📄 পবিত্র কোরআনে হযরত ইদরীস আ.
পবিত্র কোরআনুল কারিমের মাত্র দু জায়গায় হযরত ইদরীস আ. সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। সূরা মরিয়ম ও আম্বিয়ায়।
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِدْرِيسَ إِنَّهُ كَانَ صِدِّيقًا نَبِيًّا (৫৬) وَرَفَعْنَاهُ মাকানান عَلِيًّا
"আর স্মরণ করুন, কোরআনে উল্লিখিত ইদরীসকে। তিনি ছিলেন সত্যনিষ্ঠ নবী। আমি তাকে উন্নীত করেছিলাম উচ্চ মর্যাদায়।" (সূরা মরিয়ম: ৫৬-৫৭)
وَإِسْمَاعِيلَ وَإِدْرِيسَ وَذَا الْكِفْلِ كُلٌّ مِنَ الصَّابِرِينَ
"আর ইসমাইল ইদরীস ও যুলকিফল- তাদের প্রত্যেকেই ছিলেন ধৈর্যশীল।" (সূরা আম্বিয়া: ৮৫)
📄 হাদিস পাকে হযরত ইদরীস আ.-এর আলোচনা
এক হাদিসে আছে, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কেউ জ্যোতির্বিদ্যার নকশা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। তিনি বলেন, "এ জ্ঞান জনৈক নবীকে দান করা হয়েছিল। অতএব কোনো ব্যক্তির অঙ্কিত নকশা যদি সেই নকশার মতো হয়ে যায়, তবেই তা সঠিক হবে; অন্যথায় নয়।"
বোখারি ও মুসলিমে মেরাজের হাদিসে উল্লেখ আছে, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চতুর্থ আসমানে হযরত ইদরীস আ.-এর সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। ইমাম বোখারি রহ. বলেন: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, ইলিয়াস নবীর নামই ছিল ইদরীস। কিন্তু কোরআন মাজিদে হযরত ইদরীস ও হযরত ইলিয়াস আ. কে আলাদা আলাদা নবী বর্ণনা করায় তাঁর এ রেওয়ায়েত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
📄 হযরত ইদরীস আ.-এর গঠনাকৃতি
হযরত ইদরীস আ. ছিলেন বাদামী রংয়ের সুঠামদেহী, সুদর্শন ও সুশ্রী, ঘন দাড়ি, কমনীয় রং-রূপ ও চেহারার অধিকারী। শক্ত বাহু ও প্রশস্ত কাঁধ, মজবুত হাড় ও হালকা পাতলা গঠন ও উজ্জ্বল সুরমা চোখ। কথাবার্তায় গম্ভীর। নীরবতাপ্রিয়। দৃঢ়চেতা। চলাফেরায় নিচুদৃষ্টি, চিন্তাশীল ও অনুসন্ধানী। ক্রোধের সময় অত্যন্ত ক্রুদ্ধ। কথা বলার সময় তর্জনী অঙ্গুলি দ্বারা বারবার ইশারা করতে অভ্যস্ত। হযরত ইদরীস আ. ৮২ বছর বয়স পেয়েছিলেন। তাঁর আংটির ওপর একটি বাক্য অঙ্কিত ছিল-
الصَّبْرُ مَعَ الْإِيْمَانِ بِاللَّهِ يُوْরিথু الظُّফَرَ .
"আল্লাহর প্রতি ঈমানের সঙ্গে সঙ্গে ধৈর্যধারণ বিজয়ের কারণ হয়ে থাকে।" কোমরবন্দের বা বেল্টের ওপর লেখা ছিল-
الْأَعْيَادُ فِي حِفْظِ الْفُرُوضِ وَالشَّرِيعَةُ مِنْ تَمَامِ الدِّينِ وَتَمَامُ الدِّينِ كَمَالُ الْمُرُوَّةِ.
“প্রকৃত আনন্দ আল্লাহ পাকের ফরযগুলো সংরক্ষণের মধ্যে নিহিত। ধর্মের পূর্ণতা শরিয়তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আর মানবতার পূর্ণতা অর্জনে ধর্মের পূর্ণতা সাধিত হয়।” জানাযার নামাযের সময় যে পাগড়ি বাঁধতেন, তাতে লিখা ছিল-
السَّعِيدُ مَنْ نَظَرَ لِنَفْسِهِ وَشَفَاعَتُهُ عِنْدَ رَبِّهِ أَعْمَالُهُ الصَّالِحَةُ.
"ভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসের প্রতি দৃষ্টি রাখে। আর পালনকর্তার দরবারে মানুষের জন্য সুপারিশকারী হলো, তার নেকআমলসমূহ।"
📄 হযরত ইদরীস আ.-এর তাবলীগে দীন
আল্লামা জামালুদ্দীন কাতফী রহ. রচিত 'তারিখুল হুকামা' কিতাবে লিখেছেন: "হযরত ইদরীস আ. সম্বন্ধে তাফসিরকারক ও ঐতিহাসিকগণের কথাগুলো প্রসিদ্ধ। তাঁর সম্পর্কে দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের বিশেষ কথাগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলো- হযরত ইদরীস আ. জ্ঞান বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়ার বয়সে উপনীত হলে আল্লাহ পাক তাঁকে নবুয়ত প্রদান করেন। তখন তিনি দুষ্টপ্রকৃতির ও ফাসাদ বিস্তারকারীদের হেদায়েতের পথে আহ্বান করেন। ফাসাদ বিস্তারকারীরা তাঁর কোনো কথাই কর্ণপাত করল না। হযরত আদম ও শীষ আ.-এর শরিয়তের বিরোধিতাই করতে থাকল। অবশ্য ক্ষুদ্র একটি দল ইমান গ্রহণ করল। হযরত ইদরীস আ. এ অবস্থা দেখে সেখান থেকে অন্যর হিজরতের মনস্থ করলেন। নিজের অনুগামীদেরকে হিজরত করতে বললেন। তাঁর অনুসারীরা তখন আপন জন্মভূমি ত্যাগ করাকে দুঃসহ ও কষ্টসাধ্য মনে করে বলল, 'বাবেল' শহরের মতো এমন সুন্দর বাসস্থান আমাদের ভাগ্যে আর কোথায় হতে পারে। (বাবেল অর্থ নহর) বাবেল যেহেতু দজলা ও ফোরাত নদীদ্বয়ের পানিতে সবুজ-শ্যামল ছিল, তাই একে 'বাবেল' নাম দেওয়া হয়েছিল। এটা ছিল ইরাকের অন্তর্গত একটি বিখ্যাত শহর। কালক্রমে তা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
হযরত ইদরীস আ. তাদের সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, "তোমরা যদি আল্লাহ তাআলার পথে এতটুকু কষ্ট সহ্য কর, তবে তাঁর রহমত সুপ্রসন্ন। তিনি তোমাদেরকে এর চেয়ে উত্তম প্রতিদান প্রদান করবেন। সাহস হারিও না। আল্লাহ পাকের আদেশের সামনে অনুগত হও।"
মুসলমানদের সম্মতি লাভের পর হযরত ইদরীস আ. এবং তাঁর অনুসারীগণ বাবেল থেকে হিজরত করলেন। এ ক্ষুদ্র দলটি যখন নীলনদের প্রবহমান এবং পার্শ্বস্থ অববাহিকার সবুজ সতেজ দৃশ্য দেখতে পেল, তখন প্রফুল্ল ও আনন্দিত হলো। হযরত ইদরীস আ. তাঁর অনুসারীদের বললেন, "বাবলিউন” অর্থাৎ এ বিশাল নদীটির উপকূলীয় ভূমি তোমাদের বাবেলের মতোই সবুজ শ্যামল।
অনন্তর তারা একটি উৎকৃষ্ট স্থান নির্বাচন করে নীলনদের পার্শ্বেই বসবাস করতে লাগল। হযরত ইদরীস আ.-এর 'বাবলিউন' শব্দটি বিরাট খ্যাতি লাভ করল। আরবরা ছাড়া প্রাচীনকালে সব জাতিই এ ভূখণ্ডটিকে 'বাবলিউন' বলে ডাকত। আরবরা বলত একে 'মিসর'। এ নামকরণের কারণ তাঁরা বলেছেন, হযরত নূহ আ.-এর তুফানের পর এ স্থানটুকু মেছের ইবনে হাম-এর বংশধরদের বাসস্থান হয়েছিল।
হযরত ইদরীস আ. ও তাঁর অনুসারীগণ মিসরে বসবাস শুরু করেন। এখানেও তিনি আল্লাহ তাআলার পয়গাম প্রচার, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ অব্যাহত রাখেন। কথিত আছে, তাঁর সময় ৭২ টি ভাষা প্রচলিত ছিল। তিনি আল্লাহ পাকের অনুগ্রহে সব ভাষাতেই অভিজ্ঞ ছিলেন। প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তাদের নিজ নিজ ভাষায় হেদায়েত ও ইমান-ইসলামের দাওয়াত প্রদান করতেন।