📄 নবীদরে নিষ্পাপ হওয়ার অর্থ
নবীদের নিষ্পাপ হওয়ার অর্থ
বিশ্বজগতের স্রষ্টা দয়াময় আল্লাহ মানুষকে পরস্পর বিরোধী শক্তিসমূহ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তাকে পাপ ও পূণ্য উভয় প্রকারের শক্তি প্রদান করেছেন। সে পাপও করতে পারে, পুণ্যও করতে পারে। তার মধ্যে মন্দ কাজের ইচ্ছাশক্তি আছে, ভালো কাজের ইচ্ছাশক্তিও আছে। এটাই তার মানবসূলভ মর্যাদার পার্থক্যের প্রতীক।
এই বিপরীতমুখী শক্তিসমূহের বাহক মানুষের মধ্য হতেই আল্লাহ তাআলা মানুষের হেদায়াত- সৎপথ প্রদর্শন এবং আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছানোর উপায় প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে কোনো কোনো সময় কোনো মানুষকে নির্বাচিত করে তাঁকে নিজের রাসূল, নবী ও পয়গম্বর মনোনীত করেন। এরূপ ব্যক্তিত্বকে যখন আল্লাহ তাআলা নুবয়তের জন্য নির্বাচিত করে নেন, তখন তাঁর জন্য সর্বপ্রকার পাপকাজ নাফরমানি থেকে পবিত্র ও নিষ্কলুষ থাকা কর্তব্য হয়ে যায়। যাতে তিনি আল্লাহ তাআলার পয়গাম পৌঁছানোর ও প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব সুষ্ঠু ও বিশুদ্ধভাবে পালন করতে পারেন। সঙ্গে সঙ্গে
او خویشتن گمراه است کرار هبری کند
"যে নিজেই পথভ্রষ্ট, অপরকে কেমন করে পথ দেখাবে?" এ প্রবাদ বাক্যের প্রয়োগক্ষেত্র না হন।
নবীগণ আর দশজন মানুষের মতোই পানাহার করেন। ঘুমান। পরিবার ও সন্তান-সন্ততির সঙ্গে বসবাস করেন। তাঁরা সর্বপ্রকার ইচ্ছা-কর্ম সংক্রান্ত পাপ হতে পবিত্র থাকেন। তাঁরা নেককাজের প্রতি হেদায়াত ও নসিহতকারী এবং আল্লাহ তাআলার প্রতিনিধি। যদিও তাঁরা অন্যান্য মানুষের মতো বিপরীতমুখী শক্তিসমূহের অধিকারী; কিন্তু কাজে ও ইচ্ছায় তাদের দ্বারা সর্বপ্রকার মন্দকাজ সংঘটিত হওয়া অসম্ভব করে দেওয়া হয়েছে। যাতে তাঁদের প্রতিটি কাজ বিশ্ববাসীর জন্য আদর্শ ও নমুনাস্বরূপ হতে পারে। অবশ্য মানুষ হওয়ার কারণে ভুল-ভ্রান্তি ও ত্রুটি-বিচ্যুতির সম্ভাবনা (অবশিষ্ট) থাকে এবং কদাচিৎ কাজেও পরিণত হয়ে থাকে। কিন্তু তৎক্ষণাৎ তাঁদের সতর্ক করে দেওয়া হয়। তাঁরা সাবধানতা অবলম্বন করে, তা হতে দূরে সরে যান।
আল্লাহ পাকের দরবারে সান্নিধ্যপ্রাপ্ত একজন মহামানব আল্লাহ পাকের মর্জি বুঝার ব্যাপারে এই ত্রুটি-বিচ্যুতির সম্মুখীন হবেন কেন? এ জন্য আল্লাহ তাআলার নীতি হলো, তিনি নবী ও রাসূলগণের এ জাতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতির ওপর যখন তাদের সতর্ক করেন, তখন প্রথমে অতি কঠোরভাবে এবং অপরাধীর আকারে সেই ত্রুটি-বিচ্যুতির উল্লেখ করেন। সেই সঙ্গে অন্য কোনো ক্ষেত্রে বিষয়টির স্বরূপ বর্ণনা করে দিয়ে নবী ও রাসূলের অনুরূপ কাজকে ত্রুটি-বিচ্যুতির সীমার ভিতরে নিয়ে আসেন। তাদের পক্ষ হতে নিজে ওযর পেশ করে দেন। যাতে মুশরিক ও মুনাফিকরা নবী ও রাসুলগণের প্রতি কোনো বিষয়ে দোষারোপ করতে সাহস না পায়। এই তত্ত্বসমষ্টির নামই 'নবীদের নিষ্পাপতা'। এবং এটি ইসলামী আকিদাসমূহের মধ্যে একটি মৌলিক আকিদা।
আম্বিয়ায়ে কেরামের নিষ্পাপতা সম্পর্কিত উপরোক্ত তত্ত্ব জানার পর এবার হযরত আদম আ. এর ঘটনাটি দেখুন এবং চিন্তা করুন। কোরআন মাজিদের সূরা বাকারার মধ্যে যখন এ ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে, তখন পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, এই ভুল পাপজনিত ছিল না; অবাধ্যতামূলকও ছিল না বরং তা অতি সাধারণ ধরনের বিচ্যুতি ছিল। "শয়তান তাঁদের উভয়ের দ্বারা ত্রুটি করিয়ে দিল। আর একটি চিরন্তন সত্য হলো حَسَنَاتُ الْأَبْرَارِ سَيِّئَاتُ الْمُقَرَّبِينَ "সৎকর্মশীলদের পুণ্যকর্মও নিকটতম প্রিয়জনদের পক্ষে কখনো অপরাধ বলে বিবেচিত হয়।"
এরপর সূরা আরাফে এবং সূরা ত্বহার দু জায়গায় এই ঘটনাটিকে উদ্ধৃত করে ওয়াসওয়াসা শব্দ দ্বারা বর্ণনা করেছেন: فَأَزَلَّهُمَا الشَّيْطَانُ "শয়তান তাঁদের ফুসলিয়ে পদস্থলিত করল।"
আর সূরা ত্বহার তৃতীয় স্থানে ত্রুটি ও ফুসলানোর কারণ নিজেই ব্যক্ত করে হযরত আদমকে সর্বপ্রকারের ইচ্ছা-কর্ম সংক্রান্ত গুনাহ থেকে পবিত্র বলে প্রকাশ করেছেন এবং তাঁর নিষ্পাপতার বিষয়টিকে অত্যন্ত সুদৃঢ় ও মজবুত করে দিয়েছেন- وَلَقَدْ عَهِدْنَا إِلَى آدَمَ مِنْ قَبْلُ فَنَسِيَ وَلَمْ نَجِدْ لَهُ عَزْمًا "আর নিঃসন্দেহে, আমি আদম হতে একটি অঙ্গীকার নিয়েছিলাম। এরপর সে তা ভুলে গেল। আর আমি তাকে দৃঢ়তার মধ্যে পাই নি (আমি তাকে অঙ্গীকার পূরণ না করার ব্যাপারে তাঁর ইচ্ছা ও বাসনার অধিকারী দেখতে পাই নি)। (সূরা ত্বহা: ১১৫)
এ আয়াতগুলো থেকে পরিষ্কার বুঝা যায়, হযরত আদম আ. কোনো প্রকার গুনাহ করেন নি। যতটুকু ব্যাপার ঘটেছে, তাতেও তাঁর ইচ্ছাকৃত আদেশ লঙ্ঘনের কোনো দখল নেই বরং সেটা শুধু শয়তানের কুমন্ত্রণায় সংঘটিত ভুলক্রমে বিচ্যুতি ছিল।
• ইমাম বোখারি রহ. বর্ণনা করেন, আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "হযরত মূসা আ. ও হযরত আদম আ.-এর মধ্যে পরস্পর কথোপকথন হয়েছে। হযরত মূসা আ. তাঁকে বললেন, আপনিই তো মানুষকে আপনার অপরাধ দ্বারা জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছেন এবং তাদেরকে দুর্বিপাকে ফেলেছেন!" আদম আ. বললেন, হে মূসা! আল্লাহ তাআলা তাঁর রিসালাত কালাম দিয়ে আপনাকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন। আপনি কি আমাকে এমন একটি কাজের জন্য তিরস্কার করছেন, যা আমাকে সৃষ্টি করার আগেই আল্লাহ আমার নামে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এতে আদম আ. মূসা আ.-এর ওপর বিজয়ী হন。
কোরআনের আয়াতসমূহ থেকে প্রমাণিত হয়েছে, হযরত আদম আ. নবী ছিলেন। আল্লাহ পাকের খাঁটি বন্ধু, মনোনীত বান্দা ও আল্লাহ পাকের প্রতিনিধিরূপে মহান মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তিনি আল্লাহর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত একজন মহামানব ছিলেন। যাকে আল্লাহ পাক নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, নিজ রূহ তাঁর মধ্যে সঞ্চার করেছেন এবং যিনি আল্লাহ পাকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন। সুতরাং এই ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং ভুলও তাঁর মর্যাদার বিচারে অত্যন্ত হীন ও অসঙ্গত।
📄 পৃথিবীতে আদম আ.-এর আগমন
পৃথিবীতে আদম আ.-এর আগমন
ইবলিসের ধোঁকায় পড়ে হযরত আদম ও হাওয়া আ. নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করার পর আল্লাহ তাআলা তাদের স্মরণ করিয়ে দেন, "আমি কি তোমাদের বলি নি, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু!"
তারপর তাঁরা আল্লাহ তাআলার কাছে অত্যন্ত বিনয়াবনত হয়ে ক্ষমা ও দয়ার প্রার্থনা করলেন। সুতরাং আল্লাহ তাআলা হযরত আদম ও হাওয়া আ. এবং ইবলিসকে সম্বোধন করে বলেন:
قُلْنَا اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَمَتَاعٌ إِلَى حِينٍ "তোমরা নেমে যাও! তোমরা একে অপরের শত্রু এবং পৃথিবীতে তোমাদের কিছুকাল বসবাস ও জীবিকা রয়েছে।" (সূরা বাকারা: ২৪)
কারো কারো মতে তাঁদের সঙ্গে সাপের প্রতিও এ আদেশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। সীমালঙ্ঘন করার অপরাধে তাদেরকে জান্নাত থেকে নেমে যাওয়ার এ আদেশ দেওয়া হয়।
আদম ও হাওয়া আ.-এর সঙ্গে সাপের উল্লেখের স্বপক্ষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর একটি হাদিস পেশ করা হয়ে থাকে। তা হলো- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাপ হত্যার আদেশ দিয়ে বলেন, "যেদিন এগুলোর সঙ্গে আমরা লড়াই শুরু করেছি, সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত এগুলোর সঙ্গে আর আমরা সন্ধি করি নি।"
সূরা ত্বহায় আল্লাহ তাআলা বলেন:
قَالَ اهْبِطَا مِنْهَا جَمِيعًا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ "তোমরা দুজনে একই সঙ্গে জান্নাত থেকে নেমে যাও! তোমরা পরস্পর পরস্পরের শত্রু।" (সূরা ত্বহা: ১২৩) এই আদেশ হল আদম আ. ও ইবলিসের প্রতি। আর হাওয়া আ. হযরত আদম আ.-এর এবং সাপ ইবলিসের অনুগামী হিসাবে এ আদেশের আওতাভুক্ত। কেউ কেউ বলেন, এখানে দ্বিবচন শব্দ দ্বারা একত্রে সকলকেই আদেশ করা হয়েছে।
হাফেজ ইবনে আসাকির রহ. মুজাহিদ রহ. থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা হযরত আদম ও হাওয়া আ. কে তাঁর নৈকট্য থেকে বের করে দেওয়ার জন্য দুজন ফেরেশতাকে আদেশ দেন। ফলে জিবরাইল আ. তাঁর মাথা থেকে মুকুট উঠিয়ে নেন। মিকাইল আ.ও তাঁর কপাল থেকে মুকুট খুলে ফেলেন। আর তাঁকে একটি বৃক্ষ শাখা জড়িয়ে ধরে। তখন আদম আ. ধারণা করলেন, এটা তাঁর তাৎক্ষণিক শাস্তি। তাই তিনি মাথা নিচু করে বলতে লাগলেন- ক্ষমা চাই! ক্ষমা চাই! তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, তুমি কি আমার কাছ থেকে পালাচ্ছ? আদম আ. বললেন: না, বরং আপনার লজ্জায় এমনটি করছি, হে আমার রব।
আওযায়ি রহ. হাসসান ইবনে আতিয়া রহ. এর সূত্রে বর্ণনা করেন। আদম আ. জান্নাতে একশ বছরকাল অবস্থান করেন। অন্য এক বর্ণনায় ষাট বছরের উল্লেখ রয়েছে। তিনি জান্নাত হারানোর দুঃখে সত্তর বছর, অন্যায়ের অনুতাপে সত্তর বছর এবং নিহত পুত্রের শোকে চল্লিশ বছর কাঁদেন। ইবনে আসাকির রহ. এটি বর্ণনা করেন।
ইবনে আবু হাতিম রহ. বর্ণনা করেন, ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন: আদম আ. কে মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী দাহনা নামক স্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়।
হাসান রহ. বলেন: আদম আ. কে ভারতে, হাওয়া আ. কে জিদ্দায় এবং ইবলিসকে বসরা থেকে মাইল কয়েক দূরে দস্তমিসান নামক স্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়। আর সাপকে নামানো হয় ইস্পাহানে।
সুদ্দী রহ. বলেন, আদম আ. ভারতে অবতরণ করেন। আসার সময় তিনি হাজরে আসওয়াদ ও জান্নাতের একমুঠো পাতা নিয়ে আসেন এবং এ পাতাগুলো ভারতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেন। ফলে সে দেশে সুগন্ধি গাছ উৎপন্ন হয়।
ইবনে ওমর রাযি. বলেন, আদম আ. কে সাফায় এবং হাওয়া আ.-কে মারওয়ায় নামিয়ে দেওয়া হয়। ইবনে আবু হাতিম এ তথ্যটিও বর্ণনা করেছেন।
আবদুর রাযযাক রহ. আবু মুসা আশআরী রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন: আল্লাহ তাআলা আদম আ. কে জান্নাত থেকে পৃথিবীতে নামিয়ে দেওয়ার সময় যাবতীয় বস্তুর প্রস্তুতপ্রণালী শিখিয়ে দেন। এবং জান্নাতের ফল-ফলাদি থেকে তার খাবারের ব্যবস্থা করে দেন। সুতরাং তোমাদের এ ফল-মূল জান্নাতের ফল-মূল থেকেই এসেছে। পার্থক্য শুধু এতটুকু, এগুলো নষ্ট হয় আর ওগুলো মোটেও নষ্ট হয় না।
হাকিম রহ. তাঁর মুসতাদরাকে বর্ণনা করেন, ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন: আদম আ. কে জান্নাতে শুধু আছর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময় থাকতে দেওয়া হয়েছিল। হাকিম রহ. বলেন: হাদিসটি বোখারি ও মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহি। তবে তাঁরা হাদিসটি বর্ণনা করেন নি।
সহি মুসলিমে বর্ণিত আছে। হযরত আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "দিবসসমূহের মধ্যে জুমার দিন হলো সর্বোত্তম। এ দিনে আদম আ.-কে সৃষ্টি করা হয়। এ দিনেই তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়। এ দিনেই তাঁকে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করা হয়।" সহি বোখারিতে অন্য এক সূত্রে বর্ণিত আছে, "এ দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।"
ইবনে আবু হাতিম রহ. বর্ণনা করেন, উবাই ইবনে কাব রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: আদম আ. বললেন, হে আমার রব! আমি যদি তাওবা করি ও ফিরে আসি, তা হলে আমি কি আবার জান্নাতে যেতে পারব? আল্লাহ তাআলা বললেন, নিশ্চয় পারবে।
ইবনে আবু নাজিহ রহ. মুজাহিদ রহ. থেকে বর্ণনা করেন। আল্লাহ তাআলার কাছে করা হযরত আদম আ.-এর দোয়াগুলো হলো-
اللَّهُمَّ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي إِنَّكَ خَيْرُ الْغَافِرِينَ.
اللَّهُمَّ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي إِنَّكَ خَيْرُ الرَّحِمِينَ.
اللَّهُمَّ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ .
"হে আল্লাহ! তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি তোমার পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা করি। হে আমার রব! নিশ্চয় আমি আমার নিজের ওপর যুলুম করেছি। তুমি আমাকে মাফ করে দাও! নিশ্চয় তুমি ক্ষমাকারীদের সর্বোত্তম। হে আল্লাহ! তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করি ও প্রশংসা করি। হে আমার রব! নিশ্চয় আমি নিজের প্রতি অবিচার করেছি। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও! নিশ্চয় তুমি সর্বোত্তম দয়ালু। হে আল্লাহ! তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করি ও প্রশংসা করি। হে আমার রব! আমি নিজের প্রতি অন্যায় করেছি। আমার প্রতি তুমি ক্ষমা পরবশ হও! নিশ্চয় তুমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
• ইমাম হাকেম রহ. বর্ণনা করেন, ইবনে আব্বাস রাযি. فَتَلَقَّى آدَمُ مِنْ رَبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ এর ব্যাখ্যায় বলেন- আদম আ. বললেন, হে আমার রব! আপনি কি আমাকে আপনার কুদরতি হাতে সৃষ্টি করেন নি? বলা হলো, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, আপনি কি আমার দেহে আপনার রূহ সঞ্চার করেন নি? বলা হলো, হ্যাঁ। তখন তিনি পুনরায় বললেন, আমি হাঁচি দিলে আপনি কি يرحমক আল্লাহ (আল্লাহ তোমাকে রহম করুন!) বলেন নি এবং আপনার রহমত কি আপনার গযবের উপর প্রবল নয়? বলা হলো, হ্যাঁ। পুনরায় তিনি বললেন, আপনি কি এ কথা নির্ধারণ করে রাখেন নি, আমি এ কাজ করব? বলা হলো, হ্যাঁ। এবার আদম আ. বললেন, আচ্ছা আমি যদি তাওবা করি, তা হলে আপনি পুনরায় আমাকে জান্নাতে ফিরিয়ে দেবেন কি? আল্লাহ তাআলা বললেন, হ্যাঁ। হাকিম বলেন: এর সনদ সহি; কিন্তু ইমাম বোখারি ও মুসলিম রহ. হাদিসটি বর্ণনা করেন নি।
• ইমাম হাকেম, বায়হাকি ও ইবনে আসাকির রহ. ওমর ইবনে খাত্তাব রাযি. থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : "আদম আ. যখন ভুল করে বসলেন, তখন বললেন- হে আমার রব! মুহাম্মদের উছিলা দিয়ে আমি আপনার দরবারে দোয়া করছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন! তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, তুমি মুহাম্মদকে চিনলে কী করে অথচ এখনও তাঁকে আমি সৃষ্টিই করি নি? আদম আ. বললেন, হে আমার রব! যখন আপনি আমাকে আপনার নিজ হাতে সৃষ্টি করলেন এবং আমার মধ্যে আপনার রূহ সঞ্চার করলেন, তখন আমি মাথা তুলে আরশের স্তম্ভসমূহে لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ লিখিত দেখতে পাই। আমি বুঝতে পারলাম, আপনার পবিত্র নামের সঙ্গে আপনি সৃষ্টির মধ্যে আপনার সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারো নাম যোগ করেন নি। তখন আল্লাহ তাআলা বললেন- তুমি যথার্থই বলেছ, হে আদম! নিশ্চয় তিনি সৃষ্টির মধ্যে আমার প্রিয়তম। তাঁর উসিলায় যখন তুমি আমার কাছে দোয়া করেছ, তখন আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। আর মুহাম্মদকে সৃষ্টি না করলে তোমাকে আমি সৃষ্টি করতাম না। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। কোরআন মাজিদে বর্ণিত আছে:
وَعَصَىٰ آدَمُ رَبَّهُ فَغَوَىٰ (১২১) ثُمَّ اجْتَبَاهُ رَبُّهُ فَتَابَ عَلَيْهِ وَهَدَى (১২২) "আদম তার প্রতিপালকের হুকুম অমান্য করল। ফলে সে ভ্রমে পতিত হলো। এরপর তার প্রতিপালক তাকে মনোনীত করলেন, তার প্রতি ক্ষমাপরায়ণ হলেন এবং তাকে পথ-নির্দেশ করলেন। (সূরা ত্বহা: ১২১-১২২)
📄 হযরত মূসা আ.-এর সঙ্গে কথোপকথন
হযরত মূসা আ.-এর সঙ্গে কথোপকথন
ইমাম বোখারি রহ. বর্ণনা করেন, আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: হযরত মূসা আ. হযরত আদম আ.-এর মধ্যে পরস্পরে কথোপকথন হয়। হযরত মূসা আ. তাঁকে বললেন, আপনিই তো মানুষকে আপনার অপরাধ দ্বারা জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছেন এবং তাদেরকে দুর্বিপাকে ফেলেছেন। আদম আ. বললেন, মূসা! আপনি তো সে ব্যক্তি, আল্লাহ তাআলা তাঁর রিসালাত ও কালাম দিয়ে আপনাকে বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছেন। আপনি কি আমাকে এমন একটি কাজের জন্য তিরস্কার করছেন, যা আমাকে সৃষ্টি করার আগেই আল্লাহ আমার নামে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এতে আদম আ. মূসা আ.-এর ওপর বিজয়ী হন। (মুসলিম, নাসায়ি ও আহমাদ)
ইমাম আহমাদ রহ. বর্ণনা করেন, আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: আদম আ. ও মূসা আ. আলোচনায় রত হন। মূসা আ. আদম আ. কে বললেন- আপনি তো সে আদম, আপনার ত্রুটি আপনাকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছে। উত্তরে আদম আ. তাকে বললেন- আর আপনি তো সেই মূসা, যাকে আল্লাহ তাআলা তাঁর রিসালাত ও কালাম দিয়ে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন। আপনি কি আমাকে এমন একটি কাজের জন্য তিরস্কার করছেন, যা আমার সৃষ্টির আগেই স্থির করে রাখা হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: এভাবে আদম আ. যুক্তিপ্রমাণে মূসা আ.-এর ওপর জয়লাভ করেন। কথাটি তিনি দুবার বলেছেন। (বোখারি ও মুসলিম)
ইবনে আবু হাতেম রহ. বর্ণিত এ হাদিসের শেষাংশে আদম আ.-এর উক্তিসহ অতিরিক্ত এরূপ বর্ণনা আছে- "আল্লাহ আপনাকে এমন কয়েকটি ফলক দান করেছেন, যাতে যাবতীয় বিষয়ের সুস্পষ্ট বিবরণ রয়েছে এবং একান্তে নৈকট্য দান করেছেন। এবার আপনি বলুন, আল্লাহ তাআলা তাওরাত কখন লিপিবদ্ধ করেছিলেন? মূসা আ. বললেন, সৃষ্টির চল্লিশ বছর আগে। আদম আ. বললেন, তাতে কি আপনি وَعَمَى آدَمُ رَبَّهُ فَقَوَى কথাটি পান নি? মূসা আ. বললেন: জী পেয়েছি! আদম আ. বললেন: তবে কি আপনি আমাকে আমার এমন একটি কৃতকর্মের জন্য তিরস্কার করছেন, যা আমার সৃষ্টির চল্লিশ বছর আগেই আল্লাহ তাআলা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন, আমি তা করব?" বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “এভাবে আদম আ. মূসার ওপর জয় লাভ করেন।"
ইমাম আহমদ রহ. বর্ণিত রেওয়ায়েতে মূসা আ.-এর বক্তব্যে অতিরিক্ত আরো আছে- "আপনি আপনার সন্তানদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছেন।" তবে এ অংশটি হাদিসের অংশ কি না, তাতে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে。
• হাফেয আবু ইয়ালা আল-মূসিলি তাঁর মুসনাদে আমিরুল মুমিনিন ওমর ইবনে খাত্তাব রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "মূসা আ. বললেন, হে আমার রব! আপনি আমাকে সে আদম আ. কে একটু দেখান, যিনি আমাদেরকে এবং নিজেকে জান্নাত থেকে বের করিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে আদম আ. কে দেখালেন। মূসা আ. বললেন, আপনিই আদম আ.? তিনি বললেন, হ্যাঁ। মূসা আ. বললেন, আপনি সে ব্যক্তি, যার মধ্যে আল্লাহ তাআলা তাঁর রূহ সঞ্চার করেছেন, যাঁর সামনে তাঁর ফেরেশতাদের সিজদাবনত করিয়েছেন এবং যাঁকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিয়েছেন? জবাবে তিনি বললেন, হ্যাঁ। মূসা আ. জিজ্ঞাসা করলেন, আমাদেরকে এবং আপনার নিজেকে জান্নাত থেকে বের করে দিতে কীসে আপনাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল?
আদম আ. বললেন, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি মূসা আ.। আদম আ. বললেন, আপনি কি বনি ইসরাইলের নবী মূসা আ., আল্লাহ তাআলা পর্দার আড়াল থেকে যার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলেছেন, আপনার ও তাঁর মধ্যে কোনো দূত ছিল না? মূসা আ. বললেন, জী হ্যাঁ। আদম আ. বললেন: আপনি আমাকে এমন একটি বিষয়ে তিরস্কার করছেন, যা পূর্ব থেকেই আল্লাহ তাআলা নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এভাবে আদম আ. মূসা আ.-এর ওপর জয়ী হন। আবু দাউদ রহ. ভিন্নসূত্রে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন。
কারো কারো মতে এ জয়লাভের কারণ হলো, আদম আ. হলেন মূসা আ.-এর চেয়ে প্রবীণ। কেউ কেউ বলেন- এর কারণ হলো, আদম আ. হলেন তাঁর আদি-পিতা। কারো কারো মতে এর কারণ, তাঁরা দুজন ছিলেন ভিন্ন ভিন্ন শরিয়তের ধারক। আবার কেউ কেউ বলেন, এর কারণ তাঁরা দুজনই ছিলেন আলমে-বরযখে (যা এ জগতের বা পরকালের ব্যাপারে নয়, বরং মধ্যবর্তী আরেক জগতের ব্যাপার) আর তাঁদের ধারণায় সে জগতে শরিয়তের বিধান প্রযোজ্য নয়।
সঠিক কথা হলো, এ হাদিসটি বহুপাঠে বর্ণিত হয়েছে। তার কোনো কোনোটি বর্ণিত হয়েছে অর্থগতরূপে; কিন্তু তা সন্দেহমুক্ত নয়। বোখারি, মুসলিমসহ অন্যান্য কিতাবের বেশির ভাগ বক্তব্যের সারকথা হলো, মূসা আ. আদম আ. কে তাঁর নিজেকে ও সন্তানদেরকে জান্নাত থেকে বের করে দেয়ার জন্য দোষারোপ করেছিলেন। তাই উত্তরে আদম আ. তাঁকে বলেছিলেন, আমি আপনাদের বের করি নি। মূলত বের করেছেন সেই সত্তা, যিনি আমার বৃক্ষ-ফল খাওয়ার সঙ্গে বহিষ্কারকে সংশ্লিষ্ট করে রেখেছিলেন। আর যিনি তা সংশ্লিষ্ট করে রেখেছিলেন আমার সৃষ্টির পূর্বেই। এবং তা লিপিবদ্ধ ও নির্ধারিত করে রেখেছিলেন, তিনি হলেন মহান আল্লাহ। সুতরাং আপনি আমাকে এমন একটি কাজের জন্য দোষারোপ করছেন, যার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।
বড়জোর এতটুকু বলা যায়, আমাকে বৃক্ষ-ফল খেতে নিষেধ করা হয়েছিল; কিন্তু আমি তা খেয়ে ফেলেছি। এর সঙ্গে বহিষ্কারের সংশ্লিষ্টতা আমার কর্ম নয়। সুতরাং আপনাদেরকে এবং আমার নিজেকে জান্নাত থেকে বহিষ্কার আমি করি নি। তা ছিল সম্পূর্ণ আল্লাহ তাআলার কুদরতের লীলা! অবশ্য তাতে আল্লাহর হেকমত রয়েছে। অতএব এ কারণে হযরত আদম আ. মূসা আ.-এর ওপর জয়ী হয়েছিলেন।
পক্ষান্তরে যারা এ হাদিসকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, তারা আসলে একগুঁয়ে। কেননা হাদিসটি আবু হোরায়রা রাযি. থেকে মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। আর বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্মৃতিশক্তির ব্যাপারে আবু হোরায়রা রাযি.-এর মর্যাদা প্রশ্নাতীত। তা ছাড়া আরো কতিপয় সাহাবা থেকেও হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে। যা আমরা পূর্বে উল্লেখ করে এসেছি। আর একটু আগে হাদিসটির যেসব ব্যাখ্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল, তা হাদিসের শব্দ ও মর্ম উভয়ের সঙ্গেই অসঙ্গতিপূর্ণ। তাদের মধ্যে অবস্থানের যৌক্তিকতা জাবরিয়া সম্প্রদায়ের চেয়ে বেশি আর কারো নেই। কিন্তু কয়েক দিক থেকে তাতেও আপত্তি রয়েছে।
প্রথমত: মূসা আ. এমন কাজের জন্য দোষারোপ করতে পারেন না, যে কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তাওবা করে নিয়েছেন। দ্বিতীয়ত: মূসা আ. নিজে আদিষ্ট না হয়েও এক ব্যক্তিকে হত্যা করে আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করে বলেছিলেন:
رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي فَغَفَرَ لَهُ
হে আমার রব! আমি নিজের উপর অত্যাচার করেছি। অতএব তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও! ফলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। (সূরা কাসাস ১৬)
তৃতীয়ত: আদম আ. যদি পূর্বলিখিত তাকদির দ্বারা অপরাধের জন্য দোষারোপের জবাব দিয়ে থাকেন, তা হলে কৃতকর্মে তিরস্কৃত সকলের জন্যই এ পথ খুলে যেত এবং সকলেই পূর্ব নির্ধারিত তাকদিরের দোহাই দিয়ে প্রমাণ পেশ করতে পারত। এভাবে কিসাস ও হুদুদ তথা শরিয়ত নির্ধারিত শাস্তিসমূহের বিধানের দ্বার রুদ্ধ হয়ে যেত। তাকদিরকেই যদি দলিলরূপে পেশ করা যেত, তা হলে যে কেউ ছোট-বড় সকল কৃত অপরাধের জন্য তার দ্বারা দলিল পেশ করতে পারত। আর এটা ভয়াবহ পরিণতির দিকেই নিয়ে যেত। এ জন্যই কোনো কোনো আলিম বলেন: আদম আ. তাকদির দ্বারা দুর্ভোগের ব্যাপারে দলিল পেশ করেছিলেন; আল্লাহর আদেশ অমান্যের স্বপক্ষে যুক্তি হিসাবে নয়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
📄 হাবিল ও কাবিলের কাহিনী
হাবিল ও কাবিলের কাহিনী আল্লাহ তাআলা বলেন: وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِلَ مِنْ أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ الْآخَرِ قَالَ لَأَقْتُلَنَّكَ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ (۲۷) لَئِنْ بَسَطْتَ إِلَيَّ يَدَكَ لِتَقْتُلَنِي مَا أَنَا بِبَাসِطِ يَدِيَ إِلَيْكَ لِأَقْتُلَكَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ رَبَّ الْعَالَمِينَ (২৮) إِنِّي أُرِيدُ أَنْ تَبُوءَ بِإِثْنِي وَإِثْمِكَ فَتَكُونَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ وَذَلِكَ جَزَاءُ الظَّالِمِينَ (২৯) فَطَوَّعَتْ لَهُ نَفْسُهُ قَتْلَ أَخِيهِ فَقَتَلَهُ فَأَصْبَحَ مِنَ الْخَاسِرِينَ (٣٠) فَبَعَثَ اللَّهُ غُرَابًا يَبْحَثُ فِي الْأَرْضِ لِيُرِيَهُ كَيْفَ يُوَارِي سَوْءَةَ أَخِيهِ قَالَ يَا وَيْلَتَا أَعَجَزْتُ أَنْ أَكُونَ مِثْلَ هَذَا الْغُرَابِ فَأُوَارِيَ سَوْءَةَ أَخي فَأَصْبَحَ مِنَ النَّادِمِينَ (৩১)
"আদমের দু পুত্রের বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথভাবে শোনাও! যখন তারা উভয়ে কোরবানি করেছিল, তখন একজনের কোরবানি কবুল হলো, অন্যজনের কবুল হলো না। তাদের একজন বলল, আমি তোমাকে হত্যা করবই। অপরজন বলল, আল্লাহ মুত্তাকীদের কোরবানি করেন। আমাকে হত্যা করার জন্য আমার প্রতি হাত বাড়ালেও তোমাকে হত্যা করার জন্য আমি হাত বাড়াব না। আমি তো জগতসমূহের প্রতিপালককে ভয় করি। আমি চাই, তুমি আমার ও তোমার পাপের ভার বহন করে জাহান্নামী হও এবং এটা জালিমদের কর্মফল। তারপর তার প্রবৃত্তি তার ভাইকে হত্যা করতে উদ্বুদ্ধ করল এবং সে তাকে হত্যা করল। ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হলো। তারপর আল্লাহ তাআলা একটি কাক পাঠালেন, যে তার ভাইয়ের লাশ কীভাবে গোপন করা যায়, তা দেখানোর জন্য মাটি খুঁড়তে লাগল। সে বলল, হায়! আমি কি এ কাকের মতোও হতে পারলাম না! যাতে আমার ভাইয়ের লাশ গোপন করতে পারি? তারপর সে অনুতপ্ত হলো। (সূরা মায়েদা: ২৭-৩১)
সুদ্দী রহ. ইবনে আব্বাস ও ইবনে মাসউদ রাযি. সহ কতিপয় সাহাবা সূত্রে বর্ণনা করেন, আদম আ.-এর এক গর্ভের পুত্র সন্তানের সঙ্গে অন্য গর্ভের কন্যা সন্তানকে বিয়ে দিতেন। সে মতে কাবীলের যমজ বোনকে বিয়ে করতে মনস্ত করেন হাবীল। কাবীল বয়সে হাবীলের চেয়ে বড় ছিল। আর তার বোন ছিল অত্যন্ত রূপসী। তাই কাবিল ভাইকে না দিয়ে নিজেই আপন বোনকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে চাইল এবং আদম আ. হাবীলের সঙ্গে তাকে বিবাহ দেওয়ার আদেশ করলে সে তা অগ্রাহ্য করল। ফলে আদম আ. তাদের দুজনকে কোরবানি করার আদেশ দিয়ে তিনি হজ করার জন্য মক্কায় চলে যান। যাওয়ার প্রাক্কালে তিনি আসমানসমূহকে তাঁর সন্ত নিদের দেখাশুনার দায়িত্ব দিতে চান; তারা তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। যমিন, পাহাড়-পর্বতকে তা নিতে বললে তারাও অস্বীকৃতি জানায়। শেষে কাবীল এ দায়িত্বভার গ্রহণ করে।
তারপর আদম আ. চলে গেলে তারা তাদের কোরবানি করে। হাবীল একটি মোটা তাজা বকরি কোরবানি করে। তার অনেক বকরি ছিল। আর কাবীল কোরবানি দেয় নিজের উৎপাদিত নিম্নমানের এক বোঝা শস্য। তারপর আগুন হাবিলের কোরবানি গ্রাস করে নেয় আর কাবীলের কোরবানি অগ্রাহ্য হয়। এতে কাবীল ক্ষেপে গিয়ে বলল, তোমাকে আমি হত্যা করেই ছাড়ব। যাতে করে তুমি আমার বোনকে বিয়ে করতে না পার। উত্তরে হাবীল বলল, আল্লাহ তাআলা কেবল মুত্তাকীদের কোরবানিই কবুল করে থাকেন。
আবদুল্লাহ ইবনে আমরা রাযি. বলেন, আল্লাহর কসম! তাদের দুজনের মধ্যে নিহত লোকটিই অধিক শক্তিশালী ছিল। কিন্তু নির্দোষ থাকার প্রবণতা তাকে হত্যাকারীর প্রতি হাত বাড়ানো থেকে বিরত রাখে।