📘 যুক্তির নিরিখে সুন্নাহর প্রামাণ্যতা > 📄 লেখক, অনুবাদক ও সম্পাদক পরিচিতি

📄 লেখক, অনুবাদক ও সম্পাদক পরিচিতি


লেখক: রিদা যাইদান। মিশরের একজন তরুণ গবেষক ও লেখক। ইতিহাস, ভাষা, দর্শন, নৃতত্ত্ব, মনোবিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয় তার গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু। মিশরের স্থানীয় আলেমদের সান্নিধ্যে ইলম অর্জন করার পাশাপাশি মানবিক বিদ্যাসমূহে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পর তিনি ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির সাথে মানবিক বিদ্যার তুলনামূলক পর্যালোচনায় পারঙ্গমতা অর্জন করেছেন। এমনই কিছু বিষয়ে কয়েকটি বই রচনা করে তিনি খ্যাতি কুড়িয়েছেন। তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ কিছু বই: আল-ইজমাউল ইনসানী, সুয়ালুল কদর, আযমাতুল ফালসাফাতিল আখলাকিয়্যাহ, নাহুয়া মানহাজ ওয়াসফী লিল-ইলম, মাউসুকিয়্যাতুস সুন্নাহ। এছাড়া ইংরেজী ভাষায় রচিত বেশ কিছু বই তিনি আরবীতে অনুবাদ করেছেন।

অনুবাদক: আব্দুল্লাহ মজুমদার, ১৯৯৮ সালে তার জন্ম। পিতা প্রফেসর ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া। ২০১৬ সালে টঙ্গীস্থ তা'মিরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা থেকে আলিম (এইচএসসি সমমান) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। সে বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান লাভ করেন। পরবর্তীতে কলা অনুষদভুক্ত আরবী বিভাগে ভর্তি হন এবং অনার্স ও মাস্টার্সে উভয়টিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ইতিমধ্যে তার অনূদিত ১৭টি বই প্রকাশিত হয়েছে।

সম্পাদক: ১৯৬৯ সালে কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলাধীন ধনুসাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সরকারী মাদ্রাসা-ই আলীয়া ঢাকা হতে ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত কামিল (হাদীস) পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধাতালিকায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। তারপর মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স, মাস্টার্স, এম-ফিল ও পি.এইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি 'আল কুরআনুল কারীমের অর্থানুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর' নামে কুরআনের বৃহৎ খিদমত আঞ্জাম দিয়েছেন, যা কিং ফাহাদ কুরআন প্রিন্টিং প্রেস সৌদি আরব থেকে প্রকাশিত হয়েছে। ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের উপর তার লিখিত, অনূদিত ও সম্পাদিত বহু সংখ্যক বই ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া'র আইন ও শরী'আহ অনুষদভুক্ত আল-ফিকহ এন্ড লিগ্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে নিয়োজিত আছেন।

📘 যুক্তির নিরিখে সুন্নাহর প্রামাণ্যতা > 📄 সম্পাদকের কথা

📄 সম্পাদকের কথা


সকল হামদ মহান রাব্বুল আলামীনের জন্য, যিনি আমাদের জন্য তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ওহী পাঠিয়ে হিদায়াতের পথ দেখিয়েছেন। সালাত ও সালাম সে মহান নবীর ওপর যাঁকে আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্য আদর্শ হিসেবে প্রেরণ করেছেন এবং যাঁর অনুসরণ করা ফরয করে দিয়েছেন আর যাঁর কথা, কাজ ও অনুমোদনকে উম্মতের জন্য হিকমত হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

তারপর কথা হলো, আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে জানিয়েছেন যে, তিনি 'যিক্র' নাযিল করেছেন, [সূরা আল-হিজর: ৯] আর সে 'যিক্' এর সংরক্ষণের দায়িত্ব নিজেই গ্রহণ করেছেন। এ দীনকে কিয়ামত পর্যন্ত সুদীর্ঘ করেছেন, যার অনিবার্য দাবি হচ্ছে কুরআন ও সুন্নাহ সংরক্ষিত থাকবে। কারণ আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা সবই ওহী। তাই কুরআন ও সুন্নাহ উভয়টিই ওহী, উভয়টিই যিক্র। এর প্রমাণ হচ্ছে, অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, 'আর আমরা আপনার কাছে যিক্র নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষের কাছে যা নাযিল হয়েছে সেটা বর্ণনা করেন, আর যাতে তারা চিন্তা করে।' [সূরা আন-নাহল: ৪৪] এর মাধ্যমে এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ অবশ্যই যিক্র এর অন্তর্ভুক্ত। আর যিক্ এর হিফাযতের দায়িত্ব আল্লাহ তা'আলা নিজেই নিয়েছেন; বিধায় যুগ যুগ ধরে তা সংরক্ষিত থাকবে। ইমাম ইবন হাযম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'সুতরাং আল্লাহ তা'আলা জানালেন যে, তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল বাণী ওহী। আর ওহীর ব্যাপারে কোনো মতভেদ নেই যে, তা ওহী। আর যিক্র কুরআনের ভাষ্য দ্বারা সংরক্ষিত থাকা সাব্যস্ত হয়েছে। সুতরাং এটা অবশ্যই বিশুদ্ধ যে, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের যাবতীয় বাণী আল্লাহর সংরক্ষণের মাধ্যমে সংরক্ষিত। আমাদের জন্য এ গ্যারান্টি রয়েছে যে, তার কোনো কিছু হারিয়ে যাবে না।' [আল-ইহকাম (১/৯৮)]

তাছাড়া আমরা আরও দেখতে পাই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ সংরক্ষিত, আর তা হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীর কাছে কিতাব ও হিকমত নাযিল করার কথা ঘোষণা করে তাঁর নবীর প্রতি দয়া প্রদর্শন করেছেন। আল্লাহ বলেন, 'আর আল্লাহর আপনার ওপর কিতাব ও হিকমত নাযিল করেছেন, আর আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন যা আপনি জানতেন না, আর আল্লাহর দয়া তো আপনার ওপর অনেক বড়।' [সূরা আন-নিসা: ১১৩]

ইমাম শাফেয়ী ও একদল সালাফে সালেহীন বলেছেন, হিকমত হচ্ছে সুন্নাহ। সুতরাং কুরআন হচ্ছে মহান আল্লাহর বাণী, যাতে সবকিছু উন্মুক্তভাবে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু হিকমত হচ্ছে সুন্নাত, যা রাসূলের পক্ষ থেকে কুরআনের জন্য বাস্তব প্রয়োগ। কুরআনের মূল কারণ, অর্থ অনুধাবন, উদ্দেশ্য আয়ত্বকরণের জন্য সুন্নাহ থেকে কুরআন কখনো অমুখাপেক্ষী হবে না।

সাহাবায়ে কিরাম সুন্নাহকে এভাবেই দেখেছেন। তারা কুরআনের মতই সুন্নাতকে অবশ্য পালনীয় বিষয় জ্ঞান করতেন। তারা কখনো আল্লাহর বাণী ও রাসূলের বাণীর মধ্যে পার্থক্য করতেন না। সাহাবায়ে কিরাম কুরআনকে যেভাবে মুখস্থ করতেন সেভাবে সুন্নাহকেও স্মৃতিতে ধারণ করতেন। সুন্নাহ সাব্যস্ত হওয়ার বিপরীতটি তারা কখনো করেছেন এমন নযীর কেউ দেখাতে পারবে না।

এভাবেই তা তাদের সুন্দর অনুসারী তাবেয়ীনে ইযামের কাছে সমভাবে সমাদৃত হতো। তারা কখনো হাদীস পেলে অন্য কারও বক্তব্যের অপেক্ষা করতেন না। কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে কোনোভাবেই তারা পার্থক্য করতেন না। আকীদা-বিশ্বাস ও শরী'আহ উভয় ক্ষেত্রেই কুরআন ও সুন্নাহর ছিল অপ্রতিরোধ্য বিচরণ। এ ব্যাপারে আমি আমার 'হাদীসের প্রামাণিকতা' ও 'আকীদার চারটি মৌলিক পরিভাষা'র সুন্নাহ অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

প্রথম শতাব্দীর পরে দ্বিতীয় শতাব্দীতে বিভিন্ন ফের্কা যখন ইসলামের পবিত্র আঙ্গিনায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠে তখন ফিতনাবাজ ফির্কাসমূহের নেতাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সুন্নাহকে যদি যথাযথ মর্যাদার ওপর রাখা হয় তাহলে তারা তাদের সেসব বস্তাপঁচা চিন্তা ও ফের্কাবাজী মানুষদেরকে গলাধকরণ করাতে সক্ষম হবে না। তখনি তাদের মধ্যে কুরআন মানি কিন্তু সুন্নাহ মানতে বাধ্য নই এমন প্রবণতার ক্ষীণ উদ্ভব আমরা লক্ষ্য করি। সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে যারা জীবিত ছিলেন তারা এ লক্ষণের বিপরীতে পর্বতের ন্যায় দাঁড়িয়েছিলেন। সাহাবায়ে কিরামের অনুসারীরা কঠিনভাবে তাদের প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তাদের ভ্রষ্টতা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। তাই সে প্রবণতা বেশি দূর এগুতো পারেনি।

কিন্তু মুসলিমদের বর্তমান দুর্বল অবস্থানের সুযোগ নিয়ে প্রাচ্যবিদ ও তাদের পদলেহী, অনুরূপভাবে পাশ্চাত্যের নীতির পূজাকারী ও তাদের অনুসারীদের মধ্যে সেই সর্বনাশা বক্তব্য আবার জাগরুক হয়ে যায়। তারা আবার সুন্নাহর চারপাশে সন্দেহের ধুম্রজাল সৃষ্টিতে লেগে যায়। কারণ তারা বুঝতে পেরেছে যে, মুসলিমরা যতক্ষণ কুরআন ও সুন্নাহকে যথাযথভাবে আকঁড়ে থাকবে ততক্ষণ তাদের মধ্যে ফিতনা প্রবিষ্ট করে তাদেরকে দীন থেকে দূরে সরানো সহজ হবে না। ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহর বাণীটি তাদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে গিয়েছে, যাতে তিনি বলেছিলেন, সুন্নাহ হচ্ছে নূহের কিস্তি, যে তাতে আরোহণ করবে সে নাজাত পাবে আর যে তাতে আরোহণ করবে না, সে ডুবে মরবে। অনুরূপ ইমাম শাফেয়ীর বচনটি তাদের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যাতে তিনি কুরআন ও সুন্নাহকে ওহী হিসেবে আকীদা ও শরী'আহর জন্য প্রামাণ্য হওয়ার বিষয়টি যথাযথভাবে পূর্ববর্তী মনিষীদের কাছ থেকে এসেছে বলে ঘোষণা করেছেন।

তাই সেসব দেশের ইসলামের শত্রুরা ইসলামের অথেনটিক এ উৎসকে মিথ্যাচার ও অপবাদ আরোপের মাধ্যমে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালাতে সামান্যতম ত্রুটি করছে না। দুর্ভাগ্যবশত তাদের সেসব বক্তব্যকে হুবহু বা তাদের মতো করে বা আরও বেশি করে রঙ-বেরঙের চটকদার বক্তব্যের মাধ্যমে তুলে ধরার জন্য তারা অনেক মুসলিম সন্তানদেরকে তাদের কাতারে ভেড়াতে সক্ষম হয়। তাই দেখা যাচ্ছে, তারা হাদীসের প্রথম শতাব্দীর মুখস্থ যুগকে বিতর্কিত করতে চায়, তারা অপবাদ দিয়ে বলতে চায় মুখস্থ যুগের হাদীস সংরক্ষণ পদ্ধতি প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়। অথচ সেসব সময়ে মানুষের ধী-শক্তি ছিল অসাধারণ। তারা হাজার হাজার ও লাখ লাখ বচন, প্রবচন, কবিতা, গদ্য ও পদ্য বড় কোনো কষ্ট ছাড়াই মুখস্থ রাখতেন। মুখস্থ বিদ্যার মতো বড় সংরক্ষণ পদ্ধতিকে এসব ফিতনাবাজরা বিতর্কিত করার অপপ্রয়াস চালাতে কোনো রূপ কমতি করছে না।

আলোচ্য গ্রন্থে লেখক অত্যন্ত সুন্দর করে তাদের বক্তব্য দিয়েই মুখস্থ বিদ্যার শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রামাণিকতাকে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন। আমার প্রিয় ছেলে আবদুল্লাহ মজুমদার গ্রন্থটির যথাযথ অনুবাদ করেছে। তার আগ্রহের কারণে আমি গ্রন্থটিকে সম্পাদনা করি। গ্রন্থটি আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। এর মাধ্যমে হাদীসের মধ্যে যেসব আনাড়ি লোক তাদের নাপাক হাত প্রবেশ করার চেষ্টা করেছে তাদেরকে ধরাশায়ী করা সম্ভব হয়েছে বলে আমার কাছে মনে হয়েছে।

আল্লাহর কাছে দো'আ করছি, তিনি যেন এ গ্রন্থের লেখক, অনুবাদক আমার সন্তানকে ও আমাকে দীনের জন্য কবুল করেন। আর যারা এ গ্রন্থটিকে প্রকাশের জন্য ব্যবস্থা নিয়েছে তাদেরকেও যথাযথ পুরস্কৃত করেন। আমীন, সুম্মা আমীন।

প্রফেসর ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
আল-ফিকহ অ্যান্ড লিগ্যাল স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
উত্তর আউচপাড়া, গাজীপুর, ২০/১১/২০২৩, রাত ১.৩০।

📘 যুক্তির নিরিখে সুন্নাহর প্রামাণ্যতা > 📄 অনুবাদকের কথা

📄 অনুবাদকের কথা


সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, সালাত ও সালাম নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর। পর সমাচার,
বর্তমান যুগে এসে ইসলামকে যে সকল সংকটের মোকাবেলা করতে হচ্ছে, তার মাঝে অন্যতম একটি হলো সুন্নাহর প্রামাণ্যতা অস্বীকার। এই অস্বীকৃতি নানাভাবে হতে পারে। নবীজী থেকে প্রাপ্ত একক বর্ণনাকে নাকচ করা অথবা সেটাকে প্রাগৈতিহাসিক বলে গণ্য করা কিংবা নিজের বিবেক-বুদ্ধি, আধুনিক মূল্যবোধ প্রভৃতির সাথে সংঘর্ষে এনে নাকচ করে দেওয়া। প্রাচ্য নিয়ে গবেষণা করে প্রাচ্যবিদ নামে যারা খ্যাতি কুড়িয়েছে, তাদের মাঝে গোল্ডযিহার, শাখত, মাইকেল কুক, ইয়াম্বুল কিংবা ওয়ায়েল হাল্লাক সবাই কম-বেশি প্রাচ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গী থেকে সুন্নাহকে দেখেছে, যেখানে সবার জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থান কাছাকাছি ছিল। উপনিবেশ পরবর্তী এই বিশ্বে শক্তির পারদ পশ্চিমের দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণে বহু মানুষ নির্দ্বিধায় তাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থানকে গ্রহণ করেছে। আর এটা শিক্ষিত সমাজের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে জনসাধারণের মাঝেও প্রবেশ করেছে। তাই আমরা দেখতে পাই বর্তমানে সাধারণ মানুষও অনেক সময় সুন্নাহর বিষয়ে সংশয় করছে। প্রসিদ্ধ অনেক আলোচক ও চিন্তকের কথায় প্রভাবিত হয়ে সুন্নাহর ব্যাপারে অনেক মানুষের অবস্থান বদলে যাচ্ছে।

বইটির লেখক রিদা যাইদান সুন্নাহর সমালোচকদের গবেষণাগুলো নিবিড়ভাবে পাঠ করেছেন। কিন্তু সাধারণত যেভাবে তাদের খণ্ডন করা হয়, সেভাবে অগ্রসর হননি। তিনি সরাসরি প্রাচ্যবাদী চিন্তাপদ্ধতির গোড়ায় আঘাত করেছেন। তাই প্রথমে তিনি প্রাচ্যবিদদের চোখে সুন্নাহ কেমন তা চিত্রিত করেছেন। তারপর অ্যারিস্টটলের যুক্তিবিদ্যায় প্রভাবিত কালামবিদদের দৃষ্টিতে চিন্তার পদ্ধতি অনুযায়ী সুন্নাহর প্রকৃতি তুলে ধরেছেন। যুক্তিবিদ্যা কিছু আদর্শবাদী তথা ভাববাদী মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। এই মূলনীতিগুলোর দুর্বলতা বিশ্লেষণ করার পর লেখক আধুনিক দর্শনের দুই দিকপাল হাইডেগার এবং ভিটগেনস্টাইনের দর্শনকে বেছে নিয়েছেন। তার এই বাছাইয়ের কারণ তাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থান ভিন্ন। তারা জ্ঞানের 'বর্ণনামূলক পদ্ধতি'র প্রচারক, যেটা লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন। আধুনিক দর্শনে জ্ঞানকে যে আদর্শবাদী তথা ভাববাদী দৃষ্টিতে দেখা হয়, সেটা থেকে বেরিয়ে এসে তিনি জ্ঞানকে 'সামাজিক এবং উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত' বলে প্রমাণ করেছেন। যে ভিটগেনস্টাইন দেকার্তের জ্ঞানতত্ত্ব থেকে বেরিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দৃঢ় বিশ্বাসের সংজ্ঞায়ন করেছেন 'বিশেষ ভাষা'র ভিত স্থাপন করেছেন, জ্ঞানতত্ত্বের ক্ষেত্রে তার চিন্তাকে লেখক গ্রহণ করেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, লেখকের জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থান পশ্চিমাদের প্রচলিত জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থান থেকে ভিন্ন হওয়ায় তিনি এর নাম দিয়েছেন 'অ-জ্ঞানতাত্ত্বিক'। এছাড়াও লেখক তার বইয়ের বড় অংশ জুড়ে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানী থমাস কুনের চিন্তার সহায়তায় বিজ্ঞানের ব্যাপারে প্রচলিত কিছু প্রতিষ্ঠিত ধারণারও খণ্ডন করেছেন। এর মাধ্যমে তার লক্ষ্য ছিল বিজ্ঞানকে জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে যে অবস্থান থেকে দেখা হয়, ইতিহাসকেও সে অবস্থান থেকে দেখানো।

আমরা জানি যে প্রথম হিজরী শত থেকে সাহাবী-তাবেয়ীদের মৌখিক বর্ণনার মাধ্যমে সুন্নাহ সংরক্ষিত হয়েছে। মৌখিক বর্ণনার প্রামাণ্যতা নিয়ে বইয়ে একটি অধ্যায় জুড়ে গুরুত্বপূর্ণ আলাপ হয়েছে। সমাজের প্রচলিত চিন্তা হলো, মৌখিক বর্ণনা সুন্নাহ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তুলনামূলক দুর্বল পদ্ধতি। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের (Natural Science) মত নির্ভরযোগ্যতা নেই এমনটাই অধিকাংশের ভাবনা। লেখক মৌখিক বর্ণনার দার্শনিক, জ্ঞানতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক গ্রহণযোগ্যতাকে প্রমাণ করেছেন, আর সেটা এমন কিছু পশ্চিমা গবেষণার সহায়তায় যেগুলো প্রাচ্যবিদদের স্থাপিত সংশয় এবং তাদের চিন্তার গণ্ডির সমালোচনা করে। বইটির বিশেষত্ব হল এটি হাদীস শাস্ত্রকে ইতিহাসের একটি নির্ভরযোগ্য শাস্ত্র বলে প্রতিষ্ঠা করেছে। তারপর পশ্চিমাদের গবেষণার আলোকে প্রাচ্যবিদদের দৃষ্টিভঙ্গী ক্রমান্বয়ে খণ্ডন করেছে।

ইতিহাস শাস্ত্রের ভিত স্থাপনের জন্য লেখক প্রথম অধ্যায়ে পশ্চিমাদের চোখে ইতিহাস শাস্ত্রের ইতিহাস বর্ণনা করে রেনেসাঁর যুগে কীভাবে ইতিহাস শাস্ত্রে দার্শনিক সংকট এসেছে তা তুলে ধরেছেন। কেন পশ্চিমারা তাদের ঐতিহ্যকে ত্যাগ করতে শুরু করল এবং জ্ঞানের নতুন মাপকাঠি স্থাপন করল তার বিবরণ দিয়েছেন। ইতিহাস শাস্ত্রকে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান থেকে 'জ্ঞান' হওয়ার দিক থেকে নিচের স্তরে দেখার সমালোচনা প্রমাণসহ করেছেন। দ্বিতীয় অধ্যায়ে তিনি বর্ণনার ব্যাপারে যুক্তিবিদ্যায় প্রভাবিত উসূলবিদদের উত্থাপিত সংশয়গুলো উপস্থাপন করেছেন। তৃতীয় অধ্যায়টা সবচেয়ে চমকপ্রদ ও গভীর। আমজনতা কোনো কিছুকে 'সুন্নাহ' জানার পরই সেটা মেনে নিতে কী কী দার্শনিক ও যুক্তিবিদ্যার প্রতিবন্ধক পায়, সেগুলোর বিশদ খণ্ডন তিনি করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে বিশুদ্ধ হাদীসকে নির্ভরযোগ্য মনে করে তার সামনে সমর্পণ জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে যথার্থ। এমন কাজে দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো ধরনের সমস্যা নেই। চতুর্থ অধ্যায়ে লেখক প্রাচ্যবিদদের তৈরি করা কাঠামোর ভিতকে প্রশ্নবিদ্ধ বলেছেন। প্রাচ্যবিদরা মনে করে শাফেয়ীর আগে নবীজীর সুন্নাহ বলে কোনো কিছু ছিল না। তাদের দৃষ্টিতে দ্বিতীয় শতকের আগে হাদীসগুলো সমালোচনার পর গ্রহণ করার নীতি ছিল না। লেখক তাদের এই প্রাচ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গীর দুর্বলতা তুলে ধরার পাশাপাশি এটাও ব্যক্ত করেছেন যে একজন গবেষক অমুসলিম হলেও যদি ইনসাফগার হন, তাহলে প্রাচ্যবিদদের বক্তব্য তিনি গ্রহণ করবেন না। কেননা ইসলামপূর্ব যুগে ও ইসলামী যুগে জ্ঞান ও লিখনীর সংজ্ঞা কী ছিল, সেটা একজন নিরপেক্ষ গবেষক পাঠ করলে তার কাছে স্পষ্ট ধরা পড়বে যে পশ্চিমা দৃষ্টিকোণ থেকে জ্ঞান যেমন ভিন্ন, তেমন লিখনী ছাড়াও মৌখিক বর্ণনার নির্ভরযোগ্যতা স্পষ্টরূপে প্রমাণিত।

বস্তুত এই বইটি হাদীস অস্বীকারকারীদের জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পাশাপাশি মৌখিক বর্ণনার নৃতাত্ত্বিক ও দার্শনিক গ্রহণযোগ্যতাকে বেশ দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। পরিভাষাগত নানান বিষয় থাকার কারণে অনুবাদটা জটিল ছিল, তবে আল্লাহর রহমতে সমাপ্ত করতে পেরেছি। অনুবাদের পর শ্রদ্ধেয় পিতা ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার সাথে বসে পুরো বইটা তার সামনে পড়ে শরয়ী দিকগুলো সম্পাদনা করিয়েছি, তাই তার প্রতি কৃতজ্ঞতা। সাথে কৃতজ্ঞতা আমার বড় ভাইয়ের প্রতি, যিনি অনূদিত বইয়ে পরিভাষাগত দিকগুলো দেখে দিয়েছেন এবং প্রয়োজনে সংশোধনী এনে দিয়েছেন। ধন্যবাদ জানাই দারুল কারার প্রকাশনীর আল-আমিন ভাইকে, যিনি বইটি ছাপানোর ব্যাপারে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন।

আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন বইটি কবুল করে নেন। সুন্নাহর ব্যাপারে যারা সংশয় উত্থাপন করে, তাদের খণ্ডনে বইটি যেন কার্যকর ভূমিকা রাখে সে জন্য আল্লাহর তৌফিক কামনা করছি।

আল্লাহর করুণার ভিখারী আব্দুল্লাহ মজুমদার
১৯ রবিউস সানী, ১৪৪৫ হিজরী

📘 যুক্তির নিরিখে সুন্নাহর প্রামাণ্যতা > 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সূচনালগ্নে হাদীসশাস্ত্র ও মুহাদ্দিসদের সাথে পরিচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সুন্নাহর নির্ভরযোগ্যতার ব্যাপারে আমি বলতে গেলে তেমন কিছুই জানতাম না। যখন নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে কোনো বক্তব্য সম্পৃক্ত করা হতো তখন আমার কাছে বিষয়টি বেশ দুর্বোধ্য ঠেকত। তারপর আল্লাহ আমাকে তৌফিক দিলেন, আমি ইলমুল হাদীসের একটি সংক্ষিপ্ত ভূমিকা পড়লাম। ভূমিকাটা পড়ার পেছনে আমি মোটামুটি লম্বা সময় দিলাম। সাথে আলেমদের লেকচার শুনলাম, তাদের প্রশ্নোত্তর পড়লাম। হাদীসশাস্ত্রের একটি প্রারম্ভিক তাখরীজের কাজ করার পর বুঝতে পারলাম যে, এর স্পষ্ট একটি কর্মপদ্ধতি আছে। এই শতাব্দীতে এসে সুন্নাহর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে যে তর্ক-বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে, সেগুলো আমি পর্যবেক্ষণ করলাম। সহীহ বুখারী ও মুসলিমকে খুব গুরুত্ব দিয়ে পড়ার পর বুঝলাম যে, এই শাস্ত্রের ঘাড়ে আমার ঋণ আছে। ঋণটা হলো হাদীসশাস্ত্র যাচাইয়ের পদ্ধতির পক্ষে কিছু কথা লেখা। বিশেষ করে আমি যেহেতু এ ব্যাপারে প্রাচ্যবিদদের বইগুলো পড়েছি। হ্যাঁ, আমার আগে অনেক আলেম সুন্নাহর পক্ষে লড়েছেন। সুন্নাহর ব্যাপারে সংশয় সৃষ্টিকারী লোকদের জবাবে অনেক চমৎকার বই তারা লিখেছেন। কিন্তু পাঠকদের কাছে আমি যে বই উপস্থাপন করতে যাচ্ছি সেটার বৈশিষ্ট্য হলো এটা দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে হাদীস শাস্ত্রকে একটা নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে। তারপর পশ্চিমা নানা গবেষণার সহায়তা নিয়ে প্রাচ্যবিদদের তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণের খণ্ডন করছে। প্রাচ্যবাদের জবাবে আমি যে সকল গবেষণার উপর নির্ভর করেছি, সেগুলো হয় পশ্চিমাদের লেখা, নতুবা প্রাচ্যের লেখক হলেও সুন্নাহর ব্যাপারে প্রাচ্যবিদদের মতো ধ্যান-ধারণা রাখে এমন লোকের লেখা। সংক্ষেপে বলতে গেলে এ বইটি হাদীসশাস্ত্রকে নিরপেক্ষ একাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করছে।

ইতিহাসশাস্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমরা প্রথম অধ্যায়ে তুলে ধরব পশ্চিমাদের চোখে ইতিহাসশাস্ত্রের ইতিহাস। এর মাধ্যমে আমরা আলোকায়নের যুগে ইতিহাসশাস্ত্রে সৃষ্ট দার্শনিক সমস্যাগুলো উদঘাটন করব। কেন এবং কীভাবে পশ্চিমারা তাদের ঐতিহ্যকে পরিত্যাগ করতে শুরু করল? কীভাবে তারা ক্রমান্বয়ে 'জ্ঞানের' মাপকাঠি নির্ণয় করল? ইতিহাসশাস্ত্র কি অন্যান্য 'জ্ঞান' থেকে মর্যাদার দিক থেকে নীচে? দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমরা উপস্থাপন করব ঐতিহাসিক বর্ণনাগুলো কালামবিদরা কীভাবে দেখেছে? তাদের আলোচনা থেকে আমরা আসলেই বেশ কিছু সংশয়মূলক বিষয় পেয়ে যাব। প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায় সমাপ্ত হলে আমরা দেখতে পাব যে, হাদীসশাস্ত্রের প্রক্রিয়ার সামনে কিছু দার্শনিক সংশয় ও বাধা উপস্থিত।

বইটির প্রথম বৈশিষ্ট্য এর তৃতীয় অধ্যায়ে নিহিত। আম জনতা যখন শুনতে পায় 'নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ এটা' অথবা 'বুখারী এটা বর্ণনা করেছেন' তখন তারা সেগুলো বিশ্বাস করার পথে যে সকল দার্শনিক বাধা-বিপত্তি ও সংশয় আছে সেগুলোর খণ্ডন করছে তৃতীয় অধ্যায়। সুন্নাহর নির্ভরযোগ্যতা, বিশেষত সহীহ বুখারী ও মুসলিমের নির্ভরযোগ্যতা মেনে নেওয়ার বিষয়টি যে জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে সঠিক এবং এতে দার্শনিক কোনো সংকট নেই, তা প্রমাণ করা এখানে লক্ষ্য। সহীহ সনদ গ্রহণ করা জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে বৈধ বিষয়। এমনকি যদি হাদীসের মতনের নক্কদ তথা সমালোচনা নাও করা হয়।

বইয়ের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায় চতুর্থ অধ্যায়ে। এখানে প্রাচ্যবিদদের দৃষ্টিভঙ্গির জ্ঞানগত সমস্যাগুলোর সমালোচনা ও খণ্ডন করা হয়েছে। প্রাচ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ইমাম শাফেয়ীর আগে সুন্নাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করে। প্রথম শতাব্দীতে হাদীস লেখা হয়েছে এমন বিষয়টা নাকচ করে। সাধারণত দ্বিতীয় হিজরী শতকের শেষভাগ এবং তৃতীয় শতকে হাদীস যাচাই-বাছাই করার বিষয়টি স্বীকার করে। কিন্তু এর আগে হাদীসের ক্ষেত্রে শুদ্ধাশুদ্ধি নির্ণয়ের প্রচেষ্টাকে নাকচ করে দেয়। আমরা এই অধ্যায়ে এমন কিছু পেশ করব যেটা নৃতাত্ত্বিকভাবে প্রমাণ করবে যে, প্রাচ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সেটা অবাস্তব নয়। অমুসলিম একজন গবেষকের জন্য জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে প্রাচ্যবিদদের ঐ সকল বক্তব্য গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

-রিদা যাইদান

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00