📄 কোরআনুল কারিমের আলোকে হযরত আদম আ.
পবিত্র কোরআনুল কারিমে হযরত আদম আ.-এর নাম ২৫ বার এসেছে। কোরআন মাজিদে পয়গম্বরগণের আলোচনায় সর্বপ্রথম হযরত আদম আ.-এর আলোচনা এসেছে। সূরা বাকারা, আরাফ, ইসরা, কাহাফ এবং ত্বহায় তাঁর নাম, গুণাবলী ও কার্যাবলীর আলোচনা হয়েছে। সূরা হিজর ও ছোয়াদে শুধু গুণাবলী এবং সূরা আল- ইমরান, মায়েদা, মারইয়াম এবং ইয়াসিনে আনুসাঙ্গিকরূপে শুধু নামের উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً قَالُوا أَتَجْعَلُ فِيهَا مَنْ يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاءَ وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ قَالَ إِنِّي أَعْلَمُ مَا لَا تَعْلَمُونَ (۳۰) وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمْ عَلَى الْمَلَائِكَةِ فَقَالَ أَنْبِئُونِي بِأَسْمَاءِ هَؤُلَاءِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ (۳۱) قَالُوا سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا إِنَّكَ أَنْتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ (۳۲) قَالَ يَا آدَمُ أَنْبِتُهُمْ بِأَسْمَائِهِمْ فَلَمَّا أَنْبَأَهُمْ بِأَسْمَائِهِمْ قَالَ أَلَمْ أَقُلْ لَكُمْ إِنِّي أَعْلَمُ غَيْبَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَأَعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَمَا كُنْتُمْ تَكْتُمُونَ (۳۳) وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَى وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ (٣٤) وَقُلْنَا يَا آدَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ وَكُلا مِنْهَا رَغَدًا حَيْثُ شِئْتُهَا وَلَا تَقْرَبَا هَذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ (٣٥) فَأَزَلَّهُمَا الشَّيْطَانُ عَنْهَا فَأَخْرَجَهُمَا مِمَّا كَانَا فِيهِ وَقُلْنَا اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَمَتَاعٌ إِلَى حِينٍ (٣٦) فَتَلَقَّى آدَمُ مِنْ رَبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ (۳۷) قُلْنَا اهْبِطُوا مِنْهَا جَمِيعًا فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ مِنِّي هُدًى فَمَنْ تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ (۳৮) وَالَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِآيَاتِنَا أُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
"স্মরণ করো, যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বললেন, আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করছি। তারা বলল: আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যে অশান্তি ঘটাবে ও রক্তপাত করবে? আমরাই তো আপনার সপ্রশংস স্তুতি ও পবিত্রতা ঘোষণা করি। তিনি বললেন, আমি যা জানি তোমরা জান না।" এবং তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন, তারপর তিনি সমুদয় ফেরেশতার সম্মুখে তা প্রকাশ করলেন এবং বললেন, তোমরা আমাকে এ সবের নাম বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও! তারা বলল, আপনি মহান, পবিত্র! আপনি আমাদের যা শিক্ষা দিয়েছেন, তা ছাড়া আমাদের তো কোনো জ্ঞানই নেই। বস্তুত আপনি মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়।
তিনি বললেন, হে আদম! তাদেরকে এ সবের নাম বলে দাও। যখন সে তাদেরকে এ সবের নাম বলে দিল- তিনি বললেন: আমি কি তোমাদের বলি নি, আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর অদৃশ্য বস্তু সম্বন্ধে আমি নিশ্চিতভাবে অবহিত এবং তোমরা যা প্রকাশ কর আর যা গোপন কর, আমি তা-ও জানি? আর যখন ফেরেশতাদের বললাম, তোমরা আদমকে সিজদা করো! তখন ইবলীস ছাড়া সকলেই সিজদা করল। সে অমান্য করল ও অহংকার করল। সুতরাং সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। এবং আমি বললাম, হে আদম! তুমি ও তোমার সঙ্গিনী জান্নাতে বসবাস কর এবং যেথায় ইচ্ছে আহার করো; কিন্তু এ বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়ো না। তা হলে তোমরা অন্যায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
কিন্তু শয়তান সেখান থেকে তাদের পদস্খলন ঘটাল এবং তারা যেখানে ছিল সেখান থেকে তাদের বিতাড়িত করল। আমি বললাম তোমরা একে অন্যের শত্রুরূপে নেমে যাও আর পৃথিবীতে কিছুকালের জন্য তোমাদের রইল বসবাস ও জীবিকা। তারপর আদম তার প্রতিপালকের কাছ থেকে কিছু বাণী প্রাপ্ত হলো। আল্লাহ তার প্রতি ক্ষমাপরবশ হলেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, দয়ালু। আমি বললাম, তোমরা সকলেই স্থান থেকে নেমে যাও। পরে যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সৎপথের কোনো নির্দেশ আসবে, তখন যারা আমার সৎপথের অনুসরণ করবে, তাদের কোনে ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। যারা কুফরি করবে ও আমার নির্দেশসমূহ অস্বীকার করবে, তারাই হবে জাহান্নামী। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। (সূরা বাকারা: ৩০-৩৯)
অন্য আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন-
إِنَّ مَثَلَ عِيسَى عِنْدَ اللَّهِ كَمَثَلِ آدَمَ خَلَقَهُ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ (٥٩) "আল্লাহর কাছে ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের দৃষ্টান্তের মতো। আল্লাহ তাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছিলেন। তারপর তাকে বলেছিলেন, হও! ফলে সে হয়ে যায়।" (আল-ইমরান: ৫৯)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا "হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো, তিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন। এবং তাদের দু'জন থেকে বিস্তার করেছেন বহু নর-নারী। আর সেই আল্লাহকে ভয় করো, যার নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচনা কর এবং সতর্ক থাকো আত্মীয়তার বন্ধন সম্পর্কে। আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখেন।” (সূরা নিসা: ১)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন:
هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا "তিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও তার থেকে সৃষ্টি করেছেন তার সঙ্গিনী, যাতে সে তার কাছে প্রশান্তি লাভ করে।” (সূরা আ'রাফ: ১৮৯)
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَقَدْ خَلَقْنَاكُمْ ثُمَّ صَوَّرْنَاكُمْ ثُمَّ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ لَمْ يَكُنْ مِنَ السَّاجِدِينَ (١١) قَالَ مَا مَنَعَكَ أَلَّا تَسْجُدَ إِذْ أَمَرْتُكَ قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ (١٢) قَالَ فَاهْبِطُ مِنْهَا فَمَا يَكُونُ لَكَ أَنْ تَتَكَبَّرَ فِيهَا فَاخْرُجْ إِنَّكَ مِنَ الصَّاغِرِينَ (١٢) قَالَ أَنظِرْنِي إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ (١٤) قَالَ إِنَّكِ مِنَ الْمُنْظَرِينَ (١٥) قَالَ فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأُقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ (۱۱) ثُمَّ لَآتِيَنَّهُمْ مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَنْ شَمَائِلِهِمْ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَاكِرِينَ (۱۷) قَالَ اخْرُجُ مِنْهَا مَنْعُوَمًا مَدْحُورًا لَمَنْ تَبِعَكَ مِنْهُمْ لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنْكُمْ أَجْمَعِينَ (۱۸) وَيَا آدَمُ اسْكُنُ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ فَكُلًّا مِنْ حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هَذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ (۱۹) فَوَسْوَسَ لَهُمَا الشَّيْطَانُ لِيُبْدِيَ لَهُمَا مَا وُورِيَ عَنْهُمَا مِنْ سَوْآتِهِمَا وَقَالَ مَا نَهَا كُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ إِلَّا أَنْ تَكُونَا مَلَكَيْنِ أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ (۲۰) وَقَاسَمَهُمَا إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ النَّاصِحِينَ (۲۱) فَدَلَّا هُمَا بِغُرُورٍ فَلَمَّا ذَاقَا الشَّجَرَةَ بَدَتْ لَهُمَا سَوْآتُهُمَا وَطَفِقَا يَخْصِفَانِ عَلَيْهِمَا مِنْ وَرَقِ الْجَنَّةِ وَنَادَاهُمَا رَبُّهُمَا أَلَمْ أَنْهَكُمَا عَنْ تِلْكُمَا الشَّجَرَةِ وَأَقُلْ لَكُمَا إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمَا عَدُوٌّ مُبِينٌ (٢٢) قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ (২৩) قَالَ اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَمَتَاعٌ إِلَى حِينٍ (٢٤) قَالَ فِيهَا تَحْيَوْنَ وَفِيهَا تَمُوتُونَ وَمِنْهَا تُخْرَجُونَ (٢٥)
"আমিই তোমাদের সৃষ্টি করেছি, তারপর রূপদান করেছি, তারপর ফেরেশতাদের বলেছি আদমকে সিজদা করতে। তখন ইবলিস ছাড়া সকলেই সিজদা করে; সে সিজদাকারীদের দলভুক্ত হয় নি।" তিনি বললেন, "আমি যখন তোমাকে আদেশ দিলাম তখন সিজদা করা থেকে কী সে তোমাকে বারণ করল? সে বলল, আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ; আমাকে তুমি আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছ আর তাকে সৃষ্টি করেছ কাদা মাটি দিয়ে। তিনি বললেন, এখান থেকে তুমি নেমে যাও- এখানে থেকে তুমি অহংকার করবে, তা হতে পারে না। সুতরাং তুমি বের হয়ে যাও, তুমি অধমদের অন্তর্ভুক্ত।” সে বলল, পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত তুমি আমাকে অবকাশ দাও। তিনি বললেন, যাদেরকে অবকাশ দেওয়া হয়েছে তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হলে। ইবলিস বলল, তুমি আমাকে শাস্তি দান করলে, তাই আমিও নিঃসন্দেহে তোমার সরল পথে মানুষের জন্য ওঁৎ পেতে থাকব। তারপর আমি নিশ্চয় তাদের সম্মুখ, পশ্চাৎ, ডান ও বাম দিক থেকে তাদের কাছে আসব আর তুমি তাদের অধিকাংশকেই কৃতজ্ঞ পাবে না।" তিনি বললেন, "এখান থেকে তুমি ধিকৃত ও বিতাড়িত অবস্থায় বের হয়ে যাও; মানুষের মধ্যে যারা তোমার অনুসরণ করবে, নিশ্চয় আমি তোমাদের সকলের দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করবই। আর বললাম, হে 'আদম! তুমি ও তোমার সঙ্গিনী জান্নাতে বসবাস করো এবং যেখান থেকে যা ইচ্ছে আহার কর; কিন্তু এ গাছের নিকটবর্তীও হয়ো না। অন্যথায় তোমরা জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।” তারপর তাদের গোপন করে রাখা লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ করার জন্য শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দিল এবং বলল, পরে না তোমরা ফেরেশতা হয়ে যাও কিংবা তোমরা চিরস্থায়ী হও- এ জন্য তোমাদের প্রতিপালক এ বৃক্ষ সম্বন্ধে তোমাদের নিষেধ করেছেন। এবং সে তাদের উভয়ের কাছে শপথ করে বলল, আমি তোমাদের হিতাকাঙ্ক্ষীদের একজন।
এভাবে সে প্রবঞ্চনা দ্বারা তাদের অধঃপতিত করল। তারপর যখন তারা সে বৃক্ষফল আস্বাদন করল, তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ল এবং তারা জান্নাতের পাতা দিয়ে নিজেদের ঢাকতে লাগল। তখন তাদের প্রতিপালক তাদেরকে সম্বোধন করে বললেন, আমি কি তোমাদের এ বৃক্ষের নিকটবর্তী হতে নিষেধ করি নি এবং আমি কি তোমাদেরকে বলি নি যে, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু? তারা বলল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করেছি, তুমি যদি আমাদের ক্ষমা না কর এবং দয়া না কর; তা হলে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব। তিনি বললেন, তোমরা একে অন্যের শত্রুরূপে নেমে যাও এবং পৃথিবীতে কিছু দিনের জন্যে তোমাদের রইল আবাসন ও জীবিকা। তিনি বললেন : সেখানেই তোমরা জীবন যাপন করবে, সেখানেই তোমাদের মৃত্যু হবে এবং সেখান থেকেই তোমাদের বের করে আনা হবে। (সূরা আরাফ: ১১-২৫)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন- مِنْهَا خَلَقْنَاكُمْ وَفِيهَا نُعِيدُكُمْ وَمِنْهَا نُخْرِجُكُمْ تَارَةً أُخْرَى "এ (মাটি) থেকে তোমাদের সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদের ফিরিয়ে দেব এবং সেখান থেকেই পুনরায় তোমাদের বের করে আনব।" (সূরা ত্বহা : ৫৫)
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ صَلْصَالٍ مِنْ حَمَإٍ مَسْنُونٍ (٢٦) وَالْجَانَّ خَلَقْنَاهُ مِنْ قَبْلُ مِنْ نَارِ السَّمُومِ (۲۷) وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي خَالِقٌ بَشَرًا مِنْ صَلْصَالٍ مِنْ حَمَإٍ مَسْنُونٍ (۲۸) فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِنْ رُوحِي فَقَعُوا لَهُ سَاجِدِينَ (۲۹) فَسَجَدَ الْمَلَائِكَةُ كُلُّهُمْ أَجْمَعُونَ (۲٠) إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَى أَنْ يَكُونَ مَعَ السَّاجِدِينَ (۳۱) قَالَ يَا إِبْلِيسُ مَا لَكَ أَلَّا تَكُونَ مَعَ السَّاجِدِينَ (۳۲) قَالَ لَمْ أَكُنْ لِأَسْجُدَ لِبَشَرٍ خَلَقْتَهُ مِنْ صَلْصَالٍ مِنْ حَمَإٍ مَسْنُونٍ (۳۳) قَالَ فَاخْرُجُ مِنْهَا فَإِنَّكَ رَحِيمٌ (٣٤) وَإِنَّ عَلَيْكَ اللَّعْنَةَ إِلَى يَوْমِ الدِّينِ (٣٥) قَالَ رَبِّ فَأَنْظِرْنِي إِلَى يَوْমِ يُبْعَثُونَ (٣٦) قَالَ فَإِنَّكَ مِنَ الْمُنْظَرِينَ (৩৭) إِلَى يَوْمِ الْوَقْتِ الْمَعْلُومِ (৩৮) قَالَ رَبِّ بِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأُزَيِّنَنَّ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَلَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ (৩৯) إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ (٤٠) قَالَ هَذَا صِرَاطٌ عَلَيَّ مُسْتَقِيمٌ (٤١) إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ إِلَّا مَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْغَاوِينَ (٤٢) وَإِنَّ جَهَنَّمَ لَمَوْعِدُهُمْ أَجْمَعِينَ (٤٣) لَهَا سَبْعَةُ أَبْوَابٍ لِكُلِّ بَابٍ مِنْهُمْ جُزْءٌ مَقْسُومٌ (٤٤)
"আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি ছাঁচে-ঢালা শুকনো ঠনঠনে মাটি থেকে এবং তার পূর্বে সৃষ্টি করেছি জিন জাতিকে অতি উষ্ণ বায়ুর উত্তাপ থেকে। স্মরণ করো! যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদেরকে বললেন, আমি ছাঁচে-ঢালা শুকনো ঠনঠনে মাটি দিয়ে মানুষ সৃষ্টি করতে যাচ্ছি। যখন আমি তাকে সুঠাম করব এবং তাতে আমার রূহ সঞ্চার করব; তখন তোমরা তার সামনে সিজদায় পড়ে যেয়ো। তখন ফেরেশতাগণ সকলেই সিজদা করল কিন্তু ইবলিস সিজদা করল না। সে সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে অস্বীকার করল।"
আল্লাহ তাআলা বলেন, হে ইবলিস! কী ব্যাপার তুমি সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হলে না যে! সে বলল, আমি এমন মানুষকে সিজদা করার নই, যাকে আপনি ছাঁচে-ঢালা শুকনো ঠনঠনে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তাআলা বললেন, তবে তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও। কারণ, তুমি বিতাড়িত এবং কিয়ামত পর্যন্ত তোমার প্রতি রইল লানত।
সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমাকে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবকাশ দিন। আল্লাহ তাআলা বললেন, যাও, অবধারিত সময় আসা পর্যন্ত তোমাকে অবকাশ প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করা হল। সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আপনি যে আমাকে পথভ্রষ্ট করলেন, সে জন্য আমি পৃথিবীতে পাপকর্মকে মানুষের সামনে শোভন করে উপস্থাপন করব এবং আপনার মনোনীত বান্দাদের ছাড়া তাদের সকলকেই আমি বিপথগামী করে ছাড়ব।
আল্লাহ তাআলা বললেন, এ হলো আমার কাছে পৌঁছানোর সরল-সোজা পথ। বিভ্রান্ত দের মধ্যে যারা তোমার অনুসরণ করবে, তারা ছাড়া আমার বান্দাদের ওপর তোমার কোনো ক্ষমতা থাকবে না। অবশ্য তোমার অনুসারীদের সকলেরই নির্ধারিত স্থান হবে জাহান্নাম। যার সাতটি দরজা আছে। প্রত্যেক দরজার জন্য আছে পৃথক পৃথক দল। (সূরা হিজর: ২৬-৪৪)
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ قَالَ أَأَسْجُدُ لِمَنْ خَلَقْتَ طِينًا (٦١) قَالَ أَرَأَيْتَكَ هَذَا الَّذِي كَرَّمْتَ عَلَيَّ لَئِنْ أَخَرْتَنِ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ لَأَحْتَنِكَنَّ ذُرِّيَّتَهُ إِلَّا قَلِيلًا (٦٢) قَالَ اذْهَبْ فَمَنْ تَبِعَكَ مِنْهُمْ فَإِنَّ جَهَنَّمَ جَزَاؤُكُمْ جَزَاءً مَوْفُورًا (٦٣) وَاسْتَفْزِزْ مَنِ اسْتَطَعْتَ مِنْهُمْ بِصَوْتِكَ وَأَجْلِبْ عَلَيْهِمْ بِخَيْلِكَ وَرَجِلِكَ وَشَارِكُهُمْ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ وَعِدْهُمْ وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَانُ إِلَّا غُرُورًا (٦٤) إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ وَكَفَى بِرَبِّكَ وَكِيلًا (٦٥)
"স্মরণ কর! যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম 'আদমকে সিজদা কর', তখন ইবলিস ছাড়া সকলেই সিজদা করল। সে বলল: যাকে আপনি কাদা মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন, আমি কি তাকে সিজদা করব? সে আরো বলল, বলুন! ওকে যে আপনি আমার উপর উচ্চ মর্যাদা দান করলেন, তা কেন? আপনি যদি কিয়ামত পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দেন, তবে অল্প কয়েকজন ছাড়া তার বংশধরকে আমি আমার কর্তৃত্বাধীন করে ফেলব। আল্লাহ তাআলা বললেন, যাও, তাদের মধ্যে যারা তোমার অনুসরণ করবে, জাহান্নামই হবে তাদের সকলের শাস্তি; পূর্ণ শাস্তি। তোমার আহ্বানে ওদের মধ্যকার যাদেরকে পার পদস্খলিত কর! তুমি তোমার অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে তাদেরকে আক্রমণ কর এবং তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতিতে শরিক হয়ে যাও আর তাদের প্রতিশ্রুতি দাও। শয়তান তাদের যে প্রতিশ্রুতি দেয়; তা ছলনা মাত্র। আমার বান্দাদের ওপর তোমার কোনো ক্ষমতা নেই। কর্মবিধায়ক হিসেবে তোমার প্রতিপালকই যথেষ্ট।" (সূরা বনি ইসরাইল: ৬১-৬৫)
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْজُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ كَانَ مِنَ الْجِنِّ فَفَسَقَ عَنْ أَمْرِ رَبِّهِ أَفَتَتَّخِذُونَهُ وَذُرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِي وَهُمْ لَكُمْ عَدُوٌّ بِئْسَ لِلظَّالِمِينَ بَدَلًا (٥٠)
"আর স্মরণ কর! যখন আমি ফেরেশতাদের বলেছিলাম, আদমকে সিজদা কর! তখন ইবলিস ছাড়া তারা সকলেই সিজদা করল। সে ছিল জিনদের একজন। সে তার প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করল। তবে কি তোমরা আমার পরিবর্তে তাকে এবং তার বংশধরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করছ? অথচ তারা তোমাদের শত্রু। জালিমদের এ বিনিময় কত নিকৃষ্ট!" (সূরা কাহাফ: ৫০)
وَلَقَدْ عَهِدْنَا إِلَى آدَمَ مِنْ قَبْلُ فَنَسِيَ وَلَمْ نَجِدْ لَهُ عَزْمًا (١١٥) وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَى (١١٦) فَقُلْنَا يَا آدَمُ إِنَّ هَذَا عَدُوٌّ لَكَ وَلِزَوْجِكَ فَلَا يُخْرِ جَنَّكُمَا مِنَ الْجَنَّةِ فَتَشْقَى (۱۱۷) إِنَّ لَكَ أَلَّا تَجوعَ فِيهَا وَلَا تَعْرَى (۱১৮) وَأَنَّكَ لَا تَظْمَأُ فِيهَا وَلَا تَضْحَى (۱১৯) فَوَسْوَسَ إِلَيْهِ الشَّيْطَانُ قَالَ يَا آدَمُ هَلْ أَدُلُّكَ عَلَى شَجَرَةِ الْخُلْدِ وَمُلْكٍ لَا يَبْلَى (۱۲۰) فَأَكَلَا مِنْهَا فَبَدَتْ لَهُمَا سَوْآتُهُمَا وَطَفِقَا يَخْصِفَانِ عَلَيْهِمَا مِنْ وَرَقِ الْجَنَّةِ وَعَصَى آدَمُ رَبَّهُ فَغَوَى (১২১) ثُمَّ اجْتَبَاهُ رَبُّهُ فَتَابَ عَلَيْهِ وَهَدَى (۱۲۲) قَالَ اهْبِطَا مِنْهَا جَمِيعًا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ مِنِّي هُدًى فَمَنِ اتَّبَعَ هُدায়َ فَلَا يَضِلُّ وَلَا يَشْقَى (১২৩) وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى (١٢٤) قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَى وَقَدْ كُنْتُ بَصِيرًا (١٢٥) قَالَ كَذَلِكَ أَتَتَكَ آيَاتُنَا فَنَسِيتَهَا وَكَذَلِكَ الْيَوْمَ تُنْسَى (١٢٦)
"আমি তো ইতোপূর্বে আদমের প্রতি নির্দেশ দিয়েছিলাম। কিন্তু সে ভুলে গিয়েছিল। আমি তাকে সংকল্পে দৃঢ় পাই নি। স্মরণ কর! যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, আদমের প্রতি সিজদা করো! তখন ইবলিস ছাড়া সকলেই সিজদা করল; সে অমান্য করল। তারপর আমি বললাম, হে আদম! এ তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু। সুতরাং সে যেন কিছুতেই তোমাদেরকে জান্নাত থেকে বের করে না দেয়, দিলে তোমরা দুঃখ পাবে। তোমার জন্য এ-ই রইল, তুমি জান্নাতে ক্ষুধার্ত হবে না, নগ্নও হবে না এবং তথায় পিপাসার্ত হবে না; রৌদ্রক্লিষ্টও হবে না।
তারপর শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দিল। সে বলল, হে আদম! আমি কি তোমাকে বলে দিব অনন্ত জীবনপ্রদ গাছের কথা ও অক্ষয় রাজ্যের কথা? তারপর তারা তা থেকে ভক্ষণ করল; তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ল এবং তারা জান্নাতের গাছের পাতা দিয়ে নিজেদের আবৃত করতে লাগল। আদম তার প্রতিপালকের হুকুম অমান্য করল। ফলে সে ভ্রমে পতিত হল। এরপর তার প্রতিপালক তাকে মনোনীত করলেন, তার প্রতি ক্ষমাপরায়ণ হলেন ও তাকে পথ-নির্দেশ করলেন।
তিনি বললেন, তোমরা একই সঙ্গে জান্নাত থেকে নেমে যাও! তোমরা পরস্পর পরস্পরের শত্রু। পরে আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সৎ পথের নির্দেশ আসলে যে আমার নির্দেশ অনুসরণ করবে, সে বিপথগামী হবে না ও দুঃখ-কষ্ট পাবে না। যে আমার স্মরণে বিমুখ তার জীবন যাপন হবে সঙ্কুচিত এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন উত্থিত করব অন্ধ অবস্থায়। সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! কেন তুমি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলে? আমি তো চক্ষুষ্মান ছিলাম। তিনি বললেন: এরূপই আমার নির্দেশাবলী তোমার কাছে এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবেই আজ তুমিও বিস্মৃত হলে।" (সূরা ত্বহা: ১১৫-১২৬)
قُلْ هُوَ نَبَأٌ عَظِيمٌ (٦٧) أَنْتُمْ عَنْهُ مُعْرِضُونَ (٦٨) مَا كَانَ لِيَ مِنْ عِلْمٍ بِالْمَلَأُ الْأَعْلَى إِذْ يَخْتَصِمُونَ (٦٩) إِنْ يُوحَى إِلَيَّ إِلَّا أَنَّمَا أَنَا نَذِيرٌ مُبِينٌ (٧٠) إِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي خَالِقٌ بَشَرًا مِنْ طِينٍ (۷۱) فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِنْ رُوحِي فَقَعُوا لَهُ سَاجِدِينَ (۷২) فَسَجَدَ الْمَلَائِكَةُ كُلُّهُمْ أَجْمَعُونَ (۷۳) إِلَّا إِبْلِيسَ اسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ (٧٤) قَالَ يَا إِبْلِيسُ مَا مَنَعَكَ أَنْ تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ أَسْتَكْبَرْتَ أَمْ كُنْتَ مِنَ الْعَالِينَ (٧٥) قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ (٧٦) قَالَ فَاخْرُجُ مِنْهَا فَإِنَّكَ رَحِيمٌ (۷৭) وَإِنَّ عَلَيْكَ لَعْنَتِي إِلَى يَوْمِ الدِّينِ (۷۸) قَالَ رَبِّ فَأَنْظِرْنِي إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ (۷۹) قَالَ فَإِنَّكَ مِنَ الْمُنْظَرِينَ (৮০) إِلَى يَوْمِ الْوَقْتِ الْمَعْلُومِ (৮১) قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ (৮২) إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ (৮৩) قَالَ فَالْحَقُّ وَالْحَقَّ أَقُولُ (৮৪) لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنْكَ وَمِمَّنْ تَبِعَكَ مِنْهُمْ أَجْمَعِينَ (৮Update) قُلْ مَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُتَكَلِّفِينَ (৮৬) إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِلْعَالَمِينَ (৮৭) وَلَتَعْلَمُنَّ نَبَأَهُ بَعْدَ حِينٍ (৮৮)
"বলো, এ এক মহা সংবাদ। যা থেকে তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ; ঊর্ধ্বলোকে তাদের বাদানুবাদ সম্পর্কে আমার কোনো জ্ঞান ছিল না। আমার কাছে তা ওহি এসেছে, আমি একজন স্পষ্ট সতর্ককারী। স্মরণ কর! তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বলেছিলেন, আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি কাদা মাটি থেকে। যখন আমি তাকে সুষম করব, তখন তোমরা তার প্রতি সিজদাবনত হয়ো। তখন ইবলিস ছাড়া ফেরেশতারা সকলেই সিজদাবনত হলো। সে অহংকার করল এবং কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হলো।
তিনি বললেন, হে ইবলিস! আমি যাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছি, তার প্রতি সিজদাবনত হতে তোমাকে কী সে বাধা দিল? তুমি কি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলে, না তুমি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন? সে বলল, আমি তার থেকে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন আর তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদা মাটি থেকে। তিনি বললেন, তুমি এখানে থেকে বের হয়ে যাও, নিশ্চয়ই তুমি বিতাড়িত এবং তোমার ওপর আমার লানত স্থায়ী হবে কর্মফল দিবস পর্যন্ত।
সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমাকে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবকাশ দিন। তিনি বললেন, তুমি অবকাশ প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হলে অবধারিত সময় উপস্থিত হওয়ার দিন পর্যন্ত। সে বলল, আপনার ক্ষমতার শপথ! আমি তাদের সকলকেই পথভ্রষ্ট করব, তবে তাদের মধ্যে আপনার একনিষ্ঠ বান্দাদের নয়।
তিনি বললেন, তবে এটাই সত্য; আর আমি সত্যই বলি- তোমার দ্বারা ও তোমার অনুসারীদের দ্বারা আমি জাহান্নাম পূর্ণ করবই। বল, এর জন্য আমি তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না এবং যারা মিথ্যা দাবি করে, আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নই। এ তো বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ মাত্র। এর সংবাদ তোমরা অবশ্যই জানবে কিছুকাল পরে। (সূরা সোয়াদ: ৬৭-৮৮)
এ হলো কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে হযরত আদম আ.-এর সৃষ্টির বিবরণ।
📄 হাদিসের আলোকে হযরত আদম আ.-এর সৃষ্টি
• আবু মূসা আশআরী রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: আল্লাহ তাআলা আদম আ.-কে সমগ্র পৃথিবী থেকে সংগৃহীত এক মুঠো মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেন। তাই মাটি অনুপাতে আদম সন্তানের কেউ হয় সাদা, কেউ হয় গৌরবর্ণ, কেউ হয় কালো, কেউ মাঝামাঝি বর্ণের। আবার কেউ হয় নোংরা, কেউ হয় পরিচ্ছন্ন, কেউ হয় কোমল, কেউ হয় পাষাণ, কেউ-বা এগুলোর মাঝামাঝি। সামান্য শাব্দিক পার্থক্যসহ তিনি ভিন্ন সূত্রে উক্ত হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযি রহ. হাদিসটিকে হাসান সহি বলেছেন।
• সুদ্দী রহ. ইবনে আব্বাস ও ইবনে মাসউদ রাযি. সহ কয়েকজন সাহাবির সূত্রে বর্ণনা করেন। তারা বলেন: আল্লাহ তাআলা কিছু কাদা মাটি নেওয়ার জন্য জিবরাইল আ.-কে যমিনে প্রেরণ করেন। তিনি এসে মাটি নিতে চাইলে জমিন বলল, তুমি আমার অঙ্গহানি করবে বা আমাতে খুঁত সৃষ্টি করবে- এ ব্যাপারে তোমার কাছ থেকে আমি আল্লাহর পানাহ চাই। ফলে জিবরাঈল আ. মাটি না নিয়ে ফিরে গিয়ে বললেন, হে আমার রব! যমিন তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করায় আমি তাকে ছেড়ে এসেছি।
এবার আল্লাহ তাআলা মিকাইল আ.-কে প্রেরণ করেন। জমিন তাঁর কাছে থেকেও আশ্রয় প্রার্থনা করে বসে। তিনিও ফিরে গিয়ে জিবরাইল আ.-এর মতো বর্ণনা করেন। এবার আল্লাহ তাআলা আজরাইল আ.-কে প্রেরণ করেন। যমিন তাঁর কাছ থেকেও আশ্রয় প্রার্থনা করল। তিনি বললেন, আমি আল্লাহ তাআলার আদেশ বাস্তবায়ন না করে শূন্য হাতে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে তাঁর পানাহ চাই। এ কথা বলে তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে সাদা, লাল ও কালো রংয়ের কিছু মাটি সংগ্রহ করে মিশিয়ে নিয়ে যান। এ কারণেই আদম আ.-এর সন্তানদের এক একজনের গায়ের রং এক এক রকম হয়ে থাকে। আজরাইল আ. মাটি নিয়ে উপস্থিত হলে আল্লাহ তাআলা মাটিগুলো ভিজিয়ে নেন। এতে তা আঠালো হয়ে যায়। তারপর ফেরেশতাদের উদ্দেশ্যে তিনি ঘোষণা করেন:
وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي خَالِقٌ بَشَرًا مِنْ صَلْصَالٍ مِنْ حَمَإٍ مَسْنُونٍ (۲۸) فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِنْ رُوحِي فَقَعُوا لَهُ سَاجِدِينَ (۲۹)
"স্বরণ কর যখন তোমার প্রতিপালন ফিরিশতাগণকে বললেন, কাদা মাটি দ্বারা আমি মানুষ সৃষ্টি করতে যাচ্ছি। যখন আমি তাকে সুঠাম করব এবং তাতে আমার রূহ সঞ্চার করব, তখন তোমরা তার প্রতি সিজদাবনত হয়ো।” (সূরা হিজর: ২৮)
তারপর আল্লাহ তাআলা আদম আ.-কে নিজ হাতে সৃষ্টি করেন, যাতে ইবলিস তার ব্যাপারে অহংকার করতে না পারে। তারপর মাটির তৈরি এ মানবদেহটি চল্লিশ বছর পর্যন্ত এভাবে পড়ে থাকে। তা দেখে ফেরেশতাগণ ঘাবড়ে যান। সবচেয়ে বেশি ভয় পায় ইবলিস। সে তাঁর পাশ দিয়ে আনাগোনা করত এবং তাঁকে আঘাত করত। ফলে দেহটি ঠনঠনে পোড়া মাটির মতো শব্দ করত। এ কারণেই মানব সৃষ্টির উপাদানকে صَلْصَالِ كَالْفَخَّارِ তথা পোড়ামাটির মতো ঠনঠনে মাটি বলে অভিহিত করা হয়েছে। আর ইবলিস তাঁকে বলত, তুমি একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি হয়েছ।
এক পর্যায়ে ইবলিস তাঁর মুখ দিয়ে প্রবেশ করে পেছন দিয়ে বের হয়ে এসে ফেরেশতাগণকে বলল, একে তোমাদের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। কেননা তোমাদের রব হলেন সামাদ তথা অমুখাপেক্ষী আর এটি একটি শূন্যগর্ভ বস্তু মাত্র। কাছে পেলে আমি একে ধ্বংস করেই ছাড়ব।
এরপর তাঁর মধ্যে রূহ সঞ্চার করার সময় হয়ে এলে আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাগণকে বললেন: আমি যখন এর মধ্যে রূহ সঞ্চার করব, তখন তার প্রতি তোমরা সিজদাবনত হবে! যথাসময়ে আল্লাহ তাআলা তাঁর মধ্যে রূহ সঞ্চার করলেন। যখন রূহ তাঁর মাথায় প্রবেশ করে, তখন তিনি হাঁচি দেন। ফেরেশতাগণ বললেন, আপনি 'আলহামদুলিল্লাহ' বলুন। তিনি 'আলহামদুলিল্লাহ' বললেন।
জবাবে আল্লাহ তাআলা বললেন: يرحمك ربك (তোমার রব তোমাকে রহম করুন!) তারপর রূহ তাঁর দু চোখে প্রবেশ করলে তিনি জান্নাতের ফল-ফলাদির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। এবার রূহ তাঁর পেটে প্রবেশ করলে তাঁর মনে খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগে। ফলে রূহ পা পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই তড়িঘড়ি করে তিনি জান্নাতের ফল- ফলাদির দিকে ছুটে যান। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা বলেন:
خُلِقَ الْإِنْسَانُ مِنْ عَجَلٍ "মানুষ সৃষ্টিগতভাবেই ত্বরাপ্রবণ।” (সূরা আম্বিয়া: ৩৭) • ইমাম আহমদ রহ. বর্ণনা করেন, আনাস রাযি. বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- “আল্লাহ তাআলা আদম আ.-কে সৃষ্টি করে নিজের ইচ্ছানুযায়ী কিছুদিন তাঁকে ফেলে রাখেন। এ সুযোগে ইবলিস তাঁর চারপাশে চক্কর দিতে শুরু করে। অবশেষে তাঁকে শূন্যগর্ভ দেখতে পেয়ে সে আঁচ করতে পারল, এটা তো এমন একটি সৃষ্টি, যার সংযম ক্ষমতা থাকবে না।"
• ইবনে হিব্বান রহ. তাঁর সহি গ্রন্থে বর্ণনা করেন, হযরত আনাস রাযি. বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- "আদম আ.-এর মধ্যে রূহ সঞ্চারিত হওয়ার পর রূহ তাঁর মাথায় পৌঁছুলে তিনি হাঁচি দেন এবং 'আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন' বলেন। উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেন: 'ইয়ারহামুকাল্লাহ'। সামান্য শাব্দিক পার্থক্যসহ হাফিজ আবু বকর বাযযার রহ. (ইয়াহইয়া ইবনে মুহাম্মদ সাকান)- ও হাদিসটি বর্ণনা করেন।
• হাফিজ আবু ইয়ালা রহ. বর্ণনা করেন, হযরত আনাস রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "আল্লাহ তাআলা হযরত আদম আ.-কে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেন। প্রথমে মাটিগুলোকে ভিজিয়ে আঠালো করে কিছু দিন রেখে দেন। এতে তা ছাঁচে-ঢালা মাটিতে পরিণত হলে আদম আ.-এর আকৃতি সৃষ্টি করে কিছুদিন এ অবস্থায় রেখে দেন। এবার তা পোড়ামাটির মতো শুকনো ঠনঠনে মাটিতে রূপান্তরিত হয়। বর্ণনাকারী বলেন: ইবলিস তখন তাঁর কাছে গিয়ে বলতে শুরু করে, তুমি এক মহান উদ্দেশ্যে সৃষ্টি হয়েছ। তারপর আল্লাহ তাআলা তাঁর মধ্যে রূহ সঞ্চার করেন। রূহ সর্বপ্রথম তাঁর চোখ ও নাকের ছিদ্রে প্রবেশ করলে তিনি হাঁচি দেন। হাঁচি শুনে আল্লাহ পাক বললেন:
يَرْحَمُكَ رَبُّكَ তোমার রব তোমার উপর রহমত বর্ষণ করুন!
এরপর আল্লাহ তাআলা বললেন হে আদম! তুমি ওই ফেরেশতা দলের কাছে গিয়ে দেখ তারা কী বলে? তখন তিনি ফেরেশতা দলের কাছে গিয়ে তাদেরকে সালাম দেন। আর তাঁরা اَلسَّلَامُ عَلَيْكَ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ বলে উত্তর দেন। তখন আল্লাহ তাআলা বললেন: হে আদম! এটা তোমার এবং তোমার বংশধরের অভিবাদন। আদম আ. জিজ্ঞাসা করলেন: হে আমার রব! আমার বংশধর আবার কী? আল্লাহ তাআলা বললেন : আদম! তুমি আমার দু হাতের যে কোনো একটি পছন্দ করো। আদম আ. বললেন: আমি আমার রবের ডান হাত পছন্দ করলাম। আমার রব-এর উভয় হাতই তো ডান হাত-বরকতময়।
এবার আল্লাহ তাআলা নিজের হাতের তালু প্রসারিত করলে আদম আ. কেয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী তাঁর সকল সন্তানকে আল্লাহর হাতের তালুতে দেখতে পান। তন্মধ্যে কিছু সংখ্যকের মুখমণ্ডল ছিল নূরে সমুজ্জ্বল। সহসা তাদের মধ্যে একজনের নূরে অধিক বিমুগ্ধ হয়ে আদম আ. জিজ্ঞাসা করলেন, হে আমার রব! ওনি কে? আল্লাহ তাআলা বললেন: তোমার সন্তান দাউদ। জিজ্ঞাসা করলেন, এর আয়ু কত নির্ধারণ করেছেন? আল্লাহ তাআলা বললেন, ষাট বছর। আদম আ. বললেন, আমার থেকে নিয়ে এর আয়ু পূর্ণ একশ বছর করে দিন। আল্লাহ তাঁর আবদার মনযুর করেন এবং এ ব্যাপারে ফেরেশতাগণকে সাক্ষী রাখেন।
তারপর যখন আদম আ.-এর আয়ু শেষ হয়ে আসল, তখন তাঁর রূহ কবয করার জন্য আল্লাহ তাআলা আযরাইল আ.-কে প্রেরণ করেন। তখন আদম আ. বললেন, কেন? আমার আয়ু তো আরো চল্লিশ বছর বাকি আছে! ফেরেশতা বললেন, আপনি তো আপনার আয়ুর চল্লিশ বছর আপনার সন্তান দাউদ আ.-কে দিয়ে দিয়েছিলেন! কিন্তু আদম আ. তা অস্বীকার করে বসেন এবং পূর্বের কথা ভুলে যান। ফলে তার সন্তানদের মধ্যে অস্বীকৃতি ও বিস্মৃতির প্রবণতা সৃষ্টি হয়।
• হাফিজ আবু বকর বাযযার রহ. তিরমিযি ও নাসায়ি রহ. তাঁর 'ইয়াওম ওয়াল লাইল' কিতাবে হযরত আবু হোরায়রা রাযি. সূত্রে এ হাদিসটি বর্ণনা করেন। তিরমিযি রহ. বলেন, হাদিসটি হাসান গরিব এবং ইমাম নাসায়ি রহ. 'মুনকার' তথা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন।
• ইমাম তিরমিযি রহ. বর্ণনা করেন, আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "আদম আ.-কে সৃষ্টি করে আল্লাহ তাআলা তাঁর পিঠে হাত বুলান। সঙ্গে সঙ্গে কেয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী তাঁর সবকটি সন্তান পিঠ থেকে ঝরে পড়ে। আর আল্লাহ তাআলা তাদের প্রত্যেকের দু চোখের মাঝে একটি করে নূরের দীপ্তি স্থাপন করে দিয়ে তাদেরকে আদম আ.-এর সামনে পেশ করেন।
হযরত আদম আ. তাদের দেখে আল্লাহ তাআলাকে বললেন, হে আমার রব! এরা কারা? আল্লাহ তাআলা বললেন, এরা তোমার সন্তান-সন্ততি। তখন তাদের একজনের দু চোখের মাঝের দীপ্তিতে বিমুগ্ধ হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আমার রব! ওনি কে? আল্লাহ তাআলা বললেন, সে তোমার ভবিষ্যৎ বংশধর দাউদ নামক এক ব্যক্তি। তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, এর আয়ু কত নির্ধারণ করেছেন? আল্লাহ তাআলা বললেন, ষাট বছর।
আদম আ. বললেন, হে আমার রব! আমার আয়ু থেকে নিয়ে এর আয়ু আরো চল্লিশ বছর বৃদ্ধি করে দিন। তারপর যখন আদম আ.-এর আয়ু শেষ হয়ে যায়, তখন জান কবয করার জন্য আযরাইল আ. তাঁর কাছে আগমন করেন। তখন তিনি বললেন, আমার আয়ু তো আরো চল্লিশ বছর বাকি আছে? আযরাইল আ. বললেন, কেন? আপনি তো আপনার সন্তান দাউদ আ.-কে চল্লিশ বছর দিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আদম আ. তা অস্বীকার করে বসেন। এ কারণে তাঁর সন্তানদের মধ্যেও অস্বীকৃতির প্রবণতা রয়েছে। তিনি পূর্বের কথা ভুলে যান। ফলে তাঁর সন্তানদের মধ্যেও বিস্মৃতির প্রবণতা রয়েছে। আদম আ. ত্রুটি করেন, তাই তাঁর সন্তানরাও ত্রুটি করে থাকে।
ইমাম তিরমিযি রহ. হাদিসটি হাসান সহি বলেছেন। হযরত আবু হোরায়রা রাযি. থেকে আরো একাধিক সূত্রে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে। হাকিম রহ. তাঁর মুস্তাদরাকে আবু নুআইম (ফযল ইবনে দুকায়ন)-এর সূত্রে হাদিসটি বর্ণনা করে বলেছেন, ইমাম মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী হাদিসটি সহি। তবে ইমাম বোখারি ও মুসলিমের কেউই হাদিসটি বর্ণনা করেন নি।
আর ইবনে আবু হাতিম রহ. হাদিসটির যে বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে এও আছে, আল্লাহ তাআলা আদম আ.-এর বংশধরকে তাঁর সামনে পেশ করে বললেন, হে আদম! এরা তোমার সন্তান-সন্ততি। তখন আদম আ. তাদের মধ্যে কুষ্ঠরোগী ও শ্বেতরোগী, অন্ধ এবং আরো নানা প্রকার ব্যাধিগ্রস্ত লোক দেখতে পেয়ে বললেন, হে আমার রব! আমার সন্তানদের আপনি এ দশা করলেন কেন?
আল্লাহ তাআলা বললেন : করেছি এজন্য, যাতে আমার নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা হয়। এর পরে বর্ণনাটিতে দাউদ আ.-এর প্রসঙ্গ রয়েছে- যা ইবনে আব্বাস রাযি.-এর সূত্রে পরে আসছে।
• ইমাম আহমদ রহ. তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেন, আবু দারদা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: যথাসময়ে আল্লাহ তাআলা আদম আ.-কে সৃষ্টি করে তাঁর ডান কাঁধে আঘাত করে মুক্তার মতো ধবধবে সাদা তাঁর একদল সন্তানকে বের করেন। আবার তাঁর বাম কাঁধে আঘাত করে কয়লার মতো মিছমিছে কালো একদল সন্তানকে বের করে আনেন। তারপর ডান পাশেরগুলোকে বললেন, তোমরা জান্নাতগামী; আমি কারো পরোয়া করি না। আর বাঁম কাঁধেরগুলোকে বললেন, তোমরা জাহান্নামগামী; আমি কারো পরোয়া করি না।
• ইবনে আবুদ্ দুনিয়া রহ. বর্ণনা করেন, হাসান রহ. বলেন, "আদম আ.-কে সৃষ্টি করে আল্লাহ তাআলা তাঁর ডান পার্শ্বদেশ থেকে জান্নাতীদের আর বাম পার্শ্বদেশ থেকে জাহান্নামীদের বের করে এনে তাদেরকে জমিনে নিক্ষেপ করেন। এদের মধ্যে কিছু লোককে অন্ধ, বধির ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত দেখে আদম আ. বললেন, হে আমার বর! আমার সন্তানদের সকলকে এক সমান করে সৃষ্টি করলেন না কেন? আল্লাহ তাআলা বললেন, "আমি চাই, আমার শুকরিয়া আদায় হোক।" আবদুর রাযযাক অনুরূপ রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন।
ইবনে হিব্বানের এ সংক্রান্ত বর্ণনার শেষ দিকে আছে- আল্লাহর মর্জি মোতাবেক আদম আ.. কিছুক্ষণ জান্নাতে বসবাস করেন। তারপর সেখান থেকে পৃথিবীতে অবতরণ করেন। অবশেষে একসময় আযরাইল আ. তাঁর কাছে আগমন করলে তিনি বললেন, আমার আয়ু তো এক হাজার বছর। আপনি নির্ধারিত সময়ের আগেই এসে পড়েছেন। আযরাঈল আ. বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। কিন্তু আপনি তো আপনার আয়ু থেকে চল্লিশ বছর আপনার সন্তান দাউদকে দিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আদম আ. তা অস্বীকার করে বসেন। ফলে তাঁর সন্তানদের মধ্যেও অস্বীকার করার প্রবণতা সৃষ্টি হয়। তিনি পূর্বের কথা ভুলে যান। ফলে তাঁর সন্তানদের মধ্যে বিস্মৃতির প্রবণতা দেখা দেয়। সেদিন থেকেই পারস্পরিক লেনদেন লিপিবদ্ধ করে রাখার এবং সাক্ষী রাখার আদেশ জারি হয়।
• ইমাম বোখারি রহ. বর্ণনা করেন, আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "আল্লাহ তাআলা হযরত আদম আ.-কে ষাট হাত দীর্ঘ করে সৃষ্টি করেন। তারপর বললেন- ওই ফেরেশতা দলের কাছে গিয়ে তুমি সালাম করো এবং লক্ষ করে শোন, তারা তোমাকে কী উত্তর দেয়? কারণ, এটাই হবে তোমার এবং তোমার সন্তান-সন্ততির অভিবাদন। আদেশ মতো ফেরেশতাগণের কাছে গিয়ে তিনি اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ বলে সালাম করলেন। তাঁরা وَعَلَيْكَ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ বলে উত্তর দেন।
উল্লেখ্য, আদম আ.-এর সন্তানদের যারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে, তারা সকলেই আদম আ.-এর আকৃতি সম্পন্ন হবে। ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে পেতে মানুষের উচ্চতা আজকের পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে।
• ইমাম আহমদ রহ. বর্ণনা করেন, আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: আদম আ.-এর উচ্চতা ছিল ষাট হাত আর প্রস্থ সাত হাত।
• ইমাম আহমদ রহ. বর্ণনা করেন, ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন: বকেয়া লেনদেন লিপিবদ্ধ করে রাখার আদেশ সংক্রান্ত আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- সর্বপ্রথম যিনি অস্বীকার করেন, তিনি হলেন আদম আ.। ঘটনা হলো, আল্লাহ তাআলা আদম আ.-কে সৃষ্টি করে তাঁর পৃষ্ঠদেশে হাত বুলিয়ে কেয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী সকল মানুষকে বের করে এনে তাঁর সামনে পেশ করেন। তাদের মধ্যে তিনি উজ্জ্বল এক ব্যক্তিকে দেখতে পেয়ে বললেন, হে আমার রব! ওনি কে? আল্লাহ বলেন, সে তোমার সন্তান দাউদ। আদম আ. জিজ্ঞাসা করলেন, এর আয়ু কত? আল্লাহ তাআলা বললেন, ষাট বছর। আদম আ. বললেন, এর আয়ু আরো বাড়িয়ে দিন। আল্লাহ তাআলা বলেন: না, তা হবে না। তোমার আয়ু থেকে কর্তন করে বাড়াতে পারি। উল্লেখ্য, আদম আ.-এর আয়ু ছিল এক হাজার বছর। তাঁর আয়ু থেকে কর্তন করে আল্লাহ তাআলা দাউদ-এর আয়ু চল্লিশ বছর বৃদ্ধি করে দেন।
এ ব্যাপারে চুক্তিনামা লিপিবদ্ধ করে নেন এবং ফেরেশতাদের সাক্ষী রাখেন। অবশেষে আদম আ.-এর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তাঁর জান কবয করার জন্য আযরাইল আ. তাঁর কাছে আগমন করেন। তখন তিনি বললেন, আমার আয়ু তো আরো চল্লিশ বছর বাকি আছে! জিজ্ঞাসা করা হলো, কেন? আপনি তো আপনার সন্তান দাউদকে চল্লিশ বছর দিয়ে দিয়েছিলেন। আদম আ. তা অস্বীকার করে বললেন, আমি তো এমনটি করি নি! তখন প্রমাণস্বরূপ আল্লাহ তাআলা পূর্বের লিখিত চুক্তিনামা তাঁর সামনে তুলে ধরেন এবং ফেরেশতাগণ এ ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করেন।
• ইমাম আহমদের অনুরূপ আরেকটি বর্ণনার শেষাংশে আছে: অবশেষে আল্লাহ দাউদের বয়স একশ বছর আর আদম আ.-এর এক হাজার বছর পূর্ণ করে দেন। ইমাম তবরানি রহ. ও অনুরূপ একটি রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন।
• ইমাম মালিক ইবনে আনাস রহ. বর্ণনা করেন, মুসলিম ইবনে ইয়াসার রহ বলেন, উমর ইবনে খাত্তাব রাযি.-কে এ আয়াতখানা:
وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِنْ بَنِي آدَمَ مِنْ ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَى أَنفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ قَالُوا بَلَى شَهِدْنَا أَنْ تَقُولُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَذَا غَافِلِينَ
সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো। তিনি বললেন, এ আয়াত সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন- আল্লাহ তাআলা আদম আ.-কে সৃষ্টি করে তাঁর পিঠে নিজের ডান হাত বুলিয়ে তাঁর সন্তানদের একদল বের করে এনে বললেন, এদেরকে আমি জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করলাম। এরা জান্নাতীদের আমলই করবে। পুনরায় হাত বুলিয়ে আরেক দল সন্তানকে বের করে এনে বললেন, এদের আমি জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি। এরা জাহান্নামীদেরই আমল করবে।
এ কথা শুনে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসূল! তা হলে আমল করার প্রয়োজন কী? জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আল্লাহ যাকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেন, তার থেকে তিনি জান্নাতীদেরই আমল করান। আমৃত্যু জান্নাতীদের আমল করতে করতেই শেষ পর্যন্ত সে জান্নাতে চলে যাবে। পক্ষান্তরে যাকে তিনি জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেন, তার দ্বারা তিনি জাহান্নামীদের আমলই করান। আমৃত্যু জাহান্নামীদের আমল করতে করতেই শেষ পর্যন্ত সে জাহান্নামে পৌঁছে যাবে।” ইমাম তিরমিযি রহ. হাদিসটি 'হাসান সহি' বলেছেন।
ইমাম দারাকুতনী বলেন, "উপরিউক্ত সবকটি হাদিসই প্রমাণ করে, আল্লাহ তাআলা আদম আ.-এর সন্তানদের তাঁরই পিঠ থেকে ছোট ছোট পিঁপড়ার মতো বের করে এনেছেন এবং তাদেরকে ডান ও বাম দু' দলে বিভক্ত করেছেন। এরপর ডান দলকে বলেছেন, তোমরা জান্নাতী! আমি কাউকে পরোয়া করি না। আর বাম দলকে বলেছেন, তোমরা জাহান্নামী। আমার কারো পরোয়া নেই।"
পক্ষান্তরে তাঁদের কাছ থেকে সাক্ষ্য এবং আল্লাহর একত্ববাদ সম্পর্কে তাঁদের থেকে স্বীকারোক্তি নেওয়ার কথা প্রামাণ্য কোনো হাদিসে পাওয়া যায় না। সূরা আরাফের একটি আয়াতকে এ অর্থে প্রয়োগ করার ব্যাপারে আপত্তি রয়েছে। যথাস্থানে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে এ মর্মে ইমাম আহমদ রহ. কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদিস আছে। ইমাম মুসলিমের শর্তানুযায়ী যার সনদ উত্তম ও শক্তিশালী। হাদিসটি হলো: • হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "আল্লাহ তাআলা যিলহজের নয় তারিখে 'নো'মান' নামক স্থানে আদম আ.-এর পিঠ থেকে অঙ্গীকার নেন। তারপর তাঁর মেরুদণ্ড থেকে (কিয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী) তাঁর সকল সন্তানকে বের করে এনে তাঁর সম্মুখে ছড়িয়ে দেন। তারপর তাদের সাথে সামনা-সামনি কথা বলেন। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, আমি কি তোমাদের রব নই? তারা বলল, নিশ্চয়ই আপনি আমাদের রব। আমরা এর সাক্ষী থাকলাম। এ স্বীকৃতি গ্রহণের কারণ, তোমরা যাতে কেয়ামতের দিন বলতে না পার- আমরা তো এ ব্যাপারে অবহিত ছিলাম না কিংবা বলতে না পার- আমাদের পূর্বপুরুষগণই তো আমাদের পূর্বে শিরক করেছে। আর আমরা তো তাদের পরবর্তী বংশধর। তবে কি পথভ্রষ্টদের কৃতকর্মের জন্য তুমি আমাদের ধ্বংস করবে?
ইমাম নাসায়ি, ইবনে জারির ও হাকিম রহ. এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। হাকিম রহ. হাদিসটির সনদ সহি বলেছেন। প্রামাণ্য কথা হলো, বর্ণিত হাদিসটি আসলে ইবনে আব্বাস রাযি.-এর উক্তি। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. থেকেও মওকুফ, মারফু উভয় সূত্রেই হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে। তবে মওকুফ সূত্রটি সর্বাধিক বিশুদ্ধ। অধিকাংশ আলেমের মতে সেদিন আদম আ.-এর সন্তানদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছে। এর দলিল হলো, ইমাম আহমদ রহ. বর্ণিত হাদিসটি। যাতে আছে-
• আনাস রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: কিয়ামতের দিন এক জাহান্নামিকে বলা হবে- আচ্ছা! যদি তুমি পৃথিবীতে সমুদয় বস্তু- সম্ভারের মালিক হতে, তা হলে এখন জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তার সব কিছুই মুক্তিপণরূপে দিতে প্রস্তুত থাকতে? উত্তরে সে বলবে, জি হ্যাঁ। তখন আল্লাহ বলবেন, আমি তো তোমার কাছ থেকে এর চেয়ে আরো সহজটাই চেয়েছিলাম। আদম আ.-এর পিঠে থাকা অবস্থায় আমি তোমার কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম, আমার সঙ্গে তুমি কাউকে শরিক করবে না। কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করে তুমি শরিক না করে ছাড় নি। হযরত শুবার বরাতে ইমাম বোখারি ও মুসলিম রহ. হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।
• আবু জাফর রাযি রহ. বর্ণনা করেন, উবাই ইবনে কাব রাযি. إِذْ أَخَذَ رَبُّكَ আয়াত এবং এর পরবর্তী আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: কিয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী সকল মানুষ সৃষ্টি করে আল্লাহ তাআলা তাদের এক স্থানে সমবেত করেন। তারপর তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের কাছে থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেন এবং তাদের নিজেদেরকেই তাদের সাক্ষীরূপে রেখে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, "আমি কি তোমাদের রব নই? তাঁরা বলল, জি হ্যাঁ। আল্লাহ তাআলা বললেন: এ ব্যাপারে আমি সাত আসমান, সাত যমিন এবং তোমাদের পিতা আদম আ.-কে সাক্ষী রাখলাম। যাতে কেয়ামতের দিন তোমরা এ কথা বলতে না পার, এ ব্যাপারে তো আমরা কিছুই জানতাম না। তোমরা জেনে রাখ! আমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আমি ছাড়া কোনো রব নেই। আমার সঙ্গে তোমরা কাউকে শরিক করো না। তোমাদের কাছে পর্যায়ক্রমে আমি রাসূল পাঠাব। তাঁরা তোমাদেরকে আমার এ অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে সতর্ক করবেন। আর তোমাদের কাছে আমি আমার কিতাব নাযিল করব।"
তাঁরা বলল: আমরা সাক্ষ্য দিলাম, আপনি আমাদের রব ও ইলাহ। আপনি ছাড়া আমাদের কোনো রব বা ইলাহ নেই। মোটকথা, সেদিন তাঁরা আল্লাহর আনুগত্যের অঙ্গীকার করেছিল।
এরপর উপর থেকে দৃষ্টি করে আদম আ. তাঁদের মধ্যে ধনী-গরীব ও সুশ্রী-কুশ্রী সকল ধরনের লোক দেখতে পেয়ে বললেন, হে আমার রব! আপনার বান্দাদের সকলকে যদি সমান করে সৃষ্টি করতেন! আল্লাহ তাআলা বললেন: আমি চাই, আমার শুকরিয়া আদায় করা হোক। এরপর আদম আ. নবীগণকে তাদের মধ্যে প্রদীপের মতো দীপ্তিমান দেখতে পান। আল্লাহ তাআলা তাদের কাছ থেকে রেসালাত ও নবুয়তের বিশেষ অঙ্গীকার গ্রহণ করেন। এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّينَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنْكَ وَمِنْ نُوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَأَخَذْنَا مِنْهُمْ مِيثَاقًا غَلِيظًا
'স্মরণ কর! যখন আমি নবীগণের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম এবং তোমার কাছ থেকেও এবং নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও মারইয়াম তনয় ঈসা আ.-এর কাছ থেকে। এদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছিলাম দৃঢ় অঙ্গীকার।” (সূরা আহযাব : ৭)
فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ "তুমি একনিষ্ঠ হয়ে নিজেকে দীনে প্রতিষ্ঠিত কর। আল্লাহর প্রকৃতির অনুসরণ কর, যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই।" (সূরা রূম: ৩০)
هَذَا نَذِيرٌ مِنَ النُّذُرِ الْأُولَى (٥٦)
"অতীতের সতর্ককারীদের মতো এ নবীও একজন সতর্ককারী।" (সূরা নাজম: ৫৭)
وَمَا وَجَدْنَا لِأَكْثَرِهِمْ مِنْ عَهْدٍ وَإِنْ وَجَدْنَا أَكْثَرَهُمْ لَفَاسِقِينَ (١٠০২)
"আমি তাঁদের অধিকাংশকে প্রতিশ্রুতি পালনকারী পাই নি বরং তাদের অধিকাংশকে তো সত্য ত্যাগী পেয়েছি।" (সূরা আরাফ: ১০২) • ইমাম আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ, ইবনে আবু হাতিম, ইবনে জারির ও ইবনে মারদুওয়েহ রহ. তাঁদের নিজ নিজ তাফসির গ্রন্থে আবু জাফর রহ. সূত্রে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। মুজাহিদ, ইকরামা, সাঈদ ইবনে যুবায়ের, হাসান বসরি, কাতাদা ও সুদ্দী রহ. প্রমুখ পূর্বসূরী আলেম থেকেও এসব হাদিসের সমর্থনে বর্ণনা পাওয়া যায়।
পূর্বে আমরা এ কথাটি উল্লেখ করে এসেছি, ফেরেশতাগণ আদম আ.-কে সিজদা করার জন্যে আদিষ্ট হলে ইবলিস ছাড়া সকলেই সে খোদায়ি ফরমান পালন করেন। ইবলিস হিংসা ও শত্রুতাবশত সিজদা করা থেকে বিরত থাকে। ফলে আল্লাহ তাআলা তাকে আপন সান্নিধ্য থেকে বিতাড়িত করে অভিশপ্ত শয়তান বানিয়ে পৃথিবীতে নির্বাসন দেন। • ইমাম আহমদ রহ. বর্ণনা করেন, আবু হুরাইরা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "আদমের সন্তানরা সিজদার আয়াত পাঠ করে যখন সিজদা করে, ইসলিস তখন একদিকে সরে গিয়ে কাঁদতে শুরু করে এবং বলে, হায় কপাল! আল্লাহর আদেশ পালনার্থে সিজদা করে আদম সন্তান জান্নাতী হলো আর সিজদার আদেশ অমান্য করে আমি হলাম জাহান্নামী।" ইমাম মুসলিমও হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।
📄 হযরত আদম আ. ও হাওয়া আ.-এর জান্নাতে অবস্থানকাল
যা হোক, হযরত আদম আ. ও তাঁর স্ত্রী হাওয়া আ. জান্নাতে- তা আসমানেই হোক বা যমিনের কোনো উদ্যানই হোক; যে মতভেদের কথা পূর্বেই বিবৃত হয়েছে- কিছুকাল বসবাস করেন। এবং অবাধে ও স্বাচ্ছন্দে সেখানে আহারাদি করতে থাকেন। অবশেষে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল আহার করায় তাদের পরিধানের পোশাক ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং তাদেরকে পৃথিবীতে নামিয়ে দেওয়া হয়। অবতরণের ক্ষেত্র সম্পর্কে মতভেদের কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে।
জান্নাতে আদম আ.-এর অবস্থানকাল সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। কারো মতে দুনিয়ার হিসাবের একদিনের কিছু অংশ। আবু হোরায়রা রাযি. থেকে মারফু সূত্রে ইমাম মুসলিম রহ. কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদিস উপরে উল্লেখ করে এসেছি, জুমার দিন আদম আ.-কে সৃষ্টি করা হয়। আর এদিনই তাঁকে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করা হয়। সুতরাং যদি এমন হয়ে থাকে, অর্থাৎ যেদিন আদম আ.-এর সৃষ্টি হন এবং ঠিক সেদিনই জান্নাত থেকে তিনি বহিষ্কৃত হন, তা হলে বলা যায়, তিনি একদিনের মাত্র কিছু অংশ জান্নাতে অবস্থান করেছিলেন। তবে এ বক্তব্যটি বিতর্কের ঊর্ধে নয়।
পক্ষান্তরে যদি তাঁর বহিষ্কার সৃষ্টির দিন থেকে ভিন্ন কোনো দিনে হয়ে থাকে কিংবা ওই ছয় দিনের সময়ের পরিমাণ ছয় হাজার বছর হয়ে থাকে, তা হলে সেখানে তিনি সুদীর্ঘ সময়ই অবস্থান করে থাকবেন। যেমন: ইবনে আব্বাস রাযি., মুজাহিদ ও যাহ্হাক রহ. থেকে বর্ণিত এবং ইবনে জারির রহ. কর্তৃক সমর্থিত বর্ণনা পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে।
• ইবনে জারির রহ. বলেন: এটা জানা কথা, আদম আ.-কে সৃষ্টি করা হয়েছে জুমার দিনের শেষ প্রহরে। আর সেখানকার এক প্রহর দুনিয়ার তিরাশি বছর চার মাসের সমান। এতে প্রমাণিত হয়, রূহ সঞ্চারের পূর্বে জান্নাতে অবস্থান করেছেন তেতাল্লিশ বছর চার মাস কাল। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
📄 হযরত আদম আ.-এর উচ্চতা
আবদুর রাযযাক রহ. বর্ণনা করেন, 'আতা ইবনে আবু রাবাহ রহ. বলেন: আদম আ.-এর পদদ্বয় যখন পৃথিবী স্পর্শ করে, তখনও তাঁর মাথা ছিল আকাশে। তারপর আল্লাহ তাঁর দৈর্ঘ্য ষাট হাতে কমিয়ে আনেন। ইবনে আব্বাস রাযি. সূত্রেও এরূপ একটি বর্ণনা আছে। তবে এ তথ্যটি আপত্তিকর। কারণ, ইতোপূর্বে আবু হোরায়রা রাযি. কর্তৃক সর্বজন স্বীকৃত বিশুদ্ধ হাদিস উদ্ধৃত করে এসেছি- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: আল্লাহ তাআলা আদম আ.-কে ষাট হাত দীর্ঘ করে সৃষ্টি করেন। এরপর তাঁর সন্তানদের উচ্চতা কমতে কমতে এখন এ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। এ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়, আদম আ.-কে সৃষ্টিই করা হয়েছে ষাট হাত দৈর্ঘ্য দিয়ে; তার বেশি নয়। আর তাঁর সন্তানদের উচ্চতা হ্রাস পেতে পেতে বর্তমান পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছে।