📄 প্রাচীন গ্রীকদের কাছে মৌখিক বর্ণনা
গ্রীকদের চোখে হোমারের 'ইলিয়াড' এবং 'ওডেসা' খ্রিষ্টের জন্মের এক হাজার পূর্বের ইতিহাসের সূত্র। এই দুটি মহাকাব্য বীর এবং জমিদারির যুগে গ্রীক সমাজের চিত্র তুলে ধরে। সে সময় গ্রীকদের রাজারা দাবি করত, তারা স্রষ্টার বংশধর। শাসনকার্য পরিচালনা করার সময় এটা বিশ্বাস রাখত যে, তাদের ক্ষমতা মূলত পবিত্র অধিকার, যে ক্ষমতা ও শৌর্যবীর্যের বলে তারা গ্রীক জাতির অন্যদের উপর শ্রেষ্ঠ। কিন্তু হোমারের মূল ভূমিকা ছিল বীরদের গৌরবগাঁথা তুলে ধরে তাদেরকে অমর করে রাখা। 'প্রথম যুগে ইতিহাস রচনা ছিল মূলত আত্মজীবনী ও যুদ্ধের বিবরণী।'⁴
হোমার যদিও ইতিহাস বর্ণনা করছিলেন, তবুও তিনি মূলত কিছু নির্দিষ্ট ঘটনা বাছাই করে সেগুলোকে নির্দিষ্ট শৈল্পিক পদ্ধতিতে উপস্থাপন করছিলেন। নিজের বর্ণনাভঙ্গিতে তিনি ঐশী, নৈতিক, সামাজিক-সকল উৎস মিশ্রিত করে ফেলেছিলেন। কোনো এক সামাজিক ঘটনা দেবতাদের ক্রুদ্ধ করে ফেলে, ফলে মহামারী ছড়িয়ে পড়ে। কবি হোমার এই ঘটনা উপস্থাপন করে নৈতিকতার উৎস তুলে ধরেন। সাধারণভাবে বলতে গেলে, 'প্রাচীন যুগের মানুষের ইতিহাস লেখার প্রচেষ্টা রূপকথাসুলভ বিবরণে ছেয়ে গিয়েছে। কিন্তু এমন বর্ণনাভঙ্গি তৈরিতে তার কোনো স্পষ্ট ভূমিকা ছিল না। কারণ প্রাচীন যুগের মানুষের ইতিহাস রচনার বৈশিষ্ট্যই ছিল এমন যে, তাতে মানুষের কর্ম ও অতি-প্রাকৃত শক্তির ইচ্ছার মাঝে মিশ্রণ থাকবে।'⁵ রূপকথা বলতে এখানে উদ্দেশ্য 'নিছক কল্পনা থেকে উদ্ভূত বিষয়সমূহ নয়। বরং বাস্তব নানা ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে সেগুলোকে শৈল্পিক ঢঙে উপস্থাপন করা, যেন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক এমনসব লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয় যেগুলোকে রূপকথার মাধ্যমে সমাজে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। কল্পকথার মাধ্যমেই আমরা জানতে পেরেছি পূর্ববর্তীদের এমন সব প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, যেগুলো লিখিত ইতিহাসের বহুপূর্বের ঘটে যাওয়া ঘটনা।⁶ গ্রীকসহ অন্যান্য প্রাচীন জাতির কাছে মৌখিক বর্ণনা ছিল বর্ণিত ঘটনাবলি ধারণ করার উপকরণ। 'এভাবে মৌখিক বর্ণনার মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষিত হয়েছে, লেখার কোনো প্রয়োজন পড়েনি।⁷
পূর্ববর্তী জাতিগুলোর ক্ষেত্রে যে বিষয়টা দেখা যায় সেটা হলো, সে সময় এমন কিছু দক্ষ হাফেয ছিল যারা দীর্ঘ পদ্য মুখস্থ করত। 'যদিও আমাদের জন্য সেসব মৌখিক বর্ণনা বুঝতে পারা অনেকটাই কঠিন। কারণ আধুনিক যুগে এসে দীর্ঘ লম্বা কবিতা মুখস্থ করার সক্ষমতা মানুষজন প্রায় হারাতে বসেছে। প্রাচীন যুগে অনেক মানুষের মাঝে এই সক্ষমতা এমনভাবে ছিল যেটার পক্ষে আমাদের কাছে অসংখ্য প্রমাণ না থাকলে বিশ্বাস করাই কঠিন হয়ে যেত।'⁸ কিন্তু রূপকথার বর্ণনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। কারণ এই বর্ণনাগুলো মূল্যবোধ ধারণ করে এবং মানুষকে কাজের লিকে উদ্বুদ্ধ করে। আর সময়ের পরিক্রমায় ছোট-বড় পরিবর্তন সংঘটিত হয়। বিশেষ করে সমাজের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের হাত ধরে।
টিকাঃ
৪. কয়েকজন লেখক, ফালসাফাতুত তারীখ: জাদালুল বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ওয়াল-আউদ আদ-দায়েম, ইবনুন্নাদীম ওয়া-দারুর রাওয়াফেদ, ২০১২, পৃ. ৬৬।
৫. মুহাম্মাদ সাক্কর খাফ্ফাজা, তারীখুল আদাবিল ইউনানী, মাকতাবাতুন্নাহদ্বাহ মিসর, ১৯৫৬, পৃ. ১৮।
৬. কাসেম আব্দুহ কাসেম, তাত্বাউরু মানাহিজিলি বাহস ফিদ্দিরাসাতিত তারিখিয়্যাহ, পৃ. ১০২।
৭. জর্জ সার্টন, তারীখুল ইলম: আল-ইলমুল কাদীম ফিল-আসরিয যাহাবী লিল-ইউনান, ১ম খণ্ড, অনুবাদ: আব্দুল হামীদ লুৎফী, পৃ. ২৮৮।
৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৯০।
📄 সমালোচনার সূচনা
অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন যে, ইতিহাসের সূচনা হয়েছে খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকের দ্বিতীয়ার্ধে। সে সময় বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার এক অনবদ্য উত্থান পরিলক্ষিত হয়। আর সেটা ছিল পুরোপুরি ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত একটি প্রকল্প, যার উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বজগৎ এবং মানুষের ব্যাখ্যা প্রদান। অর্থাৎ ইতিহাসবিদরা মনে করেন, প্রথমবারের মতো ইতিহাস রচিত হয় মানবীয় প্রয়োজন থেকে, ঐশী কোনো প্রভাবে নয়। আর এই ইতিহাসের রচয়িতা ছিলেন হেরোডোটাস। কিন্তু এই ধারণা সঠিক নয়, হোক সেটা হেরোডোটাস বা সে সময়কার দর্শনের ব্যাপারে। 'কারণ হেরোডোটাসের ইতিহাসে 'ধর্মীয় আলোচনা' গভীরভাবে প্রবিষ্ট। হেরোডোটাস যদিও যুদ্ধসমূহকে মানবীয় কারণে ও প্রভাবে হয়েছে বলে থাকেন, তদুপরি তার বইয়ে ঐশী প্রত্যাদেশ, ভবিষ্যদ্বাণী এবং বিশ্বাসের ব্যাপারে স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়।'⁹ অর্থাৎ সে সময়ের দর্শনে 'ধর্ম'ও উপস্থিত।¹⁰
কিন্তু তার অর্থ কি হোমার আর হেরোডোটাসের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই? কোনো কোনো ইতিহাসবিদ মনে করেন, তারা দুজন একই সময়ের। তারা হেরোডোটাসকে প্রথম ইতিহাসবিদ হিসেবে অবস্থান দিতে চান না। কিন্তু বাস্তবে নতুন সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিস্থিতির কারণে উভয়ের মাঝে পদ্ধতিগত পার্থক্য বিদ্যমান।¹¹ আমরা দেখতে পাই হেরোডোটাস স্পষ্টভাবে বাস্তবতা ও কুসংস্কারের মাঝে পার্থক্য করেন (তার ইতিহাসে বহু কল্পকথা থাকা সত্ত্বেও)। তিনি দ্রুত ইতিহাস থেকে যাচাই-বাছাই করে গ্রহণ করেন। গ্রীক ও পারস্যের পারস্পরিক যুদ্ধে জড়ানোর কারণ ব্যাখ্যা করেন। সংখ্যা ও অস্ত্রশস্ত্রে কম হওয়ার পরও গ্রীকদের বিজয়ের কারণ তুলে ধরেন এবং এক্ষেত্রে তিনি মানবীয় বিভিন্ন যুক্তি-বিশ্লেষণের উপর নির্ভর করেন। আমরা হোমারের দুটি মহাকাব্য এবং হেরোডোটাসের ইতিহাসের মাঝে বর্ণনাভঙ্গির পার্থক্য দেখতে পাই। হেরোডোটাসের ইতিহাস জনগণের সামনে পাঠ করার জন্য রচিত হয়নি। তাই স্বভাবতই একজন উপস্থাপক তার বর্ণনার মাধ্যমে যে নৈতিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রোতাদেরকে আহ্বান করবেন, সেটার উপর তার বর্ণনাভঙ্গির প্রভাব পড়বে। কেননা 'পদ্য দেবতাদের ভাষা, গদ্য মানুষের ভাষা'¹²। হেরোডোটাসের ইতিহাসের মূল্য হলো সেটার মাধ্যমে 'গ্রীক ও বর্বরদের সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ কার্যাবলী অমরত্ব অর্জন করে'¹³। হেরোডোটাসের সময়ে এসে এমন মৌখিক বর্ণনার সমালোচনা করা সম্ভব যেটাকে হোমার কবিতার মাধ্যমে এক মহাকাব্যে ফুটিয়ে তুলেছেন আর কোনো এক ঘটনার ঐতিহাসিক বর্ণনা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। সেক্ষেত্রে এই বর্ণনার চাইতে আরো নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক বর্ণনার উপর নির্ভর করা হবে, যদিও তা ভিন্ন সমাজের হয়ে থাকে। কারণ হেরোডোটাস ছোটকাল থেকে একটা সংস্কৃতিকে ধারণ করে আছেন। ভ্রমণের মাধ্যমে তার সাংস্কৃতিক জ্ঞানের পরিধি আরো বিস্তৃত করেছেন। তিনি মিশর, ব্যাবিলন, সিরিয়া, লিবিয়া প্রভৃতি বহু দেশে ভ্রমণ করেছেন। ফলে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য থেকে সরাসরি তথ্য আহরণের সুযোগ তিনি অর্জন করেন। হেরোডোটাস 'তথ্য সংকলনের ক্ষেত্রে এমন কিছু পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির উপর নির্ভর করেছিলেন যেখানে বর্ণনাকারী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কেন্দ্রীয় ও মুখ্য ভূমিকা ছিল।'¹⁴ 'হেরোডোটাস এমন সব ঘটনা বিশ্বাস করতে প্রস্তুত ছিলেন যেটা তার দুই প্রজন্ম আগে ঘটেছে।¹⁵ বস্তুত পশ্চিমা ইতিহাসের রূপকথা এবং ইতিহাসের মাঝে পার্থক্য করার প্রথম ধাপ এটাই। 'হোমারের রচনাবলি জ্ঞান-নির্ভর গবেষণা বলে গণ্য করা হয় না, বরং রূপকথা হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ সেখানে দেবতারা মানুষদের বিভিন্ন কাজে এমনভাবে হস্তক্ষেপ করে, যেটা প্রাচ্যের প্রাচীন ইতিহাসের নানান চিত্র থেকে ভিন্ন নয়। অনুরূপভাবে হেরোডোটাসের কাজেও রকমারি কুসংস্কারের দেখা মিলে খুব বাজেভাবে। এতদসত্ত্বেও গ্রীকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো, হেরোডোটাসের লিখনীর মাধ্যমে ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।'¹⁶
টিকাঃ
৯. জেনিফার টি. রবার্টস, হিরোদোত: মুকাদ্দিমাতুন সাগীরাতুন জিদ্দান, মুআস্সাসাতু হিন্দাওয়ী, অনুবাদ: খালেদ গরীব আলী, পৃ. ১৪।
১০. আত-তাইয়্যিব বু ইয্যাত, আল-ফাললাফাতুল ইউনানিয়্যা মা-ক্বাবলাস সুক্রাত্বিয়্যাহ, মারকাযু নামা লিল-বুহুস ওয়াদ্দিরাসাত, ২০১৩ খ্রি.।
১১. সেই পরিস্থিতি জানার জন্য দেখুন, M. Bentley (ed.), Companion to Historiography. Routledge, London and New York, ১৯৯৭, pp. ২২-২৫.
১২. জেনিফার টি. রবার্টস, হিরোদোত, পৃ. ১২।
১৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩।
১৪. ফাতহী লেসির, তারীখুয যামানুর রাহিন, দারু মুহাম্মাদ আলী-লিল্লাশর, সাফাকেস, ২০১২, পৃ. ১৪।
১৫. M. Bentley (ed.), 1997, p. 22.
১৬. হেরোডোটাস, তারীখু হিরোদোত, আল-মাজমাউস সাকাফী- আবু যাবী, অনুবাদ: আব্দুল ইলাহ আল-মাল্লাহ, পৃ. ২৯।
১৭. আব্দুল ওয়াহেদ যিল্গুন ত্বাহা, উসুলুল বাহসিত তারীখী, দারু মাদারিল ইসলামী, ২০০৪, পৃ. ৬৯-৭০।
📄 ইতিহাসের খ্রিষ্টীয় দর্শন
ইহুদী-খ্রিষ্টানরা তাদের লিখনীর সাথে প্রাচীন পৌত্তলিকদের যেকোনো প্রকারের সংযোগ নাকচ করার জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছে। ধর্মীয় গ্রন্থগুলো অনুযায়ী, মানুষ ও সৃষ্টির সূচনা হয়েছে স্রষ্টা থেকে, স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে নির্দিষ্ট সম্পর্ক আছে, ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে স্রষ্টা বার্তাবাহকদের পাঠিয়েছেন এবং অস্বীকারকারীদের শাস্তি দিয়েছেন। তবে প্রাচীন জাতিসমূহের মাঝে ইতিহাস সংক্রান্ত ধারণায় যে বিষয়টা পাওয়া যায় সেটা হলো ইতিহাসের মূল্যবোধ-নির্ভর নৈতিক ধারণা, হোক সেই জাতিগুলো তাওহীদের অনুসারী কিংবা পৌত্তলিক। ধর্মীয় ঘটনা সবসময় শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে বর্ণনা করা হতো এবং সেগুলো মূল্যবোধে পূর্ণ ছিল, কেবল জানানোর লক্ষ্যে করা হতো না। (উদাহরণস্বরূপ) আল্লাহ যে আদম 'আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করেছেন, এটাকে নিছক ঘটনা বলে বিবেচনা করা যাবে না। বরং এর মাঝে মানুষের জীবনের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি চলে আসবে। তাই 'মধ্যযুগ ইতিহাস আর ধর্মতত্ত্বের মাঝে আলাদা করেনি। বরং এমন কিছুকে সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিহত করেছে। যাতে করে চিন্তার ক্ষেত্রে এতটুকু পরিমাণ সংহতি থাকে, যা দিয়ে বিকৃত চিন্তার বিরুদ্ধে লড়াই করা যাবে। ইতিহাসে এভাবেই গীর্জার পোপদের চিন্তাধারা প্রতিফলিত ছিল মধ্যযুগের শেষ পর্যন্ত, যে সময়কালকে নাম দেওয়া হয়েছে বিশ্বাসের যুগ।'¹⁷ 'মধ্যযুগের অধিকাংশ ইতিহাসবিদ ইতিহাস বর্ণনা করত নৈতিক অর্থ ও আদর্শিক যুক্তি প্রদানের লক্ষ্যে।'¹⁸ স্বাভাবিকভাবেই খ্রিষ্টান ইতিহাসবিদ ‘পুরাতন নিয়ম’ ও ‘নতুন নিয়ম’ থেকে তার যাত্রা শুরু করে। সে সময় একজন ইতিহাসবিদের জন্য বাইবেল থেকে চয়ন করা এবং সেখানকার বিভিন্ন ঘটনার দিকে ইশারা-ইঙ্গিত করা খুবই স্বাভাবিক ছিল। ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে বাইবেলের ঘটনাবলি ও বর্ণনাভঙ্গির বড় প্রভাব ছিল। কিন্তু একজন খ্রিষ্টান ইতিহাসবিদ এমন গ্রীক সূত্রও পান যেখানে ইতিহাসের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, ইতিহাসের সমালোচনা এবং ইতিহাস রচনার বিভিন্ন নিয়ম-কানুন জানতে পারেন। 'জ্ঞানের এই দুটি উৎস একটি অন্যটির সাথে মিশে যায়।¹⁹
উপর্যুক্ত আলোচনা দক্ষ ইতিহাস রচনাকে নাকচ করে না। ইতিহাসের ক্ষেত্রে নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ এবং অলৌকিক ঘটনাবলিতে বিশ্বাস থাকলেও অতীতের ঘটনাবলি দক্ষতার সাথে বর্ণনা এবং বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধক নেই (এর প্রমাণ হেরোডোটাস নিজে)। কিন্তু খ্রিষ্টধর্ম তখন নিছক ধর্ম ছিল না, বরং পরিণত হয়েছিল জীবনের একটা দৃষ্টিভঙ্গিতে, যা কয়েক শতক ধরে পশ্চিমাদেরকে পরিচালনা করেছে। এটা একটা ধর্মীয় মেটাফিজিক্স থেকে বদলে গিয়ে এপিস্টেমোলজির রূপ নিয়েছে, যা ইউরোপে সমগ্র মধ্যযুগ প্রভাব ফেলেছে। অন্য সকল মানবিক বিদ্যা খ্রিষ্টধর্মের পবিত্র গ্রন্থের বক্তব্য এবং যাজকদের বিভিন্ন ব্যাখ্যার অনুগামী থেকেছে। ফলে ইতিহাস রচনা ঐশী ব্যাখ্যার অনুবর্তী ছিল। ইতিহাসের এই ঐশী প্রাতিষ্ঠানিক (ধর্মীয় ব্যাখ্যা নয় যেটা প্রাচীন জাতিসমূহও ধারণ করে) ব্যাখ্যা মধ্যযুগে ইতিহাস রচনার কাজকে কার্যত বাধাগ্রস্ত করেছে। কেননা 'ইতিহাসের ঐশী অর্থ ধারণের ফলে সেকুলার ধারণাসমূহ এবং তথ্যের সুক্ষ্মতাকে জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে। আর এটা ছিল বড় ধরনের বিসর্জন।²⁰ গীর্জার যাজকদের পরবর্তী প্রজন্মগুলো এমন অবনতি দেখেছে যার প্রতিফলন ইতিহাসের ধারণার উপর পড়েছে। এর কারণ ইতিহাস রচনার জন্য প্রয়োজনীয় সাংস্কৃতিক জ্ঞানের অভাব এবং বাইবেলে বিদ্যমান ঐতিহাসিক স্ববিরোধিতার খণ্ডন করার জন্য ধর্মতত্ত্বের জ্ঞানে গভীরতার অনুপস্থিতি। ইতিহাসের জন্য প্রয়োজন 'ভাষাগত কয়েকটি দক্ষতার অনুশীলন, প্রসঙ্গের ব্যাপারে প্রশস্ত জ্ঞান, উক্ত বিষয়ের ভেতর অন্যান্য ব্যাখ্যার ব্যাপারে গভীর জ্ঞান এবং প্রাথমিক যে সকল উৎস তুলনা এবং গবেষণার সুযোগ দেয়, সেগুলোকে স্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে পারা।'²¹
জনৈক প্রসিদ্ধ ইতিহাসবিদ এ প্রসঙ্গে বলেন, 'সে সময়টাতে ইতিহাসের কোনো মাপকাঠি ছিল না, ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে অনুধাবনের কোনো প্রচেষ্টা ছিল না আবার সমালোচনা করার ক্ষুদ্রতম মানসিকতাও ছিল না। বরং শর্তহীনভাবে সব গ্রহণযোগ্য ছিল। ধর্মীয় কর্তৃত্ব কোনো বাধা ছাড়াই প্রভাব বিস্তার করত।... মধ্যযুগে মানুষদের যা বলা হতো, তাই তারা বিশ্বাস করত। বাস্তব-অবাস্তবের মাঝে পার্থক্য করার উদ্দেশ্যে গবেষণা চালানোর কোনো চেষ্টা তাদের মাঝে পরিলক্ষিত হয়নি।²² মধ্যযুগে ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এমন দুর্বলতা থাকার পরও ইনসাফ করলে বলতেই হবে যে, সে সময় ইতিহাস রচনার পদ্ধতিতে এমন পশ্চাৎপদতা তৎকালীন ইউরোপীয় সমাজের অবস্থার ফল। রোমান সভ্যতার পতন এবং জার্মানদের অভিযানের ফলে বিশৃঙ্খলা ও হানাহানি দেখা দেয়। জ্ঞানচর্চার পতন ঘটে এ অর্থে যে জ্ঞান তার মৌলিকত্ব হারিয়ে বসে। কিছু কিছু অঞ্চলে শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।²³ এছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিকূল হওয়ায় এক সমাজ থেকে অন্য সমাজে তথ্য স্থানান্তর করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে একজন ইতিহাসবিদের জন্য ইতিহাস পূর্ণরূপে জানা দুঃসাধ্য হয়। দীর্ঘ যাত্রা করার মতো উদ্দীপনাও তাদের মাঝে দেখা যায়নি।
মধ্যযুগে ইতিহাস লেখার বেশ কিছু ধরন ছিল। তন্মধ্যে একটা ছিল ‘বাৎসরিক বিবরণী’। সেটা ছিল নথিপত্রের মতো যেখানে এক বছরের পর আরেক বছরের ঘটনাগুলো লেখা হতো। যেমন- অমুক বছরে অনেক শস্য হয়েছে, তমুক বছরে একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব মারা গেছেন। নগরীর সরকারগুলো তাদের কর্মচারীদের নামের তালিকা, আঞ্চলিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তালিকা, সন্ধির চুক্তিপত্র, পাশের নগরীর সাথে সংঘটিত যুদ্ধ প্রভৃতি সংরক্ষণ করত। ইতিহাসের এই বিবরণীগুলোতে অনেক বছরের ঘটনা থাকত। একজন লেখক সেগুলো একত্র করে উপস্থাপন করতেন। তথ্যগুলো একজন বর্ণনাকারী বা ইতিহাসবিদের জন্য ছিল উৎসের মতো, যেগুলোকে সে সাহিত্যিক ঢঙে উপস্থাপন করত। ইতিহাস ছিল নাটকের মতো সাহিত্যিক উপকরণ, যা পড়া বা শোনা হতো। মধ্যযুগে ইতিহাস ও বাৎসরিক বিবরণীর মাঝে পার্থক্য করার বিষয়টি দেখা যায়। সাহিত্যিক উৎকর্ষের মাধ্যমে উপস্থাপন করার বিষয়টিকে কোনো প্রকার গুরুত্ব না দিয়ে বাৎসরিক বিবরণীগুলো সময়ের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ঘটনাগুলো তুলে ধরত। অন্যদিকে ইতিহাসবিদ ছিলেন বক্তার মতো, তিনি ভঙ্গি ও পারিপার্শ্বিক আলোচনাকে গুরুত্ব দিতেন। এছাড়া তার উপর একটা নৈতিক দায়িত্বও ছিল। অন্যভাবে বলতে গেলে, প্রকৃত অতীত এবং সাহিত্যিক বর্ণনার মাঝে পার্থক্য অনুধাবনযোগ্য ছিল। মধ্যযুগের ইতিহাসবিদরা ইতিহাস রচনার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ বা বিষয় হিসেবে জীবনী লিখত। এছাড়াও রাজাদের জীবনী তারা লিখত, যেগুলো ছিল তাদের জন্য প্রার্থনার উদ্দেশ্যে। এটা সত্য যে, লেখকদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এবং বর্ণনার পদ্ধতি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন ছিল। কিন্তু তারা সবাই একটা কাঠামো দাঁড় করাতেন যেখানে নানা ঘটনাকে স্থান দেওয়া যেত। কেননা এই ইতিহাসের মাধ্যমে শাসককে নিজের পছন্দসই চিত্রে শ্রোতা বা পাঠকদের কাছে উপস্থাপন করা জীবনী-লেখকের দায়িত্ব ছিল।²⁴
টিকাঃ
১৮. আব্দুল ওয়াহেদ যিল্গুন ত্বাহা, উসুলুল বাহসিত তারীখী, দারু মাদারিল ইসলামী, ২০০৪, পৃ. ৮৩।
১৯. Lloyd S. Kramer and Sarah Maza (eds.), A Companion to Western Historical Thought (Oxford: Wiley-Blackwell), 2002, p. 87.
২০. বেরিল স্ট্যালি (Beryl Smalley), আল-মুরারিখুন ফিল-উসুরিল উসত্বা, দারুল মারারিফ, অনুবাদ: কাসেম আব্দুহ কাসেম, পৃ. ৩৫-৩৬।
২১. আব্দুল হালীম মাহুরবাশা, ফালসাফাভূত তারীখ: মাদখাল ইলান-নামাবিজিত তাফসীরিয়্যাহ লিত-ভারীখিল ইলানী, মারকাবু নামা লিল-বুহুস ওয়ান্দিরাসাত, ২০১৬ খ্রি. পৃ. ৪৭।
২২. হ্যারি এলমার বার্নেস (Harry Elmer Barnes), তারীখুল কিতাবাতিত তারীখিয়্যাহ, আল-হাইআতুল মিসরিয়্যা লিল-কুত্তাব, অনুবাদ: মুহাম্মাদ আব্দুর রহমান বুরজ, পৃ. ৭৪।
২৩. অ্যালুন মুন্সলো, দিরাসাত তাফকিকিয়্যা ফিত-তারীখ, আল-মারকাযুল কাওমী লিত-তর্জমা, অনুবাদ: কাসেম আব্দুহ কাসেম, ২০১৫, পৃ. ৬৭।
২৪. হ্যারি এলসার, তারীখুল কিতাবাতিত তারীখিয়্যাহ, পৃ. ৮৪।
২৫. কাসেম আব্দুহ কাসেম, তাতাউরু মানাহিজিল বাহস ফিদ দিরাসাতিত ভারিখিয়্যাহ, পৃ. ১৬৭।
২৬. বেরিল স্ম্যালী, আল-মুয়ারিখুন ফিল-উসুরিল উসত্ত্বা, পৃ. ২১।
২৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৭।