📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 ইবলিসের কুমন্ত্রণা

📄 ইবলিসের কুমন্ত্রণা


ইবলিসের কুমন্ত্রণা ইবলিস আদম আ.-কে কুমন্ত্রণা দিয়ে বলেছিল: هَلْ أَدُلُّكَ عَلَى شَجَرَةِ الْخُلْدِ وَمُلْكٍ لَا يَبْلَى (১২০) "হে আদম! আমি কি তোমাকে বলে দিব অনন্ত জীবনপ্রদ বৃক্ষের কথা এবং অক্ষয় রাজ্যের কথা? (সূরা ত্বহা: ১২০) অর্থাৎ, আমি কি তোমাকে এমন বৃক্ষের সন্ধান দিব, যার ফল খেলে তুমি স্থায়ী জীবন লাভ করবে? তুমি এখন যে সুখ-সম্ভোগ ও শান্তিতে আছ, চিরজীবন তা ভোগ করতে পারবে; তুমি লাভ করবে এমন রাজত্ব, যার কখনো বিনাশ ঘটবে না। ইবলিসের এ বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ প্রতারণামূলক এবং অবাস্তব। আলোচ্য আয়াতের মর্ম হচ্ছে, এর ফল ভক্ষণ করলে তুমি অনন্ত জীবন লাভ করবে। আবার এখানে সে বৃক্ষও উদ্দেশ্য হতে পারে, নিম্নোক্ত হাদিসে যার উল্লেখ রয়েছে। যেমন-

• ইমাম আহমদ রহ. বর্ণনা করেন, আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: "জান্নাতে এমন একটি বৃক্ষ আছে, কোনো আরোহী তার ছায়ায় একশ বছর ভ্রমণ করেও তা অতিক্রম করতে পারবে না। তা হলো 'শাজারাতুল খুলদ'। হাদিসটি অন্যান্য সূত্রেও বর্ণিত আছে এবং ইমাম আবু দাউদ তায়ালিসীও তাঁর মুসনাদে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। গুনদার বলেন: আমি শুবাকে জিজ্ঞাসা করলাম, এটি কি সেই শাজারাতুল খুলদ? তিনি বললেন, না।

পবিত্র কোরআনের অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে فَدَلَّاهُمَا بِغُرُورٍ فَلَمَّا ذَاقَا الشَّجَرَةَ بَدَتْ لَهُمَا سَوْآتُهُمَا وَطَفِقَا يَخْصِফَانِ عَلَيْهِمَا مِنْ وَرَقِ الْجَنَّةِ

"এভাবে সে তাদেরকে প্রবঞ্চনা দ্বারা অধঃপতিত করল। তারপর যখন তারা ঐ বৃক্ষ-ফলের স্বাদ গ্রহণ করল। তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ল এবং উদ্যানপত্র দ্বারা তারা তাদেরকে আবৃত করতে লাগল।” (সূরা আরাফ: ২২)

আল্লাহ তাআলা বলেন: فَأَكَلَا مِنْهَا فَبَدَتْ لَهُمَا سَوْآتُهُمَا وَطَفِقَا يَخْصِফَانِ عَلَيْهِمَا مِنْ وَরَقِ الْجَنَّةِ

"তারপর তারা তা থেকে ভক্ষণ করল; তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ল। (সূরা ত্বহা: ১২১)

আদম আ.-এর আগে হাওয়া আ. বৃক্ষ-ফল ভক্ষণ করেছিলেন। এবং তিনিই আদম আ. কে তা খাওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। বোখারির নিম্নোক্ত হাদিসটি এ অর্থেই নেয়া হয়ে থাকে।

• ইমাম বোখারি রহ. বর্ণনা করেন, আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "বনি ইসরাইলরা না হলে গোশত পচতো না; আর হাওয়া আ. না হলে কোনো নারী তার স্বামীর সঙ্গে খেয়ানত করত না।" (বোখারি, মুসলিম ও আহমাদ)

আহলে কিতাবদের হাতে থাকা তাওরাতে আছে, হাওয়া আ. কে বৃক্ষ-ফল খাওয়ার পথ দেখিয়েছিল একটি সাপ। সাপটি ছিল অত্যন্ত সুদর্শন ও বৃহদাকার। তার কথায় হাওয়া আ.-ও তা খান এবং আদম আ.-কেও খাওয়ান। এ প্রসঙ্গে ইবলিসের উল্লেখ নেই। খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের চোখ খুলে যায় এবং তাঁরা দু জনেই অনুভব করেন, তাঁরা দু জনই বিবস্ত্র। ফলে তাঁরা ডুমুরের পাতা গায়ে জড়িয়ে নেন। তাওরাতে আরো আছে, তাঁরা বিবস্ত্রই ছিলেন। ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ. বলেন, হযরত আদম ও হাওয়া আ.-এর পোশাক ছিল তাদের উভয়ের লজ্জাস্থানের উপর একটি জ্যোতির আবরণ।

উল্লেখ্য, আহলে কিতাবদের হাতে রক্ষিত বর্তমান তাওরাতে এ কথাটা ভুল ও বিকৃত এবং আরবি ভাষান্তরের প্রমাদ বিশেষ। কারণ, ভাষান্তর কর্মটি যার-তার পক্ষে সহজসাধ্য নয়। বিশেষ করে আরবি ভাষায় যার কোনো দক্ষতা নেই এবং মূল কিতাবের ভাব উদ্ধারে যিনি পটু নন, তার পক্ষে তো এ কাজটি অত্যন্ত দুরূহ। এ জন্যই আহলে কিতাবদের তাওরাত আরবিকরণে শব্দ ও মর্মগত যথেষ্ট ভুল-ভ্রান্তি হয়েছে। কোরআনুল কারিমের নিম্নোক্ত বর্ণনার দ্বারা প্রতীয়মান হয়, হযরত আদম ও হাওয়া আ.-এর দেহে বস্ত্র ছিল।

আল্লাহ তাআলা বলেন: يَنْزِعُ عَنْهُمَا لِبَاسَهُمَا لِيُرِيَهُمَا سَوْآتِهِمَا

"শয়তান তাদেরকে তাদের লজ্জাস্থান দেখানোর জন্য বিবস্ত্র করে।" (সূরা আরাফ: ২৭) কোরআনের এ বক্তব্য তো আর অন্য কারো কথায় উড়িয়ে দেওয়া যায় না! অন্যান্য সূত্রে বিশুদ্ধতার সনদে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে অনুরূপ একটি রেওয়ায়েত রয়েছে।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ

📄 নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ


নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ এভাবে তার প্রবঞ্চনায় প্রতারিত হয়ে যখন তাঁরা সে বৃক্ষফল আস্বাদন করল, তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ল। তাঁরা জান্নাতের পাতা দিয়ে নিজেদের ঢাকতে লাগলেন। তখন তাদের প্রতিপালক তাদেরকে সম্বোধন করে বললেন, আমি কি তোমাদেরকে এ বৃক্ষের নিকটবর্তী হতে নিষেধ করি নি? আমি কি তোমাদের বলি নি, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু? তাঁরা বলল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছি! তুমি যদি আমাদের ক্ষমা না কর এবং দয়া না কর, তা হলে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।

আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেন, "তারপর শয়তান তাদের কুমন্ত্রণা দিল। বলল, হে আদম! আমি কি তোমাকে বলে দিব অনন্ত জীবন দানকারী গাছের কথা। অক্ষয় রাজ্যের কথা? তারপর তাঁরা তা থেকে ভক্ষণ করল। ফলে তাদের লজ্জাস্থান তাদের নিকট প্রকাশ হয়ে পড়ল এবং তারা জান্নাতের গাছের পাতা নিয়ে নিজেদের আবৃত করতে লাগল। আদম তাঁর প্রতিপালকের হুকুম অমান্য করল। ফলে সে ভ্রমে পতিত হলো। এরপর তাঁর প্রতিপালক তাঁকে মনোনীত করলেন, তাঁর প্রতি ক্ষমাপরায়ণ হলেন এবং তাঁকে পথ-নির্দেশ করলেন।"

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 নবীদরে নিষ্পাপ হওয়ার অর্থ

📄 নবীদরে নিষ্পাপ হওয়ার অর্থ


নবীদের নিষ্পাপ হওয়ার অর্থ

বিশ্বজগতের স্রষ্টা দয়াময় আল্লাহ মানুষকে পরস্পর বিরোধী শক্তিসমূহ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তাকে পাপ ও পূণ্য উভয় প্রকারের শক্তি প্রদান করেছেন। সে পাপও করতে পারে, পুণ্যও করতে পারে। তার মধ্যে মন্দ কাজের ইচ্ছাশক্তি আছে, ভালো কাজের ইচ্ছাশক্তিও আছে। এটাই তার মানবসূলভ মর্যাদার পার্থক্যের প্রতীক।

এই বিপরীতমুখী শক্তিসমূহের বাহক মানুষের মধ্য হতেই আল্লাহ তাআলা মানুষের হেদায়াত- সৎপথ প্রদর্শন এবং আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছানোর উপায় প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে কোনো কোনো সময় কোনো মানুষকে নির্বাচিত করে তাঁকে নিজের রাসূল, নবী ও পয়গম্বর মনোনীত করেন। এরূপ ব্যক্তিত্বকে যখন আল্লাহ তাআলা নুবয়তের জন্য নির্বাচিত করে নেন, তখন তাঁর জন্য সর্বপ্রকার পাপকাজ নাফরমানি থেকে পবিত্র ও নিষ্কলুষ থাকা কর্তব্য হয়ে যায়। যাতে তিনি আল্লাহ তাআলার পয়গাম পৌঁছানোর ও প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব সুষ্ঠু ও বিশুদ্ধভাবে পালন করতে পারেন। সঙ্গে সঙ্গে

او خویشتن گمراه است کرار هبری کند

"যে নিজেই পথভ্রষ্ট, অপরকে কেমন করে পথ দেখাবে?" এ প্রবাদ বাক্যের প্রয়োগক্ষেত্র না হন।

নবীগণ আর দশজন মানুষের মতোই পানাহার করেন। ঘুমান। পরিবার ও সন্তান-সন্ততির সঙ্গে বসবাস করেন। তাঁরা সর্বপ্রকার ইচ্ছা-কর্ম সংক্রান্ত পাপ হতে পবিত্র থাকেন। তাঁরা নেককাজের প্রতি হেদায়াত ও নসিহতকারী এবং আল্লাহ তাআলার প্রতিনিধি। যদিও তাঁরা অন্যান্য মানুষের মতো বিপরীতমুখী শক্তিসমূহের অধিকারী; কিন্তু কাজে ও ইচ্ছায় তাদের দ্বারা সর্বপ্রকার মন্দকাজ সংঘটিত হওয়া অসম্ভব করে দেওয়া হয়েছে। যাতে তাঁদের প্রতিটি কাজ বিশ্ববাসীর জন্য আদর্শ ও নমুনাস্বরূপ হতে পারে। অবশ্য মানুষ হওয়ার কারণে ভুল-ভ্রান্তি ও ত্রুটি-বিচ্যুতির সম্ভাবনা (অবশিষ্ট) থাকে এবং কদাচিৎ কাজেও পরিণত হয়ে থাকে। কিন্তু তৎক্ষণাৎ তাঁদের সতর্ক করে দেওয়া হয়। তাঁরা সাবধানতা অবলম্বন করে, তা হতে দূরে সরে যান।

আল্লাহ পাকের দরবারে সান্নিধ্যপ্রাপ্ত একজন মহামানব আল্লাহ পাকের মর্জি বুঝার ব্যাপারে এই ত্রুটি-বিচ্যুতির সম্মুখীন হবেন কেন? এ জন্য আল্লাহ তাআলার নীতি হলো, তিনি নবী ও রাসূলগণের এ জাতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতির ওপর যখন তাদের সতর্ক করেন, তখন প্রথমে অতি কঠোরভাবে এবং অপরাধীর আকারে সেই ত্রুটি-বিচ্যুতির উল্লেখ করেন। সেই সঙ্গে অন্য কোনো ক্ষেত্রে বিষয়টির স্বরূপ বর্ণনা করে দিয়ে নবী ও রাসূলের অনুরূপ কাজকে ত্রুটি-বিচ্যুতির সীমার ভিতরে নিয়ে আসেন। তাদের পক্ষ হতে নিজে ওযর পেশ করে দেন। যাতে মুশরিক ও মুনাফিকরা নবী ও রাসুলগণের প্রতি কোনো বিষয়ে দোষারোপ করতে সাহস না পায়। এই তত্ত্বসমষ্টির নামই 'নবীদের নিষ্পাপতা'। এবং এটি ইসলামী আকিদাসমূহের মধ্যে একটি মৌলিক আকিদা।

আম্বিয়ায়ে কেরামের নিষ্পাপতা সম্পর্কিত উপরোক্ত তত্ত্ব জানার পর এবার হযরত আদম আ. এর ঘটনাটি দেখুন এবং চিন্তা করুন। কোরআন মাজিদের সূরা বাকারার মধ্যে যখন এ ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে, তখন পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, এই ভুল পাপজনিত ছিল না; অবাধ্যতামূলকও ছিল না বরং তা অতি সাধারণ ধরনের বিচ্যুতি ছিল। "শয়তান তাঁদের উভয়ের দ্বারা ত্রুটি করিয়ে দিল। আর একটি চিরন্তন সত্য হলো حَسَنَاتُ الْأَبْرَارِ سَيِّئَاتُ الْمُقَرَّبِينَ "সৎকর্মশীলদের পুণ্যকর্মও নিকটতম প্রিয়জনদের পক্ষে কখনো অপরাধ বলে বিবেচিত হয়।"

এরপর সূরা আরাফে এবং সূরা ত্বহার দু জায়গায় এই ঘটনাটিকে উদ্ধৃত করে ওয়াসওয়াসা শব্দ দ্বারা বর্ণনা করেছেন: فَأَزَلَّهُمَا الشَّيْطَانُ "শয়তান তাঁদের ফুসলিয়ে পদস্থলিত করল।"

আর সূরা ত্বহার তৃতীয় স্থানে ত্রুটি ও ফুসলানোর কারণ নিজেই ব্যক্ত করে হযরত আদমকে সর্বপ্রকারের ইচ্ছা-কর্ম সংক্রান্ত গুনাহ থেকে পবিত্র বলে প্রকাশ করেছেন এবং তাঁর নিষ্পাপতার বিষয়টিকে অত্যন্ত সুদৃঢ় ও মজবুত করে দিয়েছেন- وَلَقَدْ عَهِدْنَا إِلَى آدَمَ مِنْ قَبْلُ فَنَسِيَ وَلَمْ نَجِدْ لَهُ عَزْمًا "আর নিঃসন্দেহে, আমি আদম হতে একটি অঙ্গীকার নিয়েছিলাম। এরপর সে তা ভুলে গেল। আর আমি তাকে দৃঢ়তার মধ্যে পাই নি (আমি তাকে অঙ্গীকার পূরণ না করার ব্যাপারে তাঁর ইচ্ছা ও বাসনার অধিকারী দেখতে পাই নি)। (সূরা ত্বহা: ১১৫)

এ আয়াতগুলো থেকে পরিষ্কার বুঝা যায়, হযরত আদম আ. কোনো প্রকার গুনাহ করেন নি। যতটুকু ব্যাপার ঘটেছে, তাতেও তাঁর ইচ্ছাকৃত আদেশ লঙ্ঘনের কোনো দখল নেই বরং সেটা শুধু শয়তানের কুমন্ত্রণায় সংঘটিত ভুলক্রমে বিচ্যুতি ছিল।

• ইমাম বোখারি রহ. বর্ণনা করেন, আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "হযরত মূসা আ. ও হযরত আদম আ.-এর মধ্যে পরস্পর কথোপকথন হয়েছে। হযরত মূসা আ. তাঁকে বললেন, আপনিই তো মানুষকে আপনার অপরাধ দ্বারা জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছেন এবং তাদেরকে দুর্বিপাকে ফেলেছেন!" আদম আ. বললেন, হে মূসা! আল্লাহ তাআলা তাঁর রিসালাত কালাম দিয়ে আপনাকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন। আপনি কি আমাকে এমন একটি কাজের জন্য তিরস্কার করছেন, যা আমাকে সৃষ্টি করার আগেই আল্লাহ আমার নামে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এতে আদম আ. মূসা আ.-এর ওপর বিজয়ী হন。

কোরআনের আয়াতসমূহ থেকে প্রমাণিত হয়েছে, হযরত আদম আ. নবী ছিলেন। আল্লাহ পাকের খাঁটি বন্ধু, মনোনীত বান্দা ও আল্লাহ পাকের প্রতিনিধিরূপে মহান মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তিনি আল্লাহর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত একজন মহামানব ছিলেন। যাকে আল্লাহ পাক নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, নিজ রূহ তাঁর মধ্যে সঞ্চার করেছেন এবং যিনি আল্লাহ পাকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন। সুতরাং এই ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং ভুলও তাঁর মর্যাদার বিচারে অত্যন্ত হীন ও অসঙ্গত।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 পৃথিবীতে আদম আ.-এর আগমন

📄 পৃথিবীতে আদম আ.-এর আগমন


পৃথিবীতে আদম আ.-এর আগমন

ইবলিসের ধোঁকায় পড়ে হযরত আদম ও হাওয়া আ. নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করার পর আল্লাহ তাআলা তাদের স্মরণ করিয়ে দেন, "আমি কি তোমাদের বলি নি, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু!"

তারপর তাঁরা আল্লাহ তাআলার কাছে অত্যন্ত বিনয়াবনত হয়ে ক্ষমা ও দয়ার প্রার্থনা করলেন। সুতরাং আল্লাহ তাআলা হযরত আদম ও হাওয়া আ. এবং ইবলিসকে সম্বোধন করে বলেন:

قُلْنَا اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَمَتَاعٌ إِلَى حِينٍ "তোমরা নেমে যাও! তোমরা একে অপরের শত্রু এবং পৃথিবীতে তোমাদের কিছুকাল বসবাস ও জীবিকা রয়েছে।" (সূরা বাকারা: ২৪)

কারো কারো মতে তাঁদের সঙ্গে সাপের প্রতিও এ আদেশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। সীমালঙ্ঘন করার অপরাধে তাদেরকে জান্নাত থেকে নেমে যাওয়ার এ আদেশ দেওয়া হয়।

আদম ও হাওয়া আ.-এর সঙ্গে সাপের উল্লেখের স্বপক্ষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর একটি হাদিস পেশ করা হয়ে থাকে। তা হলো- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাপ হত্যার আদেশ দিয়ে বলেন, "যেদিন এগুলোর সঙ্গে আমরা লড়াই শুরু করেছি, সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত এগুলোর সঙ্গে আর আমরা সন্ধি করি নি।"

সূরা ত্বহায় আল্লাহ তাআলা বলেন:

قَالَ اهْبِطَا مِنْهَا جَمِيعًا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ "তোমরা দুজনে একই সঙ্গে জান্নাত থেকে নেমে যাও! তোমরা পরস্পর পরস্পরের শত্রু।" (সূরা ত্বহা: ১২৩) এই আদেশ হল আদম আ. ও ইবলিসের প্রতি। আর হাওয়া আ. হযরত আদম আ.-এর এবং সাপ ইবলিসের অনুগামী হিসাবে এ আদেশের আওতাভুক্ত। কেউ কেউ বলেন, এখানে দ্বিবচন শব্দ দ্বারা একত্রে সকলকেই আদেশ করা হয়েছে।

হাফেজ ইবনে আসাকির রহ. মুজাহিদ রহ. থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা হযরত আদম ও হাওয়া আ. কে তাঁর নৈকট্য থেকে বের করে দেওয়ার জন্য দুজন ফেরেশতাকে আদেশ দেন। ফলে জিবরাইল আ. তাঁর মাথা থেকে মুকুট উঠিয়ে নেন। মিকাইল আ.ও তাঁর কপাল থেকে মুকুট খুলে ফেলেন। আর তাঁকে একটি বৃক্ষ শাখা জড়িয়ে ধরে। তখন আদম আ. ধারণা করলেন, এটা তাঁর তাৎক্ষণিক শাস্তি। তাই তিনি মাথা নিচু করে বলতে লাগলেন- ক্ষমা চাই! ক্ষমা চাই! তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, তুমি কি আমার কাছ থেকে পালাচ্ছ? আদম আ. বললেন: না, বরং আপনার লজ্জায় এমনটি করছি, হে আমার রব।

আওযায়ি রহ. হাসসান ইবনে আতিয়া রহ. এর সূত্রে বর্ণনা করেন। আদম আ. জান্নাতে একশ বছরকাল অবস্থান করেন। অন্য এক বর্ণনায় ষাট বছরের উল্লেখ রয়েছে। তিনি জান্নাত হারানোর দুঃখে সত্তর বছর, অন্যায়ের অনুতাপে সত্তর বছর এবং নিহত পুত্রের শোকে চল্লিশ বছর কাঁদেন। ইবনে আসাকির রহ. এটি বর্ণনা করেন।

ইবনে আবু হাতিম রহ. বর্ণনা করেন, ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন: আদম আ. কে মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী দাহনা নামক স্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়।

হাসান রহ. বলেন: আদম আ. কে ভারতে, হাওয়া আ. কে জিদ্দায় এবং ইবলিসকে বসরা থেকে মাইল কয়েক দূরে দস্তমিসান নামক স্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়। আর সাপকে নামানো হয় ইস্পাহানে।

সুদ্দী রহ. বলেন, আদম আ. ভারতে অবতরণ করেন। আসার সময় তিনি হাজরে আসওয়াদ ও জান্নাতের একমুঠো পাতা নিয়ে আসেন এবং এ পাতাগুলো ভারতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেন। ফলে সে দেশে সুগন্ধি গাছ উৎপন্ন হয়।

ইবনে ওমর রাযি. বলেন, আদম আ. কে সাফায় এবং হাওয়া আ.-কে মারওয়ায় নামিয়ে দেওয়া হয়। ইবনে আবু হাতিম এ তথ্যটিও বর্ণনা করেছেন।

আবদুর রাযযাক রহ. আবু মুসা আশআরী রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন: আল্লাহ তাআলা আদম আ. কে জান্নাত থেকে পৃথিবীতে নামিয়ে দেওয়ার সময় যাবতীয় বস্তুর প্রস্তুতপ্রণালী শিখিয়ে দেন। এবং জান্নাতের ফল-ফলাদি থেকে তার খাবারের ব্যবস্থা করে দেন। সুতরাং তোমাদের এ ফল-মূল জান্নাতের ফল-মূল থেকেই এসেছে। পার্থক্য শুধু এতটুকু, এগুলো নষ্ট হয় আর ওগুলো মোটেও নষ্ট হয় না।

হাকিম রহ. তাঁর মুসতাদরাকে বর্ণনা করেন, ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন: আদম আ. কে জান্নাতে শুধু আছর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময় থাকতে দেওয়া হয়েছিল। হাকিম রহ. বলেন: হাদিসটি বোখারি ও মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহি। তবে তাঁরা হাদিসটি বর্ণনা করেন নি।

সহি মুসলিমে বর্ণিত আছে। হযরত আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "দিবসসমূহের মধ্যে জুমার দিন হলো সর্বোত্তম। এ দিনে আদম আ.-কে সৃষ্টি করা হয়। এ দিনেই তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়। এ দিনেই তাঁকে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করা হয়।" সহি বোখারিতে অন্য এক সূত্রে বর্ণিত আছে, "এ দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।"

ইবনে আবু হাতিম রহ. বর্ণনা করেন, উবাই ইবনে কাব রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: আদম আ. বললেন, হে আমার রব! আমি যদি তাওবা করি ও ফিরে আসি, তা হলে আমি কি আবার জান্নাতে যেতে পারব? আল্লাহ তাআলা বললেন, নিশ্চয় পারবে।

ইবনে আবু নাজিহ রহ. মুজাহিদ রহ. থেকে বর্ণনা করেন। আল্লাহ তাআলার কাছে করা হযরত আদম আ.-এর দোয়াগুলো হলো-

اللَّهُمَّ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي إِنَّكَ خَيْرُ الْغَافِرِينَ.

اللَّهُمَّ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي إِنَّكَ خَيْرُ الرَّحِمِينَ.

اللَّهُمَّ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ .

"হে আল্লাহ! তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি তোমার পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা করি। হে আমার রব! নিশ্চয় আমি আমার নিজের ওপর যুলুম করেছি। তুমি আমাকে মাফ করে দাও! নিশ্চয় তুমি ক্ষমাকারীদের সর্বোত্তম। হে আল্লাহ! তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করি ও প্রশংসা করি। হে আমার রব! নিশ্চয় আমি নিজের প্রতি অবিচার করেছি। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও! নিশ্চয় তুমি সর্বোত্তম দয়ালু। হে আল্লাহ! তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করি ও প্রশংসা করি। হে আমার রব! আমি নিজের প্রতি অন্যায় করেছি। আমার প্রতি তুমি ক্ষমা পরবশ হও! নিশ্চয় তুমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

• ইমাম হাকেম রহ. বর্ণনা করেন, ইবনে আব্বাস রাযি. فَتَلَقَّى آدَمُ مِنْ رَبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ এর ব্যাখ্যায় বলেন- আদম আ. বললেন, হে আমার রব! আপনি কি আমাকে আপনার কুদরতি হাতে সৃষ্টি করেন নি? বলা হলো, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, আপনি কি আমার দেহে আপনার রূহ সঞ্চার করেন নি? বলা হলো, হ্যাঁ। তখন তিনি পুনরায় বললেন, আমি হাঁচি দিলে আপনি কি يرحমক আল্লাহ (আল্লাহ তোমাকে রহম করুন!) বলেন নি এবং আপনার রহমত কি আপনার গযবের উপর প্রবল নয়? বলা হলো, হ্যাঁ। পুনরায় তিনি বললেন, আপনি কি এ কথা নির্ধারণ করে রাখেন নি, আমি এ কাজ করব? বলা হলো, হ্যাঁ। এবার আদম আ. বললেন, আচ্ছা আমি যদি তাওবা করি, তা হলে আপনি পুনরায় আমাকে জান্নাতে ফিরিয়ে দেবেন কি? আল্লাহ তাআলা বললেন, হ্যাঁ। হাকিম বলেন: এর সনদ সহি; কিন্তু ইমাম বোখারি ও মুসলিম রহ. হাদিসটি বর্ণনা করেন নি।

• ইমাম হাকেম, বায়হাকি ও ইবনে আসাকির রহ. ওমর ইবনে খাত্তাব রাযি. থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : "আদম আ. যখন ভুল করে বসলেন, তখন বললেন- হে আমার রব! মুহাম্মদের উছিলা দিয়ে আমি আপনার দরবারে দোয়া করছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন! তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, তুমি মুহাম্মদকে চিনলে কী করে অথচ এখনও তাঁকে আমি সৃষ্টিই করি নি? আদম আ. বললেন, হে আমার রব! যখন আপনি আমাকে আপনার নিজ হাতে সৃষ্টি করলেন এবং আমার মধ্যে আপনার রূহ সঞ্চার করলেন, তখন আমি মাথা তুলে আরশের স্তম্ভসমূহে لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ লিখিত দেখতে পাই। আমি বুঝতে পারলাম, আপনার পবিত্র নামের সঙ্গে আপনি সৃষ্টির মধ্যে আপনার সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারো নাম যোগ করেন নি। তখন আল্লাহ তাআলা বললেন- তুমি যথার্থই বলেছ, হে আদম! নিশ্চয় তিনি সৃষ্টির মধ্যে আমার প্রিয়তম। তাঁর উসিলায় যখন তুমি আমার কাছে দোয়া করেছ, তখন আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। আর মুহাম্মদকে সৃষ্টি না করলে তোমাকে আমি সৃষ্টি করতাম না। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। কোরআন মাজিদে বর্ণিত আছে:

وَعَصَىٰ آدَمُ رَبَّهُ فَغَوَىٰ (১২১) ثُمَّ اجْتَبَاهُ رَبُّهُ فَتَابَ عَلَيْهِ وَهَدَى (১২২) "আদম তার প্রতিপালকের হুকুম অমান্য করল। ফলে সে ভ্রমে পতিত হলো। এরপর তার প্রতিপালক তাকে মনোনীত করলেন, তার প্রতি ক্ষমাপরায়ণ হলেন এবং তাকে পথ-নির্দেশ করলেন। (সূরা ত্বহা: ১২১-১২২)

ফন্ট সাইজ
15px
17px