও এবং আমাকে ও আমার সঙ্গে যে সব মুমিন আছে, তাদেরকে রক্ষা কর। অতএব আমি তাঁকে ও তাঁর সঙ্গে যারা ছিল, তাদের রক্ষা করলাম বোঝাইকৃত নৌযানে। আর বাকিদের ডুবিয়ে দিলাম। এতে অবশ্যই রয়েছে নিদর্শন। কিন্তু তাদের অধিকাংশই বিশ্বাসী নয়; আর আপনার প্রতিপালক; তিনি তো পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।" (সূরা শুআরা : ১০৫-১২২)
সূরা কামারে আল্লাহ তাআলা বলেন- কাজ্জাবাত কবলাহুম কওমু নূহিন ফাকাজ্জাবূ আবদানা ওয়া কলূ মাজনূনূ ওয়াজদুজির (৯) ফাদআ রব্বাহূ আন্নী মাগলূবুন ফানতাসির (১০) ফাফাতাহনা আবওয়াবাস সামাি বিমািম মুনহামির (১১) ওয়া ফাজ্জারনাল আরদ উয়ুনান ফালতাক্বল মাউ আলা আমরিন ক্বদ কুদির (১২) ওয়া হামালনাহু আলা যাাতি আলওয়াহিও ওয়া দুসুর (১৩) তাজরী বিআইয়ুনিনা জাযাআল লিমান কানা কুফির (১৪) ওয়া লাকদ তারাকনাহা আয়াতান ফাহাল মিম মুদ্দাকির (১৫) ফাকাইফা কানা আজাবী ওয়া নুযুর (১৬) ওয়া লাকদ ইয়াসসারনাল কুরআনা লিজজিকরি ফাহাল মিম মুদ্দাকির (১৭) কাজ্জাবাত আদুন ফাকাইফা কানা আজাবী ওয়া নুযুর
"এদের আগে নূহের সম্প্রদায়ও মিথ্যা আরোপ করেছিল। মিথ্যা আরোপ করেছিল আমার বান্দার প্রতি এবং বলেছিল, 'এ তো এক পাগল! আর তাকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছিল, তখন সে তাঁর প্রতিপালককে আহ্বান করে বলেছিল- 'আমি তো অসহায়। অতএব তুমি প্রতিবিধান কর!' ফলে আমি উন্মুক্ত করে দিলাম আকাশের দ্বার, প্রবল বারিবর্ষণে এবং মাটি থেকে উৎসারিত করলাম ঝরনা। সকল পানি মিলিত হলো এক পরিকল্পনা অনুসারে। তখন নূহকে আরোহণ করালাম কাঠ ও পেরেক নির্মিত এক নৌযানে, যা চলত আমার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। এটা পুরস্কার তার জন্য যে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। আমি একে রেখে দিয়েছি এক নিদর্শনরূপে। অতএব উপদেশ গ্রহণকারীরা কেউ আছে কি? কী কঠোর ছিল আমার শান্তি ও সতর্কবাণী! কোরআন আমি সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য, কে আছে উপদেশ গ্রহণকারী? (সূরা কামার: ৯-১৭)
সূরা নূহে হযরত নূহ আ.-এর আলোচনা বিস্তারিত এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- "নূহকে আমি প্রেরণ করেছিলাম তাঁর সম্প্রদায়ের প্রতি এ নির্দেশসহ- তুমি তোমার সম্প্রদায়কে সতর্ক কর তাদের প্রতি শাস্তি আসার আগে। সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্য স্পষ্ট সতর্ককারী এ বিষয়ে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাঁকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। তিনি তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন এবং তিনি তোমাদের অবকাশ দেবেন এক নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত। নিশ্চয় আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত কাল উপস্থিত হলে, তা বিলম্বিত হয় না; যদি তোমরা তা জানতে! তিনি বলেছিলেন; হে আমার প্রতিপালক! আমি তো আমার সম্প্রদায়কে দিবা-রাত্রি আহ্বান করেছি। কিন্তু আমার আহ্বানে তাদের পলায়ন প্রবণতাই বৃদ্ধি করেছে। আমি যখনই তাদেরকে আহ্বান করি, যাতে তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর, তারা কাণে আঙ্গুলি দেয়, বস্ত্রাবৃত করে নিজেদেরকে ও জিদ করতে থাকে এবং অতিশয় ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে।
এরপর আমি তাদেরকে আহ্বান করেছি প্রকাশ্যে, পরে আমি উচ্চস্বরে প্রচার করে ও উপদেশ দিয়েছি গোপনে। বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা কর, তিনিই তো মহা ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন। তিনি তোমাদের সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতিতে এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা। তোমাদের কি হয়েছে, তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতে চাচ্ছ না? অথচ তিনিই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন পর্যায়ক্রমে, তোমরা লক্ষ কর নি? আল্লাহ কিভাবে সৃষ্টি করেছেন সপ্ত স্তরে বিন্যস্ত আকাশমণ্ডলী? এবং সেখানে চাঁদকে স্থাপন করেছেন আলোকরূপে ও সূর্যকে স্থাপন করেছেন প্রদীপরূপে। তিনি তোমাদেরকে উদ্ভুত করেছেন মাটি থেকে। এরপর তাতে তিনি তোমাদেরকে প্রত্যাবৃত্ত করবেন ও পরে পুনরুত্থিত করবেন এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য ভূমিকে করেছেন বিস্তৃত, যাতে তোমরা চলাফেরা করতে পার প্রশস্ত পথে। নূহ বলেছিলেন, হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় তো আমাকে অমান্য করেছে এবং অনুসরণ করেছে এমন লোকের, যার ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি তার ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করে নি।
তারা ভয়ানক ষড়যন্ত্র করেছিল এবং বলেছিল, তোমরা কখনো পরিত্যাগ করো না তোমাদের দেব-দেবীকে; পরিত্যাগ করো না ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুছ, ইয়াউক ও নাসরকে। তারা অনেককে বিভ্রান্ত করেছে। সুতরাং জালিমদের বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করে না। তাদের অপরাধের জন্য তাদের নিমজ্জিত করা হয়েছিল এবং পরে তাদের দাখিল করা হয়েছিল অগ্নিতে। এরপর তারা কাউকেই আল্লাহর মুকাবিলায় পায় নি সাহায্যকারীরূপে।
নূহ আরও বলেছিলেন, হে আমার প্রতিপালক! পৃথিবীতে কাফিরদের মধ্য হতে কোনো গৃহবাসীকে অব্যাহতি দিও না। তুমি তাদের অব্যাহতি দিলে, তারা তোমার বান্দাদের বিভ্রান্ত করবে এবং জন্ম দিতে থাকবে কেবল দুষ্কৃতিকারী ও কাফির। হে আমার প্রতিপালক! তুমি ক্ষমা কর আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং যারা মুমিন হয়ে আমার গৃহে প্রবেশ করে তাদেরকে এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের। আর জালিমদের শুধু ধ্বংসই বৃদ্ধি কর। (সূরা নূহ : ১-২৮)
কোরআন মাজিদের আরো কিছু সূরায় আল্লাহ তাআলা হযরত নূহ আ.-এর সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন। যেমন সূরা ইউসুফ: ৭১-৭৩, সূরা আম্বিয়া: ৭৬-৭৭, সূরা আনকাবুত : ১৪-১৫, সূরা সাফফাত: ৭৫-৮২ নং আয়াতসমূহ। তদ্রুপ কোরআন মাজিদের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ তাআলা হযরত নূহ আ.-এর প্রশংসা এবং তাঁর বিরুদ্ধাচরণকারীদের নিন্দা করা হয়েছে। যেমন: সূরা নিসায় আল্লাহ তাআলা বলেন-
আওহায়না ইলাইকা কামা আওহায়না ইলা নূহিন ওয়ান নাবিয়্যিনা মিম বাদিহী ওয়া আওহায়না ইলা ইবরাহীমা ওয়া ইসমাইল ওয়া ইসহাক্বা ওয়া ইয়াকুবা ওয়াল আসবাত্বি ওয়া ঈসা ওয়া আইয়ূবা ওয়া ইউনুসা ওয়া হারূনা ওয়া সুলায়মানা ওয়া আতায়না দাউদা যাবূরা (১৬৩) ওয়া রসুলান কদ কসসনাহুম আলাইকা মিন ক্বলু ওয়া রসূলান লাম নাক্বসুসহুম আলাইকা ওয়া কাল্লামাল্লাহু মূসা তকলীমা (১৬৪) রুসুলান মুবাশশিরীনা ওয়া মুনজিরীনা লি আল্লা ইয়াকূনা লিন নাসি আলাল্লাহি হুজ্জাতুম বাদাল রুসুলি ওয়া কানাল্লাহু আযীযান হাকীমা
"হে নবী! আপনার কাছে অহি প্রেরণ করেছি, যেমন নূহ ও তাঁর পরবর্তী নবীগণের কাছে প্রেরণ করেছিলাম। ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাঁর বংশধরগণ, ঈসা, আইয়ূব, ইউনুস, হারুন এবং সুলাইমানের কাছে অহি প্রেরণ করেছিলাম। অনেক রাসূল প্রেরণ করেছি, যাদের কথা পূর্বে আপনাকে বলেছি এবং অনেক রাসূল, যাদের কথা আপনাকে বলি নি। এবং মূসার সাথে আল্লাহ সাক্ষাৎ-বাক্যালাপ করেছিলেন। সুসংবাদবাহী ও সাবধানকারীরূপে রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি। যাতে রাসূল আসার পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো অভিযোগ না থাকে এবং আল্লাহ প্ররাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।" (সূরা নিসা: ১৬৩-১৬৪)
সূরা আনআমে আল্লাহ তাআলা বলেন-
ওয়া তিলকা হুজ্জাতুনা আতায়নাহা ইবরাহীমা আলা কওমিহী নারফাউ দারাজাতিম মান নাশাউ ইন্না রব্বাকা হাকীমুন আলীম (৮৩) ওয়া ওয়াহাবনা লাহূ ইসহাক্বা ওয়া ইয়াকুবা কুল্লা হাদানিনা ওয়া নূহান হাদানিনা মিন ক্বলু ওয়া মিন যুররিয়্যাতিহী দাউদা ওয়া সুলায়মানা ওয়া আইয়ূবা ওয়া ইউসুফা ওয়া মূসা ওয়া হারূনা ওয়া কাজালিকা নাযযিল মুহসিনীন (৮৪) ওয়া যাকারিয়া ওয়া ইয়াহইয়া ওয়া ঈসা ওয়া ইলইয়াসা কুল্লুম মিনাস সালিহীন (৮৫) ওয়া ইসমাইল ওয়াল ইয়াসাআ ওয়া ইউনুসা ওয়া লুত্বা ওয়া কুল্লা ফাদদলনা আলাল আলামীন (৮৬) ওয়া মিন আবাইহিম ওয়া যুররিয়্যাতিহিম ওয়া ইখওয়ানিম ওয়াজতাবায়নাহুম ওয়া হাদানাহুম ইলা সিরাতিল মুস্তাক্বীম
"এটা আমার যুক্তি প্রমাণ, যা ইবরাহীমকে দিয়েছিলাম তার সম্প্রদায়ের মোকাবিলায়। যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় আমি উন্নীত করি। আপনার প্রতিপালক প্রজ্ঞাময়, জ্ঞানী। এবং তাকে দান করেছিলাম ইসহাক ও ইয়াকুব এবং তাদের প্রত্যেককে সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম। পূর্বে নূহকেও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম এবং তাঁর বংশধর দাউদ, সুলাইমান, আইয়ূব, ইউসুফ, মূসা এবং হারুনকেও। আর এভাবেই সৎকর্ম পরায়ণদের পুরস্কৃত করি। এবং যাকারিয়া, ঈসা এবং ইলিয়াসকেও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম। তারা সকলে পুণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত। আরও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম ইসমাইল, আল ইয়াসাআ, ইউনুস ও লুতকে এবং শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছিলাম বিশ্বজগতের উপর প্রত্যেককে এবং তাদের কিছুসংখ্যক পিতৃপুরুষ, বংশধর এবং ভ্রাতৃবৃন্দকে। তাদেরকে মনোনীত করেছিলাম এবং সরল পথে পরিচালিত করেছিলাম।" (সূরা আনআম: ৮৩-৮৭)
সূরা তওবায় আল্লাহ তাআলা বলেন- আলাম ইয়াতিহিম নাবাউল্লাজিনা মিন ক্ববলাহিম কওমি নূহিন ওয়া আদিল ওয়া ছামূদা ওয়া কওমি ইবরাহীমা ওয়া আসহািব মাদইয়ানা ওয়াল মুতফিকাত আতাতহুম রুসুলুহুম বিল বাইয়্যিনাত ফামা কানাল্লাহু লি ইয়াজলি মাহুম ওয়া লাকিন কানূ আনফুসাহুম ইয়াজলিমূন
"তাদের পূর্ববর্তী নূহ, আদ ও ছামুদের সম্প্রদায়, ইবরাহীমের সম্প্রদায় এক মাদায়েন ও বিধ্বস্ত নগরের অধিবাসীদের সংবাদ কি তাদের কাছে আসে নি? তাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শনসহ তাদের রাসূলগণ এসেছিলেন। আল্লাহ এমন নন, তাদের উপর জুলুম করেন। কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করে।" (সূরা তাওবা: ৭০)
সূরা ইবরাহীমে আল্লাহ তাআলা বলেন- আলাম ইয়ািতকুম নাবাউল্লাজিনা মিন ক্বলিকুম কওমি নূহিন ওয়া আদিল ওয়া ছামূদা
"তোমাদের কাছে কি সংবাদ আসে নি তোমাদের পূর্ববর্তীদের; (অর্থাৎ) নূহের সম্প্রদায়ের, আদ ও ছামুদের?"
সূরা বনি ইসরাইলে আল্লাহ তাআলা বলেন- যুররিয়্যাতা মান হামালনা মাআ নূহিন ইন্নাহূ কানা আবদান শাকূরা
"হে তাদের বংশধর। যাদের আমি নূহের সাথে আরোহণ করিয়েছিলাম; সে তো ছিল পরম কৃতজ্ঞ বান্দা।” (সূরা বনী ইসরাঈল: ৩) ওয়া কাম আহলাকনা মিনাল কুরূনি মিম বাদি নূহিন ওয়া কাফা বিরব্বিকা বিযুনূবি ইবাদিহী খবীরাম বাসীরা
"নূহের পর আমি কত মানবগোষ্ঠী ধ্বংস করেছি! তোমার প্রতিপালকই তাঁর বান্দাদের পাপাচারের সংবাদ রাখা ও পর্যবেক্ষণের জন্য যথেষ্ট।" (সূরা বনি ইসরাইল: ১৭)
সূরা আম্বিয়া, সূরা মুমিনূন, সূরা শুরা ও সূরা আনকাবূতে তাঁর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। সূরা আহযাবে আল্লাহ তাআলা বলেন- ওয়া ইজ আখাজনা মিনান নাবিয়্যিনা মীছাক্বহুম ওয়া মিনকা ওয়া মিন নূহিও ওয়া ইবরাহীমা ওয়া মূসা ওয়া ঈসাবনি মারইয়ামা ওয়া আখাজনা মিনহুম মীছাক্বান গালীযা
“হে নবী! স্মরণ করুন, যখন আমি নবীদের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম এবং আপনার কাছ থেকেও এবং নূহ, ইবরাহীম, মূসা, মরিয়ম-তনয় ঈসার কাছ থেকে। তাদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছিলাম দৃঢ় অঙ্গীকার।" (সূরা আহযাব: ৭)
সূরা সোয়াদে আল্লাহ তাআলা বলেন- কাজ্জাবাত ক্ববলাহুম কওমু নূহিও ওয়া আদু ওয়া ফিরআউনু জুল আওতাদ (১২) ওয়া ছামূদু ওয়া কওমু লুতও ওয়া আসহািবুল আইকা উলাইকাল আহযাব (১৩) ইন কুল্লুন ইল্লা কাজ্জাবার রুসুলা ফাহাক্কা ইক্বাব
"এদের পূর্বেও রাসূলদের মিথ্যাবাদী বলেছিল নূহের সম্প্রদায়, আদ ও বহুঅট্টালিকার অধিপতি ফেরাউন। ছামূদ, লুত সম্প্রদায় ও আয়কার অধিবাসী। তারা ছিল এক একটি বিশাল বাহিনী। তাদের প্রত্যেকেই রাসূলগণকে মিথ্যা বলেছে। ফলে তাদের ক্ষেত্রে আমার শাস্তি হয়েছে বাস্তব। (সূরা সোয়াদ: ১২-১৪)
সূরা মুমিনে আল্লাহ তাআলা বলেন- কাজ্জাবাত ক্ববলাহুম কওমু নূহিও ওয়াল আহযাবু মিম বাদিহিম ওয়া হাম্মাত কুল্লু উম্মাতিম বি রসূলিহিম লি ইয়াখুযূহু ওয়া জাদালূ বিল বাত্বিলি লি ইউদহিদু বিহিল হাক্ক ফা আখাজতুহুম ফাকাইফা কানা ইক্বাব (৫) ওয়া কাজালিকা হাক্কত কলিমাতু রব্বিকা আলাল্লাজিনা কাফারূ আন্নাহুম আসহািবুন নার
"এদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায় এবং তাদের পরে অন্যান্য দলও মিথ্যা আরোপ করেছিল। প্রত্যেক সম্প্রদায় নিজ নিজ রাসূলকে আবদ্ধ করার অভিসন্ধি করেছিল এবং তারা অসার তর্কে লিপ্ত হয়েছিল সত্যকে ব্যর্থ করে দেওয়ার জন্য। ফলে আমি তাদের পাকড়াও করলাম এবং কত কঠোর ছিল আমার শাস্তি! এভাবে কাফেরদের ক্ষেত্রে সত্য হলো আপনার প্রতিপালকের বাণী এরা জাহান্নামী।” (সূরা মুমিন: ৫-৬)
সূরা শুরায় আল্লাহ তাআলা বলেন- শরাআ লাকুম মিনাদ দীনি মা ওয়াসসা বিহী নূহান ওয়াল্লাজি আওহায়না ইলাইকা ওয়া মা ওয়াসসায়না বিহী ইবরাহীমা ওয়া মূসা ওয়া ঈসা আন আক্বীমুদ দীনা ওয়া লা তাত্বাফাররাকু ফীহি কবুরা আলাল মুশরিকীনা মা তাদউহুম ইলাইহি আল্লাহু ইয়াজতাবী ইলাইহি মাই ইয়াশাউ ওয়া ইয়াহদী ইলাইহি মাই ইউনীব
"তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন দীন, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি নূহকে আর যা আমি অহি করেছি আপনাকে এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে এই বলে, তোমরা দীনকে প্রতিষ্ঠা কর এবং তাতে মতভেদ করো না। আপনি মুশরিকদের যার প্রতি আহ্বান করছেন, তা তাদের কাছে দুর্বল মনে হয়। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা দীনের প্রতি আকৃষ্ট করেন এবং যে তাঁর অভিমুখী তাকে দীনের দিকে পরিচালিত করেন।" (সূরা শুরা: ১৩)
সূরা ক্বাফে আল্লাহ তাআলা বলেন- ওয়া আদু ওয়া ফিরআউনু ওয়া ইখওয়ানু লুত (১৩) ওয়া আসহািবুল আইকাতি ওয়া কওমু তুব্বা কুল্লুন কাজ্জাবার রুসুলা ফাহাক্কা ওয়াঈদ
"তাদের পূর্বেও সত্য প্রত্যাখান করেছিল নূহের সম্প্রদায়, রাস ও ছামূদ সম্প্রদায় আদ, ফেরাউন ও লূত সম্প্রদায় এবং আইকার অধিবাসী ও তুব্বা সম্প্রদায়। তাঁরা সকলেই রাসূলকে মিথ্যাবাদী বলেছিল। ফলে তাদের ওপর আমার শাস্তি আপতিত হয়েছে।" (সূরা ক্বাফ: ১২-১৪)
সূরা যারিয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন- ওয়া কওমা নূহিম মিন ক্ববলু ইন্নাহুম কানূ কওমান ফাসিক্বীন “আমি ধ্বংস করেছিলাম এদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায়কে। তারা ছিল সত্য ত্যাগ সম্প্রদায়।" (সূরা যারিয়াত: ৪৬)
সূরা নাজমে আল্লাহ তাআলা বলেন- ওয়া কওমা নূহিম মিন ক্ববলু ইন্নাহুম কানূ হুম আজলামা ওয়া আত্বগ্বা "আর এদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায়কেও (ধ্বংস করেছিলাম)। তারা ছিল অতিশয় জালিম অবাধ্য।" (সূরা নাজ্য: ৫২)
সূরা হাদিদে আল্লাহ তাআলা বলেন- ওয়া লাকদ আরসালনা নূহান ওয়া ইবরাহীমা ওয়া জাআলনা ফী যুররিয়্যাতিহিন নুবুওয়াতা ওয়াল কিতাব ফামিনহুম মুহতাদিও ওয়া কাছীরুম মিনহুম ফাসিক্বূন "আমি নূহ এবং ইবরাহীমকে রাসূলরূপে প্রেরণ করেছিলাম এবং আমি তাদের বংশধরগণের জন্য স্থির করেছিলাম নবুয়ত ও কিতাব; কিন্তু তাদের অল্পই সৎপথ অবলম্বন করেছিল এবং অধিকাংশ ছিল সত্যত্যাগী।" (সূরা হাদীদ: ২৬)
দ্বরবাল্লাহু মাছালাল লিল্লাজিনা কাফারুমরাআতা নূহিও ওমরাআতা লূত কানাতা তাহতা আবদাইনি মিন ইবাদিনা সালিহায়নি ফাখানাতাহুমা ফালাম ইয়ুগনিয়া আনহুমা মিনাল্লাহি শাইয়াও ওয়া ক্বিলাদখুলান নারা মাআদ দাখিলীন “আল্লাহ কাফেরদের জন্য নূহ ও লূতের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। তারা ছিল আমার বান্দাদের মধ্যে দুই সৎকর্মপরায়ণ বান্দার অধীন। কিন্তু তারা তাদের প্রতি বিশ্বাস ঘাতকতা করেছিল। ফলে নূহ ও লূত তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারে নি এবং তাদের বলা হলো, জাহান্নামে প্রবেশকারীদের সাথে তোমরাও তাতে প্রবেশ কর।" (সূরা তাহরীম: ১০)
পবিত্র কোরআনুল কারিমে হযরত নূহ আ.-এর ঘটনা সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিতভাবে মোট ৪৩ জায়গায় এসেছে। কিন্তু ঘটনার বিস্তারিত গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ শুধু সূরা আরাফ, সূরা হৃদ, সূরা মুমিনূন, সূরা শুআরা, সূরা কামার ও সূরা নূহের মধ্যে বর্ণনা করা হয়েছে। আর তা-ই আমাদের মূল আলোচ্য বিষয়।
সূরা আরাফে আল্লাহ তাআলা বলেন-
লক্কদ আরসালনা নূহান ইলা কওমিহী ফাকলা ইয়া কওমিউবুদুল্লাহা মা লাকুম মিন ইলাহিন গইরুহু ইন্নী আখাফু আলাইকুম আজাবা ইয়াওমিন আজীম (৫৯) কলাল মালাউ মিন কওমিহী ইন্না লানারাকা ফী দলািলন মুবীন (৬০) কলা ইয়া কওমি লাইসা বী দলালাতুন ওয়া লাকিন্নী রসূলুম মির রব্বিল আলামীন (৬১) উবাল্লিগুকুম রিসালাতি রব্বী ওয়া আনসাহু লাকুম ওয়া আলামু মিনাল্লাহি মা লা তালামুন (৬২) আওয়া জিবতুম আন জাআকুম জিকরুম মির রব্বিকুম আলা রজলিম মিনকুম লি ইউনজিরাকুম ওয়া লিতাত্তাকু ওয়া লাল্লাকুম তুরহামুন (৬৩) ফাকাজ্জাবুহু ফাআনজায়নাহু ওয়াল্লাজিনা মাআহু ফিল ফুলকি ওয়া আগ্রহনাল্লাজিনা কাজ্জাবু বিআয়াতিনা ইন্নাহুম কানূ কওমান আমীন
"আমি তো নূহকে পাঠিয়েছিলাম তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে এবং সে বলেছিল, 'হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ নেই। আমি তোমাদের জন্য মহা দিনের শাস্তির আশঙ্কা করছি।"
তাঁর সম্প্রদায়ের প্রধানরা বলল, আমরা তো তোমাকে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে দেখছি। তিনি বলেন, হে সম্প্রদায়! আমাতে কোনো ভ্রান্তি নেই। আমি তো জগতসমূহের প্রতিপালকের রাসূল। আমার প্রতিপালকের বাণী আমি তোমাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি এবং তোমাদের সৎ উপদেশ দিচ্ছি। আর তোমরা যা জানো না, আমি তা আল্লাহর কাছ থেকে জানি। তোমরা কি বিস্মিত হচ্ছ, তোমাদেরই একজনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমাদের কাছে উপদেশ এসেছে, যাতে সে তোমাদের সতর্ক করে। তোমরা সাবধান হও এবং তোমরা অনুকম্পা লাভ কর। এরপর তারা তাকে মিথ্যাবাদী বলে। তাকে ও তাঁর সঙ্গে যারা নৌকায় ছিল, আমি তাদের উদ্ধার করি এবং যারা আমার নির্দেশ প্রত্যাখান করেছিল তাদেরকে নিমজ্জিত করি। তারা ছিল এক অন্ধ সম্প্রদায়।" (সূরা আরাফ: ৫৯-৬৪)
সূরা হুদে আল্লাহ তাআলা বলেন- "আমি তো নূহকে তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, আমি তোমাদের জন্য প্রকাশ্য সতর্ককারী, যাতে তোমরা আল্লাহ ছাড়া অপর কিছুর ইবাদত না কর। আমি তোমাদের জন্য এক ভয়ঙ্কর দিবসের শাস্তির আশঙ্কা করি। তাঁর সম্প্রদায় প্রধানরা যারা ছিল কাফের, তারা বলল- আমরা তোমাকে তো আমাদের মতোই মানুষ দেখছি। আমরা তো দেখছি, অনুধাবন না করে তোমার অনুসরণ করছে তারাই, যারা আমাদের মধ্যে অধম (নীচ) এবং আমরা আমাদের ওপর তোমাদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব দেখছি না; বরং আমরা তোমাদের মিথ্যাবাদী মনে করি।
তিনি বললেন, হে আমার সম্প্রদায়। তোমরা আমাকে বল, আমি যদি আমার প্রতিপালক প্রেরিত স্পষ্ট নিদর্শনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকি এবং তিনি যদি আমাকে তাঁর নিজ অনুগ্রহ দান করে থাকেন, অথচ এ বিষয়ে তোমরা জ্ঞান শূন্য হও, আমি কি বিষয়ে তোমাদের বাধ্য করতে পারি, যখন তোমরা এটা অপছন্দ কর?
হে আমার সম্প্রদায়! এর পরিবর্তে আমি তোমাদের কাছে ধন-সম্পদ চাই না। আমার পারিশ্রমিক তো আল্লাহরই কাছে। মুমিনদেরকে তাড়িয়ে দেওয়া আমার কাজ নয়। তারা নিশ্চিতভাবে তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ লাভ করবে। কিন্তু আমি দেখছি তোমরা এক অজ্ঞ সম্প্রদায়!
হে আমার সম্প্রদায়! আমি যদি তাদের তাড়িয়ে দিই, তবে আল্লাহর শাস্তি থেকে আমাকে কে রক্ষা করবে? তবুও কি তোমরা চিন্তা কর না? আমি তোমাদের বলি না আমার কাছে আল্লাহর ধনভাণ্ডার আছে আর না অদৃশ্য সম্বন্ধে আমি অবগত এবং এও বলি না, আমি ফেরেশতা। তোমাদের দৃষ্টিতে যারা হেয় তাদের সম্বন্ধে আমি বলি না, আল্লাহ তাদের কখনোই কল্যাণ দান করবেন না। তাদের অন্তরে যা আছে, তা আল্লাহ ভালোভাবেই অবগত। তা হলে আমি অবশ্যই যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবো।
তারা বলল, হে নূহ! তুমি আমাদের সঙ্গে বিতণ্ডা করছ; তুমি বিতণ্ডা করছ আমাদের সঙ্গে অতিমাত্রায়। সুতরাং তুমি সত্যবাদী হলে আমাদেরকে যার ভয় দেখাচ্ছ তা আনয়ন কর। তিনি বললেন, ইচ্ছা করলে আল্লাহই তা তোমাদের কাছে উপস্থিত করবেন এবং তোমরা তাকে ব্যর্থ করতে পারবে না। আমি তোমাদের উপদেশ দিতে চাইলেও আমার উপদেশ তোমাদের উপকারে আসবে না, যদি আল্লাহ তোমাদেরকে বিভ্রান্ত করতে চান। তিনিই তোমাদের প্রতিপালক এবং তাঁরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তন করবে। তারা কি বলে, সে এটা রচনা করেছে? বলুন! আমি যদি এটা রচনা করে থাকি তবে আমিই আমার অপরাধের জন্য দায়ী হব। তোমরা যে অপরাধ করছ, তার জন্য আমরা দায়ী নই।
নূহের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছিল, যারা ইমান এনেছে তারা ছাড়া কোনো সম্প্রদায়ের অন্য কেউ কখনো ইমান আনবে না। সুতরাং তারা যা করে, তার জন্যে আপনি রাগ করবেন না। আপনি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার প্রত্যাদেশ অনুযায়ী নৌকা নির্মাণ করুন এবং যারা সীমালঙ্ঘন করেছে, তাদের সম্পর্কে আপনি আমাকে কিছু বলবেন না; তারা তো নিমজ্জিত হবে।
তিনি নৌকা নির্মাণ করতে লাগলেন এবং যখনই তাঁর সম্প্রদায়ের প্রধানরা তাঁর কাছ দিয়ে যেত, তাঁকে উপহাস করত। তিনি বলতেন: তোমরা যদি আমাকে উপহাস কর, তবে আমরাও তোমাদের উপহাস করব; যেমন তোমরা উপহাস করছ এবং তোমরা অচিরেই জানতে পারবে, কার ওপর আসবে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আর কার ওপর আপতিত হবে স্থায়ী শাস্তি।
অবশেষে যখন আমার আদেশ আসল এবং উনুন (চুলা) উথলে উঠল, আমি বললাম; এতে উঠিয়ে নাও প্রত্যেক শ্রেণীর যুগল, যাদের বিরুদ্ধে পূর্বে সিদ্ধান্ত হয়েছে তারা ছাড়া তোমার পরিবার-পরিজনকে এবং যারা ইমান এনেছে তাদেরকে। তাঁর সঙ্গে ঈমান এনেছিল অল্প কয়েকজন। তিনি বললেন, এতে আরোহণ কর! আল্লাহর নামে এর গতি ও স্থিতি। আমার প্রতিপালক অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। পর্বত-প্রমাণ তরঙ্গের মধ্যে তা তাদের নিয়ে বয়ে চলল।
নূহ আ. তাঁর পুত্র, যে তাদের থেকে পৃথক ছিল, তাকে আহ্বান করে বললেন- হে আমার পুত্র! আমাদের সঙ্গে আরোহণ কর এবং কাফেরদের সাথী হয়ো না। সে বলল, 'আমি এমন এক পর্বতে আশ্রয় নেব, যা আমাকে প্লাবন হতে রক্ষা করবে। তিনি (নূহ আ.) বললেন, আজ আল্লাহর বিধান থেকে রক্ষা করার কেউ নেই, যাকে আল্লাহ দয়া করবেন সে ছাড়া! এরপর তরঙ্গ তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দিল এবং সে নিমজ্জিতদের অন্তর্ভুক্ত হল। এরপর বলা হল, হে পৃথিবী! তুমি তোমার পানি গ্রাস করে লও; হে আকাশ! ক্ষান্ত হও। এরপর বন্যা প্রশমিত হল এবং কার্য সমাপ্ত হল।
নৌকা জুদী পাহাড়ের ওপর স্থির হল এবং বলা হল, যালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হোক! নূহ তাঁর প্রতিপালককে সম্বোধন করে বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমার পুত্র আমার পরিবারর্ভুক্ত এবং আপনার প্রতিশ্রুতি সত্য এবং আপনি বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক। তিনি বললেন, হে নূহ! সে তোমার পরিবারভূক্ত নয়। সে অসৎ কর্মপরায়ণ। সুতরাং যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে আমাকে অনুরোধ করো না। আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি, তুমি অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। তিনি বললেন, হে আমার প্রতিপালক! যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে যাতে আপনাকে অনুরোধ না করি- এ জন্য আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন এবং আমাকে দয়া না করেন, তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।
বলা হল, হে নূহ। আমার দেওয়া শান্তিসহ অবতরণ কর। এবং তোমার প্রতি ও যে সকল সম্প্রদায় তোমার সঙ্গে আছে তাদের প্রতি কল্যাণসহ। অপর সম্প্রদায়সমূহকে জীবন উপভোগ করতে দেব, পরে আমার পক্ষ হতে কঠিন শাস্তি তাদের স্পর্শ করবে। এ সকল অদৃশ্যলোকের সংবাদ আমি আপনাকে অহির দ্বারা জানিয়েছি। যা এর আগে আপনি জানতেন না এবং আপনার সম্প্রদায়ও জানত না। সুতরাং ধৈর্য ধারণ করুন, শুভ পরিণাম মুত্তাকিদের জন্য।" (সূরা হুদ: ২৫-৪৯)
সূরা মুমিনুনে আল্লাহ তাআলা বলেন- "আমি নূহকে পাঠিয়েছিলাম তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে। তিনি বলেছিলেন, হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ নেই। তবুও কি তোমরা সাবধান হবে না? তাঁর সম্প্রদায়ের প্রধানরা, যারা কুফরি করেছিল তারা বলল- এ তো তোমাদের মতো একজন মানুষই। সে তোমাদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে চাচ্ছে। আল্লাহ ইচ্ছা করলে ফেরেশতা পাঠাতেন। আমরা তো আমাদের পূর্বপুরুষদের সময়ে এরূপ ঘটেছে বলে শুনি নি। এ তো এমন এক লোক, যাকে পাগলামী পেয়ে বসেছে। সুতরাং এর সম্পর্কে কিছুকাল অপেক্ষা কর। নূহ আ. বলেছিলেন, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য করুন! কারণ, তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলছে। এরপর আমি তাঁর কাছে ওহি পাঠালাম, তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার অহি অনুযায়ী নৌযান নির্মাণ কর। এবং যখন আমার আদেশ আসবে ও উনুন (চুলা) উথলে উঠবে, তখন তাতে (নৌযানে) উঠিয়ে নিও প্রত্যেক জীবের এক এক জোড়া এবং তোমার পরিবার-পরিজনকে। তার মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে আগে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাদের সম্পর্কে তুমি আমাকে কিছু বল না। তারা তো নিমজ্জিত হবে। যখন তুমি ও তোমার সাথীরা নৌযানে আসন গ্রহণ করবে তখন বলবে- সকল প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি আমাদের উদ্ধার করেছেন যালেম সম্প্রদায় থেকে। আরো বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এমনভাবে অবতরণ করান যা হবে কল্যাণকর। আর আপনিই শ্রেষ্ঠ অবতরণকারী। এতে অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে। আমি তো তাদের পরীক্ষা করেছিলাম।" (সূরা মুমিনুন: ২৩-৩০)
সূরা শুআরায় আল্লাহ তাআলা বলেন- কাজ্জাবাত কওমু নূহিনিল মুরসালীনা (১০৫) ইজ কলা লাহুম আখূহুম নূহুন আলা তাত্তাকুন (১০৬) ইন্নী লাকুম রসূলুন আমীন (১০৭) ফাত্তাকুল্লাহা ওয়া আতীউন (১০৮) ওয়া মা আসআলুকুম আলাইহি মিন আজরিন ইন আজরিয়া ইল্লা আলা রব্বিল আলামীন (১০৯) ফাত্তাকুল্লাহা ওয়া আতীউন (১১০) কলু আনুমিনু লাকা ওয়াত্তাবাআকাল আরজালুন (১১১) কলা ওয়া মা ইলমী বিমা কানূ ইয়ামালুন (১১২) ইন হিসাবাহুম ইল্লা আলা রব্বী লাও তাশরুন (১১৩) ওয়া মা আনা বিতরিদিল মুমিনীন (১১৪) ইন আনা ইল্লা নাযীরুম মুবীন (১১৫) কলু লাইল লাম তানতাহি ইয়া নূহু লাতাকূনান্না মিনাল মারজূমীন (১১৬) কলা রব্বি ইন্না কওমী কাজ্জাবুন (১১৭) ফাফতাহ বাইনী ওয়া বাইনাহুম ফাতহাও ওয়া নাজ্জিনী ওয়া মাম মাঈয়া মিনাল মুমিনীন (১১৮) ফাআনজায়নাহু ওয়া মাম মাআহু ফিল ফুলকিল মাশহূন (১১৯) ছুম্মা আগ্রহনাল বাদিল বাকীন (১২০) ইন্না ফী যাালিকা লাআয়াতাও ওয়া মা কানা আকছারুহুম মুমিনীন (১২১) ওয়া ইন্না রব্বাকা লাহুয়াল আযীযুর রহীম (১২২)
"নূহের সম্প্রদায় রাসূলগণের প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছিল। যখন তাদের ভাই নূহ তাদের বললেন, তোমরা কি সাবধান হবে না? আমি তো তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রাসূল। অতএব আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। আমি তোমাদের কাছে এর জন্য কোনো প্রতিদান চাই না। আমার পুরস্কার তো জগতসমূহের প্রতিপালকের কাছেই আছে। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। তারা বলল, আমরা কি তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব, অথচ ইতরজনেরা তোমার অনুসরণ করছে? নূহ বললেন: তারা কি করত, তা আমার জানা নেই। তাদের হিসাব গ্রহণ তো আমার প্রতিপালকের কাজ; যদি তোমরা বুঝতে! মুমিনগণকে তাড়িয়ে দেওয়া আমার কাজ নয়। আমি তো কেবল একজন স্পষ্ট সতর্ককারী। তারা বলল, হে নূহ! তুমি যদি নিবৃত্ত না হও তবে তুমি অবশ্যই প্রস্তরাঘাতে নিহতদের শামিল হবে। নূহ বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায়তো আমাকে অস্বীকার করছে। সুতরাং আমার ও তাদের মধ্যে স্পষ্ট মীমাংসা করে দাও এবং আমাকে ও আমার সঙ্গে যে সব মুমিন আছে, তাদেরকে রক্ষা কর। অতএব আমি তাঁকে ও তাঁর সঙ্গে যারা ছিল, তাদের রক্ষা করলাম বোঝাইকৃত নৌযানে। আর বাকিদের ডুবিয়ে দিলাম। এতে অবশ্যই রয়েছে নিদর্শন। কিন্তু তাদের অধিকাংশই বিশ্বাসী নয়; আর আপনার প্রতিপালক; তিনি তো পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।" (সূরা শুআরা : ১০৫-১২২)
সূরা কামারে আল্লাহ তাআলা বলেন- কাজ্জাবাত কবলাহুম কওমু নূহিন ফাকাজ্জাবূ আবদানা ওয়া কলূ মাজনূনূ ওয়াজদুজির (৯) ফাদআ রব্বাহূ আন্নী মাগলূবুন ফানতাসির (১০) ফাফাতাহনা আবওয়াবাস সামাি বিমািম মুনহামির (১১) ওয়া ফাজ্জারনাল আরদ উয়ুনান ফালতাক্বল মাউ আলা আমরিন ক্বদ কুদির (১২) ওয়া হামালনাহু আলা যাাতি আলওয়াহিও ওয়া দুসুর (১৩) তাজরী বিআইয়ুনিনা জাযাআল লিমান কানা কুফির (১৪) ওয়া লাকদ তারাকনাহা আয়াতান ফাহাল মিম মুদ্দাকির (১৫) ফাকাইফা কানা আজাবী ওয়া নুযুর (১৬) ওয়া লাকদ ইয়াসসারনাল কুরআনা লিজজিকরি ফাহাল মিম মুদ্দাকির (১৭) কাজ্জাবাত আদুন ফাকাইফা কানা আজাবী ওয়া নুযুর
"এদের আগে নূহের সম্প্রদায়ও মিথ্যা আরোপ করেছিল। মিথ্যা আরোপ করেছিল আমার বান্দার প্রতি এবং বলেছিল, 'এ তো এক পাগল! আর তাকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছিল, তখন সে তাঁর প্রতিপালককে আহ্বান করে বলেছিল- 'আমি তো অসহায়। অতএব তুমি প্রতিবিধান কর!' ফলে আমি উন্মুক্ত করে দিলাম আকাশের দ্বার, প্রবল বারিবর্ষণে এবং মাটি থেকে উৎসারিত করলাম ঝরনা। সকল পানি মিলিত হলো এক পরিকল্পনা অনুসারে। তখন নূহকে আরোহণ করালাম কাঠ ও পেরেক নির্মিত এক নৌযানে, যা চলত আমার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। এটা পুরস্কার তার জন্য যে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। আমি একে রেখে দিয়েছি এক নিদর্শনরূপে। অতএব উপদেশ গ্রহণকারীরা কেউ আছে কি? কী কঠোর ছিল আমার শান্তি ও সতর্কবাণী! কোরআন আমি সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য, কে আছে উপদেশ গ্রহণকারী? (সূরা কামার: ৯-১৭)
সূরা নূহে হযরত নূহ আ.-এর আলোচনা বিস্তারিত এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- "নূহকে আমি প্রেরণ করেছিলাম তাঁর সম্প্রদায়ের প্রতি এ নির্দেশসহ- তুমি তোমার সম্প্রদায়কে সতর্ক কর তাদের প্রতি শাস্তি আসার আগে। সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্য স্পষ্ট সতর্ককারী এ বিষয়ে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাঁকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। তিনি তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন এবং তিনি তোমাদের অবকাশ দেবেন এক নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত। নিশ্চয় আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত কাল উপস্থিত হলে, তা বিলম্বিত হয় না; যদি তোমরা তা জানতে! তিনি বলেছিলেন; হে আমার প্রতিপালক! আমি তো আমার সম্প্রদায়কে দিবা-রাত্রি আহ্বান করেছি। কিন্তু আমার আহ্বানে তাদের পলায়ন প্রবণতাই বৃদ্ধি করেছে। আমি যখনই তাদেরকে আহ্বান করি, যাতে তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর, তারা কাণে আঙ্গুলি দেয়, বস্ত্রাবৃত করে নিজেদেরকে ও জিদ করতে থাকে এবং অতিশয় ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে।
এরপর আমি তাদেরকে আহ্বান করেছি প্রকাশ্যে, পরে আমি উচ্চস্বরে প্রচার করে ও উপদেশ দিয়েছি গোপনে। বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা কর, তিনিই তো মহা ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন। তিনি তোমাদের সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতিতে এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা। তোমাদের কি হয়েছে, তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতে চাচ্ছ না? অথচ তিনিই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন পর্যায়ক্রমে, তোমরা লক্ষ কর নি? আল্লাহ কিভাবে সৃষ্টি করেছেন সপ্ত স্তরে বিন্যস্ত আকাশমণ্ডলী? এবং সেখানে চাঁদকে স্থাপন করেছেন আলোকরূপে ও সূর্যকে স্থাপন করেছেন প্রদীপরূপে। তিনি তোমাদেরকে উদ্ভুত করেছেন মাটি থেকে। এরপর তাতে তিনি তোমাদেরকে প্রত্যাবৃত্ত করবেন ও পরে পুনরুত্থিত করবেন এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য ভূমিকে করেছেন বিস্তৃত, যাতে তোমরা চলাফেরা করতে পার প্রশস্ত পথে। নূহ বলেছিলেন, হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় তো আমাকে অমান্য করেছে এবং অনুসরণ করেছে এমন লোকের, যার ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি তার ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করে নি।
তারা ভয়ানক ষড়যন্ত্র করেছিল এবং বলেছিল, তোমরা কখনো পরিত্যাগ করো না তোমাদের দেব-দেবীকে; পরিত্যাগ করো না ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুছ, ইয়াউক ও নাসরকে। তারা অনেককে বিভ্রান্ত করেছে। সুতরাং জালিমদের বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করে না। তাদের অপরাধের জন্য তাদের নিমজ্জিত করা হয়েছিল এবং পরে তাদের দাখিল করা হয়েছিল অগ্নিতে। এরপর তারা কাউকেই আল্লাহর মুকাবিলায় পায় নি সাহায্যকারীরূপে।
নূহ আরও বলেছিলেন, হে আমার প্রতিপালক! পৃথিবীতে কাফিরদের মধ্য হতে কোনো গৃহবাসীকে অব্যাহতি দিও না। তুমি তাদের অব্যাহতি দিলে, তারা তোমার বান্দাদের বিভ্রান্ত করবে এবং জন্ম দিতে থাকবে কেবল দুষ্কৃতিকারী ও কাফির। হে আমার প্রতিপালক! তুমি ক্ষমা কর আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং যারা মুমিন হয়ে আমার গৃহে প্রবেশ করে তাদেরকে এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের। আর জালিমদের শুধু ধ্বংসই বৃদ্ধি কর। (সূরা নূহ : ১-২৮)
কোরআন মাজিদের আরো কিছু সূরায় আল্লাহ তাআলা হযরত নূহ আ.-এর সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন। যেমন সূরা ইউসুফ: ৭১-৭৩, সূরা আম্বিয়া: ৭৬-৭৭, সূরা আনকাবুত : ১৪-১৫, সূরা সাফফাত: ৭৫-৮২ নং আয়াতসমূহ। তদ্রুপ কোরআন মাজিদের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ তাআলা হযরত নূহ আ.-এর প্রশংসা এবং তাঁর বিরুদ্ধাচরণকারীদের নিন্দা করা হয়েছে। যেমন: সূরা নিসায় আল্লাহ তাআলা বলেন-
আওহায়না ইলাইকা কামা আওহায়না ইলা নূহিন ওয়ান নাবিয়্যিনা মিম বাদিহী ওয়া আওহায়না ইলা ইবরাহীমা ওয়া ইসমাইল ওয়া ইসহাক্বা ওয়া ইয়াকুবা ওয়াল আসবাত্বি ওয়া ঈসা ওয়া আইয়ূবা ওয়া ইউনুসা ওয়া হারূনা ওয়া সুলায়মানা ওয়া আতায়না দাউদা যাবূরা (১৬৩) ওয়া রসুলান কদ কসসনাহুম আলাইকা মিন ক্বলু ওয়া রসূলান লাম নাক্বসুসহুম আলাইকা ওয়া কাল্লামাল্লাহু মূসা তকলীমা (১৬৪) রুসুলান মুবাশশিরীনা ওয়া মুনজিরীনা লি আল্লা ইয়াকূনা লিন নাসি আলাল্লাহি হুজ্জাতুম বাদাল রুসুলি ওয়া কানাল্লাহু আযীযান হাকীমা
"হে নবী! আপনার কাছে অহি প্রেরণ করেছি, যেমন নূহ ও তাঁর পরবর্তী নবীগণের কাছে প্রেরণ করেছিলাম। ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাঁর বংশধরগণ, ঈসা, আইয়ূব, ইউনুস, হারুন এবং সুলাইমানের কাছে অহি প্রেরণ করেছিলাম। অনেক রাসূল প্রেরণ করেছি, যাদের কথা পূর্বে আপনাকে বলেছি এবং অনেক রাসূল, যাদের কথা আপনাকে বলি নি। এবং মূসার সাথে আল্লাহ সাক্ষাৎ-বাক্যালাপ করেছিলেন। সুসংবাদবাহী ও সাবধানকারীরূপে রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি। যাতে রাসূল আসার পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো অভিযোগ না থাকে এবং আল্লাহ প্ররাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।" (সূরা নিসা: ১৬৩-১৬৪)
সূরা আনআমে আল্লাহ তাআলা বলেন-
ওয়া তিলকা হুজ্জাতুনা আতায়নাহা ইবরাহীমা আলা কওমিহী নারফাউ দারাজাতিম মান নাশাউ ইন্না রব্বাকা হাকীমুন আলীম (৮৩) ওয়া ওয়াহাবনা লাহূ ইসহাক্বা ওয়া ইয়াকুবা কুল্লা হাদানিনা ওয়া নূহান হাদানিনা মিন ক্বলু ওয়া মিন যুররিয়্যাতিহী দাউদা ওয়া সুলায়মানা ওয়া আইয়ূবা ওয়া ইউসুফা ওয়া মূসা ওয়া হারূনা ওয়া কাজালিকা নাযযিল মুহসিনীন (৮৪) ওয়া যাকারিয়া ওয়া ইয়াহইয়া ওয়া ঈসা ওয়া ইলইয়াসা কুল্লুম মিনাস সালিহীন (৮৫) ওয়া ইসমাইল ওয়াল ইয়াসাআ ওয়া ইউনুসা ওয়া লুত্বা ওয়া কুল্লা ফাদদলনা আলাল আলামীন (৮৬) ওয়া মিন আবাইহিম ওয়া যুররিয়্যাতিহিম ওয়া ইখওয়ানিম ওয়াজতাবায়নাহুম ওয়া হাদানাহুম ইলা সিরাতিল মুস্তাক্বীম
"এটা আমার যুক্তি প্রমাণ, যা ইবরাহীমকে দিয়েছিলাম তার সম্প্রদায়ের মোকাবিলায়। যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় আমি উন্নীত করি। আপনার প্রতিপালক প্রজ্ঞাময়, জ্ঞানী। এবং তাকে দান করেছিলাম ইসহাক ও ইয়াকুব এবং তাদের প্রত্যেককে সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম। পূর্বে নূহকেও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম এবং তাঁর বংশধর দাউদ, সুলাইমান, আইয়ূব, ইউসুফ, মূসা এবং হারুনকেও। আর এভাবেই সৎকর্ম পরায়ণদের পুরস্কৃত করি। এবং যাকারিয়া, ঈসা এবং ইলিয়াসকেও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম। তারা সকলে পুণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত। আরও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম ইসমাইল, আল ইয়াসাআ, ইউনুস ও লুতকে এবং শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছিলাম বিশ্বজগতের উপর প্রত্যেককে এবং তাদের কিছুসংখ্যক পিতৃপুরুষ, বংশধর এবং ভ্রাতৃবৃন্দকে। তাদেরকে মনোনীত করেছিলাম এবং সরল পথে পরিচালিত করেছিলাম।" (সূরা আনআম: ৮৩-৮৭)
সূরা তওবায় আল্লাহ তাআলা বলেন- আলাম ইয়াতিহিম নাবাউল্লাজিনা মিন ক্ববলাহিম কওমি নূহিন ওয়া আদিল ওয়া ছামূদা ওয়া কওমি ইবরাহীমা ওয়া আসহািব মাদইয়ানা ওয়াল মুতফিকাত আতাতহুম রুসুলুহুম বিল বাইয়্যিনাত ফামা কানাল্লাহু লি ইয়াজলি মাহুম ওয়া লাকিন কানূ আনফুসাহুম ইয়াজলিমূন
"তাদের পূর্ববর্তী নূহ, আদ ও ছামুদের সম্প্রদায়, ইবরাহীমের সম্প্রদায় এক মাদায়েন ও বিধ্বস্ত নগরের অধিবাসীদের সংবাদ কি তাদের কাছে আসে নি? তাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শনসহ তাদের রাসূলগণ এসেছিলেন। আল্লাহ এমন নন, তাদের উপর জুলুম করেন। কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করে।" (সূরা তাওবা: ৭০)
সূরা ইবরাহীমে আল্লাহ তাআলা বলেন- আলাম ইয়ািতকুম নাবাউল্লাজিনা মিন ক্বলিকুম কওমি নূহিন ওয়া আদিল ওয়া ছামূদা
"তোমাদের কাছে কি সংবাদ আসে নি তোমাদের পূর্ববর্তীদের; (অর্থাৎ) নূহের সম্প্রদায়ের, আদ ও ছামুদের?"
সূরা বনি ইসরাইলে আল্লাহ তাআলা বলেন- যুররিয়্যাতা মান হামালনা মাআ নূহিন ইন্নাহূ কানা আবদান শাকূরা
"হে তাদের বংশধর। যাদের আমি নূহের সাথে আরোহণ করিয়েছিলাম; সে তো ছিল পরম কৃতজ্ঞ বান্দা।” (সূরা বনী ইসরাঈল: ৩) ওয়া কাম আহলাকনা মিনাল কুরূনি মিম বাদি নূহিন ওয়া কাফা বিরব্বিকা বিযুনূবি ইবাদিহী খবীরাম বাসীরা
"নূহের পর আমি কত মানবগোষ্ঠী ধ্বংস করেছি! তোমার প্রতিপালকই তাঁর বান্দাদের পাপাচারের সংবাদ রাখা ও পর্যবেক্ষণের জন্য যথেষ্ট।" (সূরা বনি ইসরাইল: ১৭)
সূরা আম্বিয়া, সূরা মুমিনূন, সূরা শুরা ও সূরা আনকাবূতে তাঁর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। সূরা আহযাবে আল্লাহ তাআলা বলেন- ওয়া ইজ আখাজনা মিনান নাবিয়্যিনা মীছাক্বহুম ওয়া মিনকা ওয়া মিন নূহিও ওয়া ইবরাহীমা ওয়া মূসা ওয়া ঈসাবনি মারইয়ামা ওয়া আখাজনা মিনহুম মীছাক্বান গালীযা
“হে নবী! স্মরণ করুন, যখন আমি নবীদের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম এবং আপনার কাছ থেকেও এবং নূহ, ইবরাহীম, মূসা, মরিয়ম-তনয় ঈসার কাছ থেকে। তাদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছিলাম দৃঢ় অঙ্গীকার।" (সূরা আহযাব: ৭)
সূরা সোয়াদে আল্লাহ তাআলা বলেন- কাজ্জাবাত ক্ববলাহুম কওমু নূহিও ওয়া আদু ওয়া ফিরআউনু জুল আওতাদ (১২) ওয়া ছামূদু ওয়া কওমু লুতও ওয়া আসহািবুল আইকা উলাইকাল আহযাব (১৩) ইন কুল্লুন ইল্লা কাজ্জাবার রুসুলা ফাহাক্কা ইক্বাব
"এদের পূর্বেও রাসূলদের মিথ্যাবাদী বলেছিল নূহের সম্প্রদায়, আদ ও বহুঅট্টালিকার অধিপতি ফেরাউন। ছামূদ, লুত সম্প্রদায় ও আয়কার অধিবাসী। তারা ছিল এক একটি বিশাল বাহিনী। তাদের প্রত্যেকেই রাসূলগণকে মিথ্যা বলেছে। ফলে তাদের ক্ষেত্রে আমার শাস্তি হয়েছে বাস্তব। (সূরা সোয়াদ: ১২-১৪)
সূরা মুমিনে আল্লাহ তাআলা বলেন- কাজ্জাবাত ক্ববলাহুম কওমু নূহিও ওয়াল আহযাবু মিম বাদিহিম ওয়া হাম্মাত কুল্লু উম্মাতিম বি রসূলিহিম লি ইয়াখুযূহু ওয়া জাদালূ বিল বাত্বিলি লি ইউদহিদু বিহিল হাক্ক ফা আখাজতুহুম ফাকাইফা কানা ইক্বাব (৫) ওয়া কাজালিকা হাক্কত কলিমাতু রব্বিকা আলাল্লাজিনা কাফারূ আন্নাহুম আসহািবুন নার
"এদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায় এবং তাদের পরে অন্যান্য দলও মিথ্যা আরোপ করেছিল। প্রত্যেক সম্প্রদায় নিজ নিজ রাসূলকে আবদ্ধ করার অভিসন্ধি করেছিল এবং তারা অসার তর্কে লিপ্ত হয়েছিল সত্যকে ব্যর্থ করে দেওয়ার জন্য। ফলে আমি তাদের পাকড়াও করলাম এবং কত কঠোর ছিল আমার শাস্তি! এভাবে কাফেরদের ক্ষেত্রে সত্য হলো আপনার প্রতিপালকের বাণী এরা জাহান্নামী।” (সূরা মুমিন: ৫-৬)
সূরা শুরায় আল্লাহ তাআলা বলেন- শরাআ লাকুম মিনাদ দীনি মা ওয়াসসা বিহী নূহান ওয়াল্লাজি আওহায়না ইলাইকা ওয়া মা ওয়াসসায়না বিহী ইবরাহীমা ওয়া মূসা ওয়া ঈসা আন আক্বীমুদ দীনা ওয়া লা তাত্বাফাররাকু ফীহি কবুরা আলাল মুশরিকীনা মা তাদউহুম ইলাইহি আল্লাহু ইয়াজতাবী ইলাইহি মাই ইয়াশাউ ওয়া ইয়াহদী ইলাইহি মাই ইউনীব
"তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন দীন, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি নূহকে আর যা আমি অহি করেছি আপনাকে এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে এই বলে, তোমরা দীনকে প্রতিষ্ঠা কর এবং তাতে মতভেদ করো না। আপনি মুশরিকদের যার প্রতি আহ্বান করছেন, তা তাদের কাছে দুর্বল মনে হয়। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা দীনের প্রতি আকৃষ্ট করেন এবং যে তাঁর অভিমুখী তাকে দীনের দিকে পরিচালিত করেন।" (সূরা শুরা: ১৩)
সূরা ক্বাফে আল্লাহ তাআলা বলেন- ওয়া আদু ওয়া ফিরআউনু ওয়া ইখওয়ানু লুত (১৩) ওয়া আসহািবুল আইকাতি ওয়া কওমু তুব্বা কুল্লুন কাজ্জাবার রুসুলা ফাহাক্কা ওয়াঈদ
"তাদের পূর্বেও সত্য প্রত্যাখান করেছিল নূহের সম্প্রদায়, রাস ও ছামূদ সম্প্রদায় আদ, ফেরাউন ও লূত সম্প্রদায় এবং আইকার অধিবাসী ও তুব্বা সম্প্রদায়। তাঁরা সকলেই রাসূলকে মিথ্যাবাদী বলেছিল। ফলে তাদের ওপর আমার শাস্তি আপতিত হয়েছে।" (সূরা ক্বাফ: ১২-১৪)
সূরা যারিয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন- ওয়া কওমা নূহিম মিন ক্ববলু ইন্নাহুম কানূ কওমান ফাসিক্বীন “আমি ধ্বংস করেছিলাম এদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায়কে। তারা ছিল সত্য ত্যাগ সম্প্রদায়।" (সূরা যারিয়াত: ৪৬)
সূরা নাজমে আল্লাহ তাআলা বলেন- ওয়া কওমা নূহিম মিন ক্ববলু ইন্নাহুম কানূ হুম আজলামা ওয়া আত্বগ্বা "আর এদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায়কেও (ধ্বংস করেছিলাম)। তারা ছিল অতিশয় জালিম অবাধ্য।" (সূরা নাজ্য: ৫২)
সূরা হাদিদে আল্লাহ তাআলা বলেন- ওয়া লাকদ আরসালনা নূহান ওয়া ইবরাহীমা ওয়া জাআলনা ফী যুররিয়্যাতিহিন নুবুওয়াতা ওয়াল কিতাব ফামিনহুম মুহতাদিও ওয়া কাছীরুম মিনহুম ফাসিক্বূন "আমি নূহ এবং ইবরাহীমকে রাসূলরূপে প্রেরণ করেছিলাম এবং আমি তাদের বংশধরগণের জন্য স্থির করেছিলাম নবুয়ত ও কিতাব; কিন্তু তাদের অল্পই সৎপথ অবলম্বন করেছিল এবং অধিকাংশ ছিল সত্যত্যাগী।" (সূরা হাদীদ: ২৬)
দ্বরবাল্লাহু মাছালাল লিল্লাজিনা কাফারুমরাআতা নূহিও ওমরাআতা লূত কানাতা তাহতা আবদাইনি মিন ইবাদিনা সালিহায়নি ফাখানাতাহুমা ফালাম ইয়ুগনিয়া আনহুমা মিনাল্লাহি শাইয়াও ওয়া ক্বিলাদখুলান নারা মাআদ দাখিলীন “আল্লাহ কাফেরদের জন্য নূহ ও লূতের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। তারা ছিল আমার বান্দাদের মধ্যে দুই সৎকর্মপরায়ণ বান্দার অধীন। কিন্তু তারা তাদের প্রতি বিশ্বাস ঘাতকতা করেছিল। ফলে নূহ ও লূত তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারে নি এবং তাদের বলা হলো, জাহান্নামে প্রবেশকারীদের সাথে তোমরাও তাতে প্রবেশ কর।" (সূরা তাহরীম: ১০)
📄 হাদিস শরিফে হযরত নূহ আ.
সহি বোখারি ও মুসলিম শরিফে আছে, উম্মে সালমা ও উম্মে হাবিবা রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে তাদের হাবশায় দেখে আসা 'মারিয়া' নামক গির্জা এবং তার সৌন্দর্য ও তাতে স্থাপন করে রাখা প্রতিকৃতির কথা উল্লেখ করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তাদের নিয়ম ছিল তাদের মধ্যে সৎকর্মপরায়ণ কেউ মারা গেলে তার কবরের উপর তারা একটি উপাসনালয় নির্মাণ করত। তারপর তাতে তার প্রতিকৃতি স্থাপন করে রাখত। আল্লাহর কাছে তারা ছিল সৃষ্টির সবচেয়ে নিকৃষ্ট জাতি।
অবক্ষয় যখন পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে এবং শিরক ও প্রতিমা পূজার ব্যাপক প্রসার ঘটে, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দা ও রাসূল নূহ আ.-কে প্রেরণ করেন। তিনি এক 'লা-শরীক আল্লাহর প্রতি আহ্বান জানান এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর উপাসনা করতে নিষেধ করেন।
ইমাম বোখারি রহ. বর্ণনা করেন। হযরত আবু সাঈদ খুদারী রাযি. বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (কেয়ামতের দিন) নূহ আ. ও তাঁর উম্মত উপস্থিত হবেন। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি কি দীনের পয়গাম পৌঁছিয়েছিলে? নূহ আ. বলবেন: জী হাঁ, হে আমার রব! তারপর আল্লাহ তাআলা তাঁর উম্মতকে জিজ্ঞাসা করবেন, নূহ কি তোমাদের কাছে দীনের দাওয়াত পৌঁছিয়েছিল? তারা বলবে, না। আমাদের কাছে কোনো নবী আসেন নি। তখন আল্লাহ তাআলা নূহ আ. কে বলবেন, তোমার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে কে? তিনি বলবেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর উম্মত। তখন উম্মতে মুহাম্মদী সাক্ষ্য দিয়ে বলবে, 'নূহ আ. তাঁর তাবলীগের দায়িত্ব পালন করেছেন।
ইমাম বোখারি রহ. আরো বর্ণনা করেন, ইবনে উমর রাযি. বলেছেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন জনসাধারণের মধ্যে দাঁড়িয়ে আল্লাহ তাআলার শানে উপযুক্ত প্রশংসা বর্ণনা করেন। তারপর দাজ্জালের কথা উল্লেখ করে বললেন, "তোমাদেরকে আমি তার ব্যাপারে সাবধান করছি। এমন কোনো নবী নেই, যিনি আপন সম্প্রদায়কে তার ব্যাপারে সাবধান করেন নি। নূহ আ.ও আপন সম্প্রদায়কে তার ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছিলেন। তবে তার ব্যাপারে তোমাদেরকে আমি এমন একটি কথা বলে দিই, যা কোনো নবী তাঁর সম্প্রদায়কে বলেন নি। তোমরা জেনে রেখ, সে এক-চক্ষু বিশিষ্ট। কিন্তু আল্লাহ তাআলা এক চক্ষুবিশিষ্ট নন।"
ইমাম আবু হাতেম হযরত আসলাম রহ.-এর সূত্রে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: নূহ আ. নৌযানে প্রতি জীবের এক জোড়া তুলে নিলে তাঁর সঙ্গীরা বলল, সিংহের সাথে আমরা কিংবা বলল, গৃহপালিত প্রাণীরা কীভাবে নিরাপদ বোধ করবে? তখন আল্লাহ তাআলা সিংহকে জ্বরাক্রান্ত করে দেন। পৃথিবীতে এটাই ছিল সর্বপ্রথম জ্বরের আবির্ভাব। তারপর তাঁরা ইঁদুরের ব্যাপারে অনুযোগ করে বললেন, "পাজিগুলো তো আমাদের খাদ্যদ্রব্য ও জিনিসপত্র সব নষ্ট করে ফেলল! তখন আল্লাহ তাআলার নির্দেশে সিংহ হাঁচি দেয়। এতে বিড়াল বের হয়ে আসে। বিড়াল দেখে ইঁদুররা সব আত্মগোপন করে।"
ইমাম আবু জাফর ইবনে জারীর ও আবু মুহাম্মদ ইবনে আবু হাতিম আপন তাফসিরে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাযি.-এর বরাতে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "নূহের সম্প্রদায়ের কারো প্রতি যদি আল্লাহ দয়া করতেন, তা হলে অবশ্যই শিশুর মায়ের প্রতি দয়া করতেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “নূহ আ. তাঁর সম্প্রদায়ের মধ্যে পঞ্চাশ কম এক হাজার [সাড়ে নয় শ] বছর অবস্থান করেন এবং বৃক্ষরোপণ করে একশ বছর অপেক্ষা করেন। বৃক্ষটি বড় হয়ে পোক্ত হলে তা কেটে নৌকা নির্মাণ করেন। নৌকা নির্মাণকালে সম্প্রদায়ের লোকেরা যখন তাঁর কাছ দিয়ে অতিক্রম করত, তখন তাঁকে ঠাট্টা করে বলত, তুমি ডাঙ্গায় নৌকা নির্মাণ করছ! এটা চলবে কীভাবে? নূহ আ. বলতেন, অচিরেই তোমরা জানতে পারবে।
সহি বোখারি ও মুসলিম শরিফে আছে, উম্মে সালমা ও উম্মে হাবিবা রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে তাদের হাবশায় দেখে আসা 'মারিয়া' নামক গির্জা এবং তার সৌন্দর্য ও তাতে স্থাপন করে রাখা প্রতিকৃতির কথা উল্লেখ করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তাদের নিয়ম ছিল তাদের মধ্যে সৎকর্মপরায়ণ কেউ মারা গেলে তার কবরের উপর তারা একটি উপাসনালয় নির্মাণ করত। তারপর তাতে তার প্রতিকৃতি স্থাপন করে রাখত। আল্লাহর কাছে তারা ছিল সৃষ্টির সবচেয়ে নিকৃষ্ট জাতি।
অবক্ষয় যখন পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে এবং শিরক ও প্রতিমা পূজার ব্যাপক প্রসার ঘটে, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দা ও রাসূল নূহ আ.-কে প্রেরণ করেন। তিনি এক 'লা-শরীক আল্লাহর প্রতি আহ্বান জানান এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর উপাসনা করতে নিষেধ করেন।
ইমাম বোখারি রহ. বর্ণনা করেন। হযরত আবু সাঈদ খুদারী রাযি. বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (কেয়ামতের দিন) নূহ আ. ও তাঁর উম্মত উপস্থিত হবেন। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি কি দীনের পয়গাম পৌঁছিয়েছিলে? নূহ আ. বলবেন: জী হাঁ, হে আমার রব! তারপর আল্লাহ তাআলা তাঁর উম্মতকে জিজ্ঞাসা করবেন, নূহ কি তোমাদের কাছে দীনের দাওয়াত পৌঁছিয়েছিল? তারা বলবে, না। আমাদের কাছে কোনো নবী আসেন নি। তখন আল্লাহ তাআলা নূহ আ. কে বলবেন, তোমার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে কে? তিনি বলবেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর উম্মত। তখন উম্মতে মুহাম্মদী সাক্ষ্য দিয়ে বলবে, 'নূহ আ. তাঁর তাবলীগের দায়িত্ব পালন করেছেন।
ইমাম বোখারি রহ. আরো বর্ণনা করেন, ইবনে উমর রাযি. বলেছেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন জনসাধারণের মধ্যে দাঁড়িয়ে আল্লাহ তাআলার শানে উপযুক্ত প্রশংসা বর্ণনা করেন। তারপর দাজ্জালের কথা উল্লেখ করে বললেন, "তোমাদেরকে আমি তার ব্যাপারে সাবধান করছি। এমন কোনো নবী নেই, যিনি আপন সম্প্রদায়কে তার ব্যাপারে সাবধান করেন নি। নূহ আ.ও আপন সম্প্রদায়কে তার ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছিলেন। তবে তার ব্যাপারে তোমাদেরকে আমি এমন একটি কথা বলে দিই, যা কোনো নবী তাঁর সম্প্রদায়কে বলেন নি। তোমরা জেনে রেখ, সে এক-চক্ষু বিশিষ্ট। কিন্তু আল্লাহ তাআলা এক চক্ষুবিশিষ্ট নন।"
ইমাম আবু হাতেম হযরত আসলাম রহ.-এর সূত্রে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: নূহ আ. নৌযানে প্রতি জীবের এক জোড়া তুলে নিলে তাঁর সঙ্গীরা বলল, সিংহের সাথে আমরা কিংবা বলল, গৃহপালিত প্রাণীরা কীভাবে নিরাপদ বোধ করবে? তখন আল্লাহ তাআলা সিংহকে জ্বরাক্রান্ত করে দেন। পৃথিবীতে এটাই ছিল সর্বপ্রথম জ্বরের আবির্ভাব। তারপর তাঁরা ইঁদুরের ব্যাপারে অনুযোগ করে বললেন, "পাজিগুলো তো আমাদের খাদ্যদ্রব্য ও জিনিসপত্র সব নষ্ট করে ফেলল! তখন আল্লাহ তাআলার নির্দেশে সিংহ হাঁচি দেয়। এতে বিড়াল বের হয়ে আসে। বিড়াল দেখে ইঁদুররা সব আত্মগোপন করে।"
ইমাম আবু জাফর ইবনে জারীর ও আবু মুহাম্মদ ইবনে আবু হাতিম আপন তাফসিরে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাযি.-এর বরাতে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "নূহের সম্প্রদায়ের কারো প্রতি যদি আল্লাহ দয়া করতেন, তা হলে অবশ্যই শিশুর মায়ের প্রতি দয়া করতেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “নূহ আ. তাঁর সম্প্রদায়ের মধ্যে পঞ্চাশ কম এক হাজার [সাড়ে নয় শ] বছর অবস্থান করেন এবং বৃক্ষরোপণ করে একশ বছর অপেক্ষা করেন। বৃক্ষটি বড় হয়ে পোক্ত হলে তা কেটে নৌকা নির্মাণ করেন। নৌকা নির্মাণকালে সম্প্রদায়ের লোকেরা যখন তাঁর কাছ দিয়ে অতিক্রম করত, তখন তাঁকে ঠাট্টা করে বলত, তুমি ডাঙ্গায় নৌকা নির্মাণ করছ! এটা চলবে কীভাবে? নূহ আ. বলতেন, অচিরেই তোমরা জানতে পারবে।
📄 প্রথম রাসূল হযরত নূহ আ.
হযরত আদম আ.-এর পর হযরত নূহ আ.-কে আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে সর্বপ্রথম রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেন। বোখারি ও মুসলিম শরিফের হাদিস দ্বারা তা সুস্পষ্ট প্রমাণিত। মুসলিম শরিফের শাফায়াতের অধ্যায়ে হযরত আবু হোরায়রা রাযি. থেকে একটি দীর্ঘ রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে- ইয়া নূহু আনতা আওওয়ালুর রুসুলি ইলাল আরদ "হে নূহ! তোমাকে পৃথিবীতে সর্বপ্রথম রাসূল বানানো হয়েছে।"
আল্লাহ তাআলা হযরত নূহ আ.-কে পৃথিবীতে রাসূল হিসেবে প্রেরণের পর, তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে আল্লাহ তাআলার ইবাদত ও তাওহিদের দাওয়াত দেন। অনুরূপভাবে অন্যান্য পয়গম্বরগণও তাওহিদ ও অন্যান্য বিষয়ের দাওয়াত দিয়েছেন। তাঁরা সকলে তাঁরই বংশধর ছিলেন। কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে- ওয়া জাআলনা যুররিয়্যাতাহূ হুমুল বাক্বীন "তাঁর (নূহ আ.-এর) বংশধরকেই আমি বিদ্যমান রেখেছি বংশ পরম্পরায়।" (সূরা সাফ্ফাত: ৭৭) ওয়া জাআলনা ফী যুররিয়্যাতিহিন নুবুওয়াতা ওয়াল কিতাব "আমি তাঁদের (নূহ ও ইবরাহীম আ.-এর) বংশধরদের জন্য স্থির করেছিলাম নবুয়ত ও কিতাব।” (সূরা হাদিদ: ২৬)
হযরত নূহ আ.-এর পরে আগত সকল নবী ও রাসূলই তাঁর বংশধর ছিলেন। তেমনিভাবে তাঁর বংশধর ছিলেন হযরত ইবরাহীম আ.ও। আর তাঁর মাধ্যমে তাঁর পরবর্তীকালের সকল নবী-রাসূলই হযরত নূহ আ.-এর বংশধর।
হযরত আদম আ.-এর পর হযরত নূহ আ.-কে আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে সর্বপ্রথম রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেন। বোখারি ও মুসলিম শরিফের হাদিস দ্বারা তা সুস্পষ্ট প্রমাণিত। মুসলিম শরিফের শাফায়াতের অধ্যায়ে হযরত আবু হোরায়রা রাযি. থেকে একটি দীর্ঘ রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে- ইয়া নূহু আনতা আওওয়ালুর রুসুলি ইলাল আরদ "হে নূহ! তোমাকে পৃথিবীতে সর্বপ্রথম রাসূল বানানো হয়েছে।"
আল্লাহ তাআলা হযরত নূহ আ.-কে পৃথিবীতে রাসূল হিসেবে প্রেরণের পর, তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে আল্লাহ তাআলার ইবাদত ও তাওহিদের দাওয়াত দেন। অনুরূপভাবে অন্যান্য পয়গম্বরগণও তাওহিদ ও অন্যান্য বিষয়ের দাওয়াত দিয়েছেন। তাঁরা সকলে তাঁরই বংশধর ছিলেন। কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে- ওয়া জাআলনা যুররিয়্যাতাহূ হুমুল বাক্বীন "তাঁর (নূহ আ.-এর) বংশধরকেই আমি বিদ্যমান রেখেছি বংশ পরম্পরায়।" (সূরা সাফ্ফাত: ৭৭) ওয়া জাআলনা ফী যুররিয়্যাতিহিন নুবুওয়াতা ওয়াল কিতাব "আমি তাঁদের (নূহ ও ইবরাহীম আ.-এর) বংশধরদের জন্য স্থির করেছিলাম নবুয়ত ও কিতাব।” (সূরা হাদিদ: ২৬)
হযরত নূহ আ.-এর পরে আগত সকল নবী ও রাসূলই তাঁর বংশধর ছিলেন। তেমনিভাবে তাঁর বংশধর ছিলেন হযরত ইবরাহীম আ.ও। আর তাঁর মাধ্যমে তাঁর পরবর্তীকালের সকল নবী-রাসূলই হযরত নূহ আ.-এর বংশধর।