📄 জান্নাত আসমানে না যমিনে!
হযরত আদম আ. যে জান্নাতে প্রবেশ করেছিলেন, তার অবস্থান আসমানে না যমিনে- এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। তা বিস্তারিত আলোচনা ও নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। জমহুর আলেমদের অভিমত হচ্ছে, তা আসমানে অবস্থিত জান্নাতুল মাওয়া। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে এবং বিভিন্ন হাদিসে যার ইঙ্গিত রয়েছে। যেমন এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন: وَقُلْنَا يَا آدَمُ اسْكُنْ أَنتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ "আমি বললাম, হে আদম! তুমি এবং তোমার সঙ্গিনী জান্নাতে বসবাস কর।"
এ আয়াতে الجنة এর আলিফ-লাম ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয় নি বরং তা দ্বারা সুনির্দিষ্ট একটি জান্নাতকে বুঝানো হয়েছে। তা হলো জান্নাতুল মাওয়া। আবার মূসা আ. হযরত আদম আ.-কে বলেছিলেন, কেন আপনি আমাদেরকে এবং নিজেকে জান্নাত থেকে বের করলেন? এটি একটি হাদিসের অংশ। তবে এ বিষয়ে পরে আলোচনা করা হবে।
• সহি মুসলিম শরিফে বর্ণিত আছে, আবু হোরায়রা রাযি. ও হুযাইফা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে সমবেত করবেন। ফলে মুমিনগণ এমন সময় উঠে দাঁড়াবে, যখন জান্নাত তাদের কাছে এসে যাবে। তারা আদম আ.-এর কাছে এসে বলবেন, হে আমাদের পিতা! আমাদের জন্য আপনি জান্নাত খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন! তখন তিনি বলবেন, তোমাদের পিতার অপরাধেই তো তোমাদেরকে জান্নাত থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। এ হাদিস প্রমাণ করে, হযরত আদম আ. যে জান্নাতে বসবাস করেছিলেন, তা হলো জান্নাতুল মাওয়া। কিন্তু এ যুক্তিটিও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়।
অন্যরা বলেন: আল্লাহ তাআলা আদম আ.-কে যে জান্নাতে বসবাস করতে দিয়েছিলেন, তা 'জান্নাতুল খুলদ' তথা অনন্ত জান্নাত ছিল না। কারণ, নির্দিষ্ট একটি গাছের ফল খেতে নিষেধ করে সেখানে তাঁর ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। তিনি সেখানে নিদ্রা যান, সেখান থেকে তাঁকে বহিষ্কারও করা হয় এবং ইবলিসও সেখানে তাঁর কাছে উপস্থিত হয়। এ সব কটি বিষয়ই প্রমাণ করে, সেটি জান্নাতুল মাওয়া ছিল না। এ অভিমত হযরত উবাই ইবনে কাব, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ ও সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রহ. থেকে বর্ণিত। ইমাম আবু হানিফা রহ. ও তাঁর বিশিষ্ট শাগরিদগণ থেকেও এরূপ অভিমত বর্ণিত আছে。
• হযরত ইমাম রাযি রহ. তাঁর তাফসির গ্রন্থে আবুল কাসেম বলখী ও আবু মুসলিম ইস্পাহানি রহ. থেকে এবং কুরতুবি তাঁর তাফসির গ্রন্থে আবুল কাসেম বলখী ও আবু মুসলিম ইস্পাহানি রহ. থেকে এবং কুরতুবী তাঁর তাফসির গ্রন্থ 'মুতাযিলা ও কাদরিয়্যাহ' থেকে এ অভিমতটি উদ্ধৃত করেছেন। আহলে কিতাবিদের হাতে থাকা তাওরাত পাঠেও এর স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়। আবু মুহাম্মদ ইবনে হাযম 'আল-মিলাল ও আন-নিহাল' গ্রন্থে এবং আবু মুহাম্মদ ইবনে আতিয়া ও আবু ঈসা রুম্মানী আপন আপন তাফসিরে এ বিষয়টির মতভেদের কথা উল্লেখ করেছেন।
জমহুর আলেমদের বর্ণনায় প্রথম অভিমতের সমর্থন পাওয়া যায়। কাযি মাওয়ারদি রহ. তাঁর তাফসিরে বলেন, হযরত আদম ও হাওয়া আ. যে জান্নাতে বসবাস করেন, তার ব্যাপারে দুটি অভিমত রয়েছে। প্রথমত, তা জান্নাতুল খুলদ। দ্বিতীয়ত, তা স্বতন্ত্র এক জান্নাত। যা আল্লাহ তাআলা তাঁর পরীক্ষাস্থল হিসাবে তৈরি করেন। এটা সে জান্নাতুল খুলদ নয়, যা আল্লাহ তাআলা পুরস্কারের স্থান হিসাবে প্রস্তুত করে রেখেছেন।
এ দ্বিতীয় অভিমতের সমর্থকদের মধ্যে আবার মতভেদ রয়েছে। একদল বলেন, তার অবস্থান আসমানে। কারণ, আল্লাহ তাআলা আদম ও হাওয়া আ. কে জান্নাত থেকে নামিয়ে দিয়েছিলেন। এটা হাসানের অভিমত। অপর দল বলেন, সেটির অবস্থান পৃথিবীতে। কেননা আল্লাহ তাআলা সে জান্নাতে বহু ফল-ফলাদির মাঝে বিশেষ একটি গাছ সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তাদেরকে পরীক্ষা করেছিলেন।
বলা বাহুল্য, দ্বিতীয় অভিমতের সমর্থকগণ একটি প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেছেন, নিঃসন্দেহে সেজদা করা থেকে বিরত থাকার দরুন আল্লাহ তাআলা ইবলিসকে জান্নাত থেকে বিতাড়িত করেন এবং তাকে সেখান থেকে নেমে যাওয়ার আদেশ প্রদান করেন। আর এ আদেশটি কোনো শরয়ি আদেশ ছিল না, তাঁর বিরুদ্ধাচরণের অবকাশ থাকবে বরং তা ছিল এমন অখণ্ডনীয় তকদির সংক্রান্ত নির্দেশ, যার বিরুদ্ধাচরণের কোনো অবকাশ থাকে না। তাই আল্লাহ তাআলা বলেন:
قَالَ اخْرُجْ مِنْهَا مَنْءُ ومَا مَدْحُورًا "এখান থেকে তুমি ধিকৃত ও বিতাড়িত অবস্থায় বের হয়ে যাও।" (সূরা আরাফ: ১৮)
قَالَ فَاهْبِطُ مِنْهَا فَمَا يَكُونُ لَكَ أَنْ تَتَكَبَّرَ فِيهَا "এ স্থান থেকে তুমি নেমে যাও! এখানে থেকে তুমি অহঙ্কার করবে, এ হতে পারে না।" (সূরা আরাফ: ১৩)
قَالَ فَاخْرُجُ مِنْهَا فَإِنَّكَ رَحِيمٌ (٣٤) "তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও! কারণ, তুমি অভিশপ্ত।” (সূরা হিজর : ৩৪)
এ আয়াতগুলোতে منهاএর সর্বনামটি দ্বারা الجنة (জান্নাত) কিংবা السماء (আসমান) অথবা المنزلة (আবাসস্থল) বুঝানো হয়েছে। যাই হোক! নিঃসন্দেহে ইবলিসকে যে স্থান থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল, সেখানে সামান্যতম সময়ের জন্যেও তার উপস্থিতি থাকার কথা নয়।
তাঁরা বলেন, কোরআনের বাহ্যিক বর্ণনাভঙ্গি থেকে আরো প্রমাণিত, ইবলিস আদম আ. কে এই বলে কুমন্ত্রণা দিয়েছিল:
هَلْ أَدُلُّكَ عَلَى شَجَرَةِ الْخُلْدِ وَمُلْكٍ لَا يَبْلَى (۱۲۰) “হে আদম! আমি কি তোমাকে বলে দিব, অনন্ত জীবনপ্রদ বৃক্ষের কথা এবং অক্ষয় রাজ্যের কথা? (সূরা ত্বহা: ১২০)
وَقَالَ مَا نَهَا كُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ إِلَّا أَنْ تَكُونَا مَلَكَيْنِ أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ (٢٠) وَقَاسَمَهُمَا إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ النَّاصِحِينَ (۲۱) فَدَلَّا هُمَا بِغُرُورٍ "আর সে বলল: পাছে তোমরা উভয়ে ফেরেশতা হয়ে যাও কিংবা তোমরা স্থায়ী হও, এ জন্যই তোমাদের প্রতিপালক এ বৃক্ষ সম্বন্ধে তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন। সে তাদের উভয়ের নিকট শপথ করে বলল, আমি তোমাদের হিতাকাঙ্ক্ষীদের একজন। এভাবে সে তাদেরকে প্রবঞ্চনা দ্বারা অধঃপতিত করল। (সূরা আরাফ: ২০-২২)
এ আয়াতগুলো স্পষ্ট প্রমাণ করে, আদম ও হাওয়া আ.-এর সঙ্গে ইবলিসের সাক্ষাৎ ঘটেছিল জান্নাতে। তাঁদের এ প্রশ্নের জবাবে বলা হয়েছে, নিয়মিত বসবাসের ভিত্তিতে না হলেও যাতায়াত ও আনাগোনার সুবাদে জান্নাতে আদম ও হাওয়া আ.-এর সঙ্গে ইবলিসের একত্র হওয়া বিচিত্র নয়। কিংবা হতে পারে জান্নাতের দরজায় দাঁড়িয়ে বা আকাশের নিচে থেকে ইবলিস তাঁদেরকে কুমন্ত্রণা দিয়েছিল। তবে তিনটি জবাবের কোনোটিই সন্দেহমুক্ত নয়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
📄 হযরত হাওয়া আ.-এর সৃষ্টি
হাওয়া আ.-এর সৃষ্টি আদম আ.-এর জান্নাতে প্রবেশের আগেই হয়েছিল। কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেন, "হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর।"
ইসহাক ইবনে বাশশার রহ. স্পষ্টরূপেই এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু সুদ্দী আবু সালেহ ও আবু মালেকের সূত্রে ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে এবং মুররা-এর সূত্রে ইবনে মাসউদ রাযি. ও কতিপয় সাহাবী থেকে বর্ণনা করেছেন: আল্লাহ তাআলা ইবলিসকে জান্নাত থেকে বের করে দেন। আদম আ. কে জান্নাতে বসবাস করতে দেন। আদম আ. তথায় নিঃসঙ্গ একাকী ঘুরে বেড়াতে থাকেন। সেখানে তাঁর স্ত্রী নেই, যার কাছে গিয়ে একটু শান্তি লাভ করা যায়। একসময় তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। জাগ্রত হয়ে দেখতে পান, তাঁর শিয়রে একজন নারী উপবিষ্ট রয়েছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে আদম আ.-এর পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করেন। তাকে দেখে আদম আ. জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কে হে? তিনি বললেন: আমি একজন নারী। আদম আ. বললেন, তোমাকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে? জবাবে তিনি বললেন, যাতে আপনি আমার কাছে শান্তি পান。
তখন ফেরেশতাগণ আদম আ.-এর জ্ঞান যাচাই করার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আদম! বলুন তো, ওনার নাম কী? আদম আ. বললেন, 'হাওয়া। তাঁরা আবার জিজ্ঞাসা করলেন, হাওয়া নাম হল কেন? আদম আ. বললেন, কারণ তাঁকে 'হাই (জীবন্ত সত্তা) থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে।
• মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ. ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, হাওয়াকে আদম আ.-এর বাম পাঁজরের সবচেয়ে ছোট হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তখন আদম আ. ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। পরে সে স্থানটি আবার গোশত দ্বারা পূরণ করে দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন: يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً
"হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তা হতে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের দুজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। (সূরা আনফাল: ১)
هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا فَلَمَّا تَغَشَّاهَا حَمَلَتْ حَمْلًا خَفِيفًا فَمَرَّتُ بِهِ
"তিনিই তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেন, যাতে সে তার নিকট শান্তি পায়। তারপর যখন সে তার সঙ্গে মিলিত হয়, তখন সে এক লঘু গর্ভধারণ করে এবং তা নিয়ে সে অনায়াসে চলাফেরা করে।" (সূরা আ'রাফ: ১৮৯)
• সহি বোখারি ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত আছে, আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: মহিলাদের ব্যাপারে তোমরা আমার সদুপদেশ গ্রহণ করো। কেননা নারীদেরকে পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের উপরের অংশটুকু সর্বাধিক বাঁকা। যদি তোমরা তা সোজা করতে যাও, তা হলে ভেঙে ফেলবে এবং আপন অবস্থায় ছেড়ে দিলে তা বাঁকাই থেকে যাবে। অতএব মহিলাদের ব্যাপারে তোমরা আমার সদুপদেশ গ্রহণ করো। বর্ণনাটি ইমাম বোখারি রহ. এর।
📄 নিষিদ্ধ বৃক্ষটি কী?
নিষিদ্ধ বৃক্ষটি কী? وَلَا تَقْرَبَا هَذِهِ الشَّجَرَةَ আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণের মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন, গাছটি ছিল আঙ্গুরের। ইবনে আব্বাস ও ইবনে মাসউদ রাযি. সহ কয়েকজন সাহাবা থেকে এক বর্ণনায় আছে, ইহুদিদের ধারণা হলো গাছটি ছিল গমের। ইবনে আব্বাস রাযি. হাসান বসরি, ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ, আতিয়া আওফি, আবু মালেক, মুহারি ইবনে দিছার ও আবদুর রহমান ইবনে আবু লায়লা থেকেও এ কথা বর্ণিত আছে।
ওহাব রহ. বলেন, তার দানাগুলো ছিল মাখন অপেক্ষা নরম আর মধু অপেক্ষা মিষ্ট। সাওয়ারি আবু হাসীন ও আবু মালিক রহ. সূত্রে বলেন : فمرت به এ আয়াতে যে বৃক্ষের কথা বলা হয়েছে, তা হলো খেজুর গাছ।
• ইবনে জুরায়জ মুজাহিদ রহ. থেকে বর্ণনা করেন, তা হলো ডুমুর গাছ। কাতাদা ও ইবনে জুরায়জও এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
আবুল আলিয়া বলেন: তা এমন একটি গাছ ছিল, যার ফল খেলেই পবিত্রতা নষ্ট হয়ে যেত। কিন্তু জান্নাতে পবিত্রতা নষ্ট হওয়া অনুচিত। মোটকথা, এ মতভেদগুলো প্রায় কাছাকাছি। তবে লক্ষণীয় হলো, আল্লাহ তাআলা নির্দিষ্ট করে এর নাম উল্লেখ করেন নি। যদি উল্লেখ করার মধ্যে আমাদের কোনো উপকার নিহিত থাকত; তা হলে আল্লাহ তাআলা নির্দিষ্ট করে তা উল্লেখ করে দিতেন। পবিত্র কোরআনের আরো বহু ক্ষেত্রে এরূপ অস্পষ্ট রাখার নজির রয়েছে।
📄 ইবলিসের কুমন্ত্রণা
ইবলিসের কুমন্ত্রণা ইবলিস আদম আ.-কে কুমন্ত্রণা দিয়ে বলেছিল: هَلْ أَدُلُّكَ عَلَى شَجَرَةِ الْخُلْدِ وَمُلْكٍ لَا يَبْلَى (১২০) "হে আদম! আমি কি তোমাকে বলে দিব অনন্ত জীবনপ্রদ বৃক্ষের কথা এবং অক্ষয় রাজ্যের কথা? (সূরা ত্বহা: ১২০) অর্থাৎ, আমি কি তোমাকে এমন বৃক্ষের সন্ধান দিব, যার ফল খেলে তুমি স্থায়ী জীবন লাভ করবে? তুমি এখন যে সুখ-সম্ভোগ ও শান্তিতে আছ, চিরজীবন তা ভোগ করতে পারবে; তুমি লাভ করবে এমন রাজত্ব, যার কখনো বিনাশ ঘটবে না। ইবলিসের এ বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ প্রতারণামূলক এবং অবাস্তব। আলোচ্য আয়াতের মর্ম হচ্ছে, এর ফল ভক্ষণ করলে তুমি অনন্ত জীবন লাভ করবে। আবার এখানে সে বৃক্ষও উদ্দেশ্য হতে পারে, নিম্নোক্ত হাদিসে যার উল্লেখ রয়েছে। যেমন-
• ইমাম আহমদ রহ. বর্ণনা করেন, আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: "জান্নাতে এমন একটি বৃক্ষ আছে, কোনো আরোহী তার ছায়ায় একশ বছর ভ্রমণ করেও তা অতিক্রম করতে পারবে না। তা হলো 'শাজারাতুল খুলদ'। হাদিসটি অন্যান্য সূত্রেও বর্ণিত আছে এবং ইমাম আবু দাউদ তায়ালিসীও তাঁর মুসনাদে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। গুনদার বলেন: আমি শুবাকে জিজ্ঞাসা করলাম, এটি কি সেই শাজারাতুল খুলদ? তিনি বললেন, না।
পবিত্র কোরআনের অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে فَدَلَّاهُمَا بِغُرُورٍ فَلَمَّا ذَاقَا الشَّجَرَةَ بَدَتْ لَهُمَا سَوْآتُهُمَا وَطَفِقَا يَخْصِফَانِ عَلَيْهِمَا مِنْ وَرَقِ الْجَنَّةِ
"এভাবে সে তাদেরকে প্রবঞ্চনা দ্বারা অধঃপতিত করল। তারপর যখন তারা ঐ বৃক্ষ-ফলের স্বাদ গ্রহণ করল। তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ল এবং উদ্যানপত্র দ্বারা তারা তাদেরকে আবৃত করতে লাগল।” (সূরা আরাফ: ২২)
আল্লাহ তাআলা বলেন: فَأَكَلَا مِنْهَا فَبَدَتْ لَهُمَا سَوْآتُهُمَا وَطَفِقَا يَخْصِফَانِ عَلَيْهِمَا مِنْ وَরَقِ الْجَنَّةِ
"তারপর তারা তা থেকে ভক্ষণ করল; তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ল। (সূরা ত্বহা: ১২১)
আদম আ.-এর আগে হাওয়া আ. বৃক্ষ-ফল ভক্ষণ করেছিলেন। এবং তিনিই আদম আ. কে তা খাওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। বোখারির নিম্নোক্ত হাদিসটি এ অর্থেই নেয়া হয়ে থাকে।
• ইমাম বোখারি রহ. বর্ণনা করেন, আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "বনি ইসরাইলরা না হলে গোশত পচতো না; আর হাওয়া আ. না হলে কোনো নারী তার স্বামীর সঙ্গে খেয়ানত করত না।" (বোখারি, মুসলিম ও আহমাদ)
আহলে কিতাবদের হাতে থাকা তাওরাতে আছে, হাওয়া আ. কে বৃক্ষ-ফল খাওয়ার পথ দেখিয়েছিল একটি সাপ। সাপটি ছিল অত্যন্ত সুদর্শন ও বৃহদাকার। তার কথায় হাওয়া আ.-ও তা খান এবং আদম আ.-কেও খাওয়ান। এ প্রসঙ্গে ইবলিসের উল্লেখ নেই। খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের চোখ খুলে যায় এবং তাঁরা দু জনেই অনুভব করেন, তাঁরা দু জনই বিবস্ত্র। ফলে তাঁরা ডুমুরের পাতা গায়ে জড়িয়ে নেন। তাওরাতে আরো আছে, তাঁরা বিবস্ত্রই ছিলেন। ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ. বলেন, হযরত আদম ও হাওয়া আ.-এর পোশাক ছিল তাদের উভয়ের লজ্জাস্থানের উপর একটি জ্যোতির আবরণ।
উল্লেখ্য, আহলে কিতাবদের হাতে রক্ষিত বর্তমান তাওরাতে এ কথাটা ভুল ও বিকৃত এবং আরবি ভাষান্তরের প্রমাদ বিশেষ। কারণ, ভাষান্তর কর্মটি যার-তার পক্ষে সহজসাধ্য নয়। বিশেষ করে আরবি ভাষায় যার কোনো দক্ষতা নেই এবং মূল কিতাবের ভাব উদ্ধারে যিনি পটু নন, তার পক্ষে তো এ কাজটি অত্যন্ত দুরূহ। এ জন্যই আহলে কিতাবদের তাওরাত আরবিকরণে শব্দ ও মর্মগত যথেষ্ট ভুল-ভ্রান্তি হয়েছে। কোরআনুল কারিমের নিম্নোক্ত বর্ণনার দ্বারা প্রতীয়মান হয়, হযরত আদম ও হাওয়া আ.-এর দেহে বস্ত্র ছিল।
আল্লাহ তাআলা বলেন: يَنْزِعُ عَنْهُمَا لِبَاسَهُمَا لِيُرِيَهُمَا سَوْآتِهِمَا
"শয়তান তাদেরকে তাদের লজ্জাস্থান দেখানোর জন্য বিবস্ত্র করে।" (সূরা আরাফ: ২৭) কোরআনের এ বক্তব্য তো আর অন্য কারো কথায় উড়িয়ে দেওয়া যায় না! অন্যান্য সূত্রে বিশুদ্ধতার সনদে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে অনুরূপ একটি রেওয়ায়েত রয়েছে।