📄 জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাওহীদের বাস্তবায়ন
তাওহীদের বাস্তবায়ন হলো তাওহীদকে শিরক, বিদআত ও পাপাচার মুক্ত করা। তাওহীদকে কলুষ মুক্ত করা। যারা নিজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে- নিজ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সর্বক্ষেত্রে এক আল্লাহর তাওহীদকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে এবং বড় শিরক থেকে বেঁচে থাকবে, তারা জাহান্নামে চিরস্থায়ী বসবাস করা হতে পরিত্রাণ লাভ করবে। আর যারা ছোট-বড় সর্বপ্রকার শিরক থেকে বেঁচে থাকবে এবং বড় ও ছোট পাপ হতে দূরে থাকবে, তাদের জন্য দুনিয়াতে ও আখিরাতে রয়েছে পূর্ণ নিরাপত্তা। আল্লাহ বলেন-
الَّذِينَ آمَنُوْا وَلَمْ يَلْبِسُوْا إِيْمَانَهُمْ بِظُلْمٍ أُولَئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُمْ مُهْتَدُونَ) যারা ঈমান এনেছে আর যুলুম (অর্থাৎ শিরক) দ্বারা তাদের ঈমানকে কলুষিত করেনি, তারাই নিরাপত্তা লাভ করবে; আর তারাই হলো সঠিক পথপ্রাপ্ত। [সূরা আনআম ৬:৮২]
وَمَنْ يَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَّهَا أَخَرَ لَا بُرْهَانَ لَهُ بِهِ فَإِنَّمَا حِسَابُهُ عِنْدَ رَبِّةٍ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে অন্য ইলাহকেও ডাকে, এ ব্যাপারে তার কাছে কোন দলীল প্রমাণ নেই, তবে একমাত্র তার প্রতিপালকের কাছেই তার হিসাব হবে। কাফেরগণ অবশ্যই সফলকাম হবে না। [সূরা মুমিনূন ২৩:১১৭]
📄 তাওহীদের বিপরীত হলো শিরক
শিরকের শাব্দিক অর্থ হলো, শরীক করা, অংশীদার স্থাপন করা। ইংরেজিতে বলা হয়- Polytheism, Associate, Partner. আর সাধারণ অর্থে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে আল্লাহর বৈশিষ্ট্যের সমকক্ষ করা বা আল্লাহর পাশাপাশি গাইরুল্লাহকে ইলাহ/মাবুদ/উপাস্য ও রব হিসেবে গ্রহণ করা। সারকথা হচ্ছে, আল্লাহ-কে সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রিযিকদাতা, ভাগ্যবিধাতা, সর্বময়-ক্ষমতার একক অধিপতি এবং একমাত্র উপাসক হিসেবে মনে না করাকে শিরক বলে। অতএব শিরক হচ্ছে অংশীদারিত্ব আর এ অংশীদারিত্ব হচ্ছে আল্লাহর উলুহিয়্যাত, রুবুবিয়্যাত এবং আসমা ওয়াস সিফাতের ক্ষেত্রে কাউকে তাঁর সমকক্ষ মনে করা- অর্থাৎ সৃষ্টির ছোট- বড় কোন বস্তু যেমন গ্রহ, নক্ষত্র, নবী-ওলী-দরবেশ, পীর-ফকির অথবা কোন নেক মানুষকে আল্লাহর সাথে পূর্ণ বা আংশিক সাহায্যকারী মনে করা। যেমন- মহান আল্লাহর জ্ঞান, তাঁর বড়ত্ব, মহত্ব ও সৌন্দর্যের যাবতীয় গুণাবলির ক্ষেত্রে সৃষ্টি জগতের কাউকে তাঁর সমকক্ষ মনে করা। অন্য কথায় এমন বিশ্বাস, কাজ, কথা বা অভ্যাসকে শিরক বলা হয়, যার দ্বারা বাহ্যত মহান আল্লাহর রুবুবিয়্যাত, উলুহিয়্যাত ও গুণাবলিতে অপর কারো অংশীদারিত্ব বা সমকক্ষতা প্রতীয়মান হয়।
শিরক কত প্রকার?
শিরক দুই প্রকার: ১. শিরকে আকবার (বড় শিরক) ২. শিরকে আসগার (ছোট শিরক)
১. শিরকে আকবার: শিরকে আকবার বলা হয় এমন শিরককে, যা বান্দাকে ইসলামের মিল্লাতের গন্ডি থেকে বের করে দেয়। এ ধরনের শিরকে লিপ্ত ব্যক্তি যদি তওবা না করে এবং শিরকের উপরই মৃত্যুবরণ করে থাকে, তাহলে সে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে অবস্থান করবে। শিরকে আকবার হলো গাইরুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া যে কোন ব্যক্তি, প্রাণী বা বস্তুর উদ্দেশ্যে কোন ইবাদাত করা, গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানি করা, মান্নত করা, কোন মৃত ব্যক্তি কিংবা জিন অথবা শয়তান কারো ক্ষতি করতে পারে কিংবা কাউকে অসুস্থ করতে পারে, এ ধরনের ভয় পাওয়া, প্রয়োজন ও চাহিদা পূর্ণ করা এবং বিপদ দূর করার ন্যায় যেসব ব্যাপারে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ ক্ষমতা রাখে না- সেসব ব্যাপারে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে আশা করা। আল্লাহ বলেন,
وَيَعْبُدُونَ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ وَيَقُوْلُوْنَ هَؤُلَاءِ شُفَعَاؤُنَا عِنْدَ اللَّهِ
আর তারা আল্লাহকে ছেড়ে ইবাদাত করে এমন কিছুর যা না পারে তাদের কোন ক্ষতি করতে, আর না পারে কোন উপকার করতে। আর তারা বলে, এগুলো আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশকারী। [সূরা ইউনুস ১০:১৮]
২. শিরকে আসগার: শিরক আসগার বান্দাকে মুসলিম মিল্লাতের গন্ডি থেকে বের করে দেয় না, তবে তার তাওহীদী আকীদায় ত্রুটি ও ঘাটতির সৃষ্টি করে। এটি শিরকে আকবারে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যম ও কারণ। এ ধরনের শিরক দু'প্রকারে সংঘটিত হয়ে থাকে।
প্রথমত: কথা ও কাজের ক্ষেত্রে। দ্বিতীয়ত: গোপন শিরক। কথার ক্ষেত্রে শিরকের উদাহরণ: যেমন আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর কসম বা শপথ করা। রাসূল বলেন, مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللَّهِ فَقَدْ أَشْرَكَ»
যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে কসম করল, সে শিরক করল।** এমন কথা বলা যে, مَا شَاءَ اللَّهُ وَشِئْتَ অর্থাৎ আল্লাহ এবং তুমি যেমন চেয়েছ। কোন এক ব্যক্তি রাসূল-কে "আল্লাহ এবং আপনি যেমন চেয়েছেন" কথাটি বললে তিনি বললেন, তুমি কি আমাকে আল্লাহর সাথে সমকক্ষ স্থির করলে? বরং বলো, আল্লাহ এককভাবে যা চেয়েছেন。
কাজের ক্ষেত্রে শিরকের উদাহরণ: যেমন বিপদাপদ দূর করার জন্য কড়ি কিংবা দাগা বাঁধা, বদনযর থেকে বাঁচার জন্য তাবিজ লটকানো ইত্যাদি। এসব ব্যাপারে যদি এ বিশ্বাস থাকে যে, এগুলো বালা-মুসীবত দূর করার মাধ্যম ও উপকরণ, তাহলে তা হবে শিরকে আসগার। কেননা আল্লাহ এগুলোকে সে উপকরণ হিসেবে সৃষ্টি করেননি। পক্ষান্তরে কারো যদি এ বিশ্বাস হয় যে, এসব বস্তু স্বয়ং বালা-মুসীবত দূর করে, তবে তা হবে শিরকে আকবার। কেননা এতে গাইরুল্লাহর প্রতি সেই ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে যা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট।
গোপন শিরকের উদাহরণ: এ প্রকার শিরকের স্থান হলো ইচ্ছা, সংকল্প ও নিয়তের মধ্যে। যেমন লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে বা প্রসিদ্ধি অর্জনের জন্য কোন আমল করা। অর্থাৎ আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায় এমন কোন কাজ করে তা দ্বারা মানুষের প্রশংসা লাভের ইচ্ছা করা। যেমন মানুষকে দেখানোর জন্য সুন্দরভাবে নামায আদায় করা কিংবা সাদাকা করা এ উদ্দেশ্যে যে, মানুষ তার প্রশংসা করবে অথবা সশব্দে যিকির-আযকার করা ও সুকণ্ঠে তিলাওয়াত করা যাতে তা শুনে লোকজন তার গুণগান করে। যদি কোন আমলে রিয়া তথা লোক দেখানোর উদ্দেশ্য সংমিশ্রিত থাকে, তাহলে আল্লাহ তা বাতিল করে দেন। তিনি বলেন, ﴿فَمَن كَانَ يَرْجُوا لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا﴾ কাজেই যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সঙ্গে সাক্ষাতের আশা করে, সে যেন সৎ আমল করে; আর তার প্রতিপালকের ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে।। [সূরা কাহফ ১৮: ১১০]
إِنَّ أَخْوَنَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ قَالُوا : يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ ؟ قَالَ : الرِّيَاءُ তোমাদের উপর আমি যে জিনিসের ভয় সবচেয়ে বেশি করছি তা হলো শিরকে আসগার। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল ! শিরকে আসগার কী? তিনি বললেন, রিয়া (লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে আমল করা)।"
পার্থিব লোভে পড়ে কোন আমল করাও এ প্রকার শিরকের অন্তর্গত। যেমন কোন ব্যক্তি শুধু ধনসম্পদ অর্জনের জন্যই আযান দেয় অথবা লোকদের ইমামতি করে, কিংবা শরঈ জ্ঞান অর্জন করে। নবী বলেন, تَعِسَ عَبْدُ الدِّينَارِ وَعَبْدُ الدِّرْهَم وَعَبْدُ الْخَمِيصَةِ إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ وَإِنْ لَمْ يُعْطَ سَخِطَ تَعِسَ وَانْتَكَسَ দ্বীনার, দিরহাম এবং খামিসা, খামিলা (তথা উত্তম পোশাক-পরিচ্ছদ) এর দাস যারা, তাদের ধ্বংস। তাকে দেয়া হলে সে সন্তুষ্ট হয়, আর না দেয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়।"
ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন, সংকল্প বা নিয়তের শিরক হলো এমন এক সাগর সদৃশ যার কোন কূল-কিনারা নেই। খুব কম লোকই তা থেকে বাঁচতে পারে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আমল করলো বা নৈকট্য কামনা করলো অথবা অন্য কারও নিকট আমলের প্রতিদান চাইল- সে নিয়ত ও সংকল্পের ক্ষেত্রে শিরক করল।
উপরের বক্তব্য থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, শিরকে আকবার ও শিরকে আসগারের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। সংক্ষিপ্তভাবে সেগুলো হলো:
১. কোন ব্যক্তি শিরকে আকবারে লিপ্ত হলে সে মুসলিম মিল্লাত থেকে বের হয়ে যায়। পক্ষান্তরে শিরকে আসগারের ফলে মুসলিম মিল্লাত থেকে বের হয় না।
২. শিরকে আকবারে লিপ্ত ব্যক্তি চিরকাল জাহান্নামে অবস্থান করবে। পক্ষান্তরে শিরকে আসগারে লিপ্ত ব্যক্তি জাহান্নামে গেলে চিরকাল সেখানে অবস্থান করবে না।
৩. শিরকে আকবার বান্দার সমস্ত আমল নষ্ট করে দেয়। কিন্তু শিরকে আসগার সব আমল নষ্ট করে না। বরং রিয়া ও দুনিয়া অর্জনের উদ্দেশ্যে কৃত আমল এবং শুধু তৎসংশিষ্ট আমলকেই নষ্ট করে দেয়।
৪. শিরকে আকবারে লিপ্ত ব্যক্তির জান-মাল মুসলিমদের জন্য হালাল। পক্ষান্তরে শিরকে আসগারে লিপ্ত ব্যক্তির জান-মাল কারো জন্য হালাল নয়।
টিকাঃ
* মুসনাদে আহমাদ ৬০৭২, ৫৫৯৪; আবু দাউদ: ৩২৫১। ** মুসনাদে আহমাদ ১৮৩৯, ইবনে মাজাহ: ২১১৭。
মুসনাদে আহমাদ: ২৩৬৭০, ২৩৬৮৬। - সহীহ বুখারী: ২৮৮৭, ইবনে মাজাহ: ৪১৩৬
আল-জাওয়াবুল কাফী, ১৪৭ পৃ.
📄 শিরকের ভয়াবহতা
শিরক হচ্ছে সব চেয়ে বড় পাপ, যা দয়াময় আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করে আর পরিপূর্ণ তাওবা না করে মারা যায়, তাহলে তাকে চিরকাল জাহান্নামে থাকতে হবে। শিরকের ভয়াবহতা এত বেশি যে, শিরক মানুষের সব আমল নষ্ট করে দেয় এবং মানুষকে চিরস্থায়ী জাহান্নামের দিকে ঠেলে দেয়। আল্লাহ বলেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا
নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে অংশীদার স্থাপনকারীকে ক্ষমা করবেন না এবং তা ব্যতীত যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন এবং যে কেউ আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থির করে সে মহাপাপে আবদ্ধ হলো। [সূরা নিসা ৪:৪৮]
হাদীসে এসেছে,
مَنْ لَقِيَ اللَّهَ لَا يُشْرِكْ بِهِ شَيْئًا dَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ لَقِيَهُ يُشْرِكُ بِهِ دَخَلَ النَّارِ
যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কিছু শরীক না করে মারা যাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কিছু শরীক করা অবস্থায় মারা যাবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।"
وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ
স্মরণ করো, যখন লুকমান তার ছেলেকে নসীহত করে বলেছিল- হে বৎস! আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না, শিরক হচ্ছে অবশ্যই বিরাট যুলুম। [সূরা লুকমান ৩১: ১৩]
إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ
নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন এবং তার বাসস্থান হবে জাহান্নাম; আর এরূপ অত্যাচারীদের জন্য কোন সাহায্যকারী থাকবে না। [সূরা মায়েদা ৫: ৭২] আল্লাহ তার নবী -কে সাবধান করে বলেন,
وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
কিন্তু তোমার কাছে আর তোমাদের পূর্ববর্তীদের কাছে ওহী করা হয়েছে যে, তুমি যদি (আল্লাহর) সাথে শরীক স্থির কর, তাহলে তোমার কর্ম অবশ্যই নিষ্ফল হয়ে যাবে, আর তুমি অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। [সূরা যুমার ৩৯: ৬৫] আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার! কত কঠিন সাবধানবাণী- নবীরাও যদি শিরক করতেন, তাহলে তাদের সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে যেত। অতএব আমরা উম্মতরা কোথায় আছি! সুতরাং সাবধান, শিরক থেকে সাবধান, শিরক থেকে সাবধান! হে আল্লাহ, হে বিশ্বজগতের রব তোমার কাছে আমরা যাবতীয় শিরক থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
টিকাঃ
- সহীহ মুসলিম ৯৩, সহীহ বুখারী: ১২৯।
📄 কীভাবে শিরকের সূচনা হয় ?
আপনি যদি চিন্তা করে দেখেন পৃথিবীতে কীভাবে শিরকের সূচনা হয়; তবে দেখবেন এর কারণ হলো নেককার লোকদের নিয়ে বাড়াবাড়ি। নূহ এর সম্প্রদায় তাওহীদপন্থী ছিল। তারা এককভাবে একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করত। তাঁর সাথে কাউকে শরীক করত না। সে সময় পৃথিবীর বুকে কোন শিরক ছিল না। তাদের মধ্যে ওয়াদ, সুয়া'আ, ইয়াগূস, ইয়া'উক ও নাসর নামে পাঁচজন আল্লাহওয়ালা/নেককার লোক ছিল। তাদের মৃত্যুর পর তার গোত্রের লোকেরা খুবই চিন্তিত হলো। তারা বলল, যারা আমাদেরকে ইবাদাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন তারা তো চলে গেলেন। শয়তান এসে তাদের কুমন্ত্রণা দিয়ে বলল, তোমরা যদি তাদের ছবি তৈরি করতে মূর্তির আকৃতিতে আর তা মসজিদের কাছে রেখে দিতে তাহলে তাদেরকে দেখলেই তোমরা তোমাদের ইবাদাতে প্রাণ ফিরে পেতে। লোকেরা শয়তানের কথা শুনল এবং মূর্তি তৈরি করল। উদ্দেশ্য তাদের দেখে ইবাদাত ও নেক কাজে স্পৃহা ও উদ্দীপনা লাভ করা। এভাবে কিছুকাল পার হয়ে গেল। তারা ধীরে ধীরে বিদায় নিল। নতুন প্রজন্ম অর্থাৎ তাদের সন্তানগণ জ্ঞানবান হওয়ার পর থেকেই দেখল যে, তাদের বাপ-দাদারা এ সমস্ত মূর্তি সম্পর্কে ভালো ভালো কথা বলে, তাদের অনেক প্রশংসা করে। তাদের পর আরেক প্রজন্ম দুনিয়ায় এলো। ইবলীস তাদের কাছে এসে বলল, তোমাদের বাপ-দাদারা এগুলোর ইবাদাত করত, দুর্ভিক্ষ বা অনাবৃষ্টি বা বিপদ- আপদে তারা এগুলোর আশ্রয় কামনা করত। সুতরাং তোমরা এগুলোর ইবাদাত করো। তারা শয়তানের প্ররোচনায় নেক বান্দাদের মূর্তির/ভাস্কর্যের ইবাদাত শুরু করল। আর এভাবেই এই পৃথিবীতে শিরকের সূচনা ঘটে। তখন আল্লাহ তাওহীদের মিশন দিয়ে নূহ-কে পাঠালেন। তিনি তাদেরকে ঐ সমস্ত মূর্তির সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করে এক আল্লাহর ইবাদাতের দিকে মানুষকে আহ্বান জানালেন। সাড়ে নয়শ বছর তিনি দাওয়াত দিলেন। কিন্তু মাত্র অল্প ক'জন লোক দাওয়াত কবুল করল। মুশরিক জাতির নেতৃস্থানীয়রা তখন বলেছিল- وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ الهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوْثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا
আর তারা বলেছিল, তোমাদের দেব-দেবীদের কক্ষনো পরিত্যাগ করো না, আর অবশ্যই পরিত্যাগ করো না ওয়াদ সুয়া'আকে, আর না ইয়াগুস, ইয়া'উক ও নাসরকে। [সূরা নূহ ৭১: ২৩] নূহ তার জাতিকে শুধুমাত্র এক ইলাহের (আল্লাহর) ইবাদাতের দিকে আহ্বান করেছিলেন। তিনি তাদের কোন পীর-বুযুর্গের নাম উল্লেখ করেননি। অথচ তার জাতি প্রত্যুত্তরে পাঁচজন আল্লাহ-ওয়ালার নাম উল্লেখ করে বলতে চাইল- হে নূহ! এরা কি তোমার চেয়ে কম বুঝেছিল? বতর্মানেও জাতির সামনে তাওহীদের (এক আল্লাহর ইবাদাতের) দাওয়াত তুলে ধরা হলে তারা বিভিন্ন পীর-বুজুর্গদের, বাপ-দাদা ও পূর্বপুরুষের কথা উল্লেখ করে বলে এরা কি কম বুঝে? তারা কি ভুল করেছিল?