📄 মালেক ও পূর্ববর্তীদের অনুকরণে অগ্রাধিকার, অতঃপর শাফেয়ী ও মৌখিক ইতিহাসের অগ্রাধিকার
আমরা ইতঃপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় সুন্নাহ যে ওহী তা স্বতঃসিদ্ধ বিষয় ছিল। কারণ সেটা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যক্তিত্বে বিদ্যমান শরীয়ত প্রণয়নের দিকটির প্রতিনিধিত্ব করত। এই সুন্নাহ সাহাবী-তাবেয়ী প্রজন্ম পেরিয়ে ইমাম মালেকসহ বড় লেখকদের প্রজন্ম অতিক্রম করে ইমাম শাফেয়ীতে এসে পৌঁছায়। যাহাবী বলেন, '১৪৩ হিজরী সনে এ যুগের আলেমরা হাদীস, ফিকহ ও তাফসীর লিখনীর কাজ শুরু করেন। ইবন জুরাইজ মক্কায়, মালেক মদীনায় মুয়াত্তা, আওযা'ঈ শামে, ইবন আবী 'আরূবা ও হাম্মাদ ইবন সালামাহ প্রমুখ বসরায়, মা'মার ইয়েমেনে, সুফিয়ান সাওরী কুফায় গ্রন্থ রচনা করেন। ইবন ইসহাক মাগাযী তথা যুদ্ধের বিবরণ আর আবু হানীফা ফিকহ ও রায়ের উপর লেখেন। এর কিছু সময় পরে হুশাইম, লাইস, ইবন লাহী'আ, ইবনুল মুবারক, আবু ইউসুফ, ইবন ওয়াত্ব বই লেখেন। এরপর জ্ঞান লিপিবদ্ধ ও অধ্যায়ে বিন্যস্ত করা হতে থাকে। আরবী, ভাষা, ইতিহাস ও যুদ্ধের বিবরণের উপর বই রচিত হয়।'
কিন্তু তার অর্থ কি ইমাম মালেক আর ইমাম শাফেয়ীর কর্মপদ্ধতিতে কোনো পার্থক্য নেই? মৌলিকভাবে তাদের মাঝে পার্থক্য আছে। কিন্তু সেটা সুন্নাহকে ওহী বা প্রমাণ হিসেবে মেনে নেওয়ার সাথে সম্পৃক্ত না যেমনটা শান্ত দাবি করেছেন, অথবা কুলসন যেমনটা বলেছেন, 'প্রথম বারের মত শাফেয়ী একটা চিন্তার উপর জোর দেন। চিন্তাটা আগে অনেকের কাছে কিছুটা অস্পষ্ট ছিল। সেটা হলো নবীজীর শরয়ী বিধি-বিধান আল্লাহ প্রদত্ত ওহী।' এছাড়াও কুলসন বলেন, 'তবে শাফেয়ীর মাহাত্ম্য নতুন ধারণা প্রদানের মাঝে সীমিত না। বরং তিনি প্রতিষ্ঠিত চিন্তার সাথে নিজের চিন্তাকে মিলিয়ে উভয়ের মাঝে ভারসাম্য করে উসূলুল ফিকহের এক পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি উপস্থাপন করেন, যেমনটা আগে কখনো ঘটেনি।' পরের বক্তব্যটা সঠিক, আর প্রথম বক্তব্যটা শাস্ত্রের এঁকে দেওয়া গণ্ডির প্রতি আনুগত্য টিকিয়ে রাখা ছাড়া ভিন্ন কিছু বোঝায় না। মালেক আর শাফেয়ীর পদ্ধতিগত পার্থক্য আগে থেকেই ছিল। কিন্তু একটা পরিবর্তনমূলক স্তরের কারণে এটার নবায়ন হয়। সেটা হলো জীবন্ত মৌখিক বক্তব্যের অনুসরণের যুগের সমাপ্তি টেনে নির্ভরযোগ্য মৌখিক বর্ণনার সূচনা। আমরা নিচে এটাই ব্যাখ্যা করব।
ইমাম মালেক একজন বড় মাপের তাবে-তাবেয়ী। নবুওয়তের যুগের কাছাকাছি সময়ে থাকার কারণে তিনি মদীনাবাসী তাবেয়ীদের কথা ও কাজ থেকে জীবন্ত সুন্নাহর সংস্পর্শ লাভ করতে সক্ষম হন। 'মদীনার ফকীহদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এমন, যে বিষয়ের উপর আমল চলে আসছে, সেটা নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা, কাজ ও অভিজ্ঞতার যৌক্তিক ও ঐতিহাসিক স্থায়িত্ব নির্দেশ করে। এখান থেকেই তারা বিষয়টার বৈধতা সাব্যস্ত করে। মদীনাবাসীর এমন দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী প্রচলিত হাদীসগুলো যদি চলে আসা আমলকে জোরদার করে, তাহলে সেটাকে সবচেয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখলে একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি বলে গণ্য করতে হবে। আর যদি নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয় তাহলে নবীজীর অভিজ্ঞতার সাথে না মেলা পর্যন্ত মিথ্যা বলে গণ্য হবে, যে অভিজ্ঞতাকে মদীনাবাসী তাদের আমলের মাধ্যমে জীবিত রেখেছে।' এমন দৃষ্টিভঙ্গি যৌক্তিক; কেননা 'যে লক্ষ্যে হাদীস সংকলন করা হয়েছে, বা যে লক্ষ্যে ইসলামী জ্ঞান অগ্রসর হয়, সেটা হলো একজন ব্যক্তি তার বিবিধ অবস্থায় কী কী করবে সেটা জানা। অন্যভাবে বললে, এর উদ্দেশ্য থাকে নির্দিষ্ট ও বিশেষ পরিস্থিতিতে এবং নব-উদ্ভূত অবস্থায় ওহী হিসেবে প্রাপ্ত শরীয়ত বাস্তবায়নের পদ্ধতি জানা। শরীয়ত কীভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে সেটার জন্য হাদীসকে একমাত্র উপকরণ হিসেবে ধরে নিতে হবে এমন কোনো আবশ্যকতা নেই। মুসলিম সমাজে প্রচলিত উরফ বা প্রথাও দলীলে পরিণত হতে পারে যেটার শক্তিমত্তা স্বল্প সংখ্যক সাহাবীদের থেকে বর্ণিত হাদীসের চাইতে শক্তিশালী হবে।' নৃতাত্ত্বিকদের ভাষায় এই স্তরের নাম 'মৌখিক বর্ণনার অনুকরণ'। এগুলো মূলত এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে মুখে মুখে স্থানান্তরিত হওয়া চিন্তাসমূহ (সাময়িকভাবে পাঠককে অনুরোধ করব তিনি যেন মেনে নেন যে, প্রথম শতাব্দীতে কেবল মৌখিকভাবে হয়েছে, আমরা লিখনীর সংজ্ঞায়নে গিয়ে এটার খণ্ডন করব)। এই মৌখিক বর্ণনার অনুকরণ মূলত জীবন্ত বিষয় অনুসরণের উপর নির্ভর করে। অন্যদিকে শাফেয়ী যেহেতু কালের বিবেচনায় জীবন্ত নমুনা অনুসরণের দিক থেকে মালেকের পরে ছিলেন, অধিকন্তু তার সময়ে হাদীস গ্রন্থগুলো দেখা গিয়েছিল আর হাদীসের সমালোচনার ধারাও পূর্ণতা লাভ করেছিল, সেহেতু শাফেয়ী মৌখিক বর্ণনাকে এমন আমলের উপর প্রাধান্য দিয়েছিলেন যেটা তার দৃষ্টিতে যথাযথ ও নিয়মতান্ত্রিক ছিল না। মৌখিক বর্ণনার ইতিহাসের চাইতে মৌখিক জীবন্ত অনুকরণের ভিন্নতার জায়গা হলো মৌখিক বর্ণনার ইতিহাস ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নিরবচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছে দিয়েছে। যে বর্ণনাকারী থেকে শাফেয়ী বা অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ শুনছেন, তিনি তার উপরের বর্ণনাকারীর থেকে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সরাসরি শুনছেন। এভাবে বর্ণনা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। আর মৌখিক বর্ণনার অনুকরণ হলো জীবন্ত সুন্নাহর সাথে জীবনযাপন, যেখানে সুন্নাহ হিসেবে সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে ফকীহদের কর্মেরও ভূমিকা থাকবে। কারণ তাদের কাজগুলো পূর্ববর্তীদের থেকে প্রাপ্ত। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তাদের মাত্র দুই প্রজন্মের ব্যবধান। ইমাম মালেক এবং তার পূর্ববর্তী মদীনার ইমামরা মাদানী আমল ও সহীহ বর্ণনার মাঝে তুলনা করেন। 'শাফেয়ী নিছক সুন্নাহর দলীলকে গ্রহণ করেন। অন্যদিকে মালেক গবেষণা চালিয়ে যাচাই-বাছাই করে তুলনার মাধ্যমে কোনো দলীল গ্রহণ করেন; এমনকি যদি তিনি ঐ দলীল নিজে বর্ণনা করে থাকেন এবং মুয়াত্তা বইয়ে লিখে থাকেন।' অন্যভাবে বললে, শাফেয়ী প্রথমেই নির্ভর করেছেন জীবন্ত স্মৃতির সংরক্ষিত আর্কাইভের উপর, অন্যদিকে মালেক প্রথমেই নির্ভর করেছেন যাপিত জীবন্ত স্মৃতির উপর। এখানে দুটি কর্মপদ্ধতির মাঝে তুলনা করা উদ্দেশ্য নয়। কারণ তুলনার জন্য বিশেষজ্ঞরা আছেন। আমরা যেটা বলতে চাই সেটা হলো:
(১) মালেক ও শাফেয়ীর যে মতভেদ, সেটা সুন্নাহর সংজ্ঞায়নে নয়, বরং সুন্নাহ কীসের দিকে নির্দেশ করে সেটার ব্যাপারে। শাফেয়ীসহ অন্যান্য মুহাদ্দিস-ফকীহদের কাছে সুন্নাহ প্রথমেই সহীহ হাদীসকে বুঝায়। তাই তারা সহীহ হাদীস দিয়েই সুন্নাহকে বুঝিয়েছেন। অন্যদিকে মালেকের কাছে সুন্নাহ প্রথমেই আমলকে বুঝায়। তাই সুন্নাহ এখানে সহীহ হাদীস থেকে ব্যাপক। এই বিষয়ের আলোকেই আমরা সুন্নাহ ও হাদীসকে পৃথকভাবে দেখা প্রাচীন বক্তব্যগুলো বুঝব।
(২) মালেক ও শাফেয়ীর মাঝে মতভেদ নতুন নয়। মালেকের জন্মের আগেও এটা ছিল। ইমাম আহমদ সহীহ সনদে ইবন আবী মুলাইকা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, উরওয়া একবার ইবন আব্বাসকে বললেন, 'ইবন আব্বাস, আর কত আপনি মানুষকে বিভ্রান্ত করবেন?' ইবন আব্বাস বললেন, 'কী হলো উরওয়াহ?' উরওয়া বললেন, 'আপনি আমাদেরকে হজ্জের মাসে উমরাহ করতে নির্দেশ দেন, অথচ আবু বকর-উমার এটা করতে নিষেধ করেছেন।' ইবন আব্বাস বললেন, 'আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং করেছেন।' উরওয়াহ বললেন, 'তারা দুজন আপনার চাইতে রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বেশি অনুসরণ করতেন, তার ব্যাপারে তারা আপনার চাইতে বেশি জানতেন।'
তাই 'জোসেফ শাখ বা অন্যরা যখন দাবি করেছে যে, শাফেয়ী ইসলামী ফিকহকে পরিপক্কতার স্তরে নিয়ে এসেছে, তখন তারা স্পষ্ট ভুল বলেছে। কারণ এই প্রক্রিয়ায় যত ফকীহ ভূমিকা রেখেছেন, তিনি তাদের একজন ছিলেন মাত্র। ফকীহরা সকলে কুরআন-সুন্নাহকে গ্রহণ করতেন। তারা দলীলের বিবেচনায় দুইটাকে ভিন্নভাবে দেখতেন না। 'শাফেয়ীর আগে বা পরে কোনো মুসলিম কল্পনাও করেনি যে, সাহাবী বা তৎপরবর্তীদের আমল অথবা জামা'আতের আমল তথা উরফ (প্রথা) নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে সম্বন্ধকৃত সুন্নাহর সমকক্ষ। আর নবীজীর সুন্নাহকে সাহাবীদের সম্মিলিত আমলের বা একক আমলের চাইতে নিচের স্তরে ভাবা তো বহু দূরের বিষয়। সর্বোচ্চ যেটা ঘটেছে সেটা হলো কিছু ফকীহ সুন্নাহর নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কিছু মাপকাঠি নির্ধারণ করেছিলেন, যেগুলোর কারণে ইমাম শাফেয়ী তাদেরকে সুন্নাহ পরিত্যাগ করা এবং সনদের বিবেচনায় সহীহ না বলার দায়ে অভিযুক্ত করেন। শাফেয়ী এর মাধ্যমে নতুন কিছু বলেননি। বরং তার আগে-পরে অনেক মুহাদ্দিস ছিলেন যারা এই মাপকাঠিগুলো পরিত্যাগ করে কেবল সনদের বিশুদ্ধতার মাঝে সীমিত থাকতে বলতেন, বিপরীত মতাদর্শীদেরকে সুন্নাহ পরিত্যাগ ও এর থেকে দূরে সরে যাওয়ার দোষে দুষ্ট বলতেন। এই অভিযোগ শুনে প্রতিপক্ষ হতচকিত হয়ে যেত। তারা এর থেকে নিজেদের মুক্ত দাবি করতে জোর প্রচেষ্টা চালাত। শাখ বা তার অনুসারীরা যেমনটা দাবি করছে, তেমনটা যদি হয়ে থাকত, তাহলে তারা তো এসব অভিযোগের কোনো পরোয়াই করত না। তাদের এবং সমাজের চোখে অভিযোগগুলো নিন্দনীয়ও হতো না; যদি নবীজীর সুন্নাহ গ্রহণ করাটা 'বিচ্ছিন্ন' (শায) মত-ই হয়ে থাকত।'
এতদসত্ত্বেও হাদীসের বর্ণনাসমূহ কতটুকু সুন্নাহর প্রতিনিধিত্ব করে সেটা নিয়ে ইমাম মালেক ও শাফেয়ীর পদ্ধতির মাঝে আপেক্ষিক অবিচ্ছিন্নতা ছিল, বিচ্ছিন্নতা ছিল না। মুরসাল বর্ণনার ক্ষেত্রে এসে এটা স্পষ্ট দেখা যায়। মুরসাল হাদীসের বিষয়টাই 'জীবন্ত ঐতিহ্যের অনুকরণ' (যেখানে মুরসাল এবং সনদ ছাড়াই কারো থেকে প্রাপ্ত বর্ণনা দিয়ে অনেক সময় দলীল পেশ করা হয়)-এর ধারা এবং মৌখিক নিয়মতান্ত্রিক বর্ণনার ধারাকে পৃথক করে। কিছু ইমামের বক্তব্য অনুযায়ী মুরসাল হাদীসের সাথে আচরণের পদ্ধতিতে ইমাম শাফেয়ীর সাথে তার পূর্ববর্তীদের পদ্ধতির পূর্ণ বৈপরিত্য বা বিচ্ছিন্নতা ছিল: যেমনটা আবু দাউদ তার 'রিসালাহ লি-আহলি মাক্কাহ'-তে বলেন— 'মুরসাল হাদীস দিয়ে পূর্ববর্তী আলেমরা দলীল দিতেন, যেমন: সুফিয়ান সাওরী, মালেক ইবন আনাস, আওযাঈ; অবশেষে শাফেয়ী এসে মুরসাল বর্ণনার ব্যাপারে কথা বললেন'। তবে সে সকল ইমামের বক্তব্যে উত্থাপিত বিচ্ছিন্নতার এই দাবি সূক্ষ্ম নয়। শাফেয়ী সহীহ সনদে বর্ণিত মুরসালকে প্রত্যাখ্যান করেননি। বরং কিছু নির্দিষ্ট শর্ত তাতে জুড়ে দিয়েছেন। যেমন-অন্য কোনো সূত্র থেকে মুসনাদ হিসেবে বর্ণিত হবে, মুরসালের বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যশীল এমন সাহাবীর কথা বা কাজ থাকতে হবে, মুরসাল অনুযায়ী অধিকাংশ আলেম ফতোয়া দিবে প্রভৃতি। অবিচ্ছিন্নতা বুঝায় এমন আরো একটা বিষয় হলো ইমাম শাফেয়ী ইজমাকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ইজমাকে দলীল হিসেবে মানার ক্ষেত্রে তার যুক্তি আর মালেকের মদীনাবাসীর আমলকে দলীল হিসেবে মানার যুক্তি একই। যুক্তিটা হলো বিভিন্ন শহরে একটা ফিকহী ঐতিহ্য প্রচলিত থাকলে সেটা 'সুন্নাহ' হওয়ার পক্ষে জোর প্রমাণ। এমনকি শাফেয়ী যখন বললেন: আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহগুলো আম মুসলিমদের জীবন থেকে উঠে যেতে পারে না, তখন তার বক্তব্যের উপর মন্তব্য করে নসর হামেদ আবু যাইদ দাবি করল, 'তার এই বক্তব্যে সে তার উস্তায ইমাম মালেকের যুক্তির পুনরাবৃত্তি করেছে, যে যুক্তি ইমাম মালেক মদীনাবাসীর আমলকে ফিকহের উৎস হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে পেশ করেছিলেন।' ইজমা এবং মুসনাদ হাদীসের মাঝে পার্থক্য হলো 'ইজমা সরাসরি শ্রুত নয় এমন বিবরণ, এটা শ্রুত বিবরণের চাইতে দালীলিক বিবেচনায় কোনো অংশে কম না।' শাফেয়ী যদি মুসলিমদের মাঝে সুন্নাহর নতুন ভিত স্থাপনকারী ফকীহ হতেন কিংবা অস্পষ্টতার পর নতুনভাবে স্পষ্টতা প্রদানকারী হতেন (যেমনটা প্রাচ্যবিদরা বলে) তাহলে আমরা এই আপেক্ষিক অবিচ্ছিন্নতা পেতাম না, বরং পূর্ণ বিচ্ছিন্নতাই পেতাম।
টিকাঃ
২৯১. আস-সুয়ূত্বী, তারীখুল খুলাফা (৪১৬-৪১৭)।
২৯২. কুলসন, ফী তারীখিত তাশরী'ইল ইসলামী, পৃ. ৮৩।
২৯৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৮।
২৯৪. হাল্লাক, নাশআতুল ফিকহিল ইসলামী ওয়া-তাতাউরুহু, পৃ. ১৫৫।
২৯৫. ওয়ালব্রিজ, আল্লাহ ওয়াল-মানত্বেক ফিল-ইসলাম, পৃ. ৮০।
২৯৬. মুহাম্মাদ আবু যাহরা, মালেক: হায়াতুহু ওয়া-আসরুহু ওয়া-আরাউহুল ফিকহিয়্যাহ, পৃ. ৩৪২।
২৯৭. মুসনাদ আহমদ (২২৭৭)।
২৯৮. হাল্লাক, নাশআতুল ফিকহিল ইসলামী ওয়া-তাতাউরুহু, পৃ. ১৬৯। বিষয়টা নিয়ে বিস্তারিত আমাদের মতের সাথে সামঞ্জস্যশীল মত জানতে পড়ুন, N. Calder, Studies in Early Muslim Jurisprudence (Oxford: Clarendon Press, ১৯৯৩).
২৯৯. রিফ'আত ফাওযী আব্দুল মুত্তালিব, তাওসিকুস-সুন্নাহ ফিল-কারনিস সানী আল-হিজরী: উসুসুহু ওয়া-ইত্তিজাহাতুহু, মাকতাবাতুল খানান্জী, মিশর, পৃ. ১৬।
৩০০. আর-রিসালাহ (পৃ. ৪৬১-৪৬৫)।
৩০১. নসর হামেদ আবু যাইদ, আল-ইমাম আশ-শাফেয়ী ওয়া তাসীসুল আইদিউলুজিয়্যা আল-ওয়াসাত্বিয়্যাহ, মাকতাবাতু মাদবুলী, ১৯৯৬, পৃ. ১২২।
📄 শাফেয়ীর সাথে তার প্রতিপক্ষের মতবিরোধের বিষয় কি সুন্নাহর প্রামাণ্যতা ছিল?
আমরা প্রমাণ করেছি যে, জীবনাচরণের মাপকাঠি হিসেবে নববী সুন্নাহর ধারণা সাহাবী-তাবেয়ীদের মাঝে ছিল। এখানে আমরা প্রমাণ করব যে, এই ধারণা শাফেয়ীর সময়কাল পর্যন্ত চলমান ছিল। অর্থাৎ সুন্নাহর ব্যাপারে শাস্ত্রের ধারণার বাকি অংশ এখানে খণ্ডন করব। শাস্ত্রের দাবি অনুযায়ী শাফেয়ীর যুগে সুন্নাহকে প্রমাণ হিসেবে মেনে নেয়ার বিষয়টা প্রতিষ্ঠিত ছিল না। প্রাচ্যবিদদের গবেষণার সারকথা হলো শাফেয়ী সুন্নাহ অস্বীকারকারী মুতাযিলাদের সমালোচনা করতেন। আমি আমাদের ইমামদের কোনো বইয়ে সুন্নাহকে ঐশী উৎস হিসেবে মেনে নেওয়ার বিষয়টা অস্বীকার করার মতো কিছু দেখিনি। শাফেয়ীর বই পড়ে 'মুতাযিলা সম্প্রদায় সুন্নাহ অস্বীকার করত' এমন ধারণা দিতে সর্বপ্রথম দেখেছি শাইখ মুহাম্মাদ আল-খুদ্বারী (১৯২৭ খ্রি.)-কে। তিনি তার বই 'তারীখুত তাশরী'ইল ইসলামী'তে বলেন, 'শাফেয়ী আমাদের কাছে স্পষ্ট করেননি কারা এই মত অনুসরণ করত। ইতিহাস থেকেও আমরা সেটা জানতে পারি না। তবে শাফেয়ী পরবর্তী মতের (বিশেষ ব্যক্তিদের থেকে প্রাপ্ত বর্ণনা প্রত্যাখ্যানের মতো) অনুসারীদের সাথে তর্ক করতে গিয়ে স্পষ্ট বলেছেন যে, এই মতের (সকল বর্ণনা প্রত্যাখ্যানের মতো) অনুসারীরা বসরার অধিবাসী। আর বসরা সে সময় কালামী মতাদর্শের কেন্দ্র ছিল। এখান থেকে মুতাযিলাদের উত্থান ঘটে। এখানে মুতাযিলাদের বড় ব্যক্তিবর্গ এবং বই রচিত হয়। তারা আহলুল হাদীসের বিরোধিতা করার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। সম্ভবত এই মতের অনুসারী তাদের কেউ হবে। আমার কাছে বিষয়টা আরো শক্তিশালী হলো যখন আমি আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ইবন মুসলিম ইবন কুতাইবাহর 'তাওয়ীলু মুখতালাফিল হাদীস' বইটি পড়লাম। তিনি সেখানে সুন্নাহর ব্যাপারে মুতাযিলা শাইখ ও তাদের বড় মুফতীদের অবস্থান আর সাহাবীদের ব্যাপারে তাদের নিন্দাবাদ উপস্থাপন করেছেন।'
খুদ্বারী এখান থেকে উদঘাটন করেন যে, শাফেয়ীর যুগে বা তার কিছু সময় আগে আহলুস সুন্নাহর উপর কালামবিদরা আক্রমণ করত। অধিকাংশ কালামবিদ বসরায় ছিলেন। সুতরাং শাফেয়ীর সাথে যারা তর্ক-বিতর্ক করেছিলেন, তারা নিশ্চয় কালামবিদ। কিন্তু শাফেয়ীর বই বা তিনি যাদের খণ্ডন করেছেন তাদের কারো বক্তব্য থেকে এমনটা জানা যায় না যে, তারা সুন্নাহকে প্রমাণ হিসেবে মানার বিষয়টা অস্বীকার করত। অর্থাৎ এটাকে ঐশী মাপকাঠি হিসেবে মেনে নিতে তাদের কোনো আপত্তি ছিল। বরং তাদের আপত্তি ছিল যে, 'কুরআনের মতো করে সমগ্র সুন্নাহকে প্রমাণ করা সম্ভব না।' যিনি সুন্নাহ অস্বীকার করেন তিনি 'খবরে ওয়াহেদ এবং (খবরে) মুতাওয়াতির প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ এই দুটির কোনোটিই তার দৃষ্টিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত না।' সুতরাং প্রত্যাখ্যানের কারণ 'ভুল-ত্রুটি ও বর্ণনাকারীদের মিথ্যা বলার সম্ভাবনা; যদিও তাদের সংখ্যা তাওয়াতুরের পর্যায়ে যায়। ... সুন্নাহকে প্রমাণ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে না; তাই এই প্রত্যাখ্যানকারী ব্যক্তি যদি নবীজীর যুগে থাকতেন, তার কথা শুনতেন এবং তার কাজকর্ম দেখতেন, তাহলে প্রত্যাখ্যান করতেন না, বরং এই সুন্নাহ দিয়ে দলীল দিতেন।' অন্যভাবে বললে, 'মতভেদের জায়গা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রাপ্ত বর্ণনাসমূহের উপর আমল করার আবশ্যকতা; আর সেটা বর্ণনাগত বিশুদ্ধতার বিবেচনায়, সুন্নাহ হিসেবে নয়।'
খুদ্বারী (এবং শান্ত) শাফেয়ীর বক্তব্যকে যেভাবে পাঠ করেছেন, উপর্যুক্ত আলোচনা হলো আব্দুল গনী আব্দুল খালেক কর্তৃক সেই পাঠের সূক্ষ্ম সমালোচনার মূল বক্তব্য। শাফেয়ী সুন্নাহকে প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে কুরআনের যে সকল আয়াত ব্যবহার করেছেন, সেগুলো আব্দুল গনী আব্দুল খালেকের মতে গবেষণার ভূমিকা ছিল, প্রতিপক্ষকে বোঝানোর লক্ষ্যে সুন্নাহকে প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আয়াতগুলো ব্যবহৃত হয়নি। তিনি শাফেয়ীর বিভিন্ন বক্তব্য থেকে স্পষ্ট প্রমাণ করেন যে, শাফেয়ীর বিরোধী ব্যক্তি রাসূলের সুন্নাহকে ওহী হিসেবে মানতেন এবং সেটাকে প্রমাণ হিসেবে স্বীকার করতেন। নাহলে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শাফেয়ীর উপস্থাপিত প্রমাণ যথাযথ হবে না।
এটা মুতাযিলাদের রক্ষা করার জন্য বলা হচ্ছে না। বরং সাহাবীদের ব্যাপারে মুতাযিলাদের আক্রমণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি সাহাবীদের থেকে বর্ণিত হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছিল। তবে তার মানে এই না যে, মুতাযিলারা সুন্নাহ অস্বীকার করত, যেমনটা প্রাচ্যবিদরা তুলে ধরার চেষ্টা করে। বরং তারা বর্ণনাসমূহ সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে মতবিরোধ করেছিল, মুহাদ্দিসদের কর্মপদ্ধতি থেকে সরে গিয়েছিল। প্রাসঙ্গিক আলামত থাকলে খবরে ওয়াহেদ গ্রহণ করার ব্যাপারে তাদের বড় ব্যক্তিত্বদের যে বক্তব্যসমূহ আমরা ইতঃপূর্বে উল্লেখ করেছি, সেগুলো মুতাযিলাদের বাইরে অন্যান্য কালামবিদদের মতের চাইতে সত্যের বেশি কাছাকাছি। মুতাযিলারা যে সুন্নাহকে স্বতঃসিদ্ধ বিষয় হিসেবে সাব্যস্ত করত, সেটার পক্ষে ঐ বক্তব্যগুলো প্রমাণ। আমি যা বলতে চাইছি তা হলো 'সুন্নাহকে প্রমাণ হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানানো এবং ইসলাম শুধু কুরআনে সীমিত করে দেওয়ার বিষয়টা এমন কোনো মুসলিম বলতে পারে না, যিনি আল্লাহর দীন ও শরয়ী বিধান ঠিকভাবে জানেন। তার বক্তব্য বাস্তবতার সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। শরয়ী বিধি-বিধানের অধিকাংশ বিষয় সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। কুরআনে যত বিধি-বিধান আছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেগুলো সংক্ষিপ্ত এবং সামগ্রিক মূলনীতি।'
টিকাঃ
৩০২. আল-খুদ্বারী, তারীখুত তাশরী'ইল ইসলামী (পৃ. ১৯৭)। মূল সূত্র: মুস্তফা সিবা'ঈ, আস-সুন্নাহ ওয়া-মাকানাতুহা ফিত-তাশরী'ইল ইসলামী (পৃ. ১৭১)।
৩০৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭১।
৩০৪. আব্দুল গনী আব্দুল খালিক, হুজিয়াতুস সুন্নাহ, দারুল ওয়াফা- আস-মা'হাদুল 'আলামী লিল-ফিকরিল ইসলামী, পৃ. ২৬০-২৬১।
৩০৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬৩-২৬৪।
৩০৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫৫-২৭৭।
৩০৭. সিবা'ঈ, আস-সুন্নাহ ওয়া-মাকানাতুহা ফিত-তাশরী'ইল ইসলামী, পৃ. ১৬৫।