📄 একনজরে সমাজে প্রচলিত শিরক
১. দু'আ বা আহ্বানের ক্ষেত্রে শিরক: দু'আ বা আহ্বানের শিরক বলতে মানুষের ক্ষমতার বাইরে এমন কোন পার্থিব লাভের আশায় অথবা কোন পার্থিব ক্ষতি হতে রক্ষা পাবার উদ্দেশ্যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে আহ্বান করা বুঝায়। যা বহুল প্রচলিত সুস্পষ্ট একটি শিরক। আল্লাহ বলছেন, وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا
আর মসজিদগুলো কেবলমাত্র আল্লাহরই জন্য, কাজেই তোমরা আল্লাহর সঙ্গে অন্য আর কাউকে ডেকো না। [সূরা জিন ৭২: ১৮] لَهُ دَعْوَةُ الْحَقِّ وَالَّذِينَ يَدْعُوْنَ مِنْ دُونِهِ لَا يَسْتَجِيبُونَ
সত্যিকার আহ্বান-প্রার্থনা তাঁরই প্রাপ্য, যারা তাঁকে ছাড়া অন্যকে ডাকে, তারা তাদেরকে কোন জবাব দেয় না। [সূরা রাদ ১৩: ১৪]
২. ফরিয়াদের ক্ষেত্রে শিরক : ফরিয়াদের ক্ষেত্রে শিরক বলতে নিতান্ত অসহায় অবস্থায় আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সাহায্যের জন্য ডাকাকে বুঝায়। রোগ নিরাময়ে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকা এর অন্তর্ভুক্ত। فَإِذَا رَكِبُوا فِي الْفُلْكِ دَعَوُا اللهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ فَلَمَّا نَجَّاهُمْ إِلَى الْبَرِّ إِذَا هُمْ يُشْرِكُونَ)
তারা যখন নৌযানে আরোহণ করে তখন বিশুদ্ধ অন্তঃকরণে একনিষ্ঠ হয়ে তারা আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর তিনি যখন তাদেরকে নিরাপদে স্থলে পৌঁছে দেন, তখন তারা (অন্যকে আল্লাহর সাথে) শরীক করে বসে। [সূরা আনকাবুত ২৯:৬৫]
৩. আশ্রয় প্রার্থনার ক্ষেত্রে শিরক: কোন অনিষ্টকর বস্তু বা ব্যক্তি বা জিন/শয়তান হতে বাঁচার জন্য আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো কাছে আশ্রয় নেয়া বা শরণাপন্ন হওয়া বা সাহায্য চাওয়া শিরক।
وَإِمَّا يَنْزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ শয়তানের পক্ষ থেকে যদি তুমি কুমন্ত্রণা অনুভব কর, তাহলে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করো। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। [সূরা ফুসসিলাত/হা-মীম সাজদা ৪১: ৩৬]
৪. আশা বা কামনা-বাসনার ক্ষেত্রে শিরক: মানুষের অসাধ্য কোন বস্তু আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে কামনা করা। যেমন কোন পীরের কাছে সন্তান বা ধনসম্পদ ইত্যাদি কামনা করা।
لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكُورَ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা তাই সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। [সূরা শুআরা ৪২: ৪৯]
৫. সালাতের (নামাযের) ক্ষেত্রে শিরক: সালাতের ক্ষেত্রে শিরক বলতে রুকু, সিজদা, সওয়াবের আশায় কোন ব্যক্তি বা বস্তুর সামনে বিনম্রভাবে দাঁড়ানো ইত্যাদি এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাতগুলো একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য আদায় করাকে বুঝানো হয়।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ارْكَعُوا وَاسْجُدُوا وَاعْبُدُوا رَبَّكُمْ وَافْعَلُوا الْخَيْرَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ হে মুমিনগণ! তোমরা রুকু করো, সিজদা করো এবং তোমাদের রবের ইবাদাত করো ও সৎ কাজ করো যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। [সূরা হজ্জ ২২:৭৭]
৬. তাওয়াফের ক্ষেত্রে শিরক: কাবা ঘর ব্যতীত অন্য কোন ঘর বা বস্তুর তাওয়াফ করা।
وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِلنَّاسِ وَأَمْنًا وَاتَّخِذُوا مِنْ مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى وَعَهِدْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَنْ طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ এবং স্মরণ করো যখন আমি কাবা ঘরকে মানুষের জন্য মিলনকেন্দ্র এবং নিরাপদস্থল করলাম এবং বললাম, মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থান হিসেবে গ্রহণ করো এবং ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে বলেছিলাম, আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী এবং রুকু ও সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখবে। [সূরা বাকারা ২: ১২৫]
৭. তাওবার শিরক: আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে তাওবা করা।
وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُوْنَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। [সূরা নূর ২৪: ৩১]
৮. যবেহের শিরক: আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নৈকট্য লাভের জন্য পশু যবেহ করা। চাই তা আল্লাহর নামেই করা হোক বা অন্য কারো নামে বা নবী বা জিনের নামে।
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ তুমি বলে দাওঃ আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সব কিছু সারা জাহানের রব আল্লাহর জন্য। [সূরা আনআম ৬: ১৬২]
৯. মান্নতের শিরক : আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য মান্নত করা শিরক।
وَمَا أَنْفَقْتُمْ مِنْ نَفَقَةٍ أَوْ نَذَرْتُمْ مِنْ نَذْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُهُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ
তোমরা যা ব্যয় কর কিংবা যা কিছু মান্নত কর, আল্লাহ নিশ্চয় তা জানেন; কিন্তু যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই। [সূরা বাকারা ২: ২৭০]
১০. আনুগত্যের শিরক : বিনা দলীলে হালাল-হারাম, বৈধ-অবৈধ, জায়েয-নাজায়েযের ব্যাপারে আলেম-বুযুর্গ বা নেতা-নেত্রী কারো সিদ্ধান্ত অন্ধভাবে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেয়া। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে,
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُوْنِ اللَّهِ )
আল্লাহকে বাদ দিয়ে তারা তাদের আলেম আর দরবেশদেরকে রব বানিয়ে নিয়েছে। [সূরা তাওবা ৯: ৩১]
খ্রিস্টানরা তাদের আলেমদের উপাসনা করত না; তবে তারা হালাল হারামের ব্যাপারে বিনা প্রমাণে তাদের আলেমদের সিদ্ধান্ত মেনে নিত। আর এটিই হচ্ছে শিরক।
১১. ভালোবাসার শিরক : দুনিয়ার কাউকে এমনভাবে ভালোবাসা যাতে তাঁর আদেশ-নিষেধকে আল্লাহর আদেশ-নিষেধের উপর প্রাধান্য দেয়া অথবা সমপর্যায়ের মনে করা। প্রকৃতিগত ভালোবাসা (খাবার), স্নেহ জাতীয় ভালোবাসা (সন্তানের জন্য পিতামাতার), আসক্তিগত ভালোবাসা (স্বামীর জন্য স্ত্রীর) ইত্যাদির কোনটাকেই আল্লাহর ভালোবাসার উপর স্থান দেয়া যাবে না।
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُوْنِ اللهِ أَنْدَادًا يُحِبُّوْنَهُمْ كَحُبِ اللَّهِ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ وَلَوْ يَرَى الَّذِينَ ظَلَمُوا إِذْ يَرَوْنَ الْعَذَابَ أَنَّ الْقُوَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا وَأَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعَذَابِ)
আর কোন কোন লোক এমনও আছে, যে আল্লাহ ছাড়া অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, আল্লাহকে ভালোবাসার মতো তাদেরকে ভালোবাসে। কিন্তু যারা মুমিন আল্লাহর সঙ্গে তাদের ভালোবাসা প্রগাঢ় এবং কী উত্তমই হত যদি এ যালিমরা শান্তি দেখার পর যেমন বুঝবে তা যদি এখনই বুঝত যে, সমস্ত শক্তি আল্লাহরই জন্য এবং আল্লাহ শান্তিদানে অত্যন্ত কঠোর। [সূরা বাকারা ২: ১৬৫]
১২. ভয়ের শিরক: ভয়ের শিরক বলতে আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া অন্য কেউ দুনিয়া বা আখিরাত সংক্রান্ত যে কোন বিষয়ে ক্ষতি সাধন করতে পারে বলে বিশ্বাস করা। যেমন- মানুষ, মূর্তি, জিন ইত্যাদির অনিষ্টতাকে ভয় পাওয়া শিরক। প্রভাবশালী শাসকের ভয়ে ভালো কাজ হতে দূরে থাকা ছোট শিরক। তবে শত্রুর ভয়, বাঘের ভয় ইত্যাদি স্বাভাবিক (ফিতরাতি) ভয় শিরকের অন্তর্ভুক্ত নয়।
وَحَاجَّةً قَوْمُهُ قَالَ أَتُحَاجُّونِي فِي اللهِ وَقَدْ هَدَانِ وَلَا أَخَافُ مَا تُشْرِكُونَ بِهِ
তার জাতি তার সাথে বাদানুবাদ করল। সে বলল, তোমরা আল্লাহর ব্যাপারে আমার সাথে বাদানুবাদ করছ অথচ তিনি আমাকে সৎপথ দেখিয়েছেন। তোমরা যাদেরকে তার অংশীদার স্থির কর আমি তাদেরকে ভয় করি না। [সূরা আনআম ৬: ৮০]
১৩. ভরসার শিরক : মানুষের অসাধ্য ব্যাপারসমূহের ক্ষেত্রে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো প্রতি ভরসা করা। কারো সমস্যা দূরীকরণ, চাকরি লাভ, রোগমুক্তি ইত্যাদির ব্যাপারে আল্লাহর উপরই ভরসা রাখতে হবে।
﴿قَالَ رَجُلَانِ مِنَ الَّذِينَ يَخَافُوْنَ أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِمَا ادْخُلُوا عَلَيْهِمُ الْبَابَ فَإِذَا دَخَلْتُمُوهُ فَإِنَّكُمْ غَالِبُونَ وَعَلَى اللَّهِ فَتَوَكَّلُوا إِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِينَ)
সেই দুই ব্যক্তি (যারা আল্লাহকে ভয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছিলেন তারা) বললঃ তোমরা তাদের উপর আক্রমণ চালিয়ে (নগরের) দ্বারদেশ পর্যন্ত যাও, অনন্তর যখনই তোমরা দ্বারদেশে পা রাখবে তখনই জয় লাভ করবে এবং তোমরা আল্লাহর উপরই নির্ভর করো, যদি তোমরা মুমিন হও। [সূরা মায়েদা ৫: ২৩]
১৪. সুপারিশের শিরক : আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে পরকালের মুক্তির জন্য সুপারিশ কামনা করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
﴿قُلْ لِلَّهِ الشَّفَاعَةُ جَمِيعًا لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ثُمَّ إِلَيْهِ تُرْجَعُوْنَ)
বলো, শাফা'আত সম্পূর্ণ আল্লাহর ইখতিয়ারভুক্ত। আকাশ ও পৃথিবীর রাজত্ব তাঁরই, অতঃপর তাঁর কাছেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনা হবে। [সূরা যুমার ৩৯: ৪৪]
১৫. হেদায়াতের শিরক : আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ কাউকে হেদায়াত করতে পারে এমন বিশ্বাস করা অথবা কারো নিকট হেদায়াত কামনা করা শিরক।
﴿لَيْسَ عَلَيْكَ هُدَاهُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ خَيْرٍ فَلِأَنْفُسِكُمْ ۚ وَمَا تُنْفِقُوْنَ إِلَّا ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللَّهِ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ خَيْرٍ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تُظْلَمُوْنَ)
তাদেরকে সঠিক পথে নিয়ে আসা তোমার দায়িত্ব নয়, বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সঠিক পথে পরিচালিত করেন, বস্তুতঃ তোমরা যা কিছু ব্যয় কর, তা তোমাদের নিজেদের জন্যই এবং তোমরা তো শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই ব্যয় করে থাক এবং যা কিছু তোমরা মাল হতে ব্যয় করবে, তোমাদেরকে তার ফল পুরোপুরি দেয়া হবে এবং তোমাদের প্রতি অন্যায় করা হবে না। [সূরা বাকারা ২: ২৭২]
১৬. সাহায্য প্রার্থনার শিরক : গায়েবি সাহায্য বা মানুষের সাধ্যের বাইরে কোন কাজ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নিকট কামনা করা। ﴾إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
আমরা কেবল তোমারই ইবাদাত করি এবং কেবলমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি। [সূরা ফাতিহা ১: ৪]
১৭. কবরের শিরক : কবরে শায়িত কারো জন্য ইবাদাত করা। অর্থাৎ সেখানে সালাত আদায় করা, সিজদা করা, তার নিকট কিছু চাওয়া, তার (ওসীলার) মাধ্যমে আল্লাহর নিকটে কিছু চাওয়া, সেখানে মসজিদ নির্মাণ ইত্যাদি কাজও শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ الهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوْثَ وَيَعُوْقَ وَنَسْرًا
আর তারা বলেছিল, তোমাদের দেব-দেবীদের কক্ষনো পরিত্যাগ করো না, আর অবশ্যই পরিত্যাগ করো না ওয়াদ সুয়া'আকে, আর না ইয়াগুস, ইয়া'উক ও নাসরকে। [সূরা নূহ ৭১: ২৩]
১৮. আল্লাহর অবস্থান সম্পর্কিত শিরק : আল্লাহ মুমিনের অন্তরে বিরাজমান মনে করা, আল্লাহ সবার অন্তরে বিরাজমান মনে করা, আল্লাহ সকল বস্তুর মাঝে মিশ্রিত বা মিশে আছেন বা লুকায়িত আছেন মনে করা ইত্যাদি ধারণা শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
إِنَّ رَبَّكُمُ اللهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ যিনি ছয় দিনে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আরশে সমুন্নত হয়েছেন। [সূরা আরাফ ৭: ৫৪]
১৯. দেখা ও শোনার শিরক : আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মানুষ (হোক তিনি নবী বা রাসূল) সব শুনতে বা দেখতে পান এমন মনে করা শিরק।
قَالَ لَا تَخَافَا " إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى তিনি (আল্লাহ) বললেন, তোমরা ভয় করো না, আমি তোমাদের সাথেই আছি, আমি (সব কিছু) শুনি ও দেখি। [সূরা ত্ব-হা ২০: ৪৬]
২০. কিয়ামত সম্পর্কিত শিরক : কিয়ামতের দিন আল্লাহ ছাড়া কোন নবী-রাসূল, পীর, ওলী, ইত্যাদি মানুষরা অন্যান্য মানুষদেরকে আল্লাহর আযাব হতে বাঁচাতে পারবে মনে করা শিরক। এছাড়া কেউ কোন মানুষকে আল্লাহর আযাব হতে রেহাই দিতে পারবে এমনটা মনে করাও শিরক।
ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِلَّذِينَ كَفَرُوا امْرَأَتَ نُوحٍ وَامْرَأَتَ لُوطٍ كَانَتَا تَحْتَ عَبْدَيْنِ مِنْ عِبَادِنَا صَالِحَيْنِ فَخَانَتَاهُمَا فَلَمْ يُغْنِيَا عَنْهُمَا مِنَ اللهِ شَيْئًا وَقِيلَ ادْخُلَا النَّارَ مَعَ الدَّاخِلِينَ যারা কুফরীর নীতি অবলম্বন করে তাদের ব্যাপারে আল্লাহ নূহের স্ত্রী আর লূতের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত পেশ করছেন। এরা ছিল আমার দু'নেককার বান্দার অধীনে। কিন্তু তারা দু'জনই তাদের স্বামীদ্বয়ের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। ফলে নূহ ও লূত তাদেরকে আল্লাহর শান্তি থেকে রক্ষা করতে পারল না। তাদেরকে বলা হলো, তোমরা দু'জন জাহান্নামে প্রবেশ করো (অন্যান্য) প্রবেশকারীদের সঙ্গে। [সূরা তাহরীম ৬৬: ১০]
২১. গায়েব সম্পর্কিত শিরক : আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মানুষ হোক নবী-রাসূল, হুজুর/কেবলা/পীর/বুযুর্গ- গায়েব জানেন এমনটা বিশ্বাস করা শিরক।
قُلْ لَّا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ وَمَا يَشْعُرُونَ أَيَّانَ يُبْعَثُونَ বলো, আকাশ ও পৃথিবীতে যারা আছে তারা কেউই অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না আল্লাহ ছাড়া, আর তারা জানে না কখন তাদেরকে জীবিত করে উঠানো হবে। [সূরা নামল ২৭: ৬৫]
২২. আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ মানুষের মনের কথা জানে বলে বিশ্বাস করা শিরক। وَأَسِرُّوا قَوْلَكُمْ أَوِ اجْهَرُوا بِهِ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ أَلَّا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ) তোমরা তোমাদের কথা চুপেচাপেই বল আর উচ্চৈঃস্বরেই বল, তিনি (মানুষের) অন্তরের গোপন কথা সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত। যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনিই কি জানেন না? তিনি অতি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবগত। [সূরা মুলক ৬৭: ১৩-১৪]
২৩. আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ সন্তানসন্ততি দিতে পারে- এমন বিশ্বাস করা শিরক। لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكُورَ أَوْ يُزَوِّجُهُمْ ذُكْرَانًا وَإِنَاثًا وَيَجْعَلُ مَنْ يَشَاءُ عَقِيمًا ۚ إِنَّهُ عَلِيمٌ قَدِيرٌ) আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা তাই সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন। অথবা দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা তাকে করে দেন বন্ধ্যা। তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান। [সূরা শূরা ৪২: ৪৯-৫০]
২৪. আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ সুস্থতা দান করতে পারে বলে বিশ্বাস করা শিরক। وَالَّذِي يُمِيتُنِي ثُمَّ يُحْيِينِ وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ আর (ইবরাহীম (আঃ) বললেন) আমি যখন পীড়িত হই তখন তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন। যিনি আমার মৃত্যু ঘটাবেন, পুনরায় আমাকে জীবিত করবেন। [সূরা শুআরা ২৬: ৮০-৮১]
২৫. আল্লাহর তাওফীক ছাড়া ইচ্ছা করলেই কেউ ভালো কাজ করতে পারে অথবা আল্লাহর হেফাযত ছাড়া ইচ্ছা করলেই কেউ খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে পারে- এমন মনে করা শিরক। قَالَ يَا قَوْمِ أَرَأَيْتُمْ إِنْ كُنْتُ عَلَى بَيِّنَةٍ مِنْ رَّبِّي وَرَزَقَنِي مِنْهُ رِزْقًا حَسَنًا وَمَا أُرِيدُ أَنْ أُخَالِفَكُمْ إِلَى مَا أَنْهَاكُمْ عَنْهُ إِنْ أُرِيدُ إِلَّا الْإِصْلَاحَ مَا اسْتَطَعْتُ وَمَا تَوْفِيقِيَّ إِلَّا بِاللَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أَنِيبُ সে বলল, হে আমার কাওম! আচ্ছা বলো তো, যদি আমি আমার রবের পক্ষ হতে প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকি এবং তিনি আমাকে নিজ সন্নিধান হতে একটি উত্তম সম্পদ (নবুওয়াত) দান করেন, তাহলে আমি কী রূপে প্রচার না করে পারি? আর আমি এটা চাইনা যে, আমি তোমাদের বিপরীত সেই সব কাজ করি যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করছি; আমি তো সংশোধন করে দিতে চাচ্ছি, যে পর্যন্ত আমার সাধ্যে হয়, আর আমার যা কিছু প্রচেষ্টা তা শুধু আল্লাহরই সাহায্যে হয়ে থাকে; আমি তাঁরই উপর ভরসা রাখি এবং তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করি। [সূরা হুদ ১১: ৮৮]
২৬. আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কেউ কারো ক্ষতি করতে পারে এমনটা মনে করা শিরক। سَيَقُولُ لَكَ الْمُخَلَّفُونَ مِنَ الْأَعْرَابِ شَغَلَتْنَا أَمْوَالُنَا وَأَهْلُونَا فَاسْتَغْفِرْ لَنَا يَقُولُونَ بِأَلْسِنَتِهِمْ مَّا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ قُلْ فَمَنْ يَمْلِكُ لَكُمْ مِّنَ اللَّهِ شَيْئًا إِنْ أَرَادَ بِكُمْ ضَرًّا أَوْ أَرَادَ بِكُمْ نَفْعًا بَلْ كَانَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا
(যুদ্ধ থেকে) পিছ-পড়া বেদুঈনরা তোমাকে বলবে- আমাদের মালধন আর আমাদের পরিবার-পরিজন আমাদেরকে ব্যস্ত রেখেছিল, কাজেই (হে নবী) আপনি আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তারা মুখে এমন কথা বলে যা তাদের অন্তরে নেই। (তাদেরকে) বলো, আল্লাহ তোমাদের কোন ক্ষতি বা কোন কল্যাণ করার ইচ্ছা করলে তাঁর বিপক্ষে তোমাদের জন্য কিছু করার ক্ষমতা কার আছে? (কারো কোন ওকালতির দরকার নেই) বরং তোমরা যা কর সে বিষয়ে আল্লাহই খবর রাখেন। [সূরা ফাতহ ৪৮: ১১]
২৭. আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কেউ কাউকে বাঁচাতে বা মারতে পারে মনে করা শিরק। هُوَ الَّذِي يُحْيِي وَيُمِيتُ فَإِذَا قَضَى أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ
তিনিই জীবন দেন ও মৃত্যু ঘটান। তিনি যখন কোন কিছু করার সিদ্ধান্ত করেন, তার জন্য তিনি বলেন- হও, তখনই তা হয়ে যায়। [সূরা মুমিন ৪০: ৬৮]
২৮. কোন নবী-রাসূল গাউস, কুতুব, ওলী, বুযুর্গ, দরবেশ বিশ্ব পরিচালনায় অংশ নেন এরকম বিশ্বাস করা শিরক। اللَّهُ الَّذِي رَفَعَ السَّمَاوَاتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ كُلٌّ يَجْرِي لِأَجَلٍ مُّسَمًّى يُدَبِّرُ الْأَمْرَ يُفَضِلُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ بِلِقَاءِ رَبِّكُمْ تُوقِنُونَ
আল্লাহই স্তম্ভ ছাড়া আকাশমন্ডলীকে ঊর্ধ্বে তুলে রেখেছেন, যা তোমরা দেখছ; অতঃপর তিনি আরশে সমুন্নত হয়েছেন। তিনিই সূর্য ও চন্দ্রকে নিয়মের বন্ধনে বশীভূত রেখেছেন, প্রত্যেকেই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গতিশীল আছে। যাবতীয় বিষয় তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন, তিনি নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেন- যাতে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাসী হতে পার। [সূরা রাদ ১৩: ২]
২৯. একমাত্র আল্লাহই কারো অন্তরের পরিবর্তন ঘটাতে পারেন। এর ব্যতিক্রম বিশ্বাস করা শিরক। يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ وَأَنَّهُ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ
ওহে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ডাকে সাড়া দাও যখন তোমাদেরকে ডাকা হয় (এমন বিষয়ের দিকে) যা তোমাদের মাঝে জীবন সঞ্চার করে; আর জেনে রেখো যে, আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে যান। আর তোমাদেরকে তাঁর কাছেই একত্রিত করা হবে। [সূরা আনফাল ৮: ২৪]
৩০. যাদু-টোনা করা শিরক এবং কুফরঃ কুরআনে বর্ণিত হয়েছে- "সুলায়মানের রাজত্বকালে শয়তানরা যা পাঠ করত, তারা তা অনুসরণ করত। মূলতঃ সুলায়মান কুফরী করেনি বরং শয়তানরাই কুফরী করেছিল। তারা মানুষকে যাদু শিক্ষা দিত এবং যা বাবিলের দু'জন ফেরেশতা হারুত ও মারূতের উপর পৌঁছানো হয়েছিল এবং ফেরেশতাদ্বয় কাউকেও (তা) শিখাত না যে পর্যন্ত না বলত, আমরা পরীক্ষা স্বরূপ, কাজেই তুমি কুফরী করো না। এতদসত্ত্বেও তারা উভয়ের নিকট হতে এমন জিনিস শিক্ষা করত, যা দ্বারা তারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করত। মূলতঃ তারা তাদের এ কাজ দ্বারা আল্লাহর বিনা হুকুমে কারও ক্ষতি করতে পারত না। বস্তুতঃ এরা এমন বিদ্যা শিখত, যা দ্বারা তাদের ক্ষতি সাধিত হত আর এদের কোন উপকার হত না এবং অবশ্যই তারা জানত যে, যে ব্যক্তি ঐ কাজ অবলম্বন করবে পরকালে তার কোনই অংশ থাকবে না। আর যার পরিবর্তে তারা স্বীয় আত্মাগুলোকে বিক্রয় করেছে, তা কতই না জঘন্য, যদি তারা জানত। [সূরা বাকারা ২:১০২]
৩১. সওয়াবের উদ্দেশ্যে মসজিদ ছাড়া অন্য কোন জায়গায় সফর করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত। ﴿وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِلنَّاسِ وَأَمْنًا وَاتَّخِذُوا مِنْ مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلَّى وَعَهِدْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَنْ طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ﴾
এবং স্মরণ করো যখন আমি কাবাগৃহকে মানুষের জন্য মিলনকেন্দ্র এবং নিরাপদস্থল করলাম এবং বললাম, মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থান হিসেবে গ্রহণ করো এবং ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে বলেছিলাম, আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী এবং রুকু ও সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখবে। [সূরা বাকারা ২:১২৫]
৩২. আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য পীর, ওলী বা বুযুর্গ ব্যক্তির ওসীলা গ্রহণ: আল্লাহকে পাওয়ার জন্য, তাঁর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে ক্ষমা ও সাহায্য পাওয়ার জন্য কোন জীবিত বা মৃত পীর, ওলী বা বুযুর্গ/নেককার ব্যক্তিকে ওসীলা বা মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা শিরক।
৩৩. আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে জীবনবিধান প্রণেতা মনে করা: আল্লাহই একমাত্র মানব জাতির সার্বিক উন্নতির জন্য আইন বিধানের অধিকার রাখেন। এ কাজের যোগ্য তিনি ছাড়া আর কেউ নন। কোন ব্যক্তি, শক্তি, প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন অথবা কোন দল যদি আল্লাহর দেয়া বিধানের হালালকে হারাম করে আর হারামকে হালাল করে তাহলে তা মেনে নেয়া শিরক।
৩৪. মানবরচিত বিধান দ্বারা শাসন করা, এমনিভাবে প্রথা ও চিরাচরিত অভ্যাস দ্বারা ফায়সালা করাও শিরকের অন্তর্ভূক্ত।
৩৫. সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, পীরতন্ত্র, পুঁজিবাদ, জাতীয়তাবাদ, নাস্তিক্যবাদ, মানবধর্মবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ সমর্থন ও বিশ্বাস করা: যদি কোন ব্যক্তি মনে করে বর্তমান যুগে ইসলামী শাসনব্যবস্থা চলে না এবং তা সেকেলে বা অচল এবং গণতন্ত্র, রাজতন্ত্র, পীরতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষ-মতবাদ, নাস্তিক্যবাদ, মানবধর্মবাদ, ইত্যাদিই হলো যুগোপযোগী পদ্ধতি- তাহলে সে ইসলাম থেকে খারিজ/বের হয়ে যাবে।
৩৬. কুরআনের বিকৃতি ঘটেছে এমন ধারণা করা শিরক ও কুফুরী।
৩৭. ন্যাংটা বাবা ভবিষ্যৎ বা গায়েব জানে বা ভালো-মন্দ করার ক্ষমতা রাখে। এরূপ বিশ্বাস করা শিরক।
৩৮. গাইরুল্লাহর নামে কসম করা: মূলত আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন নামে কসম করা শিরক। যেমন: নবীর কসম, কাবার কসম, চোখের কসম, প্রেমের কসম, বাবা-মায়ের কসম, বিদ্যা বা বইয়ের কসম ইত্যাদি।
৩৯. ছবি-মূর্তি: কোন নেতা, লিডার বা স্মরণীয়-বরণীয় ব্যক্তিবর্গের ছবি, চিত্র, প্রতিকৃতি, মূর্তি ভাস্কর্য ইত্যাদি তৈরি করা, মাঠে-ঘাটে, অফিস-আদালতে ও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এগুলো স্থাপন করা, এগুলোকে সম্মান করা, এগুলোর উদ্দেশ্যে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা ইত্যাদি এসবই শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
৪০. সমাধি, স্মৃতিস্তম্ভ, শহীদ মিনার সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের স্মরণে সমাধি, স্মৃতিস্তম্ভ, স্মৃতিসৌধ বা শহীদ মিনার নির্মাণ, এগুলোকে সম্মান জানানো, সামনে দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা ইত্যাদি শিরক।
৪১. অগ্নিপূজা, শিখা চিরন্তন, শিখা অনির্বাণ 'অগ্নিশিখা' অগ্নিপূজকদের ইলাহ/উপাস্য বা দেবতা। তারা ভক্তি, প্রণাম ও নানা কর্মকান্ডের দ্বারা আগুনের পূজা করে থাকে। এ অগ্নিপূজা সম্পূর্ণ শিরক ও আল্লাহদ্রোহী কাজ। 'শিখা চিরন্তন' বা 'শিখা অনির্বাণের' নামে অগ্নিমশালকে সারা দেশে ঘুরিয়ে ভক্তি শ্রদ্ধা জানানো এবং এগুলোর প্রজ্জ্বলনকে অব্যাহত রাখার জন্য বিশেষ ধরনের বেদীর উপর এগুলো স্থাপন করা, অলিম্পিক মশালসহ বিভিন্ন ক্রীড়ানুষ্ঠানের মশাল প্রজ্জ্বলনও শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
৪২. মঙ্গল প্রদীপ: হিন্দুদের অনুকরণে কোন অনুষ্ঠানের শুরুতে বা কোন প্রতিষ্ঠানের উদ্বোধন উপলক্ষে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে বিশেষ আনুষ্ঠানিকতা পালন করা শিরক।
৪৩. পীরের ধ্যান: পীরের চেহারা, আকৃতি ইত্যাদি কল্পনা করে মুরাকাবা, ধ্যান, যিকির বা অন্য যে কোন ইবাদাত করা শিরক।
৪৪. গাইরুল্লাহর নামে যিকির বা ওযীফা আল্লাহর যিকিরের ন্যায় কোন নবী বা রাসূল, পীর, ওলী-আওলিয়া, বুযুর্গ, আলিমের নাম জপ করা, বিপদে পড়লে তাদের নামের ওযীফা পড়া। যেমন- ইয়া রাহমাতুল্লিল আলামীন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, নূরে রাসূল, নূরে খোদা, হক বাবা, ইয়া বড়-পীর আব্দুল কাদির জিলানী, ইয়া গাউসুল আযম, ইয়া আলী, ইয়া হুসাইন, ইয়া হাসান ইত্যাদি বলা শিরক।
৪৫. আল্লাহ যা করান, তাই করি একদল পীরেরা বলে, আল্লাহ যা করান, তাই করি। আল্লাহ সালাত আদায় করান না, তাই আদায় করি না; আল্লাহ গাঁজা টানাচ্ছেন, তাই টানি; তাকদীরে সালাত থাকলে তো আদায় করব ইত্যাদি এসব কথা বলা শিরক ও কুফরী।
৪৬. সীনায় সীনায় মারেফতি: একদল লোক বলে থাকে, কুরআন মোট ৪০ পারা। ৩০ পারায় যাহেরি (প্রকাশ্য) ইলম আছে। বাকি ১০ পারা মারেফতি ইলমে ভরা রয়েছে। এ ১০ পারা আমরা সীনায় পেয়েছি। শরীয়তের মোল্লারা এগুলোর খবর রাখেন না। এটি শীয়া ধর্ম থেকে আগত একটি শিরকি কথা।
৪৭. শরীয়তের ইত্তেবা সর্বাবস্থায় ফরয নয়: অনেকের ধারণা, মারেফতের উচ্চ শিখরে পৌঁছে গেলে তখন তার জন্য শরীয়তের হুকুম-আহকাম, সালাত, সাওম ইত্যাদি মাফ হয়ে যায় এমন ধারনা করা শিরক ও কুফুরী।
৪৮. শিরকের গন্ধযুক্ত উপাধি: সমাজে প্রচলিত ভন্ডপীর-ফকির বা ওলীকে এমন কোন উপাধিতে সম্বোধন করা, যা অর্থগত দিক দিয়ে আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য। যেমন- গাউসুল আযম (সর্বশ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী), গরীবে নেওয়ায (গরিবরা যার মুখাপেক্ষী), মুশকিল কুশা (যার মাধ্যমে বিপদাপদ দূর হয়), কাইয়ূমুয যামান (যামানা কায়েম করেছেন যিনি) ইত্যাদি বলা শিরক।
৪৯. সন্তানের নামকরণে নবী-রাসূল ও পীর-আওলিয়ার সাথে সম্পর্ক স্থাপন: গোলাম মোস্তফা (মোস্তফার গোলাম), আবদুন নবী (নবীর দাস), আবদুর রাসূল (রাসূলের দাস), আলী বখশ (আলীর দান), হুসাইন বখশ (হুসাইনের দান), পীর বখশ (পীরের দান), মাদার বখশ (মাদারের দান), গোলাম মহিউদ্দীন (মহিউদ্দীনের গোলাম), আবদুল হাসান (হাসানের গোলাম), আবদুল হুসাইন (হুসাইনের গোলাম), গোলাম রাসূল (রাসূলের গোলাম) ইত্যাদি নাম রাখা শিরক।
৫০. মন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তন: সিলভা, কোয়ান্টাম বা অন্য কোন মেথড (পদ্ধতি) দ্বারা মন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানো এবং সকল সমস্যার সমাধান লাভ করার মাধ্যমে জীবনে সফলতা অর্জনে বিশ্বাস করা শিরক।
৫১. গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাবে বিশ্বাস: অনেকের ধারণা মানুষের ভালো-মন্দ, বিপদ-আপদ, উন্নতি-অবনতি ইত্যাদি গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাবে হয়। কেউ বিপদে পড়লে বলা হয়, এ ব্যক্তির উপর শনি গ্রহের প্রভাব পড়েছে বা রাহুগ্রাস হয়েছে। কারো আনন্দের খবর শুনলে বলা হয়ে থাকে, এ ব্যক্তি মঙ্গল গ্রহের সুনজরে আছে।
৫২. বাতাস, রোদ বা বৃষ্টিকে গালি দেয়া: অনেক মানুষ না বুঝে বাতাস, রোদ বা বৃষ্টিকে গালি দেয়। বাতাস, রোদ বা বৃষ্টিকে গালি দেয়া নিষেধ। কেননা স্বয়ং আল্লাহ যেভাবে ইচ্ছা বাতাস, রোদ বা বৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেন। তাই বাতাস, রোদ বা বৃষ্টিকে গালি দিলে প্রকৃতপক্ষে তা বাতাস, রোদ বা বৃষ্টির নিয়ন্ত্রকের উপরই বর্তায়। তাই বাতাস, রোদ বা বৃষ্টিকে গালি দেয়া হারাম ও শিরকী কাজ।
৫৩. চন্দ্র ও সূর্য গ্রহণের প্রভাব : অনেকের ধারণা চন্দ্র ও সূর্য গ্রহণ মানুষের ভালো-মন্দ, জন্ম-মৃত্যু, বিপদ-আপদের উপর প্রভাব বিস্তার করে। এসবই স্রেফ শিরকী ধারণা।
৫৪. উরস: অনেক মাযারে ও পীরের দরবারে অমাবশ্যা, পূর্ণিমা, পীরের জন্ম বা মৃত্যু তারিখ নির্দিষ্ট করে উরস হয়ে থাকে। সেখানেও অনেক ধরনের শিরকী কর্ম হয়ে থাকে। যেমন পীরদের সেজদা করে মুরীদরা। বেপর্দা অবস্থায় নারী-পুরুষ একত্রে বসে যিকির করে, কাওয়ালি গান শুনে। ভন্ড পীর, ফকিররা এসব ওরশে ওয়ায নসীহতের নামে ইসলাম বিরোধী আকীদা-বিশ্বাস প্রচার করে। শাহী তবারক রান্না করা হয়। উরসের পরে যে টাকা অবশিষ্ট থেকে যায়, তা পীর ও তার খাদেমদের পকেটে চলে যায়। বাস্তবিক অর্থে উরস হচ্ছে আনন্দোৎসব ও টাকা উপার্জনের একটা সহজ পন্থা (বিনা পুঁজির ব্যবসা)।
৫৫. খাজা বাবার ডেগ : একদল লোক বিশেষত যুবকরা রজব মাস এলেই পথে-ঘাটে, বাজারে যেখানেই সুযোগ পায় সেখানেই একটা ডেগ বা বড় হাড়ি বসায়। কাপড় বিছিয়ে, বাঁশ দিয়ে ছাউনি দিয়ে, বিজলি বাতি জ্বালিয়ে, বিভিন্ন কালারের কাগজ এবং বিভিন্ন ধরনের রং লাগিয়ে ঘর সাজিয়ে তার মধ্যে স্থাপন করে ডেগ। তারা একে বলে 'খাজা বাবার ডেগ।' এটাও একটা বিনা পুঁজির ব্যবসা। এতে টাকা দেয়া হারাম ও মারাত্মক গুনাহের কাজ।
আসুন, ঈমানী দায়িত্ব পালন করি
* নবী-রাসূল ﷺ ও ওলীদেরকে মহান আল্লাহর বৈশিষ্ট্যের সমকক্ষ না করি। * রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দেশের জনগণকে সকল ক্ষমতার মালিক বলে মনে না করি। কোন ভাস্কর্য, মূর্তি, শহীদ মিনার ও স্মৃতিসৌধকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য নীরবে দাঁড়িয়ে না থাকি। গণতন্ত্র, পীরতন্ত্র, রাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র, নাস্তিক্যবাদ, ধর্মনিরপেক্ষবাদকে না বলি ও প্রত্যাখ্যান করি। * মাযার ও কবরে নযর/মান্নত না করি। মাযার ও কবরে গিয়ে মাযার ও কবর মুখী হয়ে দু'আ ও সালাত/নামায না পড়ি। হাদীসে বর্ণিত দু'আসমূহ আমলে আনার চেষ্টা করি।
শিরক সম্পর্কে সহজ কথা
> আল্লাহর উলুহিয়্যাত, রুবুবিয়্যাত, আসমা ওয়াস-সিফাতের সাথে অন্য কোন ব্যক্তি বা শক্তিকে অংশীদার মনে করাই হচ্ছে শিরক। > শিরক সমস্ত নেক আমলকে বিনষ্ট করে দেয়। শিরকের পাপের কোন ক্ষমা নেই। শিরকের পরিণতি ধ্বংস। মুশরিকরা চিরস্থায়ী জাহান্নামী। মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নিষেধ। শিরক মিশ্রিত ঈমান কখনই ঈমান হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।
> জীবন বিপন্ন হলেও শিরক করা যাবে না। সুতরাং শিরক থেকে বেঁচে থাকার জন্য সবসময় আল্লাহর নিকটে প্রাণ খুলে দু'আ করা ও সাহায্য প্রার্থনা করা কর্তব্য। রাসূল শিরক হতে বাঁচার জন্য আমাদেরকে দু'আ শিখিয়েছেন- اللَّهُمَّ إِنَّا نَعُوْذُ بِكَ أَنْ نُشْرِكَ شَيْئًا نَعْلَمُهُ وَنَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا نَعْلَمُهُ উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্না না'ঊযুবিকা আন-নুশরিকা শাইআন না'লামুহ, ওয়া নাসতাগফিরুকা লিমা লা না'লামুহ। অর্থ: হে আল্লাহ! জেনে-বুঝে শিরক করা থেকে আমরা আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং আমাদের অজ্ঞাত শিরক থেকেও আপনার নিকটে ক্ষমা চাচ্ছি।" আল্লাহ আমাদের সবাইকে ছোট-বড় সকল প্রকার শিরক হতে রক্ষা করুন। আমীন।
টিকাঃ
* আল্লাহর অনুমতিক্রমে পরকালে হাশরের মাঠে নবী-রাসুলগন, শহীদগণ, নেকবান্দাগণ শাফা'আত করবেন তাদের জন্য যাদের উপর স্বয়ং আল্লাহ সন্তুষ্ট/খুশি।
বায়হাকী, ২৬১, ২০৩৫০, তিরমিযী, ৩০৯৫।
মাদার-কে বাংলাদেশের কিছু অঞ্চলের হিন্দুরা বড় ঋষি বলে জানে。
মুসনাদে আহমাদ: ১৯৬০৬, মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা: ২৯৫৪৭।
📄 জাহিলিয়াত : সে যুগে-এ যুগে
জাহেলী যুগের মানুষের বিশ্বাস, কর্ম ও অভ্যাসের সাথে বর্তমান বাংলাদেশের মুসলিমদের কী পরিমাণ মিল বা অমিল রয়েছে, তা সর্ব সাধারণের নিকট যেন সম্পূর্ণভাবে পরিষ্কার হয়ে যায়, সেজন্য নিম্নে উভয় সময়ের শিরকী কর্মকান্ডের একটি তুলনামূলক বর্ণনা প্রদান করা হলো:
১. জাহেলী যুগের লোকেরা কাহিন বা গণকদের দ্বারা ভাগ্য জানার চেষ্টা করত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম গণক, টিয়া পাখি ও বানরের মাধ্যমে ভাগ্য জানার চেষ্টা করে।
২. জাহেলী যুগের লোকেরা আররাফ বা ভবিষ্যদ্বাণীকারকদের গায়েব সম্পর্কীয় কথায় বিশ্বাস করত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম জিন সাধকদের গায়েব সম্পর্কীয় কথায় বিশ্বাস করে। তারা আরো মনে করে যে, নবী ও ওলীগণ গায়েব জানেন।
৩. জাহেলী যুগের লোকেরা পাখি উড়িয়ে ভাগ্যের মঙ্গল ও অমঙ্গল জানার চেষ্টা করত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম টিয়া পাখি ও বানরের সাহায্যে ভাগ্য জানার চেষ্টা করে।
৪. জাহেলী যুগের লোকেরা ওয়াদ, সুয়া'আ, ইয়াগুস ইত্যাদি নামে নির্মিত মূর্তিসমূহ প্রয়োজন পূরণ করতে পারে বলে বিশ্বাস করত। আর বর্তমান সময়ের নামধারী মুসলিম বিশ্বাস করে- ওলীগণ বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণ করতে পারেন।
৫. জাহেলী যুগের লোকেরা বিশ্বাস করত যে, দেবতারা ইহকালীন কল্যাণার্জন ও অকল্যাণ দূর করতে পারে। আর বর্তমান সময়ের অনেক নামধারী মুসলিম বিশ্বাস করে- ওলীদের মধ্যকার গাউস ও কুতুবগণ দুনিয়া পরিচালনা করেন এবং মানুষের কল্যাণ ও অকল্যাণ করতে পারেন।
৬. জাহেলী যুগের লোকেরা ওলী ও ফেরেশতাদের নামে নির্মিত মূর্তি ও দেবতাসমূহ আল্লাহর কাছে মানুষের জন্য শাফাআত করতে পারে বলে বিশ্বাস করত। আর বর্তমান সময়ের অনেক নামধারী মুসলিম বিশ্বাস করে--ওলীগণ নিজস্ব মর্যাদায় আল্লাহর কোন পূর্বানুমতি ব্যতীত তাদের ভক্তদের জন্য শাফাআত করে তাদেরকে মুক্তি দিতে পারবেন।
৭. জাহেলী যুগের লোকেরা মালাইকা/ফেরেশতা ও ওলীদের নামে নির্মিত দেবতাদের/উপাস্যদের সাধারণ মানুষদের জন্য আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়ার ওসীলা/মাধ্যম হিসেবে মনে করত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম মৃত ওলীদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়ার ওসীলা/মাধ্যম মনে করে। তারা আরো বিশ্বাস করে যে, মৃত ওলীগণ ভক্তদের সমস্যার সমাধানে হস্তক্ষেপ করতে পারেন।
৮. জাহেলী যুগের লোকেরা উয্যা ও যাতে আনওয়াত নামের গাছ সর্বস্ব দেবতা যুদ্ধে বরকত ও বিজয় এনে দিত বলে বিশ্বাস করত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম ওলীদের কবরের/মাজারের উপর অথবা পার্শ্ববর্তী স্থানে উৎপন্ন বা লাগানো গাছের শিকড়, ফল ও পাতার মাধ্যমে বরকত ও বিবিধ কল্যাণ লাভ করা যায় বলে মনে করে। তারা কবরের/মাজারের পুকুর ও কূপের পানি পান করে এবং মাছ, কচ্ছপ ও কুমীরকে খাবার দিয়ে রোগ মুক্তি ও বরকত কামনা করে।
৯. জাহেলী যুগের লোকেরা উপত্যকার জিন সর্দারের নিকট আশ্রয় কামনা করত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম কাঠ ও মধু সংগ্রহকারীদের দ্বারা জঙ্গলের জিন ও হিংস্র প্রাণীর অনিষ্ট থেকে রক্ষার জন্য জঙ্গলের জিন সর্দারের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে। বিল ও জলাশয়ের মাছ ধরার জন্য পানি সেচের পূর্বে 'কাল' নামক জিনকে শিরনী দিয়ে সন্তুষ্ট করে।
১০. জাহেলী যুগের লোকেরা পৃথিবীর ঘটনা প্রবাহের উপর তারকা ও নক্ষত্রের প্রভাবে বিশ্বাস করত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম মানুষের ভাগ্যের উপর গ্রহ ও তারকার প্রভাবে বিশ্বাস করে।
১১. জাহেলী যুগের লোকেরা গোত্রীয় নেতাদের প্রবৃত্তি অনুযায়ী গোত্র শাসন করত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম মানবরচিত বিধানের আলোকে দেশ শাসন করে। আল্লাহর পরিবর্তে দেশের জনগণকে ক্ষমতায় বসানোর মাধ্যমে সর্বময় ক্ষমতার মালিক মনে করে।
১২. জাহেলী যুগের লোকেরা দাদ ও পেগ রোগকে নিজ থেকে সংক্রামক রোগ বলে বিশ্বাস করত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম কলেরা, বসন্ত, দাদ, এজমা, যক্ষা, পেগ ও এইডস রোগকে নিজ থেকে সংক্রামক রোগ বলে মনে করে।
১৩. জাহেলী যুগের লোকেরা দেবতাদের দিকে মুখ করে দু'আ করত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম দু'আ গৃহীত হওয়ার জন্য মুরশিদ, পীর ও ওলীদের কবরের/মাজারের দিকে মুখ করে দু'আ করে।
১৪. জাহেলী যুগের লোকেরা, ছোট ছোট ব্যাপারে দেবতারা সাহায্য করতে পারে-এ বিশ্বাসের ভিত্তিতে তাদের নিকট তা কামনা করত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম মৃত ওলীগণ সাহায্য করতে পারেন মনে করে তাদের নিকট সাহায্য চায়।
১৫. জাহেলী যুগের লোকেরা ওলীদের মূর্তির সামনে বিনয়ের সাথে দাঁড়াত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম ওলীদের কবর ও পীরের সামনে বিনয়ের সাথে দাঁড়ায়।
১৬. জাহেলী যুগের লোকেরা ভালো-মন্দ সর্বাবস্থায় মূর্তির নিকট সাহায্য চাইত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম ওলীদের নিকট সাহায্য কামনা করে।
১৭. জাহেলী যুগের লোকেরা ওয়াদ, সুয়া'আ ইত্যাদি ওলীগণের প্রথমত কবর এবং পরে তাদের মূর্তির সামনে অবস্থান গ্রহণ করে আল্লাহর উপাসনায় মনোযোগ দিত ও তার নিকটবর্তী হতে চাইত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম ওলীদের কবরে অবস্থান গ্রহণ করে তাদের বাতেনী ফয়েয হাসিল করতে চায় এবং তাদের মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হতে চায়।
১৮. জাহেলী যুগের লোকেরা চাঁদ ও সূর্যকে সেজদা করত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম পীর/ওলীদের কবরে/মাজারে সেজদা করে।
১৯. জাহেলী যুগের লোকেরা বিপদাপদ দূর করার জন্য দেবতাদের উদ্দেশ্যে নযর-নিয়াজ ও মান্নত করত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম বিভিন্ন উদ্দেশ্যে পীর/ওলীদের কবরে মান্নت করে।
২০. জাহেলী যুগের লোকেরা দেবতাদেরকে আল্লাহর চেয়ে অধিক ভালোবাসত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম আল্লাহর হুকুমের উপরে পীরের হুকুমকে প্রাধান্য দেয়।
২১. জাহেলী যুগের লোকেরা দেবতাদের নিকট প্রয়োজন পেশ করত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম ওলীদের নিকট প্রয়োজন পূর্ণ করে দেয়ার জন্য আবেদন করে।
২২. জাহেলী যুগের লোকেরা উদ্দেশ্য পূরণের জন্য দেবতাদের উপর ভরসা করত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম উদ্দেশ্য পূরণের জন্য পীর/ওলীদের উপর ভরসা করে।
২৩. জাহেলী যুগের লোকেরা ধর্ম যাজকদেরকে হারাম ও হালাল নির্ধারণকারী বানিয়ে নিত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম শরীয়ত পালনের ক্ষেত্রে সহীহ হাদীসের উপর পীর ও তাদের নিজস্ব মতামতকে প্রাধান্য দেয়।
২৪. জাহেলী যুগের লোকেরা দেবতাদের সাথে সম্পর্কিত কথিত বরকতপূর্ণ স্থান সমূহ যিয়ারত করতে যেত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম ওলীদের কবর ও তাঁদের সাথে সম্পর্কিত স্থানসমূহ দূর-দূরান্ত থেকে যিয়ারত করতে যায়।
২৫. জাহেলী যুগের লোকেরা দেবতাদের মূর্তির গায়ে হাত বুলিয়ে বরকত হাসিল করত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম ওলীদের কবর/মাজার, কবরের দেয়াল, গিলাফ ও তাদের স্মৃতিসমূহ স্পর্শ করে বরকত হাসিল করে।
২৬. জাহেলী যুগের লোকেরা দেবতা ও বাপ-দাদার নামে শপথ গ্রহণ করত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম আগুন, পানি, মাটি, বিদ্যা ইত্যাদির নামে শপথ করে।
২৭. জাহেলী যুগের লোকেরা দেবতাদের নামের সাথে মিলিয়ে সন্তানাদির নাম রাখত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম কোন ওলীর নামের সাথে মিলিয়ে সন্তানাদির নাম রাখে।
২৮. জাহেলী যুগের লোকেরা বরকত হাসিলের জন্য সন্তানদেরকে দেবতাদের কাছে নিয়ে যেত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম বরকত লাভ ও রোগ মুক্তির জন্য সন্তানদেরকে পীরদের/ওলীদের কবরে নিয়ে যায়।
২৯. জাহেলী যুগের লোকেরা শিরকী পন্থায় অসুখ নিবারণের জন্য চেষ্টা করত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম বিভিন্ন তন্ত্র-মন্ত্রের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক করে।
৩০. জাহেলী যুগের লোকেরা চোখের কুদৃষ্টি থেকে শিশুদের রক্ষার জন্য গলায় ঝিনুক থেকে আহরিত মালা পরাত। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম কারো চোখ লাগা থেকে শিশুদের রক্ষার জন্য তাদের গলায় মাছের হাড়, শামুক ইত্যাদি ঝুলিয়ে রাখে।
উপরোক্ত তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে এ কথা পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হয় যে, জাহেলী যুগের মুশরিকদের বিশ্বাস, কর্ম ও অভ্যাসের সাথে আমাদের দেশের অনেক মুসলিমদের বিশ্বাস, কর্ম ও অভ্যাসের যথেষ্ট মিল রয়েছে। তাদের মধ্যে এমনও অনেক শিরকী কর্ম রয়েছে যা জাহেলী যুগের মুশরিকদের মধ্যে ছিল না। জাহেলী যুগের লোকেরা নৌকা যোগে কোথাও যাওয়ার প্রাক্কালে ঝড় ও তুফানের কবলে পতিত হলে তারা বিপদ থেকে মুক্তির জন্য একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকেই স্মরণ করে তাঁকে আহ্বান করত বলে কুরআনুল কারীমে বর্ণিত হয়েছে- [সূরা ইউনুস ১০:২২] অথচ দেখা যায়, বর্তমানে অনেক মুসলিম রয়েছে যারা অনুরূপ বিপদে পতিত হলে সাহায্যের জন্য একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ তা'আলাকে আহ্বান না করে ওলীদেরকে সাহায্যের জন্য আহ্বান করে থাকে। এতে প্রমাণিত হয় যে, জাহেলী যুগের মানুষেরা যতটুকু শয়তানের শিকারে পরিণত হয়েছিল আমাদের দেশের অনেক মুসলিমরা এর চেয়েও অধিক শিকারে পরিণত হয়েছে।