📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 পৃথিবীতে আদম আ.-এর আগমন

📄 পৃথিবীতে আদম আ.-এর আগমন


পৃথিবীতে আদম আ.-এর আগমন

ইবলিসের ধোঁকায় পড়ে হযরত আদম ও হাওয়া আ. নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করার পর আল্লাহ তাআলা তাদের স্মরণ করিয়ে দেন, "আমি কি তোমাদের বলি নি, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু!"

তারপর তাঁরা আল্লাহ তাআলার কাছে অত্যন্ত বিনয়াবনত হয়ে ক্ষমা ও দয়ার প্রার্থনা করলেন। সুতরাং আল্লাহ তাআলা হযরত আদম ও হাওয়া আ. এবং ইবলিসকে সম্বোধন করে বলেন:

قُلْنَا اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَمَتَاعٌ إِلَى حِينٍ "তোমরা নেমে যাও! তোমরা একে অপরের শত্রু এবং পৃথিবীতে তোমাদের কিছুকাল বসবাস ও জীবিকা রয়েছে।" (সূরা বাকারা: ২৪)

কারো কারো মতে তাঁদের সঙ্গে সাপের প্রতিও এ আদেশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। সীমালঙ্ঘন করার অপরাধে তাদেরকে জান্নাত থেকে নেমে যাওয়ার এ আদেশ দেওয়া হয়।

আদম ও হাওয়া আ.-এর সঙ্গে সাপের উল্লেখের স্বপক্ষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর একটি হাদিস পেশ করা হয়ে থাকে। তা হলো- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাপ হত্যার আদেশ দিয়ে বলেন, "যেদিন এগুলোর সঙ্গে আমরা লড়াই শুরু করেছি, সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত এগুলোর সঙ্গে আর আমরা সন্ধি করি নি।"

সূরা ত্বহায় আল্লাহ তাআলা বলেন:

قَالَ اهْبِطَا مِنْهَا جَمِيعًا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ "তোমরা দুজনে একই সঙ্গে জান্নাত থেকে নেমে যাও! তোমরা পরস্পর পরস্পরের শত্রু।" (সূরা ত্বহা: ১২৩) এই আদেশ হল আদম আ. ও ইবলিসের প্রতি। আর হাওয়া আ. হযরত আদম আ.-এর এবং সাপ ইবলিসের অনুগামী হিসাবে এ আদেশের আওতাভুক্ত। কেউ কেউ বলেন, এখানে দ্বিবচন শব্দ দ্বারা একত্রে সকলকেই আদেশ করা হয়েছে।

হাফেজ ইবনে আসাকির রহ. মুজাহিদ রহ. থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা হযরত আদম ও হাওয়া আ. কে তাঁর নৈকট্য থেকে বের করে দেওয়ার জন্য দুজন ফেরেশতাকে আদেশ দেন। ফলে জিবরাইল আ. তাঁর মাথা থেকে মুকুট উঠিয়ে নেন। মিকাইল আ.ও তাঁর কপাল থেকে মুকুট খুলে ফেলেন। আর তাঁকে একটি বৃক্ষ শাখা জড়িয়ে ধরে। তখন আদম আ. ধারণা করলেন, এটা তাঁর তাৎক্ষণিক শাস্তি। তাই তিনি মাথা নিচু করে বলতে লাগলেন- ক্ষমা চাই! ক্ষমা চাই! তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, তুমি কি আমার কাছ থেকে পালাচ্ছ? আদম আ. বললেন: না, বরং আপনার লজ্জায় এমনটি করছি, হে আমার রব।

আওযায়ি রহ. হাসসান ইবনে আতিয়া রহ. এর সূত্রে বর্ণনা করেন। আদম আ. জান্নাতে একশ বছরকাল অবস্থান করেন। অন্য এক বর্ণনায় ষাট বছরের উল্লেখ রয়েছে। তিনি জান্নাত হারানোর দুঃখে সত্তর বছর, অন্যায়ের অনুতাপে সত্তর বছর এবং নিহত পুত্রের শোকে চল্লিশ বছর কাঁদেন। ইবনে আসাকির রহ. এটি বর্ণনা করেন।

ইবনে আবু হাতিম রহ. বর্ণনা করেন, ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন: আদম আ. কে মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী দাহনা নামক স্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়।

হাসান রহ. বলেন: আদম আ. কে ভারতে, হাওয়া আ. কে জিদ্দায় এবং ইবলিসকে বসরা থেকে মাইল কয়েক দূরে দস্তমিসান নামক স্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়। আর সাপকে নামানো হয় ইস্পাহানে।

সুদ্দী রহ. বলেন, আদম আ. ভারতে অবতরণ করেন। আসার সময় তিনি হাজরে আসওয়াদ ও জান্নাতের একমুঠো পাতা নিয়ে আসেন এবং এ পাতাগুলো ভারতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেন। ফলে সে দেশে সুগন্ধি গাছ উৎপন্ন হয়।

ইবনে ওমর রাযি. বলেন, আদম আ. কে সাফায় এবং হাওয়া আ.-কে মারওয়ায় নামিয়ে দেওয়া হয়। ইবনে আবু হাতিম এ তথ্যটিও বর্ণনা করেছেন।

আবদুর রাযযাক রহ. আবু মুসা আশআরী রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন: আল্লাহ তাআলা আদম আ. কে জান্নাত থেকে পৃথিবীতে নামিয়ে দেওয়ার সময় যাবতীয় বস্তুর প্রস্তুতপ্রণালী শিখিয়ে দেন। এবং জান্নাতের ফল-ফলাদি থেকে তার খাবারের ব্যবস্থা করে দেন। সুতরাং তোমাদের এ ফল-মূল জান্নাতের ফল-মূল থেকেই এসেছে। পার্থক্য শুধু এতটুকু, এগুলো নষ্ট হয় আর ওগুলো মোটেও নষ্ট হয় না।

হাকিম রহ. তাঁর মুসতাদরাকে বর্ণনা করেন, ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন: আদম আ. কে জান্নাতে শুধু আছর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময় থাকতে দেওয়া হয়েছিল। হাকিম রহ. বলেন: হাদিসটি বোখারি ও মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহি। তবে তাঁরা হাদিসটি বর্ণনা করেন নি।

সহি মুসলিমে বর্ণিত আছে। হযরত আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "দিবসসমূহের মধ্যে জুমার দিন হলো সর্বোত্তম। এ দিনে আদম আ.-কে সৃষ্টি করা হয়। এ দিনেই তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়। এ দিনেই তাঁকে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করা হয়।" সহি বোখারিতে অন্য এক সূত্রে বর্ণিত আছে, "এ দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।"

ইবনে আবু হাতিম রহ. বর্ণনা করেন, উবাই ইবনে কাব রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: আদম আ. বললেন, হে আমার রব! আমি যদি তাওবা করি ও ফিরে আসি, তা হলে আমি কি আবার জান্নাতে যেতে পারব? আল্লাহ তাআলা বললেন, নিশ্চয় পারবে।

ইবনে আবু নাজিহ রহ. মুজাহিদ রহ. থেকে বর্ণনা করেন। আল্লাহ তাআলার কাছে করা হযরত আদম আ.-এর দোয়াগুলো হলো-

اللَّهُمَّ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي إِنَّكَ خَيْرُ الْغَافِرِينَ.

اللَّهُمَّ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي إِنَّكَ خَيْرُ الرَّحِمِينَ.

اللَّهُمَّ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ .

"হে আল্লাহ! তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি তোমার পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা করি। হে আমার রব! নিশ্চয় আমি আমার নিজের ওপর যুলুম করেছি। তুমি আমাকে মাফ করে দাও! নিশ্চয় তুমি ক্ষমাকারীদের সর্বোত্তম। হে আল্লাহ! তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করি ও প্রশংসা করি। হে আমার রব! নিশ্চয় আমি নিজের প্রতি অবিচার করেছি। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও! নিশ্চয় তুমি সর্বোত্তম দয়ালু। হে আল্লাহ! তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করি ও প্রশংসা করি। হে আমার রব! আমি নিজের প্রতি অন্যায় করেছি। আমার প্রতি তুমি ক্ষমা পরবশ হও! নিশ্চয় তুমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

• ইমাম হাকেম রহ. বর্ণনা করেন, ইবনে আব্বাস রাযি. فَتَلَقَّى آدَمُ مِنْ رَبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ এর ব্যাখ্যায় বলেন- আদম আ. বললেন, হে আমার রব! আপনি কি আমাকে আপনার কুদরতি হাতে সৃষ্টি করেন নি? বলা হলো, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, আপনি কি আমার দেহে আপনার রূহ সঞ্চার করেন নি? বলা হলো, হ্যাঁ। তখন তিনি পুনরায় বললেন, আমি হাঁচি দিলে আপনি কি يرحমক আল্লাহ (আল্লাহ তোমাকে রহম করুন!) বলেন নি এবং আপনার রহমত কি আপনার গযবের উপর প্রবল নয়? বলা হলো, হ্যাঁ। পুনরায় তিনি বললেন, আপনি কি এ কথা নির্ধারণ করে রাখেন নি, আমি এ কাজ করব? বলা হলো, হ্যাঁ। এবার আদম আ. বললেন, আচ্ছা আমি যদি তাওবা করি, তা হলে আপনি পুনরায় আমাকে জান্নাতে ফিরিয়ে দেবেন কি? আল্লাহ তাআলা বললেন, হ্যাঁ। হাকিম বলেন: এর সনদ সহি; কিন্তু ইমাম বোখারি ও মুসলিম রহ. হাদিসটি বর্ণনা করেন নি।

• ইমাম হাকেম, বায়হাকি ও ইবনে আসাকির রহ. ওমর ইবনে খাত্তাব রাযি. থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : "আদম আ. যখন ভুল করে বসলেন, তখন বললেন- হে আমার রব! মুহাম্মদের উছিলা দিয়ে আমি আপনার দরবারে দোয়া করছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন! তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, তুমি মুহাম্মদকে চিনলে কী করে অথচ এখনও তাঁকে আমি সৃষ্টিই করি নি? আদম আ. বললেন, হে আমার রব! যখন আপনি আমাকে আপনার নিজ হাতে সৃষ্টি করলেন এবং আমার মধ্যে আপনার রূহ সঞ্চার করলেন, তখন আমি মাথা তুলে আরশের স্তম্ভসমূহে لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ লিখিত দেখতে পাই। আমি বুঝতে পারলাম, আপনার পবিত্র নামের সঙ্গে আপনি সৃষ্টির মধ্যে আপনার সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারো নাম যোগ করেন নি। তখন আল্লাহ তাআলা বললেন- তুমি যথার্থই বলেছ, হে আদম! নিশ্চয় তিনি সৃষ্টির মধ্যে আমার প্রিয়তম। তাঁর উসিলায় যখন তুমি আমার কাছে দোয়া করেছ, তখন আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। আর মুহাম্মদকে সৃষ্টি না করলে তোমাকে আমি সৃষ্টি করতাম না। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। কোরআন মাজিদে বর্ণিত আছে:

وَعَصَىٰ آدَمُ رَبَّهُ فَغَوَىٰ (১২১) ثُمَّ اجْتَبَاهُ رَبُّهُ فَتَابَ عَلَيْهِ وَهَدَى (১২২) "আদম তার প্রতিপালকের হুকুম অমান্য করল। ফলে সে ভ্রমে পতিত হলো। এরপর তার প্রতিপালক তাকে মনোনীত করলেন, তার প্রতি ক্ষমাপরায়ণ হলেন এবং তাকে পথ-নির্দেশ করলেন। (সূরা ত্বহা: ১২১-১২২)

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত মূসা আ.-এর সঙ্গে কথোপকথন

📄 হযরত মূসা আ.-এর সঙ্গে কথোপকথন


হযরত মূসা আ.-এর সঙ্গে কথোপকথন

ইমাম বোখারি রহ. বর্ণনা করেন, আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: হযরত মূসা আ. হযরত আদম আ.-এর মধ্যে পরস্পরে কথোপকথন হয়। হযরত মূসা আ. তাঁকে বললেন, আপনিই তো মানুষকে আপনার অপরাধ দ্বারা জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছেন এবং তাদেরকে দুর্বিপাকে ফেলেছেন। আদম আ. বললেন, মূসা! আপনি তো সে ব্যক্তি, আল্লাহ তাআলা তাঁর রিসালাত ও কালাম দিয়ে আপনাকে বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছেন। আপনি কি আমাকে এমন একটি কাজের জন্য তিরস্কার করছেন, যা আমাকে সৃষ্টি করার আগেই আল্লাহ আমার নামে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এতে আদম আ. মূসা আ.-এর ওপর বিজয়ী হন। (মুসলিম, নাসায়ি ও আহমাদ)

ইমাম আহমাদ রহ. বর্ণনা করেন, আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: আদম আ. ও মূসা আ. আলোচনায় রত হন। মূসা আ. আদম আ. কে বললেন- আপনি তো সে আদম, আপনার ত্রুটি আপনাকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছে। উত্তরে আদম আ. তাকে বললেন- আর আপনি তো সেই মূসা, যাকে আল্লাহ তাআলা তাঁর রিসালাত ও কালাম দিয়ে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন। আপনি কি আমাকে এমন একটি কাজের জন্য তিরস্কার করছেন, যা আমার সৃষ্টির আগেই স্থির করে রাখা হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: এভাবে আদম আ. যুক্তিপ্রমাণে মূসা আ.-এর ওপর জয়লাভ করেন। কথাটি তিনি দুবার বলেছেন। (বোখারি ও মুসলিম)

ইবনে আবু হাতেম রহ. বর্ণিত এ হাদিসের শেষাংশে আদম আ.-এর উক্তিসহ অতিরিক্ত এরূপ বর্ণনা আছে- "আল্লাহ আপনাকে এমন কয়েকটি ফলক দান করেছেন, যাতে যাবতীয় বিষয়ের সুস্পষ্ট বিবরণ রয়েছে এবং একান্তে নৈকট্য দান করেছেন। এবার আপনি বলুন, আল্লাহ তাআলা তাওরাত কখন লিপিবদ্ধ করেছিলেন? মূসা আ. বললেন, সৃষ্টির চল্লিশ বছর আগে। আদম আ. বললেন, তাতে কি আপনি وَعَمَى آدَمُ رَبَّهُ فَقَوَى কথাটি পান নি? মূসা আ. বললেন: জী পেয়েছি! আদম আ. বললেন: তবে কি আপনি আমাকে আমার এমন একটি কৃতকর্মের জন্য তিরস্কার করছেন, যা আমার সৃষ্টির চল্লিশ বছর আগেই আল্লাহ তাআলা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন, আমি তা করব?" বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “এভাবে আদম আ. মূসার ওপর জয় লাভ করেন।"

ইমাম আহমদ রহ. বর্ণিত রেওয়ায়েতে মূসা আ.-এর বক্তব্যে অতিরিক্ত আরো আছে- "আপনি আপনার সন্তানদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছেন।" তবে এ অংশটি হাদিসের অংশ কি না, তাতে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে。

• হাফেয আবু ইয়ালা আল-মূসিলি তাঁর মুসনাদে আমিরুল মুমিনিন ওমর ইবনে খাত্তাব রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "মূসা আ. বললেন, হে আমার রব! আপনি আমাকে সে আদম আ. কে একটু দেখান, যিনি আমাদেরকে এবং নিজেকে জান্নাত থেকে বের করিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে আদম আ. কে দেখালেন। মূসা আ. বললেন, আপনিই আদম আ.? তিনি বললেন, হ্যাঁ। মূসা আ. বললেন, আপনি সে ব্যক্তি, যার মধ্যে আল্লাহ তাআলা তাঁর রূহ সঞ্চার করেছেন, যাঁর সামনে তাঁর ফেরেশতাদের সিজদাবনত করিয়েছেন এবং যাঁকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিয়েছেন? জবাবে তিনি বললেন, হ্যাঁ। মূসা আ. জিজ্ঞাসা করলেন, আমাদেরকে এবং আপনার নিজেকে জান্নাত থেকে বের করে দিতে কীসে আপনাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল?

আদম আ. বললেন, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি মূসা আ.। আদম আ. বললেন, আপনি কি বনি ইসরাইলের নবী মূসা আ., আল্লাহ তাআলা পর্দার আড়াল থেকে যার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলেছেন, আপনার ও তাঁর মধ্যে কোনো দূত ছিল না? মূসা আ. বললেন, জী হ্যাঁ। আদম আ. বললেন: আপনি আমাকে এমন একটি বিষয়ে তিরস্কার করছেন, যা পূর্ব থেকেই আল্লাহ তাআলা নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এভাবে আদম আ. মূসা আ.-এর ওপর জয়ী হন। আবু দাউদ রহ. ভিন্নসূত্রে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন。

কারো কারো মতে এ জয়লাভের কারণ হলো, আদম আ. হলেন মূসা আ.-এর চেয়ে প্রবীণ। কেউ কেউ বলেন- এর কারণ হলো, আদম আ. হলেন তাঁর আদি-পিতা। কারো কারো মতে এর কারণ, তাঁরা দুজন ছিলেন ভিন্ন ভিন্ন শরিয়তের ধারক। আবার কেউ কেউ বলেন, এর কারণ তাঁরা দুজনই ছিলেন আলমে-বরযখে (যা এ জগতের বা পরকালের ব্যাপারে নয়, বরং মধ্যবর্তী আরেক জগতের ব্যাপার) আর তাঁদের ধারণায় সে জগতে শরিয়তের বিধান প্রযোজ্য নয়।

সঠিক কথা হলো, এ হাদিসটি বহুপাঠে বর্ণিত হয়েছে। তার কোনো কোনোটি বর্ণিত হয়েছে অর্থগতরূপে; কিন্তু তা সন্দেহমুক্ত নয়। বোখারি, মুসলিমসহ অন্যান্য কিতাবের বেশির ভাগ বক্তব্যের সারকথা হলো, মূসা আ. আদম আ. কে তাঁর নিজেকে ও সন্তানদেরকে জান্নাত থেকে বের করে দেয়ার জন্য দোষারোপ করেছিলেন। তাই উত্তরে আদম আ. তাঁকে বলেছিলেন, আমি আপনাদের বের করি নি। মূলত বের করেছেন সেই সত্তা, যিনি আমার বৃক্ষ-ফল খাওয়ার সঙ্গে বহিষ্কারকে সংশ্লিষ্ট করে রেখেছিলেন। আর যিনি তা সংশ্লিষ্ট করে রেখেছিলেন আমার সৃষ্টির পূর্বেই। এবং তা লিপিবদ্ধ ও নির্ধারিত করে রেখেছিলেন, তিনি হলেন মহান আল্লাহ। সুতরাং আপনি আমাকে এমন একটি কাজের জন্য দোষারোপ করছেন, যার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।

বড়জোর এতটুকু বলা যায়, আমাকে বৃক্ষ-ফল খেতে নিষেধ করা হয়েছিল; কিন্তু আমি তা খেয়ে ফেলেছি। এর সঙ্গে বহিষ্কারের সংশ্লিষ্টতা আমার কর্ম নয়। সুতরাং আপনাদেরকে এবং আমার নিজেকে জান্নাত থেকে বহিষ্কার আমি করি নি। তা ছিল সম্পূর্ণ আল্লাহ তাআলার কুদরতের লীলা! অবশ্য তাতে আল্লাহর হেকমত রয়েছে। অতএব এ কারণে হযরত আদম আ. মূসা আ.-এর ওপর জয়ী হয়েছিলেন।

পক্ষান্তরে যারা এ হাদিসকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, তারা আসলে একগুঁয়ে। কেননা হাদিসটি আবু হোরায়রা রাযি. থেকে মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। আর বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্মৃতিশক্তির ব্যাপারে আবু হোরায়রা রাযি.-এর মর্যাদা প্রশ্নাতীত। তা ছাড়া আরো কতিপয় সাহাবা থেকেও হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে। যা আমরা পূর্বে উল্লেখ করে এসেছি। আর একটু আগে হাদিসটির যেসব ব্যাখ্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল, তা হাদিসের শব্দ ও মর্ম উভয়ের সঙ্গেই অসঙ্গতিপূর্ণ। তাদের মধ্যে অবস্থানের যৌক্তিকতা জাবরিয়া সম্প্রদায়ের চেয়ে বেশি আর কারো নেই। কিন্তু কয়েক দিক থেকে তাতেও আপত্তি রয়েছে।

প্রথমত: মূসা আ. এমন কাজের জন্য দোষারোপ করতে পারেন না, যে কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তাওবা করে নিয়েছেন। দ্বিতীয়ত: মূসা আ. নিজে আদিষ্ট না হয়েও এক ব্যক্তিকে হত্যা করে আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করে বলেছিলেন:

رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي فَغَفَرَ لَهُ

হে আমার রব! আমি নিজের উপর অত্যাচার করেছি। অতএব তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও! ফলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। (সূরা কাসাস ১৬)

তৃতীয়ত: আদম আ. যদি পূর্বলিখিত তাকদির দ্বারা অপরাধের জন্য দোষারোপের জবাব দিয়ে থাকেন, তা হলে কৃতকর্মে তিরস্কৃত সকলের জন্যই এ পথ খুলে যেত এবং সকলেই পূর্ব নির্ধারিত তাকদিরের দোহাই দিয়ে প্রমাণ পেশ করতে পারত। এভাবে কিসাস ও হুদুদ তথা শরিয়ত নির্ধারিত শাস্তিসমূহের বিধানের দ্বার রুদ্ধ হয়ে যেত। তাকদিরকেই যদি দলিলরূপে পেশ করা যেত, তা হলে যে কেউ ছোট-বড় সকল কৃত অপরাধের জন্য তার দ্বারা দলিল পেশ করতে পারত। আর এটা ভয়াবহ পরিণতির দিকেই নিয়ে যেত। এ জন্যই কোনো কোনো আলিম বলেন: আদম আ. তাকদির দ্বারা দুর্ভোগের ব্যাপারে দলিল পেশ করেছিলেন; আল্লাহর আদেশ অমান্যের স্বপক্ষে যুক্তি হিসাবে নয়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হাবিল ও কাবিলের কাহিনী

📄 হাবিল ও কাবিলের কাহিনী


হাবিল ও কাবিলের কাহিনী আল্লাহ তাআলা বলেন: وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِلَ مِنْ أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ الْآخَرِ قَالَ لَأَقْتُلَنَّكَ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ (۲۷) لَئِنْ بَسَطْتَ إِلَيَّ يَدَكَ لِتَقْتُلَنِي مَا أَنَا بِبَাসِطِ يَدِيَ إِلَيْكَ لِأَقْتُلَكَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ رَبَّ الْعَالَمِينَ (২৮) إِنِّي أُرِيدُ أَنْ تَبُوءَ بِإِثْنِي وَإِثْمِكَ فَتَكُونَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ وَذَلِكَ جَزَاءُ الظَّالِمِينَ (২৯) فَطَوَّعَتْ لَهُ نَفْسُهُ قَتْلَ أَخِيهِ فَقَتَلَهُ فَأَصْبَحَ مِنَ الْخَاسِرِينَ (٣٠) فَبَعَثَ اللَّهُ غُرَابًا يَبْحَثُ فِي الْأَرْضِ لِيُرِيَهُ كَيْفَ يُوَارِي سَوْءَةَ أَخِيهِ قَالَ يَا وَيْلَتَا أَعَجَزْتُ أَنْ أَكُونَ مِثْلَ هَذَا الْغُرَابِ فَأُوَارِيَ سَوْءَةَ أَخي فَأَصْبَحَ مِنَ النَّادِمِينَ (৩১)

"আদমের দু পুত্রের বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথভাবে শোনাও! যখন তারা উভয়ে কোরবানি করেছিল, তখন একজনের কোরবানি কবুল হলো, অন্যজনের কবুল হলো না। তাদের একজন বলল, আমি তোমাকে হত্যা করবই। অপরজন বলল, আল্লাহ মুত্তাকীদের কোরবানি করেন। আমাকে হত্যা করার জন্য আমার প্রতি হাত বাড়ালেও তোমাকে হত্যা করার জন্য আমি হাত বাড়াব না। আমি তো জগতসমূহের প্রতিপালককে ভয় করি। আমি চাই, তুমি আমার ও তোমার পাপের ভার বহন করে জাহান্নামী হও এবং এটা জালিমদের কর্মফল। তারপর তার প্রবৃত্তি তার ভাইকে হত্যা করতে উদ্বুদ্ধ করল এবং সে তাকে হত্যা করল। ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হলো। তারপর আল্লাহ তাআলা একটি কাক পাঠালেন, যে তার ভাইয়ের লাশ কীভাবে গোপন করা যায়, তা দেখানোর জন্য মাটি খুঁড়তে লাগল। সে বলল, হায়! আমি কি এ কাকের মতোও হতে পারলাম না! যাতে আমার ভাইয়ের লাশ গোপন করতে পারি? তারপর সে অনুতপ্ত হলো। (সূরা মায়েদা: ২৭-৩১)

সুদ্দী রহ. ইবনে আব্বাস ও ইবনে মাসউদ রাযি. সহ কতিপয় সাহাবা সূত্রে বর্ণনা করেন, আদম আ.-এর এক গর্ভের পুত্র সন্তানের সঙ্গে অন্য গর্ভের কন্যা সন্তানকে বিয়ে দিতেন। সে মতে কাবীলের যমজ বোনকে বিয়ে করতে মনস্ত করেন হাবীল। কাবীল বয়সে হাবীলের চেয়ে বড় ছিল। আর তার বোন ছিল অত্যন্ত রূপসী। তাই কাবিল ভাইকে না দিয়ে নিজেই আপন বোনকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে চাইল এবং আদম আ. হাবীলের সঙ্গে তাকে বিবাহ দেওয়ার আদেশ করলে সে তা অগ্রাহ্য করল। ফলে আদম আ. তাদের দুজনকে কোরবানি করার আদেশ দিয়ে তিনি হজ করার জন্য মক্কায় চলে যান। যাওয়ার প্রাক্কালে তিনি আসমানসমূহকে তাঁর সন্ত নিদের দেখাশুনার দায়িত্ব দিতে চান; তারা তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। যমিন, পাহাড়-পর্বতকে তা নিতে বললে তারাও অস্বীকৃতি জানায়। শেষে কাবীল এ দায়িত্বভার গ্রহণ করে।

তারপর আদম আ. চলে গেলে তারা তাদের কোরবানি করে। হাবীল একটি মোটা তাজা বকরি কোরবানি করে। তার অনেক বকরি ছিল। আর কাবীল কোরবানি দেয় নিজের উৎপাদিত নিম্নমানের এক বোঝা শস্য। তারপর আগুন হাবিলের কোরবানি গ্রাস করে নেয় আর কাবীলের কোরবানি অগ্রাহ্য হয়। এতে কাবীল ক্ষেপে গিয়ে বলল, তোমাকে আমি হত্যা করেই ছাড়ব। যাতে করে তুমি আমার বোনকে বিয়ে করতে না পার। উত্তরে হাবীল বলল, আল্লাহ তাআলা কেবল মুত্তাকীদের কোরবানিই কবুল করে থাকেন。

আবদুল্লাহ ইবনে আমরা রাযি. বলেন, আল্লাহর কসম! তাদের দুজনের মধ্যে নিহত লোকটিই অধিক শক্তিশালী ছিল। কিন্তু নির্দোষ থাকার প্রবণতা তাকে হত্যাকারীর প্রতি হাত বাড়ানো থেকে বিরত রাখে।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হাবিল ও কাবিলের কোরবানি

📄 হাবিল ও কাবিলের কোরবানি


হাবিল ও কাবিলের কোরবানি

আবু জাফর আল-বাকির রহ. বলেন, আদম আ. তাঁর দুই পুত্র হাবীল ও কাবীলের কোরবানি করা এবং হাবীলের কোরবানি কবুল হওয়া ও কাবীলের কোরবানি কবুল না হওয়ার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তখন কাবীল বলল, ওর জন্য আপনি দোয়া করেছিলেন। তাই ওর কোরবানি কবুল হয়েছে; আর আমার জন্য আপনি দোয়া করেন নি।

কিছুদিন পর এক রাতে হাবীল পশুপাল নিয়ে বাড়ি ফিরতে বিলম্ব করেন। ফলে আদম আ. তার ভাই কাবীলকে বললেন, দেখ তো ওর আসতে এতো দেরি হচ্ছে কেন? কাবীল গিয়ে হাবীলকে চারণভূমিতে দেখতে পেয়ে তাকে বলল, তোমার কোরবানি কবুল হলো আর আমারটা হলো না!! হাবীল বলল, আল্লাহ কেবল মুত্তাকীদের কোরবানিই কবুল করে থাকেন।

এ কথা শুনে কাবীল চটে গেল। সঙ্গে থাকা লোহার একটা টুকরা দিয়ে হাবীলকে আঘাত করে হত্যা করে ফেলল। কেউ কেউ বলেন, কাবীল ঘুমন্ত অবস্থায় হাবীলকে একটি পাথরখণ্ড নিক্ষেপ করে তাঁর মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। কেউ কেউ বলেন, কাবীল সজোরে হাবীলের গলা টিপে ধরে এবং হিংস্র পশুর মতো তাঁকে কামড় দেয়, ফলে তিনি মারা যান। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

لَئِنْ بَسَطْتَ إِلَيَّ يَدَكَ لِتَقْتُلَنِي مَا أَنَا بِبَاسِطٍ يَدِيَ إِلَيْكَ لِأَقْتُلَكَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ رَبَّ الْعَالَمِينَ (২৮)

"আমাকে খুন করার জন্য তুমি আমার প্রতি হাত বাড়ালেও তোমাকে খুন করার জন্য আমি হাত বাড়াবার নই। (সূরা মায়েদা: ২৮)

কাবীলের হত্যার হুমকির জবাবে হাবীলের এ বক্তব্য তাঁর উত্তম চরিত্র, খোদাভীতি এবং ভাই তাঁর ক্ষতিসাধন করার যে সংকল্প ব্যক্ত করেছিল, তার প্রতিশোধ নেওয়া থেকে তাঁর বিরত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়।

এ প্রসঙ্গে বোখারি ও মুসলিমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: তরবারি উঁচিয়ে দুজন মুসলমান মুখোমুখি হলে হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি দুজনই জাহান্নামে যাবে। এ কথা শুনে সাহাবাগণ বললেন- আল্লাহর রাসূল! হত্যাকারী জাহান্নামে যাওয়ার কারণটা তো বুঝলাম, নিহত ব্যক্তি জাহান্নামে যাবে কেন? উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: কারণ, সেও তার সঙ্গীকে হত্যার জন্য লালায়িত ছিল।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে: إِنِّي أُرِيدُ أَنْ تَبُوءَ بِإِثْنِي وَإِثْمِكَ فَتَكُونَ مِنَ أَصْحَابِ النَّارِ وَذَلِكَ جَزَاءُ الظَّالِمِينَ (২৯)

আমি তোমার সাথে লড়াই করা পরিহার করতে চাই। যদিও আমি তোমার চেয়ে বেশি শক্তিশালী। কারণ, আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছি, তুমি আমার ও তোমার পাপের ভার বহন করবে। আমি এটাই চাই।

অর্থাৎ, পূর্ববর্তী পাপসমূহের সঙ্গে আমাকে হত্যা করার পাপের বোঝাও তুমি বহন করবে, আমি এটাই চাই।

মুজাহিদ, সুদ্দী ও ইবনে জারির রহ. প্রমুখ আলোচ্য আয়াতের এ অর্থ করেছেন। এ আয়াতের উদ্দেশ্য এটা নয়, নিছক হত্যার কারণে নিহত ব্যক্তির যাবতীয় পাপ হত্যাকারীর ঘাড়ে গিয়ে চাপে; যেমনটি কেউ কেউ ধারণা করে থাকেন। কেননা ইবনে জারির এ মতের বিপরীত মতকে সর্বসম্মত মত বলে বর্ণনা করেছেন।

কেউ কেউ এ মর্মে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: হত্যাকারী নিহত ব্যক্তির যিম্মায় কোনো পাপ অবশিষ্ট রাখে না। কিন্তু এর কোনো ভিত্তি নেই এবং হাদিসের কোনো কিতাবে সহি হাসান বা যয়িফ-দুর্বল কোনো সনদে এর প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে কারো কারো বেলায় কেয়ামতের দিন দেখা যাবে, নিহত ব্যক্তি হত্যাকারীর কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করবে। কিন্তু হত্যাকারীর নেকআমলসমূহ তা পূরণ করতে পারবে না। ফলে নিহত ব্যক্তির পাপকর্ম হত্যাকারীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হবে। যেমনটি সর্বপ্রকার অত্যাচার-অবিচারের ব্যাপারে সহি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আর হত্যা হলো, সব যুলুমের বড় যুলুম। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। সকল প্রশংসা আল্লাহর।

ইমাম আহমদ, আবু দাউদ ও তিরমিযি রহ. হযরত সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি উসমান ইবনে আফফান রাযি.-এর গোলযোগের সময় বলেছিলেন: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "অদূর ভবিষ্যতে এমন একটি গোলযোগ হবে, সে সময়ে বসে থাকা ব্যক্তি দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির চেয়ে, দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি চলন্ত ব্যক্তির চেয়ে এবং চলন্ত ব্যক্তি ধাবমান ব্যক্তির চেয়ে উত্তম হবে।” এ কথা শুনে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযি. বললেন, আচ্ছা! কেউ যদি আমার ঘরে প্রবেশ করে আমাকে হত্যা করার জন্য হাত বাড়ায়, তখন আমি কী করব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "তখন তুমি আদমের পুত্রের মতো হয়ো।"

হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান রাযি. থেকে ইবনে মারদুহ মারফু সূত্রে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তখন তুমি আদমের দুই পুত্রের উত্তমজনের মতো হয়ো।"

আহমদ রহ. বর্ণনা করেন, ইবনে মাসউদ রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "অন্যায়ভাবে যে ব্যক্তিই নিহত হয়, তার খুনের একটি দায় আদমের প্রথম পুত্রের ওপর বর্তায়। কারণ, সে-ই সর্বপ্রথম হত্যাকর্মের প্রচলন করে।"

তদ্রুপ আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রাযি. ও ইবরাহিম নাখয়ি রহ. থেকে বর্ণিত আছে। দামেশকের উত্তর সীমান্তে কাসিয়ুন পাহাড়ের কাছে একটি বধ্যভূমি আছে বলে জনশ্রুতি আছে। এ স্থানটিকে মাগারাতুদ দাম বলা হয়ে থাকে। কেননা সেখানেই কাবীল তার ভাই হাবীলকে খুন করেছিল বলে কথিত আছে। তথ্যটি আহলে কিতাবদের থেকে সংগৃহীত। তাই এর যথার্থতা সম্পর্কে আল্লাহই ভালো জানেন।

হাফেজ ইবনে আসাকির রহ. তাঁর গ্রন্থে আহমদ ইবনে কাসির রহ.-এর জীবনী প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন, তিনি একজন পুণ্যবান লোক ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত আবু বকর, ওমর রাযি. ও হাবীলকে স্বপ্ন দেখেন। তিনি হাবীলকে কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, এখানেই তাঁর রক্তপাত করা হয়েছে কি না? তিনি শপথ করে তা স্বীকার করেন এবং বলেন- তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, তিনি যেন এ স্থানটিকে সকল দোয়া কবুল হওয়ার স্থান করে দেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর দোয়া কবুল করেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে তাঁকে সমর্থন দান করে বলেন, আবু বকর ও ওমর রাযি. প্রতি বৃহস্পতিবার এ স্থানটি যিয়ারত করতেন।

আমাদের কথা হলো, এটি একটি স্বপ্ন মাত্র। ঘটনাটি সত্যি সত্যি আহমদ ইবনে কাসির-এর হলেও এর ওপর শরয়ি বিধান কার্যকর হবে না। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

فَبَعَثَ اللَّهُ غُرَابًا يَبْحَثُ فِي الْأَرْضِ لِيُرِيَهُ كَيْفَ يُوَارِي سَوْءَةَ أَخِيهِ قَالَ يَا وَيْلَتَا أَعَجَزْتُ أَنْ أَكُونَ مِثْلَ هَذَا الْغُرَابِ فَأُوَارِيَ سَوْءَةَ أَخِي فَأَصْبَحَ مِنَ النَّادِمِينَ (৩১) "তারপর আল্লাহ এক কাক পাঠালেন, যে তার ভাইয়ের শবদেহ কীভাবে গোপন করা যায়, তা দেখানোর জন্য মাটি খনন করতে লাগল। সে বলল, হায়! আমি কি এ কাকের মতোও হতে পারলাম না, যাতে আমার ভাইয়ের লাশ গোপন করতে পারি। (সূরা মায়েদা : ৩১) তারপর সে অনুতপ্ত হলো।

কেউ কেউ উল্লেখ করেন, কাবীল হাবীলকে হত্যা করে এক বছর পর্যন্ত মতান্তরে একশ বছর পর্যন্ত তাকে নিজের পিঠে করে ঘুরে বেড়ায়। এরপর আল্লাহ তাআলা দুটি কাক প্রেরণ করেন।

সুদ্দী রহ. সনদসহ কয়েকজন সাহাবীর বরাতে বর্ণনা করেন: দুই ভাই (ভাই সম্পর্কীয় দুটি কাক) পরস্পর ঝগড়া করে একজন অপরজনকে হত্যা করে ফেলে। তারপর মাটি খুঁড়ে তাকে দাফন করে রাখে। কাবীল এ দৃশ্য দেখে বলে - يَا وَيْلَنَا أَعْجَزْتُ এরপর সে কাকের ন্যায় হাবীলকে দাফন করে।

ইতিহাস ও সীরাত বিশারদগণ বলেন, আদম আ. তাঁর পুত্র হাবীলের জন্য অত্যন্ত শোকাহত হয়ে পড়েন এবং এ বিষয়ে কয়েকটি পঙক্তি আবৃত্তি করেন। ইবনে জারির রহ. ইবনে হুমায়দ থেকে তা উল্লেখ করেন। যথা- تَغَيَّرَتِ الْبِلَادُ وَمَنْ عَلَيْهَا . فَوَجْهُ الْأَرْضِ مُغْبَرٌّ قُبْحٌ تَغَيَّرَ كُلٌّ ذِي لَوْنٍ وَطَعْمٍ ، وَقَلَّ بَشَاشَةُ الْوَجْهِ الْمَلِيحِ

"জনপদ ও জনগণ সব উলট-পালট হয়ে গেছে। পৃথিবীর চেহারা এখন ধূলি-ধূসর ও মলিনরূপ ধারণ করেছে। কোনো কিছুরই রং-রূপ স্বাদ-গন্ধ এখন আর আগের মতো নেই। লাবণ্যময় চেহারার ঔজ্জ্বল্যও আগের চেয়ে কমে গেছে।" এরপর আদম আ.-এর উদ্দেশ্যে বলা হয়-

أَبَا هُبَيْلٍ قَدْ قُتِلَا جَمِيعًا ، وَصَارَ إِلَى كَالْمَيِّتِ الذَّبْحِ وَجَاءَ بِشَرَّة قَدْ كَانَ مِنْهَا . عَلَى خَوْفٍ فَجَمَاء بِهَا يَصِيحُ .

"হে হাবীলের পিতা! ওরা দুজনই নিহত হয়েছে। আর বেঁচে থাকা লোকটিও জবাইকৃত মৃতের মতো হয়ে গেছে। সে এমন একটি অপকর্ম করল, ফলে সে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে আর্তনাদ করতে করতে ছুটতে লাগল।"

এ পঙক্তিগুলোও সন্দেহমুক্ত নয়। হতে পারে আদম আ. পুত্রশোকে নিজের ভাষায় কোনো কথা বলেছিলেন। পরবর্তীকালে কেউ তা এভাবে ছন্দরূপ দেয়। এ ব্যাপারে বেশ মতভেদ রয়েছে। আল্লাহ পাকই ভালো জানেন।

মুজাহিদ রহ. উল্লেখ করেন, কাবীল যে-দিন তার ভাইকে হত্যা করেছিল সেদিনই নগদ নগদ তাকে এর শাস্তি প্রদান করা হয়। মাতা-পিতার অবাধ্যতা, ভাইয়ের প্রতি হিংসা এবং পাপের শাস্তিস্বরূপ তার পায়ের গোছাকে উরুর সাথে ঝুলিয়ে এবং মুখমণ্ডলকে সূর্যমুখী করে রাখা হয়েছিল। হাদিসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: "পরকালের জন্য শাস্তি সঞ্চিত রাখার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তাআলা তাকে নগদ শাস্তি প্রদান করেন। শাসকের বিরুদ্ধাচরণ ও আতীীয়তা ছিন্ন করার মতো এমন জঘন্য অপরাধ আর নেই।"

আহলে কিতাবদের হাতে রক্ষিত তাওরাতে রয়েছে, আল্লাহ তাআলা কাবীলকে অবকাশ দিয়েছেন। সে এডেনের পূর্ব দিকে অবস্থিত নূদ অঞ্চলের কিন্নীন নামক স্থানে কিছুকাল বসবাস করেছিল। খানুখ নামে তার একটি সন্তানও জন্ম হয়েছিল। তারপর খানুখের ঔরসে উনদুর, উনদুরের ঔরসে মাহওয়াবিল, মাহওয়াবিলের ঔরসে মুতাওয়াশিল এবং মুতাওয়াশিলের ঔরসে লামাকের জন্ম হয়। এই লামাক দুই মহিলাকে বিবাহ করে। একজন হল আদা অপরজন সালা। আদা ইবিল নামের এক সন্তান প্রসব করে। এ ইবিলই প্রথম ব্যক্তি, যে গম্বুজাকৃতির তাবুতে বসবাস করে এবং সম্পদ আহরণ করে। আদার গর্ভে নওবিল নামের আরেকটি সন্তান জন্ম হয়। যে সর্বপ্রথম বাদ্যযন্ত্র ও করতাল ব্যবহার করে।

অপরদিকে 'সালা' তুবলাকিন নামের একটা সন্তান প্রসব করেন। তুবলাকিনই প্রথম তামা ও লোহা ব্যবহার করেন। সালা একটি কন্যা সন্তানও প্রসব করেন। তার নাম ছিল নামা।

কথিত তাওরাতে আরো আছে, আদম আ. একবার স্ত্রী সহবাস করলে তাঁর একটি পুত্র সন্তান জন্ম লাভ করে। স্ত্রী তার নাম 'শীষ' রেখে বললেন, কাবীল কর্তৃক নিহত হাবীলের পরিবর্তে আমাকে এ সন্তান দান করা হয়েছে। তাই তার এ নাম রাখা হলো। শীষের ঔরসে 'আনুশ'-এর জন্ম হয়।

কথিত আছে, শীষের যেদিন জন্ম হয় সেদিন আদম আ.-এর বয়স ছিল একশ ত্রিশ বছর। এরপর তিনি আরো আট শ' বছর বেঁচেছিলেন। আনুশের জন্মের দিন 'শীষ'-এর বয়স ছিল একশ পঁয়ষট্টি বছর। 'আনুশ' ছাড়া তাঁর আরো কয়েকজন ছেলে-মেয়ে ভূমিষ্ঠ হয়। আনুশের বয়স যখন নব্বই বছর, তখন তার পুত্র 'কীনান'-এর জন্ম হয়। তারপর যখন কীনানের বয়স সত্তর বছরে উপনীত হয়, তখন তাঁর ঔরসে 'মাহলাইল'-এর জন্ম হয়। তারপর মাহলাইল পঁয়ষট্টি বছর বয়সে উপনীত হলে তার পুত্র 'ইয়ারদ'-এর জন্ম হয়। তারপর 'ইয়ারদ' একশ বাষট্টি বছর বয়সে পৌঁছলে তাঁর পুত্র 'খানুখে'র জন্ম হয়। তারপর খানুখের বয়স পঁয়ষট্টি বছর হলে তার পুত্র মুতাওয়াশালিহ এর জন্ম হয়। তারপর যখন মুতাওয়াশালিহ একশ সাতাশি বছর বয়সে উপনীত হন, তখন তাঁর পুত্র 'লামাক' এর জন্ম হয়। লামাক এর বয়স একশ' বিরাশি বছর হলে তার ঔরসে নূহ আ.-এর জন্ম হয়।

এরপর আদম আ. আরো পাঁচ শ' পঁচানব্বই বছর বেঁচে থাকেন। এ সময়ে তাঁর আরো কয়েকজন ছেলে-মেয়ে জন্ম হয়। তারপর নূহ আ.-এর বয়স পাঁচশ বছর হলে তাঁর ঔরসে সাম, হাম ও ইয়াফিছ'-এর জন্ম হয়। এ হলো আহলে কিতাবদের গ্রন্থের বর্ণনা। উক্ত ঘটনাপঞ্জি আসমানি কিতাবের বর্ণনা কি-না, এ ব্যাপারে সন্দেহ আছে। বহু আলেম এ ব্যাপারে আহলে কিতাবদের বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন।

উল্লেখ্য, এ বর্ণনায় অবিবেচনাপ্রসূত অতিকথন রয়েছে। অনেকে এ বর্ণনাটির ব্যাখ্যাস্বরূপ অনেক সংযোজন করেছেন এবং তাতে যথেষ্ট ভুলও রয়েছে। যথাস্থানে বিষয়টি আলোচনা হবে ইনশাআল্লাহ।

ইমাম আবু জাফর তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে কতিপয় আহলে কিতাবের বরাতে উল্লেখ করেছেন, আদম আ.-এর ঔরসে হাওয়া আ.-এর বিশ গর্ভে চল্লিশজন সন্তান প্রসব করেন। ইবনে ইসহাক এ বক্তব্য দিয়ে তাদের নামও উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ। কেউ কেউ বলেন, হাওয়া আ. প্রতি গর্ভে একটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তান করে একশ' বিশ জোড়া সন্তান জন্ম দেন। এদের সর্বপ্রথম হলো, কাবীল ও তার বোন কালিমা আর সর্বশেষ হল আবদুল মুগিছ ও তাঁর বোন উম্মুল মুগিছ। এরপর মানুষ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। সংখ্যায় তারা অনেক হয়ে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে বিস্তার লাভ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً

"হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন। আর যিনি তার থেকে তার সঙ্গিনীকেও সৃষ্টি করেছেন। এবং যিনি তাদের দুজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন।" (সূরা নিসা: ১)

ঐতিহাসিকগণ বলেন, আদম আ. তাঁর ঔরসজাত সন্তান এবং তাদের সন্তানদের সংখ্যা চার লাখে উপনীত হওয়ার পর ইনতেকাল করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:

هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا فَلَمَّا تَغَشَّاهَا حَمَلَتْ حَمْلًا خَفِيفًا فَمَرَّتْ بِهِ فَلَمَّا أَثْقَلَتْ دَعَوَا اللَّهَ رَبَّهُمَا لَئِنْ آتَيْتَنَا صَالِحًا لَنَكُونَنَّ مِنَ الشَّاكِرِينَ (۱۸۹) فَلَمَّا آتَاهُمَا صَالِحًا جَعَلَا لَهُ شُرَكَاءَ فِيمَا آتَاهُمَا فَتَعَالَى اللَّهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ

"তিনিই তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে সে তার কাছে শান্তি পায়। তারপর যখন সে তার সঙ্গে মিলিত হয়, তখন সে এক লঘু গর্ভধারণ করে এবং তা নিয়ে সে অনায়াসে চলাফেরা করে; গর্ভ যখন গুরুভার হয় তখন তারা উভয়ে তাদের প্রতিপালক আল্লাহর কাছে দোয়া করেন- যদি তুমি আমাদেরকে এক পূর্ণাঙ্গ সন্তান দাও, তবে তো আমরা কৃতজ্ঞ থাকব। তারপর যখন তিনি তাদেরকে এক পূর্ণাঙ্গ সন্তান দান করেন, তখন তারা তাদেরকে যা দান করা হয়, সে সম্বন্ধে আল্লাহর শরিক করে; কিন্তু তারা যাকে শরিক করে আল্লাহ তা অপেক্ষা অনেক ঊর্ধ্বে।"

এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম আদম আ.-এর কথা উল্লেখ করে পরে ভ্রূণ তথা মানবজাতির আলোচনা করেছেন। এর দ্বারা হযরত আদম ও হাওয়া আ.কে বুঝানো হয় নি। বরং ব্যক্তি উল্লেখের দ্বারা মানব জাতিকে বুঝানো উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ سُلَالَةٍ مِنْ طِينٍ (১২) ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَكِينٍ (১৩) "আমি মানুষকে মৃত্তিকার উপাদান থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর আমি তাকে শুক্র বিন্দুরূপে স্থাপন করি এক নিরাপদ আধারে। (সূরা ত্বহা: ১২-১৩)

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَقَدْ زَيَّنَّا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِمَصَابِيحَ وَجَعَلْنَاهَا رُجُومًا لِلشَّيَاطِينِ "আমি নিকটবর্তী আকাশকে সুশোভিত করেছি প্রদীপমালা দ্বারা এবং তাদেরকে করেছি শয়তানের প্রতি নিক্ষেপের উপকরণ।" (সূরা মুল্ক: ৫)

এটা জানা কথা, এখানে শয়তানের প্রতি নিক্ষেপের উপকরণ সত্যি সত্যি আকাশের নক্ষত্ররাজি নয়। বরং আয়াতে নক্ষত্র শব্দ উল্লেখ করে নক্ষত্র শ্রেণী বুঝানো হয়েছে।

• ইমাম আহমদ রহ. বলেন, এক হাদিসে আছে- হাওয়া আ.-এর সন্তান জন্মগ্রহণ করে বাঁচতো না। একবার তাঁর একটি সন্তান জন্ম হলে ইবলিস তাঁর কাছে গমন করে বলল, তুমি এর নাম আবদুল হারিস রেখে দাও, তবে সে বাঁচবে। হাওয়া তার নাম আবদুল হারিস রেখে দিলে সে বেঁচে যায়।

আমাদের কথা হলো, আল্লাহ তাআলা আদম ও হাওয়া আ. কে সৃষ্টি করেছেন, তারা মানবজাতির উৎসমূল হবেন। তাঁদের থেকে তিনি বহু নর-নারী বিস্তার করবেন। সুতরাং উপরিউক্ত হাদিসে যা উল্লেখ করা হয়েছে, যদি তা যথার্থ হয়ে থাকে, তা হলে হাওয়া আ.-এর সন্তান না বাঁচার কী যুক্তি থাকতে পারে? তাই হাদিসটি মারফু আখ্যা দেওয়া ভুল। মওকুফ হওয়াই যথার্থ। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর।

ফন্ট সাইজ
15px
17px