📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 জিন-ভূতের আক্রমণ

📄 জিন-ভূতের আক্রমণ


জিন দু'প্রকার। মুসলমান ও কাফের। মুসলমান জিনও দু'প্রকার। ফাসেক ও নেককার। কাফের ও ফাসেক জিন মানুষের ক্ষতি করে। তারা মানুষের উপর সওয়ার হয়। আমরা এটাকে বলি অমুককে জিনে ধরেছে বা জিনে পেয়েছে। কাউকে জিনে ধরলে সে আর স্বাভাবিক থাকে না। অস্বাভাবিক কথা ও আচরণ করে।
কোরআন ও হাদীসে জিনের এ আক্রমণের প্রমাণ রয়েছে। আল্লাহ বলেন: الَّذِيْنَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُوْمُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِ .
"যারা সুদ খায় তারা কেয়ামতের দিন এমনভাবে উঠবে যেন তাদের উপর জিন-ভূত সওয়ার হয়েছে।" (সূরা বাকারা-২৭৫) আল্লাহ আরো বলেন: فَذَكَرُ فَمَا أَنْتَ بِنِعْمَةِ رَبِّكَ بِكَاهِنٍ وَلَا مَجْنُونٍ .
"আপনি স্মরণ করাতে থাকুন; আল্লাহর দয়ায় আপনি গণকও নন আর না পাগল।” (সূরা তুর-২৯) এ দু'আয়াতে জিন-ভূতে ধরলে মানুষ যে পাগল বা অস্বাভাবিক হয় তার স্বীকৃতি রয়েছে। জিন-ভূতে না ধরলেও পাগল হতে পারে। কিন্তু জিন-ভূতে ধরলেও পাগল হয়। হযরত আইউব (আঃ) বলেছেন: أَنِّي مَسَّنِيَ الشَّيْطَانُ بِنَصْبٍ وَعَذَابٍ .
'শয়তান আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্ট দিয়েছে।' (সূরা সোয়াদ-৪১) আরবীতে জিনে ধরলে একে صَرْعُ বলে। এর অর্থ পাগল হওয়া, মূর্ছা যাওয়া, মৃগী রোগে বেঁহুশ হওয়া, মাটিতে পতিত হওয়া ইত্যাদি। যাকে জিনে ধরে তাকে مصروع বলে।
মানুষের পাগল হওয়ার কারণ বিভিন্ন। যেমন, মস্তিষ্ক বিকৃতি, শরীরের ভেতর বায়ু চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হওয়া, মৃগী রোগ অথবা জিনের আক্রমণ।
কেউ কেউ মানুষের শরীরে জিন প্রবেশের কথা অস্বীকার করে। তাদের মতে, মানুষ এমনিতেই পাগল হয়। জিন-ভূতের আক্রমণের কারণে নয়। যারা জিনকে অস্বীকার করে তারা এবং মোতাজেলা সম্প্রদায়ের মধ্যে দু'ব্যক্তি আলজাবাঈ ও আবু বকর রাজী মোহাম্মদ বিন যাকারিয়া তাইয়েব সহ অন্যদের মতে, এক শরীরে দু'আত্মার অস্তিত্বের অবস্থান অসম্ভব। অথচ বাস্তবে তা সম্ভব বলে আমরা দেখতে পাই। যেমন, মানব শরীরে যে সকল রোগ জীবাণু কিংবা ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে, সেগুলো প্রাণী। তাদের প্রাণ আছে, কিন্তু তারা আকৃতিতে ক্ষুদ্র ও সূক্ষ্ম। তারা মানব শরীরে একটা বা দু'টো নয়, অগণিত যা মানুষের ক্ষতি কিংবা উপকার করে। এগুলো মানুষের রক্তে প্রবেশ করে তাদের সাথে এক সাথে খাওয়া-দাওয়া করে।
শুধু তাই নয়, ফেরেশতা তো প্রাণী। তারা মায়ের জরায়ুতে প্রবেশ করে বীর্য হাতে নিয়ে বলে, হে আল্লাহ! এটি মাংসপিণ্ডে পরিণত হওয়ার পর কি সৃষ্টি হিসেবে গণ্য হয়? আল্লাহ বলেন: হাঁ, তা সৃষ্টি। তখন ফেরেশতা এর আকৃতি তৈরি করে। একে দু'চোখ, নাক, কান ও হাত দেয় এবং তাতে ফুঁ দিয়ে রূহ দেয়। (মুসলিম)
জিন মানুষের শরীরের ভেতর প্রবেশ করে। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: "শয়তান মানুষের শিরা-উপশিরায় চলাচল করে।" ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, মানুষের শরীরে জিনের প্রবেশ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের কাছে স্বীকৃত সত্য। তিনি বলেন, কাউকে জিন-ভূতে ধরলে সে ব্যক্তি এমন সুন্দর ও শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে, যা রোগীর পক্ষে আগে বলা সম্ভব হত না। কোন কোন সময় রোগীর মুখে জিন ইংরেজি, আরবী, হিন্দী, উর্দু, ফরাসী ও জার্মানী ভাষায় কথা বলে। অথচ আগে রোগীর এ ভাষাগুলো জানা ছিল না। যারা ঐ সকল ভাষা জানেন, তারা বুঝেন যে, তা কোন গোঁজামিল নয়, সত্য সত্যই যথার্থ ভাষা বলছে। তাছাড়াও কোন কোন সময় রোগী দেশ-বিদেশের এমন সব তথ্য বলে, যা এর আগে তার পক্ষে বলা সম্ভব হয় নি। বালক-বালিকাকে জিনে ধরলে তখন তারা বহু গুরুত্বপূর্ণ ও তথ্যপূর্ণ কথা বলে যা এ বয়সের লোকদের পক্ষে বলা অসম্ভব।
কোন কোন জিনগ্রস্ত রোগীকে খুব সহজে ঘরের চালে কিংবা গাছে আরোহণ করতেও দেখা গেছে। জিনের সাহায্য ছাড়া তা এত সহজে সম্ভব হওয়ার কথা ছিল না।
আবুল হাসান আশআরী তাঁর 'মাকালাতে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতে' লিখেছেন: জিন মানব শরীরে প্রবেশ করে। কাউকে জিনে ধরলে তাদের শরীরে জিন অবশ্যই প্রবেশ করে থাকে। আব্দুল্লাহ তার পিতা আহমদ বিন হাম্বলকে জিজ্ঞেস করেন, লোকেরা বলে, জিন-শয়তান মানুষের শরীরে প্রবেশ করে না। ইমাম আহমদ বলেন, তারা মিথ্যা বলে। জিন-শয়তান মানুষের মুখ দিয়ে কথা বলে। আমরা প্রতিদিনই প্রায় রোগীর শরীর থেকে জিন তাড়াই। তুমি কি দেখ না, জিন মহিলার মুখে আমাকে বলে যে, আমি অমুক, অমুক জায়গা থেকে এসেছি? তারপর বেরিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করে। ১
কাজী আব্দুল জাব্বার বলেন, আমরা জানি যে, জিন সূক্ষ্ম দেহের অধিকারী। তাই তা বাতাসের মত মানুষের শরীরে সুক্ষ্ণতা ও তীক্ষ্ণতা সহকারে প্রবেশ করতে পারে। আমরা শ্বাস-প্রশ্বাস বায়ুর মাধ্যমেই নেই। তখন বায়ু শরীরে ঢুকে এবং রূহ তো শরীরে বিদ্যমান আছেই। এ জাতীয় দু'টো প্রাণের একই দেহে সহ অবস্থান সম্ভব। তারা একে অপরের সঙ্গী-সাথী হিসেবে ঢুকে, স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে নয়। এর উদাহরণ হল, গর্তে সাপ ঢুকার মত। কোন সময় গর্তে পুরো ঢুকে বা আংশিক ঢুকে এবং আংশিক বাইরে থাকে। তাতে গর্তের বা সাপের কোন অসুবিধে হয় না। তেমনি মানব শরীরের ফাঁকা অঙ্গ দিয়ে শয়তান ঢুকতে পারে। যেমন, কান, নাক, মুখ, লজ্জাস্থান, গুহ্যদ্বার ইত্যাদি। জিন শরীরের ভেতর কিংবা পেটে ঢুকলে কেউ একথা বলতে পারে না যে, আমরা খাদ্য গ্রহণের সময় তাকে খেয়ে ফেলেছি। আমরা আরো লক্ষ্য করি যে, পেটের মধ্যে এক ধরনের পোকা থাকে। এমন কি সেগুলো পেটের মধ্যেই বংশ বিস্তার করে। মূল কথা, জিন মানুষের ক্ষতি করার জন্য শরীরের উপর সওয়ার হয় এবং শরীরে ও প্রবেশ করে। এত হল তাত্ত্বিক জবাব। এবার আমরা বাস্তব ও প্রমাণিত ঘটনা পেশ করব।
আহমদ, দারেমী, তাবরানী, আবু নাঈম নিজ গ্রন্থে এবং বায়হাকী দালায়েল গ্রন্থে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহর এক সফরে এক মহিলা তার ছেলেকে নিয়ে মহানবী (সঃ)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার ছেলেটা পাগল। তাকে আমাদের দুপুর ও রাত্রের খাওয়ার সময় গায়েব করে দেয়া হয়। এতে আমাদের বিরাট ক্ষতি হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ছেলেটির বুকে নিজ হাত মুছলেন এবং তার জন্য আল্লাহর কাছে দোআ করলেন। এতে ছেলেটির কাশি আসলো এবং তার পেট থেকে একটি কুকুর ছানা বা হিংস্র পশুশাবক বেরিয়ে দ্রুত চলে গেল। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, এজন্য মহিলাটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দু'টো বকরী এবং ঘি ও পনির উপহার দিলেন। তিনি সফর। সঙ্গীদেরকে ঘি, পনীর ও একটি বকরী গ্রহণ করে অপর বকরীটি ফেরত দানের নির্দেশ দিলেন। এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, তার ভেতরে অবস্থানকারী জিন শয়তানটি বেরিয়ে গেল।
আহমদ, আবু দাউদ ও তাবরানী বর্ণনা করেছেন যে, উম্মে আব্বান বিনতে ওয়াযে' বলেন, তার দাদা নিজের এক পাগল ছেলে কিংবা ভাগ্নিকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে গেলেন এবং দোআর আবেদন করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন: তাকে আমার কাছে নিয়ে আস। দাদা বলেন, সে সওয়ারীর উপর ছিল। তাকে সওয়ারী থেকে নামানো হল। সফরের পোশাক খুলে তাকে দু'টো সুন্দর পোশাক পরানো হল। তাকে আমি নবী করীম (সঃ)-এর কাছে নিয়ে গেলাম। নবী (সঃ) বললেন, তাকে আমার নিকটবর্তী কর এবং আমার দিকে তার পিঠ খুলে দাও। দাদা বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার শরীরের কাপড়ের উঁচু ও নিচু অংশ একত্রে ধরে এমনভাবে তার পিঠে মারতে লাগলেন যে, আমি তাঁর দুই বগল মোবারক দেখতে পেলাম। তিনি বললেন: أَخْرُجْ عَدُوَّ اللَّهِ 'হে আল্লাহর দুশমন, বের হও।' তারপর রোগী সুস্থ্য লোকের মত দেখাতে পারল, আগের মত নয়। তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে নিজের সামনে বসালেন এবং পানি আনার জন্য বললেন। তিনি তার মুখে পানি মুছে দিলেন এবং তারজন্য দোআ করলেন। এ দোআর পর প্রতিনিধি দলে তার চাইতে উত্তম বা সুস্থ্য আর কেউ ছিল না।'
আবু ইয়া'লী, আবু নাঈম এবং বায়হাকী উসামা বিন যায়েদ থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে হজ্জে রওনা হলাম। 'রাওহা' উপত্যকায় এক মহিলা তার একটি ছোট ছেলেকে নিয়ে এসে বলল, হে আল্লাহর নবী। জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত ছেলেটি জ্ঞান ফিরে পায়নি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সওয়ারী থামিয়ে হাত বাড়িয়ে মহিলাটিকে বললেন, তোমার ছেলেকে আমার হাতে দাও। তিনি তাকে নিজ বুক ও সওয়ারীর আসনের উপর ধরলেন এবং তার মুখে থুথু দিয়ে বললেন : أَخْرُجُ يَا عَدُوٌّ اللَّهِ فَإِنِّي رَسُولُ اللَّهِ 'হে আল্লাহর দুশমন, বের হও, আমি আল্লাহর রাসূল।' তিনি ছেলেটিকে মহিলার হাতে দিয়ে বললেন: একে নিয়ে যাও, ইনশাআল্লাহ, এরপর থেকে তার মধ্যে খারাপ কিছু দেখতে পাবে না।
ওসমান বিন আবুল আস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে তায়েফের কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করেন। তখন আমার নামাজে কি যেন একটা বাধা সৃষ্টি হয়। ফলে আমি কত রাকাত নামাজ পড়ি তা মনে রাখতে পারি না। এ অবস্থা দেখে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে যাই। তিনি আমাকে বলেন, হে আবুল আসের পুত্র! আমি জওয়াব দেই যে, 'জ্বি জনাব।' তিনি প্রশ্ন করেন, তোমার কাছে কি এসেছিল? আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! নামাজে এমন কি একটা বাধা সৃষ্টি হয় যে, আমি কত রাকাত নামাজ পড়ি তা বলতে পারি না। তিনি বলেন: এটা শয়তান; আমার কাছে আস। আমি তাঁর কাছে গেলাম এবং আমার পায়ের অগ্রভাগের উপর বসলাম। তিনি আমার বুকে হাত মারলেন এবং আমার মুখে থুথু দিলেন। তারপর তিনবার বললেন: 'হে আল্লাহর দুশমন, বের হও।' তারপর বললেন, এখন কাজে যোগদান কর। ওসমান বলেন, আমার বয়সের শপথ, আমি আর কখনো ঐ সমস্যার সম্মুখীন হইনি। (ইবনে মাজাহ)
মুসলিম শরীফে আবুদ দারদা (রা) থেকে বর্ণিত। নবী (সঃ) নামাজে বলেন, 'আউজুবিল্লাহি মিনকা'। তারপর বলেন: আমি তোর উপর তিনবার আল্লাহর অভিশাপ দিচ্ছি। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, জিন কিভাবে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।
আবু ই'য়ালী 'তাবকাতে হানাফিয়া' গ্রন্থে লিখেছেন: আমি আহমদ বিন আব্দুল্লাহর কাছে শুনেছি এবং তিনি আবুল হাসান আলী বিন আহমদ বিন আলী আকবারী থেকে শুনেছেন। তিনি বলেন, আমার আব্বা আমার দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন। দাদা আলী আকবারী বলেন: ৩৫২ হিজরীর জিলকাদা মাসে আমি আহমদ বিন হাম্বল-মসজিদে ছিলাম। ইমাম আহমদকে খলীফা মোতাওয়াক্কেলের এক বন্ধু জানাল যে, তার এক বাঁদীকে জিনে ধরেছে। তাই তিনি ইমাম আহমদের কাছে দোআ প্রার্থী। ইমাম আহমদ নিজের অজুর জন্য তৈরি ফিতা বিশিষ্ট কাঠের স্যান্ডেল খলীফার বন্ধুর হাতে দিয়ে বললেন: খলীফার ঘরে যান এবং যুবতীর মাথার কাছে গিয়ে বসুন এবং জিনকে উদ্দেশ্য করে বলুন: ইমাম আহমদ জিজ্ঞেস করেছে, 'তোমার কাছে কোন্ জিনিস উত্তম-যুবতী থেকে বেরিয়ে যাওয়া, না এ স্যান্ডেলের ৭০টি ঘা খাওয়া? খলিফার বন্ধু গেলেন এবং ইমাম আহমদের কথার অনুরূপ বললেন। দুষ্ট জিন যুবতীর মুখে বলল: আমি শুনলাম এবং আনুগত্য করলাম। এমনকি যদি ইমাম আহমদ আমাদেরকে ইরাকে বাস না করার কথা বলে, তাহলে আমরা ইরাক ত্যাগ করব। তিনি আল্লাহর আদেশ পালন করেন। যে আল্লাহর আদেশ পালন করে, সকল কিছু তার প্রতি অনুগত থাকে। তারপর জিনটি যুবতী থেকে বেরিয়ে গেল এবং সে শান্তি ফিরে পেল। তারপর তার সন্তান হল। ইমাম আহমদের মৃত্যুর পর জিনটি পুনরায় যুবতীকে ধরল। খলীফা মোতাওয়াক্কেল তার বন্ধু আবু বকর মারুজীকে এ ঘটনা বলেন। মারুজী স্যান্ডেল নিয়ে যুবতীর কাছে যান। দৈত্য জিনটি যুবতীর মুখ দিয়ে বলে: আমি এ যুবতী থেকে বের হব না এবং তোমার আনুগত্য করব না। আহমদ বিন হাম্বল আল্লাহর আনুগত্য করেছেন সে জন্য আমাদেরকেও তিনি তার আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন।
সৌদী আরবের পরলোকগত জেনারেল মুফতী শেখ আব্দুল আযীয বিন বায (রঃ) ১৪০৭ হিজরীতে এক মহিলার উপর সওয়ার বৌদ্ধ জিনের সাথে কথা বলেন। এরপর তিনি তাকে ইসলামের দাওয়াত দেন। ফলে বৌদ্ধ জিনটি মুসলমান হয়ে যায় এবং মহিলাটিকে ছেড়ে দেয়। ১
মদীনার মসজিদে নবওয়ীর শিক্ষক শেখ আবু বকর আল জাজায়েরী তাঁর বোনের উপর জিনের আক্রমণের বর্ণনা দিয়ে বলেন: জিন তাঁর বোনের মুখে তাকে বলেছে, তাঁর বোন একদিন তাকে কষ্ট দেয়ায় সে তার উপর সওয়ার হয়েছে। তিনি বলেন, আমি নিজে এ ঘটনা দেখেছি ও শুনেছি। শুনা কথার চাইতে দেখার বর্ণনা শক্তিশালী। ২. তারপর জিনটি তাকে ছেড়ে দেয়।
ইবনে আবিদ দুনিয়া ইবনে ইয়াসমিন থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: বনি সোলাইম গোত্রের এক গ্রামীণ ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করে হযরত হাসান বসরী (রঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। আমি প্রশ্ন করলাম, আপনার ঘটনা কি? সে বলল: আমি গ্রামের লোক। আমার এক ভাই আমাদের সম্প্রদায়ের এক শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব ছিল। তার উপর এখন বিপদ নেমে এসেছে। আমরা তাকে লোহার সাথে বেঁধে রেখেছি। আমাদের আলাপের সময় এক আওয়াজদানকারী আমাদেরকে সালাম দিল। আমরা কাউকে দেখতে পেলাম না। আমরা সালামের উত্তর দিলাম। সে বলল: আমরা আপনাদের প্রতিবেশী। আপনাদের সাথে বাস করতে আমাদের কোন সমস্যা নেই। আমাদের এক বোকা সাথী আপনাদের সাথীকে আক্রমণ করেছে। আমরা তাকে এ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য চাপ দেই। কিন্তু সে তার থেকে সরে আসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আমরা ব্যর্থ হয়ে আপনাদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। তবে অমুক দিন আপনার গোত্রের লোকদেরকে একত্রিত করে সবাই মিলে পাগল ভাইটিকে ভাল ও শক্ত করে বাঁধবেন। যদি তাকে বাঁধতে সক্ষম না হন, তাহলে আর কখনও বাঁধতে পারবেন না। বাঁধার পর তাকে উটের উপর সওয়ার করে অমুক উপত্যকায় নিয়ে আসুন। উপত্যকার অমুক গাছের অমুক টুকরা তাকে খাইয়ে দিন। হুঁশিয়ার, সে যেন বাঁধন ছিঁড়ে না যেতে পারে। সে যদি ছুটে চলে যায়, তাহলে আর তার উপর নিয়ন্ত্রণ রক্ষা সম্ভব হবে না। আমি বললাম, আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন। আমাকে কে সে উপত্যকার রাস্তা চেনাবে এবং কে সে শাকটি দেখাবে? আওয়াজদানকারী বলল: সেদিন আপনি যখন একটি আওয়াজ শুনবেন, সে আওয়াজের পিছু পিছু চলতে থাকুন। যেমন কথা তেমন কাজ। নির্ধারিত দিনে আমি তাকে বেঁধে উটের পিঠে আরোহণ করালাম। তারপর একটি আওয়াজ শুনলাম- 'আমার দিকে', 'আমার দিকে।' আমি সে আওয়াজের পিছু পিছু চলতে লাগলাম। তারপর সে বলল: এ উপত্যকায় নাম। এখান থেকে শাক লও এবং এরূপ করে করে তাকে খাইয়ে দাও। যখন সবজি তার পেটে পড়ল, তখন সে জিনমুক্ত হল এবং দু'চোখ খুলল। আওয়াজদানকারী বলল: তাকে ছেড়ে দাও এবং লোহার বাঁধন মুক্ত কর। আমি বললাম, আমার ভয় হয় যদি সে এখনই আক্রমণাত্মক হয়ে উঠে। তখন আওয়াজদানকারী বলল: কেয়ামতের আগে আর ঐ দুষ্ট জিন তার মধ্যে ফিরে আসবে না। আমি বললাম, আল্লাহ তোমার উপর রহম করুন। কিন্তু আরেকটি বিষয় জানার বাকী আছে। সে বলল, সেটা কি? আমি বললাম, আপনি যেদিন ঐ কথা বলেছেন, সেদিন আমি মান্নত করেছি, যদি আল্লাহ আমার ভাইকে সুস্থ করেন তাহলে, আমি পায়ে হেঁটে হজ্জ করব। এখন এ মাসলার বিষয়ে কি করণীয়? আওয়াজদানকারী বলল: এ ব্যাপারে আমার জানা নেই। তবে আমার পরামর্শ হল, আপনি বসরা যান এবং সেখানে হাসান বিন আবুল হাসান বসরীকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করুন। তিনি খুবই নেক লোক।
এ বর্ণনায় খারাপ জিনের ক্ষতির মোকাবিলায় ভাল জিনের ভূমিকা ফুটে উঠেছে। 'তাজকেরাহ হামদুনিয়া' গ্রন্থে উল্লেখ আছে। এক নেক ও বিজ্ঞ লোকের স্ত্রীকে জিনে ধরেছে। তিনি স্ত্রীকে দোআ পড়ে ফুঁ দিলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন: তুমি ইহুদী না খ্রিস্টান জিন? জিন স্ত্রীর মুখে জওয়াব দেয়, আমি মুসলমান। তখন তিনি প্রশ্ন করেন, আমিও তোমার মত মুসলমান। তুমি কি করে আমার স্ত্রীর উপর সওয়ার হতে পারলে? সে বলল, আমি তাকে তোমার মতই ভালবাসি। তিনি আবারও প্রশ্ন করেন, তুমি কোথা থেকে এসেছ? সে বলল, জুরজান থেকে। তিনি জিজ্ঞেস করেন, কেন তুমি তার উপর সওয়ার হয়েছ? সে বলল, কেননা, আপনার স্ত্রী ঘরে খোলা মাথায় চলাফেরা করত। তিনি বলেন, তোমার যদি এতটুকু অভিমানই থেকে থাকে, তাহলে তাকে মাথা খোলা না রাখার জন্য উদ্বুদ্ধ করলে না কেন, যেন তার উপর কোন জিন আক্রমণ করতে না পারে?
'ওকদাতুল মাজানীন' কিতাবের বরাত দিয়ে ইবনে আবিদ দুনিয়া লিখেছেন, হোসাইন বিন আবদুর রহমান বলেন: আমি মিনায় এক জিনে পাওয়া লোকের সাক্ষাত পেলাম। যখনই সে কোন ফরজ আদায় কিংবা জিকর করার ইচ্ছা করে তখনই পাগল হয়ে যায়। লোকেরা যে রকম বলে আমিও সে রকম বললাম যে, যদি তোমরা ইহুদী হও তাহলে হযরত মূসা (আঃ), খ্রিস্টান হলে হযরত ঈসা (আঃ) এবং মুসলমান হলে হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর দোহাই দিয়ে বলছি, তাকে ছেড়ে দাও। তারা বলল: আমরা না ইহুদী, না খ্রিস্টান। কিন্তু আমরা দেখেছি সে আবু বকর ও ওমরকে খারাপ জানে। আমরা তাকে এ কঠিন কাজ থেকে বিরত রেখেছি মাত্র। ভাল জিন মানুষকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখার জন্যেও আক্রমণ করতে পারে।

টিকাঃ
১. দৈনিক আল-বেলাদ, ১৩/৫/১৯৮৯, জেদ্দা, সৌদী আরব।
১. সাপ্তাহিক দাওয়াহ পত্রিকা-৩রা জিলহজ্জ সংখ্যা-১৪১৭ হিঃ মোতাবেক ১০/৪/১৯৯৭
২. ঐ

📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 জিনে ধরলে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা

📄 জিনে ধরলে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা


জিনে ধরলে চিকিৎসা জরুরী। এজন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির জন্যও আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। নিম্নের আয়াতে ঐ নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন: وَاعِدُّوا لَهُمْ مَّا سَتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ تَرْهِبُونَ بهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ وَأَخَرِينَ مِنْ دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُوْنَهُمُ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ .
"তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যথাসাধ্য শক্তি সংগ্রহ ও যুদ্ধের ঘোড়া প্রস্তুত কর। এগুলোর মাধ্যমে তোমরা আল্লাহ ও তোমাদের দুশমনদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলবে; এছাড়াও অন্যদেরকেও ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলবে যাদেরকে তোমরা জান না, আল্লাহ জানেন।" -(সূরা আনফাল-৬০)
ইবনে কাসীর এ আয়াতের তাফসীরে লিখেছেন: সুফিয়ান সাওরী বলেন: 'এছাড়াও অন্যদেরকেও ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলবে যাদেরকে তোমরা জান না, আল্লাহ জানেন' একথা দ্বারা ইবনে ইয়ামান 'ঘরের শয়তানকে' বুঝিয়েছেন, ইয়াজীদ বিন আব্দুল্লাহ বিন গরিব তার দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) 'অন্যদেরকে' বলতে 'জিনকে' বুঝিয়েছেন।
আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়, শত্রুর মোকাবিলার জন্য শত্রুকে এবং তার হাতিয়ার কি, তা জানা দরকার। তাহলেই কেবল তার উপর বিজয় লাভের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়া যায়। যাদু এবং জিনের প্রেতাত্মার বিরুদ্ধে লড়াইর জন্য সে রকম প্রস্তুতি না থাকলে সাফল্য লাভ করা যাবে না।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, জিন যদি দৈত্য-দানব হয়, আর চিকিৎসক যদি দুর্বল হয়, তাহলে সে চিকিৎসকের ক্ষতি করতে পারে। সেজন্য আল্লাহর কাছে আশ্রয়ের আয়াত ও দোআ-দরুদ পড়ে ঈমানের মজবুতী আনার মাধ্যমে রক্ষা কবজের ব্যবস্থা করতে হবে এবং সে সকল গুনাহ থেকে দূরে থাকতে হবে যার কারণে দুষ্ট জিন তার ক্ষতি করতে না পারে। চিকিৎসক আল্লাহর পথের একজন মোজাহিদ এবং এটা বিরাট জেহাদ। তাই সতর্ক হতে হবে শত্রু যেন গুনাহর কারণে যুদ্ধে তার উপর বিজয়ী না হয়। জিনের চিকিৎসা বিষয় এলেম অর্জন ও এর উপর আমল করতে ভয় পাওয়া উচিত নয়। কেননা, এটাও একটা ইবাদাত এবং আল্লাহর পথে জিহাদ। আল্লাহর সীমানা রক্ষী মুমিনরা তাঁর হেফাজত ও যত্ন লাভ করেন। আল্লাহ বলেন:
"নিশ্চয়ই যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, তারপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা নাজিল হয় এবং বলে, তোমরা ভয় করোনা, চিন্তা করোনা এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ শোন। আমরা ইহকাল ও পরকালে তোমাদের বন্ধু। সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমরা দাবী কর।" -(সূরা হা-মীম-সাজদাহ-৩০-৩১)
এ আয়াতে ইহকাল ও পরকালে মুমিনদের জন্য আল্লাহর সাহায্য এবং ফেরেশতা পাঠানোর মাধ্যমে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়া আছে। তাই জিন-ভূতের চিকিৎসকের ভয় কিংবা দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই।
শিরক ও নাফরমানী মুক্ত অবস্থায় কারো সাহায্য করলে জিন তার কোন ক্ষতি করতে পারে না। জিন জানে যে, চিকিৎসক ন্যায়পরায়ণ। এ কারণে তারা তার ক্ষতি করতে অক্ষম। তবে দৈত্য জিন হলে এবং চিকিৎসক দুর্বল হলে, জিন তার ক্ষতি করতে পারে। তখন চিকিৎসককে আল্লাহর আশ্রয়বাণীগুলোর সাহায্য নিতে হবে, দোআ-দরুদ এবং দোআ পড়তে হবে। এর ফলে, তার ঈমান সবল হবে। তাকে গুনাহর কাজ ত্যাগ করতে হবে। কেননা, সে এখন জিহাদ ফি সাবিলিল্লায় ব্যস্ত। এটাও বিরাট জেহাদ। শত্রু যেন গুনাহর কারণে তার ক্ষতি না করে। আয়াতুল কুরসী পাঠ করলে এ সকল জটিল পরিস্থিতিতে উদ্ধার পাওয়া যায়।
জিন-ভূত তাড়ানো ফরজে কেফায়া। একজন তাড়াতে পারলে অন্যজনের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। মজলুম মানুষকে সাহায্য করা ফরজ। এটা সর্বোত্তম আমল। এ আমল আম্বিয়ায়ে কেরাম ও নেক লোকদের। তারা আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক বনি আদম থেকে শয়তানকে দূরে সরানোর কাজ করেছেন। হযরত ঈসা (আঃ) এ কাজ করেছেন। স্বয়ং মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-ও তা করেছেন। ১
পুরুষরা পুরুষের চিকিৎসা আর মহিলারা মহিলাদের চিকিৎসা করবে। এটা হলেই ভাল হয়। মহিলারা মহিলাদের চিকিৎসা করলে পর্দা সম্পর্কিত সমস্যা থাকে না। অনেক সময় পুরুষ চিকিৎসকের সামনে জিনগ্রস্ত মহিলা সতর খুলে ফেলে। মহিলারাও পুরুষ চিকিৎসকের মত কোরআনী পন্থায় চিকিৎসা করতে পারেন। এজন্য তাদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।
পাশ্চাত্যের চিকিৎসকরাও মানুষের উপর জিনের আক্রমণের স্বীকৃতি দিয়েছেন। আমেরিকার মনস্তাত্বিক গবেষণা সংস্থার সদস্য ক্যারিংটন বলেছেন, মানুষের শরীরে প্রেতাত্মা প্রবেশ করে। ইউরোপীয় ডাক্তার কার্ল উকল্যাণ্ড বলেছেন, প্রেতাত্মা প্রবেশের ফলে মানবিক অশান্তি, অস্থিরতা ও চালচলেন ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। ১
পাগলের প্রকারভেদ সম্পর্কে আমরা জানতে পারলাম যে, তা দু'প্রকার। ১. শারীরিক ২. আত্মিক। মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটলে মস্তিষ্কের কোষে বৈদ্যুতিক প্রবাহ ঘটে। ফলে শারীরিক অস্থিরতা, জ্ঞান শূন্যতা এবং শারীরিক ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। আচরণে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এর ফলে হিষ্টেরিয়াসহ বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দেয়। আত্মিক পাগলকেই জিনে ধরা রোগী বলা হয়। অর্থাৎ তাদের উপর জিন আক্রমণ করে। শরীরে প্রেতাত্মার প্রবেশের ফলেই তা ঘটে থাকে।

টিকাঃ
১. গারায়েব ও আজায়েবুল জিন-কাজী বদরুদ্দিন শিবলী।
১. কিতাব আ'লামিল জিন ওয়াল মালায়েকাহ-আবদুর রাজ্জাক নওফল- সৌদী আরব।

📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 জিনের আক্রমনের প্রকারভেদ

📄 জিনের আক্রমনের প্রকারভেদ


মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হাদীস শাস্ত্রের অধ্যাপক আলী বিন মোশরেফ ওমরী জিন-রোগীর একজন সফল চিকিৎসক। তিনি বলেন: আমার অভিজ্ঞতায় আমি জিনে ধরা তিন ধরনের রোগী দেখতে পেয়েছি। ২
১. রোগি হঠাৎ করে কষ্ট ও সংকীর্ণতা বোধ করে এবং ভয় পায়। সে ঘরের দেয়ালে বিভিন্ন জিনিসের কাল্পনিক ছবি দেখতে পায়, কারো কথা শুনে কিংবা কথা শুনার কল্পনা করে। সে দরজায় বা খাটে আকস্মিক শব্দ শুনে বলে ধারণা করে, অথবা কানে ঢোল-তবলার আওয়াজ পায়। তখন সে দাঁড়িয়ে থাকলে বসে পড়ে কিংবা বসে থাকলে দাঁড়িয়ে যায়। হৃদয়ে কাঁটা বিঁধলে যে রকম কষ্ট পায়, সে রকম অনুভূতি প্রকাশ করে। এ জাতীয় রোগীকে ঝাড়-ফুঁক করার পর জিন রোগীর মুখে কথা বলেছে, চলে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে এবং সর্বশেষে বেরিয়ে গেছে। ফলে রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছে।
২. রাগের সময় জিনের আক্রমণ ঘটে। মানুষ রাগ ও গোস্বা করলে জিন এ সুযোগে মানুষের ভেতর প্রবেশ করে তার ক্ষতি করে। এজন্য রাগ করা ঠিক নয়। ইসলামে ধৈর্য্য ধারণের উপর অত্যাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। রাগের মুহূর্তে ধৈর্যই হল উত্তম পদ্ধতি।
আল্লাহ বলেনঃ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ - নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যধারণ- কারীদের সাথে আছেন। -(সূরা বাকারা-১৫৪)
এক ব্যক্তি মহানবী (সঃ)-এর কাছে এসে বলল: أَوْصِنِي قَالَ لَا تَغْضَبُ وَرَدَّدَ مِرَارًا .
'আমাকে উপদেশ দিন। তখন তিনি বললেন: 'রাগ করো না। তিনি কয়েকবার এর পুনরাবৃত্তি করলেন।'-(বোখারী)
অন্য হাদীসে এসেছে, রাগের সময় দাঁড়ানো থাকলে বসে পড়, আর বসা থাকলে শুয়ে পড়। এতে রাগের তীব্রতা কমে যাবে। তিনি আরো বলেছেন, রাগ হচ্ছে আগুনের দাহিকা শক্তির অন্তর্ভুক্ত। আগুন পানি দ্বারা নিভানো হয়। তাই রাগ দেখা দিলে অজু করবে।
শেখ ওমরী বলেন, এ জাতীয় রোগীকে ঝাড়-ফুঁক করায় জিন বেরিয়ে গেছে।
৩. নাচ-গান ও ঢোল-বাজনায় অংশ নিলে বা সে অনুষ্ঠানে হাজির হলে ঐ আনন্দের মুহূর্তে জিন মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এটা রাগের বিপরীত অবস্থা। বিশেষ ধরনের ঢোল ও বাজনা জিনের খুব প্রিয়। জিন সে জাতীয় আওয়াজ ও অনুষ্ঠানের সদ্ব্যবহার করে। এ জাতীয় রোগী কেবলমাত্র ঢোল-বাজনার আওয়াজ পেলেই পাগল হয়, অন্য সময় নয়। ঢোলের বিশেষ আওয়াজে সে প্রথমে নাচে এবং একটু পরে বেহুশ হয়ে যায়।

টিকাঃ
২. দৈনিক আল বেলাদ-জেদ্দা, ১৩/৫/১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দ।

📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 জিনের আক্রমণ

📄 জিনের আক্রমণ


জিনের আক্রমণ: জিনের আক্রমণ তিন প্রকার হয়ে থাকে বলে অভিজ্ঞতায় জানা গেছে। সেগুলো হল:
১. পূর্ণ আক্রমণ: রোগী সম্পূর্ণ জ্ঞানশুন্য থাকে। বছরের পর বছরও রোগীর এ অবস্থা অব্যাহত থাকতে পারে। তার কোন অনুভূতি নেই। ভেতর থেকে জিনই তাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
২. আংশিক আক্রমণ: রোগীর অনুভূতি শক্তি আছে। ভেতর থেকে জিন কথা বলে এবং তাকে কষ্ট দিতে থাকে। তাকে বুকে ও অন্তরে সংকীর্ণতা সৃষ্টি করে কষ্ট দেয় এবং অন্য কোন রোগেও আক্রান্ত করে।
৩. আংশিক আক্রমণ: আংশিক আক্রমণ কখনও পূর্ণ আক্রমণে পরিণত হয়। জিন তাকে জ্ঞানশুন্য করে ফেলে। কিছুক্ষণপর তার জ্ঞান ফিরে আসে যেন সে আরোগ্য লাভ করেছে। আসলে সে পূর্ণ সুস্থ হয়নি। জিন তার শরীরের একটি অঙ্গে আশ্রয় নিয়ে বসে থাকে, পুরো শরীরে নয়। যেমন, যৌনাঙ্গে আক্রমণ হলে যৌন মিলন বাধাগ্রস্ত হয় অথবা হাত বা পায়ে জিনের আক্রমণ হলে রোগি অচল হয়ে যায়। সে হাত বা পা নাড়াতে পারে না। মনে হয় যেন বাত। রোগের বাহ্যিক কোন কারণ নেই। ডাক্তারের কাছে গেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় রোগ ধরা পড়ে না। যেমন বাত হলে শরীরে ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেশি হবে। কিন্তু তা বেশি নেই। কিন্তু তখন কোরআনের আয়াত পড়ে ফুঁ দিলে দেখা যাবে ব্যথা-বেদনা কিছুই নেই।
জিনের আক্রমণ বুঝার ৪টি উপায় আছে: ১. ঝাড়-ফুঁক করলে রোগীর ব্যথা-বেদনা সামনা সামনি বেড়ে যাবে। ২. রোগ কমে যাবে ৩. শরীরের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ব্যথা সরে যাবে ৪. রোগ অপরিবর্তিত থাকবে।
রোগ বাড়লে বা কমলে কিংবা স্থানান্তর হলে শেখ ওমরীর মতে, এর ব্যখ্যা হল : ব্যথা-বেদনা বাড়লে বুঝতে হবে এটা জিনের আক্রমণ। কোরআন পড়লে জিন তা সহ্য করতে পারে না। তখন চরম ব্যথা অনুভব করে। সপ্তাহ খানেক বা এ পরিমাণ সময়ের পর ব্যথা কমতে থাকে এবং শেষে আর ব্যথা থাকে না। তখন জিন বিদায় নেয়। ব্যথা কঠিন হলে জিন রোগীর মুখে কথা বলে এবং চলে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করে। তারপর রোগী পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়।
আর যদি ব্যথা কমে তাহলে বুঝতে হবে রোগীর প্রতি কারো চোখ লেগেছে। এর পৃথক চিকিৎসা আছে।
আর যদি ব্যথা-বেদনা এক অঙ্গ থেকে আরেক অঙ্গে স্থানান্তর হয়, তাহলে রোগী যাদুর শিকার। যাদুকর শয়তানকে মানব শরীরের নির্দিষ্ট অঙ্গে কষ্ট দেয়ার জন্য নিয়োজিত করে। চিকিৎসা শুরু হলে তা এক অঙ্গ থেকে আরেক অঙ্গে চলাচল শুরু করে। যাদুর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যৌন অক্ষমতা সৃষ্টি করা হয়। শেখ ওমরী বলেন, সুস্থ-সবল এবং দৈহিক গঠনে নিখুঁত ব্যক্তি যখন স্ত্রীর সাথে মিশতে যায়, তখন তার অক্ষমতা ও অসহায়তা দেখা দেয়। হাসপাতালে যায় ও ওষুধ সেবন করে। কিন্তু কোন লাভ হয় না। ইসলামের পদ্ধতিতে যাদুর চিকিৎসা করলে সে সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
শেখ ওমরী বলেন, যদি জিনের আক্রমণ হয়, তাহলে সরাসরি রোগীকে ঝাড়-ফুঁক কিংবা পরোক্ষভাবে তেল ও পানি পড়া দিলে সাথে সাথে জিন অসহ্য হয়ে রোগীর শরীরে নড়াচড়া করতে থাকে যা স্বাভাবিক নড়াচড়া নয়। ২য়বার এবং ৩য় বারের সময় তার নড়াচড়া এত বৃদ্ধি পায় যে, তখন চিৎকার দিতে থাকে। তারপর আমি জিনকে জিজ্ঞেস করি, সে কি পুরুষ না মহিলা জিন? সে কোথা থেকে এসেছে এবং কেন এসেছে? তারপর চিকিৎসা অব্যাহত রাখলে জিন চলে যায়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00