📘 যুক্তির নিরিখে সুন্নাহর প্রামাণ্যতা > 📄 ইতিহাসের নিরপেক্ষতা

📄 ইতিহাসের নিরপেক্ষতা


মৌলিক জ্ঞানের ব্যাপারে সংশয় থেকে বের হওয়ার সমাধান যেমন দেকার্তের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তির পরিবর্তে 'বর্ণনামূলক পদ্ধতিতে' বিদ্যমান, তেমনিভাবে বিজ্ঞানের আপেক্ষিকতা থেকে বেরিয়ে আসার সমাধান বিজ্ঞানের 'বর্ণনামূলক পদ্ধতিতে' বিদ্যমান। টমাস কুন প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞানের যে নমুনা পেশ করেছেন, সেটা বিজ্ঞানের প্রকৃত বিবরণ না। বরং এটা তত্ত্বীয় একটা নমুনা মাত্র। যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদের প্রদত্ত নমুনা বা কল্পনা পপারের প্রদত্ত নমুনার মতো এটা একটা নমুনা। কুন বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে বাছাই করে তার নমুনার সাথে যেগুলো মিলে যায়, সেগুলো নিয়েছেন। বিজ্ঞানের দার্শনিক 'ল্যারি লোডান'সহ আরো কয়েকজন কুনের উদাহরণের সাথে সাংঘর্ষিক উদাহরণ দেখিয়েছেন। 'বিজ্ঞানের বিপ্লব' এবং 'যুক্তিনির্ভর বিজ্ঞানের' মাঝে সৃষ্ট শক্ত সীমারেখা অবাস্তব। কুন যেভাবে চিত্রিত করেছেন, তার চাইতে বিজ্ঞানের যাত্রা আরো জটিল। কিন্তু এই টেকনিক্যাল সমালোচনা আমাদের কাছে এখানে গুরুত্বপূর্ণ না। আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো 'লোডান' কি বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিকদের যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে সেটা মেনে চলেছেন কিনা। কুন বা তার পরবর্তীতে আপেক্ষিকতায় বিশ্বাসী ব্যক্তিরা বিজ্ঞানে বিদ্যমান 'অযৌক্তিক' প্রভাবকের দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করেছে। এটা স্বাভাবিক। কারণ আমরা মানুষ। এছাড়াও কুন জ্ঞানের ক্ষেত্রে সমাজের ভূমিকার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এটা নিয়েও কোনো সন্দেহ নেই। কারণ 'যৌক্তিকতা' কী সেটা নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও কুনও যাত্রা শুরু করেছেন দৃষ্টবাদিতার ভূমি থেকে। যেমন: 'এই তত্ত্ব কি পূর্বের তত্ত্বসমূহের চাইতে বেশি ঘটনার ব্যাখ্যা করে? এটার পক্ষে কি পূর্ববর্তী তত্ত্বে বিদ্যমান পরীক্ষণ-নির্ভর কিছু বিচ্ছিন্নতার সমাধান করা সম্ভব?'¹⁹⁶ ল্যারি লোডান যেমনটা ব্যাখ্যা করেছেন- এই 'যৌক্তিকতা' মূলত 'যৌক্তিকতার একটা রূপ'। এটা বিজ্ঞানের ইতিহাসের সাথে সাংঘর্ষিক, যেটা অনুসারে বিজ্ঞানের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সমস্যার সমাধান করা, বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য স্থাপন করা নয় (যেমনটা দৃষ্টবাদীরা দাবি করে)। সুতরাং আমাদের উচিত বিজ্ঞান বাস্তবতার বিবরণ কতটা সত্যভাবে করে সেটার মূল্যায়ন করা থেকে বিরত থাকা। বিজ্ঞানকে আমাদের সমস্যাসমূহ সমাধানের একটা উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করা। লোডান বলেন, 'আমার গবেষণা দাবি করে, কোনো সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানকে একটা কাঠামো হিসেবে দেখা মূলত এমন দৃষ্টিভঙ্গি, যেটা অনেক উচ্চাশা রাখে। সেই উচ্চাশা হলো অন্য যেকোনো কাঠামোর তুলনায় বিজ্ঞান যে বৈশিষ্ট্যের কারণে আলাদা সেটাকে অনুধাবন করতে পারা।' আমরা এমনটা করলে স্পষ্ট হবে যে 'বিজ্ঞানের দর্শনে অধিকাংশ প্রথাগত সমস্যা এবং বিজ্ঞানের ইতিহাসে মাপকাঠির পর্যায়ে থাকা বেশ কিছু বিষয় এখন খুবই মতভেদপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে; বিশেষত যখন আমরা বিজ্ঞানকে কোনো সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে পরিচালিত কার্যক্রম বলে গণ্য করছি। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা প্রমাণ করব যে বিজ্ঞানের একটা সুচিন্তিত বিশ্লেষণ এমন অনেক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দিবে, যেগুলো বর্তমান বিজ্ঞানের ইতিহাস রচয়িতা ও বিজ্ঞান-দার্শনিকদের প্রচলিত অনেক ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক হবে।¹⁹⁷ লোডান বেশ নিশ্চয়তার সাথে ব্যক্ত করেন যে, তত্ত্বসমূহ মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে 'এটা লক্ষ্য রাখা খুব দরকারী যে, তত্ত্বগুলো কতটুকু 'সত্য' বা 'সমর্থনপ্রাপ্ত' অথবা আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বের আলোকে সেগুলোর কতটুকু বৈধতা দেওয়া সম্ভব সেটা যাচাইয়ের চাইতে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার কতটুকু উপযুক্ত ও যথাযথ সমাধান দেয় সেটা দেখা।¹⁹⁸ লোডানের যুক্তি অনুযায়ী আধুনিক বিজ্ঞানের বেশ কিছু দার্শনিক পদার্থ বা রসায়নের কিছু মূলনীতি ছাড়া প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের তত্ত্বসমূহের সত্যতাকে অস্বীকার করেন। কেউ কেউ সত্যতার প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে থেমে যান, কাজের প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দেন।

ইতিহাসশাস্ত্রে এটা প্রয়োগ করলে আমরা দেখতে পাই, দৃষ্টবাদীরা যে ভুল করে তা হলো, সামাজিক প্রয়োজন, সামাজিক চর্চা, সামাজিক ধ্যান-ধারণা, ইতিহাসবিদের উদঘাটনমূলক অনুমান, ইতিহাসবিদের পক্ষপাতিত্ব বা (কোনো এক ইতিহাস দার্শনিকের ভাষায়) 'গোপন আবেগ'- এর কোনোটি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো জ্ঞান নেই। কিন্তু সেটার কারণে ইতিহাসের যেমন 'যৌক্তিকতা' হ্রাস পায় না, তেমনিভাবে অন্য কোনো শাস্ত্রের 'যৌক্তিকতা'ও কমে যায় না। কারণ জ্ঞানের ক্ষেত্রে আদর্শবাদী যৌক্তিকতা নিছক কল্পনাই। আর অবিনির্মাণবাদীদের ভুল হলো 'তারা বর্তমানে ইতিহাস চর্চায় বিদ্যমান মৌলিক জটিলতার ব্যাপারে উদাসীন।¹⁹⁹ বরং ব্যাপকভাবে বললে ইতিহাস চর্চার ব্যাপারেই তারা উদাসীন। তারা জানে না যে, ইতিহাসবিদের উদঘাটন ও অনুমান স্বাধীন না। বরং সেগুলো 'বিভিন্ন উৎস থেকে অনুসন্ধান চালিয়ে অর্জিত, আর সেগুলো অবিনির্মাণবাদী চিন্তাধারার বিপরীতে প্রথম ঢাল।'²⁰⁰ এমন শর্ত প্রদান বিজ্ঞানে সাধ্যমত নিরপেক্ষতার সুযোগ প্রদান করে। আর মানবীয় এই নিরপেক্ষতা গ্রহণ না করা মূলত অন্য কথায় 'আদর্শবাদী বীরোচিত' জ্ঞান কামনা করার মতো, যেটা খোঁজ করে বেড়ায় দৃষ্টবাদীরা। এটা 'বাস্তবতা ও কল্পনার মাঝে পার্থক্য ধ্বংস করে দেয়। একজন লেখক টেক্সট থেকে সত্য বের করে আনার জন্য যে ক্লান্তিকর প্রচেষ্টা চালায়, সেটাকে অনর্থক কাজ হিসেবে গণ্য করে।²⁰¹ এটা সত্য যে, 'ইতিহাসবিদদের হাতে এমন কোনো জাদুর কাঠি নেই যেটা দিয়ে তারা অতীতে প্রবেশ করতে পারে। তবে তারা নিশ্চিত হতে পারে যে, তাদের ঐতিহাসিক বিবরণ বিদ্যমান বিভিন্ন আলামতের অভিনব ব্যাখ্যা প্রদানেরই অংশ; ফলে তারা এ সকল বিবরণের সত্যতার উপর নির্ভর করে।²⁰² অনেক বড় বড় ইতিহাসবিদ চূড়ান্ত মাত্রার নিরপেক্ষতা অর্জনের জন্য বড় ধরনের শর্ত দিয়েছেন। যেমন- ইতিহাসবিদ এভিয়েযার টাকার (Aviezer Tucker) সঠিক ইতিহাস জানার জন্য কিছু শর্ত প্রদান করেছেন। সেগুলো হলো:
(১) জ্ঞানের ব্যাপারে ইতিহাসবিদদের মাঝে ঐকমত্য।
(২) ঐকমত্য হবে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ইতিহাসবিদদের মাঝে। অর্থাৎ তারা রাজনৈতিক মতামত বা দার্শনিক মতাদর্শের দিক থেকে ভিন্ন হবে। এভাবে নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে যে, একই আদর্শের অনুসারী হওয়ার কারণে তারা ঐকমত্য পোষণ করেনি।
(৩) ইতিহাসবিদদের একটা বড় সংখ্যা এই ঐকমত্যে অংশ নিবে।²⁰³

কিন্তু ইতিহাসের সত্যতার প্রশ্নে কী হবে? এটা কি প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের থেকে ভিন্ন হবে? আমরা এখানে মেনে নিব যে, একজন বিজ্ঞানী যত বৈচিত্র্য সহকারে বিভিন্ন ঘটনা পর্যবেক্ষণ করবে, তার জন্য নিরপেক্ষতা ও সত্যতা থেকে দূরে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি হবে। পদার্থবিজ্ঞান বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য অনুমিত তথ্যে পূর্ণ। পাশাপাশি থাকা প্যারাডাইমের সংখ্যা অনেক। অধিকন্তু একটা নির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণের ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য সম্ভাব্য অনেক তত্ত্ব বিদ্যমান। সুতরাং নিরপেক্ষতা থেকে দূরে থাকার সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু ইতিহাসে অনুধাবন করার জাল ততটা সুবিস্তৃত নয়, ফলে একজন আধুনিক ইতিহাসবিদ সরাসরি টেক্সটে প্রবেশ করে এবং সেটার লেখকের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রসঙ্গের খোঁজ করে। এর মাধ্যমে সে কথকের বক্তব্যের অর্থ বুঝতে পারে। পদার্থবিজ্ঞান ও ইতিহাসের মাঝে পার্থক্য জানা যায় ইতিহাসের ব্যাপারে খুব প্রসিদ্ধ একটা সমস্যার জবাবে, যেটা হলো ইতিহাসের পাতায় থাকা অতীত ঘটনাবলির পুনরাবৃত্তি হওয়ার অসম্ভাব্যতা। পুনরাবৃত্তি ঘটার সক্ষমতা সাধারণত বিজ্ঞানের থাকে। কারণ প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বেশ কিছু পরীক্ষণ ও অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে একটা নির্দিষ্ট পরিবর্তনশীল বিষয়ের প্রভাবক নির্ণয়ে কিছু নির্দিষ্ট পরিবর্তনশীল উপাদানের প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। (আমরা 'সাধারণত' বললাম কেননা বিজ্ঞানের কিছু বিষয় পুনরায় ঘটে না। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যে সকল বিষয়ে গবেষণা চালায়, সেগুলো তারা নিয়ন্ত্রণ করে না। অনুরূপ অবস্থা ভূতত্ত্ববিদদেরও। তারা যে সকল বিষয়কে গুরুত্ব দেয়, সেগুলোর মাঝে অনেকগুলো পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষণের সম্ভাবনা রাখে না)²⁰⁴ অন্যদিকে ইতিহাসে পুনরাবৃত্তির সুযোগ নেই। কিন্তু 'একজন দক্ষ ইতিহাসবিদ তার পরীক্ষণের যথার্থতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অতীতের ঘটনাবলি বারংবার স্মরণ করতে পারে না, যেমনটা একজন বিজ্ঞানী পুনরায় যাচাই করার লক্ষ্যে বিভিন্ন পরীক্ষণে এমনটা করে থাকে। তবে সেটা দুর্বলতার কোনো উপাদান নয়, বরং শক্তিমত্তার উপাদান; যা ইতিহাসকে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান থেকে আলাদা করে। কারণ দক্ষ ইতিহাসবিদ মৃত অতীতের বাস্তবতাকে স্বতন্ত্রভাবে খুঁজে। অন্যদিকে বিজ্ঞানী যেকোনো ঘটনার প্রকৃতির ব্যাপারে এমন কিছু প্রশ্ন দাঁড় করায়, যেগুলো সবসময় সে যা কিছু প্রমাণ করতে ইচ্ছুক তার সাথে মিলে যায়। তার এ সকল পরীক্ষণের লক্ষ্য থাকে ঈপ্সিত বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস অর্জন অথবা দৃঢ়ভাবে নাকচ। ... সুতরাং প্রাকৃতিক বিজ্ঞান একটা কৃত্রিম কাঠামো, কেননা সেটা প্রকৃতির বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কৃত্রিম উপস্থিত বিষয় এবং গৌণ উপাদান দিয়ে যাচাই করে থাকে।²⁰⁵

উপর্যুক্ত বক্তব্য অনুযায়ী আমরা বলব, ইতিহাস যতটা কাঠামোগত শাস্ত্র, তার চাইতে উদঘাটনমূলক শাস্ত্র।

তবে বলা হতে পারে 'মানবিক বিদ্যা' হিসেবে ইতিহাসে পক্ষপাতিত্ব বিজ্ঞানের যেকোনো শাস্ত্রে বিদ্যমান পক্ষপাতিত্ব থেকে বৃহৎ। আমরা সেটা মেনেও নিব। কিন্তু তার অর্থ এটা নয় যে, ইতিহাসের সাথে জড়িত সকল ব্যবহারিক শাস্ত্রে পক্ষপাতিত্বের মাত্রা সমান। স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, ইতিহাসকে এক প্রকার অনুধাবন আর ইতিহাসকে এক প্রকার নথিপত্র হিসেবে দেখা—এ দুটি বিষয় আমাদের আলাদা করতে হবে। কারণ ইতিহাসচর্চার সত্যতা নিয়ে সামগ্রিকভাবে বলা বক্তব্য বিভ্রান্তিকর। মৌখিক বর্ণনার আধুনিক ইতিহাস অনুযায়ী একটা নির্দিষ্ট ঘটনা যে প্রজন্ম শুনেছে সে প্রজন্ম অথবা তৎপরবর্তী প্রজন্মের থেকে প্রাপ্ত তথ্যের (যারা সরাসরি শোনেনি কিন্তু পূর্বের প্রজন্ম থেকে শুনেছে) ব্যাপারে সঠিক ঐতিহাসিক জ্ঞানে পৌঁছানোর দুটি ধাপ রয়েছে। প্রথম ধাপ হলো তাদের বক্তব্যগুলোর অডিও রেকর্ড সংগ্রহ। দ্বিতীয় ধাপ হলো সেই বক্তব্যগুলো অনুধাবন ও সেগুলোর মাঝে সমন্বয়। নিঃসন্দেহে প্রথম ধাপে (সমন্বয়) কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে (অনুধাবন) পক্ষপাতিত্ব আছে। যে বইগুলো ইতিহাসকে জ্ঞান হিসেবে মেনে নেওয়ার পক্ষে যুক্তি পেশ করে, সেগুলো অনুধাবনের এই ধাপের ক্ষেত্রেই ইতিহাসের পক্ষ নেয়। কারণ প্রথম ধাপে মানবীয় অনুধাবনের জাল পাতার কোনো সুযোগ নেই।

ইলমুল হাদীস তথা হাদীসশাস্ত্র পদ্ধতিগতভাবে নথিপত্রের মাধ্যমে সংকলিত ইতিহাসের অধীন, আর এটা দুটি বিষয়ের অধীন:
(১) সকল বর্ণনাকে সংরক্ষণ (আমল করা নয়) করা। আর যে সকল বর্ণনাকে দুর্বল বলার ব্যাপারে ঐকমত্য আছে বা মুহাদ্দিসরা দুর্বলতার বিষয়টা প্রাধান্য দিয়েছে সেগুলোকে মুছে না ফেলা। কেননা 'বাস্তবতার ব্যাপারে আমরা যে ঐতিহাসিক জ্ঞানই লাভ করি না কেন সেটা এই বর্ণনাসমূহের থেকে পেতে হবে। হাদীসগুলো নিয়ে খেল-তামাশা করা বা সেগুলো থেকে পছন্দমত বাছাই করার অর্থ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হারিয়ে বসা, যার কোনো বিকল্প খুঁজে পাওয়া সম্ভব না। ... মানবীয় ইতিহাসে জীবনীশাস্ত্রের সাথে জড়িত মুখস্থের মাধ্যমে সংকলিত সর্ববৃহৎ কাজ ছিল এটা। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা ও কাজ যেখানে মুসলিমদের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ, সেখানে তার জীবনীর প্রতিটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বর্ণনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ: হোক সেটা তার কথা বা কাজ। এমনকি তিনি অন্যদের যে কাজ করতে দেখে আপত্তি করেননি, সেটাও এর অন্তর্ভুক্ত।'²⁰⁶
(২) বিপুল সংখ্যক বর্ণনার মাঝে তুলনা। হাদীসের সমালোচক বর্ণনা কারীদেরকে তাদের সমকালীন বর্ণনাকারীদের সাথে তাদের যোগাযোগ ও সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন করে থাকেন। তাদের বর্ণনাকে নির্ভরযোগ্য ও দক্ষ বর্ণনাকারীদের সাথে তুলনা করেন। এছাড়া তাদের ধার্মিকতা ও মুখস্থশক্তি যাচাই করেন। অধিকন্তু বর্ণনাকারীদের সমকালীন হাদীস তাহকীক: মুহাম্মাদ রাশাদ সালেম (৫/২৫৪)।
১৮৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩০।
১৮৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৭।
১৮৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫৩।
১৮৮. তবে কিছু অমুসলিমদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত সমস্যা আছে। স্বাভাবিকভাবেই এই মৌলিক জ্ঞান তাদের কাছে স্বীকৃত বিষয় হবে না। বরং এগুলো শুধুই তত্ত্ব। তাই আমরা চতুর্থ অধ্যায় রেখেছি যেন সেখানে প্রাচ্যবিদদের উত্থাপিত মৌলিক অভিযোগগুলোর খণ্ডন করা যায়। আমরা আবারও বলছি, যে মুসলিম ঐ সকল সংশয় পড়ে না বা খণ্ডনও পড়ে না, স্বাভাবিকভাবেই মৌলিক জ্ঞানের স্বীকৃতি প্রদান (অ-জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে) করে, মুসলিম হিসেবে তার অবস্থান বৈধ এবং জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে সেটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কিছু নেই।

মৌলিক জ্ঞানের ব্যাপারে সংশয় থেকে বের হওয়ার সমাধান যেমন দেকার্তের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তির পরিবর্তে 'বর্ণনামূলক পদ্ধতিতে' বিদ্যমান, তেমনিভাবে বিজ্ঞানের আপেক্ষিকতা থেকে বেরিয়ে আসার সমাধান বিজ্ঞানের 'বর্ণনামূলক পদ্ধতিতে' বিদ্যমান। টমাস কুন প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞানের যে নমুনা পেশ করেছেন, সেটা বিজ্ঞানের প্রকৃত বিবরণ না। বরং এটা তত্ত্বীয় একটা নমুনা মাত্র। যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদের প্রদত্ত নমুনা বা কল্পনা পপারের প্রদত্ত নমুনার মতো এটা একটা নমুনা। কুন বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে বাছাই করে তার নমুনার সাথে যেগুলো মিলে যায়, সেগুলো নিয়েছেন। বিজ্ঞানের দার্শনিক 'ল্যারি লোডান'সহ আরো কয়েকজন কুনের উদাহরণের সাথে সাংঘর্ষিক উদাহরণ দেখিয়েছেন। 'বিজ্ঞানের বিপ্লব' এবং 'যুক্তিনির্ভর বিজ্ঞানের' মাঝে সৃষ্ট শক্ত সীমারেখা অবাস্তব। কুন যেভাবে চিত্রিত করেছেন, তার চাইতে বিজ্ঞানের যাত্রা আরো জটিল। কিন্তু এই টেকনিক্যাল সমালোচনা আমাদের কাছে এখানে গুরুত্বপূর্ণ না। আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো 'লোডান' কি বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিকদের যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে সেটা মেনে চলেছেন কিনা। কুন বা তার পরবর্তীতে আপেক্ষিকতায় বিশ্বাসী ব্যক্তিরা বিজ্ঞানে বিদ্যমান 'অযৌক্তিক' প্রভাবকের দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করেছে। এটা স্বাভাবিক। কারণ আমরা মানুষ। এছাড়াও কুন জ্ঞানের ক্ষেত্রে সমাজের ভূমিকার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এটা নিয়েও কোনো সন্দেহ নেই। কারণ 'যৌক্তিকতা' কী সেটা নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও কুনও যাত্রা শুরু করেছেন দৃষ্টবাদিতার ভূমি থেকে। যেমন: 'এই তত্ত্ব কি পূর্বের তত্ত্বসমূহের চাইতে বেশি ঘটনার ব্যাখ্যা করে? এটার পক্ষে কি পূর্ববর্তী তত্ত্বে বিদ্যমান পরীক্ষণ-নির্ভর কিছু বিচ্ছিন্নতার সমাধান করা সম্ভব?'¹⁹⁶ ল্যারি লোডান যেমনটা ব্যাখ্যা করেছেন- এই 'যৌক্তিকতা' মূলত 'যৌক্তিকতার একটা রূপ'। এটা বিজ্ঞানের ইতিহাসের সাথে সাংঘর্ষিক, যেটা অনুসারে বিজ্ঞানের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সমস্যার সমাধান করা, বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য স্থাপন করা নয় (যেমনটা দৃষ্টবাদীরা দাবি করে)। সুতরাং আমাদের উচিত বিজ্ঞান বাস্তবতার বিবরণ কতটা সত্যভাবে করে সেটার মূল্যায়ন করা থেকে বিরত থাকা। বিজ্ঞানকে আমাদের সমস্যাসমূহ সমাধানের একটা উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করা। লোডান বলেন, 'আমার গবেষণা দাবি করে, কোনো সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানকে একটা কাঠামো হিসেবে দেখা মূলত এমন দৃষ্টিভঙ্গি, যেটা অনেক উচ্চাশা রাখে। সেই উচ্চাশা হলো অন্য যেকোনো কাঠামোর তুলনায় বিজ্ঞান যে বৈশিষ্ট্যের কারণে আলাদা সেটাকে অনুধাবন করতে পারা।' আমরা এমনটা করলে স্পষ্ট হবে যে 'বিজ্ঞানের দর্শনে অধিকাংশ প্রথাগত সমস্যা এবং বিজ্ঞানের ইতিহাসে মাপকাঠির পর্যায়ে থাকা বেশ কিছু বিষয় এখন খুবই মতভেদপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে; বিশেষত যখন আমরা বিজ্ঞানকে কোনো সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে পরিচালিত কার্যক্রম বলে গণ্য করছি। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা প্রমাণ করব যে বিজ্ঞানের একটা সুচিন্তিত বিশ্লেষণ এমন অনেক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দিবে, যেগুলো বর্তমান বিজ্ঞানের ইতিহাস রচয়িতা ও বিজ্ঞান-দার্শনিকদের প্রচলিত অনেক ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক হবে।¹⁹⁷ লোডান বেশ নিশ্চয়তার সাথে ব্যক্ত করেন যে, তত্ত্বসমূহ মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে 'এটা লক্ষ্য রাখা খুব দরকারী যে, তত্ত্বগুলো কতটুকু 'সত্য' বা 'সমর্থনপ্রাপ্ত' অথবা আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বের আলোকে সেগুলোর কতটুকু বৈধতা দেওয়া সম্ভব সেটা যাচাইয়ের চাইতে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার কতটুকু উপযুক্ত ও যথাযথ সমাধান দেয় সেটা দেখা।¹⁹⁸ লোডানের যুক্তি অনুযায়ী আধুনিক বিজ্ঞানের বেশ কিছু দার্শনিক পদার্থ বা রসায়নের কিছু মূলনীতি ছাড়া প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের তত্ত্বসমূহের সত্যতাকে অস্বীকার করেন। কেউ কেউ সত্যতার প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে থেমে যান, কাজের প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দেন।

ইতিহাসশাস্ত্রে এটা প্রয়োগ করলে আমরা দেখতে পাই, দৃষ্টবাদীরা যে ভুল করে তা হলো, সামাজিক প্রয়োজন, সামাজিক চর্চা, সামাজিক ধ্যান-ধারণা, ইতিহাসবিদের উদঘাটনমূলক অনুমান, ইতিহাসবিদের পক্ষপাতিত্ব বা (কোনো এক ইতিহাস দার্শনিকের ভাষায়) 'গোপন আবেগ'- এর কোনোটি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো জ্ঞান নেই। কিন্তু সেটার কারণে ইতিহাসের যেমন 'যৌক্তিকতা' হ্রাস পায় না, তেমনিভাবে অন্য কোনো শাস্ত্রের 'যৌক্তিকতা'ও কমে যায় না। কারণ জ্ঞানের ক্ষেত্রে আদর্শবাদী যৌক্তিকতা নিছক কল্পনাই। আর অবিনির্মাণবাদীদের ভুল হলো 'তারা বর্তমানে ইতিহাস চর্চায় বিদ্যমান মৌলিক জটিলতার ব্যাপারে উদাসীন।¹⁹⁹ বরং ব্যাপকভাবে বললে ইতিহাস চর্চার ব্যাপারেই তারা উদাসীন। তারা জানে না যে, ইতিহাসবিদের উদঘাটন ও অনুমান স্বাধীন না। বরং সেগুলো 'বিভিন্ন উৎস থেকে অনুসন্ধান চালিয়ে অর্জিত, আর সেগুলো অবিনির্মাণবাদী চিন্তাধারার বিপরীতে প্রথম ঢাল।'²⁰⁰ এমন শর্ত প্রদান বিজ্ঞানে সাধ্যমত নিরপেক্ষতার সুযোগ প্রদান করে। আর মানবীয় এই নিরপেক্ষতা গ্রহণ না করা মূলত অন্য কথায় 'আদর্শবাদী বীরোচিত' জ্ঞান কামনা করার মতো, যেটা খোঁজ করে বেড়ায় দৃষ্টবাদীরা। এটা 'বাস্তবতা ও কল্পনার মাঝে পার্থক্য ধ্বংস করে দেয়। একজন লেখক টেক্সট থেকে সত্য বের করে আনার জন্য যে ক্লান্তিকর প্রচেষ্টা চালায়, সেটাকে অনর্থক কাজ হিসেবে গণ্য করে।²⁰¹ এটা সত্য যে, 'ইতিহাসবিদদের হাতে এমন কোনো জাদুর কাঠি নেই যেটা দিয়ে তারা অতীতে প্রবেশ করতে পারে। তবে তারা নিশ্চিত হতে পারে যে, তাদের ঐতিহাসিক বিবরণ বিদ্যমান বিভিন্ন আলামতের অভিনব ব্যাখ্যা প্রদানেরই অংশ; ফলে তারা এ সকল বিবরণের সত্যতার উপর নির্ভর করে।²⁰² অনেক বড় বড় ইতিহাসবিদ চূড়ান্ত মাত্রার নিরপেক্ষতা অর্জনের জন্য বড় ধরনের শর্ত দিয়েছেন। যেমন- ইতিহাসবিদ এভিয়েযার টাকার (Aviezer Tucker) সঠিক ইতিহাস জানার জন্য কিছু শর্ত প্রদান করেছেন। সেগুলো হলো:
(১) জ্ঞানের ব্যাপারে ইতিহাসবিদদের মাঝে ঐকমত্য।ন্থার খোঁজ বা যাচাই করে না। তারা বিচ্ছিন্ন নানা অবস্থার উপর নির্ভর করে একটা আদর্শ নমুনাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে দেয় না। অর্থাৎ তারা কিছু নির্দিষ্ট তত্ত্বের নমুনার অভ্যন্তরকে শুধু মিথ্যা সাব্যস্ত করে, সরাসরি নমুনাকে তারা মিথ্যা সাব্যস্ত করে না। কিন্তু বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন অবস্থা বারবার আসার ফলে শেষ পর্যন্ত তত্ত্বের সংহতি হুমকির মুখে পড়ে এবং ফাটল দেখা দেয়। বিজ্ঞানীদের মাঝে তখন বিভক্তি দেখা দেয় যে এই নমুনা কি টিকে থাকার উপযুক্ত কিনা। বিজ্ঞানীদের গোষ্ঠী নির্ধারণ করে দেয় কখন পুরাতন নমুনাকে বাতিল করে নতুন নমুনাকে গ্রহণ করা হবে। কুন যে বিষয়টাতে বেশ জোর প্রদান করেন সেটা হলো এই সিদ্ধান্ত যৌক্তিক পন্থায় গৃহীত হয় না- যেমনটা বিজ্ঞানকে যারা আদর্শ জ্ঞান করে তারা মনে করে থাকে।

অ্যালেক্স রুজেনবার্গ বলেন, 'বিপ্লবীরা যখন একটা নতুন নমুনা দাঁড় করায়, তখন তারা কোনো নির্দিষ্ট পন্থা অনুসরণ করে না যেটার ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে যে এটা বেশি যৌক্তিক পন্থা। অনুরূপভাবে তাদের বিপরীতে তাদের চাইতে বয়স্ক এবং গভীরতার অধিকারী ব্যক্তিরা যখন পুরাতন নমুনাকে আঁকড়ে ধরে সেটার পক্ষে লড়াই করে, তখন তারাও অধিকতর যৌক্তিক পন্থার অনুসরণ করে না।'¹⁹² সুতরাং বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির অর্থ বিজ্ঞানীদের মাঝে নমুনায় বিদ্যমান অধিকাংশ ধাঁধাঁ সমাধান করার যোগ্যতা থাকা। কোনো তত্ত্বকে যাচাই করার মাপকাঠি স্থিত কিছু নয়, এটা বিজ্ঞানীদের ব্যক্তিত্ব থেকে স্বতন্ত্র নয়। বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ অধিকাংশ সময়ে পূর্বের মতামত ও অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রভাবিত। সুতরাং বিজ্ঞান অগ্রগতিমূলক কিংবা নিরপেক্ষ নয়। তারপর কুন বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে এর পক্ষে অনেকগুলো উদাহরণ পেশ করেন।¹⁹³

তাই বিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্য হিসেবে 'নিরপেক্ষতা'কে উপস্থাপন করার বিষয়টা কুন সংশয়ের চোখে দেখেছেন। তার বক্তব্যের কারণে সে সময়ে এসে মানবিক বিদ্যাও 'জ্ঞান' হিসেবে কতটুকু উপযুক্ত সেটা নিয়ে বিদ্যমান তর্কে মানবিক বিদ্যা এগিয়ে যায়। কেননা কুন বিশ্লেষণ করে দেখিয়ে দেন যে প্রত্যেকটা বৈজ্ঞানিক কার্যক্রমে পর্যবেক্ষকদের ব্যক্তিগত প্রভাব আছে। তত্ত্বকে মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ বা গবেষণার কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেই, যেমনটা দৃষ্টবাদীরা বা কার্ল পপার কিংবা অন্যরা বলে থাকে। তাই ইতিহাসের নিরপেক্ষতার ব্যাপারে যে আপত্তি তোলা যায়, বিজ্ঞানের নিরপেক্ষতার ব্যাপারেও সেই আপত্তি তোলা যায়। কারণ 'ইতিহাসের দর্শনে নিরপেক্ষতা মোটাদাগে দর্শনে বিদ্যমান নিরপেক্ষতার সাথে সম্পৃক্ত।'¹⁹⁴ কিন্তু অন্যদিকে থেকে দেখলে যেকোনো বৈজ্ঞানিক কার্যক্রমের সত্যতার উপর কুনের এই বইটা বড় ধরনের প্রভাব ফেলে, হোক সেটা প্রাকৃতিক বিজ্ঞান কিংবা মানবিক বিজ্ঞানের চর্চা। কুনের পর থেকে কোনো বিজ্ঞানীর জন্য 'বিজ্ঞানের আপেক্ষিকতার' যুক্তিগুলো এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে ইতিহাসের দর্শনে যারাই নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক দর্শন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন, তারা কুনের যুক্তিগুলোর পর্যালোচনা করে অগ্রসর হয়েছেন।

উল্লেখ করা জরুরী যে, কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে (পরীক্ষণের উপযুক্ততা, মিথ্যার সম্ভাবনা) জ্ঞান এবং 'অ-জ্ঞান' পৃথক করা তথা এই দুইয়ের মাঝে সীমারেখা টেনে দিয়ে কোনটা 'জ্ঞান' আর কোনটা 'জ্ঞান' নয় সেটা নির্ণয় করার চিন্তা কুনের পর থেকে প্রায় পরিত্যক্ত। কারণ কুন এমন পার্থক্য করার লক্ষ্যে অগ্রসর হননি। তিনি 'বিজ্ঞানের যৌক্তিকতা'-কেই সন্দেহ করেছেন। ফলে 'বিজ্ঞান' অন্য কোনো মানবীয় কার্যক্রম থেকে আলাদা হওয়া সম্ভব না। তাই যদি হয় তাহলে আপেক্ষিকতার উপর্যুপরি আক্রমণের পরও ঐতিহাসিক জ্ঞান কীভাবে 'সম্ভাব্য' থাকে?

টিকাঃ
১৮৯. ইউমনা ত্বারীফ আল-খুলীর 'ফালসাফাতু কার্ল পপার: মানহাজুল ইলম, মানত্বিকুল ইলম' বইটি পড়ুন।
১৯০. ইউমনা আল-খুলী, ফালসাফাতু কার্ল পপার: মানহাজুল ইলম, মানত্বিকুল ইলম, পৃ. ১৩৯।
১৯১. দেখুন আমার (লেখকের) বই 'নাহুয়া মানহাজিন ওয়াসফিয়্যিন লিল-ইলম', মারকাযু বারাহীন, ২০১৯।
১৯২. অ্যালেক্স রুজেনবার্গ, ফালসাফাতুল ইলম: মুকাদ্দিমাতুন মুরাসিরা, আল-মারকাযুল কাওমি লিত-তার্জামা, অনুবাদ: আহমদ আস-সামাহী, ফাতহুল্লাহ আশ-শাইখ, পৃ. ২৭৮।
১৯৩. আল-মা'রেফাতুত তারীখিয়্যাহ ফিল-গার্ব, পৃ. ১২৫-১৩১।
১৯৪. Aviezer Tucker, ed., 2009, p. 172.

মৌলিক জ্ঞানের ব্যাপারে সংশয় থেকে বের হওয়ার সমাধান যেমন দেকার্তের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তির পরিবর্তে 'বর্ণনামূলক পদ্ধতিতে' বিদ্যমান, তেমনিভাবে বিজ্ঞানের আপেক্ষিকতা থেকে বেরিয়ে আসার সমাধান বিজ্ঞানের 'বর্ণনামূলক পদ্ধতিতে' বিদ্যমান। টমাস কুন প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞানের যে নমুনা পেশ করেছেন, সেটা বিজ্ঞানের প্রকৃত বিবরণ না। বরং এটা তত্ত্বীয় একটা নমুনা মাত্র। যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদের প্রদত্ত নমুনা বা কল্পনা পপারের প্রদত্ত নমুনার মতো এটা একটা নমুনা। কুন বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে বাছাই করে তার নমুনার সাথে যেগুলো মিলে যায়, সেগুলো নিয়েছেন। বিজ্ঞানের দার্শনিক 'ল্যারি লোডান'সহ আরো কয়েকজন কুনের উদাহরণের সাথে সাংঘর্ষিক উদাহরণ দেখিয়েছেন। 'বিজ্ঞানের বিপ্লব' এবং 'যুক্তিনির্ভর বিজ্ঞানের' মাঝে সৃষ্ট শক্ত সীমারেখা অবাস্তব। কুন যেভাবে চিত্রিত করেছেন, তার চাইতে বিজ্ঞানের যাত্রা আরো জটিল। কিন্তু এই টেকনিক্যাল সমালোচনা আমাদের কাছে এখানে গুরুত্বপূর্ণ না। আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো 'লোডান' কি বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিকদের যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে সেটা মেনে চলেছেন কিনা। কুন বা তার পরবর্তীতে আপেক্ষিকতায় বিশ্বাসী ব্যক্তিরা বিজ্ঞানে বিদ্যমান 'অযৌক্তিক' প্রভাবকের দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করেছে। এটা স্বাভাবিক। কারণ আমরা মানুষ। এছাড়াও কুন জ্ঞানের ক্ষেত্রে সমাজের ভূমিকার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এটা নিয়েও কোনো সন্দেহ নেই। কারণ 'যৌক্তিকতা' কী সেটা নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও কুনও যাত্রা শুরু করেছেন দৃষ্টবাদিতার ভূমি থেকে। যেমন: 'এই তত্ত্ব কি পূর্বের তত্ত্বসমূহের চাইতে বেশি ঘটনার ব্যাখ্যা করে? এটার পক্ষে কি পূর্ববর্তী তত্ত্বে বিদ্যমান পরীক্ষণ-নির্ভর কিছু বিচ্ছিন্নতার সমাধান করা সম্ভব?'¹⁹⁶ ল্যারি লোডান যেমনটা ব্যাখ্যা করেছেন- এই 'যৌক্তিকতা' মূলত 'যৌক্তিকতার একটা রূপ'। এটা বিজ্ঞানের ইতিহাসের সাথে সাংঘর্ষিক, যেটা অনুসারে বিজ্ঞানের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সমস্যার সমাধান করা, বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য স্থাপন করা নয় (যেমনটা দৃষ্টবাদীরা দাবি করে)। সুতরাং আমাদের উচিত বিজ্ঞান বাস্তবতার বিবরণ কতটা সত্যভাবে করে সেটার মূল্যায়ন করা থেকে বিরত থাকা। বিজ্ঞানকে আমাদের সমস্যাসমূহ সমাধানের একটা উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করা। লোডান বলেন, 'আমার গবেষণা দাবি করে, কোনো সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানকে একটা কাঠামো হিসেবে দেখা মূলত এমন দৃষ্টিভঙ্গি, যেটা অনেক উচ্চাশা রাখে। সেই উচ্চাশা হলো অন্য যেকোনো কাঠামোর তুলনায় বিজ্ঞান যে বৈশিষ্ট্যের কারণে আলাদা সেটাকে অনুধাবন করতে পারা।' আমরা এমনটা করলে স্পষ্ট হবে যে 'বিজ্ঞানের দর্শনে অধিকাংশ প্রথাগত সমস্যা এবং বিজ্ঞানের ইতিহাসে মাপকাঠির পর্যায়ে থাকা বেশ কিছু বিষয় এখন খুবই মতভেদপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে; বিশেষত যখন আমরা বিজ্ঞানকে কোনো সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে পরিচালিত কার্যক্রম বলে গণ্য করছি। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা প্রমাণ করব যে বিজ্ঞানের একটা সুচিন্তিত বিশ্লেষণ এমন অনেক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দিবে, যেগুলো বর্তমান বিজ্ঞানের ইতিহাস রচয়িতা ও বিজ্ঞান-দার্শনিকদের প্রচলিত অনেক ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক হবে।'¹⁹⁷ লোডান বেশ নিশ্চয়তার সাথে ব্যক্ত করেন যে, তত্ত্বসমূহ মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে 'এটা লক্ষ্য রাখা খুব দরকারী যে, তত্ত্বগুলো কতটুকু 'সত্য' বা 'সমর্থনপ্রাপ্ত' অথবা আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বের আলোকে সেগুলোর কতটুকু বৈধতা দেওয়া সম্ভব সেটা যাচাইয়ের চাইতে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার কতটুকু উপযুক্ত ও যথাযথ সমাধান দেয় সেটা দেখা।'¹⁹⁸ লোডানের যুক্তি অনুযায়ী আধুনিক বিজ্ঞানের বেশ কিছু দার্শনিক পদার্থ বা রসায়নের কিছু মূলনীতি ছাড়া প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের তত্ত্বসমূহের সত্যতাকে অস্বীকার করেন। কেউ কেউ সত্যতার প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে থেমে যান, কাজের প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দেন।

ইতিহাসশাস্ত্রে এটা প্রয়োগ করলে আমরা দেখতে পাই, দৃষ্টবাদীরা যে ভুল করে তা হলো, সামাজিক প্রয়োজন, সামাজিক চর্চা, সামাজিক ধ্যান-ধারণা, ইতিহাসবিদের উদঘাটনমূলক অনুমান, ইতিহাসবিদের পক্ষপাতিত্ব বা (কোনো এক ইতিহাস দার্শনিকের ভাষায়) 'গোপন আবেগ'- এর কোনোটি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো জ্ঞান নেই। কিন্তু সেটার কারণে ইতিহাসের যেমন 'যৌক্তিকতা' হ্রাস পায় না, তেমনিভাবে অন্য কোনো শাস্ত্রের 'যৌক্তিকতা'ও কমে যায় না। কারণ জ্ঞানের ক্ষেত্রে আদর্শবাদী যৌক্তিকতা নিছক কল্পনাই। আর অবিনির্মাণবাদীদের ভুল হলো 'তারা বর্তমানে ইতিহাস চর্চায় বিদ্যমান মৌলিক জটিলতার ব্যাপারে উদাসীন।'¹⁹⁹ বরং ব্যাপকভাবে বললে ইতিহাস চর্চার ব্যাপারেই তারা উদাসীন। তারা জানে না যে, ইতিহাসবিদের উদঘাটন ও অনুমান স্বাধীন না। বরং সেগুলো 'বিভিন্ন উৎস থেকে অনুসন্ধান চালিয়ে অর্জিত, আর সেগুলো অবিনির্মাণবাদী চিন্তাধারার বিপরীতে প্রথম ঢাল।'²⁰⁰ এমন শর্ত প্রদান বিজ্ঞানে সাধ্যমত নিরপেক্ষতার সুযোগ প্রদান করে। আর মানবীয় এই নিরপেক্ষতা গ্রহণ না করা মূলত অন্য কথায় 'আদর্শবাদী বীরোচিত' জ্ঞান কামনা করার মতো, যেটা খোঁজ করে বেড়ায় দৃষ্টবাদীরা। এটা 'বাস্তবতা ও কল্পনার মাঝে পার্থক্য ধ্বংস করে দেয়। একজন লেখক টেক্সট থেকে সত্য বের করে আনার জন্য যে ক্লান্তিকর প্রচেষ্টা চালায়, সেটাকে অনর্থক কাজ হিসেবে গণ্য করে।'²⁰¹ এটা সত্য যে, 'ইতিহাসবিদদের হাতে এমন কোনো জাদুর কাঠি নেই যেটা দিয়ে তারা অতীতে প্রবেশ করতে পারে। তবে তারা নিশ্চিত হতে পারে যে, তাদের ঐতিহাসিক বিবরণ বিদ্যমান বিভিন্ন আলামতের অভিনব ব্যাখ্যা প্রদানেরই অংশ; ফলে তারা এ সকল বিবরণের সত্যতার উপর নির্ভর করে।'²⁰² অনেক বড় বড় ইতিহাসবিদ চূড়ান্ত মাত্রার নিরপেক্ষতা অর্জনের জন্য বড় ধরনের শর্ত দিয়েছেন। যেমন- ইতিহাসবিদ এভিয়েযার টাকার (Aviezer Tucker) সঠিক ইতিহাস জানার জন্য কিছু শর্ত প্রদান করেছেন। সেগুলো হলো:
(১) জ্ঞানের ব্যাপারে ইতিহাসবিদদের মাঝে ঐকমত্য।
(২) ঐকমত্য হবে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ইতিহাসবিদদের মাঝে। অর্থাৎ তারা রাজনৈতিক মতামত বা দার্শনিক মতাদর্শের দিক থেকে ভিন্ন হবে। এভাবে নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে যে, একই আদর্শের অনুসারী হওয়ার কারণে তারা ঐকমত্য পোষণ করেনি।
(৩) ইতিহাসবিদদের একটা বড় সংখ্যা এই ঐকমত্যে অংশ নিবে।²⁰³

কিন্তু ইতিহাসের সত্যতার প্রশ্নে কী হবে? এটা কি প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের থেকে ভিন্ন হবে? আমরা এখানে মেনে নিব যে, একজন বিজ্ঞানী যত বৈচিত্র্য সহকারে বিভিন্ন ঘটনা পর্যবেক্ষণ করবে, তার জন্য নিরপেক্ষতা ও সত্যতা থেকে দূরে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি হবে। পদার্থবিজ্ঞান বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য অনুমিত তথ্যে পূর্ণ। পাশাপাশি থাকা প্যারাডাইমের সংখ্যা অনেক। অধিকন্তু একটা নির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণের ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য সম্ভাব্য অনেক তত্ত্ব বিদ্যমান। সুতরাং নিরপেক্ষতা থেকে দূরে থাকার সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু ইতিহাসে অনুধাবন করার জাল ততটা সুবিস্তৃত নয়, ফলে একজন আধুনিক ইতিহাসবিদ সরাসরি টেক্সটে প্রবেশ করে এবং সেটার লেখকের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রসঙ্গের খোঁজ করে। এর মাধ্যমে সে কথকের বক্তব্যের অর্থ বুঝতে পারে। পদার্থবিজ্ঞান ও ইতিহাসের মাঝে পার্থক্য জানা যায় ইতিহাসের ব্যাপারে খুব প্রসিদ্ধ একটা সমস্যার জবাবে, যেটা হলো ইতিহাসের পাতায় থাকা অতীত ঘটনাবলির পুনরাবৃত্তি হওয়ার অসম্ভাব্যতা। পুনরাবৃত্তি ঘটার সক্ষমতা সাধারণত বিজ্ঞানের থাকে। কারণ প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বেশ কিছু পরীক্ষণ ও অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে একটা নির্দিষ্ট পরিবর্তনশীল বিষয়ের প্রভাবক নির্ণয়ে কিছু নির্দিষ্ট পরিবর্তনশীল উপাদানের প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। (আমরা 'সাধারণত' বললাম কেননা বিজ্ঞানের কিছু বিষয় পুনরায় ঘটে না। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যে সকল বিষয়ে গবেষণা চালায়, সেগুলো তারা নিয়ন্ত্রণ করে না। অনুরূপ অবস্থা ভূতত্ত্ববিদদেরও। তারা যে সকল বিষয়কে গুরুত্ব দেয়, সেগুলোর মাঝে অনেকগুলো পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষণের সম্ভাবনা রাখে না)²⁰⁴ অন্যদিকে ইতিহাসে পুনরাবৃত্তির সুযোগ নেই। কিন্তু 'একজন দক্ষ ইতিহাসবিদ তার পরীক্ষণের যথার্থতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অতীতের ঘটনাবলি বারংবার স্মরণ করতে পারে না, যেমনটা একজন বিজ্ঞানী পুনরায় যাচাই করার লক্ষ্যে বিভিন্ন পরীক্ষণে এমনটা করে থাকে। তবে সেটা দুর্বলতার কোনো উপাদান নয়, বরং শক্তিমত্তার উপাদান; যা ইতিহাসকে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান থেকে আলাদা করে। কারণ দক্ষ ইতিহাসবিদ মৃত অতীতের বাস্তবতাকে স্বতন্ত্রভাবে খুঁজে। অন্যদিকে বিজ্ঞানী যেকোনো ঘটনার প্রকৃতির ব্যাপারে এমন কিছু প্রশ্ন দাঁড় করায়, যেগুলো সবসময় সে যা কিছু প্রমাণ করতে ইচ্ছুক তার সাথে মিলে যায়। তার এ সকল পরীক্ষণের লক্ষ্য থাকে ঈপ্সিত বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস অর্জন অথবা দৃঢ়ভাবে নাকচ। ... সুতরাং প্রাকৃতিক বিজ্ঞান একটা কৃত্রিম কাঠামো, কেননা সেটা প্রকৃতির বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কৃত্রিম উপস্থিত বিষয় এবং গৌণ উপাদান দিয়ে যাচাই করে থাকে।'²⁰⁵

উপর্যুক্ত বক্তব্য অনুযায়ী আমরা বলব, ইতিহাস যতটা কাঠামোগত শাস্ত্র, তার চাইতে উদঘাটনমূলক শাস্ত্র।
তবে বলা হতে পারে 'মানবিক বিদ্যা' হিসেবে ইতিহাসে পক্ষপাতিত্ব বিজ্ঞানের যেকোনো শাস্ত্রে বিদ্যমান পক্ষপাতিত্ব থেকে বৃহৎ। আমরা সেটা মেনেও নিব। কিন্তু তার অর্থ এটা নয় যে, ইতিহাসের সাথে জড়িত সকল ব্যবহারিক শাস্ত্রে পক্ষপাতিত্বের মাত্রা সমান। স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, ইতিহাসকে এক প্রকার অনুধাবন আর ইতিহাসকে এক প্রকার নথিপত্র হিসেবে দেখা—এ দুটি বিষয় আমাদের আলাদা করতে হবে। কারণ ইতিহাসচর্চার সত্যতা নিয়ে সামগ্রিকভাবে বলা বক্তব্য বিভ্রান্তিকর। মৌখিক বর্ণনার আধুনিক ইতিহাস অনুযায়ী একটা নির্দিষ্ট ঘটনা যে প্রজন্ম শুনেছে সে প্রজন্ম অথবা তৎপরবর্তী প্রজন্মের থেকে প্রাপ্ত তথ্যের (যারা সরাসরি শোনেনি কিন্তু পূর্বের প্রজন্ম থেকে শুনেছে) ব্যাপারে সঠিক ঐতিহাসিক জ্ঞানে পৌঁছানোর দুটি ধাপ রয়েছে। প্রথম ধাপ হলো তাদের বক্তব্যগুলোর অডিও রেকর্ড সংগ্রহ। দ্বিতীয় ধাপ হলো সেই বক্তব্যগুলো অনুধাবন ও সেগুলোর মাঝে সমন্বয়। নিঃসন্দেহে প্রথম ধাপে (সমন্বয়) কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে (অনুধাবন) পক্ষপাতিত্ব আছে। যে বইগুলো ইতিহাসকে জ্ঞান হিসেবে মেনে নেওয়ার পক্ষে যুক্তি পেশ করে, সেগুলো অনুধাবনের এই ধাপের ক্ষেত্রেই ইতিহাসের পক্ষ নেয়। কারণ প্রথম ধাপে মানবীয় অনুধাবনের জাল পাতার কোনো সুযোগ নেই।

ইলমুল হাদীস তথা হাদীসশাস্ত্র পদ্ধতিগতভাবে নথিপত্রের মাধ্যমে সংকলিত ইতিহাসের অধীন, আর এটা দুটি বিষয়ের অধীন:

(১) সকল বর্ণনাকে সংরক্ষণ (আমল করা নয়) করা। আর যে সকল বর্ণনাকে দুর্বল বলার ব্যাপারে ঐকমত্য আছে বা মুহাদ্দিসরা দুর্বলতার বিষয়টা প্রাধান্য দিয়েছে সেগুলোকে মুছে না ফেলা। কেননা 'বাস্তবতার ব্যাপারে আমরা যে ঐতিহাসিক জ্ঞানই লাভ করি না কেন সেটা এই বর্ণনাসমূহের থেকে পেতে হবে। হাদীসগুলো নিয়ে খেল-তামাশা করা বা সেগুলো থেকে পছন্দমত বাছাই করার অর্থ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হারিয়ে বসা, যার কোনো বিকল্প খুঁজে পাওয়া সম্ভব না। ... মানবীয় ইতিহাসে জীবনীশাস্ত্রের সাথে জড়িত মুখস্থের মাধ্যমে সংকলিত সর্ববৃহৎ কাজ ছিল এটা। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা ও কাজ যেখানে মুসলিমদের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ, সেখানে তার জীবনীর প্রতিটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বর্ণনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ: হোক সেটা তার কথা বা কাজ। এমনকি তিনি অন্যদের যে কাজ করতে দেখে আপত্তি করেননি, সেটাও এর অন্তর্ভুক্ত।'²⁰⁶

(২) বিপুল সংখ্যক বর্ণনার মাঝে তুলনা। হাদীসের সমালোচক বর্ণনা কারীদেরকে তাদের সমকালীন বর্ণনাকারীদের সাথে তাদের যোগাযোগ ও সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন করে থাকেন। তাদের বর্ণনাকে নির্ভরযোগ্য ও দক্ষ বর্ণনাকারীদের সাথে তুলনা করেন। এছাড়া তাদের ধার্মিকতা ও মুখস্থশক্তি যাচাই করেন। অধিকন্তু বর্ণনাকারীদের সমকালীন হাদীস সমালোচকদের মূল্যায়নের উপরও নির্ভর করে থাকেন। তুলনা করাটা ইলমুল হাদীসে একটা মৌলিক উপাদান, হোক সেটা বর্ণনাসমূহের মাঝে কিংবা বর্ণনাকারীদের মাঝে। আর বর্ণনা ও বর্ণনাকারী একটি অন্যটির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, কোনো ব্যক্তির দিকে একটা টেক্সট সম্বন্ধযুক্ত করা হলে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রসঙ্গের আলোকে সেই টেক্সটের উপর সিদ্ধান্ত প্রদান এবং টাকারের উল্লিখিত সমন্বয়ের খোঁজ করার মতো কাজের তুলনায় বর্ণনাকারীদের সমালোচনা আর বর্ণনাসমূহের মাঝে তুলনা করার কাজটা সহজ। দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার উপর প্রতিষ্ঠিত এই শাস্ত্র ইতিহাসের উপর গবেষণার ক্ষেত্রে মূল্যবান সুযোগ প্রদান করেছে, যেটাকে মৌখিক ইতিহাসের পক্ষাবলম্বী যেকোনো ইতিহাসবিদ কাজে লাগাতে চাইবে। আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে এমন কিছু উল্লেখ করব যা নৃতাত্ত্বিকভাবে এই সমালোচনার অস্তিত্ব প্রমাণ করে, সেটা সাহাবীদের যুগ থেকে শুরু করে সুন্নাহ সংকলনের সময় পর্যন্ত। আর প্রাচ্যবিদরা শরয়ী টেক্সটগুলোর সাথে আচরণের ক্ষেত্রে কোনো গ্রহণযোগ্য মাপকাঠি উপস্থাপন করেনি। তবে আমাদের জন্য এখানে নিম্নের বিষয়গুলো জানা যথেষ্ট:
- হাদীসশাস্ত্র একটা বানানো শাস্ত্র।²⁰⁷ এটা ঐতিহাসিক গবেষণার একটা রূপ। কিন্তু এর বাস্তবায়নের রূপটা ব্যক্তিগত প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে; কেননা এটা একটা সংকলনমূলক কাজ, যেটা ব্যাখ্যা প্রদানের পূর্বে ঘটে থাকে; যেমনটা আধুনিক মৌখিক ইতিহাসে উপকরণ সংকলনের ক্ষেত্রে ঘটে। এখানে অনুধাবনের ক্ষেত্রে সম্মিলিত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভবের বাহিরে স্বতন্ত্র কোনো অনুধাবনের জাল নেই। বরং এটার জন্য কিছু প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়, যেগুলো বর্ণনা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আমাদের স্বাভাবিক কার্যকলাপের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়; তবে নিয়ম মাফিক।
- নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছানো বর্ণনা গ্রহণ ও তার উপর নির্ভর করা। যে বর্ণনা নির্ভরযোগ্য ও মুখস্থশক্তির অধিকারী কারো হয়ে থাকবে, আর ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ক্ষেত্রে মৌলিক জ্ঞানের বিরোধী হবে না। আবার দক্ষ বর্ণনাকারীদের বর্ণনা জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে বৈধ এমন কোনো ঘটনার সাথে সাংঘর্ষিক হবে না। এটাই মূল অবস্থা, আর মূলের বাহিরে কোনো প্রমাণ ছাড়া যাওয়া যাবে না।²⁰⁸

টিকাঃ
১৯৫. আমার বই 'নাহুয়া মানহাজিন ওয়াসফিয়্যিন লিল-ইলম' এর তৃতীয় অধ্যায় দেখুন।
১৯৬. ল্যারি লোডান, আত-তাকাদ্দুম ওয়া-মুশকিলাতুহু: নাহুয়া নাযারিয়‍্যাতিন 'আনিন-নুমুয়্যিল ইলমী, আল-মারকাযুল কওমী লিত-তর্জমা, অনুবাদ: ফাতিমা ইসমাঈল, পৃ. ৯১।
১৯৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ২২।
১৯৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৪।
১৯৯. মুন্সলো, দিরাসা তাফকিক পর্যায়ে নিয়ে যায়। সমাজ একটা নির্দিষ্ট আকৃতি বা পারিপার্শ্বিক সব কিছুর সাথে এর সম্পর্ককে একত্র করে টেবিলের সংজ্ঞায় রূপ দেয়। স্বভাবতই সম্মিলিত মাপকাঠি হলো বেদনার অনুভূতির হওয়ার সাথে সাথে কৃত আচরণ। কারণ মানুষজন এটাই প্রত্যক্ষ করে থাকে। মানুষজন যখন ব্যথা অনুভব করে, তখন তার আচরণ এবং পারিপার্শ্বিক মানুষদের আচরণ থেকে 'ব্যথা'র সংজ্ঞা শিখতে পারে। শিক্ষণের মাপকাঠি থাকে আচরণ, অনুভূতি না। আচরণই ব্যথার সংজ্ঞাকে যথাযথ ব্যবহার করার মাপকাঠি। যেমনিভাবে টেবিলের সাথে মানুষের আচরণ টেবিলকে যথাযথভাবে ব্যবহার করার মাপকাঠি।

তাই দেকার্ত যখন বলেন, আমি বহির্জগতের অস্তিত্বের ব্যাপারে কার্যত সংশয় পোষণ না করলেও তত্ত্বীয়ভাবে করি, তখন তিনি মূলত বলেন, 'আমি সংশয়ের দাবি তুলি, কিন্তু আচরণে তার কোনো প্রতিফলন থাকে না!' অর্থাৎ তিনি সংশয়ের অনুভূতির কথা বলছেন, কিন্তু সংশয়ের সংজ্ঞা বলছেন না যেটা আমরা সবাই জানি। তিনি এক বিশেষ ভাষায় কথা বলছেন যেটা বোধগম্য না, বা অন্ততপক্ষে স্ববিরোধী। তার উদাহরণ এমন মানুষের মতো যিনি বলেন, 'আমি ঈমানদার' কিন্তু ঈমানের প্রতিফলন ঘটে এমন কোনো কাজ সে করে না। সংশয় বলতে আমরা যা জানি সেটা হলো:

> এমন সংশয় যেটা পূর্ব থেকেই দৃঢ় বিশ্বাসকে অনুমিত ধরে নেয়। কারণ একটা শিশু কোনো কিছু জানার আগে অবশ্যই তাকে চারপাশের সবকিছুকে স্বীকার করে নিতে হবে। অর্থাৎ তাকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত নির্দিষ্ট বিষয় মেনে নিতে হবে এবং মেনে নেওয়ার নীতির অন্ধ অনুকরণ করতে হবে। তাহলেই বিশ্বজগত সম্পর্কে সে দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করবে। তারপর যদি কখনো তার মনে হয় যে উত্তরাধিকারসূত্রে যা জেনে এসেছে, সেটা অতিক্রম করতে হবে; তাহলে সে সেটা করতে পারে। কিন্তু বিশ্বকে চেনার আগে কিংবা শূন্য থেকে শুরু করে তার জন্য এমনটা করা সম্ভব নয়। আক্কলে শুরু থেকে যে জ্ঞান থাকে, সেটা নিয়ে সে সংশয় পোষণ করতে পারবে না (যেমন- নিজের অস্তিত্ব, বহির্জগতের অস্তিত্ব, অন্যদের আকল থাকা, যুক্তিবিদ্যার প্রারম্ভিক কিছু মূলনীতি)। দেকার্ত যেখানে মনে করেন, সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে হলে জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃঢ় বিশ্বাসের আগে মৌলিক সংশয়ের প্রয়োজন, সেখানে ভিটগেনস্টাইন বর্ণনা করেন যে, 'সংশয়ের জন্য পরীক্ষণ চালানোর সম্ভাবনা ও সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। আর পরীক্ষণের দাবি হলো এমন কিছুর অস্তিত্ব থাকা, যার উপর ইতঃপূর্বে পরীক্ষা চালানো হয়নি যা সংশয় পোষণ করা হয়নি।'¹⁸⁰ কালামবিদদের ভাষায় বললে, অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানকে শেষ পর্যন্ত আবশ্যকীয় জ্ঞানের উপর নির্ভর করতে হবে। ভিটগেনস্টাইন বলেন, 'আপনি যদি সব বিষয়ে সংশয় পোষণ করতে চান, তাহলে সংশয়ের ফলে আর কিছুই খুঁজে পাবেন না। সংশয়ের জন্য আগে দৃঢ় বিশ্বাসের অস্তিত্ব আপনাকে মেনে নিতে হবে।' তিনি আরো বলেন, 'আমাদের সংশয়গুলো মেনে নেয় যে সংশয়ের ব্যতিক্রম কিছু বিষয় আছে। এগুলো মৌলিক বিস্তৃত বিষয়ের মত যেগুলোর মাধ্যমে অন্যান্য বিষয় পরিচালিত হয়।¹⁸⁰ সুতরাং মৌলিক বা প্রাথমিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে দৃঢ় বিশ্বাসই মূল কিংবা অন্যভাবে বললে প্রাথমিক বা মৌলিক অবস্থান হলো দৃঢ় বিশ্বাস, সংশয় নয়। কারণ শুরুতেই আমরা যদি শিখতে চাই, তাহলে কিছু জিনিসের উপর সহজাত প্রবৃত্তির মাধ্যমেই বিশ্বাস করতে হবে, দলীল খুঁজতে হবে না। দার্শনিক শার্ল স্যান্ডেজ পিয়ার্স বলেন, 'পূর্ণ সংশয় থেকে আমাদের সূচনা করা সম্ভব নয়। বরং আমরা যখন দর্শন পড়া শুরু করব, তখন বাস্তবের ব্যাপারে যত পূর্ব ধারণা রাখি, সেগুলো থেকে যাত্রা শুরু করতে হবে। ... শুরুতেই পূর্ণাঙ্গ সংশয়বাদ নিছক আত্মপ্রতারণা, এটা প্রকৃত সংশয়বাদ নয়। ব্যক্তি সংশয় পোষণ করে কারণ সেটার পক্ষে তার ইতিবাচক কারণ থাকে। ... আসুন, আমরা মনে মনে যেসব বিষয়ে সংশয় পোষণ করি না, দর্শনে সেগুলোতে সংশয় পোষণ করার ভান না ধরি।¹⁸¹ এর উপর ভিত্তি করে 'ভিটগেনস্টাইন জ্ঞানের জন্য কিছু মূলনীতি থাকা দরকার এ মর্মে দেকার্তের পরবর্তী যুগে সবাই ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যে দাবি তোলে, সেটাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।' তিনি বিপরীতে এই 'অ-জ্ঞানতাত্ত্বিক বক্তব্যকে' গ্রহণ করেন।¹⁸²

> এমন সংশয় যেটার অস্তিত্ব পূর্বের কোনো বিশ্বাসকে মেনে নিতে বাধা প্রদান করে না। ভুল ও সংশয়ের সম্ভাবনার তত্ত্বীয় অস্তিত্ব আমাদের প্রাথমিক বিশ্বাসকে হুমকির মুখে ফেলে দেয় না। আর ভিটগেনস্টাইনের মতে 'আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস কোনো মাধ্যম বা অনুমোদনের উপর নির্ভর করে না। এর প্রয়োজনও নেই। সংশয়ের জন্ম কেবল মৌলিক কোনো কারণ থেকেই হতে হবে। দার্শনিকভাবে সৃষ্ট কোনো কিছু থেকে নয়।¹⁸³ আমরা 'অনেক সময়ে যৌক্তিক কারণে অসংখ্য সম্ভাবনাকে গণনার বাহিরে রাখি, যেগুলোর ব্যাপারে সূক্ষ্মভাবে দেখলে বলতে হবে যে, সেগুলো ঘটার মতো নয়; যদি আমরা যা জানার দাবি করি তা বাস্তবে জেনেই থাকি।' দেকার্তের স্বপ্নের যুক্তির উপর এটা প্রয়োগ করলে বলতে হবে, মূল অবস্থা হলো এটা মেনে নেয়া যে আমি স্বপ্নে আছি। বিভিন্ন তত্ত্বীয় সমস্যার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রত্যেকটা সংশয়ের সাথে এমন তত্ত্বীয় আচরণ করার অসম্ভাব্যতা ব্যক্ত করে ইবন তাইমিয়াহ বলেন, 'কেউ যদি বলে, এই জ্ঞান (প্রাথমিক ও মৌলিক জ্ঞান) বিষয়গুলোর বিপরীতে কূটতর্কের মাধ্যমে যে সকল যুক্তি দাঁড় করানো হয় সেগুলোর জবাব না দিলে এগুলো টিকবে না; তাহলে কারো কাছে কোনো কিছুর বিন্দুমাত্র জ্ঞান টিকে থাকবে না। কারণ মানুষের মনে কূটতর্কের কারণে যে সকল যুক্তি উপস্থিত হয়, সেগুলোর কোনো শেষ নেই।¹⁸⁴

> প্রায়োগিক वैधता পায় কিন্তু দার্শনিকভাবে পায় না এমন সংশয়। যে সকল মৌলিক বিশ্বাসের বিষয়গুলোতে অসুস্থতার কারণে বা খুব জোরাজুরি না করলে সংশয়ের কোনো অবকাশ থাকে না; সেগুলোর ব্যাপারে একজন ইতিহাসবিদের জন্য সংশয় পোষণ করা সম্ভব যদি তার কাছে এমন কিছু প্রকাশ পায় যেটা তাকে সন্দেহে ফেলে দেয়। একজন মুহাদ্দিস মুখস্থে পারদর্শী কোনো এক বর্ণনাকারীর বর্ণনার ব্যাপারে সংশয় পোষণ করতে পারে, যখন সে ঐ বর্ণনাকে অন্য বর্ণনার সাথে তুলনা করে। যেমন, তার চাইতে মুখস্থে আরো দক্ষ কারো বর্ণনা। এই জ্ঞানতাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক সংশয় আমাদের স্বাভাবিক সংশয়ের মতো। আমরা যখন কোনো মানুষের সাথে কথা বলি তখন তার কথার সত্যতার ব্যাপারে সংশয় পোষণ করতে পারি, যদি প্রাসঙ্গিক কোনো আলামত পাই। ভিটগেনস্টাইন বলেন, 'এটা হলো কল্পনা বা অনুমান, যাকে অন্যভাবে প্রকাশ করতে হবে।' কারণ দেকার্ত কর্তৃক উপস্থাপিত 'ব্যবহারিক দিক থেকে বিচ্ছিন্ন ও তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি'¹⁸⁵ কল্পনা করা সম্ভব নয়।

সারকথা হলো, দেকার্তের পর থেকে জ্ঞানের তত্ত্বগুলো (যেমন: সংশয়বাদ) সমাজ এবং সামাজিক প্রয়োগের দিকগুলোর প্রাধান্য উপেক্ষা করে যায়। সেগুলো মনে করে জ্ঞান হচ্ছে, 'একজন জ্ঞানী ব্যক্তির নিজের ব্যাপারে প্রদত্ত নির্ভরযোগ্যতার প্রক্রিয়া। আমি যখন এই প্রক্রিয়ার অধিকারী হব, তখন আমি (জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে) জানব যে আমি এটার মালিক।¹⁸⁶ আর আমাদের বিবরণমূলক পদ্ধতি মৌলিক তথা প্রাথমিক জ্ঞানের ব্যাপারে উত্থাপিত দার্শনিক প্রশ্নগুলোর জবাব দেয় না। মানুষজন যা জানে, সেটাকে প্রকাশ করার মাধ্যমে আমরা সে সকল দার্শনিক প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দিই। অর্থাৎ মানুষের স্বাভাবিক কার্যক্রমের বিবরণ দেওয়ার মাধ্যমে। যার মাঝে রয়েছে মানুষদের দ্বারা মৌলিক জ্ঞানের অস্তিত্ব স্বীকার করা। এটা তুলে ধরা বা প্রকাশ করার মাধ্যমে একজন দার্শনিক সম্মিলিত ইন্দ্রিয়ের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উত্থাপন করে, তার উপযুক্ত জবাব প্রদান করা হয়। ভিটগেনস্টাইন বলেন, 'দার্শনিক সমস্যার জন্য (মানুষদের) সম্মিলিত ইন্দ্রিয়ের পক্ষ থেকে কোনো জবাব নেই। একজন মানুষের জন্য সম্মিলিত ইন্দ্রিয়ের বিপক্ষে দার্শনিকদের সব আক্রমণের মোকাবেলা করার উপায় হলো এমন কিছু উপস্থাপন করা, যেটা দেখলে তারা এই সম্মিলিত ইন্দ্রিয়ের উপর আক্রমণে উদ্বুদ্ধ হবে।¹⁸⁷

উপর্যুক্ত বিবরণের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে সামাজিক ও পরস্পরের অংশগ্রহণমূলক জ্ঞান ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী হয়, যখন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহু মানুষের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যৌক্তিকভাবে দেখলে জ্ঞানের মূলনীতিসমূহের ব্যাপারে 'দৃঢ় বিশ্বাস' সংশয়ের পূর্বে অবস্থান করে, অর্থাৎ যে মৌলিক জ্ঞান সকল মানুষ জানে সেটার ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস। আর জ্ঞানতাত্ত্বিক সংশয়কে প্রায়োগিক দৃঢ় বিশ্বাস দুর্বল করে দেয়।

পূর্বের বক্তব্যগুলো প্রয়োগ করে বলব, ইসলামী সমাজে আমরা দেখতে পাই একজন মুসলিম কিছু মৌলিক জ্ঞান ধারণ করে। যেমন- আমাদের বইয়ের বিষয়বস্তু হলো নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ প্রমাণ করা। আমাদের কাছে যে সকল বর্ণনা পৌঁছেছে, সেগুলোর সমষ্টি সুন্নাহকে তুলে ধরে। আর কোন কোন বর্ণনা গ্রহণযোগ্য বা প্রত্যাখ্যাত, সেগুলো নির্ণয়ের ক্ষেত্রে হাদীসের আলেমদের বক্তব্য চূড়ান্ত। বর্ণনাগুলো যাচাই করার সূক্ষ্ম মাপকাঠি আছে। এই জ্ঞান একজন মুসলিম 'অ-জ্ঞানতাত্ত্বিক' পদ্ধতিতে অর্জন করে। কেবল একটা মুসলিম সমাজে জন্মগ্রহণ বা বেড়ে ওঠার মাধ্যমে সে এই জ্ঞানের অধিকারী হয়। দলীল-নির্ভর জ্ঞানের চাইতে এই জ্ঞান তার রক্তে-মাংসে আরো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। উপর্যুক্ত বক্তব্য অনুযায়ী এই জ্ঞানের স্বীকৃতি প্রদান করা স্বাভাবিকভাবেই যুক্তিযুক্ত। এ ধরনের জ্ঞান মেনে নিতে জ্ঞানতাত্ত্বিক কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়।¹⁸⁸

টিকাঃ
১৫২. Kazmi, Yedullah, Faith and Knowledge in Islam: An Essay in philosophy of religion. Islamic Studies, Vol. 38, No, 4 (1999) pp. 503-534.
১৫৩. Leslie Stevenson, Why Believe What People Say? Sunthese Vol. 94, No. 3 (Mar., 1993), pp. 429-451.
১৫৪. লুসিয়ান গোল্ডম্যান, আল-উলুম আল-ইন্সানিয়্যা ওয়াল-ফালসাফা, আল-মাজলিসুল আ'লা লিস-সাক্বাফা, অনুবাদ: ইউসুফ আল-আনত্বাকী, পৃ. ৫২।
১৫৫. প্যাট্রিক হিলি, সুয়ারুল মা'রিফাহ, পৃ. ৪৯।
১৫৬. রিচার্ড শাখত, রুয়াদুল ফালসাফাহ আল-হাসীসাহ, পৃ. ১৭।
১৫৭. Rudd, Anthony, Expressing the World: Skepticism, Wittgenstein, and Heidegger. Chicago: Open Court, 2003, p. 56.
১৫৮. আব্দুর রহমান বাদাওরী, মাউসুরাতুল ফালসাফাহ, হাইডেগার অধ্যায়।
১৫৯. প্রাগুক্ত।
১৬০. সাফা আব্দুস সালাম জাফর, আল-উজুদুল হাকীকী ইন্দা মার্তিন হাইডেগার, মুনশাআতুল মা'আরেফ, পৃ. ১৮৭।
১৬১. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯১।
১৬২. Rudd, Anthony, Expressing the World, 2003, p. 59..
১৬৩. হাইডেগার, আল-কাইনুনা ওয়ায-যামান, দারুল কুতুবিল জাদীদ আল-মুত্তাহিদাহ, অনুবাদ, ভূমিকা ও টীকা: ফাতহী আল-মিসকীনী, পৃ. ১৪৫।
১৬৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪১।
১৬৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৪।
১৬৬. হায়াত খালফাওয়ী, মাফস্থমুল হাকীকাহ ইন্দা মার্টিন হাইডেগার, মিন্ডাক্টরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মাস্টার্স থিসিস, পৃ. ৫৬।
১৬৭. মুহাম্মাদ আশ-শাইখ, নাকদুল হাদাসাহ ফী ফিকরি হাইডেগার, আশ-শাবাকাতুল আরাবিয়্যা লিল-আবহাসি ওয়ান-নাশর, ২০০৮, পৃ. ৪৭০।
১৬৮. হাইডেগার, আল-কাইনুনা ওয়ায-যামান, পৃ. ১৫৬।
১৬৯. Rudd, Anthony, Expressing the World, 2003, p. 57.
১৭০. প্রাগুক্ত, পৃ. ৬০।
১৭১. হাইডেগার, আল-কাইনুনা ওয়ায-যামান, পৃ. ৩৮৩।
১৭২. Rudd, Anthony, Expressing the world, 2003, p. 65.
১৭৩. কাইস মাদী, আল-মা'রিফাতুত তারীখিয়্যা ফিল-গার্ব, পৃ. ৩৫-৩৬।
১৭৪. গোল্ডম্যান, আল-উলুম আল-ইনসানিয়‍্যা ওয়াল-ফালসাফাহ, পৃ. ৫৩-৫৪।
১৭৫. Rudd, Anthony, Expressing the World, 2003, p. 59.
১৭৬. গোল্ডম্যান, আল-উলুম আল-ইনসানিয়্যা ওয়াল-ফালসাফাহ, পৃ. ৫৩।
১৭৭. যাকী নাজীব মাহমুদ, বারট্রান্ড রাসেল, দারুল মা'আরেক, পৃ. ৬৭।
১৭৮. হানী সুজা, ভিটগেনস্টাইন, আল-মারকাযুল কওমী লিত-তর্জমা, আফাক লিনাশর ওয়াত-তাওযী, অনুবাদ: সালাহ ইসমাইল, পৃ. ১৬১।
১৭৯. মাহমুদ যাইদান, নাযারিয়্যাতুল মারেফা ইন্দা মুফাকিরিল ইসলাম ওয়া-ফালাসিফাতিল গারবিল মুয়াসিরীন, মাকতাবাতুল মুতানাব্বী, পৃ. ১১৫।
১৮০. অ্যান্ডি হ্যামিল্টন, ভিটগেনস্টাইন ওয়াফিল ইয়াক্বীন, ইবনুন নাদীম ওয়া-দারুর রাওয়াফেদ, ২০১৯, অনুবাদ: মুস্তফা সামীর, পৃ. ৩১২।
১৮১. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৪।
১৮২. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮৭।
১৮৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৪।
১৮৪. ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল 'আক্বলি ওয়ান-নাক্কল, তাহকীক: মুহাম্মাদ রাশাদ সালেম (৫/২৫৪)।
১৮৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩০।
১৮৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৭।
১৮৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫৩।
১৮৮. তবে কিছু অমুসলিমদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত সমস্যা আছে। স্বাভাবিকভাবেই এই মৌলিক জ্ঞান তাদের কাছে স্বীকৃত বিষয় হবে না। বরং এগুলো শুধুই তত্ত্ব। তাই আমরা চতুর্থ অধ্যায় রেখেছি যেন সেখানে প্রাচ্যবিদদের উত্থাপিত মৌলিক অভিযোগগুলোর খণ্ডন করা যায়। আমরা আবারও বলছি, যে মুসলিম ঐ সকল সংশয় পড়ে না বা খণ্ডনও পড়ে না, স্বাভাবিকভাবেই মৌলিক জ্ঞানের স্বীকৃতি প্রদান (অ-জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে) করে, মুসলিম হিসেবে তার অবস্থান বৈধ এবং জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে সেটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কিছু নেই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00