📘 যুক্তির নিরিখে সুন্নাহর প্রামাণ্যতা > 📄 শাফেয়ীর সাথে তার প্রতিপক্ষের মতবিরোধের বিষয় কি সুন্নাহর প্রামাণ্যতা ছিল?

📄 শাফেয়ীর সাথে তার প্রতিপক্ষের মতবিরোধের বিষয় কি সুন্নাহর প্রামাণ্যতা ছিল?


আমরা প্রমাণ করেছি যে, জীবনাচরণের মাপকাঠি হিসেবে নববী সুন্নাহর ধারণা সাহাবী-তাবেয়ীদের মাঝে ছিল। এখানে আমরা প্রমাণ করব যে, এই ধারণা শাফেয়ীর সময়কাল পর্যন্ত চলমান ছিল। অর্থাৎ সুন্নাহর ব্যাপারে শাস্ত্রের ধারণার বাকি অংশ এখানে খণ্ডন করব। শাস্ত্রের দাবি অনুযায়ী শাফেয়ীর যুগে সুন্নাহকে প্রমাণ হিসেবে মেনে নেয়ার বিষয়টা প্রতিষ্ঠিত ছিল না। প্রাচ্যবিদদের গবেষণার সারকথা হলো শাফেয়ী সুন্নাহ অস্বীকারকারী মুতাযিলাদের সমালোচনা করতেন। আমি আমাদের ইমামদের কোনো বইয়ে সুন্নাহকে ঐশী উৎস হিসেবে মেনে নেওয়ার বিষয়টা অস্বীকার করার মতো কিছু দেখিনি। শাফেয়ীর বই পড়ে 'মুতাযিলা সম্প্রদায় সুন্নাহ অস্বীকার করত' এমন ধারণা দিতে সর্বপ্রথম দেখেছি শাইখ মুহাম্মাদ আল-খুদ্বারী (১৯২৭ খ্রি.)-কে। তিনি তার বই 'তারীখুত তাশরী'ইল ইসলামী'তে বলেন, 'শাফেয়ী আমাদের কাছে স্পষ্ট করেননি কারা এই মত অনুসরণ করত। ইতিহাস থেকেও আমরা সেটা জানতে পারি না। তবে শাফেয়ী পরবর্তী মতের (বিশেষ ব্যক্তিদের থেকে প্রাপ্ত বর্ণনা প্রত্যাখ্যানের মতো) অনুসারীদের সাথে তর্ক করতে গিয়ে স্পষ্ট বলেছেন যে, এই মতের (সকল বর্ণনা প্রত্যাখ্যানের মতো) অনুসারীরা বসরার অধিবাসী। আর বসরা সে সময় কালামী মতাদর্শের কেন্দ্র ছিল। এখান থেকে মুতাযিলাদের উত্থান ঘটে। এখানে মুতাযিলাদের বড় ব্যক্তিবর্গ এবং বই রচিত হয়। তারা আহলুল হাদীসের বিরোধিতা করার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। সম্ভবত এই মতের অনুসারী তাদের কেউ হবে। আমার কাছে বিষয়টা আরো শক্তিশালী হলো যখন আমি আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ইবন মুসলিম ইবন কুতাইবাহর 'তাওয়ীলু মুখতালাফিল হাদীস' বইটি পড়লাম। তিনি সেখানে সুন্নাহর ব্যাপারে মুতাযিলা শাইখ ও তাদের বড় মুফতীদের অবস্থান আর সাহাবীদের ব্যাপারে তাদের নিন্দাবাদ উপস্থাপন করেছেন।'

খুদ্বারী এখান থেকে উদঘাটন করেন যে, শাফেয়ীর যুগে বা তার কিছু সময় আগে আহলুস সুন্নাহর উপর কালামবিদরা আক্রমণ করত। অধিকাংশ কালামবিদ বসরায় ছিলেন। সুতরাং শাফেয়ীর সাথে যারা তর্ক-বিতর্ক করেছিলেন, তারা নিশ্চয় কালামবিদ। কিন্তু শাফেয়ীর বই বা তিনি যাদের খণ্ডন করেছেন তাদের কারো বক্তব্য থেকে এমনটা জানা যায় না যে, তারা সুন্নাহকে প্রমাণ হিসেবে মানার বিষয়টা অস্বীকার করত। অর্থাৎ এটাকে ঐশী মাপকাঠি হিসেবে মেনে নিতে তাদের কোনো আপত্তি ছিল। বরং তাদের আপত্তি ছিল যে, 'কুরআনের মতো করে সমগ্র সুন্নাহকে প্রমাণ করা সম্ভব না।' যিনি সুন্নাহ অস্বীকার করেন তিনি 'খবরে ওয়াহেদ এবং (খবরে) মুতাওয়াতির প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ এই দুটির কোনোটিই তার দৃষ্টিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত না।' সুতরাং প্রত্যাখ্যানের কারণ 'ভুল-ত্রুটি ও বর্ণনাকারীদের মিথ্যা বলার সম্ভাবনা; যদিও তাদের সংখ্যা তাওয়াতুরের পর্যায়ে যায়। ... সুন্নাহকে প্রমাণ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে না; তাই এই প্রত্যাখ্যানকারী ব্যক্তি যদি নবীজীর যুগে থাকতেন, তার কথা শুনতেন এবং তার কাজকর্ম দেখতেন, তাহলে প্রত্যাখ্যান করতেন না, বরং এই সুন্নাহ দিয়ে দলীল দিতেন।' অন্যভাবে বললে, 'মতভেদের জায়গা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রাপ্ত বর্ণনাসমূহের উপর আমল করার আবশ্যকতা; আর সেটা বর্ণনাগত বিশুদ্ধতার বিবেচনায়, সুন্নাহ হিসেবে নয়।'

খুদ্বারী (এবং শান্ত) শাফেয়ীর বক্তব্যকে যেভাবে পাঠ করেছেন, উপর্যুক্ত আলোচনা হলো আব্দুল গনী আব্দুল খালেক কর্তৃক সেই পাঠের সূক্ষ্ম সমালোচনার মূল বক্তব্য। শাফেয়ী সুন্নাহকে প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে কুরআনের যে সকল আয়াত ব্যবহার করেছেন, সেগুলো আব্দুল গনী আব্দুল খালেকের মতে গবেষণার ভূমিকা ছিল, প্রতিপক্ষকে বোঝানোর লক্ষ্যে সুন্নাহকে প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আয়াতগুলো ব্যবহৃত হয়নি। তিনি শাফেয়ীর বিভিন্ন বক্তব্য থেকে স্পষ্ট প্রমাণ করেন যে, শাফেয়ীর বিরোধী ব্যক্তি রাসূলের সুন্নাহকে ওহী হিসেবে মানতেন এবং সেটাকে প্রমাণ হিসেবে স্বীকার করতেন। নাহলে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শাফেয়ীর উপস্থাপিত প্রমাণ যথাযথ হবে না।

এটা মুতাযিলাদের রক্ষা করার জন্য বলা হচ্ছে না। বরং সাহাবীদের ব্যাপারে মুতাযিলাদের আক্রমণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি সাহাবীদের থেকে বর্ণিত হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছিল। তবে তার মানে এই না যে, মুতাযিলারা সুন্নাহ অস্বীকার করত, যেমনটা প্রাচ্যবিদরা তুলে ধরার চেষ্টা করে। বরং তারা বর্ণনাসমূহ সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে মতবিরোধ করেছিল, মুহাদ্দিসদের কর্মপদ্ধতি থেকে সরে গিয়েছিল। প্রাসঙ্গিক আলামত থাকলে খবরে ওয়াহেদ গ্রহণ করার ব্যাপারে তাদের বড় ব্যক্তিত্বদের যে বক্তব্যসমূহ আমরা ইতঃপূর্বে উল্লেখ করেছি, সেগুলো মুতাযিলাদের বাইরে অন্যান্য কালামবিদদের মতের চাইতে সত্যের বেশি কাছাকাছি। মুতাযিলারা যে সুন্নাহকে স্বতঃসিদ্ধ বিষয় হিসেবে সাব্যস্ত করত, সেটার পক্ষে ঐ বক্তব্যগুলো প্রমাণ। আমি যা বলতে চাইছি তা হলো 'সুন্নাহকে প্রমাণ হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানানো এবং ইসলাম শুধু কুরআনে সীমিত করে দেওয়ার বিষয়টা এমন কোনো মুসলিম বলতে পারে না, যিনি আল্লাহর দীন ও শরয়ী বিধান ঠিকভাবে জানেন। তার বক্তব্য বাস্তবতার সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। শরয়ী বিধি-বিধানের অধিকাংশ বিষয় সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। কুরআনে যত বিধি-বিধান আছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেগুলো সংক্ষিপ্ত এবং সামগ্রিক মূলনীতি।'

টিকাঃ
৩০২. আল-খুদ্বারী, তারীখুত তাশরী'ইল ইসলামী (পৃ. ১৯৭)। মূল সূত্র: মুস্তফা সিবা'ঈ, আস-সুন্নাহ ওয়া-মাকানাতুহা ফিত-তাশরী'ইল ইসলামী (পৃ. ১৭১)।
৩০৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭১।
৩০৪. আব্দুল গনী আব্দুল খালিক, হুজিয়াতুস সুন্নাহ, দারুল ওয়াফা- আস-মা'হাদুল 'আলামী লিল-ফিকরিল ইসলামী, পৃ. ২৬০-২৬১।
৩০৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬৩-২৬৪।
৩০৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫৫-২৭৭।
৩০৭. সিবা'ঈ, আস-সুন্নাহ ওয়া-মাকানাতুহা ফিত-তাশরী'ইল ইসলামী, পৃ. ১৬৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00