📄 জিনগ্রস্ত রোগীর চিকিৎসা পদ্ধতির সমালোচনা
পবিত্র মক্কা নগরীতে অবস্থিত উম্মুল কোরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ হোসনী মোআজ্জিন বলেছেন, জিনগ্রস্ত রোগীর চিকিৎসায় কোরআন ও হাদীসের যথার্থ পদ্ধতির অনুশীলন করা উচিত। তাতে বেশ-কম করা কিংবা বাড়াবাড়ি করা ঠিক নয়। মহানবী (সঃ) যে পদ্ধতিতে চিকিৎসা করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরام (রাঃ) যে পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন, আমাদেরও তাই করা দরকার। তিনি জিনগ্রস্ত রোগীর প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতির নিম্নোক্ত কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতির কথা উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেছেন: ১. প্রচলিত পদ্ধতিতে চিকিৎসকরা রোগীর শরীরের জিনকে দিয়ে কথা বলায়, কিভাবে সে শরীরে ঢুকেছে এবং বের হবে কিনা, হলে কিভাবে হবে-ইত্যাদি বিষয়ে জিজ্ঞেস করে। জিন সেগুলোর উত্তর দেয়। নবী করীম (সঃ) জিনদেরকে দিয়ে কথা বলান নি। তিনি সরাসরি আদেশ দিয়েছেন, 'হে আল্লাহর দুশমন, বের হও, আমি আল্লাহর রাসূল। তিনি জিনকে কোন কথা বলার সুযোগ দেননি। কাফের কিংবা ফাসেক জিনই মানুষের ক্ষতি করে। তারা সত্য কথা কমই বলে। বেশির ভাগ মিথ্যা কথা বলে। শয়তানের অস্ত্রই হল মিথ্যা বলা। তাই তার কথার কোন বিশ্বাস নেই। আর এজন্য তাকে কোন কিছু জিজ্ঞেস করারও প্রয়োজন নেই। সে যদি কিছু বলেও তাহলে তা যে মিথ্যা নয় তার কি প্রমাণ? তিনি প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন, চিকিৎসক জিনকে রোগীর শরীর থেকে বের করার জন্য রাজী করার পর জিজ্ঞেস করে, তুই এখন রোগীর শরীরের কোন্ জায়গায়? জিন বলেঃ 'মাথায়'। একটু পরে জিজ্ঞেস করে, এখন কোথায়? জিন বলে, 'পায়ে।' এখন প্রশ্ন হল, পায়ে এসে সে রোগীর মুখ দিয়ে কিভাবে কথা বলে? এটা কি জিনের মিথ্যা কথা নয়? জিনকে কথা বলার সুযোগ দেয়ায় এক ব্যক্তি তার মায়ের সাথে সদ্ব্যহার বন্ধ করে দিয়েছে। পরে মাকে সম্পূর্ণ বয়কট করেছে। কারণ হল, জিন বলেছে, মা তার স্ত্রীর জন্য যাদু করে ঐ জিন এনেছে। কথা বলতে না দিলে এ অন্যায়টি সংঘটিত হত না। জিন কথা বলে, হাসে-কাঁদে, খায় ও পান করে এগুলো সত্য। জিনগ্রস্ত রোগিকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দেয়ার পর সে রোগির মুখ দিয়ে কথা বলে না কেন? তাহলে কি জিনের উপরও ঘুমের ওষুধের প্রভাব পড়ে? এর দ্বারা প্রমাণ হয় যে, মানুষের চেতনা থাকলেই কেবল জিন আছর করতে পারে, অচেতন অবস্থায় পারে না। শয়তান চেতনা থাকা অবস্থায় মানুষের বিবেককে দিয়ে কথা বলায়, জিহ্বাকে দিয়ে নয়। অর্থাৎ সে বিবেকের উপরই আছর করে।
তিনি আরো বলেন, তিন কারণে জিনের আক্রমণ হয় বলে প্রচলিত আছে।
১. যাদু। জিন বলে, আমি যাদুর মাধ্যমে আটকা পড়েছি। আমি বের হলে অন্যান্য জিনেরা আমাকে মেরে ফেলবে। অথচ আমরা কোরআনী পদ্ধতি জানি যে, যাদু অহীর মাধ্যমে নবীদের কাছে প্রকাশ পায় আর স্বপ্নের মাধ্যমে প্রকাশ পায় নেক লোকদের মাঝে। তারপর সে যাদু তুলে নষ্ট করে দিলে যাদুর প্রভাব খতম হয়ে যায়। নবী (সঃ)-এর বিরুদ্ধে লবীদ বিন আসেম যাদু করায় তিনি অহী দ্বারা তা জানতে পারেন, এরপর যাদু তুলে নষ্ট করে দেয়ার পর তিনি যাদুর ক্ষতি থেকে মুক্ত হন। স্বয়ং জিন যাদুর সংবাদ দেয়ার কথা নয়।
২. জিনের আছরের ২য় কারণ হল, ঐ ব্যক্তি উপর থেকে বিসমিল্লাহ বলে লাফ না দেয়ায় জিনের উপর পড়েছে, কিংবা দোআ না পড়ে পেশাব করায় তাও জিনের উপর পড়েছে কিংবা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করায় জিন কষ্ট পেয়েছে। সে কারণে জিন প্রতিশোধ নেয়। ডঃ হোসনী মোআজ্জিন বলেন, এ সকল বক্তব্যের স্বপক্ষে হাদীসে কোন প্রমাণ নেই। হাদীসে যা এসেছে তাহল- ঘরের সাপকে চলে যাওয়ার অনুরোধ না জানিয়ে হত্যা করলে জিন প্রতিশোধ নেয়। নবী করীম (সঃ) বলেছেন, পেশাবখানা-পায়খানায় জিনেরা বাস করে। তাই তোমরা টয়লেটে গেলে এ দোআ পড়বে: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُبِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ .
এ দোআটি পড়লে জিনেরা আর সতর দেখতে পারে না। দোআটি সতর ও তাদের চোখের মধ্যে আড়াল হয়ে যায়। এখানে প্রতিশোধ নেয়ার পক্ষে কিছু বলা হয় নি।
৩. ৩য় যে কারণ উল্লেখ করা হয় সেটা হল, মানুষের প্রতি জিনের আসক্তি ও ভালবাসা। এর প্রমাণ হিসেবে কোরআনে সূরা আর-রাহমানে বর্ণিত আয়াতটি لَمْ يَطْمِثْهُنَّ إِنْسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانَّ “ইতিপূর্বে বেহেশতের হুর-বালার সাথে কোন মানুষ ও জিন সহবাস করেনি।” তিনি বলেন- এর অর্থ হল, মানুষ ও জিনের জন্য হুর থাকবে। জিনের জন্য নির্ধারিত হুরের সাথে ইতিপূর্বে কোন জিন এবং মানুষের জন্য নির্ধারিত হুরের সাথে কোন মানুষ সহবাস করেনি। এর দ্বারা মানুষের প্রতি জিনের ভালবাসা প্রমাণ হয় না।
তাঁর মতে, জিন-শয়তানের আক্রমণের জন্য এগুলো কোন কারণ নয়। শয়তানের কাজই হল মানুষের ক্ষতি করা। তাই সে ক্ষতি করবেই। কারণটা বড় কথা নয়।
ডঃ হোসনী মোআজ্জিন জিনগ্রস্ত রোগীকে মেরে জিন তাড়ানোর বিরোধীতা করেন। মার রোগীর উপর নয়, জিনের উপর পড়ে- তিনি একথারও বিরোধীতা করেন। কেননা, নবী করীম (সঃ) থেকে বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা রোগী মেরে জিন তাড়ানোর কথা প্রমাণিত নয়। নবী (সঃ) এক রোগীর পিঠে মারতে গিয়ে অন্য একজন তাঁর বগলের নিচের শুভ্রতা দেখেছেন মর্মে বর্ণিত হাদীসের সনদ বিশুদ্ধ নয়। একথা কি করে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? কেননা, জিন আক্রান্ত রোগী হল একজন অচেতন ব্যক্তি। জিন তার বিবেক শক্তির উপর আছর করায় সে অচেতন। এমতাবস্থায় তার শরীরে মার দিলে, চেতনা ফিরে আসার পর সে তা অনুভব করতে পারবে না এ কথা বোধগম্য নয়। তাই মার দিয়ে জিন তাড়ানো ঠিক নয়। কেননা, খারেজা বিন সলতের বাবা যখন একজন পাগলকে লোহার সাথে বাঁধা দেখে চিকিৎসা শুরু করেন, তখন তিনি শুধু সূরা ফাতেহা পাঠ করেন বলে বর্ণিত আছে, মারের কোন কথা তাতে নেই। ডঃ মোআজ্জিন বলেন, যারা মার দিয়ে জিন তাড়ায়, পরে দেখা যায়, জিন আবার ফিরে আসে এবং আক্রমণ করে। এর কারণ একটাই। আর তা হল, নবী করীম (সঃ)-এর পদ্ধতিতে চিকিৎসা করা হয় নি।
নবী করীম (সঃ) শয়তানকে গলা টিপে ধরায় তাঁর হাত মোবারকে শয়তানের জিহ্বার শীতলতা অনুভব হওয়ার উপর ভিত্তি করে অনেকে রোগীকে গলা টিপে ধরেন যেন জিন চলে যায়। ডঃ মোআজ্জিনের মতে, এর উপর কেয়াস বা তুলনা করে জিনগ্রস্ত রোগীর চিকিৎসা করা উচিত নয়। কেননা, হাদীসে এসেছে, হাই তোলার সময় মুখে হাত না দিলে শরীরের ভেতর জিন ঢুকে। রাত্রে ঘুমালে নাসিকারন্ধ্রে শয়তান ঢুকে মর্মে হাদীস রয়েছে। তাছাড়া শয়তান এমনিতেই তো মানুষের শিরা-উপশিরায় চলাচল করে। শয়তান শরীরের ভেতর ঢুকলেই মানুষ অচেতন হয় না, যে পর্যন্ত না বিবেকের উপর আছর করে। তাই মার দিয়ে তাকে কতক্ষণ পর্যন্ত তাড়ানো যাবে? সে তো সব সময় শরীরের মধ্যে প্রবেশ করছেই, কিন্তু সব সময় মানুষকে পাগল বানাচ্ছে না।
ডঃ হোসনী মোআজ্জিনের সমালোচনাকে সামনে রেখে বলতে হয়, এর যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু জিনগ্রস্ত রোগীর চিকিৎসার ব্যাপারে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল, ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রঃ) সহ অন্যান্যদের অভিজ্ঞতারও মূল্য রয়েছে। জিনকে মারলে সে যদি কষ্ট না পায়, তাহলে সে মারের চোটে চিৎকার করে কেন? রোগীতো অচেতন। মারের চোটে চলেও যায় কেন? আসলে উভয় বক্তব্যের মধ্যে সমন্বয় দরকার। কোন সময় মারও দরকার হতে পারে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মারের প্রয়োজন নেই। কোরআন পাঠ ও হাদীসে বর্ণিত দোআই হল মৌলিক চিকিৎসা।
তাছাড়া শয়তান যেসব তথ্য দেয় তা সব সময় মিথ্যা নাও হতে পারে। যেমন, বোখারী শরীফে ফিতরার মাল পাহারার জন্য নবী করীম (সঃ) হযরত আবু হোরায়রাকে নিযুক্ত করেন। প্রথম দু'বার শয়তান মিথ্যা বলে মুক্তি পায়। ৩য় বার সে আবু হোরায়রার কাছে কঠোরভাবে ধরা খাওয়ায় মুক্তির জন্য একটি সত্য বাণী বলে। সেটি হল, শোয়ার সময় আয়াতুল কুরসী পড়লে শয়তান ভোর হওয়া পর্যন্ত আর কোন ক্ষতি করতে পারে না। নবী করীম (সঃ) শুনে বলেন: আগের দু'রাত সে মিথ্যা বলেছে। কিন্তু আজকে সত্য বলেছে। এ হাদীসটি পরে আমরা বিস্তারিত উল্লেখ করব। শয়তান কদাচিত সত্য বলে। অধিকাংশ সময়ই মিথ্যা বলে।
টিকাঃ
১. সাপ্তাহিক আল-মোসলেমুন-সংখ্যা-৬৪২, ২৩ শে মে, ১৯৯৭, জেদ্দা, সৌদি আরব।