📄 জিন আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা প্রক্রিয়া
আমরা আগেই বলেছি, জিন আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা দীনি দৃষ্টিকোণ থেকে বিরাট দায়িত্ব ও কর্তব্য। কেননা, সে জিনের অত্যাচারের কারণে মজলুম। মজলুমের সাহায্য ওয়াজিব। এখন প্রশ্ন হল, কিভাবে জিন তাড়ানো যাবে? জিন তাড়ানোর কিছু পর্যায় আছে। পর্যায়ক্রমে অগ্রসর হতে হবে। সেগুলো হলঃ ১. দোআ-জিকর ও কোরআন পাঠ করা
এর মাধ্যমে জিন চলে গেলে এবং রোগী সুস্থ হলে পরবর্তী পর্যায় অতিক্রমের প্রয়োজন নেই। এজন্য কোরআন পাঠ করা, যেকোন সূরা ও আয়াত তেলাওয়াত করা, কিংবা বাছাই করা কিছু সূরা ও আয়াত পাঠ করা ইত্যাদি। ক্যাসেটের মাধ্যমেও কোরআন তেলাওয়াত শুনানো যেতে পারে। উত্তম হল, রোগীর সর্বদা নিজে কোরআন ও দোআ পড়া। প্রয়োজনে সুঘ্রাণযুক্ত ধুঁয়া গ্রহণ, যমযমের পানি পান করা, তেল ও পানি পড়া কিংবা কোন ঝাড়-ফুঁককারীর সাহায্য নেয়া যেতে পারে। এছাড়াও আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে দোআ করা জরুরী। যাবতীয় গুনাহর কাজ থেকে দূরে থাকা প্রয়োজন। জিন-শয়তান যে সকল কাজ পসন্দ করে সেগুলো থেকেও দূরে থাকতে হবে। যে সকল আয়াত ও সূরা এজন্য বেশি উপকারী সেগুলো নিম্নরূপ:
১. সূরা ফাতেহা।
সুনানে আবু দাউদে খারেজা বিন সালত থেকে, তিনি তার চাচা আল্লাকা বিন সাহহার থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি নবী করীম (সঃ)-এর কাছে আসেন এবং তাঁর কাছ থেকে ফেরত আসার পথে এক সম্প্রদায়ের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেন। তিনি তাদের মধ্যে এক পাগল ব্যক্তিকে লোহার মধ্যে বাঁধা দেখতে পান। পাগলের পরিবারের লোকেরা তাকে ঝাড়-ফুঁকের অনুরোধ করেন। তিনি সূরা ফাতেহা পড়ে তাকে ফুঁ দেন। তাতে সে সুস্থ হয়ে উঠে। তারা তাঁকে এজন্য ১শ বকরী দেয়। তিনি বিষয়টি নবী করীম (সঃ)-এর কানে পৌঁছান। নবী (সঃ) তাঁকে বলেন: এগুলো গ্রহণ কর। আমার বয়সের শপথ, অন্যেরা বাতিল ও নাজায়েয ঝাড়-ফুঁক করে তা খায়। আর তুমি সত্য ও হক ঝাড়-ফুঁক করে তা খাচ্ছ।'
২. সূরা বাকারার ১ম ৫ আয়াত তেলাওয়াত করা।
৩. সূরা বাকারার ১৬৩ ও ১৬৪নং আয়াত পাঠ করা।
৪. আয়াতুল কুরসী (সূরা বাকারা ২৫৫-২৫৬)।
৫. সূরা বাকারার শেষ ৩ আয়াত।
৬. সূরা আল-ইমরানের ১ম পাঁচ আয়াত এবং ১৮ ও ১৯নং আয়াত।
৭. সূরা আরাফের ৫৪-৫৬ আয়াত।
৮. সূরা আল-মুমিনুনের ১১৫-১১৮নং আয়াত।
৯. সূরা সাফফাতের ১ম ১০ আয়াত।
১০. সূরা হাশরের ২১-২৪নং আয়াত।
১১. সূরা আর-রাহমানের ২৩-২৬নং আয়াত।
১২. সূরা জিনের ১ম ৫ আয়াত।
১৩. সূরা ইয়াসিন।
১৪. সূরা কাফেরুন, সূরা এখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রঃ) রোগীর কানে নিম্নোক্ত আয়াত পড়ে ফুঁ দিতেনঃ أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ .
"তোমরা কি মনে করেছ যে, আমরা তোমাদেরকে অর্থহীন সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে আমার কাছে ফিরে আসতে হবে না?" (সূরা মুমেনূন-১১৫)
২. জিনকে ধমক দেয়া
হুমকী-ধামকী, আদেশ-নিষেধ, গালি ও অভিশাপ দিয়ে জিন তাড়ানোর চেষ্টা করা। আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি, নবী করীম (সঃ) একটি জিনগ্রস্ত শিশু اَخْرُجْ عَدُوَّ اللَّهِ فَإِنِّي رَسُولُ اللهِ catce a free cateca আল্লাহর দুশমন, বের হও। আমি আল্লাহর রাসূল।' অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেছেন : إِخْسَنُ عَدُوٌّ اللَّهِ 'হে আল্লাহর দুশমন, বিতাড়িত হও।'
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রঃ) খলীফার বাঁদী থেকে জিনকে তাড়ানোর জন্য ফিতাযুক্ত কাঠের স্যান্ডেল পাঠিয়ে ছিলেন। এছাড়াও স্বাভাবিকভাবে ঝাড়-ফুঁককারীরা জিনকে চলে যেতে অনুরোধ জানায়। তাতে সাড়া দিয়ে জিন চলে গেলে পরবর্তী পর্যায়ের আর প্রয়োজন হয় না।
৩. জিনকে আঘাত করা
আঘাত করলে জিনের উপরই পড়ে, রোগী তা অনুভব করে না। জিন ছেড়ে গেলে রোগী বলে, আমি আঘাত টের পাইনি এবং তা আমার শরীরে কোন ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করে নি।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রঃ) জিনগ্রস্ত রোগীর দু'পায়ে শক্ত বেত দিয়ে ৩শ থেকে ৪শ বেত্রাঘাত করেন। এ মার কোন মানুষের উপর পড়লে সে মরে যেত। তা পড়েছে জিনের উপর। তাতে জিন চিৎকার দিয়েছে। ইমাম ইবনুল কাইয়েম বলেছেন, আমরা ইমাম ইবনে তাইমিয়াকে দেখেছি, তিনি বহু জিনগ্রস্ত রোগীকে মেরে জিন তাড়িয়েছেন। একবার তিনি জিনের কানে কোরআন পড়ে ফুঁ দেন। তখন জিন ভেতর থেকে জবাব দেয়। তিনি একটা বেত দিয়ে রোগীর ঘাড়ের রগে মারা শুরু করেন। মারতে মারতে তাঁর হাত ক্লান্ত হয়ে আসে। উপস্থিত লোকেরা নিশ্চিত ছিল যে এ মারের ফলে রোগীটি মারা যাবে। মারের ভেতর জিনটি বলে, আমি তাকে ভালবাসি। ইবনে তাইমিয়া বলেন: সে তোকে ভালবাসে না। জিনটি বলে আমি তাকে নিয়ে হজ্জ করতে চাই। তিনি বলেন: সে তো তোর সাথে হজ্জ করতে চায় না। জিনটি বলে, আমি আপনার সম্মানে তাকে ছেড়ে চলে যাব। তিনি বলেন: না, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের মাধ্যমে ছেড়ে যাবি। জিনটি বলল: ঠিক আছে, আমি তার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি। এরপর রোগী ডানে-বামে তাকিয়ে বলল: আমাকে ইমাম ইবনে তাইমিয়ার কাছে কেন আনা হয়েছে? তারপর লোকেরা বলল: এত মার কোথায় গেল? রোগী বলল: শেখ আমাকে কেন মেরেছে? আমি তো কোন অন্যায় করিনি? অর্থাৎ সে মার সম্পর্কে ছিল সম্পূর্ণ অনুভূতিহীন।
ইতিপূর্বে আমরা মোসনাদে আহমদে উম্মে আব্বান বিনতে ওয়াজে কর্তৃক তার বাপের বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ করেছি যে, তার দাদা নিজের এক ছেলে কিংবা আপন ভাগিনাকে রাসূলুল্লাহর (সঃ) কাছে নিয়ে বলল: তাকে জিনে ধরেছে, তার জন্য দোআ করুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে তার কাপড় ধরে খালি পিঠে মারতে লাগলেন এবং বললেনঃ হে আল্লাহর দুশমন, বের হও। সব রোগীকে মার দেয়া যাবে না। শুধুমাত্র বেহায়া এবং আগের পদ্ধতির প্রতি সাড়া প্রদানে অস্বীকারকারী জিনকেই শাস্তি দিতে হবে।
মারের ক্ষেত্রে আরো সতর্ক হতে হবে যে, রোগীর উপর জিনের আংশিক আক্রমণ হয়েছে যেমন, শরীরের বিশেষ কোন অঙ্গে-তখন তাকে মার দেয়া যাবে না। মার দিলে তা রোগীর উপর পড়বে, জিনের উপর নয়। তখন রোগী তা সহ্য করতে পারবে না। বরং তার ক্ষতি হবে।
পক্ষান্তরে, যে রোগীর উপর জিনের পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ হয়েছে তাকেই কেবল মার দিতে হবে। মার দিলে তখন তা জিনের উপর পড়বে, রোগীর উপর নয় এবং তাতে রোগীর কোন ক্ষতি হবে না। মার সহ্য করতে না পেরে জিন রোগীকে ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।
চিকিৎসককে ধীরে সুস্থ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং নিজের প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে। তা না হয় চিকিৎসা বুমেরাং হয়ে যাবে।
নবী করীম (সঃ) জিনকে অভিশাপ দিয়েছেন। যখন এক দৈত্য জিন তাঁর মুখে আগুন নিক্ষেপ করতে এসেছিল তখন তিনি বলেছিলেন: আমি তোর উপর আল্লাহর অভিশাপ দিচ্ছি। একথা তিনি ৩ বার বলেন। এছাড়াও তিনি শয়তানকে আল্লাহর দুশমন একথা বলে গালি দিয়েছেন। জিন তাড়ানোর ক্ষেত্রে কোরআন ও হাদীসের সমর্থিত এ সকল পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত।
৪. জিনকে হত্যা করা কিংবা বন্দী করা
উপরোক্ত পদ্ধতিসমূহ প্রয়োগের পরও যদি জিন না যায় এবং তাকে হত্যা করার প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন তাই করতে হবে। এছাড়াও জিন যদি কোন মহিলা কিংবা পুরুষের সাথে অশ্লীল কাজে লিপ্ত হয়, তাহলেও তাকে হত্যা করা যাবে। ইসলামে এ সকল অপরাধের শাস্তি হত্যা। হযরত সোলায়মান (আঃ) অবাধ্য জিনকে বন্দী করে সাগরে ফেলে দিয়েছিলেন। আগে আমরা তা উল্লেখ করেছি।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রঃ) বলেন: জিনকে হত্যা বা বন্দী করার মত অবস্থা সৃষ্টি না হলে এ চরম পদ্ধতির প্রয়োগ নিষিদ্ধ। কেননা, এর ফলে জিনেরা প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করতে পারে। তখন প্রাণহাণির আশঙ্কা দেখা দেয়। এজন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রদর্শিত ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ পন্থায় অগ্রসর হতে হবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুগত বান্দাহ কারো উপর জুলুম করে না। বরং ন্যায়সঙ্গত উপায়ে মজলুম ও বিপদগ্রস্ত লোকের বিপদ দূর করার চেষ্টা চালায়।
জিন তাড়ানোর এ সকল প্রক্রিয়া সম্পর্কে ডঃ মোহাম্মদ নাগাস বলেন: ১. জিন যে কারণে শরীরে প্রবেশ করেছে, সে কারণ অনুযায়ী চিকিৎসার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যদি মানুষ বিসমিল্লাহ না বলে উপর থেকে নিচে লাফ দেয়ার কারণে জিনের উপর পড়ে থাকে এবং গরম পানি নিক্ষেপ কিংবা টয়লেটে দোআ না পড়ে পানি ব্যবহার করে থাকে যা জিনের উপর পড়ে তার কষ্টের কারণ হয়েছে। এ জাতীয় কষ্টদান মানুষের ইচ্ছাকৃত নয়। এজন্য জিন তাকে পাল্টা শাস্তি দিতে পারে না।
জিন যদি কোন মানুষের প্রতি আসক্ত হয়, তাহলে তাকে বুঝাতে হবে যে, এটা হারাম কাজ। পরকালে এর শাস্তি সম্পর্কে তাকে ভয় প্রদর্শন করতে হবে এবং আল্লাহর আজাব-গযবের হুমকী দিতে হবে। জিন যদি কাফের হয় এবং সে যদি শান্তিকামী না হয় এবং যাদুর স্থান ও কারা করেছে তা না বলে তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কালেমা 'লাইলাহা ইল্লাল্লাহ' দ্বারা তাকে কাবু করতে হবে। এরপরও সাড়া না দিলে তার শরীরে আরবী নূন অক্ষর লিখে তাকে আটক করে ফেলতে হবে। কেউ কেউ বলেছেন كهيعص এ পাঁচটি অক্ষর দ্বারা তাকে বন্দী করতে হবে। একটি অক্ষর কপালে আর বাকি অক্ষরগুলো দু'হাত ও দু'পায়ে লিখতে হবে। এরপর অধিক কোরআন তেলাওয়াত, আল্লাহর নামের জিকর এবং আজান দ্বারা তাকে জ্বালিয়ে দেয়া যাবে।
জিন যদি চলে যাওয়ার অঙ্গীকার করে তাহলে আল্লাহর শুকরিয়া। কিন্তু উত্তম হল বের হওয়ার আগে তার কাছ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার এবং পুনরায় ফিরে না আসার অঙ্গীকার নেয়া। সে চিকিৎসকের সাথে সাথে এ ওয়াদা উচ্চারণ করবে 'আমি আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি আমি তার শরীর থেকে বেরিয়ে যাব, পুনরায় ফিরে আসব না এবং অন্য কাউকে আর কষ্ট দেব না। আমি ওয়াদা ভঙ্গ করলে আমার উপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও সকল মানুষের অভিশাপ। হে আল্লাহ। আমি যদি সত্যবাদী হই, তাহলে আমার বেরিয়ে যাওয়াকে সহজ করে দাও। আর যদি মিথ্যুক হই, তাহলে মুমিনদেরকে আমার উপর নিয়ন্ত্রণকারী বানিয়ে দাও। আমি যা বললাম, আল্লাহকে এর উপর স্বাক্ষী রাখলাম।'
জিন ওয়াদা ভঙ্গ করলে, রোগীর কানে নিম্নোক্ত আয়াতগুলো পড়তে হবে: يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ إِنِ اسْتَطَعْتُمْ أَنْ تَنْفُذُوا مِنْ أَقْطَارِ (২) السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ فَانْفُذُوا لَا تَنْفُذُونَ إِلَّا بِسُلْطَانٍ . (সূরা আর-রাহমান-৩৩)
إِنَّهُ مِنْ سُلَيْمَانَ وَإِنَّهُ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ إِلَّا (২) تَعْلُوا عَلَى وَاتُونِي مُسْلِمِينَ . (সূরা নামল-৩০-৩১)
(৩) সূরা যিলযাল
এগুলো পড়লে জিন নতিস্বীকার করতে বাধ্য হবে। কোন কোন সময় জিন অল্প বয়স কিংবা কম অভিজ্ঞতার কারণে রোগীর শরীর থেকে বের হওয়ার পদ্ধতি নাও জানতে পারে। সে তা স্বীকার করবে এবং বেরিয়ে যাওয়ার উপায় জানতে চাবে। তখন সূরা ইয়াসিন ও সূরা আর-রাহমান পূর্ণ পাঠ করতে হবে এবং রোগীর ডান কানে আজান দিলে জিন বেরিয়ে যাবে।
মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রঃ) বলেছেন: ১. শরীরে জিন ঢুকলে রোগী অচেতন হয়ে পড়ে। ঢুকার সময় অনেকের বুকে ব্যথাও হয়ে থাকে এবং দাঁতে খিল লাগে, চোখ বন্ধ করে রাখে যা খোলা খুবই কষ্টকর। রোগীর দাঁত ও চোখ খোলার জন্য জোরাজুরি করা উচিত নয়। রোগের চিকিৎসা হলে এগুলো এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে।
তাঁর মতে, জিন তাড়ানোর জন্য জিনকে হাজির করা দরকার। অনেক সময় জিন রোগীর উপর আছর করে চলে যায়। মাঝে মাঝে আসে। চিকিৎসক তাকে তাড়ানোর চেষ্টা করলে সে যদি অনুপস্থিত থাকে তাহলে কিভাবে তাড়াবে? জিন হাজির করার জন্য তিনি কিছু পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন। যথা:
টিকাঃ
১. সাপ্তাহিক আল-মোসলেমুন-সংখ্যা-২৫৩, ৮-১৪ ডিসেম্বর-১৯৮৯ জেদ্দা।
১. বেহেশতী জেওর-৯ম খণ্ড।
📄 জিনকে আটক করা
মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রঃ) জিনকে আটক করার জন্য কিছু পদ্ধতির কথাও উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হল-
১. ৫ হাত সূতাকে পাকিয়ে দ্বিগুণ করতে হবে। তারপর-
إِنَّهُمْ يَكِيدُونَ كَيْدًا وَأَكِيدُ كَيْدًا : فَمَهِّلِ الْكَافِرِينَ أَمْهِلُهُمْ رُوَيْدًا . (সূরা তারেক ১৫-১৭)
এ আয়াতটি ২৫ বার পড়বে এবং প্রত্যেকবার রশির একটি গিরায় ফুঁ দেবে। এটা আগেই প্রস্তুত করে রাখতে হবে। জিন হাজির হয়ে রোগীর শরীরে প্রবেশ করলে রোগি চোখ বন্ধ এবং দাঁত খিল মেরে থাকবে। তখন চুপে চুপে তাড়াতাড়ি রোগীর বাম বাহুতে শক্ত করে রশিটি বেঁধে দিতে হবে এবং একবার নিম্নোক্ত আয়াতটি পড়ে বাঁধা সূতার উপর ফুঁ দিয়ে রুমাল দ্বারা ঢেকে রাখতে হবে যেন রোগী তা স্পর্শ করতে না পারে।
فَالْقَوْا حِبَالَهُمْ وَعِصِيَّهُمْ وَقَالُوا بِعِزَّةِ فِرْعَوْنَ إِنَّا لَنَحْنُ الْغَالِبُونَ - إِنَّا إِلَى رَبَّنَا مُنْقَلِبُونَ .
২. জিন হাজির হয়ে রোগীর শরীরে প্রবেশ করলে একটা ছুরি বা চাকুর উপর তিনবার নিম্নোক্ত দোআটি পড়ে ফুঁ দিতে হবে এবং তা দিয়ে রোগীর চারদিকে মাটিতে গোল দাগ দিলে জিন পালাতে পারবে না।
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ، لَا إِلَهَ إِلَّا الله - گرد با گرد هزار حصار باد مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللهِ - گردان حصار بستم قفل - لا إله إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللَّهِ صُمٌّ بُكْمٌ عُمْيٌ فَهُمْ لَا يَرْجِعُوْنَ .
৩. হঠাৎ জিন হাজির হলে এবং রোগী চোখ বন্ধ করলে সূতা বা ছুরি না পেলে ৬ বার নিম্নোক্ত আয়াতটি পড়ে রোগীর বাম হাতের বাহু খুব জোরে চেপে ধরে নিয়ত করতে হবে। আমি তাকে ধরেছি, সে ছুটতে পারবে না।
أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُوْنَ .
(সূরা আল-মুমেনূন-১১৫)
📄 জিনের শাস্তি
চিকিৎসক কামেল-বুজুর্গ হলে তিনি কখনও প্রথমে জিনকে শাস্তি দেবেন না। কেননা, কোন কোন সময় এর পরিণাম খুবই খারাপ হয়ে থাকে। কাজেই প্রথমাবস্থায় তিনি সহজভাবে নিজস্ব প্রভাব দ্বারা জিনকে রোগী থেকে সরানোর চেষ্টা করবেন। এতে যদি কাজ না হয়, তাহলে ঐ জিনের দ্বারা তার আত্মীয়-স্বজন কেউ থাকলে তাদেরকে হাজির করতে বাধ্য করবেন এবং জিনটিকে তাদের হাতে অর্পণ করে দেবেন। তাদের কাছ থেকে লিখিত ওয়াদা রাখবেন যেন পুনরায় সে আক্রমণ করলে তাকে মেরে ফেললে বা অন্য কোন শাস্তি দিলে তারা কেউ যেন কোন আপত্তি না করে। এ চুক্তিটি খুব মজবুত হওয়া দরকার। কেননা, শেষ পর্যন্ত যদি তাকে মেরেই ফেলতে হয় তবে যেন তাকে কেউ আক্রমণ না করে। এরূপ না করে প্রথমাবস্থায় কঠোর শাস্তি দিলে বা মেরে ফেললে শেষে হাজার হাজার জিনের আক্রমণ হলে তখন বিপদের আর সীমা থাকবে না। এজন্য খুব সতর্কতার সাথে কাজ করতে হবে।
জিনকে শাস্তি দানের প্রক্রিয়াগুলো নিম্নরূপ:
১. বিনা পরীক্ষা বা পরীক্ষার মাধ্যমে জিনের আক্রমণ প্রমাণিত হলে প্রথমে তাকে অঙ্গীকার করে চলে যাওয়ার জন্য বলতে হবে। এতে সে চলে গেলে এটা খুবই নিরাপদ।
২. সহজে না গেলে ১ বোতল পানিতে ১ বার সূরা জিন প্রথম ৫ আয়াত পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে ঐ পানি খুব জোরে ৭/৮ বার রোগীর মুখে নিক্ষেপ করবে। এতে রোগী স্বেচ্ছায় চোখ বন্ধ করে আঙ্গুল দ্বারা কোন একদিকে ইশারা করবে। যদি ইশারা না করে চুপ করে থাকে, তাহলে আরো কয়েকবার জোরে মারলে রোগী চোখ বন্ধ করে মুখেই বলবে, ঐদিকে গেল। তখন ইশারাকৃত দিকে বাকি পানিটুকু ছিটিয়ে দিলে জিন পালিয়ে যাবে এবং অপেক্ষাকৃত একটু সৎ জিন হলে আর আক্রমণ করবে না।
৩. বিসমিল্লাহসহ আয়াতুল কুরসী ৭ বার এবং يَا قَهَّارُ ১০১ বার পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে ঐ পানি রোগীকে খাওয়াতে হবে।
৪. রোগীর বাম কানে নিম্নোক্ত আয়াত ৭ বার পড়ে ফুঁ দিতে হবে : وَلَقَدْ فَتَنَّا سُلَيْمَانَ وَالْقَيْنَا عَلَى كُرْسِيهِ جَسَدًا ثُمَّ أَنَابَ . -(সূরা সোয়াদ-৩৪)
৫. রোগীর কানে ৭ বার আযান এবং সূরা ফাতেহা, সূরা ফালাক, সূরা নাস, আয়াতুল কুরসী, সূরা তারেক, সূরা হাশরের ২১-২৪নং আয়াত এবং সূরা সাফ্ফাত পড়ে ফুঁ দিলে জিন চলে যাবে।
৬. রোগীর কানে সূরা আল-মুমিনুনের ১১৫-১১৮নং আয়াত জোরে জোরে পড়ে ফুঁ দিলে জিন খুব কষ্ট পেতে থাকে। রোগীর কাছে বসে ঐ আয়াতগুলো জোরে পড়তে থাকলে জিনের গায়ে জ্বালা-যন্ত্রণা সৃষ্টি হয়। জিনেরা এ আয়াতগুলোকে খুব ভয় পায়।
৭. রোগীর দু'পাশে দু'জন হাফেজ বসে সূরা সাফফাত দু'বার পড়লে জিন জ্বলে যায়।
৮. মাটিতে কৃত্রিম ও কুৎসিত শয়তানের মূর্তি এঁকে সূরা সাফফাতের প্রথম হতে طِبْنٌ لَازِبٌ পর্যন্ত একবার পড়ে ডালিমের ডাল দ্বারা ঐ মূর্তির উপর সজোরে এক নিঃশ্বাসে ১৫/১৬টি আঘাত করলে এবং রাগান্বিত অবস্থায় এ ধারণা করলে যে, আমি উক্ত জিনের হাড় ভেঙ্গে ফেলে দিচ্ছি, তাহলে নিশ্চয়ই জিন পলায়ন করবে এবং যা ইচ্ছা তাই তাকে দিয়ে বলানো যাবে। যখন অসংখ্য জিনের আক্রমণ হয়, তখনও এর দ্বারা বিশেষ ফল পাওয়া যায়।
৯. সূরা জিন ৭ বার পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে ঐ পানি রোগীর মুখে ছিঁটিয়ে দিলে জিন কথা মানতে বাধ্য হবে।
১০. নিম্নোক্ত ৩৩ আয়াত সম্পূর্ণ পড়ে রোগীকে ফুঁ দিলে জিন পালিয়ে যায়। গভীর নিদ্রা হয়ে রোগী সুস্থ হয়ে যাবে। পানিতে ফুঁ দিয়ে যেখানে ছিটিয়ে দেবে সেখানে জিন-শয়তান থাকতে পারে না। এর আরো বহু গুণাগুণ রয়েছে। চিকিৎসক ক্রমান্বয়ে তা লক্ষ্য করতে পারবেন। আয়াতগুলো হল- সূরা ফাতেহা, সূরা বাকারার ১ম ৫ আয়াত, ১৬৩নং আয়াত, আয়াতুল কুরসী (অর্থাৎ সূরা বাকারার ২৫৫ ও ২৫৬ নং আয়াত) সুরা বাকারার শেষ তিন আয়াত, সূরা আলে ইমরানের ১৮ নং আয়াত, সূরা আরাফের ৫৪ নং আয়াত, সূরা মুমেনূন-এর ১১৬-১১৮নং আয়াত, সূরা সাফফাতের ১ম ১১ আয়াত, সূরা হাশরের ২২-২৪নং আয়াত, এরপর إِنَّهُ تَعَالَى جَدُّ رَبَّنَا مَا اتَّخَذَ صَاحِبَةٌ وَلَا وَلَدًا সূরা এখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস এবং সবশেষে এ দোআটি:
بِسْمِ اللهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ . وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ . وَصَلَّى اللَّهُ عَلَى النَّبِيِّ وَآلِهِ وَسَلَّمَ .
১১. একাধিক কিংবা শত শত জিনের আক্রমণ হলে রোগীর কাছে বসে একজন সূরা ইউনুস এবং আরেকজন সূরা ইয়াসিন জোরে জোরে পড়বে। একজন সূরা সাফফাত পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে ঐ ঘরে ছিঁটাবে। রোগীর মুখেও কিছু ছিঁটাবে। তখন ৪ জন হাফেজে কোরআন রোগীর ২ হাত ও ২ পায়ের কাছে বসে প্রত্যেকেই সূরা জিন শেষ করে রোগীর হাত পায়ের আঙ্গুল একটু জোরে টানবে এবং নিয়ত করবে যে সে জিনকে ছিঁড়ে ফেলছে। এরূপ করলে জিন আহত হবে ও শাস্তি পাবে। কিন্তু রোগী মেয়েলোক হলে এরূপ করা যাবে না। তখন ৮নং তদবীর করতে হবে। অসংখ্য জিনের আক্রমণ হলে ৮নং এবং ১১নং তদবীরের বিশেষ উপকারিতা পাওয়া যাবে। তবে এর সাথে সূরা মুমিনুনের أَفَحَسِبْتُمُ আয়াতটিও জোরে পড়তে হবে।
১২. জিনেরা দলে দলে আক্রমণ করলে তখন কয়েকজন হাফেজে কোরআনকে রোগীর নিকট রাখা চাই। তারা নাবালেগ হলে ভাল। তারা জোরে সূরা সাফফাত-এর প্রথম ৫ আয়াত, সূরা মুমিনুনের أَفَحَسِتُمْ এই আয়াতটি এবং সূরা জিনের ১ম চার আয়াত পড়বে।
১৩. পরিস্থিতি এরূপ ভয়াবহ রূপ ধারণ করলে ৮ বার সূরা সাফফাত পুরো পড়ে প্রত্যেকবার পানিতে ফুঁ দিতে হবে। অনুরূপভাবে ৮ বার সূরা জিন পড়ে প্রত্যেক বার পানিতে ফুঁ দিয়ে ঐ পানি রোগীর কামরার বাইরে চারদিকে খুব জোরে ছিটাতে হবে এবং ধারণা করতে হবে যে, কামরায় একটা জিনও ঢুকতে পারবে না। ফলে জিনেরা সবাই একত্রিত হয়ে কামরায় ঢুকতে পারবে না। দু'একটা করে ঢুকবে। তখন ৮নং তদবীর দ্বারা শাস্তি দিতে হবে। তবে কামরার ভেতরের লোকেরা যেন ভয় না পায়। বরং উল্টা তর্জন-গর্জন করে জিনদেরকে ভয় দেখাবে।
১৪. এ সময় যদি কোন দৈত্য জিন রোগীকে তুলে নেয়ার চেষ্টা করে তখনই বাচ্চা হাফেজদেরকে রোগীর বুকের উপর বসিয়ে দেবে যেন ঐ হাফেজেরা أَفَحَسِبْتُمْ এ আয়াতটি তিনবার পড়ে নিজ শরীরের ওজন রোগীর উপর রাখে। ফলে জিন রোগীকে নিয়ে যেতে পারবে না। সাথে সাথে জিনকে কঠোর শাস্তি দিতে হবে। তাতেও যদি জিন দমন না হয়, তাহলে তাকে পুড়িয়ে মারতে হবে।
১৫. উপরোক্ত তদবীরগুলো শেষ হয়ে গেলে এবং দুর্দান্ত জিন পলায়ন না করলে শেষ পর্যায়ে নিম্নের কথাগুলো একটি কাগজে লিখে ভাঁজ করতে হবে।
فِرْعَوْنَ هَامَانَ قَارُونَ نَمْرُودُ إِبْلِيسُ كُلُّهُمْ فِي النَّارِ وَإِخْوَانُهُمْ واحبابهم .
এরপর তাতে বাদام তেল মাখিয়ে লোহা দ্বারা আগুনে ধরবে, হাতে ধরা যাবে না। রোগীর নাক সোজা আধা হাত নিচে কাগজটি পুড়িয়ে দেবে। একটি কাগজ পোড়া হলে একটি জিন পুড়ে যাবে। এ তদবীরে যাদু ও জিন পুড়ে মরবে। জিনের প্রবল আক্রমণের সময় এটাই একমাত্র মারণাস্ত্র। জিন জ্বলে গেলে রোগী চেতনা লাভ করবে এবং তার জিহ্বা বেরিয়ে আসবে। খুব পানি পান করতে চাইবে। তখন বেশি পানি পান করতে দিতে হবে। মাওলানা থানবী (রঃ) বলেন : এটা আমার বহু পরীক্ষিত এবং এক জিন থেকে তা শিক্ষাপ্রাপ্ত। এ সময় জিনকে খুব কষ্ট দিয়ে মারতে হলে أَفَحَسِبْتُمْ আয়াতটিও পড়তে হবে।
অন্য পদ্ধতিতে জিনকে শাস্তি কিংবা পোড়াবার সময় যাদু দ্বারা প্রবিষ্ট জিন আগুন দ্বারাও পুড়তে চায় না। এমন হলে, রোগীর মুখে একবার থুথু দিলে যাদু নষ্ট হয়ে যায়। দূর থেকে তাকিয়ে থাকলেও ঐ লেখাযুক্ত কাগজের মাধ্যমে জিন পুড়ে যাবে।
• উল্লেখিত সকল চিকিৎসা প্রক্রিয়ার মূল উৎস হল কোরআন এবং আল্লাহর সাহায্য ও আশ্রয় গ্রহণ। প্রত্যেক চিকিৎসকের তাকওয়া-পরহেজগারী, অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতা জিন আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার মৌলিক বিষয়। আল্লাহর রহমতের কাছে শয়তানের কলাকৌশল অত্যন্ত দুর্বল।
জিন আক্রান্ত রোগীসহ বিভিন্ন রোগীর চিকিৎসার উদ্দেশ্যে কালি দিয়ে কোরআনের আয়াত লেখা এবং তা ধুয়ে পান করা জায়েয। ইমাম আহমদসহ অন্যদের মত তাই। তারা প্রমাণ হিসেবে বলেছেন, হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বিপদগ্রস্ত লোকদেরকে বিপদের দোআ এবং কোরআনের নিম্নোক্ত দু'টো আয়াত লিখে দিয়েছেন:
لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ الْعَظِيمُ الْحَلِيمُ . سُبْحَانَ اللَّهِ رَبِّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ .
كَأَنَّهُمْ يَوْمَ يَرَوْنَهَا لَمْ يَلْبَثُوا إِلَّا عَشِيَّةً أَوْ ضُحَاهَا . -(সূরা নাযিআত-৪৬)
كَأَنَّهُمْ يَوْمَ يَرَوْنَ مَا يُوعَدُونَ لَمْ يَلْبَثُوا إِلَّا سَاعَةً مِّنْ نَّهَارٍ بلاغ ، فهل يهلك الا القوم الظالمون . -(সুরা আহকাফ-৩৫)
ওলামায়ে কেরাম বলেছেন, দুর্বোধ্য শব্দ ও বাক্য দ্বারা কোন রোগের চিকিৎসা করা যাবে না। তাতে শিরক ও বেদআতের শব্দাবলী থাকতে পারে। নবী করীম (সঃ) শিরক না হলে যেকোন বাক্য দিয়ে ঝাড়-ফুঁকের অনুমতি দিয়েছেন এবং বলেছেন, কেউ যদি তার মুসলিম ভাইয়ের উপকার করতে পারে সে যেন তা করে। আল্লাহর কোরআনই জিন-ভূতের আক্রমণের চিকিৎসার জন্য যথেষ্ট। অন্যান্য রোগেরও চিকিৎসা করা যায়। আল্লাহ এ কোরআনকে মানুষের শরীর ও মনের চিকিৎসা, রহমত ও আশীর্বাদ হিসেবে নাজিল করেছেন। কোরআনের আয়াতের যে ফজীলত, আল্লাহর নাম ও জিকিরের যে বরকত- তা অন্য কিছুতে নেই। এর ফলে রোগ নিরাময় খুবই সহজসাধ্য ব্যাপার।
📄 যে সব কারণে জিন বশীভূত হয়
কাফের ও জিন শয়তান কুফর, শিরক এবং আল্লাহর নাফরমানীকে পসন্দ করে। এজন্য তারা মন্দ কাজ, কামনা-বাসনা, গোমরাহী, ধোঁকাবাজি ইত্যাদিতে জড়িত থাকে এবং আল্লাহর শাস্তির যোগ্যতা অর্জন করে।
মানুষের মন-মানসিকতা ও মেজাজ-মর্জী নষ্ট হলে ক্ষতিকর ও লোভনীয় জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তখন তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি, দীনদারী, চরিত্র, শরীর ও সম্পদ নষ্ট হয়। শয়তান নিজেই খবীস। তাই সে তাবিজ-তুমার, যাদু-মন্ত্র ইত্যাদির প্রতি আকৃষ্ট হয়। কুফর-শিরক জাতীয় তন্ত্রমন্ত্র তার কাছে খুব লোভনীয়। বরং এটা শয়তানের প্রতি তাদের ঘুষ। এ ঘুষের কারণে শয়তান তাদের এমন কিছু প্রয়োজন পূরণ করে দেয় যা নাজায়েয। যেমন, কেউ কাউকে হত্যার জন্য কিংবা অশ্লীল কাজ করার জন্য টাকা-পয়সা দেয়। তাবিজ-তুমার ও মন্ত্রকারীরা নাপাক জিনিস দিয়ে আল্লাহর বাণী লেখে, কোন সময় সূরা এখলাসের আয়াতগুলোকে নাপাক জিনিস, রক্ত ও ময়লা-আবর্জনা দিয়ে উল্টা করে লেখে। শয়তান তাতে খুব সন্তুষ্ট হয়। তারা শয়তানকে সন্তুষ্টকারী কথা-বার্তা বলে কিংবা লেখা লিখে, পানি ঘোলা করে, বিসমিল্লাহ না বলে কোন কিছু খায় বা জবেহ করে। তাতে শয়তান সন্তুষ্ট হয়ে তাদের কিছু ইচ্ছা ও কামনা-বাসনা পূরণে সাহায্য করে।
মোহাম্মদ বিন ইসহাক নাদীম তাঁর 'ফেহরেস্ত' কিতাবে লিখেছেন, কোরআন ও হাদীসের অনুসারী চিকিৎসকরা মনে করেন, তারা আল্লাহর আনুগত্য করার কারণে, আল্লাহর কাছে কাকুতি-মিনতি, শয়তান ও প্রেতাত্মা থেকে পানাহ, খারাপ কামনা-বাসনা থেকে দূরে অবস্থান এবং ইবাদাতের কারণে জিন-ভূত তাদের কথা শুনে। আল্লাহর দোহাই বা কসম অথবা আল্লাহর ভয়ে জিনেরা তাদের আনুগত্য করে। কেননা, আল্লাহর নামের মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা তাদেরকে পরাভূত ও অপমানিত করতে সক্ষম।
পক্ষান্তরে, পাপী ও অনিষ্টকারী যাদুকর ও মন্ত্রকারীরা মনে করে, শয়তান, জিন ও প্রেতাত্মা তাদের আনুগত্য ও আদেশ-নিষেধ মেনে চলে। তারা তাদেরকে দাস হিসেবে ব্যবহার করে এবং গুনাহ, হারাম ও নিষিদ্ধ কাজের নজরানা পেশ করে। তারা আল্লাহর ঐ সমস্ত আদেশ-নিষেধ অমান্য করে যার দ্বারা শয়তান সন্তুষ্ট হয়। যেমন, নামাজ-রোজা ত্যাগ করা, খুন-খারাবী করা, মুহরিম নারীকে বিয়ে-শাদী করা ইত্যাদি।
যাদুসহ খারাপ পদ্ধতি অনুসরণের ব্যাপারে মোহাম্মদ ইবনে ইসহাক নাদীম বলেছেন, ইবলিশ কন্যা মাদাখ তাদেরকে ঐ কাজের অনুমতি দিয়েছে। বলা হয় যে, মাদাখ হল ইবলিশের ছেলের কন্যা। সাগরে মাদাখের সিংহাসন আছে। কেউ যখন তার সন্তুষ্টি কামনা ও অবৈধ কাজের সাহায্য চায় তখন সে এ সকল খারাপ কাজে সাহায্য করে থাকে।
কেউ কেউ বলেছেন, ইবলিশ নিজেই মাদাখ। অন্যদের মতে, মাদাখ তার আসনে বসা থাকে। তার অনুগতরা তাকে সাজদা করে। এরপর সে তার নৈকট্য অর্জনকারীদের ইচ্ছা পূরণের নির্দেশ দেয়।
ইবনে তাইমিয়া (রঃ) বলেছেন। যারা জিনদেরকে খারাপ কাজে ব্যবহার করে তাদের অনেকের ধারণা, হযরত সোলায়মান (আঃ) জিনদেরকে ঐ সকল মন্ত্রতন্ত্র ও খারাপ পদ্ধতি প্রয়োগ করে ব্যবহার করেছেন। একাধিক অতীত বুজুর্গানে বলেছেন, সোলায়মান (আঃ)-এর ইন্তেকালের পর শয়তান কুফরী ও যাদুবিদ্যা লিখে তাঁর সিংহাসনের নিচে রেখে দেয় এবং প্রচার করে বেড়ায় যে, সোলায়মান (আঃ) জিনদেরকে ব্যবহার করার জন্য এ বিদ্যা প্রয়োগ করতেন। ফলে আহলে কিতাবের একটি দল সোলায়মান (আঃ)-এর সমালোচনা করে। পক্ষান্তরে, আরেক দল মনে করে, এটা যদি সত্য ও জায়েয না হত, তাহলে সোলায়মান (আঃ) তা কিভাবে প্রয়োগ করেছেন? সোলায়মান (আঃ)-এর প্রতি ত্রুটির কারণে উভয় দলই গোমরাহ হয়েছে।
ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, শয়তানের অনুসারী মন্ত্রকারীরা অনেক সময় তাদের মন্ত্রতন্ত্র কিংবা তাবিজ-তুমার দিয়ে জিনকে প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়। তারা মানুষের উপর আক্রমণকারী জিনকে আটক কিংবা হত্যা করতে সক্ষম হয় না। তা সত্ত্বেও তাদের ধারণা যে, তারা জিনকে আটক কিংবা হত্যা করতে পেরেছে। শয়তান আওয়াজ বিকৃত করে তাদেরকে ভুল ধারণা দেয়ার চেষ্টা করে। মূলকথা, এ সকল মন্ত্রবাজ ও যাদুকরদের কাছে যাওয়া হারাম।