📄 হযরত হাওয়া আ.-এর সৃষ্টি
হাওয়া আ.-এর সৃষ্টি আদম আ.-এর জান্নাতে প্রবেশের আগেই হয়েছিল। কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেন, "হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর।"
ইসহাক ইবনে বাশশার রহ. স্পষ্টরূপেই এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু সুদ্দী আবু সালেহ ও আবু মালেকের সূত্রে ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে এবং মুররা-এর সূত্রে ইবনে মাসউদ রাযি. ও কতিপয় সাহাবী থেকে বর্ণনা করেছেন: আল্লাহ তাআলা ইবলিসকে জান্নাত থেকে বের করে দেন। আদম আ. কে জান্নাতে বসবাস করতে দেন। আদম আ. তথায় নিঃসঙ্গ একাকী ঘুরে বেড়াতে থাকেন। সেখানে তাঁর স্ত্রী নেই, যার কাছে গিয়ে একটু শান্তি লাভ করা যায়। একসময় তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। জাগ্রত হয়ে দেখতে পান, তাঁর শিয়রে একজন নারী উপবিষ্ট রয়েছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে আদম আ.-এর পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করেন। তাকে দেখে আদম আ. জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কে হে? তিনি বললেন: আমি একজন নারী। আদম আ. বললেন, তোমাকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে? জবাবে তিনি বললেন, যাতে আপনি আমার কাছে শান্তি পান。
তখন ফেরেশতাগণ আদম আ.-এর জ্ঞান যাচাই করার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আদম! বলুন তো, ওনার নাম কী? আদম আ. বললেন, 'হাওয়া। তাঁরা আবার জিজ্ঞাসা করলেন, হাওয়া নাম হল কেন? আদম আ. বললেন, কারণ তাঁকে 'হাই (জীবন্ত সত্তা) থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে।
• মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ. ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, হাওয়াকে আদম আ.-এর বাম পাঁজরের সবচেয়ে ছোট হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তখন আদম আ. ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। পরে সে স্থানটি আবার গোশত দ্বারা পূরণ করে দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন: يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً
"হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তা হতে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের দুজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। (সূরা আনফাল: ১)
هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا فَلَمَّا تَغَشَّاهَا حَمَلَتْ حَمْلًا خَفِيفًا فَمَرَّتُ بِهِ
"তিনিই তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেন, যাতে সে তার নিকট শান্তি পায়। তারপর যখন সে তার সঙ্গে মিলিত হয়, তখন সে এক লঘু গর্ভধারণ করে এবং তা নিয়ে সে অনায়াসে চলাফেরা করে।" (সূরা আ'রাফ: ১৮৯)
• সহি বোখারি ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত আছে, আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: মহিলাদের ব্যাপারে তোমরা আমার সদুপদেশ গ্রহণ করো। কেননা নারীদেরকে পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের উপরের অংশটুকু সর্বাধিক বাঁকা। যদি তোমরা তা সোজা করতে যাও, তা হলে ভেঙে ফেলবে এবং আপন অবস্থায় ছেড়ে দিলে তা বাঁকাই থেকে যাবে। অতএব মহিলাদের ব্যাপারে তোমরা আমার সদুপদেশ গ্রহণ করো। বর্ণনাটি ইমাম বোখারি রহ. এর।
📄 নিষিদ্ধ বৃক্ষটি কী?
নিষিদ্ধ বৃক্ষটি কী? وَلَا تَقْرَبَا هَذِهِ الشَّجَرَةَ আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণের মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন, গাছটি ছিল আঙ্গুরের। ইবনে আব্বাস ও ইবনে মাসউদ রাযি. সহ কয়েকজন সাহাবা থেকে এক বর্ণনায় আছে, ইহুদিদের ধারণা হলো গাছটি ছিল গমের। ইবনে আব্বাস রাযি. হাসান বসরি, ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ, আতিয়া আওফি, আবু মালেক, মুহারি ইবনে দিছার ও আবদুর রহমান ইবনে আবু লায়লা থেকেও এ কথা বর্ণিত আছে।
ওহাব রহ. বলেন, তার দানাগুলো ছিল মাখন অপেক্ষা নরম আর মধু অপেক্ষা মিষ্ট। সাওয়ারি আবু হাসীন ও আবু মালিক রহ. সূত্রে বলেন : فمرت به এ আয়াতে যে বৃক্ষের কথা বলা হয়েছে, তা হলো খেজুর গাছ।
• ইবনে জুরায়জ মুজাহিদ রহ. থেকে বর্ণনা করেন, তা হলো ডুমুর গাছ। কাতাদা ও ইবনে জুরায়জও এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
আবুল আলিয়া বলেন: তা এমন একটি গাছ ছিল, যার ফল খেলেই পবিত্রতা নষ্ট হয়ে যেত। কিন্তু জান্নাতে পবিত্রতা নষ্ট হওয়া অনুচিত। মোটকথা, এ মতভেদগুলো প্রায় কাছাকাছি। তবে লক্ষণীয় হলো, আল্লাহ তাআলা নির্দিষ্ট করে এর নাম উল্লেখ করেন নি। যদি উল্লেখ করার মধ্যে আমাদের কোনো উপকার নিহিত থাকত; তা হলে আল্লাহ তাআলা নির্দিষ্ট করে তা উল্লেখ করে দিতেন। পবিত্র কোরআনের আরো বহু ক্ষেত্রে এরূপ অস্পষ্ট রাখার নজির রয়েছে।
📄 ইবলিসের কুমন্ত্রণা
ইবলিসের কুমন্ত্রণা ইবলিস আদম আ.-কে কুমন্ত্রণা দিয়ে বলেছিল: هَلْ أَدُلُّكَ عَلَى شَجَرَةِ الْخُلْدِ وَمُلْكٍ لَا يَبْلَى (১২০) "হে আদম! আমি কি তোমাকে বলে দিব অনন্ত জীবনপ্রদ বৃক্ষের কথা এবং অক্ষয় রাজ্যের কথা? (সূরা ত্বহা: ১২০) অর্থাৎ, আমি কি তোমাকে এমন বৃক্ষের সন্ধান দিব, যার ফল খেলে তুমি স্থায়ী জীবন লাভ করবে? তুমি এখন যে সুখ-সম্ভোগ ও শান্তিতে আছ, চিরজীবন তা ভোগ করতে পারবে; তুমি লাভ করবে এমন রাজত্ব, যার কখনো বিনাশ ঘটবে না। ইবলিসের এ বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ প্রতারণামূলক এবং অবাস্তব। আলোচ্য আয়াতের মর্ম হচ্ছে, এর ফল ভক্ষণ করলে তুমি অনন্ত জীবন লাভ করবে। আবার এখানে সে বৃক্ষও উদ্দেশ্য হতে পারে, নিম্নোক্ত হাদিসে যার উল্লেখ রয়েছে। যেমন-
• ইমাম আহমদ রহ. বর্ণনা করেন, আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: "জান্নাতে এমন একটি বৃক্ষ আছে, কোনো আরোহী তার ছায়ায় একশ বছর ভ্রমণ করেও তা অতিক্রম করতে পারবে না। তা হলো 'শাজারাতুল খুলদ'। হাদিসটি অন্যান্য সূত্রেও বর্ণিত আছে এবং ইমাম আবু দাউদ তায়ালিসীও তাঁর মুসনাদে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। গুনদার বলেন: আমি শুবাকে জিজ্ঞাসা করলাম, এটি কি সেই শাজারাতুল খুলদ? তিনি বললেন, না।
পবিত্র কোরআনের অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে فَدَلَّاهُمَا بِغُرُورٍ فَلَمَّا ذَاقَا الشَّجَرَةَ بَدَتْ لَهُمَا سَوْآتُهُمَا وَطَفِقَا يَخْصِফَانِ عَلَيْهِمَا مِنْ وَرَقِ الْجَنَّةِ
"এভাবে সে তাদেরকে প্রবঞ্চনা দ্বারা অধঃপতিত করল। তারপর যখন তারা ঐ বৃক্ষ-ফলের স্বাদ গ্রহণ করল। তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ল এবং উদ্যানপত্র দ্বারা তারা তাদেরকে আবৃত করতে লাগল।” (সূরা আরাফ: ২২)
আল্লাহ তাআলা বলেন: فَأَكَلَا مِنْهَا فَبَدَتْ لَهُمَا سَوْآتُهُمَا وَطَفِقَا يَخْصِফَانِ عَلَيْهِمَا مِنْ وَরَقِ الْجَنَّةِ
"তারপর তারা তা থেকে ভক্ষণ করল; তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ল। (সূরা ত্বহা: ১২১)
আদম আ.-এর আগে হাওয়া আ. বৃক্ষ-ফল ভক্ষণ করেছিলেন। এবং তিনিই আদম আ. কে তা খাওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। বোখারির নিম্নোক্ত হাদিসটি এ অর্থেই নেয়া হয়ে থাকে।
• ইমাম বোখারি রহ. বর্ণনা করেন, আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "বনি ইসরাইলরা না হলে গোশত পচতো না; আর হাওয়া আ. না হলে কোনো নারী তার স্বামীর সঙ্গে খেয়ানত করত না।" (বোখারি, মুসলিম ও আহমাদ)
আহলে কিতাবদের হাতে থাকা তাওরাতে আছে, হাওয়া আ. কে বৃক্ষ-ফল খাওয়ার পথ দেখিয়েছিল একটি সাপ। সাপটি ছিল অত্যন্ত সুদর্শন ও বৃহদাকার। তার কথায় হাওয়া আ.-ও তা খান এবং আদম আ.-কেও খাওয়ান। এ প্রসঙ্গে ইবলিসের উল্লেখ নেই। খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের চোখ খুলে যায় এবং তাঁরা দু জনেই অনুভব করেন, তাঁরা দু জনই বিবস্ত্র। ফলে তাঁরা ডুমুরের পাতা গায়ে জড়িয়ে নেন। তাওরাতে আরো আছে, তাঁরা বিবস্ত্রই ছিলেন। ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ. বলেন, হযরত আদম ও হাওয়া আ.-এর পোশাক ছিল তাদের উভয়ের লজ্জাস্থানের উপর একটি জ্যোতির আবরণ।
উল্লেখ্য, আহলে কিতাবদের হাতে রক্ষিত বর্তমান তাওরাতে এ কথাটা ভুল ও বিকৃত এবং আরবি ভাষান্তরের প্রমাদ বিশেষ। কারণ, ভাষান্তর কর্মটি যার-তার পক্ষে সহজসাধ্য নয়। বিশেষ করে আরবি ভাষায় যার কোনো দক্ষতা নেই এবং মূল কিতাবের ভাব উদ্ধারে যিনি পটু নন, তার পক্ষে তো এ কাজটি অত্যন্ত দুরূহ। এ জন্যই আহলে কিতাবদের তাওরাত আরবিকরণে শব্দ ও মর্মগত যথেষ্ট ভুল-ভ্রান্তি হয়েছে। কোরআনুল কারিমের নিম্নোক্ত বর্ণনার দ্বারা প্রতীয়মান হয়, হযরত আদম ও হাওয়া আ.-এর দেহে বস্ত্র ছিল।
আল্লাহ তাআলা বলেন: يَنْزِعُ عَنْهُمَا لِبَاسَهُمَا لِيُرِيَهُمَا سَوْآتِهِمَا
"শয়তান তাদেরকে তাদের লজ্জাস্থান দেখানোর জন্য বিবস্ত্র করে।" (সূরা আরাফ: ২৭) কোরআনের এ বক্তব্য তো আর অন্য কারো কথায় উড়িয়ে দেওয়া যায় না! অন্যান্য সূত্রে বিশুদ্ধতার সনদে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে অনুরূপ একটি রেওয়ায়েত রয়েছে।
📄 নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ
নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ এভাবে তার প্রবঞ্চনায় প্রতারিত হয়ে যখন তাঁরা সে বৃক্ষফল আস্বাদন করল, তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ল। তাঁরা জান্নাতের পাতা দিয়ে নিজেদের ঢাকতে লাগলেন। তখন তাদের প্রতিপালক তাদেরকে সম্বোধন করে বললেন, আমি কি তোমাদেরকে এ বৃক্ষের নিকটবর্তী হতে নিষেধ করি নি? আমি কি তোমাদের বলি নি, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু? তাঁরা বলল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছি! তুমি যদি আমাদের ক্ষমা না কর এবং দয়া না কর, তা হলে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।
আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেন, "তারপর শয়তান তাদের কুমন্ত্রণা দিল। বলল, হে আদম! আমি কি তোমাকে বলে দিব অনন্ত জীবন দানকারী গাছের কথা। অক্ষয় রাজ্যের কথা? তারপর তাঁরা তা থেকে ভক্ষণ করল। ফলে তাদের লজ্জাস্থান তাদের নিকট প্রকাশ হয়ে পড়ল এবং তারা জান্নাতের গাছের পাতা নিয়ে নিজেদের আবৃত করতে লাগল। আদম তাঁর প্রতিপালকের হুকুম অমান্য করল। ফলে সে ভ্রমে পতিত হলো। এরপর তাঁর প্রতিপালক তাঁকে মনোনীত করলেন, তাঁর প্রতি ক্ষমাপরায়ণ হলেন এবং তাঁকে পথ-নির্দেশ করলেন।"