📘 কালিমাতুশ শাহাদাহ > 📄 লা-ইলাহা এর চার নম্বর বর্জনীয় বিষয়

📄 লা-ইলাহা এর চার নম্বর বর্জনীয় বিষয়


إِجْتِنَابُ الطَّوَاغِيْتِ ইজতিনাবুত তাওয়াগীত। সকল প্রকার তাগূতকে বর্জন করা:
اغُوتْর্ড তাগূত শব্দটির মাসদার (ক্রিয়ামূল) হলো طغیان ]তুগইয়ান]। যার অর্থ হলো, সীমালঙ্ঘন করা। যেমন নদীর পানি দুই তীর দ্বারা বেষ্টিত থাকাই স্বাভাবিক নিয়ম; কিন্তু পানি যখন তার দু'তীর তথা সীমা অতিক্রম করে উপরে উঠে আসে তখন আরবিতে বলা হয়, طَاغَتِ الْمَاءُ )পানি সীমালঙ্ঘন করেছে)। তদ্রূপ মানুষ কেবল আল্লাহরই ইবাদাত ও আনুগত্য করবে, তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং তাঁরই আইন-কানুন মেনে চলবে। এটাই আল্লাহর নিয়মে স্বাভাবিক। কিন্তু মানুষ যখন এই স্বাভাবিক নিয়মকে পাশ কাটিয়ে নিজেই ইবাদাত-আনুগত্য বা উলুহিয়‍্যাতের দাবি করে বসে তখনই সে তাগূতে পরিণত হয়ে যায়।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন, "তাগূত হচ্ছে ঐ সকল উপাস্য, নেতা-নেত্রী, মুরুব্বি- যাদের আনুগত্য করতে গিয়ে সীমালঙ্ঘন করা হয়। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে বাদ দিয়ে যাদের কাছে বিচার-ফায়সালা চাওয়া হয় অথবা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদাত করা হয়। অথবা আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন দলীল-প্রমাণ ছাড়া যাদের আনুগত্য করা হয়। অথবা আল্লাহর আনুগত্য মনে করে যেসকল গাইবুল্লাহর ইবাদাত করা হয়। এরাই হলো পৃথিবীর বড় বড় তাগূত। তুমি যদি এই তাগূতগুলো এবং মানুষের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য কর তবে অধিকাংশ মানুষকেই দেখতে পাবে যে, তারা আল্লাহর ইবাদাতের পরিবর্তে তাগূতের ইবাদাত করে। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের কাছে (কুরআন ও সুন্নাহ এর কাছে) বিচার-ফায়সালা চাওয়ার পরিবর্তে তাগূতের কাছে বিচার-ফায়সালা নিয়ে যায়। আল্লাহ এবং রাসূলের আনুগত্য করার পরিবর্তে তাগূতের আনুগত্য করে। আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে তাগূতের নির্দেশ পালন করে।"-
তাগূতের প্রকারভেদ
তাগূতের প্রকার অনেক। তার মধ্যে বর্তমান সমাজের প্রধান প্রধান ৮ প্রকার তাগূত সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
১. ইবলীস সে আল্লাহকে বাদ দিয়ে তার ইবাদাতের দিকে মানুষকে আহ্বান করে এবং মানুষকে তাগূতে পরিণত করতে উষ্কানি দেয়- এমনকি অন্যান্য তাগূতদেরকেও সে পরিচালনা করে থাকে। আল্লাহ বলেন,
أَلَمْ أَعْهَدُ إِلَيْكُمْ يَا بَنِي آدَمَ أَنْ لَّا تَعْبُدُوا الشَّيْطَانَ " إِنَّهُ لَكُمْ cَدُوٌّ مُّبِينٌ ، وَأَنِ اعْبُدُونِي هَذَا صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٌ)
হে আদম সন্তান! আমি কি তোমাদেরকে নির্দেশ দেইনি যে, তোমরা শয়তানের ইবাদাত করো না? কারণ সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন। আর আমারই ইবাদাত করো, এটাই সরল সঠিক পথ। [সূরা ইয়াসিন ৩৬: ৬০-৬১]
সুতরাং আল্লাহ ছাড়া যা কিছুর উপাসনা/ইবাদাত করা হয় এর মূলে রয়েছে শয়তান। সেই হচ্ছে সমস্ত শিরকের মূল হোতা। তাই শয়তানের সাথে মুমিনের থাকবে চিরশত্রুতা।
২. শাসক: আল্লাহর বিধান পরিবর্তন করে, ঘৃণা করে বা অস্বীকার ও অমান্য করে এবং মানুষের বানানো শাসনতন্ত্র কায়েম করে এমন শাসকও তাগূতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন কেউ যদি বলে, এটা একবিংশ শতাব্দি, এ যুগে কুরআনের বিধান অচল, এগুলো মধ্যযুগীয় বর্বরতা, চোরের হাত কাটা, কিসাস, রজম এসব কুরআনিক বিধান বর্তমান যুগে চলে না ইত্যাদি, তাহলে তার ঈমান আর থাকবে না, তার ঈমান ভঙ্গ হয়ে যাবে। আল্লাহ বলেন,
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِيْنَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْzِلَ مِنْ قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَهُوْا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا ، وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلى مَا أَنْزَلَ اللهُ وَإِلَى الرَّسُوْلِ رَأَيْتَ الْمُنَافِقِينَ يَصُدُّونَ عَنْكَ صُدُودًا
তুমি কি সেই লোকদের প্রতি লক্ষ্য করনি, যারা তোমার প্রতি অবতীর্ণ কিতাবের এবং তোমার আগে অবতীর্ণ কিতাবের উপর ঈমান এনেছে বলে দাবি করে, কিন্তু তাগূতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়, অথচ তাকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে বহুদূরে নিয়ে যেতে চায়। যখন তাদেরকে বলা হয়- তোমরা আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাবের এবং রাসূলের দিকে এসো, তখন তুমি ঐ মুনাফিকদেরকে দেখবে, তারা তোমার নিকট হতে ঘৃণা ভরে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। [সূরা নিসা ৪: ৬০-৬১] আল্লাহ আরও বলেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ! তারা মুমিন হবে না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের বিবাদ-বিসম্বাদের মীমাংসার ভার তোমার উপর ন্যস্ত না করে, অতঃপর তোমার ফায়সালার ব্যাপারে তাদের মনে কিছু মাত্র কুণ্ঠাবোধ না থাকে, আর তারা তার সামনে নিজেদেরকে পূর্ণরূপে সমর্পণ করে। [সূরা আন-নিসা ৪: ৬৫]
৩. বিচারক: যে বিচারক বা সমাজপতি আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা অস্বীকার বা অমান্য করে, বাদ দেয় বা বাতিল করে অন্য কোন মানবরচিত আইন-বিধান বা সংবিধান দিয়ে ফায়সালা করে তারাও তাগূতের অন্তর্ভুক্ত।
মহান আল্লাহ বলেন, ﴿وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিচার ফায়সালা করে না, তারা কাফির। [সূরা মায়েদা ৫: ৪৪]
﴿وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ﴾ আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিচার ফায়সালা করে না, তারা যালিম। [সূরা মায়েদা ৫: ৪৫]
﴿وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُوْنَ) আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিচার ফায়সালা করে না, তারা ফাসিক। [সূরা মায়েদা ৫: ৪৭)
৪. ইলমে গায়েবের দাবিদার: যারা ইলমুল গায়িব বা অদৃশ্য জ্ঞানের দাবি করে তারাও তাগূত। এদের মাঝে রয়েছে জ্যোতিষী, ভবিষ্যৎ-বক্তা/গণক, পীর-ফকির, ধর্মীয়যাজক-পুরোহিত ইত্যাদি। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿وَعِنْدَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَا تَسْقُطُ مِنْ وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ) সমস্ত গায়েবের চাবিকাঠি তাঁর কাছে, তিনি ছাড়া আর কেউ তা জানে না, জলে-স্থলে যা আছে তা তিনি জানেন, এমন একটা পাতাও পড়ে না যা তিনি জানেন না। জমিনের গহীন অন্ধকারে কোন শস্য দানা নেই, নেই কোন ভেজা ও শুকনো জিনিস যা সুস্পষ্ট কিতাবে (লিখিত) নেই।।সূরা আনআম ৬: ৫৯]
৫. পীর-পুরোহিত: আলেম-উলামাদের দায়িত্ব হচ্ছে মানুষকে তাগূতকে বর্জন করার ও আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার আহ্বান করা। কিন্তু জনগণের নির্বুদ্ধিতার সুযোগ পেয়ে কতিপয় নামধারী আলেম পীর-পুরোহিত/ধর্মীয়যাজক সেজে মানুষকে আল্লাহর পরিবর্তে তাদের ইবাদাতের দিকে আহ্বান করে। এরা মানুষের থেকে দুভাবে ইবাদাত নেয়। আক্বীদা বা বিশ্বাসগতভাবে এবং আমলগতভাবে। যেমন তারা বলে, যার পীর নাই তার শির নাই, যার পীর নাই শয়তানই তার পীর, পীরের কাছে মুরীদ হওয়া ফরয। এরকম আরো অনেক কিছু বলে থাকে। অথচ ফরয বিধান দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ তা'আলা। কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট প্রমাণ ব্যতীত কোন ইবাদাতকে ফরয বলা যায় না। পীর-সুফিগণ মনগড়া ইবাদাত তৈরি করে। মনগড়া বহু তরীকা নিজেরা তৈরি করে। আবার একেক তরীকার পীরের একেক যিকির। এ সবকিছুই আল্লাহর শরীয়ত থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বাতিল/ভ্রান্ত একটি শরীয়ত; যা পরিত্যাজ্য। অথচ এ জাতীয় শরীয়ত তৈরি করার অধিকার আল্লাহ তা'আলা কাউকে দেননি। সুতরাং এরাও তাগূতের অন্তর্ভুক্ত। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿أَمْ لَهُمْ شُرَكَاءُ شَرَعُوا لَهُمْ مِنَ الدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَنْ بِهِ اللَّهُ ﴾ তাদের কি এমন কতকগুলি দেবতা আছে যারা তাদের জন্য বিধান দিয়েছে এমন দ্বীনের যার অনুমতি আল্লাহ দেননি। [সূরা শূরা ৪২: ২১]
﴿وَمَنْ يَقُلْ مِنْهُمْ إِنِّي إِلَهُ مِنْ دُوْنِهِ فَذَلِكَ نَجْزِيْهِ جَهَنَّمَ كَذَلِكَ نَجْزِي الظَّالِمِينَ ﴾ তাদের মধ্যে যে বলবে যে, 'তিনি ব্যতীত আমিই ইলাহ', তাহলে আমি তাকে তার প্রতিফল দেব জাহান্নাম। যালিমদেরকে আমি এভাবেই পুরস্কার দিয়ে থাকি। [সূরা আম্বিয়া ২১: ২৯]
৬. যাদুকর: যাদুকরেরাও তাগূতের অন্তর্ভুক্ত। যাদু হচ্ছে এমন কিছু মন্ত্র এবং ঝাড়ফুঁক, যা দেহ বা মনে প্রভাব বিস্তার করে। ফলে মানুষ অসুস্থ হয়ে মারা যায় অথবা স্বামী-স্ত্রীদের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করার মতো নিকৃষ্ট কাজ সংঘটিত হয়। যেমন পবিত্র কুরআনে এসেছে: সুলায়মানের রাজত্বকালে শয়তানরা যা পাঠ করত, তারা তা অনুসরণ করত, মূলতঃ সুলায়মান কুফরী করেনি বরং শয়তানরাই কুফরী করেছিল, তারা মানুষকে যাদু শিক্ষা দিত এবং যা বাবিলের দু'জন ফেরেশতা হারূত (হারুত) ও মারূতের (মারুতের) উপর পৌঁছানো হয়েছিল এবং ফেরেশতাদ্বয় কাউকেও (তা) শিখাত না যে পর্যন্ত না বলত, আমরা পরীক্ষা স্বরূপ, কাজেই তুমি কুফরী করো না, এতদসত্ত্বেও তারা উভয়ের নিকট হতে এমন জিনিস শিক্ষা করত, যা দ্বারা তারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করত, মূলতঃ তারা তাদের এ কাজ দ্বারা আল্লাহর বিনা হুকুমে কারও ক্ষতি করতে পারত না, বস্তুতঃ এরা এমন বিদ্যা শিখত, যা দ্বারা তাদের ক্ষতি সাধিত হতো; আর এদের কোন উপকার হতো না এবং অবশ্যই তারা জানত যে, যে ব্যক্তি ঐ কাজ অবলম্বন করবে পরকালে তার কোন অংশই থাকবে না, আর যার পরিবর্তে তারা স্বীয় আত্মাগুলোকে বিক্রয় করেছে, তা কতই না জঘন্য, যদি তারা জানত! [সূরা বাকারা ২:১০২]
৭. তাকলীদুল আবা বা বাপ-দাদা ও পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণ: বাপ-দাদা ও পূর্বপুরুষ থেকে চলে আসা যত রসম-রেওয়াজ নিয়ম-নীতি ও কুসংস্কার রয়েছে, সেগুলোকেই শক্তভাবে ধরে রাখা, তা যতই কুরআন-সুন্নাহবিরোধী হোক না কেন; এটা কোন নতুন রোগ নয়। পূর্বযুগের উম্মতরাও এই রোগে আক্রান্ত ছিল। যুগে যুগে সকল নবী-রাসূলগণ যখনই মানুষকে আল্লাহর অবতীর্ণ ওহীর পথে তথা হকের দিকে আহ্বান করেছেন তখনই তারা পূর্বপুরুষ ও আকাবিরদের দোহাই দিয়ে বলত, এটা আমার বাপ-দাদার আমল থেকে চলে এসেছে, বাপ-দাদারা কি ভুল করেছে নাকি? অমুক অমুক বড় বুযুর্গ/হুজুরে কেবলা এ কাজ করেছেন, তারা কি কম বুঝেছেন? তাদের এ প্রশ্নের উত্তর আল্লাহ কুরআনে দিয়েছেন-
(وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنْزَلَ اللهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ شَيْئًا وَلَا يَهْتَدُونَ)
যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা ঐ জিনিসের অনুসরণ করো যা আল্লাহ নাযিল করেছেন। তখন তারা বলে, বরং আমরা তারই উপর চলব, যার উপর আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের পেয়েছি, যদিও তাদের বাপ-দাদারা কিছুই বুঝত না এবং সঠিক পথে চলত না তবুও (কি তারা তারই অনুসরণ করবে)?। [সূরা বাকারা ২:১৭০] তাই যারা কুরআন-সুন্নাহ বাদ দিয়ে তাদের বাপ-দাদাদের, পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণ করবে তারাও তাগূতের (সীমালঙ্ঘনকারীদের) অন্তর্ভুক্ত।
৮. হাওয়া বা প্রবৃত্তি/খেয়াল-খুশির অনুসরণ করা: মনে মনে কোন কিছুকে ভালোবেসে তাকে পাওয়া, অর্জন করা বা তার আনুগত্য করা হচ্ছে হাওয়া বা প্রবৃত্তির অনুসরণ করা। অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহকে অনুসরণ না করে মন যা চায় তাই করা।
(أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ أَفَأَنْتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا)
তুমি কি তাকে দেখ না যে তার খেয়াল-খুশিকে ইলাহ রূপে গ্রহণ করেছে? এর পরেও কি তুমি তার কাজের জিম্মাদার হতে চাও? [সূরা আল ফুরকান ২৫: ৪৩]
এখানে তাদের কথা বলা হচ্ছে যারা তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণে জীবনযাপন করে। এজন্যই প্রবৃত্তিকে তাদের ইলাহ বলা হয়েছে। তাই তাদের নিজ প্রবৃত্তিও তাগূতের অন্তর্ভুক্ত। এরকম প্রবৃত্তিপূজা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
তাগূতকে অস্বীকার করা ফরয
আল্লাহ আদম সন্তানের উপর প্রথম যা ফরয করেছেন, তা হলো الْكُفْرُ بِالطَّاغُوتِ [তাগূতকে অস্বীকার করা] এবং الإِيْمَانُ بِاللهِ আল্লাহ্র প্রতি ঈমান আনা। মহান আল্লাহ বলেন,
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُوْلًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوْتَ প্রত্যেক জাতির কাছে আমি রাসূল পাঠিয়েছি (এ মর্মে) যে, আল্লাহর ইবাদাত করো আর তাগূতকে বর্জন করো। [সূরা নাহল ১৬: ৩৬]
فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِنُ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى لَا انْفِصَامَ لَهَا وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ অতএব যে তাগূতকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে সে এমন এক মজবুত রজ্জুকে আঁকড়ে ধরল যা কখনও ছিন্ন হবার নয়। আর আল্লাহ শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।।সূরা বাকারা ২: ২৫৬]
দ্বীনের মজবুত রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণের পূর্বশর্ত হলো দুটি। প্রথমত: তাগূতকে অস্বীকার করা। দ্বিতীয়ত: এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা। ওযুর শর্তসমূহের মধ্যে যে কোন একটি শর্ত বা ফরয ত্যাগ করলে যেমন ওযু হয় না এবং উক্ত ওযু দ্বারা সালাত আদায় করলে উক্ত সালাতও বাতিল বলে গণ্য হয়- অনুরূপভাবে সমস্ত তাগূতকে বর্জন না করেই কেউ যদি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে তাহলে সে ঈমানও আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হবে না। সুতরাং সমস্ত তাগূতকে বর্জনের উপরই নির্ভর করছে আমাদের ঈমানের বিশুদ্ধতা।
তাগূতকে কীভাবে অস্বীকার করব?
নিম্ন লিখিত উপায়ে তাগূতকে অস্বীকার করা যায়-
১। তাগূতের ইবাদাত বাতিল- এ আকীদা পোষণের মাধ্যমে: ذلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدْعُوْنَ مِنْ دُونِهِ هُوَ الْبَاطِلُ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ এটা এজন্য যে, আল্লাহ- তিনিই সত্য, আর তাঁকে বাদ দিয়ে তারা অন্য যাকে ডাকে তা অলীক, অসত্য; আর আল্লাহ, তিনি তো সর্বোচ্চ, সুমহান। [সূরা হজ্জ ২২: ৬২] ২। তাগূতকে পরিত্যাগ ও তাগূত থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে: মহান আল্লাহ বলেন,
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُوْلًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ প্রত্যেক জাতির কাছে আমি রাসূল পাঠিয়েছি (এ সংবাদ দিয়ে) যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করো আর তাগূতকে বর্জন করো।। সূরা নাহল ১৬: ৩৬]
৩। ক্রোধ ও ঘৃণার মাধ্যমে:
قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَاءُ مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَةً ইবরাহীম ও তার সঙ্গী-সাথিদের মধ্যে তোমাদের জন্য আছে উত্তম আদর্শ। যখন তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিল- তোমাদের সঙ্গে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদের ইবাদাত কর তাদের সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদেরকে প্রত্যাখ্যান করছি। আমাদের আর তোমাদের মাঝে চিরকালের জন্য শত্রুতা ও বিদ্বেষ শুরু হয়ে গেছে যতক্ষণ তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান না আনবে। [সূরা মুমতাহিনা ৬০: ৪]
দুরাবুস সানিয়াত্র ১/৯৩ পৃষ্ঠায় অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে- এ আয়াতটি এ কথারই প্রমাণ যে, মানুষ যদি তার রবের আনুগত্য, ভালোবাসা এবং তিনি যা পছন্দ করেন তার ইবাদাত করে, কিন্তু মুশরিকদেরকে (যারা তাগূতের দাসত্ব করে) এবং তাদের কাজকে ঘৃণা না করে, বিরোধিতা না করে, তবে সে তাগূতকে পরিত্যাগ করতে পারেনি। আর যে ব্যক্তি তাগূতকে পরিত্যাগ করতে পারেনি সে ইসলামেও প্রবেশ করতে পারেনি। অতএব সে কাফের- যদিও সে রাত জেগে ইবাদাত করার মাধ্যমে আর দিনে রোযা রাখার মাধ্যমে উম্মতের সবচেয়ে বড় আবেদ ও বুযুর্গ ব্যক্তি হয়ে থাকে। তার অবস্থা হচ্ছে ঐ নামাযির মতো, যে ফরয গোসল ব্যতীত সালাত আদায় করল অথবা তীব্র গরমের দিনে নফল রোযা রেখে রমাযান মাসে দিনের বেলা অশণ্টীল কাজে লিপ্ত থাকল।"
৪। দুশমনি বা শত্রুতার মাধ্যমে:
قَالَ أَفَرَأَيْتُمْ مَّا كُنْتُمْ تَعْبُدُوْنَ أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمُ الْأَقْدَمُوْنَ فَإِنَّهُمْ عَدُوٌّ لِي إِلَّا رَبَّ الْعَالَمِينَ) সে বলল, তোমরা কি ভেবে দেখেছ তোমরা কীসের পূজা করে যাচ্ছ? তোমরা আর তোমাদের আগের পিতৃপুরুষরা? তারা সবাই আমার শত্রু, বিশ্বজগতের পালনকর্তা ছাড়া। [সূরা শুআরা: ২৬: ৭৫-৭৭)
الَّذِينَ آمَنُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ كَفَرُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيْلِ الطَّاغُوتِ فَقَاتِلُوا أَوْلِيَاءَ الشَّيْطَانِ إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا যারা ঈমানদার তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে আর যারা কাফের তারা তাগুতের পথে যুদ্ধ করে। কাজেই তোমরা শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, শয়তানের ফন্দি অবশ্যই দুর্বল। [সূরা নিসা ৪: ৭৬]
সুতরাং তাগূতের সাথে মুমিনের থাকবে সুস্পষ্ট শত্রুতা। মুমিনরা তাগূতের বিরোধিতা করবে এবং প্রচেষ্টা চালাবে কীভাবে তাগূতের দাসত্বকে মিটিয়ে দিয়ে এক আল্লাহর দাসত্বের দিকে মানুষকে নিয়ে আসা যায়।

টিকাঃ
ফাতহুল মাজীদ ১/২৬, আত-তাওহীদু আওলান ১/১৯।
লক্ষণীয় যে, ৪৪, ৪৫ ও ৪৭ নং আয়াত অনুযায়ী আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিধান দেয় না তারা কাফির, যালিম ও ফাসিক বলা হয়েছে, এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আল্লাহর আইনে বিচার-ফায়সালা না করলে যালিম বা ফাসিক হওয়ার ব্যাপারটি স্বাভাবিক হলেও, এর মাধ্যমে সর্বাবস্থায়ই কি বড় শিরক বা বড় কুফরী হবে?
মূলত: আল্লাহর আইন অনুসারে না চলার কয়েকটি পর্যায় হতে পারে: (১) আল্লাহর আইন ছাড়া অন্য কোন আইনে বিচার-ফায়সালা পরিচালনা জায়েয মনে করা। (২) আল্লাহর আইন ব্যতীত অন্য কোন আইন দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা উত্তম মনে করা। (৩) আল্লাহর আইন ও অন্য কোন আইন বিচার ফায়সালার ক্ষেত্রে সমপর্যাযের মনে করা। (৪) আল্লাহর আইন পরিবর্তন করে তদস্থলে অন্য কোন আইন প্রতিষ্ঠা করা। উপরোক্ত যে কোন একটি কেউ করলে সে সর্বসম্মতভাবে কাফির হয়ে যাবে। কিন্তু এর বাইরেও কিছু পর্যায় রয়েছে যেগুলোতে আল্লাহর আইনে বিচার না করা বা অন্য আইনের কাছে বিচার চাওয়ার কারণে গোনাহগার হলেও কাফের হয়ে যায় না। বিস্তারিত জানতে পড়ুন: শাইখ মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম আলুশ শাইখ রহ. প্রণীত 'তাহকীমুল কাওয়ানীন'।
মাজমুআতুত-তাওহীদ আর-রিসালাতুল উলা ১৪-১৫ পৃঃ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00