📄 জিনে ধরা রোগীর চিকিৎসার শর্তাবলী
আল্লাহ কোরআন মজীদে বলেছেন: إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُمْ مُّبْصِرُونَ .
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলে এমন মোত্তাকীদের উপর শয়তানের আক্রমণ হলে তারা সাথে সাথে সতর্ক হয়ে যায় এবং তখনই তাদের বিবেচনা শক্তি ও বিবেক জাগ্রত হয়ে উঠে।” -(সূরা আ’রাফ-২০১)
এ আয়াতে তাকওয়া এবং এর দাবী অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণকে জিন-শয়তানের আগ্রাসন ও আক্রমণের চিকিৎসার মৌলিক শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ চিকিৎসার সকল পদক্ষেপ হবে কোরআন ও হাদীস ভিত্তিক। চিকিৎসক ও রোগী এবং চিকৎসার সাথে জড়িত সকলকে তাকওয়ার অনুসারী হতে হবে। তা না হলে কোরআনী চিকিৎসায় আশাপ্রদ ফল লাভ হবে না। তাকওয়ার কাছে শয়তান পরাজিত।
২য় মৌলিক শর্ত হল, এখলাস ও একনিষ্ঠতা অর্থাৎ নির্ভেজাল আকীদা ও আমল। একথা শয়তানের মুখ দিয়ে কোরআনে বর্ণিত হয়েছি। সে বলেছে: قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلِصِينَ .
"শয়তান বলে, হে আল্লাহ! আমি আপনার ইজ্জতের শপথ করে বলছি, আমি আপনার মোখলেস ও একনিষ্ঠ বান্দাহগণ ব্যতীত অন্য সবাইকে গোমরাহ করে ছাড়ব।” আল্লাহ এর জবাবে বলেন: إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ .
"আমার যারা খাঁটি বান্দাহ তাদের উপর তোর কোন শক্তিসামর্থ্য নেই।" মোখলেস বা একনিষ্ঠ বান্দাহর কাছে শয়তান এসে সফল হতে পারে না।
চিকিৎসা ও প্রতিকারের ৩য় মৌলিক বিষয় হল, আল্লাহর জিকর এবং প্রতিরক্ষা ও প্রতিকার সংক্রান্ত মহানবী (সঃ)-এর কাছ থেকে বর্ণিত দোআ-প্রার্থনাসমূহ। দোআ ও জিকর-আজকার মুমিনের জন্য শয়তানের বিরুদ্ধে দুর্ভেদ্য দুর্গ। নবী করীম (সঃ) বলেছেন, তোমাদের যদি কোন দুর্গ থাকে এবং তাতে কেউ প্রবেশ করে গেট বন্ধ করে দিলে দুশমন কি তাতে প্রবেশ করে তার কোন ক্ষতি করতে পারবে?
ঠিক আল্লাহর জিকর-আজকার এবং দোআ-প্রার্থনাও তেমনি দুর্ভেদ্য দুর্গ যা ভেদ করে শয়তান ক্ষতি করতে পারে না। ১
শয়তান কেবলমাত্র আল্লাহকেই ভয় পায়। তাই আল্লাহর কালাম বা বাণী এবং আল্লাহর জিকর ও বিভিন্ন দোআ দ্বারাই কেবল তাকে কাবু করা যায়। মুমিনের জন্য অন্য কোন বিকল্প নেই। তাকে শয়তানের বিরুদ্ধে কেবলমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে। স্বয়ং নবী করীম (সঃ)-ও একই পদ্ধতিই অবলম্বন করেছিলেন। তিনি জিন ও মানুষ উভয় সম্প্রদায়ের নবী হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা ছাড়া আর কোন ভিন্ন ও বিকৃত পন্থা অবলম্বন করেননি।
জিন আক্রান্ত রোগীর সফল চিকিৎসার জন্য নিম্নোক্ত শর্তাবলী পূরণ হওয়া দরকার। চিকিৎসার গোটা প্রক্রিয়ায় গুনাহ ও আল্লাহর নাফরমানী থাকতে পারবে না। শর্তাবলী হচ্ছে:
১. ঘর থেকে ছবি, প্রতিকৃতি, মূর্তি সরিয়ে ফেলতে হবে। ঘরে কুকুর ও শুকর থাকতে পারবে না। এগুলো ঘরে থাকলে রহমতের ফেরেশতা ঢুকে না।
২. রোগীর হাতে, পায়ে বা গলায় তাবিজ-তুমার, ঝিনুক-শামুক, তাগা থাকলে খুলে ফেলতে হবে।
৩. চিকিৎসার স্থানকে গান-বাজনা ও নাচমুক্ত হতে হবে।
৪. শরীয়তবিরোধী কার্যক্রম মুক্ত থাকতে হবে। যেমন, পর্দাহীনতা, বেহায়াপনা, নগ্নতা, পুরুষের সিল্ক পোশাক ও সোনা-রূপা পরা ইত্যাদি।
৫. মুহরিম আত্মীয় ছাড়া কোন মহিলা রোগীর চিকিৎসা করা যাবে না এবং কোন অমহরম ব্যক্তি সেখানে প্রবেশ করতে পারবে না।
৬. উত্তম হল, কোরআনী চিকিৎসক অজু অবস্থায় চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করবেন এবং কোরআন তেলাওয়াত করবেন। রোগীকেও পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা অর্জন এবং অজুর আদেশ দেবেন। এভাবে একটা নির্মল ও স্বচ্ছ নৈতিক পরিবেশ তৈরি করে চিকিৎসা শুরু করতে হবে।
টিকাঃ
১. দৈনিক আল-বেলাদ-সংখ্যা-৯১৭৩, ২০শে মে, ১৯৮৯।
📄 জিন-ভূতের আক্রমণের কারণ
জিন বিভিন্ন কারণে মানুষের ক্ষতি করে এবং তাদের উপর সওয়ার হয়। সে কারণগুলো জানা থাকলে জিনের আক্রমণ থেকে বাঁচা সহজ। কারণগুলো হলঃ
১. জিনের উপর মানুষের জুলুম এবং জিনকে কষ্ট দেয়া। যেমন, বিসমিল্লাহ না বলে গরম পানি নিক্ষেপ করা। ক্ষতি না করলে কুকুর ও বিড়াল হত্যা না করা। ঘরে সাপ দেখলে তাকে চলে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানানো। এগুলো জিনও হতে পারে।
২. গর্তে পেশাব করা। কেননা, গর্তে জিন থাকে।
৩. বিসমিল্লাহ না বলে উপর থেকে লাফ দেয়া। মানুষ অজান্তেই এগুলো করে থাকে। কিন্তু তাতে জিনেরা কষ্ট পায়। জিনের মধ্যে অনেক অজ্ঞ-মূর্খ আছে, তারা ন্যায্য শান্তির অধিক প্রতিশোধ নেয়।
৪. বিনা কারণেই দুষ্ট জিনেরা মানুষের ক্ষতি করে। তাদের উদাহরণ হল, দুষ্ট মানুষের মত। তারা বিনা কারণে মানুষকে কষ্ট দেয়।
৫. অশ্লীল কাজ করলে জিনের আক্রমণ হতে পারে।
৬. গান-বাজনা, নাচ, ঢোল-তবলা বাজালে এবং মদপানসহ গুনাহর কাজ করলে জিনের আক্রমণ হতে পারে।
৭. কোরআন তেলাওয়াত ও আল্লাহর জিকর-আযকার এবং সকাল-সন্ধ্যাসহ বিভিন্ন কাজের জন্য নির্দিষ্ট দোআ-দরূদ না পড়লে জিনের আক্রমণ হতে পারে।
৮. সন্ধ্যায় শিশু ও বেপর্দা মহিলাদের ঘরের বাইরে অবস্থান জিনের আক্রমণের অন্যতম কারণ।
৯. নারীর প্রতি পুরুষ জিনের কিংবা পুরুষের প্রতি পরী জিনের আকর্ষণ আক্রমণের অন্যতম কারণ।
১০. সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে, বিসমিল্লাহ না পড়ে সতর খুললে এবং জিন সে সতর দেখলে মানুষকে কষ্ট দেয় ও সতর উপভোগ করে। বিসমিল্লাহ হল সতর এবং জিনের চোখের মাঝে আড়াল। তাই বিসমিল্লাহ বলে সতর খোলা উচিত।
শেখ আলী বিন মোশরেফ ওমরী বলেন: সতরের কারণে অনেক জিন-আক্রান্ত রোগীর ঘটনা আমার জানা আছে। একটি ঘটনা হল, এক মহিলা গোসলখানায় গোসল করার সময় জিনের আক্রমণের শিকার হয়। আমি মহিলাটিকে বিসমিল্লাহ বলে গোসল শুরু করেছে কিনা জিজ্ঞেস করায় সে 'না' সূচক জবাব দেয়। আমি জিনকে আক্রমণের কারণ জিজ্ঞেস করায় সে বলল: মহিলাটি সতর খোলায় আমি তাকে দেখে আশ্চর্যবোধ করেছি এবং সেজন্য তার উপর সওয়ার হয়েছি। সে যদি দোআ পড়ে গোসলখানায় ঢুকত তাহলে আমি তার উপর আক্রমণ করতে পারতাম না। ১-
বিশুদ্ধ হাদীসে এসেছে, তোমাদের যে কেউ যেন স্ত্রী সহবাসের সময় এ দোআ পড়ে:
بِسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَيْبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتُنَا .
"আল্লাহর নামে শুরু করছি। হে আল্লাহ! আমাদেরকে শয়তান থেকে এবং শয়তানকে আমাদেরকে প্রদত্ত রিজক ও নেয়ামত ভোগ থেকে দূরে রাখুন।" তাহলে, ঐ বীর্য দ্বারা কোন সন্তান জন্ম নিলে শয়তান তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।
১১. জিনের ঝাড়-ফুঁক করলে জিন ক্ষতি করার চেষ্টা করে। জিনের ঝাড়-ফুঁককারীদেরকে নির্ভিক হতে হবে। ভয় করলে ভয়ের মাধ্যমে শয়তান শরীরে ঢুকে ক্ষতি করতে পারে।
শেখ ওমরী বলেন: আমি আমার ঘরে আলো জ্বলতে এবং নিভতে দেখি। এটাকে জিনের কারবার মনে করে বলি, তোরা যা ইচ্ছা কর, আমি কিন্তু তাতে ভয় পাই না। ২
টিকাঃ
১. দৈনিক আল-বেলাদ, সংখ্যা-৯১৭২, ২০ মে, ১৯৮৯ জেদ্দা, সৌদী আরব।
২. ঐ
📄 জিনের আক্রমণের সুযোগ
জিন মানুষকে আক্রমণের জন্য যে সকল সুযোগের সদ্ব্যবহার করে সেগুলো হলঃ
১. কঠোর রাগ-গোস্বা: মানুষ বেশি রাগ করলে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারে। যারা রাগী, জিন তাদের রাগের সদ্ব্যবহার করে আক্রমণের পথ রচনা করে। এজন্য মহানবী (সঃ) রাগ না করার এবং তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার উপদেশ দিয়েছেন।
২. কঠোর ভয়-ভীতি: অনেকে ভীরু প্রকৃতির লোক। তারা বেশি ভয় পায়। যে যত বেশি ভয় পায় জিন তাকে তত দুর্বল মনে করে। দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার সর্বত্র পরিলক্ষিত হয়। সাহসী লোকেরা অজেয়কে জয় করতে এবং দুর্গমকে সুগম করতে পারে। দুর্বলের স্থান না আছে মানক জগতে, আর না আছে জিনের জগতে।
৩. যৌন কামনা-বাসনা জিনের আক্রমণের বিশেষ ক্ষেত্র। এ বিষয়ে সতর্কতার প্রয়োজন সর্বাধিক। সুন্দরী নারী কিংবা সুদর্শন পুরুষের প্রতি জিনের আক্রমণের আশংকা থাকে। যে সকল মহিলারা সেন্ট মেখে বাইরে যায় এবং বেপর্দা ঘুরাফিরা করে তারা জিনের অন্যতম শিকার। অশ্লীল ও যৌন ফিল্ম দেখলেও আক্রমণ হয়। যৌন গান-বাজনাও আক্রমণের অন্যতম কারণ।
৪. কঠোর উদাসীনতা: বহু নারী-পুরুষ উদাসীন থাকে। কোন কাজেই তারা সিরিয়াস নয়। এ জাতীয় লাগামহীন উদাসীনতা জিনের পাথেয়।
টিকাঃ
১. দৈনিক আল-বেলাদ-সংখ্যা-৯১৭৩, ২০ শে মে, ১৯৮৯ সৌদি আরব।
২. ঐ
📄 নারীরা কেন জিনের আক্রমনের বেশী শিকার?
জিন আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা সর্বাধিক। এর কারণ হচ্ছে নিম্নরূপঃ
১. শারীরিক দিক থেকে নারী পুরুষ অপেক্ষা দুর্বল। দুর্বলের উপর জিনের অত্যাচার বেশি হয়।
২. বেপর্দা নারী জিনের যৌন খোরাক। উগ্রভাবে চলাফেরা করলে, উলঙ্গপনা ও বেহায়াপনা প্রদর্শন করলে জিন তাদের প্রতি আসক্ত হয়। আওলা কেশী ও খোলা মাথায় চললে জিন তাদের উপর আক্রমণ করে।
৩. অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্নতা : নারীরা ঋতুস্রাবের সময় অপরিস্কার থাকে। এটা জিনের জন্য খুবই প্রিয় সময়। তখন সতর্ক না হলে বিপদ আছে। জিন থেকে বাঁচার চেষ্টা চালাতে হবে। তাই তাদেরকে মার্জিত ও পরিচ্ছন্নভাবে চলতে হবে।
৪. অশিক্ষা-কুশিক্ষার কারণে অনেকেই বহু কুসংস্কারে জড়িত থাকে। নারীরা সে কুসংস্কারে বেশি অগ্রসর থাকে। শয়তান এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে।
৫. জিন থেকে রক্ষার ব্যাপারে বিভিন্ন দোআ পড়েনা কিংবা অলসতা করে। নারীর প্রতি শয়তানের লোলুপ দৃষ্টি প্রথম থেকেই রয়েছে। সে এ সকল সুযোগের সদ্ব্যবহার করে।
যে নারী পর্দা করে, মাথায় কাপড় রাখে, পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে, নামাজ-রোজা ঠিকমত করে, জিকর-আজকার করে, দোআ পড়ে এবং নিয়মিত কোরআন মজীদ তেলাওয়াত করে, তাদের কাছে জিন খুব কম আসে। কেননা, আল্লাহ তাদেরকে হেফাজত করেন। ফেরেশতারা তাদের হেফাজতে নিয়োজিত থাকেন। অবশ্য শয়তান তাদেরকে অন্যান্য মানুষের মত ওয়াসওয়াসা দান করা থেকে বিরত থাকে না। সাধারণত মুর্খ ও গরীব লোকেরাই জিনের আক্রমণের বেশি শিকার। শিক্ষিত লোকদেরকে জিনে কম ধরে।
৬. নারী সংসারে নির্যাতন ও দুঃখ-কষ্টের অবসানের লক্ষ্যে জিনে ধরার মত নাটকীয় মহড়া প্রদর্শন করে সংশ্লিষ্ট সকলের সহানুভূতি ও স্নেহ-ভালবাসা লাভের কৃত্রিম প্রচেষ্টা চালায়। এটাতে কেউ কেউ সফলও হয়েছে। একবার জিন তাড়ানোর উদ্দেশ্যে আগত এক চিকিৎসক যখন বুঝলেন যে তা আদৌ জিনের রোগী নয়, তখন তিনি রোগীকে গোপনে জিনে ধরার ভান করার কারণ জিজ্ঞেস করেন। বধু তাকে গোপনীয়তা রক্ষার আবদার জানিয়ে বলেন, আমি স্বামীর সংসারে শাশুড়ী, ননদ ও অন্যদের দ্বারা অত্যাচারিত। অনন্যোপায় হয়ে জিনে ধরার ভান করেছি যেন তারা আমার সাথে ভাল ব্যবহার করে। পরে চিকিৎসক কৌশল ও প্রজ্ঞা সহকারে শ্বশুরবাড়ির সকলকে রোগীর জিন তাড়ানোর শর্ত হিসেবে পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি না করা, পুত্রবধুকে আদর-সোহাগ করা এবং সবাই মিলেমিশে থাকার পরামর্শ দেন। রোগীকে খামাখা কিছু চিকিৎসা দান করেন। তারপরে দেখা গেল, জিনের সমস্যাও নেই, পারিবারিক সমস্যাও শেষ।
এছাড়াও অন্যকোন অজ্ঞাত কারণও থাকতে পারে যা কেবলমাত্র জিনেরাই জানে। কিন্তু বাস্তব সত্য কথা হল, মহিলাদের উপর জিনের আক্রমণ বেশি হয়।