📄 লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর শর্তাবলি
তাওহীদী কালিমা তথা لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ [লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ] এর কতগুলো শর্ত আছে। এর গুরুত্ব অপরিসীম। এ সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা এবং এ শর্তগুলো পূরণ করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ওয়াজিব। তাওহীদ [লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ] এর কয়েকটি শর্ত নিচে আলোচনা করা হলো:
১. اَلْعِلْمُ জ্ঞান : তাওহীদের প্রথম শর্ত হলো তাওহীদের কালিমা 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এর জ্ঞান অর্জন করা। আল্লাহ বলেন,
فَأَعْلَمُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مُتَقَلَّبَكُمْ وَمَثْوَا كُمْ সুতরাং জেনে রেখো, আল্লাহ ছাড়া কোন (সত্য) মাবুদ নেই; অতএব ক্ষমাপ্রার্থনা করো তোমার এবং মুমিন নর-নারীদের পাপের জন্য। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি এবং অবস্থান সম্বন্ধে সম্যক অবগত আছেন। [সূরা মুহাম্মাদ ৪৭: ১৯]
২. اَليَائِينَ নিশ্চিত বিশ্বাস:
আমাদেরকে অবশ্যই শাহাদাহ্র প্রথম শর্ত [তাওহীদ ও রিসালাত] এর উপর দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে। আল্লাহর অস্তিত্ব, আল্লাহর রাসূল , ফেরেশতা, আসমানী কিতাবসমূহ, বিচার দিবস, তাব্দীর, জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদির ব্যাপারেও কোনরূপ সন্দেহ পোষণ করার অবকাশ নেই। আল্লাহ্ ও রাসূল এর বক্তব্যের বিরোধিতা করা যাবে না।
وَمَنْ يَكْفُرْ بِاللهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا যে ব্যক্তি আল্লাহকে ও তাঁর ফেরেশতাদেরকে, তাঁর কিতাবসমূহকে, তাঁর রাসূলগণকে এবং শেষ দিবসকে অস্বীকার করে সে সীমাহীন পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়। [সূরা নিসাঃ ৪: ১৩৬]
৩. اَلصِّدُقُ সত্যবাদিতা :
একজন মুমিনকে তাওহীদের কালিমায় সত্যবাদী হতে হবে। সে মুখে কালিমা উচ্চারণ করার পর যদি অন্তরে তার বিপরীত ধারণা পোষণ করে তবে সে মুমিন হতে পারবে না। যেমন আল্লাহ মুনাফিকদের সম্পর্কে বলেন,
إِذَا جَاءَكَ الْمُنَافِقُوْنَ قَالُوا نَشْهَدُ إِنَّكَ لَرَسُولُ اللهِ وَاللهُ يَعْلَمُ إِنَّكَ لَرَسُولُهُ وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَكَاذِبُونَ মুনাফিকরা যখন তোমার কাছে আসে তখন তারা বলে- আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ জানেন, অবশ্যই তুমি তাঁর রাসূল আর আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। [সূরা মুনাফিকুন- ৬৩: ১]
এখানে মুনাফিকরা নবী -কে আল্লাহর রাসূল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং কথাটাকে তাগিদ দিয়ে বলেছে "আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি”। আর সাক্ষ্য বলা হয় আন্তরিক বিশ্বাসসহ কোন কথা বলাকে। যেহেতু তারা আন্তরিক বিশ্বাস নিয়ে কথাটি বলেনি, এ কারণে "আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি” তাদের এ দাবি মিথ্যা। এ জন্যই আল্লাহ তাদেরকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করেছেন।
৪. الاِخْلَاصُ একনিষ্ঠতা :
কালিমার দাবি অনুযায়ী বান্দার সকল ইবাদাতকে একমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদিত করাই হচ্ছে ইখলাস। আল্লাহ বলেন,
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ وَذَلِكَ دِينُ الْقَيِّمَةِ তাদেরকে এ ছাড়া অন্য কোন হুকুমই দেয়া হয়নি যে, তারা আল্লাহর ইবাদাত করবে খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমে। আর তারা নামায প্রতিষ্ঠা করবে আর যাকাত দিবে। আর এটাই সঠিক সুদৃঢ় দ্বীন। [সূরা বায়্যিনাহ ৯৮: ৫]
৫. الْقَبُولُ প্রকাশ্যে এবং গোপনে ঈমানের স্বীকৃতি: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ]লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। এ কালিমাকে মনে-প্রাণে গ্রহণ করতে হবে। কোন ব্যক্তি لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ]লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। এর অর্থ জানল এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসও করল, কিন্তু গ্রহণ করল না, তাহলে সে মুমিন বলে বিবেচিত হবে না। মক্কার কাফির-মুশরিকরা لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُه ]লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। এর অর্থ ভালো করেই জানত। আন্তরিকভাবে বিশ্বাসও করত; কিন্তু অহংকারবশত গ্রহণ করত না। ফলে তারা কাফির-মুশরিকই রয়ে গেল। তারা لَا إِلهَ إِلَّا الله ]লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। এর অর্থ জেনে- বুঝে প্রত্যাখ্যান করেছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, إِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ يَسْتَكْبِرُوْنَ وَيَقُولُونَ أَئِنَّا لَتَارِكُوا الهَتِنَا لِشَاعِرٍ مَجْنُونٍ যখন তাদেরকে বলা হতো যে, আল্লাহ ছাড়া কোন (সত্য) মাবুদ নেই তখন তারা অহংকার করত এবং বলত, আমরা কি এক পাগল কবির কথায় আমাদের মাবুদদেরকে বর্জন করব? [সূরা সাফফাত ৩৭: ৩৫, ৩৬]
৬. اَلْإِنْقِيَادُ আত্মসমর্পণ : لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ]লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। এর অর্থ জানা, এর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা এবং বাস্তবে ইবাদাতের মাধ্যমে তা গ্রহণ করার পর لَا إِلَهَ إِلَّا الله ]লা-ইলাহা- ইল্লাল্লাহ। এর কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে হবে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ! তারা মুমিন হবে না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের বিবাদ-বিসম্বাদের মীমাংসার ভার তোমার উপর ন্যস্ত না করে, অতঃপর তোমার ফায়সালার ব্যাপারে তাদের মনে কিছু মাত্র কুণ্ঠাবোধ না থাকে, আর তারা তার সামনে নিজেদেরকে পূর্ণরূপে সমর্পণ করে। [সূরা নিসা ৪: ৬৫]
৭. اَلْمُحَبَّةُ ভালোবাসা:
এ কালিমাকে মনে-প্রাণে ভালোবাসতে হবে এবং সমস্ত প্রকার ভালোবাসা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যই নিবেদিত করতে হবে। কোন ব্যক্তি বা বস্তুকে আল্লাহর জন্যই ভালোবাসতে হবে এবং তাঁর জন্যই ঘৃণা করতে হবে। ইবরাহীম এর ঘটনা আল ওয়ালা ওয়াল বারা এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সুতরাং মুমিনকে অবশ্যই হক (সত্য) ভালোবাসতে হবে এবং বাতিলকে (মিথ্যাকে) ঘৃণা করতে হবে। এসকল শর্ত মেনে চলা ব্যতীত একজন বান্দা কুফরী ও মুনাফিকী থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। তাই এসকল শর্ত মেনে لَا إِلَهَ إِلَّا الله ]লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। এর সাক্ষ্য দিতে হবে।
টিকাঃ
আল্লামা আবদুল্লাহিল কাফী আল-কুরাইশী, কালিমা তাইয়েবা, পৃ. ৭৭-৮০।
📄 লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর সাক্ষ্য আল্লাহ নিজে দিয়েছেন
এটি এমনই এক মহান কালিমা, যার সাক্ষ্য স্বয়ং আল্লাহ, তাঁর মালাইকা/ফেরেশতাগণ এবং সমস্ত জ্ঞানবানরা দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ ) আল্লাহ সাক্ষ্য প্রদান করেন যে, নিশ্চয় তিনি ব্যতীত কেউ ইলাহ (উপাস্য) নেই এবং মালাইকা/ফেরেশতা, জ্ঞানবানগণ ও সুবিচারে আস্থা স্থাপনকারীগণও সাক্ষ্য দেয় যে, এই মহা পরাক্রান্ত বিজ্ঞানময় ব্যতীত আর কোনই উপাস্য নেই। [সূরা আল-ইমরান ৩: ১৮] অর্থাৎ যারা জ্ঞানী তারা সততা এবং ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে এ কালিমার সাক্ষ্য দেয়। সুতরাং একথা স্পষ্ট যে, যারা অজ্ঞ, মূর্খ, জাহেল তারাই এ কালিমার সাক্ষ্য দেয়া থেকে বিরত থাকে। মহান আল্লাহ বলেন, ﴾ فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ কাজেই জেনে রেখো, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই। [সূরা মুহাম্মাদ ৪৭: ১৯]
📄 লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর সাক্ষ্য দানের আহ্বান
মহান আল্লাহ বলেন, قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي وَسُبْحَانَ اللَّهِ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ বলো, এটাই আমার পথ, আল্লাহর পথে আহ্বান জানাচ্ছি, আমি ও আমার অনুসারীরা, স্পষ্ট জ্ঞানের মাধ্যমে। আল্লাহ মহান, পবিত্র; আমি কক্ষনো মুশরিকদের মধ্যে শামিল হব না। [সূরা ইউসুফ ১২: ১০৮]
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ! قُوْلُوْا لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ تُفْلِحُوا হে মানুষেরা! বলো, "আল্লাহ ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই"তাহলেই তোমরা সফল হবে।*
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ لِمُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ حِيْنَ بَعَثَهُ إِلَى اليَمَنِ: إِنَّكَ سَتَأْتِي قَوْمًا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ فَإِذَا جِئْتَهُمْ فَادْعُهُمْ إِلَى أَنْ يَشْهَدُوا أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَإِنْ هُمْ طَاعُوا لَكَ بِذلِكَ فَأَخْبِرْهُمْ أَنَّ اللَّهَ قَدْ فَرَضَ عَلَيْهِمْ خَمْسَ صَلَوَاتٍ في كُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ فَإِنْ هُمْ طَاعُوا لَكَ بِذلِكَ فَأَخْبِرْهُمْ أَنَّ اللَّهَ قَدْ فَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ فَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ فَإِنْ هُمْ طَاعُوا لَكَ بِذلِكَ فَإِيَّاكَ وَكَرَائِمَ أَمْوَالِهِمْ وَاتَّقِ دَعْوَةَ المَظْلُومِ فَإِنَّهُ لَيْسَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ
ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ মুয়ায বিন জাবাল-কে ইয়ামানের শাসনকর্তা নিয়োগ করে পাঠানোর সময় বললেন, তুমি এমন এক সম্প্রদায়ের কাছে যাচ্ছ যারা আহলে কিতাব। সর্বপ্রথম যে জিনিসের দিকে তুমি তাদেরকে আহ্বান জানাবে তা হচ্ছে, আল্লাহ ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ইলাহা ইল্লাল্লাহ] এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল- এর সাক্ষ্য দান। এ বিষয়ে যদি তারা তোমার আনুগত্য করে তবে তাদেরকে জানিয়ে দিয়ো যে, মহান আল্লাহ তাদের উপর দিনে-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে তারা যদি তোমার কথা মেনে নেয় তবে তাদেরকে জানিয়ে দিয়ো যে, মহান আল্লাহ তাদের উপর যাকাত ফরয করে দিয়েছেন, যা বিত্তশালীদের কাছ থেকে নিয়ে গরিবদেরকে দেয়া হবে। তারা যদি এ ব্যাপারেও তোমার আনুগত্য করে তবে তাদের উৎকৃষ্ট মালের ব্যাপারে তুমি খুব সাবধান থাকবে। আর মাযলুমের ফরিয়াদকে ভয় করে চলবে। কেননা মাযলুমের ফরিয়াদ এবং আল্লাহর মাঝখানে কোন পর্দা নেই。
টিকাঃ
ইবনে খুযায়মাহ: ১৫৯, মুসনাদে আহমাদ: ১৬০২২-২৩।
সহীহ বুখারী ৪৩৪৭, সুনানে ইবনে মাজাহ ১৭৮৩, সুনানে আবু দাউদ ১৫৮৪।
📄 লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর আহ্বানে পূর্ববর্তীরা কী বলেছিল
প্রিয় পাঠক! আসুন এবার জেনে নেই- নবী-রাসূলরা যখন لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ]লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ] এর দাওয়াত দিয়েছিলেন তাদের জাতিকে তখন সেই জাতির লোকেরা কী বলেছিল? রাসূল যখন তার জাতিকে আহ্বান জানালেন, لَا إِلَهَ إِلَّا الله [লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ] বলতে অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন (সত্য) মাবুদ নেই এর সাক্ষ্য দিতে, তখন মুশরিকরা বলেছিল,
أَجَعَلَ الْآلِهَةَ إِلَهًا وَاحِدًا إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ عُجَابٌ) সে কি অনেক মাবুদের পরিবর্তে এক মাবুদ বানিয়ে নিয়েছে? এতো এক আশ্চর্য ব্যাপার! [সূরা সোয়াদ ৩৮: ৫]
وَ يَقُولُونَ أَبْنَا لَتَارِكُوا لِهِتِتِنَا لِشَاعِرٍ مَّجْنُونٍ) ৩৫ এবং তারা বলত, আমরা কি এক পাগল কবির কথায় আমাদের ইলাহদেরকে বর্জন করব? [সূরা সাফফাত ৩৭: ৩৬]
বুঝা গেল, মুশরিকরা لَا إِلَهَ إِلَّا الله] লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ] এর অর্থ ঠিকমতই বুঝেছিল যে, এক আল্লাহকে মেনে নিলে সমস্ত দেব-দেবী, তাগূত ও গাইরুল্লাহকে বর্জন করতে হবে। নতুবা তারা (আমাদের ইলাহদেরকে পরিত্যাগ করব?) এ কথা বলল কেন? আল্লাহ বলেন-
وَإِذَا ذَكَرْتَ رَبَّكَ فِي الْقُرْآنِ وَحْدَهُ وَلَّوْا عَلَى أَدْبَارِهِمْ نُفُورًا) আর যখন তুমি কুরআনে তোমার প্রতিপালকের একত্বের কথা (তাদের সামনে) উল্লেখ করো, তখন তারা (সত্য থেকে) পালিয়ে পিছনে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। [সূরা বনী ইসরাঈল ১৭: ৪৬]
তারা বলে, আমাদের লাত কোথায় গেল? উযযা কোথায় গেল? মূর্তি/প্রতিমা কোথায় গেল? পীর কোথায় গেল? খাজা বাবা, গাঁজা বাবা কোথায় গেল? একি বলে! শুধুমাত্র এক ইলাহকেই মানতে হবে! এক আল্লাহরই ইবাদাত করতে হবে! এতো বড় আজব ব্যাপার! কুরআনে আরও বর্ণিত হয়েছে,
وَإِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَحْدَهُ اشْمَأَزَّتْ قُلُوبُ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآخِرَةِ وَإِذَا ذُكِرَ الَّذِينَ مِنْ دُونِهِ إِذَا هُمْ يَسْتَبْشِرُونَ এক আল্লাহর কথা বলা হলে, যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না তাদের অন্তর বিতৃষ্ণায় সংকুচিত হয় এবং আল্লাহর পরিবর্তে তাদের দেবতাগুলির উল্লেখ করা হলে তারা আনন্দে উল্লসিত হয়। [সূরা যুমার ৩৯: ৪৫]
মহান আল্লাহ এখানে মক্কার কাফের-মুশরিকদের চিত্র তুলে ধরেছেন। যখন আল্লাহ্র এককত্ব তথা তাওহীদের আলোচনা করা হয়, তখন তাদের মনটা খারাপ হয়ে যায়, রাগে-ক্ষোভে, অন্তরটা ফেটে যেতে চায়। শরীরের পশমগুলো দাঁড়িয়ে যায়, চেহারাটা মলিন হয়ে যায়। আর যদি আল্লাহর সাথে তাদের নেতা, পীর, বুযুর্গ, মূর্তি, প্রতিমা তথা গাইরুল্লাহর আলোচনা করা হয়, তখন তাদের মনটা আনন্দে উল্লাসিত হয়, খুশিতে বাগ বাগ হয়ে যায়, চেহারা উজ্জ্বল হয়ে যায়।
ইসলাম বলে গাইরুল্লাহকে বর্জন করতে হবে, মুশরিকরা বলে গাইরুল্লাহকে বর্জন করা যাবে না। গাইরুল্লাহর নামে নযর-মান্নত বন্ধ করা যাবে না।
কুরআন মাজীদ বলছে, আল্লাহর সঙ্গে গাইরুল্লাহ (তথা মূর্তি/প্রতিমা, পীর, বুযুর্গ, ওলী-আউলিয়াদের)-কে যোগ করার এ রোগ শুধু মক্কার মুশরিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং পূর্ববর্তী উম্মতের মুশরিকরাও এ রোগে আক্রান্ত ছিল। সুতরাং এ কথা বলা যায় যে, রোগ একটাই কিন্তু ডাক্তার পরিবর্তন হচ্ছিল। যখনই নবী-রাসূলগণ মুশরিক সম্প্রদায়কে তাওহীদের (একত্ববাদের) কথা বলেছেন এবং তাদের কাছে দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ]লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। এর মূল দাবি পেশ করেছেন, তখনই তারা জবাবে বলেছে-
قَالُوا إِنْ أَنْتُمْ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُنَا تُرِيدُونَ أَنْ تَصُدُّونَا عَمَّا كَانَ يَعْبُدُ بَآؤُنَا فَأْتُوْنَا بِسُلْطَانٍ مُّبِينٍ তারা বলত, তোমরা তো আমাদের মতই মানুষ; আমাদের পিতৃ পুরুষগণ যাদের ইবাদাত করত তোমরা তাদের ইবাদাত হতে আমাদেরকে বিরত রাখতে চাও; অতএব তোমরা আমাদের কাছে কোন অকাট্য প্রমাণ উপস্থিত করো। [সূরা ইবরাহীম ১৪: ১০]
কাওমে নূহ: নূহ যখন তার জাতিকে তাওহীদের দাওয়াত দিলেন তখন তার জাতি উত্তর দিয়েছিল- وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ الهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوْثَ وَيَعُوْقَ وَنَسْرًا আর তারা বলেছিল, তোমাদের দেব-দেবীদের কক্ষনো পরিত্যাগ করো না, আর অবশ্যই পরিত্যাগ করো না ওয়াদ সুয়া'আকে, আর না ইয়াগুস, ইয়া'উক ও নাসরকে। [সূরা নূহ ৭১: ২৩] নূহ তার জাতিকে এক ইলাহের (আল্লাহর) দিকে আহ্বান করেছিলেন। তিনি কোন পীর-বুযুর্গের নাম উল্লেখ করেননি। অথচ তার জাতি প্রত্যুত্তরে পাঁচজন আল্লাহওয়ালার (নেককার বান্দার) নাম উল্লেখ করল। বতর্মানেও যখন মানুষকে তাওহীদের দাওয়াত দেয়া হয়, তখন মানুষ বিভিন্ন পীর-বুযুর্গের কথা উল্লেখ করে বলে, আমার মুফতী সাহেব, পীর সাহেব কেবলা, হুজুর কেবলা কি তোমাদের চেয়ে কম বুঝেছিলেন? তারা কি ভুল করেছেন?
কাওমে হূদ: قَالُوا أَجِئْتَنَا لِنَعْبُدَ اللهَ وَحْدَةً وَنَذَرَ مَا كَانَ يَعْبُدُ بَاؤُنَا তারা বলল, তুমি কি আমাদের কাছে এজন্য এসেছ যাতে আমরা এক আল্লাহর ইবাদাত করি। আর আমাদের পিতৃপুরুষগণ যার ইবাদাত করত তা ত্যাগ করি? [সূরা আরাফ ৭: ৭০] অর্থাৎ তারা আল্লাহর ইবাদাত করতে আপত্তি করেনি, কিন্তু তাদের আপত্তি ছিল তাওহীদ তথা এক আল্লাহর ইবাদাত করতে। এবার হূদ এর জাতি অহংকার এবং দাম্ভিকতা প্রকাশ করে হূদ-কে বলল-
قَالُوا يَا هُودُ مَا جِئْتَنَا بِبَيِّنَةٍ وَمَا نَحْنُ بِتَارِكِي الهَتِنَا عَنْ قَوْلِكَ وَمَا نَحْنُ لَكَ بِمُؤْمِنِينَ ) তারা বলল, হে হূদ! তুমি আমাদের কাছে কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে আসনি, আর তোমার কথায় আমরা আমাদের উপাস্যগুলোকে ত্যাগ করতে পারি না, আমরা তোমাতে বিশ্বাসী নই। [সূরা হুদ ১১: ৫৩]
এই আয়াতেও প্রমাণিত হলো হূদ গাইরুল্লাহর ইবাদাতের অনুমতি দেননি। অথচ তার জাতি গাইরুল্লাহর ইবাদাত ছাড়তে পারেনি。