📄 জিনের আক্রমনের প্রকারভেদ
মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হাদীস শাস্ত্রের অধ্যাপক আলী বিন মোশরেফ ওমরী জিন-রোগীর একজন সফল চিকিৎসক। তিনি বলেন: আমার অভিজ্ঞতায় আমি জিনে ধরা তিন ধরনের রোগী দেখতে পেয়েছি। ২
১. রোগি হঠাৎ করে কষ্ট ও সংকীর্ণতা বোধ করে এবং ভয় পায়। সে ঘরের দেয়ালে বিভিন্ন জিনিসের কাল্পনিক ছবি দেখতে পায়, কারো কথা শুনে কিংবা কথা শুনার কল্পনা করে। সে দরজায় বা খাটে আকস্মিক শব্দ শুনে বলে ধারণা করে, অথবা কানে ঢোল-তবলার আওয়াজ পায়। তখন সে দাঁড়িয়ে থাকলে বসে পড়ে কিংবা বসে থাকলে দাঁড়িয়ে যায়। হৃদয়ে কাঁটা বিঁধলে যে রকম কষ্ট পায়, সে রকম অনুভূতি প্রকাশ করে। এ জাতীয় রোগীকে ঝাড়-ফুঁক করার পর জিন রোগীর মুখে কথা বলেছে, চলে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে এবং সর্বশেষে বেরিয়ে গেছে। ফলে রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছে।
২. রাগের সময় জিনের আক্রমণ ঘটে। মানুষ রাগ ও গোস্বা করলে জিন এ সুযোগে মানুষের ভেতর প্রবেশ করে তার ক্ষতি করে। এজন্য রাগ করা ঠিক নয়। ইসলামে ধৈর্য্য ধারণের উপর অত্যাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। রাগের মুহূর্তে ধৈর্যই হল উত্তম পদ্ধতি।
আল্লাহ বলেনঃ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ - নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যধারণ- কারীদের সাথে আছেন। -(সূরা বাকারা-১৫৪)
এক ব্যক্তি মহানবী (সঃ)-এর কাছে এসে বলল: أَوْصِنِي قَالَ لَا تَغْضَبُ وَرَدَّدَ مِرَارًا .
'আমাকে উপদেশ দিন। তখন তিনি বললেন: 'রাগ করো না। তিনি কয়েকবার এর পুনরাবৃত্তি করলেন।'-(বোখারী)
অন্য হাদীসে এসেছে, রাগের সময় দাঁড়ানো থাকলে বসে পড়, আর বসা থাকলে শুয়ে পড়। এতে রাগের তীব্রতা কমে যাবে। তিনি আরো বলেছেন, রাগ হচ্ছে আগুনের দাহিকা শক্তির অন্তর্ভুক্ত। আগুন পানি দ্বারা নিভানো হয়। তাই রাগ দেখা দিলে অজু করবে।
শেখ ওমরী বলেন, এ জাতীয় রোগীকে ঝাড়-ফুঁক করায় জিন বেরিয়ে গেছে।
৩. নাচ-গান ও ঢোল-বাজনায় অংশ নিলে বা সে অনুষ্ঠানে হাজির হলে ঐ আনন্দের মুহূর্তে জিন মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এটা রাগের বিপরীত অবস্থা। বিশেষ ধরনের ঢোল ও বাজনা জিনের খুব প্রিয়। জিন সে জাতীয় আওয়াজ ও অনুষ্ঠানের সদ্ব্যবহার করে। এ জাতীয় রোগী কেবলমাত্র ঢোল-বাজনার আওয়াজ পেলেই পাগল হয়, অন্য সময় নয়। ঢোলের বিশেষ আওয়াজে সে প্রথমে নাচে এবং একটু পরে বেহুশ হয়ে যায়।
টিকাঃ
২. দৈনিক আল বেলাদ-জেদ্দা, ১৩/৫/১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দ।
📄 জিনের আক্রমণ
জিনের আক্রমণ: জিনের আক্রমণ তিন প্রকার হয়ে থাকে বলে অভিজ্ঞতায় জানা গেছে। সেগুলো হল:
১. পূর্ণ আক্রমণ: রোগী সম্পূর্ণ জ্ঞানশুন্য থাকে। বছরের পর বছরও রোগীর এ অবস্থা অব্যাহত থাকতে পারে। তার কোন অনুভূতি নেই। ভেতর থেকে জিনই তাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
২. আংশিক আক্রমণ: রোগীর অনুভূতি শক্তি আছে। ভেতর থেকে জিন কথা বলে এবং তাকে কষ্ট দিতে থাকে। তাকে বুকে ও অন্তরে সংকীর্ণতা সৃষ্টি করে কষ্ট দেয় এবং অন্য কোন রোগেও আক্রান্ত করে।
৩. আংশিক আক্রমণ: আংশিক আক্রমণ কখনও পূর্ণ আক্রমণে পরিণত হয়। জিন তাকে জ্ঞানশুন্য করে ফেলে। কিছুক্ষণপর তার জ্ঞান ফিরে আসে যেন সে আরোগ্য লাভ করেছে। আসলে সে পূর্ণ সুস্থ হয়নি। জিন তার শরীরের একটি অঙ্গে আশ্রয় নিয়ে বসে থাকে, পুরো শরীরে নয়। যেমন, যৌনাঙ্গে আক্রমণ হলে যৌন মিলন বাধাগ্রস্ত হয় অথবা হাত বা পায়ে জিনের আক্রমণ হলে রোগি অচল হয়ে যায়। সে হাত বা পা নাড়াতে পারে না। মনে হয় যেন বাত। রোগের বাহ্যিক কোন কারণ নেই। ডাক্তারের কাছে গেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় রোগ ধরা পড়ে না। যেমন বাত হলে শরীরে ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেশি হবে। কিন্তু তা বেশি নেই। কিন্তু তখন কোরআনের আয়াত পড়ে ফুঁ দিলে দেখা যাবে ব্যথা-বেদনা কিছুই নেই।
জিনের আক্রমণ বুঝার ৪টি উপায় আছে: ১. ঝাড়-ফুঁক করলে রোগীর ব্যথা-বেদনা সামনা সামনি বেড়ে যাবে। ২. রোগ কমে যাবে ৩. শরীরের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ব্যথা সরে যাবে ৪. রোগ অপরিবর্তিত থাকবে।
রোগ বাড়লে বা কমলে কিংবা স্থানান্তর হলে শেখ ওমরীর মতে, এর ব্যখ্যা হল : ব্যথা-বেদনা বাড়লে বুঝতে হবে এটা জিনের আক্রমণ। কোরআন পড়লে জিন তা সহ্য করতে পারে না। তখন চরম ব্যথা অনুভব করে। সপ্তাহ খানেক বা এ পরিমাণ সময়ের পর ব্যথা কমতে থাকে এবং শেষে আর ব্যথা থাকে না। তখন জিন বিদায় নেয়। ব্যথা কঠিন হলে জিন রোগীর মুখে কথা বলে এবং চলে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করে। তারপর রোগী পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়।
আর যদি ব্যথা কমে তাহলে বুঝতে হবে রোগীর প্রতি কারো চোখ লেগেছে। এর পৃথক চিকিৎসা আছে।
আর যদি ব্যথা-বেদনা এক অঙ্গ থেকে আরেক অঙ্গে স্থানান্তর হয়, তাহলে রোগী যাদুর শিকার। যাদুকর শয়তানকে মানব শরীরের নির্দিষ্ট অঙ্গে কষ্ট দেয়ার জন্য নিয়োজিত করে। চিকিৎসা শুরু হলে তা এক অঙ্গ থেকে আরেক অঙ্গে চলাচল শুরু করে। যাদুর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যৌন অক্ষমতা সৃষ্টি করা হয়। শেখ ওমরী বলেন, সুস্থ-সবল এবং দৈহিক গঠনে নিখুঁত ব্যক্তি যখন স্ত্রীর সাথে মিশতে যায়, তখন তার অক্ষমতা ও অসহায়তা দেখা দেয়। হাসপাতালে যায় ও ওষুধ সেবন করে। কিন্তু কোন লাভ হয় না। ইসলামের পদ্ধতিতে যাদুর চিকিৎসা করলে সে সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
শেখ ওমরী বলেন, যদি জিনের আক্রমণ হয়, তাহলে সরাসরি রোগীকে ঝাড়-ফুঁক কিংবা পরোক্ষভাবে তেল ও পানি পড়া দিলে সাথে সাথে জিন অসহ্য হয়ে রোগীর শরীরে নড়াচড়া করতে থাকে যা স্বাভাবিক নড়াচড়া নয়। ২য়বার এবং ৩য় বারের সময় তার নড়াচড়া এত বৃদ্ধি পায় যে, তখন চিৎকার দিতে থাকে। তারপর আমি জিনকে জিজ্ঞেস করি, সে কি পুরুষ না মহিলা জিন? সে কোথা থেকে এসেছে এবং কেন এসেছে? তারপর চিকিৎসা অব্যাহত রাখলে জিন চলে যায়।
📄 কোরআনের মাধ্যমে জিনসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা
শেখ ওমরী বলেন, আমার কাছে এক অসংক্রামক মারাত্মক চর্ম রোগী এসে বলেছে, দীর্ঘ ১১ বছর পর্যন্ত সে এ রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসার জন্য আমেরিকা এবং ব্রিটেনে গিয়ে বিফল হয়ে ফিরে এসেছে। কিন্তু আমি কোরআন পড়ে তার চিকিৎসা করেছি।
তিনি আরো বলেন: আমার কাছে কুয়েত থেকে দু'মহিলা চিকিৎসার জন্য এসেছিল। একজনের ঘাড়ে ক্যান্সার এবং অন্য জনের জরায়ুতে ক্যান্সার। আমি কোরআনের মাধ্যমে উভয় রোগীর চিকিৎসা করেছি। তাদের একজনের অস্ত্রোপচারের কথা ছিল। কিন্তু কোরআনী চিকিৎসা ব্যবস্থায় আরোগ্য লাভ করার পর অস্ত্রোপচার পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। সর্বশেষ মেডিকেল পরীক্ষায় দেখা গেছে, সে ক্যান্সারমুক্ত।
শেখ ওমরী আরো বলেন, আমার কাছে এক ব্লাড ক্যান্সারের রোগীকে আনা হল। মাঝে-মধ্যে হাসপাতালে গিয়ে তাকে শরীরের রক্ত বদল করতে হত। কিন্তু আমি কোরআনের মাধ্যমে চিকিৎসা করায় সে আরোগ্য লাভ করল এবং আর রক্ত পরিবর্তনের দরকার হয়নি।
তিনি বলেন, এ সকল ঘটনা প্রমাণ করে যে কোরআন বহু শারীরিক ও মানসিক রোগের চিকিৎসার উত্তম হাতিয়ার। সেজন্য দরকার দৃঢ় বিশ্বাস ও নেক আমল।
এখন আমরা জিন তাড়ানোর আরো কয়েকটি বাস্তব ঘটনা তুলে ধরব। এর মাধ্যমে আমরা জিন তাড়ানোর পদ্ধতি জানতে পারব।
আরবী ভাষায় ডক্টরেট ডিগ্রীধারী মিসরীয় নাগরিক এবং মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী ভাষার শিক্ষক ডঃ মোঃ নাগাস জিন আক্রান্ত রোগীর আরেকজন সফল চিকিৎসক। তিনিও কোরআন পড়ে জিন তাড়ান। তিনি বলেন, কাউকে জিনে ধরার লক্ষণ বিভিন্ন রকম। যেমন, মানসিক রোগ অর্থাৎ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, ভয়-ভীতি, অধিক ভুলে যাওয়া, অলসতা-অবসাদগ্রস্ততা, অর্ধেক মাথা ব্যথা, দুশ্চিন্তা ও পেরেশানী, ক্লান্তি-শ্রান্তি, কোন অঙ্গে অজ্ঞাত কারণজনিত ব্যথা এবং ভয়াবহ স্বপ্ন দেখা ইত্যাদি। স্বপ্ন দু'প্রকার হতে পারে। ১. দিবা স্বপ্ন বা জাগ্রত অবস্থায় কোন কিছু দেখা, ২. ঘুম বা তন্দ্রার স্বপ্ন। ঘুমে সে কোন প্রেতাত্মা বা প্রতিমূর্তি, আক্রমণকারী মানুষ, মৃত ব্যক্তি, হিংস্র কিংবা গৃহপালিত পশু, যেমন-বিড়াল ও কুকুর দেখে। অথবা সে ঘুমে কোন দুর্ঘটনা, রোগ-শোক, হাসি-কান্না, চিৎকার ইত্যাদি দেখতে পায়।
তিনি আরো বলেন: জিনের আক্রমণ দু'প্রকার।
১. পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ। তখন রোগী সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক বা পাগল হয়ে যায়। ২. আংশিক আক্রমণ। যেমন জিন শরীরের কোন অঙ্গে আক্রমণ করে। যেমন, হাত, পা, জিহ্বা, মুখের অর্ধাংশ, নারী ও পুরুষের যৌনাঙ্গ, হৃদযন্ত্র ও পেট ইত্যাদি। তখন এ সকল অঙ্গগুলোতে ব্যথা-বেদনা অনুভূত হয়। তিনি বলেন, প্রত্যক্ষ কোরআন তেলাওয়াত করে ফুঁ দিলে বা কোরআনের ক্যাসেট বাজিয়ে শুনালে রোগীর মধ্যে নিম্নোক্ত লক্ষণগুলোর যে কোন একটি বিষয় লক্ষ্য করা যায়।
১. চোখ বন্ধ করা, চোখ ছানাবড়া করা, একচোখে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়া কিংবা দুই চোখের উপর হাত রাখা।
২. সমস্ত শরীর অথবা শুধু হাত বা পা, কিংবা মুখমণ্ডলে হাল্কা বা কঠোর কম্পন অনুভূত হবে।
৩. মাথা ব্যথা শুরু হবে, যা কোরআন তেলাওয়াতের আগে ছিল না এবং ক্রমান্বয়ে মাথা ব্যথা বাড়তে থাকবে।
৪. কোন অঙ্গে ব্যথা অনুভব করা। রোগী এমনও মনে করতে পারে যে, সে হাত-পা নাড়াতে পারছে না।
৫. জোরে চিৎকার দেয়া বা স্বাভাবিকভাবে কাঁদা।
৬. যাদুর মাধ্যমে আসা এবং আটকা পড়ার কারণে বের হতে না পারায় এবং কোরআন সহ্য করতে অক্ষম হওয়ায় চিকিৎসকের উদ্দেশ্যে মুখে জিনের হুমকীর বাণী উচ্চারণ করা কিংবা যে যাদুকর তাকে যাদু পাহারার জন্য নিয়োজিত করেছে সে যাদু নষ্ট করার বিরুদ্ধে রোগী বা চিকিৎসকের ক্ষতির হুমকী প্রদান করা
ডঃ নাগাস বলেন: জিনে পাওয়া রোগীকে ডাক্তার কিংবা হাসপাতালে নিলে কোন চিকিৎসা হবে না। কোরআনের পদ্ধতিতেই তাদের চিকিৎসা করতে হবে। তিনি বলেন: কোরআন শুধু জিনের চিকিৎসা নয়, অন্যান্য রোগেরও চিকিৎসা। কেননা, আল্লাহ কোরআনকে মানুষের সকল প্রকার দৈহিক ও আত্মিক রোগের চিকিৎসা হিসেবে নাজিল করেছেন।
তিনি বলেছেন: وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةً لِلْمُؤْمِنِينَ .
"আমি কোরআনকে মুমিনদের চিকিৎসা ও রহমত হিসেবে পাঠিয়েছি।”
ডঃ নাগাস বলেন: একবার কোরআন পড়ে তিনি এক হৃদরোগীকে সুস্থ করে তোলেন। কোরআনী চিকিৎসা শুরুর আগে তিনি মিসরের একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞকে দিয়ে ঐ রোগীর ইসিজি করান। তারপর কোরআনের আয়াত পড়ে ঝাড়-ফুঁক করতে থাকেন। এরপর তিনি ঐ ডাক্তারকে দিয়ে আবার রোগীর ইসিজি করান। ইসিজির ফলাফলে দেখা গেছে রোগীর অবস্থা উন্নতির দিকে। কোরআনী চিকিৎসা অব্যাহত থাকল। রোগী ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিল। দেখা গেল, তার মানসিক অবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে এবং স্বাস্থ্যেরও উন্নতি হয়েছে। ডাক্তার স্বীকার করেছেন যে, রোগী এখন সুস্থ।১
ডঃ নাগাস আরো বলেন: কোরআন চর্ম রোগেরও চিকিৎসা। কোরআনে বর্ণিত হযরত আইউব (আঃ)-এর ঘটনা থেকে এ তথ্য পাওয়া যায়। তিনি দীর্ঘদিন যাবত চর্মরোগে ভোগেন। তিনি আল্লাহর কাছে বলেন : أَنِّي مَسَّنِيَ الشَّيْطَانُ بِنُصْبٍ وَعَذَابٍ "আমাকে শয়তান যন্ত্রণা ও কষ্ট দিয়েছে।” -(সূরা সোয়াদ-৪১)
আল্লাহ আইউব (আঃ)-কে বলেনঃ "তুমি তোমার পা দিয়ে ভূমিতে আঘাত কর। গোসল এবং শীতল পানি পান করার জন্য ঝর্ণা নির্গত হল।" (সূরা সোয়াদ-৪২) পানি জীবনের অন্যতম উপকরণ।
আল্লাহ বলেন : وَجَعَلْنَا مِنَ الْمَاءِ كُلَّ شَيْ حَيِّ “আমরা পানির মাধ্যমে সকল জীবকে বাঁচিয়ে রেখেছি।" আল্লাহ ঠাণ্ডা পানিকে কোরআনে আইউব (আঃ)-এর রোগের চিকিৎসা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যেমন শ্বেতরোগ ও ক্রনিক একজিমাসহ বিভিন্ন চর্মরোগের সাথে মানব মনের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এগুলোর পেছনে অদৃশ্য ভাইরাস কাজ করে। এ সকল রোগ দূরারোগ্য। কেননা, এ ভাইরাসগুলোর কারণ ও প্রকৃতি অজ্ঞাত। তিনি বলেন, আমি শ্বেত রোগীর উপর কোরআন পড়ে ফুঁ দেয়ার পর চামড়ার রংয়ে পরিবর্তন দেখা দিয়েছে এবং চামড়ার মৃত কোষগুলো সরে গেছে। সে স্থানে নতুন কোষ স্থলাভিষিক্ত হয়েছে, চর্ম বিশেষজ্ঞদের এ বিষয়ে ব্যাখ্যা কি? এটা কি আমাদের বিরুদ্ধে শয়তানের ভাইরাস যুদ্ধ? কিছু আলেম এ ব্যাখ্যাই দিয়েছেন।২
ডঃ নাগাস যৌন রোগের কোরআনী চিকিৎসার কথা বলে চিকিৎসকদেরকে অস্থির করে তুলেছেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি যৌন অক্ষমতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, যৌন রোগী ডাক্তারের কাছে গিয়ে অভিযোগ করে যে, সে স্ত্রীর সতীত্বের পর্দা ফাটাতে অক্ষম কিংবা তার দ্রুত বীর্যপাত হয় অথবা পুরুষাঙ্গ শিথিল থাকে। ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাকে ওষুধ দেয়ার পরও কোন লাভ হয়নি। কিন্তু যখনই রোগীর কাছে কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করা হয়, তখন দেখা যায় যে, সে জিন দ্বারা আক্রান্ত। যাদুর ফলে কিংবা স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গী শয়তানের কারণে ঐ অবস্থার সৃষ্টি হয়। সঙ্গী শয়তানের উদ্দেশ্য হল, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর পরিবেশ তৈরি করা। কোরআন এ কথার সমর্থন দিয়েছে। আল্লাহ শয়তানকে বলেছে : وَشَارِكُهُمْ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ “তুমি তাদের সম্পদ ও সন্তান উৎপাদনে শরীক হও।" ঝাড়-ফুঁককারী জিন তাড়াতে পারলে অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে আসবে এবং কোন ওষুধপত্র ছাড়াই দাম্পত্য জীবন স্থিতিশীল হবে। ১. অর্থাৎ শয়তান যৌনাঙ্গে আক্রমণ করার কারণে তা যৌন রোগের আকৃতি ধারণ করেছিল।
তিনি মহিলাদের মাসিকের সময় অধিক রক্তস্রাবকেও শয়তানের আক্রমণ হিসেবে উল্লেখ করে এর স্বপক্ষে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একটি হাদীস উল্লেখ করেন। নারীদের অনিয়মিত ঋতুস্রাব হয়। কোন সময় তা দেরীতে এবং কোন সময় দীর্ঘায়িত হয়। হামনাহ বিনতে জাহাশ রাসূলুল্লাহকে বলেন, আমার খুব বেশি রক্ত যায়। তিনি উত্তরে বলেন: إِنَّمَا هِيَ رَحْضَةٌ مِنْ رَحْضَاتِ الشَّيْطَانِ .
"নিশ্চয়ই এটা শয়তানের খোঁচা ছাড়া আর কিছু নয়।" -(তিরমিজী).
শয়তান মাসিকের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও কিছু রক্ত আটক রেখে মাসিককে দীর্ঘায়িত করে। যেন নারী নামাজ-রোজা করতে না পারে কিংবা কোরআন তেলাওয়াত করতে সক্ষম না হয়। অনেক সময় অনেক মহিলা মাসিক ও রোগের মধ্যে পার্থক্য করতে সক্ষম হয় না। তাই ইবাদাতে মনোনিবেশ করতে পারে না। শয়তানের পক্ষে মানব শরীরের যে কোন অঙ্গে বিভ্রাট ঘটানো সম্ভব। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: إِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مِنْ ابْنِ آدَمَ مَجْرَى الدَّمِ .
'নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের শিরা-উপশিরায় চলাচল করে।' (বোখারী-মুসলিম)
ডঃ নাগাস বলেন: এক বয়স্কা মহিলাকে আমার ঘরে খুব ক্লান্ত-শ্রান্ত অবস্থায় আনা হল। দীর্ঘ ১৫ বছর ব্যাপী মহিলার ঐ কষ্ট অব্যাহত ছিল। বহু ডাক্তার-কবিরাজের চিকিৎসায় কোন ফলোদয় হয় নি। ডঃ নাগাস জিজ্ঞেস করেন যে, আপনার কি সমস্যা? মহিলাটি বলল: আমার সারা শরীরে ব্যথা এবং আমি কোন কাজ করতে সক্ষম নই। ডঃ নাগাস কোরআনের ক্যাসেট লাগিয়ে মহিলাকে তা শুনার অনুরোধ জানালেন। মহিলাটির কঠিন কষ্ট ও ব্যথা শুরু হল। সে সারারাত ঘুমুতে পারে নি। জিনেরা তার জন্য সারারাত বিচার বসিয়েছে। এক জিন প্রশ্ন করল। তোমরা কেন এ মহিলাকে কষ্ট দিচ্ছ? অন্য এক জিন জবাব দিল, সে আমাদের অপর এক জিন ভাইকে হত্যা করেছে। ৩য় জিন বলল, 'মহিলাটিকে কষ্টদায়ক শাস্তি দাও।' ৪র্থ জিন বলল : তোমরা তাকে আর কত কষ্ট দেবে? তোমরা কেন তার মাথা ধরে রেখেছ? কেন তার শরীর আঁকড়ে আছ? তার থেকে দূরে সরে যাও। তার শাস্তি যথেষ্ট হয়েছে। সারারাত এ বিচার কাজ চলেছে। মহিলাটি একটাই কথা বলেছে, এ কষ্টদায়ক পশুকে অর্থাৎ জিনকে আমার থেকে দূরে সরাও, আমার শরীর ভক্ষণকারী বহু সংখ্যক বিষাক্ত সাপকে দূর কর।'
ডঃ নাগাস মহিলাটিকে তার এ কষ্টের মূল উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করায় সে বলল, আমি টয়লেটে গিয়ে একটি সাপ দেখতে পাই। আমি সেটাকে কুড়াল দিয়ে মেরে ফেলি। ডঃ নাগাস বলেন, সেটাতো সাপ ছিল না বরং জিন ছিল। তখন থেকে দীর্ঘ ১৫ বছর পর্যন্ত ঐ মহিলা আর কোন সন্তান ধারন করতে সক্ষম হয় নি।
২য় অধিবেশনে তার সামনে কোরআনের সূরা ইয়াসিন, সূরা জিন, সূরা যিলযাল, সূরা এখলাস, সূরা নাস ও ফালাক এবং সূরা সাফফাতের ক্যাসেট চালানো হল। এ অধিবেশনে তার আর কোন কষ্ট নেই। অর্থাৎ ১ম অধিবেশনের পরই জিনেরা তাকে ছেড়ে চলে গেছে। এভাবে এ মহিলাটি বন্ধ্যাত্ব এবং জিনের কষ্ট থেকে মুক্তি পেল। ১
ডঃ নাগাস আরেক রোগীর চিকিৎসা অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন : প্রতি দু'মাস পর পর তার শরীরের মাথা থেকে পা পর্যন্ত লম্বালম্বি অবশ হয়ে যেত। দীর্ঘ ৪ বছর পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। রাত বা দিনে ঘুমের শুরুতে শরীর অবש হয়ে আসত। বিরাট শব্দ সহকারে শরীরে কম্পন দিয়ে রোগের সূচনা হত। এরপর ডঃ নাগাস কোরআনের আয়াত পড়তে থাকলেন। দীর্ঘ দু'মাস তাকে শুনানোর জন্য কোরআনের আয়াত ক্যাসেটে রেকর্ড করে দিলেন। সকাল-বিকেল তাকে কোরআন শুনানোর পর পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠল।
মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তাফসীর বিভাগের প্রধান এবং মসজিদে নষওয়ীর শিক্ষক অধ্যাপক আবু বকর আল-জাযায়েরী বলেন। ২. আমার কাছে ২৫ বছর বয়স্ক এক সৌদী রোগী এসেছে- যাকে জিনে পেয়েছে। আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুতি এবং গুনাহ ও অন্যায় কাজে জড়িত থাকার কারণে জিন তার উপর সওয়ার হয়। তাকে সৌদী আরব, মিসর ও পাশ্চাত্যের বড় বড় ডাক্তারদের কাছে চিকিৎসার জন্য নেয়া হয়। কোন উপকার না হওয়াতে রোগীর অভিভাবকেরা তাকে যাদুকরের কাছেও চিকিৎসার জন্য নিয়ে যায়। কিন্তু তাতেও কোন লাভ হয় না। নি। শেষ পর্যন্ত তারা আমার কাছে আসে। আমি রোগীর কাছে কোরআনের কিছু আয়াত ও কিছু হাদীস পড়ি। তখন খোদাদ্রোহী জিন আত্মপ্রকাশ করে এবং কষ্টের কারণে বিকট শব্দ সহকারে চিৎকার শুরু করে। কিন্তু জিনটি ছিল ফাসেক ও গুনাহগার। সে কুফরী বাক্য উচ্চারণ করে হুমকী-ধামকী শুরু করে। আমার সময়ের স্বল্পতার কারণে আমি এ রোগীর চিকিৎসার জন্য মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হাদীস বিভাগের অধ্যাপক মোহাদ্দেস শেখ আলী মোশরেফ ওমরীসহ অন্য একজনের সাহায্য নেই। জিন তাড়ানোর ব্যাপারে তাদের রয়েছে ভাল অভিজ্ঞতা। শেখ ওমরী যখন কোরআন পড়া শুরু করেন, তখন জিন চিৎকার করে বলতে থাকে, আপনি কেন আমার উপর কোরআন পড়ছেন? এতে আমার উপর কোন প্রতিক্রিয়া হয় না। আপনি জানেন, আমি কে? শেখ ওমরী জিজ্ঞেস করেন, কে তুমি? জিন বলে: 'আমি আল্লাহ।'
শেখ ওমরী রোগীর অভিভাবকদের প্রতি রোগীকে বেঁধে তার ঘাড় ও দু'পায়ে মারার আহ্বান জানান। উদ্দেশ্য হল জিনকে শাস্তি দেয়া। এমতাবস্থায় রোগী ব্যক্তির কোন ক্ষতি হবে না। তারপর আল্লাহ দাবীকারী জিন তাকে ক্ষমা করার প্রার্থনা জানায়। সে খোদাদ্রোহীতার দাবী থেকে সরে আসে এবং রোগীর শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং আর কখনও ফিরে না আসার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে এ পর্যায়ে জিন চলে যায় এবং রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠে।
কিন্তু শেখ ওমরী সেখান থেকে ঘরে ফিরার পরপরই জিন তার ওয়াদা ভঙ্গ করে পুনরায় রোগির উপর সওয়ার হয়। এক পর্যায়ে রোগী চরম উত্তেজনা ও রাগ-গোস্বার শিকার হয়। সে ঘরের বিভিন্ন আসবাবপত্র ভেঙ্গে ফেলে এবং পরিবারের দু'একজনকে মারে। তারপর শেখ ওমরী পুনরায় এসে তার কাছে কোরআন পড়তে থাকেন। জিন শেখ ওমরীর কপালে এমন জোরে থাপড় লাগায় যেন তা হাতুড়ীর আঘাত। এমন সময় ডঃ মোহাম্মদ নাগাসকে ডাকা হয়। তিনি আসেন। ডঃ নাগাস রোগীর ৪টি বৃদ্ধাঙ্গুলী এবং তার দু'হাত-পা বেঁধে ফেলেন যেন সে উপস্থিত কারো ক্ষতি করতে না পারে। তারপর তিনি কোরআন পড়া শুরু করলেন। জিন উপস্থিত হল। তিনি জিনটিকে জিজ্ঞেস করলেন: তোর স্রষ্টা কে? সে উত্তর দিল: আল্লাহ। ডঃ নাগাস জিজ্ঞেস করেন, তাহলে তুই কিভাবে নিজেকে আল্লাহ হিসেবে দাবী করেছিস? তুই কি একই সময়ে স্রষ্টা ও সৃষ্টি? এবার দুষ্ট জিন বেকুফ হয়ে গেল। আলোচনায় জিনের আকীদাগত ভ্রান্তি ধরা পড়ল। জিনটি ডঃ নাগাসকে বলেন, এখন আমার করণীয় কি বলুন। ডঃ নাগাস বলেন, তুই আল্লাহর একজন মুসলমান বান্দাহ হয়ে যা। জিন বলল: আমি এ ব্যাপারে আমার পরিবার ও সম্প্রদায়ের অত্যাচারের আশঙ্কা বোধ করি। ডঃ নাগাস বলেন: আল্লাহকেই তোর সর্বাধিক ভয় করা উচিত। জিন আবারও জিজ্ঞেস করল, এখন আমাকে কি করতে বলেন? ডঃ নাগাস বলেন: তোকে কালেমা শাহাদাত উচ্চারণ করতে হবে। জিন জবাব দিল, এটা খুবই ভারী, আমার জিহ্বায় এর উচ্চারণ কষ্টকর। ডঃ নাগাস বলেন: এক একটি করে শব্দ বলি, তুই আমার সাথে সাথে উচ্চারণ করতে থাকবি। এতে করে উচ্চারণের জটিলতা কেটে যাবে। ডঃ নাগাস এভাবে কালেমা তাইয়েবা ও শাহাদাত উচ্চারণ করতে থাকলেন এবং জিনও বারবার তা উচ্চারণ করতে থাকল। এক পর্যায়ে জিন তা সহজেই উচ্চারণ করতে শিখে ফেলল। এবার জিনটি বলল: আমি চলে যেতে চাই। ডঃ নাগাস জিজ্ঞেস করেন, শরীরের কোন অংশ দিয়ে তুই বের হবি? জিন বলল: রোগীর বাম হাত দিয়ে। ডঃ নাগাস বললেন: ঠিক আছে, তাই হোক। তবে তোকে আবারো ওয়াদা করতে হবে। ডঃ নাগাস তার কাছ থেকে রোগীর কাছে পুনরায় প্রত্যাবর্তন না করার বিষয়ে তিনবার ওয়াদা করান এবং বলেন: এরপর যদি তুই রোগীকে, তার পরিবারের কাউকে কিংবা বের হবার সময় এ মজলিশের কাউকে কষ্ট দিস, তাহলে আল্লাহর হুকুমে তোকে পুড়িয়ে মারব। ডঃ নাগাস জিন বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে রোগীর বামহাতের বৃদ্ধাঙ্গুল খুলে দেন। জিন বেরিয়ে যাওয়ার সময় রোগীর বাম হাতে কয়েকবার ভীষণ নড়াচড়া পরিলক্ষিত হল। তারপর তিনি রোগির অন্যান্য সকল বন্ধন খুলে দেন। রোগী সুস্থ হল। সে অনুভব করল যে, তার শরীরে যেন আগে কিছুই ঘটে নি। ১
জিনে ধরা রোগীর চিকিৎসার আরো অগণিত বাস্তব ঘটনাবলী রয়েছে। আমরা শুধু নমুনা হিসেবে কয়েকটি উদাহরণ পেশ করলাম। এতে আমাদেরও বাস্তবধর্মী জ্ঞান অর্জিত হবে।
বোখারী ও মুসলিম শরীফে আ'তা বিন আবি রেবাহ থেকে বর্ণিত। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমি কি আপনাকে একজন বেহেশতী মহিলা দেখাব না? আমি বললাম, অবশ্য দেখাবেন। তিনি বলেন: এ কৃষ্ণাঙ্গ মহিলাই সেটি। সে নবী করীম (সঃ)-এর কাছে এসে বলল: আমি পাগল এবং উলঙ্গ হয়ে যাই। আমার জন্য দোআ করুন। তিনি বলেন: তুমি যদি ধৈর্য ধারণ কর তাহলে বেহেশত পাবে, আর দোআ চাইলে আমি আল্লাহর কাছে তোমাকে সুস্থ করার জন্য দোআ করতে পারি। মহিলাটি বলল: ঠিক আছে, আমি সবর করব। তবে আমি যেন উলঙ্গ না হই, সেজন্য আল্লাহর কাছে দোআ করুন। তিনি তার জন্য দোআ করলেন।
এ হাদীস দ্বারা বুঝা যায়, এটা জিনের প্রভাব ছিল না। বরং রোগ ছিল। কিন্তু অন্য এক বর্ণনায় এটা জিনের প্রভাব বলে বর্ণিত হয়েছে। সে বর্ণনায় বলা হয়েছে “তবে আপনি দোআ করুন যেন খবীস জিনটি আমাকে উলঙ্গ করে না ফেলে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দোআ করলেন। যখনই সে জিনের আশঙ্কা অনুভব করত তখনই কাবার গেলাফ তার শরীরে এসে লেগে যেত।” -(বাজ্জার)
জিন-শয়তান মানুষকে অপহরণ এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে। জিনের আক্রমণ, অপহরণ অহরহ ঘটছে। এরূপ বহু ঘটনা রয়েছে। ইমাম ইবনে তাইমিয়া এরকম বহু ঘটনার চিকিৎসা করেছেন। ইমাম ইবনুল কাইয়েম বলেছেন, আমি আমার শেখ ইবনে তাইমিয়াকে এরূপ বহু রোগির চিকিৎসা করতে দেখেছি।
ইবনুল কাইয়েম বলেছেন, অনেক সময় জিন ছাড়াও মানুষ পাগল হয়। তখন ওষুধ বা ফিজিওথেরাপী দ্বারা রোগীর চিকিৎসা করা হয়।
এ আলোচনায় পরিষ্কার হল যে, কোরআনের মাধ্যমে মানুষের দৈহিক ও মানসিক সকল রোগের চিকিৎসা হয়। জিন-ভূত তাড়ানোর ব্যাপারে কোরআনী চিকিৎসার বিকল্প নেই। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে এর কোন চিকিৎসা নেই।
মানব দেহের বিভিন্ন রোগের কারণ হল- শয়তান। চিকিৎসা বিজ্ঞান এখনও তা আবিষ্কার করতে পারে নি। শয়তান যেহেতু মানুষের রক্তনালীতে চলাচল করে এবং যৌনাঙ্গে বিচরণ করতে পারে তাই এগুলোতে সে কৃত্রিম রোগ তৈরি করতে সক্ষম। অর্থাৎ আদৌ তা শারীরিক রোগ নয়। কিন্তু আপাততঃ তা রোগ মনে হয়। যেমন, পেটের আলসার, গ্যাস্ট্রিকের জ্বালা-পোড়া এবং মলাশয়ের বিভিন্ন রোগের পেছনে রাগ-ক্রোধের ভূমিকা অন্যতম। দুশ্চিন্তা থেকে সৃষ্ট বহুমূত্র রোগের মূল কারণও রাগ। মাথা ব্যথা, রক্তের জমাটবদ্ধতা, মস্তিষ্ক বিকৃতি, আকস্মিক প্যারালাইসিস, হৃদরোগ ইত্যাদির পেছনেও রাগ-ক্রোধের একটা ভূমিকা রয়েছে। রাগ হচ্ছে, সকল মন্দের উৎস। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: الْغَضَبُ مِنَ الشَّيْطَانِ ‘রাগ-ক্রোধ শয়তান থেকে সৃষ্টি।' -(আহমদ)
এছাড়াও নারী-পুরুষের বন্ধাত্য, নারীদের মাসিক সংক্রান্ত অনিয়ম, মাসিকে জমাটবদ্ধ রক্ত কিংবা অধিক রক্ত নিঃসরণ অথবা দীর্ঘদিন রক্তস্রাব অব্যাহত থাকা এবং অন্যান্য যৌন রোগ এগুলোর পেছনেও শয়তানের ভূমিকা কার্যকর থাকতে পারে। আবার এসব রোগ শয়তান ছাড়া শারীরিক কারণেও হতে পারে। সেজন্য ডাক্তারের কাছেও যেতে হবে এবং প্রয়োজনবোধে কোরআনী চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।
টিকাঃ
১. দৈনিক আল-বেলাদ-সংখ্যা-৯১৭৩, ২০শে মে, ১৯৮৯, জেদ্দা, সৌদী আরব।
২. সাপ্তাহিক আল-মোসলেমুন ৮-১৪ই ডিসেম্বর, ১৯৮৯, জেদ্দা, সৌদী আরব।
১. ঐ
২. ঐ
১. ঐ
২. ঐ
📄 জিন-ভূতের উপর কোরআনের প্রতিক্রিয়া
মানুষ ও জিন আল্লাহর সৃষ্টি। উভয় জাতির জন্যই ইসলামের দাওয়াত পেশ করা হয়েছে। মহানবী (সঃ) উভয় সম্প্রদায়েরই নবী। তাই জিন ও মানুষকে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলতে হবে। তা না হয় উভয়ের জন্যই শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। কেউ যদি আল্লাহর নাফরমানী করে তাহলে তার বিরুদ্ধে দুনিয়া ও আখেরাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কাফের, মোশরেক ও পাপী জিনেরাও মানুষের মধ্যে যারা পাপী ও অন্যায়কারী তাদের মতই অপরাধী। খারাপ জিনেরা নিজ জাতির ক্ষতি করে, মানবজাতিরও ক্ষতি করে। তারা মানুষের উপর সওয়ার হয়। তাদেরকে তাড়ানোর জন্য কোরআনই একমাত্র হাতিয়ার।
কোরআন তেলাওয়াত করলে দুষ্ট ও ফাসেক এবং কাফের জিনগুলো কষ্ট পায়। কোরআন তাদের জন্য গোলা-বারুদের মত কষ্টকর। তারা যে রোগীর উপর সওয়ার হয় সে রোগীর উপর কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করলে সে রোগীর শরীরে থাকতে পারে না। অবশ্য এজন্য বিশুদ্ধ কোরআন তেলাওয়াতের প্রয়োজন। যিনি কোরআন তেলাওয়াত করবেন তিনি যদি আলেম হন এবং কোরআনের অর্থ বুঝেন, নিজে আমল করেন এবং তাকওয়া-পরহেজগারী অবলম্বন করেন তাহলে, তার তেলাওয়াতের মাধ্যমে জিনের শরীরে আগুন ধরে। তখন তার অবস্থা হয় 'ছেড়ে দে মা কেঁদে বাচি'-এ প্রবাদের মত। তখন সে চলে যেতে বাধ্য হয় এবং রোগী সুস্থ হয়। আলেম না হলেও কোরআন পাঠের মাধ্যমে জিন চলে যেতে বাধ্য।
ইবনু আবিদ দুনিয়া বিভিন্ন বর্ণনাকারীদের বর্ণনা পরম্পরায় কায়েস বিন হাজ্জাজ থেকে বর্ণনা করেছেন। কায়েস বলেন: আমার শয়তান আমাকে বলেছে, আমি যখন তোমার শরীরে প্রবেশ করি তখন উটের মত প্রবেশ করি। আজ আমি তোমার শরীরে একটি ছোট পাখির মত দুর্বল। কায়েস বলেন: এরকম কেন? সে জবাব দেয় তুমি আমাকে আল্লাহর কিতাবের মাধ্যমে দুর্বল করে দিয়েছ।
ইবনে আবিদ দুনিয়া বর্ণনাকারীদের বর্ণনা পরম্পরায় আবদুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: 'মুমিনের শয়তান দুর্বল।' অর্থাৎ নেক আমল, জিকর ও কোরআন তেলাওয়াতের কারণে শয়তান দুর্বল হতে বাধ্য।
আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'মুমিন শয়তানকে এমনভাবে দুর্বল করে যেমনি তোমরা সফরে উটকে ক্লান্ত-শ্রান্ত করে তোল।' (আহমদ)
ইবনে আবিদ দুনিয়া খালেদ আল-ওয়ালেবী থেকে বর্ণনা করেছেন। খালেদ বলেন, আমি ওমর বিন আবদুল আযীযের কাছে প্রতিনিধি হিসেবে সপরিবারে রওনা হয়েছি। আমি এক জায়গায় অবতরণ করি। আমার পরিবার আমার পেছনে ছিল। আমি শিশুদের আওয়াজ শুনলাম। তারপর জোরে কোরআন পড়লাম। তখন একটা পুটলী নিচে পড়ল। তাতে কতগুলো শিশু ছিল। আমি তাদেরকে ব্যাপার কি জিজ্ঞেস করায় তারা বলল: শয়তান আমাদেরকে নিয়ে গিয়েছিল এবং আমাদেরকে নিয়ে খেলা-ধূলা করছিল। আপনি যখন কোরআন পড়লেন তখন সে আমাদেরকে নিক্ষেপ করে চলে গেল।
উপরোক্ত বর্ণনা দ্বারা পরিস্কার হয়ে গেল যে, কোরআন শুনলে শয়তান ভেগে যায়।
ইবনে আকীল তাঁর 'আল-ফুনুন' গ্রন্থে লিখেছেন, বাগদাদের জাফরিয়া নামক জায়গায় আমাদের একটি ঘর ছিল। যখনই মানুষ তাতে বাস করেছে, তারা মৃত্যুবরণ করেছে। একবার এক ক্বারী ঘরটি ভাড়া নিল। আমরা তার পরিণতি জানার অপেক্ষায় থাকলাম। সকালবেলায় তাকে সবল-সুস্থ্য দেখে আমাদের প্রতিবেশীরাসহ আমরা আশ্চর্য হলাম। সে ঐ ঘরে অনেক দিন থেকেছে। তারপর সেখান থেকে অন্যত্র চলে গেছে। তাকে তার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করায় সে বলল: আমি যখন রাত্রে এশার নামাজ পড়ি এবং কিছু কোরআন তেলাওয়াত করি তখন এক যুবক পার্শ্ববর্তী কূপ থেকে উঠে আসল। আমাকে সালাম দিল। আমি পেরেশান হয়ে গেলাম। যুবকটি বলল: কোন অসুবিধে নেই, আমাকে কিছু কোরআন শিক্ষা দিন। আমি তাকে কোরআন শিখাতে থাকলাম। তারপর আমি তাকে এ ঘরের কাহিনী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। যুবকটি জবাব দিল, আমরা মুসলমান জিন, কোরআন পড়ি ও নামাজ আদায় করি। এ ঘরে ফাসেক ও পাপী লোকেরা বাস করত। তারা মদ পান করত। আমরা তাদেরকে গলা টিপে মেরে ফেলতাম। তারপর আমি বললাম, আমি রাত্রে তোমাকে দেখে ভয় পাচ্ছি। তুমি দিনে আস। সে বলল, ঠিক আছে। সে দিনে কূপ থেকে উঠে আসল। তার সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেল। সে তখন কেরাত পড়ছিল, হঠাৎ করে রাস্তায় এক ঝাড়-ফুঁককারীর আওয়াজ শুনা গেল। সে বলল, আমি সাপ-বিচ্ছু, চোখ লাগা ও জিনে আক্রান্ত রোগীকে ঝাঁড়-ফুঁক করি। যুবকটি জিজ্ঞেস করল সে কে? আমি বললাম, 'ঝাড়-ফুঁককারী'। যুবকটি বলল: তাকে ডাকুন। আমি তাকে ডাকলাম এবং ঘরে প্রবেশ করালাম। তখন দেখি যে, ছাদে জিনটি সাপের আকৃতিতে অবস্থান করছে। লোকটি দোআ পড়তে লাগল। সাপটি ঘরের মেঝে পড়ল। লোকটি সাপটিকে তার ব্যাগে ঢুকানোর উদ্যোগ নিল। আমি নিষেধ করলাম। লোকটি বলল: তুমি আমার শিকার সংগ্রহে বাধা দিচ্ছ? আমি তাকে এক-দীনার দিয়ে বিদায় করলাম। সাপটি নড়াচড়া দিয়ে উঠল। সে খুব দুর্বল হয়ে গেল, রং হলুদ হয়ে গেল এবং খুবই ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে গেল। আমি প্রশ্ন করলাম, তোমার কি হল? সে উত্তরে বলল, লোকটি দোআ ও কেরাত পড়ে আমাকে শেষ করে দিয়েছে। আমি বাঁচব বলে মনে হয় না। সে বলল: যদি কূপে কোন আওয়াজ শুনতে পান, তাহলে বুঝবেন যে, আমি মৃত্যুবরণ করেছি। লোকটি বলল, আমি রাত্রেই কূপে জিনটির মৃত্যুর সংবাদের আওয়াজ শুনতে পেয়েছি।
ইবনু আকীল বলেন, এরপর ঐ ঘরে আর কেউ বাস করত না। এখানে প্রশ্ন দাঁড়ায়, জিনটি নিজেও কোরআন শিখত। স্বয়ং রাসূলুল্লাহর (সঃ) কাছেও জিনেরা কোরআন শুনেছে। তাহলে, কোরআন দ্বারা কি করে জিনকে কষ্ট দেয়া বা ক্ষতি করা যায়? এ প্রশ্নের উত্তর হল- মুসলমান জিন কোরআন দ্বারা কষ্ট পায় না, বরং আনন্দ পায়। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে জিনদের কোরআন শুনার ঘটনা তার প্রমাণ। তবে শর্ত হল, তাকে নিজস্ব স্বত্বায় অপরিবর্তিত থাকতে হবে। কোন মুসলমান জিন যদি সাপের বা অন্য কোন আকৃতি ধারণ করে নিজ সত্ত্বার পরিবর্তন ঘটায় তাহলে কোরআন দ্বারা তার কষ্ট ও ক্ষতি করা যাবে। যেমন, উল্লেখিত ঘটনা তার উৎকষ্ট প্রমাণ। জিনটি সাপ না হলে তার এ ক্ষতি হত না। তার ভুলের কারণেই এ ক্ষতি হল। কাফের ও ফাসেক জিনকে কোরআন দ্বারা শান্তি দেয়া যাবে। ক্ষতি করা হারাম। তাই জিন মানুষকে ক্ষতি করলে আল্লাহ তাকে নিজ বাণীর মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন।