📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত ইদরীস আ.-এর তাবলীগে দীন

📄 হযরত ইদরীস আ.-এর তাবলীগে দীন


আল্লামা জামালুদ্দীন কাতফী রহ. রচিত 'তারিখুল হুকামা' কিতাবে লিখেছেন: "হযরত ইদরীস আ. সম্বন্ধে তাফসিরকারক ও ঐতিহাসিকগণের কথাগুলো প্রসিদ্ধ। তাঁর সম্পর্কে দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের বিশেষ কথাগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলো- হযরত ইদরীস আ. জ্ঞান বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়ার বয়সে উপনীত হলে আল্লাহ পাক তাঁকে নবুয়ত প্রদান করেন। তখন তিনি দুষ্টপ্রকৃতির ও ফাসাদ বিস্তারকারীদের হেদায়েতের পথে আহ্বান করেন। ফাসাদ বিস্তারকারীরা তাঁর কোনো কথাই কর্ণপাত করল না। হযরত আদম ও শীষ আ.-এর শরিয়তের বিরোধিতাই করতে থাকল। অবশ্য ক্ষুদ্র একটি দল ইমান গ্রহণ করল। হযরত ইদরীস আ. এ অবস্থা দেখে সেখান থেকে অন্যর হিজরতের মনস্থ করলেন। নিজের অনুগামীদেরকে হিজরত করতে বললেন। তাঁর অনুসারীরা তখন আপন জন্মভূমি ত্যাগ করাকে দুঃসহ ও কষ্টসাধ্য মনে করে বলল, 'বাবেল' শহরের মতো এমন সুন্দর বাসস্থান আমাদের ভাগ্যে আর কোথায় হতে পারে। (বাবেল অর্থ নহর) বাবেল যেহেতু দজলা ও ফোরাত নদীদ্বয়ের পানিতে সবুজ-শ্যামল ছিল, তাই একে 'বাবেল' নাম দেওয়া হয়েছিল। এটা ছিল ইরাকের অন্তর্গত একটি বিখ্যাত শহর। কালক্রমে তা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

হযরত ইদরীস আ. তাদের সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, "তোমরা যদি আল্লাহ তাআলার পথে এতটুকু কষ্ট সহ্য কর, তবে তাঁর রহমত সুপ্রসন্ন। তিনি তোমাদেরকে এর চেয়ে উত্তম প্রতিদান প্রদান করবেন। সাহস হারিও না। আল্লাহ পাকের আদেশের সামনে অনুগত হও।"

মুসলমানদের সম্মতি লাভের পর হযরত ইদরীস আ. এবং তাঁর অনুসারীগণ বাবেল থেকে হিজরত করলেন। এ ক্ষুদ্র দলটি যখন নীলনদের প্রবহমান এবং পার্শ্বস্থ অববাহিকার সবুজ সতেজ দৃশ্য দেখতে পেল, তখন প্রফুল্ল ও আনন্দিত হলো। হযরত ইদরীস আ. তাঁর অনুসারীদের বললেন, "বাবলিউন” অর্থাৎ এ বিশাল নদীটির উপকূলীয় ভূমি তোমাদের বাবেলের মতোই সবুজ শ্যামল।

অনন্তর তারা একটি উৎকৃষ্ট স্থান নির্বাচন করে নীলনদের পার্শ্বেই বসবাস করতে লাগল। হযরত ইদরীস আ.-এর 'বাবলিউন' শব্দটি বিরাট খ্যাতি লাভ করল। আরবরা ছাড়া প্রাচীনকালে সব জাতিই এ ভূখণ্ডটিকে 'বাবলিউন' বলে ডাকত। আরবরা বলত একে 'মিসর'। এ নামকরণের কারণ তাঁরা বলেছেন, হযরত নূহ আ.-এর তুফানের পর এ স্থানটুকু মেছের ইবনে হাম-এর বংশধরদের বাসস্থান হয়েছিল।

হযরত ইদরীস আ. ও তাঁর অনুসারীগণ মিসরে বসবাস শুরু করেন। এখানেও তিনি আল্লাহ তাআলার পয়গাম প্রচার, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ অব্যাহত রাখেন। কথিত আছে, তাঁর সময় ৭২ টি ভাষা প্রচলিত ছিল। তিনি আল্লাহ পাকের অনুগ্রহে সব ভাষাতেই অভিজ্ঞ ছিলেন। প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তাদের নিজ নিজ ভাষায় হেদায়েত ও ইমান-ইসলামের দাওয়াত প্রদান করতেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত ইদরীস আ.-এর অন্যান্য শিক্ষা

📄 হযরত ইদরীস আ.-এর অন্যান্য শিক্ষা


হযরত ইদরীস আ.-ই সর্বপ্রথম বিজ্ঞান শাস্ত্র ও জ্যোতির্বিদ্যার প্রচলন করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে আসমানসমূহ এবং এদের পাস্পরিক আকর্ষণের গুরুত্ব ও রহস্য শিক্ষা দিয়েছিলেন। এ ছাড়া তাঁকে গণিত শাস্ত্রে অভিজ্ঞ বানান। বস্তুত আল্লাহ তাআলার এ পয়গম্বর দ্বারা এ সকল শাস্ত্রের বিকাশ না হলে মানুষের স্বভাব-প্রকৃতির পক্ষে সে পর্যন্ত পৌঁছনো দুষ্কর ছিল। তিনি বিভিন্ন দল ও সম্প্রদায়ের জন্য তাদের অবস্থানুযায়ী আইনকানুন ও রীতিনীতি নির্ধারিত করে দিয়েছিলেন। ভূমণ্ডলকে চারভাগে বিভক্ত করে প্রত্যেক ভাগে একজন করে গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন। তারাই ছিল উক্ত ভূখণ্ডের শাসক ও যিম্মাদার। সেই সঙ্গে ওইসব ভূখণ্ডের জন্য এ সমস্ত আইন ও রীতিনীতির ওপর আল্লাহ প্রদত্ত অহির আইনকানুন ও রীতিনীতি অগ্রগণ্য থাকবে বলে চূড়ান্ত করে দেওয়া হয়েছিল।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত ইদরীস আ.-এর শিক্ষাদানের বিষয়বস্তু

📄 হযরত ইদরীস আ.-এর শিক্ষাদানের বিষয়বস্তু


হযরত ইদরীস আ. তাঁর অনুসারীদের যে সকল বিষয়ে শিক্ষা দিতেন, সেগুলো হলো-
(১) আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব ও একত্বের ওপর ইমান আনয়ন করা।
(২) একমাত্র বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহ পাকের ইবাদত করা।
(৩) পরকালের আযাব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য নেকআমল করা।
(৪) দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি ও বিমুখতা।
(৫) যাবতীয় কাজে ইনসাফ ও ন্যায়ের মানদণ্ডকে সমুন্নত রাখা।
(৬) নির্ধারিত নিয়মে আল্লাহর ইবাদত করা।
(৭) আইয়্যামে বীয অর্থাৎ প্রত্যেক (চাঁদ) মাসের ১৪, ১৫, ১৬ তারিখে রোযা রাখা।
(৮) ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা।
(৯) যাকাত দেওয়া ও পাক-পবিত্র থাকা।
(১০) শুয়োর, কুকুর ও সকল প্রকার নেশাকর দ্রব্য হতে দূরে থাকা।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত ইদরীস আ.-এর পার্থিব খেলাফত

📄 হযরত ইদরীস আ.-এর পার্থিব খেলাফত


হযরত ইদরীস আ.-কে যখন আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর খলিফা ও অধিপতি বানালেন, তখন তিনি আল্লাহর বান্দাগণকে ইলম ও আমলের প্রেক্ষিতে তিনভাগে বিভক্ত করে দিলেন। জ্যোতিষী, বাদশা ও প্রজা। পর্যায়ক্রমিকভাবে তাদের মর্যাদা নির্ধারণ করে দিলেন। জ্যোতিষীর মর্যাদা সবার ঊর্ধ্বে। কেননা তাকে আল্লাহ পাকের দরবারে নিজেকে ছাড়াও বাদশা ও প্রজাদের ব্যাপারেও জবাবদিহি করতে হবে। দ্বিতীয় মর্যাদাবান হলেন বাদশা। কেননা তাকে নিজেকে এবং রাজত্বসংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ের জবাবদিহি করতে হবে। তৃতীয় পর্যায়ে প্রজা। কেননা তাকে শুধু নিজের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু এ পর্যায়ক্রমিক মর্যাদাভেদ কর্তব্যের ভিত্তিতে ছিল। বংশ ও খান্দানের পার্থক্যের ভিত্তিতে নয়। সারকথা, হযরত ইদরীস আ. আল্লাহর কাছে উত্থিত হওয়া পর্যন্ত শরিয়ত ও রাষ্ট্রনীতির এ সমস্ত কানুন প্রচার করতে থাকেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px