📘 যুক্তির নিরিখে সুন্নাহর প্রামাণ্যতা > 📄 রেনেসাঁ ও লিখনীর সমালোচনার যুগে ইতিহাসশাস্ত্র

📄 রেনেসাঁ ও লিখনীর সমালোচনার যুগে ইতিহাসশাস্ত্র


'রেনেসাঁ' পরিভাষা ইউরোপে পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে সংস্কৃতি, রাজনীতি, শিল্প ও সমাজে গভীর পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করে। এই পরিবর্তনটি পশ্চাৎমুখী ছিল। অর্থাৎ এটা গ্রীক 'মানবতাবাদী' পৌত্তলিক সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করে; যাতে করে গীর্জার কর্তৃত্ব এবং দর্শনে বিদ্যমান স্থবিরতা থকে বেরিয়ে আসা যায়। এ সকল 'মানবতাবাদী' লোকেরা 'ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গীর্জার যাবতীয় শিক্ষাকে শ্রদ্ধা করত'। তারা কমপক্ষে এটা চায় না যে, ধর্মের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাক। কিন্তু তাদের আলোচনা স্বভাবতই গীর্জায় বিদ্যমান চিন্তার পদ্ধতিতে কম্পন ধরিয়ে দেয়। কারণ তারা পার্থিব বিভিন্ন টেক্সটের উপর যে সকল সমালোচনার নীতি প্রয়োগ করেছিল, সেগুলোই আবার ধর্মীয় টেক্সটের উপর প্রয়োগ করেছিল। সময়ের পরিক্রমায় পবিত্র গ্রন্থসমূহের টেক্সটে যে সংশয়পূর্ণ বিষয় সংযুক্ত হয়ে গিয়েছে, সেগুলো থেকে তারা ধর্মগ্রন্থকে মুক্ত করতে চেয়েছিল। এমন ব্যাখ্যা প্রদান করতে চেয়েছিল যা প্রকৃত অর্থের দিকে ফিরিয়ে আনবে। এর মাধ্যমে তাদের দাবি ছিল এই যে, তারা যীশু এবং তার একনিষ্ঠ শিষ্যদের প্রকৃত শিক্ষার দিকে ফিরে যাচ্ছে এবং অসত্য কল্পকাহিনী ধর্মগ্রন্থ থেকে সরিয়ে ফেলছে। তাদের এ পদক্ষেপের মাধ্যমে তারা মধ্যযুগে ধর্মতত্ত্ববিদেরা যে সকল নিয়ম-কানুন প্রণয়ন করেছিল সেগুলোকে অতিক্রম করতে চেয়েছিল।²⁸

সে সময়কালের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম 'রেনেসাঁ' পরিভাষাটি ব্যবহার করেন ফরাসি ইতিহাসবিদ জন মিশেলে। তিনি প্রচারণা চালান যে, রেনেসাঁ হলো অগ্রগতি, গণতন্ত্র, বুদ্ধিবৃত্তি, বাস্তবতা, শিল্পকলা, সৌন্দর্য এবং সব ধরনের স্বৈরাচার থেকে মুক্তির যুগ, বিশেষ করে গীর্জার স্বৈরাচারী কর্তৃত্ব থেকে। এই চিন্তাধারার সমস্যা বা সংকট হলো 'এটা পঞ্চদশ শতক থেকে পরবর্তী সময় পর্যন্ত যা ঘটেছে তার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিবরণ দেওয়ার পরিবর্তে ঊনবিংশ শতকে এসে ইউরোপীয় সমাজকে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে।' সেটার প্রকাশ ঘটেছে 'গীর্জার বিরুদ্ধে সংশয়, শিল্প-সাহিত্যের শক্তিমত্তা, সকল সভ্যতার উপর ইউরোপীয় সভ্যতার বিজয় প্রভৃতির মাধ্যমে। এই মূলনীতিগুলো উনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। ইতিহাসের এই সময়টিতে ইউরোপ জোরপূর্বক দুই আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ায় নিজেদের কর্তৃত্ব ফলানোর চেষ্টা চালায়। কিছু মানুষ আলোকায়নের যুগের ব্যাপারে এমন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে যেন সেটা বিশ্বের উপর ইউরোপীয় কর্তৃত্ব ও প্রভাবের বৈধতা প্রদান করে।'²⁹

মিশেলের পর থেকে ইতিহাসবিদরা আজ পর্যন্ত এই পরিভাষা ব্যবহার করে আসছে। তবে বর্তমান সময়ের অধিকাংশ ইতিহাসবিদ এই সরল ও আংশিক বিবরণের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেন। তারা মনে করেন, রেনেসাঁ মধ্যযুগেরই বিস্তৃত রূপ। তবে বেশ কিছু কারণে সে সময়টাতে ধাপে ধাপে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হয়। সেখানে যুগপৎভাবে বিচ্ছিন্নতা ও নিরবচ্ছিন্নতা ছিল। ক্রেন ব্রেন্টন বলেন, 'এখানে আমরা সর্বপ্রথম যে সমস্যার সম্মুখীন হই সেটা হলো আধুনিক ও বর্তমানের মাঝে পৃথকীকরণের সমস্যা। এটা খুবই বড় সমস্যা। কারণ বাস্তব জীবনের লক্ষ লক্ষ নির্দিষ্ট ঘটনাকে আমরা এমন ব্যাপক পরিভাষা দিয়ে সংক্ষেপে উপস্থাপন করতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছি যেগুলো একটি অন্যটির সাথে এতটা সরলভাবে সংশ্লিষ্ট বা সম্পৃক্ত নয়। এটা আমাদের চিন্তার ক্ষেত্রে সরলতার দিকে ইঙ্গিত করে। মধ্যযুগ স্থান-কালের একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে গিয়ে থেমে যায়নি, যার পর থেকে আধুনিক যুগ শুরু হয়ে গিয়েছে। আধুনিকতার এক সূর্যোদয় এসে বুড়িয়ে যাওয়া মধ্যযুগের রাতকে মুছে দেয়নি। এটা সত্য যে মধ্যযুগ বা আধুনিক যুগের মাঝে পার্থক্য করতে পারাটা বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে ইতিহাসবিদদের ভাবনার বিষয় ছিল। আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে স্পষ্ট নিদর্শনগুলো জানত, সেগুলো আমাদের সময়ে এসে অজানা হয়ে পড়ে।³⁰

ড. নূরুদ্দীন হাতুম বলেন, 'বর্তমান সময়ে এসে কেউ মধ্যযুগ আর রেনেসাঁকে পূর্ণ বিচ্ছিন্ন দুটি যুগ হিসেবে বিবেচনা করে না। নিঃসন্দেহে একটা অন্যটা থেকে ভিন্ন, কিন্তু 'জটিল কিছু শক্তি-ক্ষমতার সমন্বয়ে গঠিত ভারসাম্য যেন একই প্রকারের অন্য ভারসাম্যের প্রতিফলন ঘটাতে পারে'। আর এই দুই ভারসাম্যের মাঝে সাধারণ কিছু উপাদান আছে, তবে সেটা থাকার মাঝে তারতম্য আছে।³¹

কিন্তু আমাদের বর্তমান বিষয় এবং উদ্দেশ্যের প্রেক্ষিতে আমরা ধরে নিব যে, রেনেসাঁ 'অতীতের এক নতুন ধারণা' প্রবেশ করিয়েছে। ইতিহাসের স্বাভাবিক ধারণার জায়গা থেকে দেখলে রেনেসাঁ নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ ধারণ করে:-

প্রথমত, রেনেসাঁ আবিষ্কার করেছে যে, ইতিহাস মানুষের সৃষ্টি। মধ্যযুগে যে সকল ধর্মীয় ব্যাখ্যা ছিল, সেগুলোকে দূর করে দিয়েছে। এ যুগের ইতিহাসবিদ 'এমন ব্যক্তি যিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, ইতিহাসশাস্ত্রে যাজকদের হস্তক্ষেপ ছিল বড় ধরনের দুর্ঘটনা। কারণ তারা অতীতের মাঝে এমন সব ধর্মীয় ও ঐশ্বরিক উপকরণের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে যেগুলো কোনো মন্তব্য বা আলোচনা গ্রহণ করে না।³²

দ্বিতীয়ত, রেনেসাঁ খ্রিষ্টধর্মের নৈতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাহিরে গিয়ে নাগরিক সমাজকে আবিষ্কার করেছে। 'প্রাচীন বিশ্বের ব্যাপারে রেনেসাঁর সময়কালীন চিন্তাবিদরা এটা জানতে পেরেছে যে, আধুনিক নগরে জীবন নিছক মানবীয় বিষয়, এখানে ঐশ্বরিক কোনো প্রভাবের হস্তক্ষেপ নেই।³³

তৃতীয়ত, রেনেসাঁ আধুনিক ইতিহাসের ধারণা সৃষ্টি করেছে, যা মধ্যযুগের ইতিহাসে লিখনীসমূহের বিপরীত। মধ্যযুগে ইতিহাস লেখা হতো পৃথক একাকী আসরে। ইতিহাসবিদ নাটকীয় ভঙ্গিতে সেটাকে বর্ণনা করতেন। এই বৈশিষ্ট্যের অর্থ হলো রেনেসাঁ 'ইতিহাসের ব্যাপারে খ্রিষ্টধর্মের সংকীর্ণ ধারণার বিপরীত প্রতিক্রিয়া। সে সময়ের ইতিহাসের একটাই অর্থ ছিল, আর তা হলো মানবতার জন্য আত্মার বিসর্জন।'³⁴ আর এই ধারণাটির উৎপত্তি ঐ জায়গা থেকে যে, প্রথম যুগ হচ্ছে সর্বোত্তম। কিন্তু রেনেসাঁর সময়ে এসে একজন ইতিহাসবিদ 'স্বর্ণালী যুগ বলে কোনো কিছুর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না, যে যুগের পর মানুষজন পশ্চাৎমুখী হয়েছে। সে মনে করে ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকে মানুষ ছিল জংলী প্রাণীর মতো। কিন্তু ধীরে ধীরে পশুত্ব থেকে বেরিয়ে মানুষজন উন্নতি ও উৎকর্ষ সাধন করেছে।'³⁵

চতুর্থত, ইতিহাস ও মূল্যবোধ পৃথককরণ। 'মানবতাবাদীরা গ্রীক টেক্সট পড়ার মাধ্যমে নিজেদের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে ধীরে ধীরে উন্নতি সাধন করেছে। তারা ষোড়শ শতকে এসে প্রাচ্যের ভাষাগুলো জানতে পেরেছে। সে সময়ে নতুন টেক্সট আবিষ্কার করা কোনোভাবেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তার চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছিল বিদ্যমান টেক্সটসমূহ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পাঠ করা। বাইবেলের ব্যাখ্যার সাথে নতুন বিভিন্ন টেক্সটকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করাটা লক্ষ্য ছিল না, বরং লক্ষ্য হয়ে গিয়েছিল বাইবেলকেই (ভিন্নভাবে) বোঝা।'³⁶

প্রাচীন গ্রীক সভ্যতা রেনেসাঁ যুগে মূল্যবোধের উৎস ছিল না। অর্থাৎ গ্রেকো- রোমান সভ্যতা 'মানবতাবাদী' যুগের শিক্ষিত ব্যক্তিদের কাছে অন্ধ অনুকরণের মতো আবশ্যকীয় বিষয় ছিল না। তাদের কাছে এটা এমন কোনো সূত্র যা উৎস নয় যেটা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। বরং এটা তথ্যের একটা উৎস মাত্র। তাদের উদ্দেশ্য প্রাচীন বিশ্বকে পুনরায় ফিরিয়ে আনা নয়, বরং প্রাচীন বিশ্বের সাথে সংলাপে যাওয়া। কারণ তাদের দৃষ্টিতে প্রাচীন বিশ্ব স্বাধীন চিন্তা ও প্রজ্ঞার প্রতীক। এই প্রজ্ঞা আর স্বাধীন চিন্তা মানুষের দিকে খুব বেশি আশাবাদ বা নৈরাশ্য কোনো দৃষ্টিতেই তাকাবে না।' অন্যভাবে বললে এই সাংস্কৃতিক কার্যক্রম তত্ত্বীয় ছিল, আধ্যাত্মিক না। জর্জ মিনোর ভাষায়, 'আধ্যাত্মিক ও বিশ্বাসগত চাহিদার উপর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়োজন, কাজের উপর জ্ঞান, সিদ্ধান্তের উপর সংশয় প্রাধান্য পেতে শুরু করেছে। পূর্বের প্রজন্মসমূহে বিদ্যমান বিশ্বাসের যে সীমারেখা আছে, সেটাকে সীমিত করে দিয়েছে অসীম সাংস্কৃতিক প্রবৃত্তি। মানব-মন মানবীয় জ্ঞানের সকল ক্ষেত্রের সামনে নিজেকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে।³⁷ কিন্তু এই সংলাপ খ্রিষ্টান ভাষ্যের জন্য হুমকি। তাই আমরা দেখতে পাই, মিশেল দে মন্তের মতো একজন প্রসিদ্ধ লেখক (মৃ. ১৫৯২ খ্রি.) খ্রিষ্টীয় ও পৌত্তলিক নৈতিকতার মাঝে তুলনা করে খ্রিষ্টীয় নৈতিকতার শ্রেষ্ঠত্বে আপত্তি তোলে। আর ইতিহাস লেখার প্রসঙ্গ আসলে সেখানে 'ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে মানবীয় প্রভাব এই (মানবতাবাদী) আন্দোলনের মৌলিক দিকসমূহের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যশীল। ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে এই আন্দোলন বলতে বোঝার প্রাচীন টেক্সটের অনুসন্ধান (বিশেষত গ্রীক টেক্সট)। তারপর বিদ্যমান টেক্সটসমূহ তুলনা, সমালোচনা ও সংশোধন। বইয়ের টেক্সট সমালোচনা ঐতিহাসিক নথিগুলোর বিশ্লেষণের মূল্য সম্পর্কে প্রাথমিক অনুভূতি প্রদান করে।³⁸ ইতিহাসশাস্ত্রের এমন বৃহৎ পদক্ষেপের পরও এটা নিছক সাহিত্যের মাঝে সীমিত ছিল, আধুনিক পরিভাষায় 'জ্ঞান' বলতে যা বোঝায় তার অন্তর্ভুক্ত হয়নি। 'মানবতাবাদী আন্দোলনের যুগে অনেক সময় ইতিহাস ও বাস্তবতাকে বিকৃত করা হয়েছে; যাতে অলঙ্কারশাস্ত্র ও বক্তৃতার সাথে সামঞ্জস্যশীল হয়।³⁹

রেনেসাঁ ভাষাগত বিশ্লেষণ এবং প্রাচীন ভাষাসমূহ নিয়ে মুগ্ধ ছিল। সুতরাং এই বিশ্লেষণ খ্রিষ্টধর্মের উপর প্রয়োগ করা অবাক করার মত কিছু নয়। অগাস্টিন খ্রিষ্টধর্ম এবং ইতিহাসের তত্ত্ব যেভাবে প্রদান করেছিলেন, রেনেসাঁ সেটা থেকে বেরিয়ে পড়ে। অগাস্টিন ছিলেন মধ্যযুগে ইতিহাসের উপর ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক। তিনি সর্বপ্রথম খ্রিষ্টধর্মকে 'জ্ঞানের তত্ত্ব' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। এই তত্ত্ব ইউরোপীয় রেনেসাঁর যুগ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই রেনেসাঁর যুগ ছিল খ্রিষ্টধর্মের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ। ভাষাগত বিশ্লেষণ এবং ঐতিহাসিক সমালোচনার মাধ্যমে খ্রিষ্টধর্মের মূল পুনরায় উদঘাটন করতে শুরু করে। বিষয়টির সবচেয়ে প্রসিদ্ধ উদাহরণ দিয়েছেন মানবতাবাদী আন্দোলন এবং আলোকায়নের যুগের অন্যতম দুই কর্ণধার, ইতালির ইতিহাসবিদ লরেঞ্জা ভালা (১৪৫৭) এবং হল্যান্ডের খ্রিষ্টান দার্শনিক দেসিদেরিয়োস ইরাসমস (১৫৬৩)। প্রথম জন 'তার বইপত্র ও প্রবন্ধে বিভিন্ন ঐতিহাসিক টেক্সটের সমালোচনা করার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন। যদিও 'ডোনেশন অফ কন্সট্যান্টিন' (Donation of Constantine) নামক নথির সমালোচনা ছিল তার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ সমালোচনামূলক কাজ, যার জন্য তিনি নিহত হতে গিয়েছিলেন। তবে এটার কারণে তিনি ব্যাপক প্রসিদ্ধি অর্জন করেন; যেহেতু এর কিছু মারাত্মক ফলাফল ছিল। পোপরা নিজেদের ঐতিহাসিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য উক্ত নথির উপর নির্ভর করত। ঐ নথির বক্তব্য ছিল এই যে, রাজা বড় কন্সট্যান্টিন ইতালির জমিগুলো তৎকালীন পোপকে দান করে দিয়ে যান, যেহেতু তিনি হলেন সেন্ট পিটারের সময়ে রাজা এবং তিনি যীশুখ্রিষ্ট থেকে এটা লাভ করেন। লরেঞ্জা ভালা অকাট্য দলীলের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, গীর্জার লোকজন এই নথিটি বানিয়েছে। তারপর রাজা কন্সট্যিান্টিনের নামে জাল স্বাক্ষর বসিয়েছে। ভালার এই গবেষণা তৎকালীন রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও জ্ঞানের অঙ্গনে বড় ধরনের শোরগোল সৃষ্টি করে। ভালাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়।⁴⁰

অন্যদিকে দেসিদেরিয়োস ইরাসমস 'নতুন নিয়মের প্রাচীন গ্রীক টেক্সটগুলোতে অন্বেষণ চালিয়ে সবগুলো পরস্পর তুলনার মাধ্যমে সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও নির্ভরযোগ্য রূপ বের করে আনেন এবং উক্ত রূপ লেখার সময় যে ভুল-ত্রুটি হয়েছিল সেগুলো থেকে মুক্ত করার পাশাপাশি ভাষাগত বোঝার ভুল থেকে উদ্ভূত ত্রুটিও দূর করেন। এছাড়া পরবর্তী বিভিন্ন ঘরানায় লোকজন যা কিছু সংযুক্ত করে সেগুলোও বাদ দিয়ে দেন। তিনি যখন সতুম নিয়মের মূল গ্রীক টেক্সট বের করলেন, তখন আবিষ্কার করলেন যে ত্রিত্ববাদ চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘ সময় জুড়ে ল্যাটিম ইঞ্জিলে যে বক্তব্য দিয়ে প্রমাণ পেশ করা হয়েছিল সেটা পরবর্তী সংযোজন এবং মূল গ্রীক টেক্সটে তার কোনো অস্তিত্ব নেই।

এদের পর এলেন বাইবেলের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ সমালোচক দার্শনিক স্পিনোজা। তিনি মুসা 'আলাইহিস সালামের নামে প্রসিদ্ধ পঞ্চপুস্তকের ব্যাপারে সংশয় উত্থাপন করে সেগুলোকে নাকচ করে দেন। তিনি দাবি করেন, এগুলোর লেখক মুসা 'আলাইহিস সালামের অনেক যুগ পরে একজন ব্যক্তি। তার ভিত্তি ছিল বেশ কিছু টেক্সট এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন। লিখনীর সমালোচনা করার সময় তিনি একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেন, সেটা হলো: মুসা 'আলাইহিস সালামের একনিষ্ঠ শিষ্যরা কি এই পুস্তক 'নবী' হিসেবে লিখেন যে, তাদের বক্তব্য ওহী বলে বিবেচিত হবে? নাকি তারা কেবল প্রচারক হিসেবে বক্তব্যগুলো প্রদান করেন?

স্পিনোজার উপসংহার হলো, মুসা 'আলাইহিস সালামের একনিষ্ঠ এই শিষ্যদের বর্ণনাভঙ্গি নবীদের বর্ণনাভঙ্গি থেকে পুরোপুরি ভিন্ন। তারা ওহী বা ঐশী দায়িত্ব থেকে লেখেনি। বরং ব্যক্তিগত মতামতের জায়গা থেকে তাদের রচনা। স্পিনোজার মত হলো এই শিষ্যরা লিখনীর কোনো নির্দেশই পাননি, তারা শুধু ধর্ম প্রচারের নির্দেশনা পান। এছাড়া তিনি প্রচলিত খ্রিষ্টান বিশ্বাসের ব্যাপারে অনেক সংশয় তুলে ধরেন। অবশেষে তিনি জোর দিয়ে প্রমাণ করেন যে, মূল গ্রন্থের অনেক বিকৃতি হয়েছে।⁴²

তারপর অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রচুর পরিমাণে সমালোচনামূলক গবেষণা প্রকাশ পেতে থাকে। 'নতুন নিয়মের অন্তর্ভুক্ত পুস্তকগুলোর উপর যে সকল গবেষণা হয়, সেগুলোর ফলাফল এসে দাঁড়ায় যে, ইঞ্জিলের লেখক লুক ও মথি উভয়ে যীশুকে যে শুধু দেখেননি তা নয়, বরং তারা যীশুর জীবনী লিখেছেন মার্কের সুসমাচার থেকে। (মার্কের সুমসমাচারকে গণ্য করা হয় সবচেয়ে প্রাচীন সুসমাচার। অথচ গীর্জাগুলো মনে করত মথির সুসমাচারের একটা সংক্ষিপ্ত রূপ হলো মার্কের সুসমাচার)⁴³ অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে এসে ভাষাগত এমন গবেষণার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় এ ধরনের সমালোচনার ক্ষেত্রে 'সংশয়-সন্দেহ' অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত হয়। 'সন্দেহ'ই হয়ে যায় প্রকৃত বা মূল অবস্থা। তারপর নথির মৌলিকত্ব এবং লেখকের দিকে সেটার সম্বন্ধের সত্যতা যাচাইয়ের প্রসঙ্গ আসে।

টিকাঃ
২৮. লরেন্স প্রিলিপে বলেন, 'বর্তমান সময়ে কারো কারো মাঝে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে সেটা হলো, মানবতাবাদী লোকেরা সবসময় অধার্মিক সেকুলার এবং ধর্ম-বিরোধী ছিল। হ্যাঁ, এটা সত্য যে কিছু মানবতাবাদী গীর্জার বিভিন্ন ভুলত্রান্তির সমালোচনা করেছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় শিক্ষাকে তাচ্ছিল্য করেছে। কিন্তু তারা কোনোভাবেই খ্রিষ্টধর্ম বা কোনো ধর্মকে প্রত্যাখ্যান করেনি। বাস্তবে বহু মানুষ ভাষার সংস্কারের সাথে গীর্জার সংস্কারও চেয়েছিল। তারা প্রাচীন যুগে ফিরে যেতে চেয়েছিল, খ্রিষ্টীয় প্রথম কয়েক শতকের গীর্জা ব্যবস্থায় তারা প্রত্যাবর্তন করতে আগ্রহী ছিল।' লরেন্স এম. প্রিন্সিপে (Lawrance M. Principe), আস-সাউরাতুল ইলমিয়্যা: মুকাদ্দিমাতুন কাসীরাতুন জিদ্দান, মুআস্সাসাতু হিন্দাওয়ী, অনুবাদ: মুহাম্মাদ আব্দুর রহমান ইসমাঈল, পৃ. ১৯।
২৯. নূরুদ্দীন হাতুম, তারীখু আসরিন নাহদ্বাতিল উরুঝিয়াহ, দারুল ফিকর, দিমাক্ষ, ১৯৬৮, পৃ. ১৬১।
৩০. প্রিলিপে, আস-সাউরাহুল ইলমিয়্যা, পৃ. ১৫।
৩১. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭-১৮।
৩২. ক্রেন ব্রেন্টন, তাশকীলুল আকলিল হাদীস, মাকতাবাতুল উসরা, অনুবাদ: শাওকি জালাল, পৃ. ২৪।
৩৩. হাতুম, তারীখু আসরিন নাহদ্বাতিল উরুব্বিয়্যাহ, পৃ. ৭৫।
৩৪. আল-হাদী আত-তাইমুমী, আল-মাদারিস আত-তারীগিয়া আল-হাদীসাহ, দারুত তানওয়ীর ওয়া দারু মুহাম্মাদ আলী লিস-সাপর, ২০১৩ খ্রি. পৃ. ৪৭।
৩৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪১।
৩৬. আলবান জি. উইডগেরি (Alban G. Widgery), আত-তারীখ ওয়া-কাইফা ইউফাস্সিরুনাহ, আল-হাইআতুল মিসরিয়া লিল-কিতাব, অনুবাদ: আব্দুল আযীয তাওফীক জাওয়েদ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ১৪।
৩৭. আত-তাইমূমী, আল-মাদারিস আত-তারীখিয়্যাহ, পৃ. ৪৮।
৩৮. এমিল ব্রেহি, তারীখুল ফালসাফাহ ফিল-আসরিল ওয়াসীত্ব ওয়ান-নাহদ্বাহ, দারুত- তুলীয়াহ, ১৯৮৮, অনুবাদ: জর্জ ত্বারাবিশি, পৃ. ২৬৯।
৩৯. আত-তাইমুমী, আল-মাদারিস আত-তারীখিয়্যাহ, পৃ. ৪১।
৪০. জর্জ মিনো, আল-কানীসাহ ওয়াল-ইলম: তারীখুন সিরা' বাইনাল আকলিদ্দীনী ওয়াল-আকল আল-ইলমী, আল-মুআস্সাসাতুল আরাবিয়্যা লিত-তাহদীসিল ফিকরী, অনুবাদ: মোরিস জালাল, পৃ. ৩৮০।
৪১. হ্যারি এলমার, তারীখুল কিতাবাতিত তারীখিয়‍্যাহ, পৃ. ১৪৬।
৪২. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৭।
৪৩. জামীল মুসা আন-নাজ্জার, দিরাসাত ফি-ফালসাফাতিত তারীক আন-নাকদিয়্যা, মাকতাবাতু মাদবুলী, ২০১১, পৃ. ১২৩।
৪৪. Jonathan A. C. Brown, Hadith: Muhammad's Legacy in the Medieval and Modern World, Oneworld Publications, 2009, p. 201.
৪৫. দেখুন, নাঈমা ইদরীস, 'আযমাতুল মাসীহিয়্যাহ বাইনান-নাৰুদিত তারীখী ওরাত- তাতাউর আল-ইলমী'-র তৃতীয় অধ্যায়, এটা মেস্তরী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হওয়া একটা ডক্টরেট থিসিস। ইন্টারনেটে প্রকাশিত।
৪৬. Jonathan A. C. Brown, 2009, p. 201.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00