📄 দ্বিতীয়ত: লিখনীর ব্যাপারে ছাড় দেয় এমন বর্ণনাসমূহ
আমর ইবন আবু সাবরা বলেন, আমি উমার ইবনুল খাত্তাবকে বলতে শুনেছি, তোমরা ইলম লিখে রাখার মাধ্যমে সংরক্ষণ করো।
হাসান ইবন জাবের বলেন, তিনি আবু উমামা আল-বাহেলী রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুকে ইলম লিখে রাখার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে আবু উমামা উত্তর দেন, 'এতে কোনো আপত্তি নেই।'
আনাস ইবন মালেকের কাছে একটা হাদীস পছন্দ হওয়ার পর তিনি তার ছেলেকে সেটা লিখে রাখতে বলেন।
বাশীর ইবন নুহাইক বলেন, আমি আবু হুরাইরা থেকে যা শুনতাম তা লিখে রাখতাম। তার থেকে যখন বিচ্ছিন্ন হতে গেলাম, তখন তার থেকে লিখিত বিষয়গুলো সংকলন এনে তার সামনে পড়লাম। তাকে বললাম, 'আমি এগুলো আপনার থেকে শুনেছিলাম?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।'
সাঈদ ইবন জুবাইর বলেন, আমি ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর কাছে একটা কাগজে লিখতাম আবার জুতায় লিখতাম। হারুন ইবন আনতারা বলেন, তার বাবা বলেন, ইবন আব্বাস আমাকে একটা হাদীস বললে আমি তাকে বললাম, আমি কি এটা আপনার থেকে লিখব? তিনি আমাকে অনুমতি দিতে না চাইলেও পরে দিলেন।
সুলাইমান ইবন মুসা থেকে বর্ণিত, তিনি ইবন উমারের মাওলা নাফে'কে ইলম লিখে রাখতে দেখেন।
আব্দুল্লাহ ইবন হানাশ বলেন, আমি তাদেরকে তাদের কলমের প্রান্ত দিয়ে হাতের তালুতে লিখতে দেখেছি।
ইব্রাহীম বলেন, আবীদাহ আস-সালমানী আমাকে বলেন, আমার কোনো লিখনীকে স্থায়ী করবে না (অর্থাৎ তিনি লিখতেন)।
উবাইদ আল-মাকতাব বলেন, আমি লোকজনকে মুজাহিদের কাছে তাফসীর লিখতে দেখেছি।
আব্দুল্লাহ ইবন দীনার বলেন, উমার ইবন আব্দুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ আবু বকর ইবন মুহাম্মাদ ইবন আমর ইবন হাযমকে নির্দেশ দিলেন, 'তোমার কাছে রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত হাদীসগুলো লিখে পাঠাও। আমার আশঙ্কা হচ্ছে ইলম উঠে যাবে।'
মুবারক ইবন সাঈদ বলেন, সুফইয়ান রাতের বেলা দেওয়ালে হাদীস লিখতেন। সকাল হলে সেটার অনুলিপি লিখে দেয়াল থেকে মুছে ফেলতেন।
লেখার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো কেউ পড়লে সে বলবে যে, সাহাবীদের মাঝে (এ ব্যাপারে ইজমা না থাকলেও) একটা ধারা ছিল যারা কুরআন ছাড়া অন্য সবকিছু লিখে রাখতে নিষেধ করত। সাহাবীদের থেকে বর্ণিত আছারগুলো পড়লে কেউ বলতে বাধ্য হবে যে, লেখার বৈধতার ব্যাপারে সন্দেহ নেই। তাহলে এই দুইয়ের মাঝে সমন্বয় কীভাবে হবে? হাফেয ইবন হাজার এ ব্যাপারে আলেমদের বিরোধ নিরসন করে বলেন, 'এই দুই মতের মাঝে সমন্বয় হলো, নিষেধাজ্ঞা কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময়ের সাথে নির্দিষ্ট। কারণ সে সময় কুরআনের সাথে অন্য কিছু মিশে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। আর লিখে রাখার অনুমতি অন্যান্য সময়ের জন্য।
অথবা নিষেধাজ্ঞা কুরআনের সাথে অন্য কিছু একত্রে লেখার ক্ষেত্রে, আর অনুমতি ভিন্নভাবে লেখার ক্ষেত্রে। অথবা নিষেধাজ্ঞা প্রথমে ছিল, পরবর্তীতে যখন কুরআন-হাদীস মিশে যাওয়ার আশঙ্কা দূর হয় তখন অনুমতি প্রদানের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা রহিত হয়। আর এটাই সঠিক মতের সবচেয়ে কাছাকাছি। বলা হয়, নিষেধাজ্ঞা ঐ ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যে লিখনীর উপর নির্ভর করে মুখস্থ ছেড়ে দিবে। আর অনুমতি তার জন্য, যে এমন কাজে জড়িয়ে পড়া থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখবে। কেউ কেউ আবু সাঈদের হাদীসে ত্রুটি আছে বলে মনে করেন, সেক্ষেত্রে সঠিক মত হলো হাদীসটা আবু সাঈদের থেকে মাওকুফ (নবীজী থেকে বর্ণিত না)। এটা বুখারীসহ অন্যদের মত। '৩১৪ আর অনুমতির পক্ষে প্রমাণ হিসেবে বলতে হয়, নিষেধাজ্ঞার পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী হাদীস আবু সাঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর হাদীস। আমরা দেখেছি হাদীসটা মারফু হওয়ার ব্যাপারে ইমাম বুখারী আপত্তি করেছেন এবং এটাকে মাওকুফ বলেছেন। তারপরও মুসলিম যেহেতু এটাকে সহীহ বলেছেন আর সাহাবীদেরকে লেখার ব্যাপারে নিষেধ করার অন্যান্য বর্ণনাও রয়েছে, সেহেতু আমরা একটাকে মারফু’ ধরে নিব। মতামতের মাঝে সমন্বয় এবং কোনো একটা মতকে রহিত বলার যে সমাধান ইবন হাজার দিয়েছেন, সেটাও আমরা দেখব। ইমাম রামহুরমুখী মনে করেন, লেখার নিষেধাজ্ঞা রহিত হয়েছে এবং অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। তিনি বলেন, 'আমি মনে করি এটা হিজরতের পর প্রথম সময়ে ছিল; যে সময় কুরআন ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত হওয়াকে আশঙ্কাজনক মনে করা হত। '৩১৫ খাত্তাবীসহ বেশ কিছু আলেম তার মতের প্রতি সায় দেন। খাত্তাবী বলেন, 'সম্ভবত নিষেধাজ্ঞা প্রথম যুগে ছিল। আর শেষ পর্যায়ে লিখে রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। আবার এটাও বলা হয়, কুরআনের সাথে হাদীসকে একত্রে লিখতে নিষেধ করার কারণ যাতে একজন পাঠক এই দুটির মাঝে মিশিয়ে না ফেলেন। কিন্তু লেখা পুরোপুরি নিষেধ করা হয়েছে এমনটা যথাযথ নয়। '৩১৬ 'তবে আমরা দেখতে পাই, রহিত হওয়ার মতকে প্রাধান্য দিলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না। কারণ লেখার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা যদি ব্যাপকভাবে রহিত হয়ে যেত তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর সাহাবীদের মাঝে লেখার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞার মতের কোনো অস্তিত্বই থাকত না। আর যে সকল ইলম অন্বেষী সাহাবী লেখার ব্যাপারে খুবই আগ্রহী ছিলেন, তাদের বিপক্ষে প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেত। সুতরাং সমস্যাটার ভিন্ন সমাধান প্রয়োজন। '৩১৭ বরং শাইখ রশীদ রিদ্বা বিষয়টা উল্টে দিয়ে বলেন, 'আমরা যদি ধরে নিই লেখার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আর অনুমতির হাদীসগুলোর মাঝে বৈপরিত্য আছে, যার ফলে একটা অন্যটাকে রহিত করবে; তাহলে আমরা নিষেধাজ্ঞাটা পরবর্তী সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করতে পারব দুটি প্রমাণের মাধ্যমে। প্রথমত, কিছু কিছু সাহাবী লেখা থেকে বিরত থাকতেন এবং নিষেধ করতেন। আর এটা তারা করতেন নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর। দ্বিতীয়ত, সাহাবীরা হাদীস লিখতেন না বা প্রচার করতেন না। যদি তারা লিখতেন বা প্রচার করতেন, তাহলে তারা যা লিখে রেখেছেন তা বিপুল পরিমাণে বর্ণিত হত। '৩১৮ রহিত (নাসখ) করার প্রসঙ্গ আনা হলে সবসময় একটা বিতর্ক থেকে যাবে যে, কোন হাদীসগুলোকে একজন গবেষক মূল হিসেবে ধরবেন। যিনি হাদীস লিখে রাখার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞার হাদীসগুলোকে মূল ধরবেন, তিনি দেখতে পাবেন যে কিছু সাহাবী ও তাবেয়ীদের থেকে বর্ণিত নিষেধাজ্ঞার আছারসমূহ রহিত না হওয়ার মতকে প্রাধান্য দেয়। আর এটা বেশ শক্তিশালী প্রমাণ। বিংশ শতাব্দীতে এসে যারা সাধারণত সুন্নাহ অস্বীকার করে, তারা এই দৃষ্টিকোণ থেকে অস্বীকার করে যে সুন্নাহ ওহী নয়; কেননা সুন্নাহ নির্দিষ্ট সময়ের সাথে প্রাসঙ্গিক, অন্যদিকে কুরআন ব্যাপক। এছাড়াও তারা এই যুক্তি দিবে সুন্নাহর প্রামাণ্যতা অস্বীকার করে যে, প্রথম শতকে সেটা লিপিবদ্ধ করা হয়নি। ইবন হাজার যে সমন্বয়ের কথা বলেছেন, 'নিষেধাজ্ঞা কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময়কালের সাথে নির্দিষ্ট, যাতে কুরআন অন্য কিছুর সাথে মিশে না যায়' অথবা 'নিষেধাজ্ঞা কুরআনের সাথে অন্য কিছু একত্রে লেখার ব্যাপারে, আর ভিন্নভাবে লিখলে নিষেধ নয়'- এই সমন্বয় আধুনিক মানুষকে তুষ্ট করে না। মাহমুদ আবু রাইয়্যা তার প্রসিদ্ধ বই 'আদ্বওয়া আলাস সুন্নাহ আল-মুহাম্মাদিয়্যা' বইয়ে বলেছে, 'এই যুক্তিতে কোনো বুদ্ধিমান জ্ঞানী মানুষ বিশ্বাস করে না। কোনো প্রকৃত গবেষক এটা গ্রহণ করে না। তবে যদি আমরা হাদীসগুলোকে বালাগাতের ক্ষেত্রে কুরআনের স্তরে মনে করি আর হাদীসের বাচনভঙ্গিতে কুরআনের মত ইজায খুঁজে পাই তাহলে বিশ্বাস করব। কিন্তু এটা কেউ স্বীকার করবে না, এমনকি যারা এই মত দিচ্ছে তারাও করবে না। কারণ এটা বলার অর্থ কুরআনের মুজিযা বাতিল করে দেওয়া, কুরআন যে মুজিযা সেই ভিত উপড়ে ফেলা। ... তারা যে যুক্তি বা কারণ দেখাচ্ছে সেটা তো আবু বকরের আমলে কুরআন লেখা আর উসমানের আমলে সংকলন ও বিতরণের মাধ্যমে দূর হয়ে গিয়েছে। এখন কুরআনে এক হরফ পরিমাণ বৃদ্ধি করাও অসম্ভব হয়ে গিয়েছে।' সুতরাং সে সময় কুরআন সংকলনের মত করে কিছু সাহাবীকে হাদীস সংকলনের জন্য নিযুক্ত করা অসম্ভব কাজ ছিল না। 'মুসলিমরা তাহলে নবীজীর কথা হিসেবে সেগুলো গ্রহণ করত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম জুড়ে সেটা চলে আসত। এতে কোনো পরিবর্তন হতো না বা বানোয়াট বর্ণনা প্রবেশ করত না। '৩১৯ অধিকন্তু ইবন হাজার যে সমন্বয় দেখানোর চেষ্টা করেছেন, সেটা দিয়ে কিছু সাহাবীর লেখার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা সমর্থনের কোনো ব্যাখ্যা প্রদান করা সম্ভব না।
খ) লিখনী নিষেধ করার পক্ষে মৌলিকভাবে আমরা যে যুক্তি উপস্থাপন করব সেটা হলো সুন্নাহ যেন আল্লাহর কিতাবের সমকক্ষ না হয়। এক্ষেত্রে আমরা খত্বীব বাগদাদীর বক্তব্য উদ্ধৃত করব। তিনি বলেন, 'কুরআন ছাড়া অন্য কিছু লিখতে নিষেধ করার কারণ হলো আল্লাহর কিতাব যেন অন্য কিছুর সমান না হয়ে যায়। কুরআন ছাড়া অন্য কিছুতে যেন মানুষ ব্যস্ত না হয়ে যায়। পরবর্তীতে যখন এই শঙ্কা কেটে গেল, ইলমী কিতাবাদির প্রয়োজন দেখা দিল, তখন লেখা অপছন্দনীয় থাকল না। '৩২০ নিম্নের আলোচনায় আমরা দেখাব আরবদের দৃষ্টিতে 'লিখনী' বলতে নৃতাত্ত্বিকভাবে কী বোঝাত। কেন আমরা 'আল্লাহর কিতাবের সমকক্ষ' হওয়ার মত বাক্যাংশ বেছে নিলাম। কেন আমরা 'মিশে যাওয়ার আশঙ্কা'র মত বাক্যাংশ নিলাম না।
আরবী ভাষায় 'লেখা'র দুটি অর্থ হয়। একটা হলো: স্মরণের জন্য লেখা, অন্যটা হলো আমরা লেখালেখি যে অর্থে বুঝি। একজন মানুষ সাময়িকভাবে স্মরণ রাখার জন্য যা কিছু লিখে রাখে, কিন্তু তথ্যসূত্র বা উৎস হিসেবে লেখে না, সেটাকে আরবী ভাষায় 'কিতাব' বলে। অন্যদিকে প্রকাশের জন্য মানুষ যা লেখে সেটাকেও আরবীতে 'কিতাব' বলে। গ্রিক ভাষায় বিষয়টা বিপরীত। গ্রিক ভাষায় hypomnema শব্দটা বলতে এমন কিছুকে বোঝায় যেটা আমরা দৈনন্দিন স্মরণের জন্য লিখে রাখি। আর syngramma বলতে লিখিত 'বই'কে বোঝায়। আরবী ভাষায় একটা শব্দেই অর্থের আধিক্য থাকায় আমরা দুই প্রকার লিখনীর মাঝে পার্থক্য করতে পারিনি। ফলে একই সাহাবীর দুই প্রকার বর্ণনা আমাদের কাছে বিপরীতমুখী মনে হয়েছে। এক বর্ণনায় তিনি লিখতে নিষেধ করছেন, আবার অন্য বর্ণনায় তিনি অনুমতি দিচ্ছেন। আমরা যখন দেখি সাঈদ ইবন জুবাইর জুতায় লিখছেন, তখন আমাদেরকে বুঝতে হবে এখানে লেখার অর্থ স্মরণের জন্য লেখা। আমরা চাইলে এর নাম দিতে পারি 'অস্থায়ী' লিখনী। (এতে অন্তর্ভুক্ত হবে মানুষের মাঝে ঋণপত্র ও দিয়তসহ যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ শরয়ী বিষয় লিপিবদ্ধ করা। এখানে ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক স্মৃতিশক্তিই হবে মূল আর লিখিত বই হবে স্মরণিকা মাত্র।) অন্যদিকে আবীদাহ আস-সালমানী যখন 'আমার কোনো বই স্থায়ী করবে না' বলে দেন, তখন এর অর্থ ভিন্ন। আমরা এর নাম দিতে পারি 'স্থায়ী' লিখনী। তাই কোনো সাহাবী যখন লিখনীর ব্যাপারে নিষেধ করেন, আবার একই সময়ে আমরা দেখতে পাই তিনি ছাত্রদের হাদীস বলছেন আর তারাও লিখছে, তখন আমরা বুঝব তিনি লেখার ব্যাপারে যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন, সেটা স্থায়ীভাবে লেখার ক্ষেত্রে, অস্থায়ী লেখার ব্যাপারে নয়।
তত্ত্বীয় দিক থেকে দেখলে লিখতে নিষেধ করার বিষয়টা দুটি অর্থের সম্ভাবনা রাখে: ১) শুধু স্থায়ী লেখা নিষেধ করা, ২) স্থায়ী-অস্থায়ী উভয় প্রকার লেখা নিষেধ করা। কারণ অস্থায়ী লেখা হয়তো কোনো ছাত্র স্থায়ী করে রেখে দিতে পারে। কিন্তু কোনো সাহাবীর কাছ থেকে যদি লেখার অনুমতি প্রমাণিত হয়, সেক্ষেত্রে তার নিষেধাজ্ঞা স্থায়ীভাবে লেখার নিষেধাজ্ঞাই বোঝাবে। পক্ষান্তরে কোনো সাহাবী থেকে যদি নিছক লেখার ব্যাপারেই নিষেধাজ্ঞা পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে তার নিষেধাজ্ঞা স্থায়ী লেখার ক্ষেত্রেও হতে পারে, আবার যেকোনো ধরনের লেখার ক্ষেত্রেও হতে পারে।
প্রায়োগিক দিক থেকে দেখলে আমরা দেখি বড় বড় সাহাবীদের থেকে নিষেধাজ্ঞা ও অনুমতি উভয়টা পাওয়া যায়। সুতরাং এই মত প্রাধান্য পায় যে, সাহাবীরা স্থায়ীভাবে লিখতে নিষেধ করতেন, অস্থায়ীভাবে নয়। এটা অনুধাবন করলে আমরা খুব সহজে বুঝব আরবরা স্থায়ী লিখনী বলতে কী বুঝতেন আর কেনইবা সাহাবীরা তাদের সূত্রে লিখিত কোনো কিছু বর্ণিত হওয়া ভয় পেতেন, মৌখিকভাবে বর্ণিত হওয়াকে ভয় পেতেন না।
আরবদের কাছে স্থায়ীভাবে লেখার বিষয়টা যদি কোনো মহান ব্যক্তির ক্ষেত্রে (জাহেলী যুগের মর্যাদাবান পূর্বপুরুষ, নবী এবং ইসলাম আসার পরে সাহাবীরা) হয়ে থাকে তাহলে সেটা তার প্রতি সম্মান প্রকাশের জন্য হয়ে থাকে। নিজ সম্প্রদায়ে সম্মানিত কোনো ব্যক্তির বর্ণনাগুলো পরবর্তী প্রজন্মসমূহের কাছে পবিত্র ও মর্যাদার বিষয় হিসেবে গণ্য হয়। তাই বহু জাতির মাঝে নেফফারদের ইবাদত তথা উপাসনার মাধ্যমে শির্ক ছড়িয়ে পড়ে। আরবদের কাছে লেখার বিষয়টা ওহীর সাথে বেশ শক্তিশালীভাবে জড়িত। এর পক্ষে প্রমাণ হলো লাবীদ ইবন রাবীয়ার মুয়াল্লাকায় তার পংক্তি,
فمدافع الريان عرى رسمها **** خلقا كما ضمن الوحى سلامها
'রাইয়্যান পর্বতের জলধারাগুলো বিলীন হয়ে গিয়েছে এবং এর চিহ্নসমূহ জীর্ণশীর্ণ হয়ে প্রকাশ পেয়েছে; (তবুও তার স্মারকচিহ্ন বিলুপ্ত হয়নি, বরং অক্ষুণ্ণ রয়েছে) যেমনটি প্রস্তর গায়ে অঙ্কিত (লিখিত) লিপি সুরক্ষিত থাকে।' আযহারী তার মু'জামু তাহযীবিল লুগাহ বইয়ে বলেন, 'ওয়াহাইতুল কিতাব আহীহি ওয়াহইয়ান' অর্থাৎ আমি সেটা লিখলাম, সুতরাং সেটা ওহী হলো। ইবনুল আ'রাবী বলেন, আরবদের কাছে লেখক (কাতেব) হলেন আলেম। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿ أَمْ عِندَهُمُ الْغَيْبُ فَهُمْ يَكْتُبُونَ ﴾ [الطور: ٤١]
"নাকি তাদের কাছে গায়েবের সংবাদ আছে, তাই তারা লেখে।” [সূরা আত-তুর: ৪১] হামদানী তার 'আল-ইকলীল' বইয়ে উল্লেখ করেন যে, আরবের লোকেরা বই পাঠক বা লেখককে 'সাবে' (صابی) বলত। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কায় মানুষদের ডাকতেন এবং কুরআন তেলাওয়াত করতেন, তখন লোকজন তাকে 'সাবে' বলত। হামদানীর তাফসীর অনুযায়ী যারা লেখে এবং লিখিত বই পড়ে, তারা সাবে। ৩২১ সুতরাং হানীফ (একত্ববাদে বিশ্বাসী) সম্প্রদায় সাবে। বিষয়টা আরো স্পষ্ট হবে যদি আমরা লিখনীর বিপরীত তথা নিরক্ষরতার দিকে তাকাই। আরবের লোকজন নিরক্ষরতার বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হলে এর অর্থ দুটি হওয়ার সম্ভাবনা রাখে: স্থায়ী নিরক্ষরতা অর্থাৎ আসমানী কিতাবের অনুপস্থিতি। আর স্বাভাবিক নিরক্ষরতা অর্থাৎ অধিকাংশ মানুষের লেখাপড়ার সক্ষমতার অনুপস্থিতি। আবার দুটি অর্থই বোঝাতে পারে, যেমনটা ইসলামপূর্ব আরবের লোকজনের ছিল। তারা সবাই সাধারণ ও ধর্মীয় উভয় দিক থেকে উম্মী তথা নিরক্ষর ছিল। প্রসঙ্গ থেকে আমরা অর্থটা নির্ধারণ করব। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿وَقُل لِلَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ وَالْأُمِّيِّينَ وَأَسْلَمْتُمْ ۚ فَإِنْ أَسْلَمُوا فَقَدِ اهْتَدَوا ۖ وَإِن تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا عَلَيْكَ الْبَلَاغُ ۗ وَاللَّهُ بَصِيرٌ بِالْعِبَادِ﴾ [آل عمران: ٢٠]
"যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে এবং যারা নিরক্ষর, তাদেরকে বলুন, তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করেছ? যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে তারা সুপথপ্রাপ্ত। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে আপনার দায়িত্ব কেবল পৌঁছে দেওয়া। আর আল্লাহ বান্দাদের ব্যাপারে সর্বদ্রষ্টা।” [সুরা আলে ইমরান: ২০] এখানে নিরক্ষর বলতে উদ্দেশ্য 'আরবের সে সকল মুশরিক যারা কোনো আসমানী কিতাব লাভ করেনি। '৩২২ কারণ প্রসঙ্গ থেকে বোঝা যায় এই আয়াতে লেখার যোগ্যতা নাকচ করার বিষয়টা মানানসই নয়। আয়াতে আলোচ্য বিষয় হলো আসমানী কিতাবপ্রাপ্ত জাতি। আল্লাহ তা'আলা পরবর্তীতে আরবদেরকে সর্বশেষ আসমানী কিতাব দিয়ে অনুগ্রহ করেন। অন্যদিকে হাদীসে আছে, "আমরা উম্মী (নিরক্ষর) জাতি, হিসাব-কিতাব করতে জানি না।” এই হাদীসে নিরক্ষরতা বলতে স্বাভাবিক নিরক্ষরতা উদ্দেশ্য।
যেহেতু মুসলিমদের সালাত আদায়ের জন্য কুরআন জানা আবশ্যক, সেহেতু নিছক হাদীসকেও স্থায়ীভাবে লেখা কুরআনের সমকক্ষ হিসেবে সাব্যস্ত করার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া বলে গণ্য করা হয়। নিচের বক্তব্যগুলো পড়লে সেটা স্পষ্ট হবে। সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর এক অনুসারী বলেন, আমি এক লোকের হাতে একটা কাগজে 'সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবর' লেখা দেখলাম। তাকে বললাম, আপনি এটা আমাকে লিখে দিন। তিনি সেটা দিতে চাইলেন না। পরে অবশ্য দেওয়ার ওয়াদা দিলেন। আমি আব্দুল্লাহ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর কাছে এসে দেখলাম এটা তার সামনে। তিনি বললেন, 'লেখা বিদ'আত, ফিতনা ও বিভ্রান্তি। তোমাদের পূর্বের জাতিগুলো এ সকল বিষয় বা এগুলোর অনুরূপ জিনিসের কারণেই ধ্বংস হয়েছে। তারা এগুলো লিখে রাখত, ফলে তাদের জিহ্বায় এগুলো সুস্বাদু হয়ে যায়, তাদের অন্তর এগুলোকে গ্রহণ করে নেয়।' তারপর তিনি উপস্থিত সকল থেকে দৃঢ় ওয়াদা নিলেন যেন লিখিত সব ধরনের কাগজের স্থান দেখিয়ে দেয়। এ ব্যাপারে তিনি শপথও নিলেন। শু'বাহ বললেন, 'তিনি কি আল্লাহর নামে শপথ করেছিলেন?' বর্ণনাকারী বলেন, 'আমার যদ্দুর ধারণা তিনি শপথ করেছিলেন। এমনকি বলেছিলেন যে, আমরা যদি দীরে হিন্দ (কুফা থেকে দূরের একটা জায়গা) এমন কিছুর অস্তিত্ব শুনতে পাই তাহলে হেঁটে হলেও সেখানে যাবো। '৩২৩ ইবন আব্বাস থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত আছে, 'শয়তানরা আসমানে কান পেতে শুনত। কেউ সত্য কোনো কথা শুনলে এর সাথে এক হাজার মিথ্যা মিশিয়ে বলত। মানুষের হৃদয় এগুলোকে গ্রহণ করে নেয়। তারা এ সব কিছু লিখে রাখতে থাকে। সুলাইমান তা দেখে নিজের কুরসীর নিচে দাফন করেন। সুলাইমানের মৃত্যুর পর শয়তানরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে বলতে থাকে, 'আমরা কি সুলাইমানের গুপ্তধনের সন্ধান দিব যার মতো কোনো গুপ্তধন নেই? তারপর তারা সেটি বের করে আনে। '৩২৪
আমরা উপর্যুক্ত দুটি বক্তব্যে দেখতে পাই লিখনীর ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া কতটা তীব্র। ইবন মাসউদের হাদীসে অন্তর কোনো কিছুকে গ্রহণ করার বিষয়টা লিখনীর সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। আর ইবন আব্বাসের হাদীসেও লিখনীর সাথে অন্তর কোনো কিছু ধারণ করাকে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে। আর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু সাহাবীদেরকে স্বচ্ছ তাওহীদের উপর বড় করেছেন, সেহেতু তারা চূড়ান্ত সতর্ক ছিলেন যেন আল্লাহর বাণী দিয়ে ব্যক্তি যতটা প্রভাবিত হয় ততটা অন্য কিছু দিয়ে কেউ যেন না হয়। আর সালাতে কুরআন ছাড়া অন্য কিছুর মাধ্যমে ইবাদত করা হয় না তা আমরা জানি। সব কথার সারকথা হলো, 'আমরা এটাকে কুরআন বানাতে চাই না'। অধিকন্তু ইহুদীরা যে তাদের আলেমদের ব্যাখ্যাগুলো আল্লাহর অবতীর্ণ তাওরাতের সাথে মিশিয়ে ফেলেছিল, সেটা সাহাবীদের অন্তরে সবসময় ছিল, যেটা কিছু সাহাবীর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট। তারা বলেছেন যে, এই বইগুলো আমাদের পূর্ববর্তীদের বিভ্রান্ত করেছে। আব্দুল্লাহ ইবন আমর তো সরাসরি ‘মুসান্নাত’ থেকে সতর্ক করেছেন, অর্থাৎ আল্লাহর কিতাব ছাড়া অন্য কিছু লেখা থেকে সাবধান করে দেন। সুতরাং কোনো অবস্থাতেই সাহাবীরা সুন্নাহকে স্থায়ী করার লক্ষ্যে লিখতে পারেন না যেমনটা আবু রাইয়্যা (এবং তার কাছাকাছি চিন্তার অধিকারী লোকজন) দাবি করেন। কারণ সাহাবীরা কিতাবুল্লাহ এবং সুন্নাহর খাতার মাঝে বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে যতই আলাদা করুক না কেন, স্থায়ীভাবে লেখার ফলে একটা আশঙ্কা থেকে যায়। সে আশঙ্কাটা হল, এর ফলে পরবর্তী প্রজন্মগুলো এই লিখনীকে পবিত্র-জ্ঞান করতে শুরু করবে। সুতরাং সুন্নাহ লেখার ব্যাপারে বিপুল সংখ্যক সাহাবীর এই নিষেধাজ্ঞা বিচক্ষণতার পরিচায়ক ছিল। অধিকন্তু ইসলাম পরবর্তী সময়ে অস্থায়ীভাবে লেখার প্রবণতা খুব বেশি ছড়িয়ে পড়ে। যেহেতু ইসলাম ছিল আসমানী-কিতাব নির্ভর একটা দীন, অধিকন্তু ইসলামের প্রাথমিক বড় বিজয়সমূহের ফলে সাংস্কৃতিক বিপ্লব সাধিত হয়েছিল। সুতরাং সুন্নাহ লিখতে নিষেধ করার ব্যাপারে সাহাবীদের প্রধান কারণ ছিল (যদিও তাদের কারো কারো কাছে কিছু লিখনী ছিল এবং তাদের ছাত্রদের মাঝেও ছিল) তাওহীদ সংরক্ষণ, যাতে আল্লাহর কিতাব ছাড়া অন্য কোনো কিছুকে কেউ পবিত্র-জ্ঞান না করে। তবে অন্যান্য দুনিয়াবী কারণ থাকতে পারে যেগুলো নাকচ করা হবে না। যেমন: সরাসরি গ্রহণের গুরুত্ব, মনের উপর মুখস্থ বিষয়ের প্রভাব, মৌখিক বর্ণনার অগ্রাধিকার প্রভৃতি যে সকল কারণ সাহাবীদের পরবর্তী প্রজন্ম তথা তাবেয়ীদের মাঝে ছিল। এখান থেকে স্পষ্ট হয় কেন তাবেয়ীদের মাঝেও হাদীস লেখার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা চলমান থাকে, যদিও ততদিনে আল্লাহর কিতাব সংকলিত হয়ে গিয়েছে। উরওয়া ইবনুষ যুবাইরের ভাষায়, ‘(কিতাবুল্লাহর) প্রভাব চলমান হয়েছে।’
হাদীস লেখার ব্যাপারে নিষেধ করার কিছু মৌলিক ও কিছু শাখাগত কারণ সাহাবীদের কাছে ছিল। আল্লাহর কিতাব স্থায়িত্ব পাওয়ার পর মৌলিক কারণ দূর হয়ে যায়। কিন্তু শাখাগত কারণ এবং সাহাবীদের আমল তাবেয়ীরা ধরে রাখে।
আবু রাইয়্যার অন্য আরেকটি ভুল হলো তিনি মনে করতেন লেখার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞাই সাহাবী এবং তৎপরবর্তীদের না লেখার একমাত্র কারণ। কিন্তু আমরা যেমনটা বর্ণনা করেছি এর দুটি পর্যায় রয়েছে:
(১) মানুষের হৃদয়ে একক ও অনন্য গ্রন্থ হিসেবে কুরআনের পবিত্র অবস্থান তৈরির পূর্বাবস্থা।
(২) আর কুরআনের এমন পবিত্র অবস্থান সৃষ্টির পরবর্তী অবস্থা।
প্রথম পর্যায়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে (স্থায়ী) লিখনী বিস্তারের মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস এবং সাহাবীদের বক্তব্য স্থায়ী করা সম্ভব ছিল। কারণ এ পর্যায়ে এসে নিছক লেখাই ছিল কোনো কিছুকে পবিত্র হিসেবে সাব্যস্ত করার প্রক্রিয়া। ইহুদীদের ক্ষেত্রে যেমনটা হয়েছিল, তেমনিভাবে পরবর্তী প্রজন্ম 'আল্লাহর কিতাব' আর 'সুন্নাহর কিতাব' মিশিয়ে ফেলবে এমনটা তারা মনে করতেন। কারণ ঐ প্রজন্মের কাছে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরামের উচ্চ মর্যাদা ছিল।
দ্বিতীয় পর্যায়ে এসে স্থায়ী লিখনী কোনোভাবে পবিত্রতার ধারণা সৃষ্টি করার সম্ভাবনা থাকেনি। আল্লাহর কিতাবের গ্রহণযোগ্যতা মুসলিমদের হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। তবে মৌখিক বর্ণনার অগ্রাধিকারের বিষয়টা থেকে যায়, যদিও সেটা ধর্মীয় বিবেচনায় নয়। সেটা হলো লিখনী স্মরণের উদ্দেশ্যে হবে, আর মূল অবস্থা হলো সরাসরি মৌখিকভাবে গ্রহণ করা। লিখনীর অর্থ যিনি আলেম নন, তিনি এমন হাদীস পড়তে পারছেন যেগুলোর বুঝ অবশ্যই তাকে কোনো এক আলেম থেকে গ্রহণ করতে হবে। এছাড়াও স্মরণশক্তির উপর সামগ্রিক বা প্রায় সামগ্রিক নির্ভরতার কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল।
এ সব কিছু ছিল পরিস্থিতি-নির্ভর প্রায়োগিক কর্ম (কোনো ইবাদত নয়), যেখানে লিখনীর উপর মুখস্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। তারপর 'মানুষজন ইলমের কিতাবপত্র বেশি পরিমাণে লিখতে থাকে। কাগজে লেখার উপর তারা নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কারণ বর্ণনা অনেক ছড়িয়ে পড়ে, সনদ লম্বা হয়ে যায়, বর্ণনাকারীদের নাম, উপনাম ও বংশনামা বেশি হয়ে যায়, একই কথা বিভিন্ন বাক্যে বর্ণিত হতে থাকে; ফলে মানুষের হৃদয় এত কিছু মুখস্থ করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। '৩২৫
লিখনীর উপর্যুক্ত ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট যে বর্ণনাকে 'মৌখিক' ও 'লিখিত' এই দুই ভাগে বিভক্ত করা কৃত্রিমতায় পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর (আর এটা আরো গভীর ও বিস্তৃত একটা বিষয়ের শাখা, যে বিষয়টা হলো- সমাজকে মৌখিক ও লিখিত এই দুটি মূল ভাগে বিভক্ত করার সমালোচনা), প্রথম শতকে মৌখিক বর্ণনার সাথে স্মরণিকা হিসেবে কিছু লিখনী সহযোগী ভূমিকা পালন করছিল যেমনটা আমরা দেখেছি। অর্থাৎ স্মরণশক্তির উপর অনবরত সংশয় উত্থাপন করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। আমাদের এটা দাবি করার প্রয়োজন নেই যে, প্রত্যেক বর্ণনাকারীর স্মৃতিশক্তি ভালো (যদিও ঐতিহাসিকভাবে প্রখর স্মৃতি শক্তির অধিকারী বর্ণনাকারীর অস্তিত্ব প্রমাণিত), আবার এটাও দাবি করার প্রয়োজন নেই যে, নিরক্ষরতা প্রখর স্মৃতিশক্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখে। কারণ পূর্বের বক্তব্যসমূহ এবং অন্যান্য দলীলের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, লিখিত বিষয়গুলো স্মৃতিকে ধারণ করতে সহায়তা করেছে। তাই মূল উৎস হিসেবে মৌখিক বর্ণনা থাকার অর্থ কখনো এটা বোঝায় না যে, প্রথম শতকে স্মরণের সহায়ক হিসেবে লিখনী ছিল না। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে আমরা এই লিখনীকে বিশ্বস্ত ব্যক্তির থেকে প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য সূত্র মনে করছি, স্মরণের ক্ষেত্রে সহায়ক মনে করছি না। কারণ আমরা লিখিত টেক্সটকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। অর্থাৎ আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- যিনি অনেক বেশি হাদীস বর্ণনা করেছেন (বাস্তবে প্রথম যুগের অনেক হাফেয এমনই ছিলেন), তিনি আসলেই লিখনীর উপর নির্ভর করতেন, মৌখিক বর্ণনার উপর নয়; যেমনটা প্রসিদ্ধ সাহাবী-তাবেয়ীর ক্ষেত্রে প্রমাণিত। আর এটা দীর্ঘ হাদীসের ক্ষেত্রে আরো বেশি প্রযোজ্য। সুতরাং আমার দৃষ্টিতে প্রথম প্রজন্মের লোকদের বর্ণনা হলো 'শ্রবণ', মৌখিক বর্ণনা নয়। কারণ মৌখিক বর্ণনা বোঝায় যে, স্মরণের সহায়ক হিসেবে লিখনী ছিল না। কিন্তু 'শ্রবণ' বললে এমনটা বোঝায় না। 'শ্রবণ' কথাটা লিখিত বিষয়ের উপর মৌখিক বর্ণনা বা সাক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দেয়। 'শ্রবণ' স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, প্রথম হিজরী শতকে সুন্নাহ না লেখার দাবি নৃতাত্ত্বিকভাবে সঠিক না।
এখানে ইঙ্গিত দেওয়া জরুরী যে, সুন্নাহ যদি প্রথম হিজরী শতকে পুরোটা শুধু মৌখিক হতো, লিখিত কিছু না থাকত; তবুও সনদ প্রত্যাখ্যান করার মতটা যৌক্তিকতা পেত না। 'মৌখিক বর্ণনা যার, তিনি নির্ভরযোগ্য নন এবং তার বর্ণনার বিশুদ্ধতা যাচাই করা সম্ভব নয়– এই দাবি তুলে সেটাকে তুচ্ছ চোখে দেখার পরিবর্তে আমাদের করণীয় হলো মৌখিক বর্ণনায় অন্তর্ভুক্ত ঐতিহাসিক বয়ানের মাঝে ইতিহাসের ব্যাপারে একটা নির্দিষ্ট ধ্যান-ধারণার পক্ষে সাক্ষ্য বের করা এবং ইতিহাস নিয়ে গবেষণায় একটা নতুন দিক প্রকাশ পাওয়ার বিষয়টা আঁচ করা। টেক্সট লিখিত বা মৌখিক হোক, সেটাকে একইভাবে যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিশুদ্ধতা উদঘাটন করতে হবে। আমরা আবার বলি, ইউরোপীয়রা মৌখিক বর্ণনার ব্যাপারে যে হীন দৃষ্টিতে তাকায়, কেবল সেটার দ্বারা প্রভাবিত হয়েই এই দুই প্রকারকে (লিখিত ও মৌখিক) আলাদা করে দেখার কল্পনা মানুষের মনে সৃষ্টি হয়। ৩২৭ আর আমরা ইতঃপূর্বে উল্লেখ করে দেখিয়েছি হাদীসের সমালোচকদের তাহকীক কতটা যৌক্তিক, ব্যবহারিক ও কার্যকরী ছিল।
টিকাঃ
৩১৪. ইবন হাজার আসক্বালানী, ফাতহুল বারী শারহু সাহীহিল বুখারী (১/২০৮)।
৩১৫. আল-মুহাদ্দিসুল ফাসিল বাইনার-রাওয়ী ওয়াল-ওয়া'ঈ (পৃ. ৩৮৬)।
৩১৬. মা'আলেমুস সুনান (৪/১৮৪)।
৩১৭. নূরুদ্দীন ইতর, মানহাজুন নাক্বদ ফি উলূমিল হাদীস, দারুল ফিকর, পৃ. ৪৩।
৩১৮. মুহাম্মাদ রশীদ রিদ্বা, আল-মানার পত্রিকা, ১৩২৫ হিজরীর শাওয়াল সংখ্যা, 'আত-তাদওয়ীন ফিল-ইসলাম' শীর্ষক প্রবন্ধ।
৩১৯. মাহমুদ আবু রাইয়্যা, আওয়া আলাস সুন্নাহ আল-মুহাম্মাদিয়্যাহ, দারুল মা'আরিফ, পৃ. ২৩-২৪।
৩২০. তাক্বঈদুল ইলম, পৃ. ৯৩।
৩২১. জাওয়াদ আলী, আল-মুফাস্সাল ফী তারীখিল আরাবি কাবলাল ইসলাম, দারুস সাকী, ২০০৪, (১৫/১০৮)।
৩২২. তাফসীরুত ত্বাবারী (৬/২৮১)।
৩২৩. সুনান দারেমী, তাহকীক: হুসাইন সেলিম আসাদ, (১/২৪৬), সহীহ সনদে।
৩২৪. সুনান সাঈদ ইবন মনসুরের 'আত-তাফসীর', তাহকীক: সাদ আল-হামীদ, দারুস সুমাই'ই, (২/৫৯৫)।
৩২৫. তাক্বঈদুল ইলম (পৃ. ৬৪)।
৩২৬. Rosalind Thomas, 1989, Oral Tradition and Written Record in Classical Athens, Cambridge, University Press.
৩২৭. লুই জ্যাঁ ক্যালভি, আত-তাক্বালীদ আশ-শাফাহিয়্যা, হাইআতু আবী যাবী লিস- সাক্বাফা ওয়াত-তুরাস, ২০১২, অনুবাদ: রশীদ বারহুন, পৃ. ১৪৬।