📄 মানুষের জিন-সঙ্গী
প্রত্যেক মানুষের সাথে রয়েছে একজন জিন-শয়তান। সে মানুষকে পথভ্রষ্ট করে এবং গুনাহর কাজে ধাবিত করে। এ মর্মে হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে। একরাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর কাছ থেকে বেরিয়ে গেলেন। আয়েশা (রাঃ) বলেন, এতে আমি অভিমান করলাম। তারপর তিনি ফিরে আসেন এবং আমি কি করি তা দেখতে থাকেন। (অর্থাৎ অভিমান দেখতে থাকেন) তিনি বলেন, হে আয়েশা। তুমি কি অভিমান করেছ? আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমার মত একজন মহিলা কেন আপনার উপর অভিমান করবে না? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন: 'তোমার কাছে কি তোমার শয়তান এসেছিল? আয়েশা প্রশ্ন করেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার সাথে কি শয়তান আছে? তিনি উত্তরে বলেন, 'হাঁ'। আয়েশা প্রশ্ন করেন, প্রত্যেক মানুষের সাথেই কি শয়তান থাকে? তিনি উত্তর দেন, 'হাঁ'। আয়েশা বলেন, আমি আবারও প্রশ্ন করলাম, আপনার সাথেও কি শয়তান আছে? তিনি বলেন, 'হাঁ'। তবে আমার প্রতিপালক আমাকে তার বিষয়ে সাহায্য করেছেন। সে মুসলমান হয়ে গেছে। (মুসলিম, আহমদ)
হাদীসের অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, 'তোমাদের মধ্যে এমন কোন লোক নেই যার সাথে একজন জিন (শয়তানকে) নিযুক্ত করা হয় নি। তারা প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার সাথেও নিযুক্ত করা হয়েছে? তিনি বলেন, 'হাঁ', কিন্তু আল্লাহ আমাকে তার বিষয়ে সাহায্য করেছেন। ফলে সে মুসলমান হয়ে গেছে এবং আমাকে ভাল ও কল্যাণ ছাড়া অন্য কিছুর আদেশ করে না।' (মুসলিম-কিতাবুল মুনাফেকীন অধ্যায়)
সুফিয়ান বিন উআইনাহ এ হাদীসের অর্থ এভাবে করেছেন যে, তিনি বলেন। 'ফলে আমি শয়তানের ক্ষতি থেকে বেঁচে গেছি।'
আহমদ বিন হাম্বলের বর্ণিত হাদীসে একটু অতিরিক্ত যোগ হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, 'তোমাদের প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে একজন জিন ও একজন ফেরেশতাকে নিযুক্ত করা হয়েছে। তারা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার কাছেও কি নিযুক্ত করা হয়েছে? তিনি বলেন, 'হাঁ', আমার কাছেও নিযুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ আমাকে তার বিষয়ে সাহায্য করেছেন। সে মুসলমান হয়ে গেছে এবং আমাকে ভাল ছাড়া খারাপ আদেশ করে না।'
আবু নাঈম তাঁর 'দালায়েল আন-নবুওয়া'ত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, 'নবী (সঃ) বলেছেন, আমাকে আদম (আঃ) থেকে অতিরিক্ত দু'টো বৈশিষ্ট্য দান করা হয়েছে। ১. আমার কাছে নিযুক্ত শয়তানটি কাফের ছিল। আল্লাহ আমাকে তার ব্যাপারে সাহায্য করায় সে মুসলমান হয়ে যায়। ২. আমার স্ত্রীরা আমার সাহায্যকারিণী। পক্ষান্তরে, আদমের শয়তান ছিল কাফের এবং তাঁর স্ত্রী আল্লাহর আদেশ লঙ্ঘনের ত্রুটিতে তাঁর সঙ্গীনী ছিল।' (হাদীসটি বিশুদ্ধ-বায়হাকী)
নবী করীম (সঃ)-এর কাছে নিযুক্ত শয়তানের মুসলমান হওয়ার বিষয়টি হাদীস দ্বারা এমন সুস্পষ্ট, যা কোন ব্যাখ্যার দাবী রাখে না। কেননা, তিনি আদম (আঃ)-এর উপর নিজের যে দু'টো বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন, তার একটি হল, আদমের কাছে নিয়োজিত শয়তান মুসলমান হয় নি, কিন্তু তাঁর কাছে নিয়োজিত শয়তান মুসলমান হয়েছে।
আবু জাফর তাহাওয়ী হযরত জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী (সঃ) আমাদেরকে বলেছেন: لَا تَدْخُلُوا عَلَى الْمُغَيِّبَاتِ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِى مِنْ ابْنِ أَدَمَ مَجْرَى الدَّمِ قِيلَ وَمِنْكَ يَارَسُولَ اللَّهِ ؟ قَالَ وَمِنِّى وَلَكِنَّ اللَّهَ تَعَالَى أَعَانَنِى فَاسْلَمَ .
'তোমরা সে সকল স্ত্রীলোকের ঘরে প্রবেশ করো না যাদের স্বামী সফরে বেরিয়েছে। কেননা, নিশ্চয়ই শয়তান আদম সন্তানের রক্তের শিরায়-উপশিরায় দৌড়ে। প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসূল। শয়তান আপনার রক্তেও কি দৌড়ে? তিনি বলেন, 'হাঁ', আমার রক্তেও দৌড়ে, কিন্তু আল্লাহ আমাকে সাহায্য করেছেন, ফলে সে মুসলমান হয়ে গেছে।'
তাহাওয়ী হযরত আয়েশা বা থেকেও একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। আয়েশা (রাঃ) বলেন, এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। অথচ, তিনি আমার মাথার সাথে মাথা লাগিয়ে শুয়েছিলেন। তারপর আমি তাঁকে দুই পায়ের আঙ্গুলগুলোকে কেবলামুখী করে সাজদারত অবস্থায় দেখতে পেলাম। আমি তাঁকে এ দোআটি পড়তে শুনলাম: أعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ سَخَطِكَ وَبِعَفُوكَ مِنْ عُقُوبَتِكَ وَبِكَ مِنْكَ لَا أَبْلُغُ كُلَّ مَا فِيكَ .
“হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আপনার ক্রোধ ও রাগ থেকে পানাহ চাই, আপনার শাস্তি থেকে ক্ষমা চাই, আপনার উছিলায় আপনার থেকে আশ্রয় চাই এবং আপনার যত গুণাবলী আছে সে পর্যন্ত আমি পৌঁছতে পারব না।" তিনি সালাম ফিরিয়ে বলেন, হে আয়েশা। তোমাকে কি শয়তানে ধরেছে? আয়েশা বলেন, আপনার কাছেও কি শয়তান আছে? নবী (সঃ) বলেন, এমন কোন মানুষ নেই, যার কাছে শয়তান নেই। আয়েশা বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল। তাহলে, আপনার অবস্থা কি? তিনি বলেন, আমারও একই অবস্থা। কিন্তু আমি আল্লাহর কাছে দোআ করেছি ফলে তিনি আমাকে সাহায্য করেছেন, এবং সে মুসলমান হয়ে গেছে।'
আবু জাফর তাহাওয়ী বলেন, এ দু'টো হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, এ বিষয়ে নবী (সঃ) নিজেও অন্য মানুষের মতই ছিলেন। কিন্তু আল্লাহর সাহায্যে শয়তানটি মুসলমান হয়ে যাওয়ায় তিনি তার ক্ষতি থেকে নিরাপদ ছিলেন।
কিন্তু এক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন দেখা দেয় যে, শয়তানের ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি যদি ঠিক হয় তাহলে, তিনি শোয়ার সময় শয়তান থেকে পানাহ চাওয়ার উদ্দেশ্যে দোআ পড়েছেন কেন? আবু আজহার আনসারী থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রে শোয়ার সময় এ দোআ পড়তেনঃ
بِسْمِ اللَّهِ وَضَعْتُ جَنبِي اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ مِنْ وَاجِسِ شَيْطَانِي وَفُلِّ رَهَانِي وَثِقْلِ مِيزَانِي وَاجْعَلْنِي فِي النَّدَى الْأَعْلَى .
'আল্লাহর নামে আমি আমার পার্শ্বদেশে শুয়ে পড়লাম। হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আমার শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং বন্ধক থেকে মুক্তি চাই, আমার নেক আমলের ওজন বাড়িয়ে দিন এবং আমাকে সর্বোচ্চ স্তরে স্থান দিন।' (বোখারী ও মুসলিম)
এই প্রশ্নের জবাবে বলা হয়েছে যে, তিনি এই দোআ তখন পড়েছেন যখন তাঁর কাছে নিযুক্ত শয়তান মুসলমান হয় নি। নচেত, মুসলমান হওয়ার পর এ দোআ পড়ার প্রশ্নই উঠে না।
প্রত্যেক মানুষের সাথে যে শয়তান রয়েছে তার আরো প্রমাণ রয়েছে। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, মানুষের মধ্যে দু'ধরনের প্রবণতা আছে। একটা ফেরেশতার পক্ষ থেকে, অন্যটা শয়তানের পক্ষ থেকে। শয়তানের পক্ষ থেকে প্রবণতা সৃষ্টি হলে, আদম সন্তান খারাপ ও মন্দ কাজের প্রতি ঝুঁকে পড়ে এবং সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে। পক্ষান্তরে, ফেরেশতার পক্ষ থেকে প্রবণতা সৃষ্টি হলে, মানুষ ভাল কাজ করে এবং সত্যকে গ্রহণ করে। কেউ ভাল কাজের প্রবণতা বোধ করলে, তার জানা উচিত, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে। সেজন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিত। আর যদি এর বিপরীতটা অনুভব করে তাহলে, সে যেন অভিশপ্ত শয়তান থেকে পানাহ চায়। তারপর তিনি সূরা বাকারার ২৬৮ নং আয়াতটি পড়েন:
الشَّيْطَانَ يَعِيدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُمْ بِالْفَحْشَاءِ .
'শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্রের ভয় দেখায় এবং অশ্লীল কাজের আদেশ দেয়।' (তিরমিজী, নাসাঈ)
আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ
إِنَّ الْمُؤْمِنَ لَيُنْضِى شَيْطَانَهُ كَمَا يُنْضِي أَحَدُكُمْ بَعِيرُهُ فِي السفر .
'নিশ্চয়ই মুমিন ব্যক্তি নিজ শয়তানকে এমন দুর্বল করে, যেমন করে তোমাদের কেউ সফরে নিজ উটকে দুর্বল করে থাকে।' (আহমদ, ইবনু আবিদ দুনিয়া) অর্থাৎ প্রতিটি ক্ষেত্রে শয়তানের ওয়াসওয়াসাকে ঠেলে দিয়ে তার বিপরীতে নেক কাজ করতে থাকলে, শয়তানকে ক্লান্ত-শ্রান্ত করে দেয়া যায়।
এ হাদীসেও মানুষের সাথে নিযুক্ত শয়তানকে দীর্ঘ সফরের উটের মত ক্লান্ত করে দেয়ার নির্দেশ রয়েছে।
কায়েস বিন হাজ্জাজ বলেছেন, আমার শয়তান আমাকে বলল, আমি তোমার কাছে উটের মত প্রবেশ করেছি। (ইবনু আবিদ দুনিয়া) অর্থাৎ ক্লান্ত উটের মত প্রবেশ করেছি।
ওহাব বিন মোনাব্বেহ বলেছেন, 'এমন কোন মানুষ নেই, যার কাছে কোন শয়তানকে নিযুক্ত করা হয় নি। কাফের ব্যক্তির সাথে নিয়োজিত শয়তান তার পানাহারে অংশ নেয় এবং তার বিছানায় শোয়। আর মুমিনের সাথে নিয়োজিত শয়তান তার জ্ঞান ও বিবেক লোপ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকে। যখন বিবেক লোপ পায়, তখন সে লাফিয়ে পড়ে। শয়তানের কাছে প্রিয়তম ব্যক্তি হচ্ছে পেটুক ও অধিক নিদ্রার লোক।' (আহমদ-যোহদ কিতাব) ওহাব বিন মোনাব্বেহ একজন তাবেঈ ও বড় ঐতিহাসিক ছিলেন। তাঁর বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আবদুর রাজেক এবং ইবনুল মোনজের সাঈদ আল-জোরাইরী থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি কোরআনের এই আয়াত প্রসঙ্গে বলেছেন: وَمَنْ يَعْشُ عَنْ ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا .
'যে মেহেরবান আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত থাকে আমরা তার জন্য একজন শয়তান নিয়োগ করি।' (সূরা যুখরুফ-৩৬)
আমরা জানতে পেরেছি যে, কাফেরকে যখন কেয়ামতের দিন উঠানো হবে, তখন শয়তান তাকে হাত দিয়ে ঠেলা দেবে। কিন্তু সে তা প্রতিহত করতে পারবে না। তখন আল্লাহ জাহান্নামকে তার ঠিকানা বানাবেন। তখনই কাফের ব্যক্তি আফসোস করে বলবে: يَا لَيْتَ بَيْنِي وَبَيْنَكَ بُعْدَ الْمُشْرِقَيْنِ .
'হায়, যদি আমার ও তোমার মধ্যে পূর্ব-পশ্চিমের সমান দূরত্ব হত।' (সূরা যুখরুফ-৩৮) পক্ষান্তরে, মুমিন ব্যক্তির সাথে ফেরেশতাকে নিযুক্ত করা হবে। লোকজনের সামনে তার হিসেব-নিকেশ হবে এবং তার ঠিকানা হবে বেহেশত।'১.
শয়তান যেহেতু প্রতিটি মানুষের সাথে লাগা আছে, তাই মানুষকে এ ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন থাকতে হবে। সচেতন না থাকলে শয়তান সর্বনাশ করে ছাড়বে। দুশমন সারাক্ষণ দুশমনীই করবে। দুশমনের ব্যাপারে সজাগ থাকা সেটা ঈমানের দাবী। প্রায়ই গুনাহ করার প্রবণতা শয়তানের কারণেই হয়ে থাকে।
টিকাঃ
১. ঐ.
📄 রমযানে শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়
তিরমিজী ও ইবনে মাজাহ আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। ‘রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: রমজানের ১ম রাত্রে শয়তান ও জিন সরদারকে শিকল দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়।’
ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের ছেলে আব্দুল্লাহ বলেন। আমি আমার বাপকে এ হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম যে, রমজানে তো লোকদের প্রতি শয়তানের ওয়াসওয়াসা অব্যাহত থাকে এবং এ মাসে লোকদেরকে জিন-ভূতেও ধরে। তিনি উত্তরে বলেন: হাদীসের বর্ণনা তো এরূপই।
হাদীসের অর্থের দিকে তাকালে মনে হয় কেবলমাত্র শয়তানের সরদারকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। অন্যান্য ছোট শয়তানরা উন্মুক্ত থাকে। রমজানে তারাই পাপ সংঘটিত করায়। এদিকে, কোরআনে জিন-শয়তানের পাশাপাশি মানব শয়তানের কথাও উল্লেখ আছে। আল্লাহ বলেন: مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ .
‘আমি অন্তরে মানুষ ও জিন-শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই।’ (সূরা নাস-৬) মানুষ-শয়তানও পাপ কাজ করায়।
এছাড়াও শয়তান সারাবছর যে পাপ কাজ করায় তা সামনের দিনগুলোর জন্যও পাপ কাজে সহায়ক হয়। সেজন্য রমজানে শয়তান বাঁধা থাকলেও তার আগে শক্তিশালী ওয়াসওয়াসার প্রভাবে মানুষ রমজানেও পাপ কাজ করে।