📄 দ্বিতীয় অধ্যায়
আমরা দেখতে পাই কালামবিদ ও উসূলবিদ আলেমরা সবাই একমত যে, খবরে আহাদ দৃঢ় বিশ্বাসের ফায়দা দেয় না। সুতরাং এর মাধ্যমে আকীদা সাব্যস্ত করা যায় না। মুহাক্কিক আলেমরা মনে করেন এটা আবশ্যক বিষয়, যেটার কোনো কিছু নিয়ে কারো মতভেদ করা ঠিক নয়। আর যারা বলে ‘খবরে আহাদ জ্ঞানের ফায়দা দেয়' তাদের বক্তব্যের ব্যাখ্যায় তারা (আলেমগণ) বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য সম্ভাবনার অর্থে জ্ঞান অথবা আমল করার আবশ্য কতার জ্ঞান।
- মাহমুদ শালতুত
ইতিহাসশাস্ত্রে মতভেদপূর্ণ বিষয়গুলো জ্ঞানের বিষয়, যা জ্ঞানের সংজ্ঞা নির্ধারণের সাথে জড়িত। বর্ণনার নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ইলমুল কালাম এবং ইসলামী ফিকহের উসূলের কার্যক্রমে এটা স্পষ্ট। বর্ণনা সম্পর্কে প্রতিটা আলোচনায় আমরা দেখতে পাই জ্ঞানকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে: স্বতঃসিদ্ধ জ্ঞান ও অর্জিত জ্ঞান। তারপর খবরে আহাদের নির্ভরযোগ্যতা এবং এটা জ্ঞানের ফায়দা দিতে কতটা সক্ষম সেটা নিয়ে প্রসিদ্ধ মতভেদ দৃশ্যমান হয়। আমরা এই পরিচ্ছেদে যেটা করেছি সেটা হলো, মুসলিম কালামবিদদের দৃষ্টিকোণ থেকে জ্ঞানের সংজ্ঞা উপস্থাপন করেছি এবং এই তত্ত্বীয় দিকের উপর ভিত্তি করে তারা বর্ণনাকে যে ভাগে বিভক্ত করেছে তা তুলে ধরেছি。
ফিকহ এবং উসূলুল ফিকহের সম্পর্ক, ইতিহাস ও ইতিহাসের দর্শনের সম্পর্কের মতো। স্বাভাবিকভাবেই ফিকহ এর আগমন উসূলের আগে হয়েছে। শুরুতে তাবেয়ীরা সাহাবীদের পথে হেঁটেছিল। আল্লাহর কিতাব ও নবীজীর সুন্নাহর পাশাপাশি ইজতিহাদের ভিত প্রতিষ্ঠায় তারা সাহাবীদের ফতোয়াকে গ্রহণ করেছিল। তাই তাদের এমন কোনো মূলনীতির প্রয়োজন পড়েনি, যেটার উপর ভিত্তি করে শরয়ী উৎস থেকে ফিকহী বিধি-বিধান উদঘাটন করার প্রয়োজন পড়বে। কারণ শরয়ী উৎসগুলো আরবী, আর তারাও আরব। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা বিস্তৃত হওয়ার ফলে আরব-অনারবের মাঝে যখন মিশ্রণ হলো, তখন আরবী ভাষার বিশুদ্ধতা বিনষ্ট হয়ে গেল। শরয়ী বক্তব্য বোঝার ক্ষেত্রে ধারণার উপর ভিত্তি করে ব্যাখ্যা বেড়ে গেল। আহলুল হাদীসের ও আহলুর রায়ের মাঝে দ্বন্দ্ব জোরদার হলো। মুজতাহিদরা দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়ল। সে সময়টা দলীল-প্রমাণ উপস্থাপনের এক সুসংহত পদ্ধতির প্রয়োজন দেখা দিল। এমন সময়ে এসে দ্বিতীয় হিজরী শতকের শেষার্ধে ইমাম শাফেয়ীর হাতে উসূলুল ফিকহের ভিত স্থাপিত হলো। ইমাম শাফেয়ীর ‘আর-রিসালাহ’ এবং তার ফিকহী গ্রন্থগুলো ফিকহের ক্ষেত্রে সালাফের পন্থার অনুসরণের নমুনা। মদীনার ফিকহ, ইরাকের ফিকহ, আরবের লোকজন, আরবী ভাষা, আছারের জ্ঞান- সবকিছুর সমন্বয় ঘটার কারণে ইমাম শাফেয়ী সকল ফিকহী উপাদান থেকে উসূলের একটা তত্ত্বীয় রূপরেখা দাঁড় করাতে পেরেছিলেন। যেমন- হাদীসের বর্ণনাসমূহের ক্ষেত্রে নবীজীর সুন্নাহ নিঃসন্দেহে উত্তম প্রজন্মগুলোতে প্রমাণ হিসেবে গণ্য হতো (যেমনটা আমরা চতুর্থ অধ্যায়ে নৃতাত্ত্বিকভাবে প্রমাণ দিব)। সুন্নাহ জানার উৎস ছিল আমল এবং সঠিক সনদ। কিন্তু প্রথম প্রথম খারেজী-জাহমীসহ বিভিন্ন কালামী ফের্কার উত্থান ঘটার পর যখন কেউ কেউ পুরোপুরি আছার প্রত্যাখ্যান করা আর কেউ কেউ আছার গ্রহণ করার ক্ষেত্রে মাপকাঠি নিয়ে মতভেদ করা শুরু করল, তখন আহলুল হাদীসের পন্থা অনুযায়ী হাদীসের গ্রহণযোগ্যতার পক্ষে বুদ্ধিভিত্তিক যুক্তি প্রদান করা জরুরী হয়ে পড়ল। আর সেজন্য ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ হাদীসের নির্ভরযোগ্যতার পাশাপাশি বিশেষভাবে খবরে আহাদের নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণ করে বই রচনা করেন। ইমাম শাফেয়ীই ছিলেন ইলমুল হাদীসের পক্ষে লড়াই করা সর্বপ্রথম ব্যক্তি।⁷⁹
আবু হিলাল আসকারী বলেন, মুতাযিলা মতাদর্শের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াসেল ইবন 'আত্বা (মৃ. ১৩১ খ্রি.) হলেন 'প্রথম ব্যক্তি যিনি মন্তব্য করেন, হক্ক বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানা যায়। যথা- এক. কুরআন, যে বর্ণনার ব্যাপারে সবাই একমত, দুই. আক্কলী দলীল এবং তিন, ইজমা।⁸⁰ কাযী আব্দুল জব্বার বর্ণনা করেন, 'আত্বা বলেন, 'যে বর্ণনার বর্ণনাকারীরা সবাই একত্রে বসে বানানো অসম্ভব, সেটা প্রমাণ হিসেবে গণ্য। কিন্তু যেটার ক্ষেত্রে বর্ণনাকারীর বা বর্ণনাকারীদের জন্য বানিয়ে বলা সম্ভব, সেটা প্রত্যাখ্যাত।⁸¹ মুসলিম কালামবিদদের দ্বারা 'গ্রহণযোগ্য বর্ণনার' মাপকাঠি নির্ণয়ের সবচেয়ে প্রাচীন মন্তব্য এটাই। এই মন্তব্য অনুযায়ী বর্ণনাসমূহকে মুতাওয়াতির এবং আহাদ এই দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। বাহ্যত বোঝা যায় যে, সর্বপ্রথম এই বিভাজন করা হয় অমুসলিমদের সামনে নবুওয়ত এবং মুজিযা প্রমাণ করার ক্ষেত্রে।⁸² কিন্তু ইমাম শাফেয়ীর (২০৪ হি.) সময়ে কিছু কালামবিদ এগুলোকে নবীজীর হাদীসের উপর প্রয়োগের চেষ্টা করে। যদিও এর দ্বারা তৎকালীন কালামবিদদের লক্ষ্য (সরাসরি) সুন্নাহ অস্বীকার করা ছিল না। বরং তারা হাদীস যাচাইয়ের ঐতিহাসিক পদ্ধতির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছিল, যেমনটা চতুর্থ অধ্যায়ে আসবে।
ক) ইমাম শাফেয়ী হাদীস-নির্ভর পদ্ধতির উপর উত্থাপিত আপত্তিগুলোর খণ্ডনে ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিভিত্তিক নানা যুক্তির সহায়তা নেন।
ঐতিহাসিক যুক্তি ছিল এই যে, মুসলিমরা শরীয়তের এমন বহু বিধি-বিধান জানে, যেগুলো সাহাবীরা সরাসরি নবীজী থেকে দেখে শেখেনি, বরং শুনে বিশ্বাস করে অন্যদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। এর পক্ষে তিনি অনেকগুলো উদাহরণ পেশ করেন। তন্মধ্যে আছে, কিবলা পরিবর্তনের ঘটনা। সাহাবীরা একজনের বর্ণনার উপর ভিত্তি করে (নতুন) কাবার দিকে ফিরে যান। “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুকে নবম হিজরী শতকে হজের দায়িত্বে প্রেরণ করেন। সে বছর বহু জাতি-গোষ্ঠীর লোকজন হজে আসে। আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেন তাদের যাবতীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য।” “রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাত্র একজনকে পাঠান, কেননা তার মাধ্যমেই প্রেরিত ব্যক্তির কাছে প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।” যে সাহাবী এমন বর্ণনা শুনতে পান, তিনি কখনো এটা বলেননি, "আপনি মাত্র একজন। আল্লাহর রাসূল আমাদেরকে যেটা বলেননি, সেটা আপনি আমাদের কাছে চাইতে পারেন না।"⁸³
তাছাড়া ইমাম শাফেয়ী নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে প্রসিদ্ধ তাবেয়ী ও তাবে তাবেয়ীদের বিভিন্ন কাজ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। “তারা সবাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একজনের মাধ্যমে প্রাপ্ত সংবাদকে দৃঢ়ভাবে সাব্যস্ত করতেন, সেটা মেনে নিতেন, সেটার মাধ্যমে ফতোয়া দিতেন। উপরের থেকে এমন একজনের বর্ণনা তারা গ্রহণ করতেন, আবার তাদের নিচেও একজনের বর্ণনাকে গ্রহণ করে নেওয়া হত। কারো জন্য যদি এটা বলা বৈধ হয় যে, প্রাচীন-বর্তমান সব সময় মুসলিমরা খবরে ওয়াহেদকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা এবং সেটাকে চূড়ান্ত বলে মেনে নেয়ার বিষয়ে একমত ছিলেন- তাহলে আমার জন্য এমনটা বলা বৈধ হতো। কিন্তু আমি বলব, আমার জানা মতে মুসলিম ফকীহরা খবরে ওয়াহেদকে প্রমাণ হিসেবে মেনে নিতে কোনো মতভেদ করেননি।⁸⁴ ঐতিহাসিক যুক্তিতে আরো অন্তর্ভুক্ত হয় খবরে ওয়াহেদের গ্রহণযোগ্যতার পক্ষে ইমাম শাফেয়ী প্রদত্ত সকল নকলী দলীল।
ইমাম শাফেয়ী উত্থাপিত আক্বলী (বুদ্ধিভিত্তিক) দলীল হলো, আল্লাহ মুসলিমদের জন্য তার নবীর অনুসরণ আবশ্যক করেছেন। এতে অন্তর্ভুক্ত হবে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীরা এবং তৎপরবর্তী যত মানুষ তাকে দেখেনি তারা সবাই। এদিকে তার সুন্নাহ জানার একমাত্র উপায় হলো হাদীসের বর্ণনাসমূহ। সেগুলো গ্রহণ না করলে আমাদের জন্য নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ সম্ভব না। আর যেহেতু ফলাফল (অনুসরণের অসাম্ভব্যতা) বাতিল, সেহেতু কারণ (বর্ণনাসমূহ প্রত্যাখ্যান করা)ও বাতিল হবে। এক্ষেত্রে সঠিক বিকল্প হবে বিশুদ্ধ বর্ণনা যাচাইয়ের সঠিক মাপকাঠি প্রণয়ন করা। সেই মাপকাঠিগুলো কী কী?
প্রথমেই ইমাম শাফেয়ী তার দৃষ্টিকোণ থেকে জ্ঞানের সংজ্ঞা প্রদান করে বলেন, 'জ্ঞানের কয়েকটা রকম আছে। একটা হলো বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় দিক ব্যাপ্ত করে জানা। আরেকটা হলো বাহ্যিক দিক জানা। উভয় দিক ব্যাপ্ত করে জানার নমুনা হলো আল্লাহর বাণী এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমন সুন্নাহ যা বহু মানুষ বহু মানুষ থেকে বর্ণনা করেছে। এই দুই পন্থার মাধ্যমেই হালালকে হালাল এবং হারামকে হারাম বলা হয়। এটা কারো জন্য না জানা বা সংশয়ে পড়া সম্ভব নয়। আর বিশেষ ব্যক্তিদের থেকে বিশেষ ব্যক্তিদের বর্ণনা শুধু আলেমরা জানেন। এর দায়িত্ব অন্যদের দেওয়া হয়নি। এটা সব আলেমের মাঝে বা কিছু আলেমের মাঝে থাকবে। নির্ভরযোগ্য বিশেষ ব্যক্তির মাধ্যমে সেই বর্ণনা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছাবে। যেমন- আমরা দুইজন সাক্ষীর মাধ্যমে কাউকে হত্যার বিধান দিই। এটা বাহ্যত সত্য, যদিও দুই সাক্ষীর ভুল-ত্রুটি থাকতে পারে।⁸⁵ খবরে ওয়াহেদের ব্যাপারে শাফেয়ী আরো কিছু শর্ত প্রদান করেন (যেগুলো তৎকালীন আহলুল হাদীসের মাঝে কার্যত প্রয়োগ ও বাস্তবায়িত হত) যাতে করে একটা বর্ণনা সঠিক হয় এবং সেটা দিয়ে প্রমাণ পেশ করা যায়। সে রকম কিছু শর্ত হলো:
১. বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য হবে, কথাবার্তার ক্ষেত্রে সত্যবাদিতার জন্য প্রসিদ্ধ হতে হবে।
২. বর্ণিত বিষয়টা বর্ণনাকারীকে বুঝতে হবে। হাদীসকে অর্থ দিয়ে বর্ণনা করলে জানতে হবে হাদীসের অর্থ বদলে যায় এমন শব্দাবলির বিবরণ। যদি না জানে কীসের মাধ্যমে অর্থ বদলে যায়, তাহলে হাদীস যেমন শুনেছে তেমনিভাবে হুবহু বর্ণনা করবে।
৩. স্মৃতি থেকে বর্ণনা করলে অবশ্যই মুখস্থ হতে হবে, আর নিজের লিখিত গ্রন্থ থেকে বর্ণনা করলে সেই গ্রন্থ মুখস্থে থাকতে হবে।
৪. হাফেযদের সাথে একই বিষয় বর্ণনা করলে তাদের বর্ণনার থেকে তার বর্ণনা ভিন্ন হওয়া যাবে না। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এমন কিছু বর্ণনা করবে না যেটা নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীরা অন্যভাবে বর্ণনা করে।
৫. মুদাল্লিস হবে না, অর্থাৎ যার সাক্ষাৎ পেয়েছে তার থেকে এমন কিছু বর্ণনা করবে না যা সে শোনেনি।
৬. সকল বর্ণনাকারীর মাঝে এই বৈশিষ্ট্যগুলো থাকতে হবে।
৭. নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন বর্ণনা হতে হবে।⁸⁶
আমরা দেখতে পাচ্ছি ইমাম শাফেয়ী ঐ সকল বর্ণনার জন্য কোনো শর্তারোপ করেননি যেগুলো বহু মানুষ বহু মানুষ থেকে বর্ণনা করে। কিন্তু সেগুলোর তিনি শুধু উদাহরণ দিয়েছেন। যেমন- যোহর চার রাকাত বা মদ হারাম। আর ইমাম শাফেয়ীর কাছে জ্ঞানের মাঝে অন্তর্ভুক্ত হয় দৃঢ় বিশ্বাস আনার মতো বিষয় এবং ভুল হওয়ার সম্ভাবনা রাখে এমন বিষয়, যেমন: খবরে ওয়াহেদ। (এ অংশটা নিয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব বইয়ের শেষভাগে, যেখানে আরবদের দৃষ্টিতে জ্ঞানের সংজ্ঞা বর্ণনা করব।)
খ) শাফেয়ীর পর থেকে উসূলবিদরা খবরকে মুতাওয়াতির ও আহাদে বিভক্ত করে চলেন। তারা মনে করেন 'মুতাওয়াতির' হলো ইমাম শাফেয়ী যেটার নাম দিয়েছেন 'বহু মানুষ থেকে বহু মানুষের বর্ণনা'। আর 'খবরে আহাদ' হলো যেটাকে তিনি নাম দিয়েছেন 'বিশেষ ব্যক্তিদের থেকে বিশেষ ব্যক্তিদের বর্ণনা'। এরপর উসূলবিদরা মুতাওয়াতিরের অনেক সংজ্ঞা দিয়েছেন যেগুলো মুতাওয়াতিরের শর্তাবলিকে ধারণ করে। আমরা তার মধ্যে একটা সংজ্ঞা উল্লেখ করছি। সেটা হলো: 'ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়ে একদল লোকের বর্ণনা, যাদের জন্য স্বাভাবিকভাবে মিথ্যার উপর ঐকমত্য হওয়া কঠিন।⁸⁷ অতিরিক্ত কিছু শর্তের ব্যাপারে মতভেদ করলেও মোটামুটি সবাই একমত যে, মুতাওয়াতির দৃঢ় বিশ্বাসের ফায়দা দেয়। 'দূরবর্তী বিভিন্ন স্থান যেমন- মক্কা, মিশর, বাগদাদ, হিন্দ ও চীন এবং বিগত জাতিসমূহ যেমন- নূহ, ইব্রাহীম, হুদ, সালেহসহ বহু জাতির অস্তিত্ব আমাদের কাছে অকাট্যভাবে প্রমাণিত। এটা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে আমরা জানিনি, আক্কলের মাধ্যমেও না। আমরা এটা জেনেছি বহু সংখ্যক বর্ণনাকারীর মাধ্যমে; সুতরাং বোঝা গেল মুতাওয়াতির জ্ঞানের ফায়দা দেয়।⁸⁸ উসূলের বইগুলো অনেক প্রাচীন অদ্ভুত মতামত উল্লেখ করেছে (যেমন- শ্রমণ, ব্রহ্ম) এমন কিছু সম্প্রদায়ের, যারা মুতাওয়াতিরের মাধ্যমে জ্ঞানের ফায়দা পাওয়ার বিষয়টা অস্বীকার করেছে। অথবা 'তারা বর্তমান যুগে দূরে অবস্থিত বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যাপারে বহু সংখ্যক বর্ণনাকারীর বর্ণনা গ্রহণ করলেও অতীত হয়ে যাওয়া জাতিসমূহের ব্যাপারে বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারীর বর্ণনাকে গ্রহণ করেনি' এবং দুটোকে ভিন্নভাবে দেখেছে। তারা প্রথমটা স্বীকার করেছে আর দ্বিতীয়টা অস্বীকার করেছে।⁸⁹ তারা প্রথমটা স্বীকার করেছে আর দ্বিতীয়টা অস্বীকার করেছে। উসুলবিদরা তাদের খণ্ডন করেছে এবং বলেছে যে স্বতঃসিদ্ধ বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক প্রত্যাখ্যাত। এই আপত্তিগুলোর জবাব উসূলবিদরা কীভাবে দিয়েছেন সেটা আমাদেরকে কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
সংক্ষেপে বললে মুতাওয়াতির বর্ণনার ব্যাপারে উসূলবিদদের জবাবগুলো ছিল এই সংশয়গুলোর বিপরীতে অবস্থিত জ্ঞানতাত্ত্বিক শর্তগুলো উপস্থাপন করা। এমন কিছু প্রসিদ্ধ সংশয় হলো:
(১) যুক্তিবিদ্যায় দৃঢ় বিশ্বাসের স্তর এবং মুতাওয়াতিরে দৃঢ় বিশ্বাসের স্তর ভিন্ন। যুক্তিবিদ্যায় দৃঢ় বিশ্বাস মুতাওয়াতিরের দৃঢ় বিশ্বাস থেকে শক্তিশালী। যে কারণে মুতাওয়াতিরের থেকে সৃষ্ট দৃঢ় বিশ্বাসে আপেক্ষিকভাবে সংশয় সৃষ্টি হয়। মুতাওয়াতির থেকে সৃষ্ট জ্ঞানের ব্যাপারে পর্যালোচনা করতে গিয়ে আমেদী বলেন, 'মুতাওয়াতিরের মাধ্যমে যদি আবশ্যকীয় জ্ঞান অর্জিত হতো, তাহলে বহু সংখ্যক বর্ণনাকারীর মাধ্যমে আমরা যে কয়েকজন রাজার অস্তিত্ব জেনেছি সেটার ব্যাপারে আমাদের জ্ঞান; আর অস্বীকৃতি ও সাব্যস্তকরণের ভিন্নতা, দুই বিপরীত বিষয় একত্র হওয়ার অসম্ভাব্যতার এবং একই দেহ উভয় স্থানে থাকার অসম্ভাব্যতার ব্যাপারে আমাদের জ্ঞান- এই দুই জ্ঞানের মাঝে স্তরের ক্ষেত্রে ভিন্নতা হতো না। কারণ আবশ্যকীয় বিষয়গুলো ভিন্ন হয় না।'⁹⁰
যিনি আপত্তি তুলেছেন, তিনি 'শক্তিশালী নিশ্চয়তার অস্তিত্ব নাকচ করেন না, যেটা অধিকাংশের মতে দৃঢ় বিশ্বাসের চাইতে আলাদা করা কঠিন। কিন্তু কথা হলো দৃঢ় বিশ্বাস অর্জিত হয়েছে নাকি হয়নি সেটা নিয়ে। দৃঢ় বিশ্বাস যে অর্জিত হয়নি, সেটার পক্ষে প্রমাণ হলো আমরা যদি 'এক হচ্ছে দুইয়ের অর্ধেক' এ কথাটা আমাদের আক্কলের সামনে পেশ করি, আবার আমাদের আক্কলের সামনে বহু সংখ্যক বর্ণনাকারীর মাধ্যমে চিকিৎসক গ্যালেন, অমুক-তমুকের অস্তিত্ব পেশ করি; তাহলে দেখতে পাব প্রথমটার ব্যাপারে যে দৃঢ় প্রত্যয় পাওয়া যাবে, দ্বিতীয়টার ব্যাপারে তেমন দৃঢ় বিশ্বাস আসবে না। এই পার্থক্য প্রমাণ করে যে, দ্বিতীয়টার বিশ্বাসে 'সম্ভাব্যতার' স্থান আছে। আর এই সম্ভাব্যতার অস্তিত্ব থাকার এটা দৃঢ় বিশ্বাসের গণ্ডির বাহিরে চলে গিয়েছে।⁹¹ উসূলবিদরা মেনে নেননি যে, 'যদি এটা আবশ্যকীয় জ্ঞানের নিশ্চয়তা দিত, তাহলে এটার সাথে অন্যান্য আবশ্যকীয় জ্ঞানের নিশ্চয়তা প্রদানকারী বিষয়ের পার্থক্য হতো না। কারণ আবশ্যকীয় জ্ঞানের বিষয়গুলো নিশ্চিতভাবে বলার ক্ষেত্রে স্তরভেদ থাকে। আর যদি মেনে নেয়া হয়, তবুও কাম্য বিষয়টা আবশ্যক হয়ে যায় না। কারণ তারতম্য থাকলে সেটা আর আবশ্যকীয় জ্ঞান দেয় না, কিন্তু তারতম্য থাকলে জ্ঞানের ফায়দা দেয় না এমনটা নয়; যেটা নিয়ে এখানে মতভেদ চলমান।⁹²
কিন্তু বাস্তবে বহু উসূলবিদ আছেন যারা আবশ্যকীয় বিষয়গুলোর মাঝে তারতম্য স্বীকার করেন না। তাই যিনি তারতম্য নাকচ করেন তাঁর জবাব হলো 'কিছু প্রতিজ্ঞা খুব বেশি ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর ধারা বেশি কল্পনায় আসে। সুতরাং আকল অন্যান্য প্রতিজ্ঞার তুলনায় কিছু প্রতিজ্ঞায় খুব বেশি অভ্যস্ত হয়ে যায়।'⁹³ অর্থাৎ স্বতঃসিদ্ধ যৌক্তিক বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস পাওয়া যায়, একইভাবে মুতাওয়াতির বর্ণনার ক্ষেত্রেও পাওয়া যায়। তারতম্য নির্ভর করে ব্যবহারের কম-বেশির উপরে। যুক্তিবিদ্যার প্রতিজ্ঞাগুলো মুতাওয়াতির বর্ণনার চাইতে বেশি ব্যবহৃত হয়। যুক্তিবিদ্যার মাধ্যমে আবশ্যকীয় জ্ঞানের নিশ্চয়তাপ্রাপ্ত প্রতিজ্ঞাসমূহের ব্যাপারে যা বলা হয়, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়ের ক্ষেত্রেও তাই বলা যায়। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়গুলো মুতাওয়াতির বর্ণনার চাইতে বেশি দৃঢ় বিশ্বাস আমাদেরকে দেয়, কেননা সেগুলো বেশি ব্যবহৃত হয়।
এই আপত্তির খণ্ডনে এটাও বলা যায় যে, মুতাওয়াতিরের সূত্রে প্রাপ্ত জ্ঞানকে এই আপত্তিকারী স্বতঃসিদ্ধ বলে গণ্য করেছে; বাস্তবে তা নয়। আপত্তি তখনই সঠিক হবে 'যখন আমরা দাবি করব যে মুতাওয়াতিরের মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান স্বতঃসিদ্ধ, কিন্তু বাস্তবে তা নয়; বরং আমরা তো শুধু স্বাভাবিক জ্ঞানের ফায়দা দেওয়ার কথা বলছি।'⁹⁴
(২) সংখ্যা কত হলে একটা বর্ণনা মুতাওয়াতির হবে? যারকাশী বলেন, মুতাওয়াতির হওয়ার জন্য সংখ্যার শর্ত হলো 'বর্ণনাকারীর পরিমাণ এত হবে যে সবার জন্য একত্র হয়ে মিথ্যা রচনা করা অসম্ভব হবে। আলামত, ঘটনা ও বর্ণনাকারীদের ভিন্নতা অনুসারে সেটা হবে। কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যায় এটাকে বেঁধে ফেলা যাবে না। বরং এতটুকু শর্ত যথেষ্ট। কেউ কেউ বলেন, তাদের সার্বিক অবস্থা এমন হবে যে তাদের মত লোকজনের দ্বারা একত্রে মিথ্যা বলা বা ভুল বলা সম্ভব না। এটা নিয়ে কোনো মতভেদ নেই। কিন্তু মতভেদ হলো, এখানে কোনো সংখ্যা শর্ত কিনা? অধিকাংশের মত হলো সংখ্যার সীমাবদ্ধতা নেই। জ্ঞান অর্জিত হওয়াটাই এখানে নির্ণায়ক। এই পরিমাণ লোকজন যখন জানাবে এবং এদের বর্ণনা যখন জ্ঞানের ফায়দা দিবে তখন আমরা বুঝব এটা মুতাওয়াতির, নতুবা নয়।'⁹⁵
(৩) একটা প্রজন্মের জন্য ভুল করা সম্ভব। অর্থাৎ যে প্রজন্ম তাদের ইন্দ্রিয় দিয়ে মূল বক্তব্য প্রদানকারীকে দেখেছে। 'কারণ হয়তো তাদের কাছে বিষয়টা ঘোলাটে লেগেছিল। অনেক সময় ইন্দ্রিয় বিভ্রান্ত করে। আল্লাহ তা'আলা যায়েদের পূর্ণ আকৃতিতে কাউকে সৃষ্টি করতে পারেন। সে দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মুতাওয়াতিরের নির্ভরযোগ্যতাও থাকে না। কারণ তারা হয়তো যায়েদের মতো কাউকে দেখে যায়েদ মনে করেছিল।' এছাড়া চোখের দেখায় ভুল 'খুবই প্রসিদ্ধ বিষয়। মানুষ কখনো স্থির বিষয়কে নড়তে দেখে, আবার নড়াচড়া করা জিনিসকে স্থির দেখে। সুতরাং বোঝা গেল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়েও সংশয়-বিভ্রান্তি স্বাভাবিক।' যদি বলা হয়, 'এটা খুব কম ঘটে।' তাহলে বলা হবে, 'কম হলেও সম্ভাব্যতা বাতিল হয় না।'⁹⁶
উক্ত মৌলিক সংশয়কে রাযী উল্লেখ করেছেন গবেষণার প্রয়োজনে। মুতাওয়াতির বর্ণনা জ্ঞানের ফায়দা দেয়- এই কথার খণ্ডনে না। যদিও তিনি এমন কিছু সংশয়ের জবাব দেওয়া সম্ভব কিনা সেটার ব্যাপারে নিজেই সন্দেহ পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, 'এই সকল আপত্তির অকাট্য জবাব তখনই দেওয়া সম্ভব হবে, যখন সূক্ষ্ম ও গভীর চিন্তা-ভাবনা চালানো হবে।'⁹⁷ কারাফী এটার জবাব দিয়ে বলেন, 'এটা যে আমার ছেলে, সেই জ্ঞানটা আমার অর্জিত হয়েছে। আমি তাকে আগে দেখেছি। এখন বুদ্ধিভিত্তিক সম্ভাবনা উপস্থাপন করে সংশয় তুললেও স্বাভাবিক অর্জিত জ্ঞানকে নাকচ করবে না।' তিনি আরো বলেন, 'স্বাভাবিক জ্ঞানকে বিভিন্ন বুদ্ধিভিত্তিক সম্ভাবনা নাকচ করে না।'⁹⁸ সুতরাং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়েও বিভ্রান্তি থাকতে পারে, এমন ধারণা 'মিথ্যায় একত্র হওয়ার অসম্ভাব্যতার' শর্তকে ভুল বোঝার ফলাফল। এই 'অসম্ভাব্যতা' বাস্তবিক, যুক্তিবিদ্যার উপর নির্ভরশীল অসম্ভাব্যতা নয়।
(৪) রাজনৈতিক কারণে এক বিপুল সম্প্রদায় মিথ্যার উপর একমত হতে পারে, সেটা শাসকের প্ররোচনায় বা হুমকিতে। জুয়াইনী এই যুক্তির খণ্ডন করেন ঐতিহাসিক আদত তথা অভ্যাসের কথা উল্লেখ করে। তিনি বলেন, 'উরফের (প্রথার) কারণে তাদের মিথ্যা সময়ের পরিক্রমায় প্রকাশিত হয়ে যাবে এবং খুব দ্রুত সত্য উন্মোচিত হয়ে যাবে।'⁹⁹ অন্যদিকে আমেদী এমন বর্ণনাকে জ্ঞান হিসেবে আখ্যায়িত করতে নারাজ। কারণ এর বর্ণনাকারীরা 'মিথ্যার সম্ভাবনা রাখে, সুতরাং এদের বর্ণনা দিয়ে জ্ঞান প্রাপ্তি অসম্ভব, কেননা একটা শর্ত অনুপস্থিত আর সেটা হলো ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে জ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে খবর প্রদান।'¹⁰⁰ এখান থেকে স্পষ্ট হলো উসুলবিদরা মুতাওয়াতির বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের ক্ষেত্রে গাণিতিক বা নিছক বুদ্ধিভিত্তিক (আক্বলী) জ্ঞানের উপর নির্ভর করার পরিবর্তে স্বাভাবিক ও জরুরী জ্ঞানের উপর নির্ভর করেছিল।
উল্লেখ্য বিষয় হলো, শ্রমণ সম্প্রদায়ের উত্থাপিত সংশয়ের খণ্ডনে জুয়াইনীর স্বতন্ত্র পদ্ধতি আছে। তিনি 'বর্ণনা' বলতে বুঝেন বহু মানুষের সম্মিলিত বর্ণনা (আভিধানিক অর্থ)। অর্থাৎ কালামবিদ্যার জ্ঞানতাত্ত্বিক নানা শর্ত ছাড়াই। জুয়াইনী বলেন, 'শ্রমণদের থেকে কেউ কেউ বর্ণনা করেন যে তাদের ভাষ্য হলো, বর্ণনা কখনো এমন স্থানে গিয়ে সমাপ্ত হয় না যেটা সত্য সম্পর্কে জ্ঞান দেয়। তাদের এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা এভাবে দেওয়া যায় যে, বর্ণনাকারীর সংখ্যা যত বেশিই হোক না কেন সেটা ততক্ষণ সত্য হবে না যতক্ষণ তাতে অন্য আলামত যুক্ত না হয়, যেমন প্রতিবন্ধকের অনুপস্থিতি।'¹⁰¹
গ. জ্ঞানতাত্ত্বিক শর্তাবলির ভিত্তিতে মুতাওয়াতির বর্ণনা যদি জ্ঞানের ফায়দা দেয় এবং এ ব্যাপারে কালামবিদরা একমত থাকে, তাহলে সেটা জ্ঞানের কোন প্রকার? এটা কি অভিজ্ঞতা-পূর্ব জ্ঞান নাকি অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান? আমেদী বলেন, 'অধিকাংশ ফকীহ এবং কালামবিদ আশআরী ও মুতাযিলা একমত যে, মুতাওয়াতির বর্ণনার মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানটা অভিজ্ঞতাপূর্ব জ্ঞান। অন্যদিকে কাবী এবং মুতাযিলাদের আলেম আবুল হুসাইন আল-বসরী ও শাফেয়ীর অনুসারী দাক্কাক মনে করেন, এটা অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান।¹⁰² অধিকাংশের মত শক্তিশালী 'কেননা যদি মুতাওয়াতিরের ব্যাপারে জ্ঞান অর্জন করা লাগত, তাহলে অনুসন্ধান করার যোগ্যতা যাদের নেই, তাদের জন্য সেটা অর্জন করা সম্ভব হতো না। যেমন- বালক এবং আম জনতা। কিন্তু নিঃসন্দেহে তাদের মাঝে এই জ্ঞান থাকে।'¹⁰³
নিরপেক্ষ বাস্তবতা সাক্ষ্য দেয় যে যুক্তিবিদ্যার মাধ্যমে চিন্তা না করে এর বাহিরে গিয়ে যারা চিন্তা করে, তারা মক্কা, শাফেয়ীসহ মুতাওয়াতির সূত্রে প্রমাণিত বহু কিছুর অস্তিত্ব স্বীকার করে। আর আত্মগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে 'প্রত্যেক বুদ্ধিমান ব্যক্তি মক্কা, বাগদাদসহ দূরবর্তী বহু স্থানের ব্যাপারে মুতাওয়াতির বর্ণনার ভিত্তিতে বিশ্বাস করে। যদিও সে পূর্ব থেকে এ ব্যাপারে বিভিন্ন শাস্ত্রের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী চিন্তা বা অনুসন্ধান না চালায়; যদি এই জ্ঞানটা অভিজ্ঞতালব্ধ হত, তাহলে তো এমনটা ঘটত না।'¹⁰⁴
মুতাওয়াতির যে 'অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের' ফায়দা দেয়, সেটার পক্ষে থাকা স্বল্প সংখ্যক ব্যক্তির যুক্তি হলো- 'দলীল প্রদানের অর্থ হলো কোনো জ্ঞান জানার মাধ্যমে অন্য জ্ঞানে পৌঁছানো। কোনো কিছুর অস্তিত্ব যখন এই ধারাবাহিকতার উপর নির্ভর করবে, তখন সেটা 'অর্জিত জ্ঞান' বলে গণ্য হবে। মুতাওয়াতির বর্ণনার সূত্রে প্রাপ্ত জ্ঞানও অভিজ্ঞতালব্ধ। কেননা আমরা এটা জেনেছি যখন বুঝেছি বর্ণনাকারীর নিজে মত প্রদান করেননি, বরং এমন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়ে মত প্রদান করেছে যা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। আবার তাকে মিথ্যার দিকে ধাবিত করবে এমন কোনো প্রভাবক ছিল না; সুতরাং এটা মিথ্যা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আর যেহেতু মিথ্যা হবে না, সেহেতু সত্য হবে। উপর্যুক্ত কোনো পদক্ষেপে ঘাটতি থাকলে বর্ণনার সত্যতা আমরা জানতে পারতাম না। আর এভাবে জানার পদ্ধতিকে অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান হিসেবে মেনে না নিলে সেটা অর্থহীন কথা হবে।'¹⁰⁵ অর্থাৎ মুতাওয়াতির 'দলীল প্রদানের উপর নির্ভর করে।'¹⁰⁶ জুয়াইনী আবারও এই মতটাকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, 'আমি মনে করি কা'বীর মতটি প্রযোজ্য হবে কোনো একটা রাজনৈতিক অঞ্চল সাব্যস্ত করা বা নাকচ করার ক্ষেত্রে অনুসন্ধান চালানোর ক্ষেত্রে বর্ণনাকারীর আধিক্যের সময়। লোকটা তত্ত্বীয় অনুসন্ধান এবং বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণা চালানোর ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা ও ফলাফলকে গুরুত্বে নেয়নি। সে যা উল্লেখ করেছে তাই সত্য।'¹⁰⁷ এখানে যিনি মুতাওয়াতির জ্ঞানকে তত্ত্বীয় মনে করেন তিনি নাকচ করেন না যে, আম জনতা মুতাওয়াতির বর্ণনার অন্তর্ভুক্ত বিষয়কে দৃঢ়ভাবে সাব্যস্ত করে। কিন্তু তিনি বলেন যে, বর্ণনার ব্যাপারে তাদের অনুসন্ধানটা 'ভূমিকা ও মাধ্যম ব্যবহার করে নয়, বরং স্বাভাবিক কারণসমূহ বাস্তবায়িত হয় কিনা সেটা বুঝতে পারা।'¹⁰⁸ অর্থাৎ এটা যেন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়ে চোখ বুলানোর মত, জ্ঞানতাত্ত্বিক শর্তাবলি বিবেচনার মত নয়। আর আমেদী এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেননি।¹⁰⁹ মোটাদাগে সমস্যাটা হলো প্রায়োগিক দিক থেকে এখানে কোনো দলীল পেশ করা হয়নি, কিন্তু মুতাওয়াতিরের শর্ত বাস্তবায়ন করতে হলে কিছুটা অনুসন্ধান চালাতে হয়। কারণ শর্তগুলো জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে স্বভাবতই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জন করার মত বিষয়।
গাযালী চেষ্টা করেছেন জমহুরের সাথে মুতাওয়াতিরের মাধ্যমে জ্ঞানকে 'অভিজ্ঞতালব্ধ' বলে এমন পক্ষের সমন্বয় করা। তিনি মুতাওয়াতিরের জ্ঞানকে যারা অভিজ্ঞতালব্ধ মনে করেন তাদের মতের সাথে তিনি তার উস্তায জুয়াইনীর মত আচরণ করেছেন। তবে আমি মনে করি তিনি ভিন্ন একটা মত দিয়েছেন। যদিও কিছু কিছু উসূলবিদ-ফখর রাযী- মনে করেন তিনি মুতাওয়াতিরের জ্ঞানকে 'অভিজ্ঞতালব্ধ' বলার পক্ষে। গাযালী জমহুরের মতই মনে করেন যে, মুতাওয়াতির বর্ণনা অভিজ্ঞতাপূর্ব জ্ঞানের ফায়দা দেয়। তার দৃষ্টিতে অভিজ্ঞতাপূর্ব স্বতঃসিদ্ধ জ্ঞান হলো 'এমন বিষয় যেটা করতে আমরা বাধ্য হই। আমরা আবশ্যকীয়ভাবে বুঝে নিই যে, আমরা এটা মানতে বাধ্য।'¹¹⁰ কিন্তু যেহেতু মুতাওয়াতির স্বাভাবিক অসম্ভাব্যতার উপর প্রতিষ্ঠিত সেহেতু মুতাওয়াতির বর্ণনার অন্তর্ভুক্ত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়ের সাথে অবশ্যই আমাদের একটা মাধ্যম লাগবে। আমরা নিজ চোখে ইমাম শাফেয়ীকে দেখিনি। কিন্তু তার কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে আমাদের মাধ্যমটা বড় অর্থে 'পরীক্ষণের' অন্তর্গত। আমি প্রথমে নিজ কানে প্রথম বর্ণনাকারীর থেকে তার সম্পর্কে একটা খবর শুনি, তারপর দ্বিতীয় বর্ণনাকারী থেকে আরেকটা খবর শুনি। ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে শুনতে শুনতে এক পর্যায়ে এটা 'অভিজ্ঞতার' পর্যায়ে চলে যায়। কিন্তু মুতাওয়াতিরের ক্ষেত্রে আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতা কেবল আমাদের প্রজন্মের লোকজনের সাথে হয়ে থাকে। আর পরোক্ষভাবে যে প্রজন্মের লোকজনের মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত ঘটনাটা দেখেছে, তাদের সাথে হয়ে থাকে। গাযালী যেটা যোগ করেন সেটা হলো, মুতাওয়াতিরের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পরীক্ষণের ক্ষেত্রে যদিও সেটা স্বতঃসিদ্ধ জ্ঞানের ফায়দা দেয়, তবুও সেটা দলীল প্রদানের দিক থেকে দূরবর্তী। সুতরাং এখানে একটা ভূমিকা প্রয়োজন যেটা থেকে আমরা প্রাথমিক জ্ঞান উদঘাটন করব, যদিও এই ভূমিকাটা কঠিন হওয়ায় আমরা অনুধাবন করতে না পারি।
গাযালী বলেন, 'অভিজ্ঞতা কখনো দৃঢ় বিশ্বাসের ফয়সালা দেয়, কখনো আধিক্যের মতের উপর ফয়সালা দেয়। দর্শনীয় বিষয়ের সাথে অবশ্যই কোনো না কোনো উহ্য কিয়াসী শক্তি থাকে। সেটা হলো যদি বিষয়টা ঐকমত্যপূর্ণ হয় কিংবা আপতিত ও অনাবশ্যক হয়ে থাকে; তাহলে মতভেদ ছাড়া এতগুলো ক্ষেত্রে চলমান থাকত না। যেহেতু এই আবশ্যকতা পাওয়া যায়নি, সেহেতু মানবাত্মা এটাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে এবং বিরল হিসেবে গণ্য করেছে। আর এর জন্য একটা অস্থায়ী কারণ ও প্রতিবন্ধক খুঁজে নিয়েছে। এই অনুভূতি যদি বারবার আসতে থাকে এবং সংখ্যায় এটাকে সুসংহত করা না যায়, যেমনিভাবে মুতাওয়াতিরের বর্ণনাকারীদের সংখ্যাকে সুসংহত করা যায় না, তাহলে প্রত্যেকটা ঘটনা একজন সংবাদদাতা সাক্ষীতুল্য। এর সাথে যদি যুক্ত হয় কিয়াস, তাহলে মানবাত্মা বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়।'¹¹¹ খেয়াল করুন, গাযালী এখানে উহ্য ভূমিকার দিকে লক্ষ্য করেছেন। মুতাওয়াতির হলে সেক্ষেত্রে দুটি ভূমিকা তিনি উহ্য রেখেছেন, 'প্রথমটা হলো, বর্ণনাকারীদের অবস্থা ও উদ্দেশ্যের ভিন্নতা এবং সংখ্যাধিক্যের ফলে মিথ্যার উপর তাদের একত্র হওয়া সম্ভব নয়। তারা সত্যের উপর একমত হবেই। দ্বিতীয়টা হলো, তারা সবাই এই ঘটনা বর্ণনার ব্যাপারে একমত।'¹¹² তবে বাস্তবে অধিকাংশ মন্তব্যকারী মুতাওয়াতিরের ক্ষেত্রে গাযালীর এই তত্ত্বে 'অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের' অন্তর্ভুক্তি স্বীকার করেননি। আব্দুল করীম নামলাহ বলেন, 'এর উত্তরে বলা যাবে যে এটা দুর্বল। কারণ এই অনুসন্ধানের মাধ্যমে যে জ্ঞান অর্জিত হয়, সেটা ফিতরায়¹¹³ শুরু থেকে বিদ্যমান। এর জন্য খুব বেশি চিন্তা-ফিকিরের প্রয়োজন নেই। এমন জিনিসকে অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান বলা ঠিক হবে না। কারণ অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান সেটাই, যেটার জন্য অনুসন্ধান করার যোগ্যতা লাগে। আর এটা তেমন নয়।'¹¹⁴
ঘ- খবরে আহাদ: যেহেতু মুতাওয়াতির দৃঢ় বিশ্বাসের ফায়দা দেয়, সেহেতু স্বাভাবিকভাবে কালামবিদরা, খবরে আহাদের ক্ষেত্রে বিপরীতটাই বলবে। বাকিল্লানী বলেন, বর্ণনা দুই প্রকারের: 'এমন মুতাওয়াতির যেটা জ্ঞানকে আবশ্যক করে এবং ওজর বাতিল করে। আর এমন আহাদ যেটা আবশ্যকীয়ভাবে হোক কিংবা দলীলের উপর ভিত্তি করে, কোনোভাবেই জ্ঞানকে আবশ্যক করে না।'¹¹⁵ তিনি বলেন, 'যে সকল খবরের মাধ্যমে জ্ঞান আবশ্যক হয় না সেগুলোকে ফকীহ এবং কালামবিদরা খবরে ওয়াহেদ নাম দিয়েছে। হোক সেটা একজনের বর্ণনা কিংবা একজনের চাইতে বেশি। এই খবর জ্ঞানকে আবশ্যক করে না, যেমনটা আমরা শুরুতে বলেছি। তবে আমলকে আবশ্যক করে।'¹¹⁶ ফকীহদের কাজের ব্যাপারে বাকিল্লানীর সংজ্ঞায়ন সঠিক নাকি ভুল সেটার চাইতে আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো কালামবিদদের ব্যাপারে তার মন্তব্য।
মুতাওয়াতির এবং আহাদ যে দৃঢ় বিশ্বাসের ফায়দা দেয়, সেটার বিপরীতে আরেকটা তত্ত্ব আছে সেটা হলো খবর আহাদ থেকে পৃথক বিভিন্ন আলামতকে বিবেচনায় নেয়া; যেহেতু মুতাওয়াতিরের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বিবেচ্য বিষয়ের সাথে আহাদও মিলে যায়। জুয়াইনী উল্লেখ করেন নায্যামের সূত্রে, যার বক্তব্য হলো, 'খবরে আহাদও আবশ্যকীয় জ্ঞানের ফায়দা দিতে পারে।'¹¹⁷ আর অবশ্যই এটা প্রাসঙ্গিক আলামতের সাহায্যে। জুয়াইনী তার উসূলী চিন্তায় প্রাসঙ্গিক আলামতের ভূমিকাকে মুখ্য হিসেবে দেখেন। তিনি এই মূলনীতিকে সঠিক বলে গণ্য করেন এ কারণে যে, 'বর্ণনাকারীদের সত্যতার জ্ঞান কোনো নির্দিষ্ট সীমায় বা সংখ্যায় নির্ধারণ করা সম্ভব না। কিন্তু সত্য আলামত পাওয়া গেলে এর মাধ্যমে জ্ঞান সাব্যস্ত হবে।¹¹⁸ তাই আমরা যখন একজন সম্ভ্রান্ত ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তিকে দেখব খালি মাথায় ছেঁড়া পকেটে পায়ে জুতা না পরে চিৎকার করে বলছে যে তার ছেলে বা বাবা মারা গিয়েছে এবং জানাযা হয়ে গিয়েছে, যারা গোসল করায় তাদেরকে বের হতে বা ঢুকতে দেখি; তাহলে এ সকল আলামতের মাধ্যমে আমরা অকাট্যভাবে জ্ঞান লাভ করি যে সেটা সত্য, আবার এটাও বুঝি যে তিনি পাগল হয়ে যাননি।'¹¹⁹ সফীউদ্দীন হিন্দী বলেন, 'কিছু অবস্থায় কিছু আলামতের মাধ্যমে জ্ঞান না পাওয়া যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, সকল অবস্থায় কোনো আলামত থেকেই তা পাওয়া যাবে না। বরং বিষয়টা পরিস্থিতি, অবস্থা ও ব্যক্তি অনুযায়ী ভিন্ন। এক্ষেত্রে বিবেচ্য হলো প্রাসঙ্গিক আলামত পরিবেষ্টিত বর্ণনার শ্রোতার অবস্থা। শ্রোতার যদি জ্ঞান অর্জিত হয়, তাহলে বোঝা যায় সেটা উপকারী, নতুবা নয়।'¹²⁰ তুফী বলেন, 'বর্ণনার সাথে বিদ্যমান প্রতিটি প্রাসঙ্গিক আলামত কোনো বর্ণনার নিশ্চয়তা বৃদ্ধিতে একজন বর্ণনাকারীর সমান ভূমিকা রাখে। কারণ আমরা স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব নিজেদের মাঝে পাই। আর যদি এই আলামতগুলো বর্ণনাকারীর মত হয়ে থাকে, তাহলে আবশ্যকীয়ভাবে খবরে ওয়াহেদের দ্বারাও জ্ঞান অর্জিত হবে। কারণ একজন বর্ণনাকারীর সাথে বিশটি প্রাসঙ্গিক আলামত যুক্ত হলে একুশ জন বর্ণনাকারী হয়ে যায়। বরং এমনটাও ঘটে যে একটা প্রাসঙ্গিক আলামত এমন ফায়দা দেয়, যেটা হয়তো একদল বর্ণনাকারী দিতে পারে না; আর সেটা নির্ভর করে যে বিষয়টা দিকে বুদ্ধিভিত্তিক ইঙ্গিত করে, সেটার সাথে সম্পর্কের মাত্রা অনুযায়ী।'¹²¹ এই বর্ণনাকে সকল উসূলবিদের দিকে সম্বন্ধযুক্ত করে এটাকেই চূড়ান্ত মত বলে বিবেচনা করা যাবে। কারণ 'কোনো বুদ্ধিমান মানুষ প্রাসঙ্গিক আলামতের মাধ্যমে জ্ঞানপ্রাপ্তি অস্বীকার করবে না।'¹²²
যদিও ইবনুল হাজিবসহ অন্যান্য উসূলবিদরা বলেন, 'অধিকাংশ উসূলবিদ একমত যে একজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির প্রদত্ত খবর জ্ঞানের ফায়দা দেয় না, তার সাথে প্রাসঙ্গিক আলামত থাকুক বা না থাকুক।' তাদের এই কথার কারণ দুটি। প্রথমত, কালামশাস্ত্র অনুযায়ী মুতাওয়াতির বর্ণনায় যে পূর্ণ দৃঢ় বিশ্বাসের জ্ঞান অর্জিত হয়, সেটার তুলনায় প্রাসঙ্গিক আলামতযুক্ত খবরে ওয়াহেদ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের কমতির বিষয়ে স্থায়ী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা। মাষেরীর বক্তব্য থেকে এ কথা স্পষ্ট। তিনি বলেন, 'আমাদের অধিকাংশ ইমাম মনে করেন স্বাভাবিকভাবে যেমন মুতাওয়াতির বর্ণনার মাধ্যমে আবশ্যকীয় জ্ঞানপ্রাপ্তির বিষয়টা প্রতিষ্ঠিত, একইভাবে খবরে ওয়াহেদের মাধ্যমে জ্ঞান না পাওয়ার বিষয়টাও প্রতিষ্ঠিত, যদিও এই বর্ণনার সাথে বহু প্রাসঙ্গিক আলামত পাওয়া যায়।'¹²³ দ্বিতীয়ত, নবীজীর হাদীসের সাথে প্রাপ্ত নির্দিষ্ট কিছু আলামতের প্রায়োগিক দিক। বিশেষ করে 'উম্মাহর আমল' নামক আলামত, যেটা এখন স্পষ্ট করা হবে।
প্রায়োগিক দিকে আমরা যদি নির্দিষ্টভাবে 'উম্মাহর আমল'কে আলামত হিসেবে নিই, যেটা কিনা সবচেয়ে শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ আলামত, তাহলে কি এই আলামত কোনো বর্ণনাকে ঐতিহাসিকভাবে সঠিক বলে গণ্য করবে? আমরা দেখতে পাই এটা নিয়ে মতভেদ আছে।
মুতাযিলী আলেম আবুল হুসাইন আল-বসরী বলেন, 'খবরে ওয়াহেদে নিহিত বিষয়ের ব্যাপারে যদি উম্মাহ একত্র হয় এবং সঠিক বলে গণ্য করে, তাহলে এটাকে অকাট্যভাবে সঠিক বলা যাবে, কারণ উম্মাহ ভুলের উপর একত্র হয় না। আর যদি উম্মাহ একমত না হয়, তাহলে শাইখ আবু হাশেম (আল- জুব্বাই- ৩২১ হি.), আবুল হাসান (আল-কারখী- ৩৪০ হি.) এবং আবু আব্দিল্লাহ (আল-বসরী- ৩৬৯ হি.) রাহিমাহুমুল্লাহর মতে উম্মাহ খবরে ওয়াহেদে নিহিত বিষয়ের উপর ততক্ষণ একমত হয় না যতক্ষণ তার দ্বারা প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত না হয়।'¹²⁴ এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো খবরে ওয়াহদকে সঠিক গণ্য করার ক্ষেত্রে ইলম-আমলের মাঝে সংযোগ স্থাপন এবং বর্ণনা থেকে পৃথক এমন আলামতের ব্যবহার (উম্মাহর আমল)। এটা বাকিল্লানীর তত্ত্বীয় বক্তব্যের ঠিক বিপরীত।
জাস্সাস বলেন, 'মানুষজন যেটাকে গ্রহণ করে নিয়েছে, সেটা যদি খবরে আহাদ হয়, তবুও আমাদের কাছে মুতাওয়াতির হিসেবে গণ্য।'¹²⁵
আবু ইসহাক আল-ইসফারাইনী (তার থেকে জুয়াইনী বর্ণনা করেন) মুতাওয়াতির এবং আহাদের মাঝে আরেকটা প্রকার করেন। এর নাম দেন 'আল-মুস্তাফীদ্ব'। সেটার ব্যাপারে তিনি বলেন, 'এটা অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের ফায়দা দেয়, আর মুতাওয়াতির অভিজ্ঞতাপূর্ব আবশ্যকীয় জ্ঞানের ফায়দা দেয়। অনুরূপভাবে এতে অন্তর্ভুক্ত হবে বহুল প্রচলিত সে সকল বর্ণনা যেগুলো হাদীসের ইমামরা গ্রহণ করে নিয়েছে।'¹²⁶
ক্বারাফী বলেন, 'যে বর্ণনাকে অকাট্যভাবে সত্য বলা যায় না, সেটার উপর আমল করা বৈধ হওয়ার বিষয়টা মেনে নেয়া যায়। কিন্তু যখন তারা এটার সত্যতার ব্যাপারে জ্ঞান লাভ না করেই তারা এটার উপর আমল করবে, তখন আমাদের কাছে এটার সত্যতার জ্ঞান অর্জিত হয়ে যাবে। কারণ তারা ভুলের উপর আমল করা থেকে পবিত্র। তাই তারা যা করেছে সেটার সত্যতা অকাট্যভাবে বলা যাবে। আর আবু হাশেম এমনটাই বলেছেন।'¹²⁷
বরং আবুল মুযাফ্ফর আস-সাম'আনী বলেন, 'যে খবরে ওয়াহেদকে উম্মাহ গ্রহণ করেছে এবং এর উপর আমল করেছে সেটার সত্যতা অকাট্যভাবে সাব্যস্ত হবে। হোক সেটা এমন যে, সেটার উপর সবাই আমল করেছে অথবা কেউ আমল করেছে আর কেউ ভিন্ন ব্যাখ্যা করেছে।'¹²⁸
শাওকানী বলেন, 'এটা নিয়ে কোনো মতভেদ নেই যে, খবরে ওয়াহেদের উপর আমল করার ব্যাপারে যদি উম্মাহর ইজমা হয়ে যায় তাহলে সেটা জ্ঞানের ফায়দা দেয়। কারণ ইজমা হওয়ার মাধ্যমে সেটার সত্যতার জ্ঞান পাওয়া গিয়েছে। অনুরূপভাবে খবরে ওয়াহেদকে উম্মাহ গ্রহণ করে নিলে সেটার উপর আমল করা বা সেটার ভিন্ন ব্যাখ্যা করা দুই ধরনের মত আছে।'¹²⁹ (যদিও অধিকাংশ উসূলবিদ বর্ণনাকে উম্মাহর গ্রহণ করার বিষয়টা বলেছে, তবুও কেউ কেউ প্রথম তিন প্রজন্ম কর্তৃক গ্রহণ করার মাঝে সীমিত করে দিয়েছেন। সেই তিন প্রজন্ম হল সাহাবী, তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ী। আমরা জাসাসের বক্তব্যে এমনটা দেখতে পাই, 'সালাফের মাঝে যদি কোনো বর্ণনার ব্যবহার এবং সেটার অনুসরণ দেখা যায় যদিও বর্ণনা গ্রহণের শর্তসমূহ এবং বর্ণনা গ্রহণ ও বর্জনের ব্যাপারে ইজতিহাদের বৈধতায় তাদের মতভেদ আছে; তাহলে বোঝা যাবে সেটা সঠিক। কেননা যদি এটার সত্যতা বা যথার্থতা তারা না মনে করত, তাহলে গ্রহণ করা ও ব্যবহার করার ব্যাপারে তাদের ঐকমত্য হতো না। আর এখান থেকেই বর্ণনার বিশুদ্ধতার জ্ঞান আবশ্যক হয়।'¹³⁰
কিন্তু এদের বিপরীতে বহু কালামবিদ এমন 'আলামত'কে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আসমান্দী বলেন, 'একজন ব্যক্তি কোনো কিছু বর্ণনা করলে এবং উম্মাহ সেটা অনুযায়ী আমল করার ব্যাপারে একমত হলে এবং বিশুদ্ধতার হুকুম দিলে বোঝা যায় নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা বলেছেন। কিন্তু কোনোভাবে উম্মাহর জন্য ভুলের উপর একমত হওয়া বৈধ না। আর যদি সেটা অনুযায়ী আমল করে, কিন্তু বিশুদ্ধতার হুকুম প্রদান না করে, তাহলে একদল কালামবিদের মতে অকাট্যভাবে বলা যাবে এটা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন। অন্যদলের মতে, এটা অকাট্যভাবে বলা যাবে না।'¹³¹ এখানে আপত্তির মূলভিত্তি হলো, আমল করা এবং ঐতিহাসিকভাবে সাব্যস্ত হওয়ার মাঝে আবশ্যকীয় সম্পর্ক নেই।
ইবনুস সাম'আনী মনে করেন আকীদাগত বিভ্রান্তির সূচনালগ্নে কাদারী ও মুতাযিলা সম্প্রদায় এই শর্ত যুক্ত করেছে। তিনি বলেন, 'কোনো বর্ণনা যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়, নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী ও ইমামরা বর্ণনা করে, খালাফ থেকে সালাফ পেরিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং উম্মাহ সেটাকে গ্রহণ করে নেয়; তাহলে সেটা জ্ঞানকে আবশ্যক করে। এটাই আহলুল হাদীস এবং সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত অধিকাংশ ইমামের মত। খবরে ওয়াহেদ কখনো জ্ঞানের ফায়দা দেয় না আর জ্ঞানের ফায়দা দিতে হলে মুতাওয়াতির হওয়া আবশ্যক এমন শর্ত ক্বাদারী এবং মুতাযিলাদের উদ্ভাবন। এর মাধ্যমে তাদের উদ্দেশ্য ছিল বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করা। কিছু ফকীহের এ ব্যাপারে দৃঢ় জ্ঞান ছিল না, তাই তারা উক্ত কথার মর্ম না বুঝেই গ্রহণ করে নেয়।'¹³²
ইবন হাযমও এই মতের ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, 'মুসলিমরা সবাই নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একক নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির বর্ণনা গ্রহণের ব্যাপারে একমত ছিলেন। সকল দল এর উপর আমল করত। যেমন- আহলুস সুন্নাহ, খারেজী, শিয়া, ক্বাদরিয়া। কিন্তু প্রথম হিজরী শতকের পর মুতাযিলা সম্প্রদায় ইজমার বিপরীতে গিয়ে নতুন মত উদ্ভাবন করে।'¹³³
আশ'আরীদের মাঝে সর্বপ্রথম এটা বলেন বাকিল্লানী (৪০২ হি.)। তিনি বলেন, 'যদি উম্মাহর সকলে 'আহাদ' হাদীসের উপর আমল করার ব্যাপারে একমত হয় যদিও এর মাধ্যমে জ্ঞানপ্রাপ্তিকে আবশ্যক মনে না করে, তাহলে খবরে ওয়াহেদের উপর আমলের মাধ্যমে ইবাদত সম্পন্নকারী উম্মাহর ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্ধারিত হুকুম থাকবে। বর্ণনাটা সত্য ও সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে, আবার বানোয়াট ও বাতিল হওয়ারও সম্ভাবনা রাখবে। ... কারণ বর্ণনার উপর উম্মাহর আমল করার ইজমা থাকলেই বর্ণনাকারীর সত্যবাদিতা ও বিশুদ্ধতা প্রমাণিত হয় না।'¹³⁴
জুয়াইনী বলেন, 'উস্তায আবু বকর ইবন ফুরাক বলেন, যে বর্ণনাকে উম্মাহ গ্রহণ করে নিয়েছে সেটাকে সত্য বলে গণ্য করা হবে। নিজের কিছু বইয়ে তিনি বিস্তারিত এটা লিখেছেন। তিনি বলেছেন, যদি তারা এটার উপর আমল করার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করে, তাহলেও সেটাকে অকাট্যভাবে সত্য গণ্য করা যাবে না, বরং তারা যে খবরে ওয়াহেদের উপর আমল করার আবশ্যকতায় বিশ্বাস করে, সেটার কারণে এমনটা করেছে বলে গণ্য করা হবে। আর যদি তারা কথায় অকাট্যভাবে গ্রহণ করে নেয়ার ক্ষেত্রে একমত হয়, তাহলে এটা সত্য বলে গণ্য করতে হবে।'¹³⁵
গাযালী বলেন, 'যদি বলা হয়, যে খবরে ওয়াহেদের উপর উম্মাহ আমল করেছে, সেটাকে কি বিশ্বাস করতে হবে? আমরা বলব, যদি তারা বুঝে করে তাহলে তারা নিশ্চয় অন্য কোনো দলীলের উপর ভিত্তি করে করেছে। বস্তুত তারা খবরে ওয়াহেদের উপর আমল করার ব্যাপারে আদিষ্ট, যদিও সেটার সত্যতা তারা না জানে। সুতরাং এটার সত্যতার হুকুম প্রদান করা আবশ্যক হবে না। এখন যদি বলা হয়, বর্ণনাকারীকে মিথ্যুক হিসেবে ধরে নিলে উম্মাহর আমল বাতিল বলে গণ্য হবে আর এটা বড় ভুল, উম্মাহর জন্য এমনটা করা বৈধ নয়। আমরা তখন বলব, উম্মাহ এটার উপর আমল করেছে এ কারণে যে, তাদের শক্তপোক্ত ধারণা হয়েছিল এটা সত্য। তাদের দৃঢ় ধারণা ছিল। যেমন- একজন বিচারক যখন দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর মাধ্যমে বিচার করে, তখন সে ভুল করে না; যদিও সাক্ষী মিথ্যুক হয়। বরং তার কাজ সঠিক বলে গণ্য হয়, কেননা তাকে এমনটাই (দুজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ) করার আদেশ দেওয়া হয়েছে।'¹³⁶
রাযী বলেন, 'আবু হাশেম, কারখী এবং তাদের ছাত্র আবু আব্দিল্লাহ বসরী দাবি করেছে যেকোনো বর্ণনায় আমল করার উপর ইজমা প্রমাণ করে যে বর্ণনাটা বিশুদ্ধ। কিন্তু এটা দুই দিক থেকে বাতিল: প্রথমত, উম্মাহর সকলে বর্ণনায় নিহিত বিষয়ের উপর আমল করার উপর সেই বর্ণনার বিশুদ্ধতার নির্ভর করে না। সুতরাং বোঝা গেল বর্ণনাটার বিশুদ্ধতার পক্ষে এটা দলীল হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, যেহেতু এটার উপর নির্ভর করে না, সেহেতু এটা সাব্যস্ত হলেও ওটা (বর্ণনার বিশুদ্ধতা) সাব্যস্ত হবে না।'¹³⁷
যারকাশী বলেন, 'কাযী আবু বকর বাকিল্লানী বলেছেন, উম্মাহ কোনো বর্ণনায় উপর আমল করলে সেটার সত্যতা অকাট্যভাবে বলা যায় না, যদিও তারা মুখে সেটার সত্যতা মেনে নেয়। সর্বোচ্চ যেটা হয় সেটা হলো দৃঢ় ধারণা। ইমামুল হারামাইন, গাযালী, ইলকিয়া ত্বাবারী প্রমুখ এই মতকে গ্রহণ করেছেন।'¹³⁸ এখান থেকে আমরা দেখতে পাই, বেশ কিছু বড় কালামবিদ প্রাসঙ্গিক প্রসিদ্ধ আলামতকে (قرائن) অস্বীকার করে। সুতরাং আলামতের অকার্যকারিতাকে একদল কালামবিদের দিকে সম্বন্ধযুক্ত করার সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়。
কালামবিদদের দৃষ্টিতে খবরে আহাদের নির্ভরযোগ্যতা এবং এটাকে জ্ঞান হিসেবে গণ্য করার পথে প্রথম প্রতিবন্ধক হলো মুতাওয়াতিরের তুলনায় 'খবরে আহাদ জ্ঞানের ফায়দা দেয় না। খবরে আহাদের মৌলিক সমস্যা হলো এটা ভুলের সম্ভাবনা রাখে। এটা একটা মানবীয় বৈশিষ্ট্য, যেটা অস্বীকার করা যায় না। যদিও বর্ণনাকারী ন্যায়পরায়ণ ও মুখস্থশক্তির অধিকারী হয়ে থাকে।
তাফতাযানী বলেন, 'আমরা (খবরে আহাদের) সত্যতাকে এতটা প্রাধান্য দিতে পারি না যে, মিথ্যার সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিব (যেখানে বর্ণনাকারী ন্যায়পরায়ণ); বরং আক্কল সাক্ষ্য দেয় যে একজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির সাক্ষ্য দৃঢ় বিশ্বাসকে আবশ্যক করে না। মিথ্যার সম্ভাবনা থেকেই যায়, যদিও সেটা প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত নয়। তা নাহলে দুজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি দুটি পরস্পরবিরোধী বর্ণনা প্রদান করলে অকাট্যভাবে দুটিকে সঠিক বলে মেনে নিতে হবে।'¹³⁹ সংক্ষেপে বললে অকাট্যভাবে সাব্যস্ত বিষয়ই জ্ঞান।
কেউ কেউ আরো একটু নমনীয়তা অবলম্বন করেন, যেমন আবু যাইদ দাব্বুসী বলেন, 'যদি কোনো মতের ব্যাপারে অনুসন্ধান চালানো হয়, কোনটা দলীল আর কোনটা দলীল না সেটা পৃথক করা যায়, কোনো একটা মতকে প্রমাণের ভিত্তিতে সংশয়মুক্ত করে প্রাধান্য দেওয়া যায় এবং প্রাধান্য পেয়েও যায়, দৃঢ় বিশ্বাস ছাড়াই অন্তর সেটার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে অধিকাংশের মতে এটাই জ্ঞানের সূচনা। যেমন- ভুলের সম্ভাবনা রাখে এমন কিয়াস এবং ইজতিহাদলব্ধ জ্ঞান, খবরে আহাদ এবং এ রকম যত দলীলের কথা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। এ অবস্থাকে জ্ঞান বলা হয় তবে রূপকার্থে; যেহেতু দলীল থাকার পরও ভুল হওয়ার সম্ভাবনা রয়ে যায়। কিন্তু বিশেষভাবে এটাকে সত্য বলা হবে, কেননা দলীলের মাধ্যমে সাব্যস্ত হয়েছে।'¹⁴⁰ যিনি মনে করেন খবরে আহাদ বাহ্যিক জ্ঞানের ফায়দা দেয়, তার বক্তব্যকে ইবন ফুরাক দৃঢ় নিশ্চয়তার অর্থে নিয়েছেন।¹⁴¹
মাযেরীও এমনটাই মনে করেন। তার ভাষ্য, 'যাদের সূত্রে আমরা বর্ণনা করেছি যে, খবরে ওয়াহেদ অন্তর্নিহিত জ্ঞানের পরিবর্তে বাহ্যিক জ্ঞানের ফায়দা দেয়, তাদের কাছে বাহ্যিক জ্ঞান মূলত নিশ্চয়তাপ্রাপ্তি বোঝায়। তাদের নিশ্চয়তা দৃঢ় পর্যায়ে উপনীত হয়ে জ্ঞানের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে, এমনটা বোঝাতে তারা এটা ব্যবহার করেছে।'¹⁴² এটা কালামবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি যারা 'ধারণা, অজ্ঞতা, অনুকরণ, সংশয়, অনুমানকে জ্ঞান হিসেবে গণ্য করে না, বরং জ্ঞানের বিপরীত কিছু মনে করে।'¹⁴³
এটা সর্বজন স্বীকৃত বিষয় যে, একটা বর্ণনার সাথে প্রাসঙ্গিক আলামতসমূহ যুক্ত হলে ভুলের সম্ভাবনা অনেক কমে যায় বা দূর হয়ে যায়। এখানে দৃঢ় নিশ্চয়তা আর অকাট্যতা খুব কাছাকাছি। তাই যারকাশী বলেন, 'আলামতযুক্ত খবরে আহাদ 'অনেক ক্ষেত্রে অকাট্যতার প্রমাণ দেয়।'¹⁴⁴ শাওকানীসহ কেউ কেউ মনে করেন পার্থক্যটা শাব্দিক। তিনি বলেন, 'প্রাসঙ্গিক আলামতযুক্ত খবরে ওয়াহেদের ব্যাপারে তারা মতভেদ করেছে। কেউ কেউ বলেন, এটা জ্ঞানের ফায়দা দেয়। আবার কেউ কেউ বলেন, এটা জ্ঞানের ফায়দা দেয় না। এই পার্থক্যটা শাব্দিক। কারণ আলামতগুলো যদি এত শক্তিশালী হয় যে, প্রত্যেক বুদ্ধিমান ব্যক্তি এর থেকে জ্ঞান অর্জন করে, তাহলে এর সত্যতা অনিবার্য। অন্যথায় অধিকাংশ মানুষের যে দাবি- আলামতসহ হোক বা আলামত ছাড়া হোক কোনোভাবেই জ্ঞান অর্জিত হবে না- সেটা একটা অর্থহীন দাবি।'¹⁴⁵
কিন্তু যিনি আলামতের উপস্থিতি থাকার পরও তত্ত্বীয়ভাবে সংশয় পোষণ করেন, তিনি কোনোভাবে মেনে নিবেন না যে বর্ণনাটা আলামতের সাহায্যে জ্ঞানের ফায়দা দেয়। কারণ 'যদি জ্ঞানের ফায়দা দিত, তাহলে এটা বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা থাকা বৈধ হতো না। কিন্তু বাস্তবে এটা বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। কারণ আমরা যদি শুনতে পাই কেনো মানুষ মারা গিয়েছে এবং সেটার পক্ষে কিছু আলামত দেখতে পাই যেমন তার জন্য সবাই কান্নাকাটি করছে, কাফনের কাপড় আনা হয়েছে, গোসল করানোর লোকজন হাজির হয়েছে; তাহলেও আমরা তার মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত বলব না। কারণ বাস্তবে তার মৃত্যু না ঘটা প্রমাণিত হতে পারে। যেমন- হয়তো তিনি অজ্ঞান হয়েছেন, বা হঠাৎ নিঃশ্বাস থেমে গিয়েছে, অথবা কেউ তাকে হত্যা করতে চাইছিল সেই আশঙ্কায় সে মৃত হওয়ার ভান ধরেছে। সুতরাং বোঝা গেল বিভিন্ন আলামতের সাহচর্যে এসে বর্ণনা জ্ঞানের ফায়দা দেয় না।'¹⁴⁶ ভুলের সম্ভাবনা থাকলেই কিছু উসূলবিদ কোনো কিছুকে অকাট্য বলেন না। কারণ (রাযীর মতে) 'জ্ঞানের সাথে যদি তার বিপরীতটা (অজ্ঞতা) ঘটার সম্ভাবনা অবশিষ্ট থাকে সবচেয়ে দূরতম পর্যায়ে গিয়ে হলেও, তাহলে সেটা নিছক ধারণা, জ্ঞান নয়।'¹⁴⁷ সুতরাং বিষয়টা দূরতম সম্ভাবনার ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা অনুযায়ী ভিন্নতর হয়ে থাকে।
অধিকন্তু এখানে জ্ঞানতাত্ত্বিক একটা বিবেচনা আছে। উক্ত বিবেচনার কারণে যে সকল উসূলবিদ তত্ত্বীয় জ্ঞানকে 'সংশয়ের বিপরীত' বলে সংজ্ঞায়িত করেন, তারা প্রায়োগিক ক্ষেত্রে গিয়ে আলামতযুক্ত খবরে আহাদের সাথে মুতাওয়াতিরের মত আচরণ করেন না। সেই বিবেচনাটা হলো মূলের ভিন্নতা। প্রথমটা তত্ত্বীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সংশয়মূলক, অন্যদিকে দ্বিতীয়টা আবশ্যকীয় ও দৃঢ় বিশ্বাসের ফায়দা দেয়। গাযালী বলেন, 'অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান হলো এমন জ্ঞান যেটাতে সংশয় সৃষ্টি হওয়া বৈধ এবং অবস্থাভেদে নানা রকম হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। এটা কিছু মানুষ জানে আর কিছু মানুষ জানে না। নারী-শিশুসহ যারা চিন্তাশক্তির অধিকারী নয় তারা জানে না। অনুরূপভাবে যারা ইচ্ছাকৃত চিন্তা করা ছেড়ে দিয়েছে, তারাও জানে না। আর প্রতিটি অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের ব্যাপারে বিজ্ঞ ব্যক্তি প্রথমে সংশয়ে থাকে, তারপর অনুসন্ধানী হয়।'¹⁴⁸
আত্তার বলেন, 'অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের বিরোধিতা করা যায়, বিপরীতে অভিজ্ঞতাপূর্ব তথা আবশ্যকীয় জ্ঞানের ক্ষেত্রে করা যায় না। সুতরাং সঠিক মত হলো, আবশ্যকীয় জ্ঞান শক্তিশালী, কারণ এর বিরোধিতা করা যায় না।'¹⁴⁹ সুতরাং আবশ্যকীয় সত্য এবং সংশয়ের সম্ভাবনা রাখে এমন অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের এই দ্বৈত বিভাজনের উপর ভিত্তি করে বলা যায় যে, প্রাসঙ্গিক আলামত সংশয়কে পুরোপুরি দূর করে দেয় না। সুতরাং দৃঢ় বিশ্বাস একমাত্র আবশ্যকীয় জ্ঞানই দিতে পারে। খবরে আহাদের সামনে এটা তৃতীয় বাধা। কারণ সংজ্ঞার দিক থেকে 'আবশ্যকীয় জ্ঞান কোনো সংশয়ের অবকাশ রাখে না, যেটা অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের বিপরীত। সেটাতে সংশয়ের অনুপ্রবেশের সুযোগ আছে। পুনরায় সঠিকভাবে অনুসন্ধান চালানোর মাধ্যমে সেটাকে নাকচ করতে হয়।'¹⁵⁰ আর প্রায়োগিক দিক থেকে দেখলে একটা প্রয়োগ মনোযোগ দিয়ে দেখার মত। সেটা হলো ইবন হাজার রাহিমাহুল্লাহর বক্তব্য। তিনি সহীহ বুখারী ও মুসলিমের 'সকল হাদীস মুতাওয়াতিরের মত অকাট্য জ্ঞানের ফায়দা দেয় না' এমনটা উল্লেখ করার পর এর কারণ বলেন, 'মুতাওয়াতির আবশ্যকীয় জ্ঞানের ফায়দা দেয়, যেটাতে কোনো সংশয় থাকে না। আর এটা ছাড়া অন্যগুলো (আহাদ) অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের ফায়দা দেয়, যেটা সংশয়ের অবকাশ রাখে। তাই এই দুই গ্রন্থে যে সকল হাদীসকে ইল্লত বা সূক্ষ্ম ত্রুটিযুক্ত বলে গণ্য করা হয়েছে সেগুলো জ্ঞানের ফায়দা প্রদান করেনি। আর আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।¹⁵¹
টিকাঃ
৭৭. মাহমুদ মুহাম্মাদ আলী মুহাম্মাদ, আল-'আলাক্বাতু বাইনাল মানত্বিকি ওয়াল-ফিকহি ইন্দা মুফাক্কিরিল ইসলাম, আইন লিদ্দিরাসাত ওয়াল-বুহুসিল ইন্সানিয়্যা ওয়াল-ইজতিমাইয়্যাহ, ২০০০, পৃ. ১৮।
৭৮. আছার বলতে বুঝায় সাহাবী ও তাবেঈদের বিভিন্ন বর্ণনা।
৭৯. এর অর্থ এটি নয় যে আগে বিষয়টি বিতর্কিত ছিল। বরং আহাদ হাদীসের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি ইতোপূর্বে একটি মীমাংসিত বিষয় ছিল। কিন্তু যখন বিরোধিতা আরম্ভ হলো তখন ইমাম শাফেয়ী সেটার পক্ষে কলম ধরেন। এর মাধ্যমে তিনি সালাফদের মতকেই শক্তিশালী করেন।
৮০. আল-আওয়ায়েল, দারুল বশীর (২/১৯১)।
৮১. ফাঘলুর ই'তিযাল ওয়া-ত্বাবাকাতুল মু'তাযিলা, পৃ. ২৩৪।
৮২. অর্থাৎ অমুসলিমরা নবুয়ত-মুজিযার মত বিষয়গুলো বিশ্বাস করত না; তাদের গ্রহণ করার জন্য বহু সংখ্যক মানুষের বর্ণনার মাধ্যমে কোনো বিষয়ের সত্যতা নির্ণয় করার কাজে এমন বিভাজন করে কিছু কালামবিদ।
৮৩. আর-রিসালাহ, অহকীক; আহমদ শাকির, পৃ. ৪১৫।
৮৪. পৃ. ৪৫৩।
৮৫. পৃ. ৪৭৬।
৮৬. নু'মান জুগাইম, মাদখাল ইলাল সাহাবিশ শাফেয়ী, আল-জামেয়াতু ইসলামিয়্যাহ বি-মালিযিয়া, পৃ. ৯৪।
৮৭. শারহু তানকীহিল ফুসূল কী ইখতিসারিল মাহসূল ফিল-উসুল, তাহকীক: দ্বাহা আব্দুর রউফ সাদ, পৃ. ৩৩৭।
৮৮. শারহু মুখতাসারির রাওদ্বাহ, তাহকীক: তুর্কী, ২/৭৫।
৮৯. সফিউদ্দীন আল-হিন্দী, নিহায়াতুল উসুল ফী দিরায়াতিল উসুল, তাহকীক: সালেহ ইবন সুলাইমান ও সাদ ইবন সালেম, ৭/২৭১৬।
৯০. আল-আমেদী, আল-ইহকাম ফী উসূলিল আহকাম, তাহকীক: আব্দুর রাযযাক আকীকী (২/১৬)।
৯১. আর-রাহী, আল-মাহসূল, তাহকীক: ত্বাহা জাবের আলওয়ানী (৪/২২৯)।
৯২. আল-আসফালাসী, বায়ানুল মুখতাসার শারহু মুখতাসারি ইবলিল হাজিব, তাহকীক: মুহাম্মাদ মাযহার বাকা (১/৬৪৪)।
৯৩. তকীউদ্দীন সুবকী, আল-ইবহাজ কী শারহিল মিনহাজ (২/২৬৮)।
৯৪. আমেদী, আল-ইহকাম (২/১৮)।
৯৫. আল-বাহরুল মুহীত্ব ফী উসূলিল ফিকহ, দারুল কুতুবী (৬/৯৬)।
৯৬. রাযী, আল-মাহসূল (৪/২৪৫)।
৯৭. প্রাগুক্ত (২৫৭)।
৯৮. ক্বারাফী, নাফায়েসুল উসুল (৬/২৮৩৬)।
৯৯. আল-বুরহান ফী উসূলিল ফিকহ, তাহকীক: সালাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন উয়াইদ্বাহ (১/২২৪)।
১০০. আমেদী, আল-ইহকাম (২/২৮)।
১০১. আল-বুরহান (১/২২০)।
১০২. আমেদী, আল-ইহকাম (২/১৮)।
১০৩. প্রাগুক্ত (২/১৮)।
১০৪. প্রাগুক্ত (২/২০)।
১০৫. প্রাগুক্ত।
১০৬. আল-বাহরুল মুহীত্ব ফী উসূলিল ফিকহ (৬/১০৫)।
১০৭. আল-বুরহান (২২১)।
১০৮. ইবনুত তিলমেসানী, শারহুল মা'আলিম ফি উসূলিল ফিকহ, আলামুল কুতুব, বৈরুত (২/১৫৩)।
১০৯. আমেদী, আল-ইহকাম (২/২২)।
১১০. মুস্তাসফা, তাহকীক: মুহাম্মাদ আব্দুস সালাম আব্দুশ শাফী (পৃ. ১০৭)।
১১১. মি'ইয়ারুল ইলম ফি ফান্নিল মাস্তিক, তাহকীক: সুলাইমান দুনইয়া, ১৯০।
১১২. আল-মুস্তাসফা (১০৬)।
১১৩. অর্থাৎ মানব প্রকৃতিতে।
১১৪. আল-মুহায্যাব ফী ইলমি উসূলিল ফিকহিল মুক্কারান, মাকতাবাতুর রুশদ (২/৬৫৫)।
১১৫. আত-তাক্বরীব ওয়াল-ইরশাদ, তাহকীক: আব্দুল হামীদ ইবন আলী আবু যুনাইদ (৫২৭)।
১১৬. তামহীদুল আওয়ায়েল ওয়া-তালখীসুদ্দালায়েল (পৃ. ৪৪১-৪৪২)।
১১৭. আল-বুরহান (১/২১৭)।
১১৮. মুতাওয়াতির বর্ণনা অবশ্যই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হতে হবে এ মর্মে উসূলবিদদের বক্তব্যের সমালোচনা করেন জুয়াইনী। তিনি মনে করেন, এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক আলামত কোনো অংশে ইন্দ্রিয়ের চাইতে কম নয়। তিনি বলেন, 'আমরা যে ভিত্তির ব্যাপারে কথা বলছি সেটার ক্ষেত্রে একদল উসূলবিদ শর্ত দিয়েছে যে, সেটা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হতে হবে। এই শর্ত অর্থহীন। কারণ আবশ্যকীয় জ্ঞানের থেকে বর্ণনা এসেছে কিনা সেটা কাম্য। তারপর সেটা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে হতে পারে আবার পরিস্থিতির প্রসঙ্গ থেকেও হতে পারে। ইন্দ্রিয়ের এক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব নেই। কারণ ইন্দ্রিয় লজ্জিত ও রাগান্বিত ব্যক্তির চেহারার লাল রঙ থেকে ভীত ব্যক্তির চেহারার লাল রঙ আলাদা করতে পারে না। বরং আঞ্চল এটাকে আলাদা করে। সুতরাং ইন্দ্রিয়ের সাথে শর্তযুক্ত করে দেওয়া অর্থহীন।' (আল-বুরহান: ১/২১৬)
১১৯. প্রাগুক্ত (১/২২০)।
১২০. নিহায়াতুল উসুল (৭/২৭৬৫)।
১২১. শারহু মুখতাসারির রাওদ্বাহ (২/৮৫)।
১২২. যারকাশীর 'আল-বাহরুল মুহীত্ব' (৪/২৩৯)।
১২৩. ঈদ্বাহুল মাহসূল (৪২৩)।
১২৪. আল-মু'তামাদ (২/৮৪)।
১২৫. আল-ফুসুল ফিল-উসুল (১/১৭৪)।
১২৬. আল-বুরহান (১/২২৩)।
১২৭. নাফায়েসুল উসুল (২/২৮৭৯)।
১২৮. কাওয়াত্বেউল আদিল্লাহ (১/৩৩৩)।
১২৯. ইরশাদুল ফুহুল (১/১৩৮)।
১৩০. আল-ফুসুল ফিল-উসুল (১/১৭৫)।
১৩১. বাবলুন নাযার ফিল-উসুল (১/১৭৫)।
১৩২. সাউনুল মাস্তিক (২১২-২১৩)।
১৩৩. আল-ইহকাম ফী উসূলিল আহকাম (১/১৪১)।
১৩৪. আত-তাকরীব (৩/১৮০)।
১৩৫. আল-বুরহান (১/২২৩)।
১৩৬. আল-মুস্তাসফা (১১৩)।
১৩৭. আল-মাহসূল (৪/২৮৭)।
১৩৮. আল-বাহরুল মুহীত্ব (৬/১১১-১১২)।
১৩৯. শারহুত তালওয়ীহ 'আলাত-তাওদ্বীহ (২/৭)।
১৪০. তাকওয়ীমুল আদিল্লাহ (৪৬৫)।
১৪১. আল-বাহরুল মুহীত্ব (৫/১৩৬)।
১৪২. ঈদ্বাহুল মাহসূল (৪৪৫)।
১৪৩, আদ-দুসুকী, আত-তাজরীদুশ শাফী (পৃ. ২৯)। মূল তথ্যসূত্রঃ যাইনার শুর্বার 'আল- ইবুস্তমুলুজিয়া: দিরাসাতুন তাহলিলিয়্যাতুন লি-নাযারিয়্যাতিল ইলমি ফিত-তুরাস', দারুল হাদী, ২০০৪ খ্রি. পৃ. ৪৩।
১৪৪. আল-বাহরুল মুহীত্ব (৬/১৩৮)।
১৪৫ ইরশাদুল ফুহুল (১/১৩৮)।
১৪৬. মুহাম্মাদ আল-মাবার, আল-ক্বারায়েন ইন্দাল উসূলিয়্যিন, জামেয়াতুল ইমাম মুহাম্মাদ, রিয়াদ, ২০০৫, (১/৩৫৭)।
১৪৭. আল-মাহসূল (৫/৪০০)।
১৪৮. আল-মুস্তাসফা (১০৬)।
১৪৯. হাশিয়াতুল আত্তার আলা শারহিল জালাল আল-মাহাল্লী আলা জামইল জাওয়ামে' (১/২১০)।
১৫০. আস-সান'আনী, ইজাবাতুস সায়েল শারহু বুগইয়াতিল আমিল (পৃ. ৫৮)।
১৫১. আন-নুকাত 'আলা ইবনিস সালাহ (১/৩৭৯)।