📄 বিভিন্ন আম্বিয়ায়ে কেরামের কাছে ইবলিশের আগমন
শয়তানের আক্রমণ থেকে স্বয়ং নবীরাও মুক্ত ছিলেন না। সে তাদের কাছে গিয়েও প্রতারণা এবং ওয়াসওয়াসা দেয়ার চেষ্টা করেছে। হযরত আদম (আঃ) থেকে শুরু করে শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) পর্যন্ত প্রায় সকল নবীর কাছেই শয়তানের আগমন ঘটেছে।
হযরত আদম ও হাওয়া (আঃ)-এর প্রতি শয়তানের ওয়াস-ওয়াসা :
ইবনু জারীর বলেছেন, মুসা বিন হারুন ইবনে আব্বাস ও ইবনে মাসউদসহ আরো কিছু সংখ্যক সাহাবায়েকেরাম থেকে বর্ণনা করেছেন: অভিশপ্ত শয়তান যখন বেহেশত থেকে বেরিয়ে গেল এবং আদম (আঃ)-কে বেহেশতে বসবাস করতে দেয়া হল, তখন আদম (আঃ) একাকী অপরিচিত অবস্থায় চলতে লাগলেন। তাঁর কোন সঙ্গিনী ছিল না। তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুম থেকে উঠে নিজ মাথার কাছে একজন মহিলাকে বসা দেখতে পান। আল্লাহ আদমের পাঁজর থেকে তাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি জিজ্ঞেস করেন, তুমি কে? মহিলাটি বলেন আমি একজন মহিলা। আদম বলেন, তোমাকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে? মহিলাটি বলেন, আমার সাথে আপনি বাস করবেন, এজন্য আমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। ফেরেশতারা আদমের জ্ঞানের দৌড় পরীক্ষার জন্য জিজ্ঞেস করলেন, মহিলাটির নাম কি? আদম বলেন: তার নাম 'হাওয়া'। তাঁরা পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, হাওয়া নামকরণের স্বার্থকতা কি? আদম জবাব দেন, তাকে حى বা জীবন্ত জিনিস থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। حى فى حواء শব্দের মূল একই।
হাওয়াকে যে আদম থেকে তৈরি করা হয়েছে কোরআন একথার প্রমাণ। আল্লাহ বলেন: هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا . "তিনিই সে সত্তা, যিনি তোমাদেরকে একটিমাত্র নফস থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার স্ত্রীকে তৈরি করেছেন। যেন তিনি তার সাথে বাস করতে পারেন।" (সূরা আরাফ-১৮৯-১৯০)
যাহোক, তারপর আল্লাহ আদম ও হাওয়াকে বেহেশতে বাস করার আদেশ দেন এবং তাদেরকে বলেন: 'হে আদম। তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বাস কর এবং যা ইচ্ছা সেখান থেকে খাও। তবে এই গাছের কাছেও যেয়ো না। তাহলে, তোমরা জালেমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। এরপর শয়তান তাদেরকে ওয়াসওয়াসা দিল যেন সে তাদের পরনের পোশাক খুলে দিতে পারে।' (আল- কোরআন)
এ আয়াতে আদম ও হাওয়ার প্রতি শয়তানের ওয়াসওয়াসার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হল, শয়তান কিভাবে বেহেশতে পৌঁছল?
ইবনে আব্বাস ও ইবনে মাসউদসহ একদল সাহাবী থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: আল্লাহ পাক যখন আদম ও হাওয়াকে বেহেশতে অবাধ বিচরণের ও পানাহারের আদেশ দিলেন এবং একটিমাত্র গাছের নিকটবর্তী হতে নিষেধ করলেন, তখন ইবলিশ বেহেশতে তাদের কাছে যেতে চাইল। বেহেশতের রক্ষীরা বাধা দিল। তারপর সে সাপের কাছে আসল। সাপের ছিল ৪টি পা এবং সে উটের মত রড় ছিল। সেটি ছিল অত্যন্ত সুন্দর প্রাণী। ইবলিশ তাকে তার মুখের ভেতর করে বেহেশতে পৌছিয়ে দেয়ার অনুরোধ জানাল। সাপ তাকে মুখে করে বেহেশতের অভ্যন্তরে পৌঁছিয়ে দিল। বেহেশতের রক্ষীরা। আল্লাহর এই ইচ্ছা সম্পর্কে টের পেল না। সে সাপের মুখে থেকেই আদমকে লক্ষ্য করে কথা বলল, কিন্তু তিনি তার কথার প্রতি কান দিলেন না। পরে শয়তান বেরিয়ে তাঁর কাছে গেল এবং বললঃ
يَا آدَمُ هَلْ أَدُلُّكَ عَلَى شَجَرَةِ الْخُلْدِ وَمُلْكِ لَّا يَبْلى .
"হে আদম! আমি কি তোমাকে চিরস্থায়ী জীবনদানকারী গাছ ও অবিনশ্বর রাজত্বের কথা বলব না- যা কখনও নষ্ট হবে না?" (সূরা ত্বাহা-১২০) অর্থাৎ ইবলিশ বলল, আমি কি তোমাকে এমন গাছের সন্ধান দেব যার ফল খেলে তুমি অমর ও চিরস্থায়ী হবে এবং তোমার সাম্রাজ্য চিরদিন অব্যাহত থাকবে। তুমি কখনও মরবে না। সে শপথ করে বলল:
إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ النَّاصِحِينَ .
"অবশ্যই আমি তোমাদের উভয়ের হিতাকাঙ্খী।" (সূরা আরাফ-২০) এর দ্বারা তার লক্ষ্য ছিল, আল্লাহর আদেশ অমান্য করার সাথে সাথে তাদের শরীরের বেহেশতী পোশাক খসে পড়বে। আদম-শয়তানের কথা প্রত্যাখ্যান করলেন। কিন্তু হাওয়া সে কথা গ্রহণ করেন এবং নিষিদ্ধ গাছের ফল খান। তিনি আদমকে বলেন, হে আদম! আমিতো এ গাছটির ফল খেয়েছি, আমার কোন ক্ষতি হয় নি তাই আপনিও ফল খান।' যখন আদম ফল খেয়ে ফেলেন, তখন তাদের পরনে যে বেহেশতী পোশাক ছিল তা খসে পড়ল, তারা উভয়েই বেহেশতের গাছের পাতা দিয়ে শরীর ঢাকার চেষ্টা চালান।১-
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, এ অপরাধের কারণে আল্লাহ সাপকে উলঙ্গ রেখেছেন এবং তাকে পেটের উপর চলাচলকারী সরীসৃপে রূপান্তরিত করেছেন' ইবনে আব্বাস বলেন: তোমরা সাপকে হত্যা করে আল্লাহর দুশমনের উপর থেকে নিজেদের দায়িত্বের বোঝা কমাও। ২-
রাবী থেকে বর্ণিত। একজন মোহাদ্দেস বলেছেন, শয়তান চতুষ্পদ জন্তুর আকৃতিতে বেহেশতে প্রবেশ করেছিল। সেটাকে উটের মত দেখাচ্ছিল। তখন তার উপর লা'নত নাজিল হল। ফলে, তার পা খসে পড়ল এবং সে সাপ হয়ে গেল। শয়তান তাদেরকে বলল: مَا نَهَا كَمَا رَبِّكُمَا عَنْ هُذِهِ الشَّجَرَةِ إِلَّا أَنْ تَكُونَا مَلَكَيْنِ أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ .
"আল্লাহ তোমাদের দু'জনকে এ গাছের ফল খেতে এজন্য নিষেধ করেছেন, হয় তোমরা ফেরেশতা হয়ে যাবে অথবা বেহেশতের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যাবে।" (সূরা আরাফ-২০) অর্থাৎ আপনারা ফেরেশতা না হলেও অন্ততঃ বেহেশতে চিরস্থায়ী থাকতে পারবেন।
ইবনে জারীর থেকে বর্ণিত। আবু যায়েদ বলেছেন: ঐ গাছের ফল খাওয়ার পর আদম বেহেশতের মধ্যে ভাগতে থাকলেন। আল্লাহ ডাক দিয়ে বলেন, হে আদম! আমার থেকে ভেগে যাচ্ছ? আদম বলেন, না, তবে লজ্জায় পালাচ্ছি। আল্লাহ বলেন: কিভাবে তুমি এ কাজ করলে? আদম বলেন: হাওয়া আগে তা করেছে। তখন আল্লাহ বলেন: আমি প্রতি মাসে তাকে ১ বার রক্তস্রাব দেব, তাকে কম বুদ্ধিমতী বানাব, তাকে স্নেহশীলা হিসেবে সৃষ্টি করেছি, তাকে গর্ভধারণের কষ্ট এবং প্রসব বেদনা দান করব।" ১. আবু যায়েদ বলেন, হাওয়া যে ভুল করেছে তা যদি না করত, তাহলে, দুনিয়ার মহিলাদের ঋতুস্রাব হত না, তারা ধৈর্যশীলা হত, সহজ গর্ভধারণ ও সহজভাবে সন্তান প্রসব করত। কিন্তু আল্লাহর হুকুম অমান্য করে তারা গাছের ফল খাওয়ায় আল্লাহ তাদেরকে বেহেশত থেকে বের করে দিলেন এবং বেহেশতের সকল প্রকার নেয়ামত ও মর্যাদা ছিনিয়ে নিলেন। তাদের সাথে দুই দুশমন সাপ এবং ইবলিশকেও দুনিয়ায় পাঠিয়ে দিলেন। তিনি বলেন: اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ
"তোমরা অবতরণ কর, তোমরা একে অপরের শত্রু।' ইবনু মাসউদ ও ইবনে আব্বাস উপরোক্ত আয়াতের এরূপ তাফসীরই করেছেন।"
নৌকায় নূহ (আঃ)-এর কাছে শয়তানের আগমন :
ইবনু আবিদ দুনিয়া তাঁর 'মাকায়েদুশ শয়তান' বইতে ওমার (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, যখন নূহ (আঃ) নৌকায় আরোহণ করেন তখন তাতে এক অপরিচিত ব্যক্তিকে দেখতে পান। তিনি জিজ্ঞেস করেন, তুমি কে? লোকটি বলল, আমি ইবলিশ, নূহ (আঃ) বলেন, কে তোমাকে নৌকায় প্রবেশ করিয়েছে? সে বলল, আমি আপনার লোকদের অন্তর দখল করার জন্য প্রবেশ করেছি, যেন তাদের অন্তর থাকে আমার সাথে, আর শরীর থাকে আপনার সাথে। নূহ (আঃ) বলেন: হে আল্লাহর দুশমন। বের হও। ইবলিশ জবাব দেয়: ৫টি বিষয় দ্বারা আমি মানুষকে ধ্বংস করি। এর মধ্য থেকে তিনটি বিষয়ে আপনাকে জানাব, আর দু'টো বিষয়ে জানাব না। আল্লাহ নূহ (আঃ)-কে অহীর মাধ্যমে জানিয়ে দেন, আপনি বলুন, তোমার তিন বিষয় আমার দরকার নেই। দুই বিষয়ে বল। ইবলিশ বলল: আমি এ দু'বিষয় দ্বারা লোকদেরকে বিভ্রান্ত করি যাকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। একটি হচ্ছে, হিংসা, হিংসার কারণেই আমি অভিশপ্ত ও বিতাড়িত হয়েছি এবং শয়তানে পরিণত হয়েছি। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, লোভ। লোভের কারণেই আদম (আঃ) গোটা বেহেশতকে মোবাহ মনে করেছিলেন। তাঁর লোভের কারণেই আমি আমার লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছি। ১
ইবনু আবিদ দুনিয়া আবুল আলিয়া থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, যখন নূহ (আঃ) নৌকা ভাসালেন। তখন নৌকার পেছনে মাঝিদের থাকার ও সামান রাখার জায়গায় ইবলিশকে দেখেন। তিনি বলেন, তোর ধ্বংস হোক, তোর কারনেই জমীনের অধিবাসীরা ডুবেছে এবং তুই তাদেরকে ধ্বংস করেছিস। ইবলিশ বলে, আমি কি করব? তিনি বলেন, তাওবাহ করবে। ইবলিশ বলে, আপনি আপনার রবের কাছে জিজ্ঞেস করুন, আমার জন্য কি তাওবা আছে? নূহ (আঃ) আল্লাহর কাছে দোআ করেন। আল্লাহ নূহ (আঃ)-এর প্রতি অহী পাঠান যে তার তাওবাহ হল আদমের কবরে গিয়ে সাজদা করা। নূহ (আঃ) ইবলিশকে বলেন, তোর জন্য তাওবার সুযোগ আছে। ইবলিশ বলে, সে সুযোগ কি? নূহ (আঃ) বলেন: আদমের কবরে গিয়ে সাজদা কর। সে বলে, আমি যাকে জীবিত অবস্থায় সাজদা করিনি এখন তাকে মৃত অবস্থায় সাজদা করব?
ইবনে আব্বাস বলেন, সর্বপ্রথম নৌকায় ভুট্টা প্রবেশ করে এবং সর্বশেষ প্রবেশ করে গাধা। ইবলিশ গাধার লেজ ধরে নৌকায় প্রবেশ করে।
আবুশ শেখ নিজ তাফসীরে ইবনে আব্বাসের বরাত দিয়ে লিখেছেন, আল্লাহ যখন ইচ্ছা করলেন যে, গাধা নূহ (আঃ)-এর নৌকায় প্রবেশ করুক, তখন নূহ (আঃ) গাধার কান ধরে টানতে থাকেন আর শয়তান তার লেজ ধরে পেছনের দিকে টানতে থাকে। তখন নূহ বলেন, হে শয়তান। প্রবেশ কর। গাধা প্রবেশ করে। সাথে শয়তানও প্রবেশ করে। নৌকা চলা শুরু করলে শয়তান গাধার লেজে বসে গান শুরু করে। নূহ (আঃ) বলেন, তোর ধ্বংস হোক। তোকে কে প্রবেশ করিয়েছে?' ইবলিশ বলে, আপনি। নূহ বলেন, কখন? ইবলিশ বলে: যখন আপনি বলেন, হে শয়তান! প্রবেশ কর। তখন আমি আপনার অনুমতিসহকারে প্রবেশ করেছি।
ইবরাহীম (আঃ)-এর কাছে শয়তানের আগমনঃ
ইবনু জারীর কাতাদা থেকে বর্ণনা করেছেন। ১. আল্লাহ ইবরাহীম (আঃ)-কে তাঁর সন্তান জবেহ করার আদেশ দেন। তিনি বলেন, হে সন্তান! ছুরি লও। শয়তান ভাবল, ইবরাহীম পরিবারে আমার প্রয়োজন পূরণের এটাই মোক্ষম সুযোগ। সে ইবরাহীম (আঃ)-এর এক বন্ধুর বেশে তাঁর কাছে গিয়ে বলে: হে ইবরাহীম! আপনি কোথায় যাচ্ছেন? তিনি উত্তর দেন, একটু দরকারে যাচ্ছি। ইবলিশ বলে, আপনি স্বপ্নে আপনার সন্তানকে জবেহ করতে দেখেছেন বলে এখন তাকে জবেহ করতে নিয়ে যাচ্ছেন। স্বপ্ন তো সঠিক এবং বেঠিক দু'রকমই হতে পারে। আপনি স্বপ্নে যে ইসমাইলকে জবেহ করতে দেখেছেন, তা ঠিক নয়। সে ইবরাহীম (আঃ)-কে পদস্খলিত করতে না পেরে হযরত ইসমাইল (আঃ)-এর কাছে যায় এবং তাঁকে বলে: হে ইসমাইল! কোথায় যাচ্ছেন? তিনি উত্তর দেন, আমার পিতা ইবরাহীমের সাথে একটি কাজে যাচ্ছি। সে বলল, ইবরাহীম তো আপনাকে জবেহ করবেন। ইসমাইল বলেন: কেন আমাকে জবেহ করবেন? তুমি কি কোন পিতাকে নিজ সন্তান জবেহ করতে দেখেছ? ইবলিশ উত্তর দেয়: তিনি আপনাকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করবেন। ইসমাইল বলেন: তিনি আল্লাহর উদ্দেশ্যে জবেহ করলে আমি ধৈর্য ধারণ করব। আল্লাহ এ কাজের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ। যখন সে ইসমাইলকে বিচ্যুত করতে পারল না তখন হযরত সারার কাছে এসে বলল: ইসমাইল কোথায় যাচ্ছে? তিনি বলেন, সে তার পিতার সাথে এক কাজে যাচ্ছে। ইবলিশ বলে, তাকে তো জবেহ করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সারা বলেন: তুমি কি কোন পিতাকে নিজ সন্তান জবেহ করতে দেখেছ? ইবলিশ বলে তিনি আল্লাহর উদ্দেশ্যে তাকে জবেহ করবেন। তিনি উত্তর দেন, যদি আল্লাহর উদ্দেশ্যেই জবেহ করে, তাহলে ইবরাহীম ও ইসমাইল তো আল্লাহর জন্যই। আর আল্লাহ এ কাজের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ।
সে যখন সারাকেও হেলাতে পারল না তখন মিনায় জামরার কাছে গেল এবং এমনভাবে নিজেকে ফুলাল, মিনা উপত্যকা ভরে গেল এবং কোন খালি স্থান থাকল না। ইবরাহীম (আঃ)-এর সাথে ছিল ফেরেশতা। ফেরেশতা বলেন: হে ইবরাহীম। আপনি ৭টি কঙ্কর নিক্ষেপ করুন এবং তাকবীর বলুন। প্রত্যেক কঙ্করের সাথে শয়তান রাস্তা ছেড়ে দিতে থাকল। তারপর তিনি ২য় জামরার কাছে যান। ইবলিশ ফুলে সম্প্রসারিত হওয়ায় গোটা উপত্যকা বন্ধ হয়ে গেল। ফেরেশতা এখানেও তাকবীরসহ ৭টি কঙ্কর নিক্ষেপের পরামর্শ দেন। প্রত্যেক কঙ্করের পর ইবলিশ একটু একটু করে রাস্তা ছেড়ে দেয়। তিনি ৩য় জামরায় আসেন। এখানেও শয়তান ফুলে ফেঁপে উপত্যকা ভরে দেয়। ফেরেশতার পরামর্শে তিনি এখানেও ৭টি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। এতে ইবলিশ রাস্তা ছেড়ে দেয়। তখন তিনি জবেহর জায়গায় পৌঁছেন। এভাবে ইবরাহীম (আঃ) শয়তানের ওয়াসওয়াসাকে ব্যর্থ করে দিয়ে তাকে নিরাশ করেন। এতবড় নবী যিনি নবীদের পূর্বপুরুষ তাকেও শয়তান গোমরাহ করার চেষ্টা করেছে। সে তুলনায় মানব সমাজের অন্যান্য সদস্যদের কি উপায়? আমাদের সবাইকে ও নবীদের পদাঙ্ক অনুসরণে শয়তানকে ব্যর্থ করে দিতে হবে।
হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে শয়তানের আগমনঃ
ইবনু আবিদ দুনিয়া। ওমার (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবলিশ মূসা (আঃ)-কে বলল, হে মূসা! আল্লাহ আপনাকে নিজ রেসালাত দ্বারা মর্যাদাবান করেছেন এবং আপনার সাথে কথা বলেছেন। আর আমি হলাম তাঁর গুনাহগার সৃষ্টি এবং আমি তাওবাহ করতে চাই। আপনি আল্লাহর কাছে আমার তাওবাহ কবুলের জন্য সুপারিশ করুন। মূসা (আঃ) আল্লাহর কাছে দোআ করেন। মুসাকে বলা হল, হে মূসা! আপনি আপনার প্রয়োজন পূরণ করেছেন। তারপর মূসা (আঃ)-এর সাথে ইবলিশের সাক্ষাত হলে তিনি বলেন: তোমাকে আদমের কবরে সাজদার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তাহলে তোমার তাওবাহ কবুল হবে। ইবলিশ একথা শুনে অহঙ্কার ও গোস্সা প্রকাশ করে বলে, যাকে আমি জীবিত অবস্থায় সাজদা করিনি তাকে মৃত অবস্থায় সাজদা করব? তারপর ইবলিশ বলে: হে মূসা! আল্লাহর কাছে আমার জন্য সুপারিশের কারণে আমার উপর আপনার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিন কাজ করার সময় আমার কথা স্মরণ করে তা থেকে বেঁচে থাকবেন। কেননা, ঐগুলোর মধ্যে রয়েছে ধ্বংস। (১) রাগের সময় আমার ধ্বংসকাণ্ডের কথা স্মরণ করবেন। কেননা তখন আমার মুখ থাকে আপনার হৃদয়ে, আর চোখ থাকে আপনার চোখে। আমি আপনার শিরা-উপশিরায় ও ধমনীতে চলাচল করি। (২) যুদ্ধের সময় আমার ধ্বংসাত্মক তৎপরতা স্মরণ করুন। আমি তখন বনি আদমের কাছে যাই ও তার স্ত্রী, সন্তান ও পরিবার-পরিজনের কথা স্মরণ করাই, যে পর্যন্ত না সে জেহাদ থেকে পশ্চাতমুখী হয়। (৩) অমোহরেম মহিলার কাছে বসবেন না। আমি তার কাছে আপনার দূত এবং আপনার কাছে তার দূত।
ইবনু আবিদ দুনিয়া আবদুর রহমান বিন যিয়াদ বিন আনউ'ম আফ্রিকান থেকে বর্ণনা করেছেন। একদিন মূসা (আঃ) বসা ছিলেন। সে সময় লম্বা টুপি পরে ইবলিশ আসে। টুপিটি ছিল রং-বেরঙের। মূসা (আঃ)-এর নিকটবর্তী হওয়ার পর সে টুপিটি খুলে ফেলে। ইবলিশ বলে, হে মুসা! আপনার উপর সালাম বর্ষিত হোক। মূসা (আঃ) বলেন, তুমি কে? সে বলে : আমি ইবলিশ। মুসা বলেন : তোমার প্রতি স্বাগতম ও শুভেচ্ছা নেই। মুসা জিজ্ঞেস করেন তুমি কেন এসেছ? ইবলিশ উত্তর দেয়, আল্লাহর কাছে আপনার মর্যাদা ও সম্মানের কারণে আপনাকে সালাম দিতে এসেছি। মুসা জিজ্ঞেস করেন, তুমি কিভাবে মানুষকে ওয়াসওয়াসা দাও? ইবলিশ বলে, আমি মানুষের অন্তর ছিনিয়ে নেই। মূসা বলেন, আদম সন্তানের কোন্ কাজ তোমাকে তাদের উপর ওয়াসওয়াসা দিতে প্ররোচিত করে? ইবলিশ বলে : যখন বনি আদম গর্ববোধ করে, বেশি আমল করেছে বলে ভাবে এবং নিজ গুনাহ ভুলে যায় তখন আমি সেগুলোকে পুঁজি করে তাদের গোমরাহ করি। আমি আপনাকে তিনটি বিষয়ে সতর্ক করে দিচ্ছি। (১) কোন অমোহরেম মহিলার সাথে নির্জনে থাকবেন না। কেউ এরূপ নির্জনে থাকলে আমি তাকে দিয়ে কলঙ্ক সৃষ্টি করে ক্ষান্ত হই। (২) কেউ আল্লাহর নামে—অঙ্গীকার ও ওয়াদা করলে তা পূরণের পথে আমি এবং আমার সাথীরা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করি (৩) দান-সদকার নিয়ত করলে তা পূরণ করে ছাড়বেন। তা কার্যকর না করলে আমি তা ভঙ্গের জন্য বাধা সৃষ্টি করি।'
হযরত আইউব (আঃ)-এর কাছে শয়তানের আগমনঃ
ইমাম আহমদ তাঁর 'যোহদ' কিতাবে এবং ইবনু আবি হাতেম তাঁর নিজ তাফসীরে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন : শয়তান আকাশে উঠে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে বলে, হে আল্লাহ! আমাকে হযরত আইউবের উপর নিয়ন্ত্রণ দান করুন। আল্লাহ জবাবে বলেন, আমি তোকে তার সম্পদ ও সন্তানের উপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দিলাম, কিন্তু তার শরীরের উপর নয়। শয়তান জমীনে নেমে আসে এবং নিজ বাহিনীকে জড় করে বলে : আইউবের উপর আমাকে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এখন তোমরা আমাকে তোমাদের শক্তির দাপট দেখাও। তারা সকলে আগুনের রূপ ধারণ করল। তারপর পানি হয়ে গেল। তারা সাথে সাথে পূর্ব ও পশ্চিমে সম্প্রসারিত হয়ে পড়ল। তাদের একদলকে পাঠানো হল, আইউব (আঃ)-এর কৃষিখামারে, একদলকে তাঁর উটপাল, অন্যদলকে গরুর পাল এবং আরেক দলকে বকরীর পালের কাছে। ইবলিশ মন্তব্য করল, আজ ধৈর্য ছাড়া তাঁর বাঁচার উপায় নেই। শয়তানের দলেরা তাঁর উপর একের পর এক বিপদ নিয়ে আসল। কৃষির উপর বিপদ নাজিলকারী শয়তান বললঃ হে আইউব! আপনি কি দেখেন না, আপনার রব আগুন দ্বারা আপনার কৃষিখামার জ্বালিয়ে দিয়েছে? তারপর উট পাল ধ্বংসকারী শয়তান এসে বলল, আপনি কি দেখেন না, আপনার রব সংক্রামক রোগ দ্বারা আপনার উটগুলোকে ধ্বংস করে দিল? তারপর গরু ও বকরী পাল ধ্বংসকারী শয়তান এসে বলল : হে আইউব। আপনি কি দেখেন না, আপনার রব সংক্রামক রোগের মাধ্যমে আপনার গরু ও বকরীগুলোকে খতম করে দিল?
আইউব (আঃ) নিজ সন্তানদেরকে বড় ছেলের ঘরে জড় করেন। তারা তখন পানাহারে ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ করে ঝড়ে ঘরের খুঁটিগুলো ভেঙ্গে গেল এবং ঘরটি পড়ে গেল। শয়তান একজন শিশুর বেশে দুই কানে দুটো সোনা বা রূপার দুল পরে হযরত আইউবের কাছে হাজির হয়ে বলল: হে আইউব! আপনি কি দেখেন নি, আপনার প্রভু আপনার সন্তানদেরকে বড় ছেলের ঘরে একত্রিত করে ঝড় দিয়ে তা ভেঙ্গে দিল? আপনি যদি দেখতেন যে তাদের খাদ্য ও পানীয়ের সাথে কিভাবে তাদের রক্তমাংস একাকার হয়ে গেছে? আইউব (আঃ) প্রশ্ন করেন, তুমি তখন কোথায় ছিলে? সে বলে, আমি তাদের সাথেই ছিলাম। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, তুমি কিভাবে বেঁচে গেলে? সে উত্তরে বলে, ব্যস্, সরে গেছি। আইউব (আঃ) বলেন: তুই শয়তান। তারপর আইউব (আঃ) বলেছেন: আমি আজ মায়ের পেট থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার আকৃতি ধারণ করব। এই বলে, তিনি মাথার চুল মুণ্ডন করলেন এবং নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন। তখন শয়তান এত জোরে চিৎকার দিয়ে কাঁদতে লাগল যে, আসমান ও জমীনের সকল অধিবাসী সে কান্না শুনতে পেল। তারপর সে আবার আসমানে গেল এবং প্রার্থনা জানাল, হে আমার রব। আইউব রক্ষা পেয়ে গেছে। আমাকে তার উপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দিন। আমি আপনার ক্ষমতা ছাড়া কোন কিছুই করতে সক্ষম নই। আল্লাহ বলেন, ঠিক আছে, আমি তোকে তাঁর শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দিলাম, কিন্তু তাঁর মনের উপর নয়। শয়তান আসমান থেকে জমীনে নেমে আসে এবং আইউব (আঃ)-এর দু'পায়ের নিচে ফুঁ দেয়। ফলে তাঁর আপাদমস্তক কাঁপতে থাকে। তিনি মাটিতে পড়ে যান এবং তাঁর ডাইরিয়া শুরু হয়। তাঁর স্ত্রী সেবা করতে থাকেন। স্ত্রী বলেন: হে আইউব! আপনি তো দেখছেন যে, আমি অত্যন্ত অভাবী ও বিপদগ্রস্ত হয়েছি। আপনি যদি রুটি কেনার জন্য আমার শেষ সম্বল মাথার চুল বিক্রি করে দিতেন, তাহলে, আমি আপনার খাওয়ার ব্যবস্থা করতাম। আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, তিনি যেন আপনাকে দ্রুত সুস্থ করেন। আইউব (আঃ) বলেন, আমরা দীর্ঘ ৭০ বছর যাবত আল্লাহর অপার নেয়ামতের মধ্যে ডুবে ছিলাম। আগামী ৭০ বছর পর্যন্ত বিপদ-মুসীবতের মধ্যে টিকে থাকার লক্ষ্যে ধৈর্য্য ধারণ কর। মাত্র ৭ বছর যাবত আমাদের বিপদ চলছে।
তালহা বিন মোসাইরাফ বলেন। ইবলিশ বলে: আমি আইউব (আঃ)-এর এমন ক্ষতি করতে পারিনি যার দ্বারা আমি খুশী হতে পারি। তবে, যখন আমি তাঁর আহাজারি শুনেছি, তখন ভেবেছি যে, আমি তাকে ব্যথিত করেছি। ১
ইবলিশ আইউব (আঃ)-এর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করল, আপনাদের উপর বিপদ-মুসীবতের কারণ কি? স্ত্রী উত্তর দিল, এটা হচ্ছে, আল্লাহর ফয়সালা। ইবলিশ বলল, আমার সাথে আসুন। স্ত্রী তার সাথে গেল এবং উপত্যকায় তাদের হারানো সম্পদ দেখাল। ইবলিশ বলল, আমাকে সাজদা করলে আমি এ সকল কিছু ফেরত দেব। স্ত্রী বললেন, আমার স্বামীর অনুমতি লাগবে। স্ত্রী আইউব (আঃ)-কে ঘটনা বললে তিনি বলেন, জেনে রাখ সে হচ্ছে শয়তান। আমি সুস্থ হলে তোমাকে ১শ বেত্রাঘাত করব। ১
হযরত ইয়াহইয়া (আঃ)-এর কাছে শয়তানের আগমন :
ইবনু আবিদ দুনিয়া ওহাব বিন ওয়ারদ থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, খবীস ইবলিশ হযরত ইয়াহইয়া বিন যাকারিয়া (আঃ)-এর কাছে হাজির হয়ে বলে, আমি আপনাকে উপদেশ দিতে চাই। তিনি বলেন, তুই মিথ্যুক, তুই আমাকে উপদেশ দিবি না, তবে আমাকে আদম সন্তানদের বিষয়ে কিছু তথ্য দিয়ে যা। ইবলিশ বলে : আমাদের কাছে মানুষ তিন ধরনের। এক ধরনের মানুষ আমাদের জন্য খুবই জটিল। আমরা তাকে ফেতনায় নিমজ্জিত করে তার উপর বিজয়ী হই। কিন্তু পরক্ষণেই সে তওবা-এস্তেগফার করে আমাদের সকল সাফল্য ব্যর্থ করে দেয়। তারপর আমরা আবার তার কাছে যাই এবং সেও পুনরায় তওবা-এস্তেগফার করে। আমরা তার ব্যাপারে নৈরাশ নই। তবে আমাদের প্রয়োজনও পূরণ হয় না। তাদেরকে নিয়ে আমাদের কষ্ট বেশি। ২য় প্রকারের লোক হল, শিশুদের পায়ের বলের মত। আমরা যেভাবে ইচ্ছা তাদেরকে ঘুরপাক খাওয়াই। আমরা তাদের জন্য যথেষ্ট। ৩য় প্রকার হচ্ছে, আপনার মত নিষ্পাপ। আমরা তাদের উপর বিজয়ী হতে পারি না। তখন হযরত ইয়াহইয়া জিজ্ঞেস করেন, আমার উপর কি তুই কোন সময় সফল হয়েছিস? ইবলিশ বলে, 'না।' তবে একবার আপনি খানা বেশি খেয়ে রাত্রে ঘুমিয়ে পড়েন। ফলে অন্যান্য রাতের মত সে রাতে আপনি নামাজের জন্য জাগতে পারেন নি। হযরত ইয়াহইয়া বলেন, আমি কখনো তৃপ্ত হয়ে খাই না। এবার ইবলিশ বলে, আমি আপনার পরে আর কোন নবীকে উপদেশ দেব না।
ইমাম আহমদ তাঁর 'যোহদ' কিতাবে এবং বায়হাকী শোআ'বুল ঈমান গ্রন্থে সাবেত বানানী থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবলিশ হযরত ইয়াহইয়া (আঃ)-এর কাছে আগমন করে। ইয়াহইয়া (আঃ) ইবলিশের কাছে সকল কামনা-বাসনার উপাদান দেখে জিজ্ঞেস করেন, হে ইবলিশ। এগুলো কি? ইবলিশ জবাব দেয়, এগুলো হচ্ছে বনি আদমকে গোমরাহ করার উপায়-উপাদান। ইয়াহইয়া (আঃ) জিজ্ঞেস করেন, এতে আমার বিরুদ্ধে ব্যবহারের কিছু আছে? ইবলিশ জবাব দেয় 'না।' তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, তুই কি কখনও আমার উপর সফল হয়েছিস? ইবলিশ বলে: আপনি একবার তৃপ্তি করে খেয়েছিলেন। তখন আমরা 'আপনাকে নামাজ ও জিকর থেকে বিরত রেখেছিলাম। তিনি বলেন, আর কিছু? সে বলল, 'না।' তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ, আমি কখনো পেট পুরে খাইনি। ইবলিশ বলে, আমি আর কখনো কোন মুসলমানকে উপদেশ দেব না।
ইবনু আবিদ দুনিয়া আব্দুল্লাহ বিন আতিক থেকে বর্ণনা করেন। হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) ইবলিশকে তার আসল চেহারাসহ দেখতে পান। তখন তিনি তাকে প্রশ্ন করেন, কে তোর কাছে প্রিয় এবং কে অপ্রিয়? সে বলে, কৃপণ মুমিন আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয় এবং গুনাহগার দাতা আমার কাছে সর্বাধিক ঘৃণিত। তিনি জিজ্ঞেস করেন, তা কিভাবে? সে বলল, কূপণের কার্পণ্যই আমার জন্য যথেষ্ট। গুনাহগার দাতার দান হয়তো আল্লাহ কবুল করতে পারেন। তারপর সে একথা বলে ভেগে যায় যে, আপনি নবী ইয়াহ্ইয়া না হলে আমি আপনাকে তা বলতাম না।
হযরত ঈসা (আঃ)-এর সাথে ইবলিশের সাক্ষাত
ইবনু আবিদ দুনিয়া সুফিয়ান বিন ওয়াইনা থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবলিশের সাথে হযরত ঈসা বিন মরিয়মের সাক্ষাত হয়। ইবলিশ তাঁকে বলে: আপনি আপনার মহান রুবুবিয়ত (প্রভুত্ব)-এর কারণে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর মায়ের কোলে থেকে কথা বলেছেন। আপনার আগে আর কোন ভূমিষ্ঠ শিশুর পক্ষে কথা বলা সম্ভব হয় নি। তিনি জবাবে বলেন: রুবুবিয়ত ও মহত্ব সেই আল্লাহর জন্য, যিনি আমাকে দিয়ে কথা বলিয়েছেন, তারপর আমাকে মৃত্যু দান করবেন এবং আমি যাদেরকে জীবন দান করেছি তাদেরকেও মৃত্যু দান করবেন। তারপর আমাকে আবার জীবিত করবেন। ইবলিশ বলে: আপনি আপনার মহান রুবুবিয়তের মাধ্যমে মৃত্যুকে জীবিত করেন। তিনি জবাব দেন: রুবুবিয়ত আল্লাহর, তিনিই আমাকে মৃত্যু দেন এবং যাদেরকে জীবিত করেছি তাদেরকেও মৃত্যু দেন, তারপর আমাকে আবার জীবিত করবেন। ইবলিশ বলে: নিশ্চয়ই আপনি ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডলের মা'বুদ। তখন জিবরীল (আঃ) তাকে নিজ ডানা দিয়ে মার লাগান। ফলে সে সূর্যের শিং-এর কাছে গিয়ে পড়ে। তারপর আবার মার লাগান। এবার সে উত্তপ্ত ঝর্ণার কাছে গিয়ে পড়ে। তারপর আবার মার দিয়ে তাকে সপ্তম সাগরের নিচে প্রবেশ করান। সে সেখানে নিকৃষ্ট স্বাদ আস্বাদন করে বেরিয়ে আসে এবং বলে: হে ইবনে মরিয়ম। আমি আপনার কাছে যা পেলাম তা আর কারো কাছ থেকে পাইনি।
তাউস বলেন: ইবলিশের সাথে ঈসা (আঃ)-এর দেখা হলে ইবলিশ বলে: হে ইবনে মরিয়ম। আপনি আপনার নবুওয়াতের বিষয়ে সত্যবাদী হলে এ উঁচু পাহাড়টির উপর আরোহণ করুন এবং সেখান থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ুন। ঈসা (আঃ) বলেনঃ তোর ধ্বংস। আল্লাহ কি বলেন নি যে, 'হে বনি আদম! তোমার ধ্বংসের মাধ্যমে আমাকে পরীক্ষা করো না। আমি যা ইচ্ছা তা করি?'
আবু ওসমান থেকে বর্ণিত। ঈসা (আঃ) পাহাড়ের উপর নামাজ পড়ছিলেন। ইবলিশ এসে তাঁকে বলে: আপনি নাকি বলে থাকেন যে, প্রত্যেক জিনিস তাকদীরের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। তিনি উত্তরে বলেন, হাঁ।' ইবলিশ বলে, তাহলে, আপনি পাহাড় থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ুন এবং বলুন যে, এটা আমার তাকদীরে লেখা ছিল। তিনি জবাব দেন, হে অভিশপ্ত! আল্লাহই বান্দাকে পরীক্ষা করেন, বান্দাহ আল্লাহকে পরীক্ষা করতে পারে না।
ইবনু আসাকির হাসান থেকে বর্ণনা করেছেন। একদিন হযরত ঈসার পাশ দিয়ে ইবলিশ যাচ্ছিল। তিনি একটি পাথরের উপর হেলান দেয়া অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়েন। ইবলিশ বলে, হে ঈসা। আপনি তো দুনিয়ার কোন কিছু চান না। এ পাথরটিতো দুনিয়ার পাথর। তখন ঈসা (আঃ) উঠে পড়েন এবং ইবলিশের দিকে পাথরটি নিক্ষেপ করে বলেন: এটা দুনিয়ায় তোমার জন্য। ১
ইমাম আহমদ ওহাব থেকে যোহদ কিতাবে বর্ণনা করেন। ইবলিশ ঈসা (আঃ)-কে বলে: আপনি নাকি মৃতকে জীবিত করেন? এটা সত্য হলে, আপনি আল্লাহর কাছে এ পাহাড়টিকে রুটি বানানোর জন্য দোআ করুন। ঈসা (আঃ) বলেন, সকল মানুষ কি রুটি খায়? ইবলিশ বলে: আপনি যদি এরূপই বলেন তাহলে, এ জায়গা থেকে ঝাঁপ দিন। ফেরেশতারা আপনাকে আলিঙ্গন করবে। তিনি উত্তর দেন, আল্লাহ আমাকে আমার নিজ নফসের মাধ্যমে পরীক্ষা নিষিদ্ধ করেছেন, তাই আমি জানি না, তিনি আমাকে নিরাপত্তা দান করবেন কিনা।
ইবলিশ নবীদের সাথেও কিভাবে প্রতারণার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে তা আমরা কিছু সংখ্যক আম্বিয়ায়ে কেরামের জীবনী থেকে জানতে পেরেছি। শয়তান অবিরাম সকল মানুষের ক্ষতি করার জন্য ব্যস্ত। কিন্তু মুমিন ব্যক্তির সর্বদা সজাগ থাকা উচিত।
টিকাঃ
১. ঐ
২. ঐ
১. ঐ.
১. ঐ.
১. ঐ.
১. ঐ.
১. ঐ.
📄 মানুষের জিন-সঙ্গী
প্রত্যেক মানুষের সাথে রয়েছে একজন জিন-শয়তান। সে মানুষকে পথভ্রষ্ট করে এবং গুনাহর কাজে ধাবিত করে। এ মর্মে হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে। একরাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর কাছ থেকে বেরিয়ে গেলেন। আয়েশা (রাঃ) বলেন, এতে আমি অভিমান করলাম। তারপর তিনি ফিরে আসেন এবং আমি কি করি তা দেখতে থাকেন। (অর্থাৎ অভিমান দেখতে থাকেন) তিনি বলেন, হে আয়েশা। তুমি কি অভিমান করেছ? আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমার মত একজন মহিলা কেন আপনার উপর অভিমান করবে না? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন: 'তোমার কাছে কি তোমার শয়তান এসেছিল? আয়েশা প্রশ্ন করেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার সাথে কি শয়তান আছে? তিনি উত্তরে বলেন, 'হাঁ'। আয়েশা প্রশ্ন করেন, প্রত্যেক মানুষের সাথেই কি শয়তান থাকে? তিনি উত্তর দেন, 'হাঁ'। আয়েশা বলেন, আমি আবারও প্রশ্ন করলাম, আপনার সাথেও কি শয়তান আছে? তিনি বলেন, 'হাঁ'। তবে আমার প্রতিপালক আমাকে তার বিষয়ে সাহায্য করেছেন। সে মুসলমান হয়ে গেছে। (মুসলিম, আহমদ)
হাদীসের অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, 'তোমাদের মধ্যে এমন কোন লোক নেই যার সাথে একজন জিন (শয়তানকে) নিযুক্ত করা হয় নি। তারা প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার সাথেও নিযুক্ত করা হয়েছে? তিনি বলেন, 'হাঁ', কিন্তু আল্লাহ আমাকে তার বিষয়ে সাহায্য করেছেন। ফলে সে মুসলমান হয়ে গেছে এবং আমাকে ভাল ও কল্যাণ ছাড়া অন্য কিছুর আদেশ করে না।' (মুসলিম-কিতাবুল মুনাফেকীন অধ্যায়)
সুফিয়ান বিন উআইনাহ এ হাদীসের অর্থ এভাবে করেছেন যে, তিনি বলেন। 'ফলে আমি শয়তানের ক্ষতি থেকে বেঁচে গেছি।'
আহমদ বিন হাম্বলের বর্ণিত হাদীসে একটু অতিরিক্ত যোগ হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, 'তোমাদের প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে একজন জিন ও একজন ফেরেশতাকে নিযুক্ত করা হয়েছে। তারা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার কাছেও কি নিযুক্ত করা হয়েছে? তিনি বলেন, 'হাঁ', আমার কাছেও নিযুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ আমাকে তার বিষয়ে সাহায্য করেছেন। সে মুসলমান হয়ে গেছে এবং আমাকে ভাল ছাড়া খারাপ আদেশ করে না।'
আবু নাঈম তাঁর 'দালায়েল আন-নবুওয়া'ত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, 'নবী (সঃ) বলেছেন, আমাকে আদম (আঃ) থেকে অতিরিক্ত দু'টো বৈশিষ্ট্য দান করা হয়েছে। ১. আমার কাছে নিযুক্ত শয়তানটি কাফের ছিল। আল্লাহ আমাকে তার ব্যাপারে সাহায্য করায় সে মুসলমান হয়ে যায়। ২. আমার স্ত্রীরা আমার সাহায্যকারিণী। পক্ষান্তরে, আদমের শয়তান ছিল কাফের এবং তাঁর স্ত্রী আল্লাহর আদেশ লঙ্ঘনের ত্রুটিতে তাঁর সঙ্গীনী ছিল।' (হাদীসটি বিশুদ্ধ-বায়হাকী)
নবী করীম (সঃ)-এর কাছে নিযুক্ত শয়তানের মুসলমান হওয়ার বিষয়টি হাদীস দ্বারা এমন সুস্পষ্ট, যা কোন ব্যাখ্যার দাবী রাখে না। কেননা, তিনি আদম (আঃ)-এর উপর নিজের যে দু'টো বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন, তার একটি হল, আদমের কাছে নিয়োজিত শয়তান মুসলমান হয় নি, কিন্তু তাঁর কাছে নিয়োজিত শয়তান মুসলমান হয়েছে।
আবু জাফর তাহাওয়ী হযরত জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী (সঃ) আমাদেরকে বলেছেন: لَا تَدْخُلُوا عَلَى الْمُغَيِّبَاتِ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِى مِنْ ابْنِ أَدَمَ مَجْرَى الدَّمِ قِيلَ وَمِنْكَ يَارَسُولَ اللَّهِ ؟ قَالَ وَمِنِّى وَلَكِنَّ اللَّهَ تَعَالَى أَعَانَنِى فَاسْلَمَ .
'তোমরা সে সকল স্ত্রীলোকের ঘরে প্রবেশ করো না যাদের স্বামী সফরে বেরিয়েছে। কেননা, নিশ্চয়ই শয়তান আদম সন্তানের রক্তের শিরায়-উপশিরায় দৌড়ে। প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসূল। শয়তান আপনার রক্তেও কি দৌড়ে? তিনি বলেন, 'হাঁ', আমার রক্তেও দৌড়ে, কিন্তু আল্লাহ আমাকে সাহায্য করেছেন, ফলে সে মুসলমান হয়ে গেছে।'
তাহাওয়ী হযরত আয়েশা বা থেকেও একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। আয়েশা (রাঃ) বলেন, এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। অথচ, তিনি আমার মাথার সাথে মাথা লাগিয়ে শুয়েছিলেন। তারপর আমি তাঁকে দুই পায়ের আঙ্গুলগুলোকে কেবলামুখী করে সাজদারত অবস্থায় দেখতে পেলাম। আমি তাঁকে এ দোআটি পড়তে শুনলাম: أعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ سَخَطِكَ وَبِعَفُوكَ مِنْ عُقُوبَتِكَ وَبِكَ مِنْكَ لَا أَبْلُغُ كُلَّ مَا فِيكَ .
“হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আপনার ক্রোধ ও রাগ থেকে পানাহ চাই, আপনার শাস্তি থেকে ক্ষমা চাই, আপনার উছিলায় আপনার থেকে আশ্রয় চাই এবং আপনার যত গুণাবলী আছে সে পর্যন্ত আমি পৌঁছতে পারব না।" তিনি সালাম ফিরিয়ে বলেন, হে আয়েশা। তোমাকে কি শয়তানে ধরেছে? আয়েশা বলেন, আপনার কাছেও কি শয়তান আছে? নবী (সঃ) বলেন, এমন কোন মানুষ নেই, যার কাছে শয়তান নেই। আয়েশা বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল। তাহলে, আপনার অবস্থা কি? তিনি বলেন, আমারও একই অবস্থা। কিন্তু আমি আল্লাহর কাছে দোআ করেছি ফলে তিনি আমাকে সাহায্য করেছেন, এবং সে মুসলমান হয়ে গেছে।'
আবু জাফর তাহাওয়ী বলেন, এ দু'টো হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, এ বিষয়ে নবী (সঃ) নিজেও অন্য মানুষের মতই ছিলেন। কিন্তু আল্লাহর সাহায্যে শয়তানটি মুসলমান হয়ে যাওয়ায় তিনি তার ক্ষতি থেকে নিরাপদ ছিলেন।
কিন্তু এক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন দেখা দেয় যে, শয়তানের ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি যদি ঠিক হয় তাহলে, তিনি শোয়ার সময় শয়তান থেকে পানাহ চাওয়ার উদ্দেশ্যে দোআ পড়েছেন কেন? আবু আজহার আনসারী থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রে শোয়ার সময় এ দোআ পড়তেনঃ
بِسْمِ اللَّهِ وَضَعْتُ جَنبِي اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ مِنْ وَاجِسِ شَيْطَانِي وَفُلِّ رَهَانِي وَثِقْلِ مِيزَانِي وَاجْعَلْنِي فِي النَّدَى الْأَعْلَى .
'আল্লাহর নামে আমি আমার পার্শ্বদেশে শুয়ে পড়লাম। হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আমার শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং বন্ধক থেকে মুক্তি চাই, আমার নেক আমলের ওজন বাড়িয়ে দিন এবং আমাকে সর্বোচ্চ স্তরে স্থান দিন।' (বোখারী ও মুসলিম)
এই প্রশ্নের জবাবে বলা হয়েছে যে, তিনি এই দোআ তখন পড়েছেন যখন তাঁর কাছে নিযুক্ত শয়তান মুসলমান হয় নি। নচেত, মুসলমান হওয়ার পর এ দোআ পড়ার প্রশ্নই উঠে না।
প্রত্যেক মানুষের সাথে যে শয়তান রয়েছে তার আরো প্রমাণ রয়েছে। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, মানুষের মধ্যে দু'ধরনের প্রবণতা আছে। একটা ফেরেশতার পক্ষ থেকে, অন্যটা শয়তানের পক্ষ থেকে। শয়তানের পক্ষ থেকে প্রবণতা সৃষ্টি হলে, আদম সন্তান খারাপ ও মন্দ কাজের প্রতি ঝুঁকে পড়ে এবং সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে। পক্ষান্তরে, ফেরেশতার পক্ষ থেকে প্রবণতা সৃষ্টি হলে, মানুষ ভাল কাজ করে এবং সত্যকে গ্রহণ করে। কেউ ভাল কাজের প্রবণতা বোধ করলে, তার জানা উচিত, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে। সেজন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিত। আর যদি এর বিপরীতটা অনুভব করে তাহলে, সে যেন অভিশপ্ত শয়তান থেকে পানাহ চায়। তারপর তিনি সূরা বাকারার ২৬৮ নং আয়াতটি পড়েন:
الشَّيْطَانَ يَعِيدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُمْ بِالْفَحْشَاءِ .
'শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্রের ভয় দেখায় এবং অশ্লীল কাজের আদেশ দেয়।' (তিরমিজী, নাসাঈ)
আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ
إِنَّ الْمُؤْمِنَ لَيُنْضِى شَيْطَانَهُ كَمَا يُنْضِي أَحَدُكُمْ بَعِيرُهُ فِي السفر .
'নিশ্চয়ই মুমিন ব্যক্তি নিজ শয়তানকে এমন দুর্বল করে, যেমন করে তোমাদের কেউ সফরে নিজ উটকে দুর্বল করে থাকে।' (আহমদ, ইবনু আবিদ দুনিয়া) অর্থাৎ প্রতিটি ক্ষেত্রে শয়তানের ওয়াসওয়াসাকে ঠেলে দিয়ে তার বিপরীতে নেক কাজ করতে থাকলে, শয়তানকে ক্লান্ত-শ্রান্ত করে দেয়া যায়।
এ হাদীসেও মানুষের সাথে নিযুক্ত শয়তানকে দীর্ঘ সফরের উটের মত ক্লান্ত করে দেয়ার নির্দেশ রয়েছে।
কায়েস বিন হাজ্জাজ বলেছেন, আমার শয়তান আমাকে বলল, আমি তোমার কাছে উটের মত প্রবেশ করেছি। (ইবনু আবিদ দুনিয়া) অর্থাৎ ক্লান্ত উটের মত প্রবেশ করেছি।
ওহাব বিন মোনাব্বেহ বলেছেন, 'এমন কোন মানুষ নেই, যার কাছে কোন শয়তানকে নিযুক্ত করা হয় নি। কাফের ব্যক্তির সাথে নিয়োজিত শয়তান তার পানাহারে অংশ নেয় এবং তার বিছানায় শোয়। আর মুমিনের সাথে নিয়োজিত শয়তান তার জ্ঞান ও বিবেক লোপ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকে। যখন বিবেক লোপ পায়, তখন সে লাফিয়ে পড়ে। শয়তানের কাছে প্রিয়তম ব্যক্তি হচ্ছে পেটুক ও অধিক নিদ্রার লোক।' (আহমদ-যোহদ কিতাব) ওহাব বিন মোনাব্বেহ একজন তাবেঈ ও বড় ঐতিহাসিক ছিলেন। তাঁর বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আবদুর রাজেক এবং ইবনুল মোনজের সাঈদ আল-জোরাইরী থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি কোরআনের এই আয়াত প্রসঙ্গে বলেছেন: وَمَنْ يَعْشُ عَنْ ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا .
'যে মেহেরবান আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত থাকে আমরা তার জন্য একজন শয়তান নিয়োগ করি।' (সূরা যুখরুফ-৩৬)
আমরা জানতে পেরেছি যে, কাফেরকে যখন কেয়ামতের দিন উঠানো হবে, তখন শয়তান তাকে হাত দিয়ে ঠেলা দেবে। কিন্তু সে তা প্রতিহত করতে পারবে না। তখন আল্লাহ জাহান্নামকে তার ঠিকানা বানাবেন। তখনই কাফের ব্যক্তি আফসোস করে বলবে: يَا لَيْتَ بَيْنِي وَبَيْنَكَ بُعْدَ الْمُشْرِقَيْنِ .
'হায়, যদি আমার ও তোমার মধ্যে পূর্ব-পশ্চিমের সমান দূরত্ব হত।' (সূরা যুখরুফ-৩৮) পক্ষান্তরে, মুমিন ব্যক্তির সাথে ফেরেশতাকে নিযুক্ত করা হবে। লোকজনের সামনে তার হিসেব-নিকেশ হবে এবং তার ঠিকানা হবে বেহেশত।'১.
শয়তান যেহেতু প্রতিটি মানুষের সাথে লাগা আছে, তাই মানুষকে এ ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন থাকতে হবে। সচেতন না থাকলে শয়তান সর্বনাশ করে ছাড়বে। দুশমন সারাক্ষণ দুশমনীই করবে। দুশমনের ব্যাপারে সজাগ থাকা সেটা ঈমানের দাবী। প্রায়ই গুনাহ করার প্রবণতা শয়তানের কারণেই হয়ে থাকে।
টিকাঃ
১. ঐ.
📄 রমযানে শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়
তিরমিজী ও ইবনে মাজাহ আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। ‘রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: রমজানের ১ম রাত্রে শয়তান ও জিন সরদারকে শিকল দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়।’
ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের ছেলে আব্দুল্লাহ বলেন। আমি আমার বাপকে এ হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম যে, রমজানে তো লোকদের প্রতি শয়তানের ওয়াসওয়াসা অব্যাহত থাকে এবং এ মাসে লোকদেরকে জিন-ভূতেও ধরে। তিনি উত্তরে বলেন: হাদীসের বর্ণনা তো এরূপই।
হাদীসের অর্থের দিকে তাকালে মনে হয় কেবলমাত্র শয়তানের সরদারকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। অন্যান্য ছোট শয়তানরা উন্মুক্ত থাকে। রমজানে তারাই পাপ সংঘটিত করায়। এদিকে, কোরআনে জিন-শয়তানের পাশাপাশি মানব শয়তানের কথাও উল্লেখ আছে। আল্লাহ বলেন: مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ .
‘আমি অন্তরে মানুষ ও জিন-শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই।’ (সূরা নাস-৬) মানুষ-শয়তানও পাপ কাজ করায়।
এছাড়াও শয়তান সারাবছর যে পাপ কাজ করায় তা সামনের দিনগুলোর জন্যও পাপ কাজে সহায়ক হয়। সেজন্য রমজানে শয়তান বাঁধা থাকলেও তার আগে শক্তিশালী ওয়াসওয়াসার প্রভাবে মানুষ রমজানেও পাপ কাজ করে।