📄 প্রথম অধ্যায় : ইসলামের কতিপয় মৌলিক প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন-১ আমাদের রব কে?
উত্তর: আমাদের রব আল্লাহ। যিনি গোটা সৃষ্টি জগতের সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা, পালনকর্তা ও বিধানদাতা। আল্লাহ ইরশাদ করেন- ﴾الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য। [সূরা ফাতিহা ১:১]
প্রশ্ন-২ রব কাকে বলে?
উত্তর: কুরআনে রব শব্দটি এসেছে ৯৮০ বার। রব এমন একটি আরবি শব্দ যা অন্য ভাষায় এক শব্দে যথাযথ অনুবাদ করা সম্ভব নয়। সাধারণত এর অর্থ করা হয় প্রতিপালক, কিন্তু এর দ্বারা প্রকৃত অর্থ প্রকাশ হয় না। রব হচ্ছেন ঐ সত্তা- যিনি গোটা সৃষ্টি জগতের সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা, পালনকর্তা, বিধানদাতা ও ইবাদাত পাওয়ার একমাত্র হকদার।
প্রশ্ন-৩ আমরা আমাদের রবকে কীভাবে চিনব?
উত্তর: রবের নিদর্শন যেমন রাত, দিন, চন্দ্র, সূর্য, পাহাড়, সাগর, ঝর্ণা, নদী এবং ভূমন্ডল-নভোমন্ডল এবং এতদুভয়ের মাঝে যা কিছু আছে সেগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করে আমরা তাঁর অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে পারি। আল্লাহ ইরশাদ করেন- وَمِنْ آيَاتِهِ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ لَا تَسْجُدُوا لِلشَّمْسِ وَلَا لِلْقَمَرِ وَاسْجُدُو اللَّهِ الَّذِي خَلَقَهُنَّ إِنْ كُنْتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ ) তাঁর নিদর্শনগুলোর মধ্যে হলো রাত, দিন, সূর্য আর চন্দ্র। সূর্যকে সেজদা করো না, চন্দ্রকেও না। সেজদা করো আল্লাহকে যিনি এগুলোকে সৃষ্টি করেছেন যদি সত্যিকারভাবে তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করতে চাও। [সূরা হামীম সাজদা ৪১: ৩৭]
إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يُغْشِي اللَّيْلَ النَّهَارَ يَطْلُبُهُ حَثِيثًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتٍ بِأَمْرِهِ أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ تَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ ) তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ যিনি ছয় দিনে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আরশে সমুন্নত হয়েছেন। দিনকে তিনি রাতের পর্দা দিয়ে ঢেকে দেন, তারা একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে এবং সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি তাঁরই অনুগত। জেনে রেখো, সৃষ্টি তাঁর, হুকুমও (চলবে) তাঁর, বরকতময় আল্লাহ বিশ্বজগতের প্রতিপালক।।সূরা আরাফ ৭: ৫৪]
প্রশ্ন-৪ আমাদের রব কোথায় আছেন?
উত্তর: আমাদের রব আরশে আযীমে আছেন। যেমন তিনি বলেছেন-
الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى দয়াময় আরশে সমুন্নত।। সূরা ত্বহা ২০:৫]
প্রশ্ন-৫ আল্লাহ কি সবখানে বিরাজমান?
উত্তর: আল্লাহ সপ্তাকাশের উপর সুমহান আরশে সমুন্নত। আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে এই মহাবিশ্বের কিছুই নেই। সবখানে তাঁর রহমত, বরকত, দয়া, কল্যাণ, দৃষ্টি, শ্রবণ ও ক্ষমতা পূর্ণমাত্রায় উপস্থিত।
أَمْ أَمِنْتُمْ مِّنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا * فَسَتَعْلَمُونَ كَيْفَ نَذِيرٍ কিংবা তোমরা কি নিরাপদ হয়ে গেছ যে, যিনি আকাশে আছেন তিনি তোমাদের উপর পাথর বর্ষণকারী ঝড়ো হাওয়া পাঠাবেন না? যাতে তোমরা জানতে পারবে যে, কেমন (ভয়ানক) ছিল আমার সতর্কবাণী। [সূরা মুলক ৬৭: ১৭]
اللَّهُ الَّذِي رَفَعَ السَّمَاوَاتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ كُلٌّ يَجْرِي لِأَجَلٍ مُسَمًّى يُدَبِّرُ الْأَمْرَ يُفَصِّلُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ بِلِقَاءِ رَبِّكُمْ تُوْقِنُونَ আল্লাহই স্তম্ভ ছাড়া আকাশমন্ডলীকে ঊর্ধ্বে তুলে রেখেছেন, যা তোমরা দেখছ, অতঃপর তিনি আরশে সমুন্নত হয়েছেন। তিনিই সূর্য ও চন্দ্রকে নিয়মের বন্ধনে বশীভূত রেখেছেন, প্রত্যেকেই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গতিশীল আছে। যাবতীয় বিষয় তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন, তিনি নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেন যাতে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাসী হতে পার। [সূরা রাদ ১৩: ২]
হাদীসে এসেছে,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ : يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِيْنَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الْآخِرُ يَقُولُ: مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيْبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ مَنْ يَسْتَغْفِرُ نِي فَأَغْفِرَ لَهُ
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেনঃ যখন রাতের এক তৃতীয়াংশ বাকি থাকে তখন আল্লাহ তা'আলা নিকটবর্তী আসমানে নেমে আসেন এবং ঘোষণা করতে থাকেন, কে আমাকে ডাকছ, আমি তার ডাকে সাড়া দিব। কে প্রার্থনা করছ, আমি তাকে দান করব। কে আছ ক্ষমাপ্রার্থী, আমি তাকে ক্ষমা করে দিব।
প্রশ্ন-৬ আমাদের দ্বীন কী?
উত্তর: আমাদের দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা হচ্ছে ইসলাম। ইসলাম অর্থ একমাত্র আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ ও বশ্যতা স্বীকার করা। আল্লাহ কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন-
إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ) নিশ্চয় আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন হলো ইসলাম। [সূরা আলে ইমরান ৩: ১৯] وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ আর যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন গ্রহণ করতে চাইবে কক্ষনো তার সেই দ্বীন কবুল করা হবে না এবং আখিরাতে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। [সূরা আলে ইমরান ৩: ৮৫]
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম। [সূরা মায়েদা ৫: ৩]
প্রশ্ন-৭ আমাদের নবী কে?
উত্তর: আমাদের নবী মুহাম্মাদ । তিনি সর্বশেষ নবী ও রাসূল। তাঁর সুন্নাহ বা তরীকা ব্যতীত কোন ইবাদাত গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর আদর্শেই রয়েছে মানবতার কল্যাণ ও মুক্তি।
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের আশা রাখে আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে। [সূরা আহযাব ৩৩: ২১]
প্রশ্ন-৮ ইসলাম কী?
উত্তর: ইসলাম একটি আরবি শব্দ। ইসলাম শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো- অনুগত হওয়া, নিজেকে সঁপে দেয়া, আত্মসমর্পণ করা। পারিভাষিক অর্থে ইসলাম হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা দ্বীনের নাম, যা মুহাম্মাদ এর মাধ্যমে পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। ইসলাম হচ্ছে আল্লাহর কাছে নিজেকে সঁপে দেয়া, আত্মসমর্পণ করা, আত্মসমর্পণের মাধ্যমে তাঁর আনুগত্য করা এবং রাসূলুল্লাহ এর প্রতি ঈমান আনা, তাঁর অনুসরণ করা। শিরক থেকে পবিত্র হওয়া এবং মুশরিকদের থেকে মুক্ত হওয়া।
প্রশ্ন-৯ ইসলামের ব্যাপারে আমাদের প্রতি নির্দেশ কী?
উত্তর: ইসলামের ব্যাপারে আমাদের প্রতি নির্দেশ হচ্ছে ইসলামকে নিজের দ্বীন বা পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করা, পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করা এবং আমরণ ইসলামের উপর টিকে থাকা।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِينٌ)
হে মুমিনগণ! ইসলামের মধ্যে পূর্ণভাবে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলো না, নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। [সূরা বাকারা ২: ২০৮।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُّسْلِمُونَ
হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো যেমনভাবে করা উচিত এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। [সূরা আলে ইমরান ৩: ১০২] প্রশ্ন-১০ ইসলামের মূল উৎস কী?
উত্তর: ইসলামের মূল উৎস দু'টি। কিতাবুল্লাহ-আল্লাহর কিতাব তথা আল-কুরআন ও সুন্নাতে নববী তথা সহীহ হাদীস। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ বিদায় হজ্জের ভাষণে বলে গেছেন-
تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ
আমি তোমাদের মাঝে দু'টি বিষয় (দুটি জিনিস) রেখে গেলাম। তোমরা যতক্ষণ এগুলোকে আঁকড়ে ধরে রাখবে ততক্ষণ তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। একটি হলো আল্লাহর কিতাব (কুরআন), আরেকটি হলো আমার সুন্নাহ (আদর্শ/হাদীস)।
এছাড়া এই দু'টি মূল উৎসের আলোকে রয়েছে ইজমা ও কিয়াস। প্রশ্ন-১১ ইসলামের মূল ভিত্তি কয়টি ও কী কী?
উত্তর: ইসলামের মূল ভিত্তি পাঁচটি। হাদীসে এসেছে,
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ بُنِيَ الْإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللَّهِ وَإِقَامِ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ وَالْحَجِّ وَصَوْمِ رَمَضَانَ
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, ইসলাম পাঁচটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ ছাড়া কোন (সত্য) মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল এর ঘোষণা করা, সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, হজ্জ করা এবং রমাযানের সিয়াম পালন করা। প্রশ্ন-১২ মুসলিম কে?
উত্তর: আল্লাহর কাছে যে ব্যক্তি নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দেয়, আত্মসমর্পণ করে, আনুগত্য করে, এককভাবে শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করে, সমস্ত শিরক থেকে মুক্ত হয়, শিরককারীদের থেকে মুক্ত হয় এবং তার পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসেবে ইসলামকে মেনে নেয়, প্রকৃতপক্ষে সে-ই মুসলিম।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, "সুতরাং ইসলাম মানে- একমাত্র আল্লাহর কাছেই আত্মসমর্পণ করা, তিনি ব্যতীত অন্য কারো কাছে নয়। শুধু তাঁরই ইবাদাত করা, কাউকে তাঁর সাথে শরীক না করা। তাঁর প্রতি নিজেকে পূর্ণরূপে সঁপে দেয়া। তার কাছে আশা করা এবং তাকেই একমাত্র ভয় করা। সৃষ্টির কাউকে তাঁর মতো এমন ভালো না বাসা। সুতরাং এককভাবে আল্লাহর ইবাদাত করতে যে অপছন্দ করে সে মুসলিম নয় এবং যে আল্লাহ ব্যতীত অথবা আল্লাহর পাশাপাশি অন্যের ইবাদাত করে তাহলে সেও মুসলিম নয়।
প্রশ্ন-১৩ মুমিন কে?
উত্তর: কুরআন ও সহীহ হাদীসে উল্লেখিত ছয়টি রুকন এবং এগুলোর সাথে সংশিষ্ট বিষয় সমূহের প্রতি যে যথার্থ ঈমান আনে এবং সে অনুযায়ী কাজ করে তাকে মুমিন বা বিশ্বাসী বলা হয়। প্রকৃত মুমিনদের পরিচয়ে আল্লাহ ইরশাদ করেন-
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ) মুমিন তারাই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনে, অতঃপর কোনরূপ সন্দেহ করে না, আর তাদের মাল দিয়ে ও জান দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করে; তারাই সত্যবাদী। [সূরা হুজুরাত ৪৯: ১৫।
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوْبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيْمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ أُولَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُوْنَ حَقًّا لَهُمْ دَرَجَاتٌ عِندَ رَبِّهِمْ وَمَغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ ) নিশ্চয় মুমিনরা এরূপই হয় যে, যখন (তাদের সামনে) আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয় তখন তাদের অন্তরসমূহ ভীত হয়ে পড়ে, আর যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তাদের ঈমান আরও বৃদ্ধি পায়, আর তারা নিজেদের রবের উপর নির্ভর করে। যারা সালাত প্রতিষ্ঠিত করে এবং আমি যা কিছু তাদেরকে দিয়েছি তা থেকে তারা খরচ করে, এরাই সত্যিকারের ঈমানদার, এদের জন্য রয়েছে তাদের রবের সন্নিধানে উচ্চ পদসমূহ, আরও রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা। [সূরা আনফাল ৮: ২-৪]
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَلَدِهِ وَوَالِدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ রাসূলুল্লাহ বলেছেন, কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও অন্য সকল লোক থেকে অধিক প্রিয় হব।
প্রশ্ন-১৪ ইবাদাত কাকে বলে?
উত্তর: ইবাদাতের আভিধানিক অর্থ অনুগত হওয়া, দাসত্ব করা, নত হওয়া, অনুসরণ করা। পারিভাষিক অর্থে ইবাদাত হচ্ছে ঐ সকল কাজ যা আল্লাহ পছন্দ করেন ও খুশি হন। তা প্রকাশ্যে হোক কিংবা গোপনে, কথায় কিংবা কাজে। অন্যভাবে বলতে গেলে ইবাদাত হচ্ছে ঐ বিশ্বাস, অন্তর ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কর্ম যা আল্লাহ ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন। এছাড়াও কোন কিছু সম্পাদন করা বা বর্জন করা যা দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায় তাও ইবাদাত। ইবাদাত প্রধানত ২ প্রকার। ১. আন্তরিক ইবাদাত। যেমন- ঈমানের ছয়টি রুকন, ভয়, আশা, ভরসা, আগ্রহ ও ভীতি ইত্যাদি। ২. প্রকাশ্য ইবাদাত। যেমন- সালাত, যাকাত, সিয়াম ও হজ্জ ইত্যাদি।
প্রশ্ন-১৫ কাফির কাকে বলে?
উত্তর: কাফির (کافر) একটি আরবি শব্দ, যা আরবি কুফর (کفر) ধাতু থেকে আগত, যার শাব্দিক অর্থ হলো- ঢেকে রাখা, লুকিয়ে রাখা এবং এর ব্যবহারিক অর্থ হলো অবাধ্যতা, অস্বীকার করা, অকৃতজ্ঞতা। এটি ইসলামী তথ্যলিপিসমূহে বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ। সাধারণত 'অবিশ্বাসী' হিসেবে একে অনুবাদ করা হয়। বিশ্বের সমগ্র সৃষ্টি আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্বের প্রমাণ বহন করছে। কাফের ব্যক্তি এ মহাসত্যকে দেখেও গোপন করে, অস্বীকার করে, অবিশ্বাস করে। মানুষ সব সময় আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতের মধ্যে ডুবে আছে। আগুন, পানি, আলো, বাতাস সবকিছুই আল্লাহর দান। মানুষের হাত, পা, চোখ, কান, মস্তিষ্ক, জ্ঞান-বুদ্ধি, শক্তি-সামর্থ সবই আল্লাহর দান। এরপরও যে ব্যক্তি আল্লাহকে ও তাঁর দ্বীন ইসলামকে অস্বীকার করে সে চরম অকৃতজ্ঞ, অবাধ্য ও কাফির।
প্রশ্ন-১৬ মুশরিক কে?
উত্তর: যে ব্যক্তি আল্লাহর একক ক্ষমতা বা গুণাবলির ক্ষেত্রে কাউকে শরীক/অংশীদার সাব্যস্ত করে সে মুশরিক। অর্থাৎ যে আল্লাহ ছাড়া বা আল্লাহর পাশাপাশি অন্য কারও ইবাদাত করল, অন্য কারও জন্য কুরবানী, মান্নত, সালাত, সিয়াম ইত্যাদি পালন করল সে মুশরিক। আল্লাহর সন্তুষ্টিকে বাদ দিয়ে অন্য কারও বা অন্য কোন কিছুর সন্তুষ্টির জন্য কোন ইবাদাত করলে সেও মুশরিক।
প্রশ্ন-১৭ গণতন্ত্র কী?
উত্তর: গণতন্ত্র শব্দটি গ্রীক শব্দ Demos [ডেমোস] থেকে উৎপন্ন। যার ইংরেজি প্রতিশব্দ Democracy [ডেমোক্রেসি]। পারিভাষিক অর্থে গণতন্ত্র বলা হয় জনগণের প্রতিনিধি দ্বারা তাদের চাহিদার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা। গণতন্ত্র বলতে বুঝায়- Government of the people, for the People, by the People. অর্থাৎ জনগণের সরকার, জনগণের জন্য এবং জনগণের দ্বারা। গণতন্ত্রে জনগণ নিজেরাই নিজেদের ব্যবস্থা তৈরি করে এবং তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে নিজেদের সার্বভৌম ক্ষমতার বলে আইন রচনা করে। এভাবে জনগণ নিজেদের ক্ষমতার অনুশীলন করে এবং নিজেরাই নিজেদের পরিচালনা করে। অর্থাৎ নিজেরাই আইন তৈরি করে রবের আসনে বসে যায়। যেটা কেবলমাত্র সৃষ্টিকর্তারই কাজ।
প্রশ্ন-১৮ গণতন্ত্র ও ইসলামের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: গণতন্ত্র ও ইসলাম- দুটি বিপরীতমুখী এবং সাংঘর্ষিক দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা। প্রথমটি মানবরচিত আর দ্বিতীয়টি আল্লাহ প্রদত্ত। সুতরাং আল্লাহ যেমন নিষ্কলুষ তাঁর দ্বীনও তেমনি নিষ্কলুষ; আর মানুষ যেমন কলুষতায় পূর্ণ তেমনি মানবরচিত দ্বীনও ভুল-ভ্রান্তি ও কলুষতায় পূর্ণ। আল্লাহ বলেন-
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ)
আর যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন গ্রহণ করতে চাইবে কক্ষনো তার সেই দ্বীন কবুল করা হবে না এবং আখিরাতে সে ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সূরা আল-ইমরান ৩: ৮৫।
إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ নিশ্চয় আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন হলো ইসলাম। [সূরা আল-ইমরান ৩: ১৯]
إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান। [সূরা বাকারা ২: ২০]
পক্ষান্তরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলছে- "জনগণই সকল ক্ষমতার অধিকারী।" এটা একটা শিরকী কথা। ইসলামের মূল ভিত্তিই হচ্ছে তাওহীদ। এখানে আল্লাহর অস্তিত্ব অনস্বীকার্য। অথচ গণতন্ত্রে আল্লাহর অস্তিত্ব উপেক্ষিত। ইসলামে আইনের উৎস হচ্ছে কুরআন ও সুন্নাহ। আর গণতন্ত্রে আইনের উৎস মানুষের খেয়াল-খুশি। মহান আল্লাহ বলেন,
أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ তুমি কি তাকে দেখ না যে তার খেয়াল-খুশিকে ইলাহ রূপে গ্রহণ করেছে? [সূরা ফুরকান ২৫: ৪৩]
أَلَيْسَ اللَّهُ بِأَحْكَمِ الْحَاكِمِينَ আল্লাহ কি বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম (বিচারক) নন? [সূরা তীন ৯৫: ৮]
أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُوْنَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ তারা কি জাহেলী যুগের আইন বিধান চায়? দৃঢ় বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য আইন-বিধান প্রদানে আল্লাহ হতে কে বেশি শ্রেষ্ঠ? [সূরা মায়েদা ৫: ৫০]
إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُوْنَ)
আল্লাহ ছাড়া কোন বিধান দাতা নেই। তিনি আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া আর কারো ইবাদাত করবে না, এটাই সঠিক দ্বীন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা জানে না। [সূরা ইউসুফ ১২: ৪০]
পক্ষান্তরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, পার্লামেন্টে বসে এম.পি সাহেবরা যেমন ইচ্ছা আইন বানাতে পারে। জনগণই এ ব্যবস্থার বিধান প্রণয়ন করে এবং তারা নিজেদের তৈরি কর্তৃপক্ষ ব্যতীত অন্য কারো কাছে জবাবদিহি করে না। জনগণই সার্বভৌমত্ব চর্চা করতে পারে। তাই জনগণই এ ব্যবস্থার রব। আর আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের সাথে এটা স্পষ্ট শিরক।
প্রশ্ন-১৯ ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ কী?
উত্তর: ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে ইংরেজিতে Secularism [সেক্যুলারিজম] বলা হয়। Encyclopedia of Britannica-তে Secularism-এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, Any movement in society directed away from the worldliness to life on earth. অর্থাৎ এটি এমন একটি সামাজিক আন্দোলনের নাম, যা মানুষকে আখিরাতের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে কেবলমাত্র পার্থিব বিষয়ের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করায়। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ-এর মূল কথা হলো- Religion should not be allowed to come into politics. It is merely a matter between man and god. অর্থাৎ ধর্মকে রাজনীতির অঙ্গনে প্রবেশাধিকার দেয়া উচিত নয়। এটি মানুষ ও ঈশ্বরের মধ্যকার একটি (আধ্যাত্মিক) বিষয় মাত্র। প্রখ্যাত আরব শাইখ ড. সফর আল-হাওয়ালী বলেন, هُوَ فَضْلُ الدِّينِ عَنِ الدَّوْلَةِ রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে ধর্মকে পৃথক করাই হলো ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। এক কথায় বলা যায় যে, মানবজীবনের পারিবারিক, সাংসারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রভৃতি অঙ্গন থেকে ধর্মকে নিশ্চিহ্ন করে মসজিদ বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বেচ্ছাচারী জীবন গঠনের মন্ত্রই হলো ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ।
পর্যালোচনা: ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ দু'টি কারণে গ্রহণযোগ্য নয়। এক. ধর্মবিমুখতা। মানুষ এখানে তার বিবেকের স্বাধীনতাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। দুই. বস্তুবাদ। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের রূহ হলো 'বস্তুবাদ'। এখানে ধর্মীয় কোন কিছুরই প্রবেশাধিকার নেই। যেনতেন প্রকারে দুনিয়া হাসিল হলেই যথেষ্ট। এজন্যই তারা জনগণকে সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস বলে মনে করে। রাষ্ট্রযন্ত্রে আল্লাহর আইনের কোন প্রবেশাধিকারকে তারা তোয়াক্কা করে না।
প্রশ্ন-২০ মুরতাদ কাকে বলে?
উত্তর: মুরতাদ শব্দটি আরবি رِدَّةٌ থেকে আগত। যার অর্থ ফিরে যাওয়া, বিমুখ হওয়া, ত্যাগ করা ইত্যাদি। সুতরাং মুরতাদ অর্থ হলো- বিমুখ হয়েছে বা ফিরে গেছে এমন ব্যক্তি। শরয়ী পরিভাষায় রিদ্দাহ হলো- ইসলাম ত্যাগ করা বা ইসলামের কোন আকীদা বা আমলকে মানতে অস্বীকার করা। কিংবা তার প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করা অথবা ইসলামের কোন নিদর্শনকে ত্যাগ/অবমাননা/কটুক্তি/ঠাট্টা/বর্জন করা, যা অন্তরের ভক্তিশূন্যতা ও শ্রদ্ধাহীনতার আলামত বহন করে। আর এ ধরনের কাজ যে করে তাকেই ইসলামে মুরতাদ বা ইসলামচ্যুত বলে।
টিকাঃ
এ আয়াতে আল্লাহর একটি ক্রিয়াবাচক গুণ সাব্যস্ত করা হয়েছে। সেটি হচ্ছে استواء )ইসতাওয়া) বা আরশে সমুন্নত হওয়া। ইমাম মালিককে এ গুণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, استواء )ইসতাওয়া) এর অর্থ জানা আছে। তবে তার ধরন )كيفية( জানা নেই। এর প্রতি ঈমান (বিশ্বাস) রাখা ওয়াজিব এবং এর ধরন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা বিদআত। (বাইহাকী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত, ২/৩০৫; বর্ণনা নং ৮৬৭) • সহীহ বুখারী-১১৪৫, সহীহ মুসলিম-৭৫৮।
আদ-দুরাবুস সানিয়্যাহ ১/১২৯।
মুয়াত্তা ইমাম মালেক ১৮৭৪; মিশকাত ১৮৬ সিলসিলা সহীহাহ ১৭৬১। ইজমা: ইজমা একটি আরবি শব্দ। এ দ্বারা কোনো বিষয়ে আলেমদের ঐকমত্যকে বোঝানো হয়। বিভিন্ন বিষয়ে ইসলামি বিশেষজ্ঞ আলেমগণ কুরআন ও হাদীসের দলিলের ভিত্তিতে তাদের মতামতের ক্ষেত্রে একমত হলে তাকে ইজমা বলা হয়। শরীয়াহ অনুযায়ী উলামাদের ইজমা রয়েছে এমন বিষয় কারো অমান্য করার সুযোগ নেই। কিয়াস: কিয়াস অর্থ হল অনুমান করা, পরিমাণ করা, তুলনা করা, ওজন করা, নমুনা বা সাদৃশ্য করা ইত্যাদি। শরীয়তের পরিভাষায় কিয়াস বলা হয়, কুরআন-সুন্নাহর নস তথা মূল দলীলের আলোকে নবোদ্ভাবিত কোনো মাসআলার সমাধান বের করা। সহীহ বুখারী ৮; সহীহ মুসলিম ১৬; সুনানে তিরমিযী ২৬০৯।
কিতাবুন নবুওয়াত, পৃঃ ১২৭। • সহীহ বুখারী ১৫; সহীহ মুসলিম ৪৪; ইবনে মাজাহ ৬৭।
Encyclopedia of Britannica, 15th Edn. 2002. Vol-X. P. 594. - আল-আলামানিয়্যাহ, পৃ. ১১।