📄 ওফাত লাভ
ওফাত লাভ • মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক বলেন, মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে আদম আ. তাঁর পুত্র শীষ আ. কে অসিয়ত করেন। তাতে রাত ও দিবসের ক্ষণসমূহ এবং সেসব ক্ষণের ইবাদতসমূহ শিখিয়ে যান ও ভবিষ্যতে আসন্ন তুফান সম্পর্কে অবহিত করে যান।
• মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ. বলেন, আজকের সকল আদম সন্তানের বংশধারা শীষ পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়ে যায় এবং শীষ ছাড়া আদম আ.-এর অপর সব কটি বংশধারাই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আল্লাহ পাকই সর্বজ্ঞ।
জুমার দিন দিন আদম আ. শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ফেরেশতাগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে জান্নাতের কিছু সুগন্ধি ও কাফন নিয়ে তাঁর কাছে আগমন করেন এবং তাঁর পুত্র ও স্থলাভিষিক্ত শীষ আ.-কে সান্ত্বনা দান করেন। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ. বলেন, সেই সঙ্গে সাত দিন সাত রাত পর্যন্ত চন্দ্র ও সূর্যের গ্রহণ লেগে থাকে।
• ইমাম আহমদের পুত্র আবদুল্লাহ বলেন, ইয়াহইয়া ইবনে যামরা সাদী বলেন, মদিনায় আমি এক প্রবীণ ব্যক্তিকে কথা বলতে দেখে তাঁর পরিচয় জানতে চাইলে লোকেরা বলল, তিনি উবাই ইবনে কাব রাযি.। তখন তিনি কথা প্রসঙ্গে বললেন, "আদম আ.-এর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তিনি তাঁর পুত্রদের বললেন, আমার জান্নাতের ফল খেতে ইচ্ছা হয়। তাঁরা ফলের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন।
পথে তাঁদের সঙ্গে কতিপয় ফেরেশতাদের সাক্ষাৎ ঘটে। তাদের সাথে আদম আ.-এর কাফন, সুগন্ধি, কয়েকটি কুঠার, কোদাল ও থলে ছিল। ফেরেশতাগণ তাদের বললেন, হে আদম-পুত্রগণ। তোমরা কী চাও এবং কী খুঁজছ? কিংবা বললেন, তোমরা কী উদ্দেশ্যে এবং কোথায় যাচ্ছ? উত্তরে তারা বললেন, আমাদের পিতা অসুস্থ। তিনি জান্নাতের ফল খাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। এ কথা শুনে ফেরেশতাগণ বললেন, তোমরা ফিরে যাও। তোমাদের পিতার ইনতেকালের সময় ঘনিয়ে এসেছে। ফেরেশতাগণ আদম আ.-এর কাছে এলে হাওয়া আ. তাদের চিনে ফেলেন এবং আদম আ. কে জড়িয়ে ধরেন। তখন আদম আ. বললেন, আমাকে ছেড়ে দিয়ে তুমি সরে যাও। কারণ, তোমার আগেই আমার ডাক পড়েছে। অতএব আমার ও আমার মহান রব-এর ফেরেশতাগণের মধ্য থেকে তুমি সরে দাঁড়াও।
ফেরেশতাগণ তাঁর জান কবয করে নিয়ে তাঁকে গোসল দেন। কাফন পরান। সুগন্ধি মাখিয়ে দেন। এবং তাঁর জন্য বগলী কবর খুঁড়ে জানাযার নামায আদায় করেন। তারপর তাঁকে কবরে রেখে দাফন করেন। এরপর তাঁরা বললেন, হে আদমের সন্ত নিগণ! এ হলো তোমাদের দাফনের নিয়ম। এ বর্ণনাটির সনদ সহি।
* ইবনে আসাকির রহ. ইবনে আব্বাস রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ফেরেশতাগণ আদম আ.-এর জানাযায় চারবার, আবু বকর রাযি. ফাতেমা রাযি.-এর জানাযায় চারবার, হযরত ওমর রাযি. হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাযি.-এর জানাযায় চারবার এবং সুহাইব রাযি. হযরত ওমর রাযি.-এর জানাযায় চারবার তাকবির পাঠ করেন। ইবনে আসাকির বলেন, শায়বান ছাড়া অন্যান্য রাবি মাইমুন সূত্রে ইবনে ওমর রাযি. থেকে হাদিসটি বর্ণনা করেন।
📄 আদম আ.-কে কোথায় দাফন করা হয়েছে
আদম আ.-কে কোথায় দাফন করা হয়েছে হযরত আদম আ.-কে কোথায় দাফন করা হয়েছে, এ ব্যাপারে মতভেদ আছে। প্রসিদ্ধ মতে, তাঁকে সে পাহাড়ের কাছে দাফন করা হয়েছে, যে পাহাড় থেকে তাঁকে ভারতবর্ষে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কেউ কউে বলেন, আবু কুবাইস পাহাড়ে তাঁকে দাফন করা হয়। কেউ কেউ বলেন, মহা প্লাবনের সময় হযরত নূহ আ. আদম ও হাওয়া আ.-এর লাশ একটি সিন্দুকে ভরে বায়তুল মুকাদ্দাসে দাফন করেন। ইবনে জারির এ তথ্য বর্ণনা করেছেন।
* ইবনে আসাকির কারো কারো সূত্রে বর্ণনা করেন, আদম আ.-এর মাথা হলো মসজিদে ইবরাহিমের কাছে, এবং পা দু'খানা বায়তুল মুকাদ্দাসের সাখরা নামক বিখ্যাত পাথর খণ্ডের কাছে। হযরত আদম আ.-এর এক বছর পরই হাওয়া আ.-এর মৃত্যু হয়।
আদম আ.-এর আয়ু কত ছিল, এ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। ইবনে আব্বাস রাযি. ও আবু হোরায়রা রাযি. থেকে মারফু সূত্রে বর্ণিত হাদিসে আমরা উল্লেখ করে এসেছি, আদম আ.-এর আয়ু লাওহে মাহফুযে এক হাজার বছর লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। আদম আ. নয় শ ত্রিশ বছর জীবন লাভ করেছিলেন বলে তাওরাতে যে তথ্য আছে, তার সঙ্গে এর কোনো বিরোধ নেই। কারণ ইহুদিদের এ বক্তব্য আপত্তিকর এবং আমাদের হাতে যে সংরক্ষিত সঠিক তথ্য রয়েছে, তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে তা প্রত্যাখাত। তা ছাড়া ইহুদিদের বক্তব্য ও হাদিসের তথ্যের মাঝে সমন্বয় সাধন করাও সম্ভব। কারণ, তাওরাতের তথ্য যদি সংরক্ষিত হয়; তা হলে তা অবতরণের পর পৃথিবীতে অবস্থান করার মেয়াদের ওপর প্রয়োগ হবে। আর তা হলো সৌর বছর হিসাবে নয় শ ত্রিশ বছর। চন্দ্র বছর হিসাবে নয় শ সাতান্ন বছর। এর সঙ্গে যোগ হয় ইবনে জারির রহ.-এর বর্ণনানুযায়ী অবতরণের পূর্বে জান্নাতে অবস্থানের মেয়াদকাল তেতাল্লিশ বছর। সর্বসাকুল্যে এক হাজার বছর।
'আতা খুরাসানি বলেন, হযরত আদম আ.-এর ইনতেকাল হলে গোটা সৃষ্টিজগৎ সাতদিন পর্যন্ত ক্রন্দন করে। ইবনে আসাকির রহ. এ তথ্য বর্ণনা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র শীষ আ. তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন।
📄 হযরত আদম আ.-এর কিছু গুণাবলী
হযরত আদম আ.-এর কিছু গুণাবলী হযরত আদম ও হাওয়া আ. অত্যন্ত মুত্তাকী ছিলেন। কেননা আদম আ. হলেন মানবজাতির পিতা। আল্লাহ তাআলা তাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেন, তাঁর মধ্যে নিজের রূহ সঞ্চার করেন। ফেরেশতাদেরকে তাঁর সম্মুখে সিজদাবনত করান। তাঁকে যাবতীয় বস্তুর নাম শিক্ষা দেন ও তাঁকে জান্নাতে বসবাস করতে দেন।
• ইবনে হিব্বান রহ. তাঁর সহি গ্রন্থে আবু যর রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন : আমি বললাম, আল্লাহর রাসূল! নবীর সংখ্যা কত? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এক লাখ চব্বিশ হাজার। আমি বললাম, আল্লাহর রাসূল! তাঁদের মধ্যে রাসূলের সংখ্যা কত? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তিন শ তেরজন। আমি বললাম, তাঁদের প্রথম কে ছিলেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আদম আ.। আমি বললাম, আল্লাহর রাসূল! তিনি কি প্রেরিত নবী? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হ্যাঁ! আল্লাহ তাঁকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন। তারপর তাঁর মধ্যে তাঁর রূহ সঞ্চার করেছেন। তারপর তাঁকে নিজেই সুঠাম করেছেন। কাবে আহবার বলেন, জান্নাতে কারো দারি থাকবে না। কেবল আদম আ.- এর নাভি পর্যন্ত দীর্ঘ কালো দারি থাকবে। আর জান্নাতে কাউকে উপনামে ডাকা হবে না। শুধু আদম আ. কেই উপনামে ডাকা হবে। দুনিয়াতে তাঁর উপনাম হলো আবুল বাশার। জান্নাতে হবে আবু মুহাম্মদ।
• সহি বোখারি ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত মেরাজ সংক্রান্ত হাদিসে আছে- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নিম্ন আকাশে আদম আ.-এর কাছে গমন করেন; তখন আদম আ. তাঁকে বলেছিলেন: পুণ্যবান পুত্র ও পুণ্যবান নবীকে স্বাগতম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ডানে একদল এবং বাঁয়ে একদল লোক দেখতে পান। আদম আ. ডানদিকে দৃষ্টিপাত করে হেসে দেন ও বামদিকে দৃষ্টিপাত করে কেঁদে ফেলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: আমি তখন বললাম, জিবরাইল, এ সব কী? উত্তরে জিবরাইল আ. বললেন, ওনি আদম এবং এরা তাঁর বংশধর। ডানদিকের লোকগুলো হলো জান্নাতী। তাই সেদিকে দৃষ্টিপাত করে তিনি হেসে দেন। আর বামদিকের লোকগুলো হলো জাহান্নামী। তাই ওদের দিকে দৃষ্টিপাত করে তিনি কেঁদে ফেলেন। আবুল বায়্যার বর্ণনা করেন, আদম আ.-এর জ্ঞানবুদ্ধি তাঁর সমস্ত সন্তানের জ্ঞানবুদ্ধির সমান ছিল।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ হাদিসে আরো বলেন, তারপর আমি ইউসুফ আ.-এর কাছে গমন করি। দেখলাম, তাকে অর্ধেক রূপ দেওয়া হয়েছে। আলেমগণ এর অর্থ প্রসঙ্গে বলেন, ইউসুফ আ. আদম আ.-এর রূপের অর্ধেকের অধিকারী ছিলেন। এ কথাটা যুক্তিসঙ্গত। কারণ, আল্লাহ তাআলা আদম আ. কে নিজের পবিত্র হাতে সৃষ্টি করেছেন। আকৃতি দান করেছেন। এবং তাঁর মধ্যে নিজের রূহ সঞ্চার করেছেন। অতএব এমন লোকটি অন্যদের থেকে অধিক সুন্দর হওয়াই স্বাভাবিক।
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি. এবং ইবনে আমর রাযি. থেকে মওকূফ ও মারফুরূপে বর্ণনা করা হয়েছে- আল্লাহ তাআলা যখন জান্নাত সৃষ্টি করেন, তখন ফেরেশতাগণ বলেছিল: হে আমাদের রব, এটি আপনি আমাদেরকে দিয়ে দিন। কারণ, আদম আ.-এর সন্তানদের জন্য তো দুনিয়াই সৃষ্টি করেছেন। যাতে তারা সেখানে পানাহার করতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার সম্মান ও মহিমার শপথ! যাকে আমি নিজ হাতে সৃষ্টি করলাম, তার সন্তানদেরকে আমি তাদের সমান করব না, যাদেরকে আমি কুন (হও) বলতে হয়ে গেছে।”
বোখারি ও মুসলিমে বিভিন্ন সূত্রে আছে: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা আদম আ.-কে তাঁর আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। এ হাদিসের ব্যাখ্যায় অনেকে অনেক অভিমত ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।