📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 সর্বপ্রথম পোশাক

📄 সর্বপ্রথম পোশাক


হযরত আদম ও হাওয়া আ. সর্বপ্রথম যে পোশাক পরিধান করেন, তা ছিল ভেড়ার পশমের তৈরি। প্রথমে চামড়া থেকে পশমগুলো খসিয়ে তা দিয়ে সুতা তৈরি করেন। তারপর আদম আ. নিজের জন্য একটি জুব্বা আর হাওয়া আ.-এর জন্য একটি কামিজ ও একটি ওড়না তৈরি করে নেন। জান্নাতে থাকাবস্থায় তাঁদের কোনো সন্তানাদি জন্মেছিল কি না, এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কারো কারো মতে পৃথিবী ছাড়া অন্য কোথাও তাঁদের কোনো সন্তান জন্মে নি। কেউ বলেন, জন্মেছে। কাবিল ও তার বোনের জন্ম জান্নাতেই হয়েছিল। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।

উল্লেখ‍্য, প্রতি দফায় আদম আ.-এর এক সঙ্গে একটি পুত্র সন্তান ও একটি কন্যা সন্তান জন্ম নিত। আর একগর্ভের পুত্রের সঙ্গে পরবর্তী গর্ভের কন্যার ও কন্যার সঙ্গে পুত্রের বিবাহ দেওয়ার বিধান ছিল। পরবর্তী সময়ে একই গর্ভের দু ভাই-বোনের এরূপ বিবাহ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 আদম আ.-কে সৃষ্টির ঘোষণা

📄 আদম আ.-কে সৃষ্টির ঘোষণা


আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি ফেরেশতাদেরকে সম্বোধন করে বলেছিলেন:

إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً "পৃথিবীতে আমি প্রতিনিধি সৃষ্টি করছি।" (সূরা বাকারা: ৩০)

এ ঘোষণায় আল্লাহ তাআলা আদম আ. ও তাঁর বংশধরদের সৃষ্টি করার সংকল্প ব্যক্ত করেছেন, যারা একে অপরের প্রতিনিধিত্ব করবে। যেমন- এক আয়াতে তিনি বলেন:

وَهُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلَائِفَ الْأَرْضِ "তিনিই তোমাদেরকে দুনিয়ার প্রতিনিধি বানিয়েছেন। (সূরা আন'আম : ১৬৫)

এ ঘোষণা দ্বারা আল্লাহ তাআলা সংকল্প ব্যক্ত করণার্থে ফেরেশতাদেরকে আদম আ. ও তাঁর বংশধরদের সৃষ্টি করার কথা জানিয়ে দেন। যেমন বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের আগাম সংবাদ দেওয়া হয়ে থাকে। ঘোষণা শুনে ফেরেশতাগণ বললেন:

أَتَجْعَلُ فِيهَا مَنْ يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاءَ "আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যে সেখানে অশান্তি ঘটাবে ও রক্তপাত করবে?” (সূরা বাকারা: ৩০)

ফেরেশতাগণ বিষয়টির তাৎপর্য জানা এবং তার রহস্য সম্পর্কে অবগতি লাভ করার উদ্দেশ্যে এ কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন। আদম সন্তানদের অমর্যাদা বা তাদের প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করা উদ্দেশ্য আদৌ ছিল না। যেমনটা কোনো কোনো মুফাসসির গলত ধারণা করেছেন। তারা বলেছিলেন, আপনি কি পৃথিবীতে ফ্যাসাদ্ সৃষ্টিকারী ও রক্তপাতকারী কাউকে সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন? এর ব্যাখ্যায় কেউ কেউ বলেন, আদমের পূর্বে যে জিন জাতির বসবাস ছিল, তাদের কার্যকলাপ দেখে ফেরেশতাগণ জানতে পেরেছিলেন, আগামীতেও এমন অঘটন ঘটবে। এটা কাতাদার অভিমত।

• আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. বলেন, আদম আ.-এর পূর্বে জিন জাতি দু হাজার বছর পৃথিবীতে বসবাস করে। তারা রক্তপাতে লিপ্ত হলে আল্লাহ তাআলা তাদের কাছে একদল ফেরেশতা বাহিনী প্রেরণ করেন। তারা তাদেরকে বিভিন্ন দ্বীপে তাড়িয়ে দেন। ইবনে আব্বাস রাযি. থেকেও এরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়।

• হাসান রহ. থেকে বর্ণিত আছে, ফেরেশতাগণের প্রতি এ তথ্য ইলহাম করা হয়েছিল। কেউ বলেন, লাওহে মাহফুয থেকে তাঁরা এ ব্যাপারে অবগত হয়েছিলেন।

কেউ বলেন, মারূত ও হারূত তাদেরকে তা অবগত করেছিলেন। তাঁরা দু জন তা জানতে পেরেছিলেন তাঁদের উপরস্থ শাজাল নামক এক ফেরেশতার কাছ থেকে। ইবনে আবু হাতিম রহ. আবু জাফর বাকির রহ. সূত্রে এটা বর্ণনা করেন। কেউ কেউ বলেন, তাদের একথা জানা ছিল, মাটি থেকে সৃষ্ট জীবের স্বভাব এরূপ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাই তারা বলেছিলেন,

وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ "আমরা সর্বদা আপনার ইবাদত করি। আমাদের মধ্যকার কেউ আপনার অবাধ্যতা করে না।) এখন যদি এদেরকে সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য এই হয়, তারা আপনার ইবাদত করবে; তবে আমরাই তো রাত-দিন অবিশ্রান্তভাবে এ কাজে নিয়োজিত রয়েছি।

قَالَ إِنِّي أَعْلَمُ مَا لَا تَعْلَمُونَ "এদেরকে সৃষ্টি করার মধ্যে যে কী স্বার্থকতা রয়েছে, তা আমি জানি- তোমরা জান না। অর্থাৎ অদূর ভবিষ্যতে এদেরই মধ্য থেকে বহু নবী-রাসূল, সিদ্দিক ও শহিদের জন্ম হবে।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 আদম আ.-কে শিক্ষাদান

📄 আদম আ.-কে শিক্ষাদান


তারপর আল্লাহ তাআলা ইলমের ক্ষেত্রে ফেরেশতাগণের উপর আদমের শ্রেষ্ঠত্বের কথা ব্যক্ত করে বলেন:

وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا "এবং তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন।"

• ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, "তা হলো সেসব নাম, যদ্বারা মানুষ পরিচিতি লাভ করে থাকে। যেমন: মানুষ, জীব, ভূমি, স্থলভাগ ও জলভাগ, পাহাড়-পর্বত, উট-গাধা ইত্যাদি।"

• অন্য এক বর্ণনায় আছে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে ডেগ-ডেকচি, থালা-বাসন থেকে আরম্ভ করে বায়ু নির্গমনের নাম পর্যন্ত শিক্ষা দেন।

• মুজাহিদ রহ. বলেন: "আল্লাহ তাঁকে সকল জীব-জন্তু, পশু-পাখি ও সকল বস্তুর নাম শিক্ষা দিয়েছেন।" সাঈদ ইবনে যুবায়ের রহ. এবং কাতাদা রহ. সহ প্রমুখ এরূপ বলেছেন। রাবী বলেন: "আল্লাহ তাআলা তাঁকে ফেরেশতাগণের নামসমূহ শিক্ষা দেন। আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ রহ. বলেন: "আল্লাহ তাঁকে তাঁর সন্তানদের নাম শিক্ষা দিয়েছেন।" সঠিক কথা হলো, আল্লাহ তাআলা আদম আ.-কে ছোট-বড় সকল বস্তু ও তার গুণাগুণ বা বৈশিষ্ট্যের নাম শিক্ষা দেন। ইবনে আব্বাস রাযি. এ দিকে ইঙ্গিত করেছেন।

• ইমাম বোখারি রহ. ও মুসলিম রহ. এ প্রসঙ্গে আনাস ইবনে মালিক রাযি., কাতাদা এবং সাঈদ ও হিশামের সূত্রে বর্ণিত একটি হাদিস উল্লেখ করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: "কেয়ামতের দিন মুমিনগণ সমবেত হয়ে বলবে, আল্লাহর নিকট সুপারিশ করার জন্য আমরা যদি কারো কাছে আবেদন করতাম! এই বলে তারা আদম আ.-এর কাছে এসে বলবে, আপনি মানব জাতির পিতা। আল্লাহ আপনাকে নিজ কুদরতি হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণকে আপনার সামনে সিজদাবনত করেছেন ও আপনাকে যাবতীয় বস্তুর নাম শিক্ষা দিয়েছেন ...।

ثُمَّ عَرَضَهُمْ عَلَى الْمَلَائِكَةِ فَقَالَ أَنْبِئُونِي بِأَسْمَاءِ هَؤُلَاءِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ "তারপর সেগুলো ফেরেশতাগণের সম্মুখে পেশ করলেন এবং বললেন, তোমরা আমাকে এ সবের নাম বলে দাও যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক।" (সূরা বাকারা: ৩১)

• হাসান বসরি রহ. বলেন, আল্লাহ তাআলা আদম আ. কে সৃষ্টি করতে চাইলে ফেরেশতারা বললেন: আমাদের রব যাকেই সৃষ্টি করুন না কেন আমরাই তাঁর চাইতে বেশি জ্ঞানী প্রতিপন্ন হবো। তাই এভাবে তাদেরকে পরীক্ষা করা হয়। 'যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক' বলে এদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন মুফাসসির বিভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন।

قَالُوا سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا إِنَّكَ أَنْتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ (۳۲) "তারা (ফেরেশতারা) বলল, আপনি পবিত্র। আপনি আমাদের যা শিক্ষা দিয়েছেন, তা ছাড়া আমাদের তো কোনো জ্ঞান নেই। বস্তুত আপনি জ্ঞানময় ও প্রজ্ঞাময়।" (সূরা বাকারা: ৩২) অপর এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ "তিনি যা ইচ্ছা করেন, তা ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে না।" (সূরা বাকারা: ২৫৫)

قَالَ يَا آدَمُ أَنْبِتُهُمْ بِأَسْمَائِهِمْ فَلَمَّا أَنْبَأَهُمْ بِأَسْمَائِهِمْ قَالَ أَلَمْ أَقُلْ لَكُمْ إِنِّي أَعْلَمُ غَيْبَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَأَعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَمَا كُنْتُمْ تَكْتُمُونَ (۳۳) "আল্লাহ বলেন, হে আদম! তাদেরকে এগুলোর নাম বলে দাও। যখন সে এ সকল নাম বলে দিল, তিনি বললেন: আমি কি তোমাদেরকে বলি নি, আকাশসমূহ ও পৃথিবীর অদৃশ্য বস্তু সম্বন্ধে আমি নিশ্চিতভাবে অবহিত এবং তোমরা যা ব্যক্ত কর বা গোপন রাখ, আমি তাও জানি?” (সূরা বাকারা: ৩৩)

অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা গোপন বিষয় তেমনিভাবেই জানেন, যেভাবে জানেন প্রকাশ্য বিষয়। কারো মতে "প্রকাশ্য বিষয়” অবহিত দ্বারা এখানে ফেরেশতাদের কথা বুঝানো হয়েছে। যা তারা (ফেরেশতাগণ) আল্লাহ তাআলার আদম আ.-কে সৃষ্টির ঘোষণা শুনে বলেছিলেন। তারা বলেছিলেন:

أَتَجْعَلُ فِيهَا مَنْ يُفْسِدُ فِيهَا "আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যে সেখানে অশান্তি ঘটাবে?" (সূরা বাকারা: ৩০)

আর "গোপন বিষয়” অবহিত হওয়ার দ্বারা ইবলিসের অন্তরে যে অহঙ্কার ও বড়ত্ব গোপন ছিল, তাকে বুঝানো হয়েছে। হযরত সাঈদ ইবনে যোবায়ের, মুজাহিদ, সুররী, যিহাক, সাওরি ও ইবনে জারির রহ. তাঁরা সকলেই এ অভিমত সমর্থন করেছেন।

আবুল আলীয়া, রবী, হাসান ও কাতাদা রহ. বলেন: وَأَعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَمَا كُنتُمْ تَكْتُمُونَ "(যা তোমরা গোপন রাখ)" এর দ্বারা ফেরেশতাদের সে কথাকে বুঝানো হয়েছে, আমাদের প্রতিপালক, আমাদের চাইতে জ্ঞানবান ও মর্যাদাবান কাউকে সৃষ্টি করবেন না।"

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 সিজদার আদেশ দান এবং ইবলিসের অবাধ্যতা ও লাঞ্ছনা

📄 সিজদার আদেশ দান এবং ইবলিসের অবাধ্যতা ও লাঞ্ছনা


আল্লাহ তাআলা বলেন: وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَى وَاسْتَكْبَرَ "যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম : তোমরা আদমকে সিজদা করো! তখন ইবলিস ছাড়া সকলেই সিজদা করল, সে অমান্য করল ও অহঙ্কার করল।" (সূরা বাকারা: ৩৪)

আল্লাহ তাআলা হযরত আদম আ.-কে সেজদা করার জন্য ফেরেশতাদের যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, সেই নির্দেশ এবং তা বাস্তবায়নের মধ্যে নিহিত ছিল হযরত আদম আ.-এর জন্য বিরাট সম্মান ও মর্যাদা। আদম আ.-কে আল্লাহ তাআলা তাঁর কুদরতি হাতে সৃষ্টি করে তাতে রূহ সঞ্চার করার পর ফেরেশতাদেরকে আদেশ করলেন তাঁকে ওই সিজদা করার জন্য। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন: فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِنْ رُوحِي فَقَعُوا لَهُ سَاجِدِينَ (۲۹) "যখন আমি তাকে সুঠাম করব এবং তাতে আমার রূহ সঞ্চার করব, তখন তোমরা তার প্রতি সিজদাবনত হয়ো।" (সূরা হিজর: ২৯)

ফন্ট সাইজ
15px
17px