📄 সিজদার আদেশ দান এবং ইবলিসের অবাধ্যতা ও লাঞ্ছনা
আল্লাহ তাআলা বলেন: وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَى وَاسْتَكْبَرَ "যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম : তোমরা আদমকে সিজদা করো! তখন ইবলিস ছাড়া সকলেই সিজদা করল, সে অমান্য করল ও অহঙ্কার করল।" (সূরা বাকারা: ৩৪)
আল্লাহ তাআলা হযরত আদম আ.-কে সেজদা করার জন্য ফেরেশতাদের যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, সেই নির্দেশ এবং তা বাস্তবায়নের মধ্যে নিহিত ছিল হযরত আদম আ.-এর জন্য বিরাট সম্মান ও মর্যাদা। আদম আ.-কে আল্লাহ তাআলা তাঁর কুদরতি হাতে সৃষ্টি করে তাতে রূহ সঞ্চার করার পর ফেরেশতাদেরকে আদেশ করলেন তাঁকে ওই সিজদা করার জন্য। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন: فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِنْ رُوحِي فَقَعُوا لَهُ سَاجِدِينَ (۲۹) "যখন আমি তাকে সুঠাম করব এবং তাতে আমার রূহ সঞ্চার করব, তখন তোমরা তার প্রতি সিজদাবনত হয়ো।" (সূরা হিজর: ২৯)
📄 আদম আ.কে চারটি মর্যাদা দান
(১) আল্লাহ তাআলা তাঁকে নিজ কুদরতি হাতে সৃষ্টি করেছেন। (২) তাঁর মধ্যে নিজ রূহ সঞ্চার করেছেন। (৩) তাঁকে সেজদা করার জন্য ফেরেশতাদের আদেশ দিয়েছেন। (৪) তাঁকে সমস্ত বস্তুর নাম শিক্ষা দিয়েছেন।
এ কারণে উর্ধ্বজগতে যখন হযরত মূসা আ. ও হযরত আদম আ.-এর মধ্যে সাক্ষাৎ হয়, তখন হযরত মূসা আ. বলেছিলেন- আপনি মানবজাতির পিতা। আপনাকে আল্লাহ পাক নিজ কুদরতি হাতে সৃষ্টি করেছেন। আপনার মধ্যে তাঁর (আল্লাহর) রূহ সঞ্চার করেছেন। ফেরেশতাদের দিয়ে আপনাকে সিজদা করিয়েছেন। আপনাকে তিনি সকল বস্তুর নাম শিক্ষা দিয়েছেন এবং তার গুণাবলী ও কার্যকারিতা সম্পর্কে জ্ঞান দান করেন।
কেয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে সমবেত লোকেরাও হযরত আদম আ.-এর কাছে অনুরূপভাবে আরয করবে। অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন: وَلَقَدْ خَلَقْنَاكُمْ ثُمَّ صَوَّরْنَاكُمْ ثُمَّ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآদَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ لَمْ يَكُنْ مِنَ السَّاجِدِينَ (۱۱) "আমিই তোমাদেরকে (প্রথমে মাটি দিয়ে) সৃষ্টি করেছি। এরপর তোমাদেরকে রূপ দান করেছি এবং তারপর ফেরেশতাদেরকে বলেছি আদমকে সিজদা করতে। ইবলিস ছাড়া সকলেই সিজদা করল। সে সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হলো না।" (সূরা আরাফ: ১১)
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন: قَالَ مَا مَنَعَكَ أَلَّا تَسْجُدَ إِذْ أَمَرْتُكَ "আমি যখন তোমাকে আদেশ করলাম, তখন কী সে তোমাকে সিজদা করতে বারণ করল?" قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ “সে বলল, আমি তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ; আমাকে আপনি অগ্নি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদামাটি দিয়ে। (সূরা আরাফ : ১১-১২)
📄 সর্বপ্রথম অলীক যুক্তি উপস্থাপনকারী
হযরত হাসান বসরি রহ. বলেন, ইবলিস এখানে যুক্তি দিতে চেষ্টা করেছে এবং এভাবে যুক্তি প্রদানকারী সর্বপ্রথম সে (ইবলিস)-ই। মুহাম্মদ ইবনে সিরীন রহ. বলেন: সর্বপ্রথম যে এরূপ যুক্তির সূচনা করে, সে হলো ইবলিস। আর সূর্য ও চন্দ্রের পূজাও এই যুক্তির উপর ভিত্তি করেই শুরু হয়। (তাফসিরে তাবারি: ৮/৯৮)
ইবলিস নিজের ও আদম আ.-এর মাঝে (জ্ঞানের দিক থেকে) তুলনা করেছিল। সুতরাং আদম আ.-কে সেজদা করার জন্য তার প্রতি ও ফেরেশতাদের প্রতি আল্লাহ তাআলার নির্দেশ হওয়া সত্ত্বেও সে (ইবলিস) নিজেকে আদম আ.-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাসম্পন্ন ধারণা করে সিজদা করা থেকে বিরত থাকে। (এখানে আল্লাহ তাআলার সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও) ইবলিস (তার শ্রেষ্ঠত্বের) যুক্তি প্রদান করে。
এ কথা সুস্পষ্ট, আল্লাহ তাআলার সরাসরি আদেশের সামনে সকল প্রকার যুক্তি বাতিল ও নিরর্থক। তা ছাড়া ইবলিসের এই যুক্তিটি ছিল সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও মনগড়া। কারণ, মাটি আগুনের চেয়ে উপকারী ও উত্তম। কেননা মাটির মধ্যে রয়েছে কোমলতা, স্থিরতা, সহিষ্ণুতা ও শীতলতা। আর মাটি উৎপাদনশক্তি সম্পন্ন। মাটি থেকে প্রায় সব জিনিসই সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ সব রকম শস্য উৎপাদক। আর মাটির মধ্যে যে সকল বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী রয়েছে, সেগুলো আল্লাহ তাআলারও পছন্দনীয়。
পক্ষান্তরে আগুনের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য মাটির সম্পূণ বিপরীত। আগুনের মধ্যে রয়েছে উগ্রতা, তীব্রতা, উত্তাপ এবং ধ্বংস করার প্রবণতা। যেগুলো আল্লাহ তাআলার কাছে অপছন্দনীয়। যে কারণে তিনি আগুনকে জাহান্নামের সামগ্রী বানিয়েছেন। এরপর আল্লাহ তাআলা হযরত আদম আ.-কে অধিক মর্যাদা ও সম্মান দান করেছেন। (যা অভিশপ্ত ইবলিস অর্জন করতে পারে নি)। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অভিশপ্ত ইবলিস লানত ও লাঞ্ছনার পাত্র হয়ে গেল। ইবলিস নিম্নলিখিত কারণে অভিশপ্ত হয়েছিল। (১) হযরত আদম আ.-কে তুচ্ছ মনে করেছিল। (২) আল্লাহ তাআলার আদেশ অমান্য করেছিল। (৩) হযরত আদম আ.-কে সেজদা করার জন্য আল্লাহ তাআলার সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও সে (ইবলিস) নিজেকে আদম আ.-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ দাবি করে অমূলক যুক্তি দিয়েছিল। (৪) সত্যকে প্রত্যাখান করেছিল।
ইবলিস আদম আ.-কে তো সেজদা করলই না বরং সে উল্টো নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ও আমিত্ব প্রকাশ করল। এবং মানুষদেরকে পথভ্রষ্ট করে তার অনুগত করার কথা বলল। সেই সঙ্গে এর জন্য সে কেয়ামত পর্যন্ত অবকাশ চাইল। ইবলিসের এই অপরাধ প্রথম অপরাধের চেয়েও জঘন্যতর ছিল।
• হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “ফেরেশতাদেরকে নূর দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। আর জিনদেরকে ধোঁয়াবিহীন আগুন থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আদমকে সেই বস্তু দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে, যা তোমাদের বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ প্রত্যেক আদম সন্তানকে এমন মাটি দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে, যার বৈশিষ্ট্য ওই মাটির মধ্যে নিহিত।"
• হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, ইবনে আব্বাস ও সাহাবাগণের একটি দল এবং সাঈদ ইবনে মুসাইয়িব রহ. প্রমুখ বলেন, ইবলিস পৃথিবীর নিকটতম আকাশের ফেরেশতাদের সর্দার ছিল। হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, তার নাম ছিল 'আযাযিল'। হযরত আব্বাস রাযি.-এর এক বর্ণনা মতে তার নাম ছিল 'হারিস'। নাক্কাশ রাযি. বলেন, তার উপাধী ছিল 'আবু বকর দাওস'। • হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, 'ইবলিস ফেরেশতাদের একটি দলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। যাদেরকে জিন বলা হত। এরা জান্নাতের রক্ষক হিসেবে নিযুক্ত ছিল।'
যখন ইবলিস আল্লাহ তাআলার আদেশ অমান্য করে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করল, তখন আল্লাহ তাআলা তাকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য বললেন। সে আল্লাহর কাছে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবকাশ চাইল। আল্লাহ তাকে অবকাশ দান করলেন। সে বলল, "আপনার ক্ষমতার শপথ! আমি তাদের সকলকেই পথভ্রষ্ট করব, তবে তাদের মধ্যে আপনার একনিষ্ঠ বান্দাদের নয়। আল্লাহ তাআলা বললেন: “তবে এটাই সত্য আর আমি সত্যই বলি- তোমার দ্বারা ও তোমার অনুসারীদের দ্বারা আমি জাহান্নাম পূর্ণ করবই।"
• হযরত সুবরা বিন ফাকিহা রাযি. থেকে ইমাম আহমদ রহ, একটি হাদিস বর্ণনা করেন। হযরত সুবরা বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি : “নিশ্চয়ই শয়তান আদম সন্তানদের পথভ্রষ্ট করার জন্য রাস্তায় (ওঁৎ পেতে) বসে থাকে।” (আহমাদ: ৩/৪৮৩, নাসাঈ)
📄 জান্নাত আসমানে না যমিনে!
হযরত আদম আ. যে জান্নাতে প্রবেশ করেছিলেন, তার অবস্থান আসমানে না যমিনে- এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। তা বিস্তারিত আলোচনা ও নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। জমহুর আলেমদের অভিমত হচ্ছে, তা আসমানে অবস্থিত জান্নাতুল মাওয়া। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে এবং বিভিন্ন হাদিসে যার ইঙ্গিত রয়েছে। যেমন এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন: وَقُلْنَا يَا آدَمُ اسْكُنْ أَنتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ "আমি বললাম, হে আদম! তুমি এবং তোমার সঙ্গিনী জান্নাতে বসবাস কর।"
এ আয়াতে الجنة এর আলিফ-লাম ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয় নি বরং তা দ্বারা সুনির্দিষ্ট একটি জান্নাতকে বুঝানো হয়েছে। তা হলো জান্নাতুল মাওয়া। আবার মূসা আ. হযরত আদম আ.-কে বলেছিলেন, কেন আপনি আমাদেরকে এবং নিজেকে জান্নাত থেকে বের করলেন? এটি একটি হাদিসের অংশ। তবে এ বিষয়ে পরে আলোচনা করা হবে।
• সহি মুসলিম শরিফে বর্ণিত আছে, আবু হোরায়রা রাযি. ও হুযাইফা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে সমবেত করবেন। ফলে মুমিনগণ এমন সময় উঠে দাঁড়াবে, যখন জান্নাত তাদের কাছে এসে যাবে। তারা আদম আ.-এর কাছে এসে বলবেন, হে আমাদের পিতা! আমাদের জন্য আপনি জান্নাত খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন! তখন তিনি বলবেন, তোমাদের পিতার অপরাধেই তো তোমাদেরকে জান্নাত থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। এ হাদিস প্রমাণ করে, হযরত আদম আ. যে জান্নাতে বসবাস করেছিলেন, তা হলো জান্নাতুল মাওয়া। কিন্তু এ যুক্তিটিও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়।
অন্যরা বলেন: আল্লাহ তাআলা আদম আ.-কে যে জান্নাতে বসবাস করতে দিয়েছিলেন, তা 'জান্নাতুল খুলদ' তথা অনন্ত জান্নাত ছিল না। কারণ, নির্দিষ্ট একটি গাছের ফল খেতে নিষেধ করে সেখানে তাঁর ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। তিনি সেখানে নিদ্রা যান, সেখান থেকে তাঁকে বহিষ্কারও করা হয় এবং ইবলিসও সেখানে তাঁর কাছে উপস্থিত হয়। এ সব কটি বিষয়ই প্রমাণ করে, সেটি জান্নাতুল মাওয়া ছিল না। এ অভিমত হযরত উবাই ইবনে কাব, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ ও সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রহ. থেকে বর্ণিত। ইমাম আবু হানিফা রহ. ও তাঁর বিশিষ্ট শাগরিদগণ থেকেও এরূপ অভিমত বর্ণিত আছে。
• হযরত ইমাম রাযি রহ. তাঁর তাফসির গ্রন্থে আবুল কাসেম বলখী ও আবু মুসলিম ইস্পাহানি রহ. থেকে এবং কুরতুবি তাঁর তাফসির গ্রন্থে আবুল কাসেম বলখী ও আবু মুসলিম ইস্পাহানি রহ. থেকে এবং কুরতুবী তাঁর তাফসির গ্রন্থ 'মুতাযিলা ও কাদরিয়্যাহ' থেকে এ অভিমতটি উদ্ধৃত করেছেন। আহলে কিতাবিদের হাতে থাকা তাওরাত পাঠেও এর স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়। আবু মুহাম্মদ ইবনে হাযম 'আল-মিলাল ও আন-নিহাল' গ্রন্থে এবং আবু মুহাম্মদ ইবনে আতিয়া ও আবু ঈসা রুম্মানী আপন আপন তাফসিরে এ বিষয়টির মতভেদের কথা উল্লেখ করেছেন।
জমহুর আলেমদের বর্ণনায় প্রথম অভিমতের সমর্থন পাওয়া যায়। কাযি মাওয়ারদি রহ. তাঁর তাফসিরে বলেন, হযরত আদম ও হাওয়া আ. যে জান্নাতে বসবাস করেন, তার ব্যাপারে দুটি অভিমত রয়েছে। প্রথমত, তা জান্নাতুল খুলদ। দ্বিতীয়ত, তা স্বতন্ত্র এক জান্নাত। যা আল্লাহ তাআলা তাঁর পরীক্ষাস্থল হিসাবে তৈরি করেন। এটা সে জান্নাতুল খুলদ নয়, যা আল্লাহ তাআলা পুরস্কারের স্থান হিসাবে প্রস্তুত করে রেখেছেন।
এ দ্বিতীয় অভিমতের সমর্থকদের মধ্যে আবার মতভেদ রয়েছে। একদল বলেন, তার অবস্থান আসমানে। কারণ, আল্লাহ তাআলা আদম ও হাওয়া আ. কে জান্নাত থেকে নামিয়ে দিয়েছিলেন। এটা হাসানের অভিমত। অপর দল বলেন, সেটির অবস্থান পৃথিবীতে। কেননা আল্লাহ তাআলা সে জান্নাতে বহু ফল-ফলাদির মাঝে বিশেষ একটি গাছ সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তাদেরকে পরীক্ষা করেছিলেন।
বলা বাহুল্য, দ্বিতীয় অভিমতের সমর্থকগণ একটি প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেছেন, নিঃসন্দেহে সেজদা করা থেকে বিরত থাকার দরুন আল্লাহ তাআলা ইবলিসকে জান্নাত থেকে বিতাড়িত করেন এবং তাকে সেখান থেকে নেমে যাওয়ার আদেশ প্রদান করেন। আর এ আদেশটি কোনো শরয়ি আদেশ ছিল না, তাঁর বিরুদ্ধাচরণের অবকাশ থাকবে বরং তা ছিল এমন অখণ্ডনীয় তকদির সংক্রান্ত নির্দেশ, যার বিরুদ্ধাচরণের কোনো অবকাশ থাকে না। তাই আল্লাহ তাআলা বলেন:
قَالَ اخْرُجْ مِنْهَا مَنْءُ ومَا مَدْحُورًا "এখান থেকে তুমি ধিকৃত ও বিতাড়িত অবস্থায় বের হয়ে যাও।" (সূরা আরাফ: ১৮)
قَالَ فَاهْبِطُ مِنْهَا فَمَا يَكُونُ لَكَ أَنْ تَتَكَبَّرَ فِيهَا "এ স্থান থেকে তুমি নেমে যাও! এখানে থেকে তুমি অহঙ্কার করবে, এ হতে পারে না।" (সূরা আরাফ: ১৩)
قَالَ فَاخْرُجُ مِنْهَا فَإِنَّكَ رَحِيمٌ (٣٤) "তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও! কারণ, তুমি অভিশপ্ত।” (সূরা হিজর : ৩৪)
এ আয়াতগুলোতে منهاএর সর্বনামটি দ্বারা الجنة (জান্নাত) কিংবা السماء (আসমান) অথবা المنزلة (আবাসস্থল) বুঝানো হয়েছে। যাই হোক! নিঃসন্দেহে ইবলিসকে যে স্থান থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল, সেখানে সামান্যতম সময়ের জন্যেও তার উপস্থিতি থাকার কথা নয়।
তাঁরা বলেন, কোরআনের বাহ্যিক বর্ণনাভঙ্গি থেকে আরো প্রমাণিত, ইবলিস আদম আ. কে এই বলে কুমন্ত্রণা দিয়েছিল:
هَلْ أَدُلُّكَ عَلَى شَجَرَةِ الْخُلْدِ وَمُلْكٍ لَا يَبْلَى (۱۲۰) “হে আদম! আমি কি তোমাকে বলে দিব, অনন্ত জীবনপ্রদ বৃক্ষের কথা এবং অক্ষয় রাজ্যের কথা? (সূরা ত্বহা: ১২০)
وَقَالَ مَا نَهَا كُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ إِلَّا أَنْ تَكُونَا مَلَكَيْنِ أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ (٢٠) وَقَاسَمَهُمَا إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ النَّاصِحِينَ (۲۱) فَدَلَّا هُمَا بِغُرُورٍ "আর সে বলল: পাছে তোমরা উভয়ে ফেরেশতা হয়ে যাও কিংবা তোমরা স্থায়ী হও, এ জন্যই তোমাদের প্রতিপালক এ বৃক্ষ সম্বন্ধে তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন। সে তাদের উভয়ের নিকট শপথ করে বলল, আমি তোমাদের হিতাকাঙ্ক্ষীদের একজন। এভাবে সে তাদেরকে প্রবঞ্চনা দ্বারা অধঃপতিত করল। (সূরা আরাফ: ২০-২২)
এ আয়াতগুলো স্পষ্ট প্রমাণ করে, আদম ও হাওয়া আ.-এর সঙ্গে ইবলিসের সাক্ষাৎ ঘটেছিল জান্নাতে। তাঁদের এ প্রশ্নের জবাবে বলা হয়েছে, নিয়মিত বসবাসের ভিত্তিতে না হলেও যাতায়াত ও আনাগোনার সুবাদে জান্নাতে আদম ও হাওয়া আ.-এর সঙ্গে ইবলিসের একত্র হওয়া বিচিত্র নয়। কিংবা হতে পারে জান্নাতের দরজায় দাঁড়িয়ে বা আকাশের নিচে থেকে ইবলিস তাঁদেরকে কুমন্ত্রণা দিয়েছিল। তবে তিনটি জবাবের কোনোটিই সন্দেহমুক্ত নয়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।