📄 নাম ও বংশ পরিচয়
হযরত ইদরীস আ.-এর নাম ও বংশ পরিচয় এবং তাঁর যুগ সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। উক্তিগুলোকে একত্র করলে অন্ততপক্ষে কোনো মীমাংসা বা প্রবল অভিমত প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় না। কারণ, প্রথমত কোরআন মাজিদে শুধু নসিহত ও হেদায়েতের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তাঁর নবুয়ত, উচ্চ মর্যাদা ও মহৎ গুণাবলীর উল্লেখ করেছে। দ্বিতীয়ত হাদিসের বর্ণনাগুলোও এর চেয়ে বেশি অগ্রসর হয় নি। তাই এ সম্পর্কে যা কিছু পাওয়া যায়, তা শুধু ইসরাইলি রেওয়ায়েত তদুপরি সেগুলোও পরস্পরবিরোধী। এ সব মতানৈক্যসহ মোটামুটি যা কিছু পাওয়া যায়, নিম্নে তা উল্লেখ করা হলো-
একদল বলেন: তিনি নূহ আ.-এর দাদা। তাঁর নাম আখনুখ। ইদরীস তাঁর লকব ও উপাধি। অথবা আরবি ভাষায় ইদরীস আর হিব্রু ও সুরিয়ানি ভাষায় তাঁর নাম আখনুখ। অপর দল বলেন: ইদরীস আ. ছিলেন বনি ইসরাইল বংশীয় আম্বিয়ায়ে কেরামের একজন। তা ছাড়া ইদরীস ও ইলয়াস আ. একই ব্যক্তির নাম ও উপাধি।
তৃতীয় দল বলেন: ইদরীস আ. বাবেলে জন্মগ্রহণ করেন। সেখানেই প্রতিপালিত হন ও বেড়ে উঠেন। প্রথম জীবনে তিনি হযরত শীষ ইবনে আদম আ. থেকে জ্ঞান অর্জন করেন। আকায়েদ শাস্ত্রের বিখ্যাত আলেম আল্লামা শাহরেস্তানি বলেন, আগুসা যাইমুন ছিল হযরত শীষ আ.-এরই নাম।
📄 পবিত্র কোরআনে হযরত ইদরীস আ.
পবিত্র কোরআনুল কারিমের মাত্র দু জায়গায় হযরত ইদরীস আ. সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। সূরা মরিয়ম ও আম্বিয়ায়।
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِدْرِيسَ إِنَّهُ كَانَ صِدِّيقًا نَبِيًّا (৫৬) وَرَفَعْنَاهُ মাকানান عَلِيًّا
"আর স্মরণ করুন, কোরআনে উল্লিখিত ইদরীসকে। তিনি ছিলেন সত্যনিষ্ঠ নবী। আমি তাকে উন্নীত করেছিলাম উচ্চ মর্যাদায়।" (সূরা মরিয়ম: ৫৬-৫৭)
وَإِسْمَاعِيلَ وَإِدْرِيسَ وَذَا الْكِفْلِ كُلٌّ مِنَ الصَّابِرِينَ
"আর ইসমাইল ইদরীস ও যুলকিফল- তাদের প্রত্যেকেই ছিলেন ধৈর্যশীল।" (সূরা আম্বিয়া: ৮৫)
📄 হাদিস পাকে হযরত ইদরীস আ.-এর আলোচনা
এক হাদিসে আছে, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কেউ জ্যোতির্বিদ্যার নকশা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। তিনি বলেন, "এ জ্ঞান জনৈক নবীকে দান করা হয়েছিল। অতএব কোনো ব্যক্তির অঙ্কিত নকশা যদি সেই নকশার মতো হয়ে যায়, তবেই তা সঠিক হবে; অন্যথায় নয়।"
বোখারি ও মুসলিমে মেরাজের হাদিসে উল্লেখ আছে, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চতুর্থ আসমানে হযরত ইদরীস আ.-এর সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। ইমাম বোখারি রহ. বলেন: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, ইলিয়াস নবীর নামই ছিল ইদরীস। কিন্তু কোরআন মাজিদে হযরত ইদরীস ও হযরত ইলিয়াস আ. কে আলাদা আলাদা নবী বর্ণনা করায় তাঁর এ রেওয়ায়েত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
📄 হযরত ইদরীস আ.-এর গঠনাকৃতি
হযরত ইদরীস আ. ছিলেন বাদামী রংয়ের সুঠামদেহী, সুদর্শন ও সুশ্রী, ঘন দাড়ি, কমনীয় রং-রূপ ও চেহারার অধিকারী। শক্ত বাহু ও প্রশস্ত কাঁধ, মজবুত হাড় ও হালকা পাতলা গঠন ও উজ্জ্বল সুরমা চোখ। কথাবার্তায় গম্ভীর। নীরবতাপ্রিয়। দৃঢ়চেতা। চলাফেরায় নিচুদৃষ্টি, চিন্তাশীল ও অনুসন্ধানী। ক্রোধের সময় অত্যন্ত ক্রুদ্ধ। কথা বলার সময় তর্জনী অঙ্গুলি দ্বারা বারবার ইশারা করতে অভ্যস্ত। হযরত ইদরীস আ. ৮২ বছর বয়স পেয়েছিলেন। তাঁর আংটির ওপর একটি বাক্য অঙ্কিত ছিল-
الصَّبْرُ مَعَ الْإِيْمَانِ بِاللَّهِ يُوْরিথু الظُّফَرَ .
"আল্লাহর প্রতি ঈমানের সঙ্গে সঙ্গে ধৈর্যধারণ বিজয়ের কারণ হয়ে থাকে।" কোমরবন্দের বা বেল্টের ওপর লেখা ছিল-
الْأَعْيَادُ فِي حِفْظِ الْفُرُوضِ وَالشَّرِيعَةُ مِنْ تَمَامِ الدِّينِ وَتَمَامُ الدِّينِ كَمَالُ الْمُرُوَّةِ.
“প্রকৃত আনন্দ আল্লাহ পাকের ফরযগুলো সংরক্ষণের মধ্যে নিহিত। ধর্মের পূর্ণতা শরিয়তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আর মানবতার পূর্ণতা অর্জনে ধর্মের পূর্ণতা সাধিত হয়।” জানাযার নামাযের সময় যে পাগড়ি বাঁধতেন, তাতে লিখা ছিল-
السَّعِيدُ مَنْ نَظَرَ لِنَفْسِهِ وَشَفَاعَتُهُ عِنْدَ رَبِّهِ أَعْمَالُهُ الصَّالِحَةُ.
"ভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসের প্রতি দৃষ্টি রাখে। আর পালনকর্তার দরবারে মানুষের জন্য সুপারিশকারী হলো, তার নেকআমলসমূহ।"