📄 জিন-শয়তানের সূচনা
জিন আল্লাহর অন্যতম সৃষ্টিজগত। ইবনে আব্বাসের মতে, মানুষ সৃষ্টির আগে আল্লাহ জিন সৃষ্টি করেছেন। তারা এ পৃথিবী আবাদ করেছিল এবং তারা ছিল ফেরেশতাদের একটি শাখা। তারা পৃথিবীতে বহু অন্যায়-অত্যাচার করে এবং দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও রক্ত প্রবাহিত করে। এর শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ জমীনে তাদের কর্তৃত্ব খতম করে দেন এবং তাদেরকে পরাভূত করেন। মানুষ সৃষ্টির পর তারা পৃথিবীতে বাস করছে। তবে খলীফার ভূমিকায় নয়। অন্যান্য সাধারণ সৃষ্টির মত। তাদের মর্যাদা মানুষ অপেক্ষা নিম্নতর। জিন ও মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।
আল্লাহ পরে পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টির পরিকল্পনা করেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন:
"আর ঐ সময়টি স্মরণ করুন, যখন আপনার প্রতিপালক ফেরেশতাদের উদ্দেশ্যে বললেন: আমি অবশ্যই পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি বা খলীফা পাঠাব। ফেরেশতারা বলল: আপনি কি পৃথিবীতে এমন জীব পাঠাবেন যারা সেখানে ফেতনা-ফাসাদ ও গোলযোগ সৃষ্টি করবে এবং খুন-খারাবী করবে? "আর আমরা আপনার প্রশংসাসহকারে তসবীহ পাঠ করি ও পবিত্রতা বর্ণনা করি। আল্লাহ বলেন- নিশ্চয়ই আমি যা জানি তোমরা তা জান না।" (সূরা বাকারা-৩০)
আল্লাহ আদম (আঃ)-কে সকল কিছুর নাম শিক্ষা দিয়ে মানুষ ও ফেরেশতার মধ্যে জ্ঞানের প্রতিযোগীতা করেন। ফেরেশতারা প্রতিযোগীতায় হার মানে। আদম জিতে যায়। এর মাধ্যমে ফেরেশতার উপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ফেরেশতারা জিন জাতির অতীত নাফরমানী ও দাঙ্গা-হাঙ্গামার অভিজ্ঞতার আলোকে মানব খলীফা সৃষ্টির বিরোধীতা করে। যাহোক, আল্লাহ সৃষ্টির সেরা মানুষের মর্যাদার স্বীকৃতিস্বরূপ সেজদা করার জন্য ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন:
"অতঃপর আমি ফেরেশতাদেরকে বললাম: তোমরা সকলেই আদমকে সাজদা কর। তখন ইবলিশ ছাড়া সকলেই আদমকে সাজদা করে। সে সাজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হল না। আল্লাহ প্রশ্ন করেন, যখন আমি তোমাকে সাজদা করার হুকুম দিলাম তখন কোন্ জিনিস তোমাকে এ থেকে বিরত রেখেছে? সে বলল: আমি আদম হতে উত্তম। আমাকে আপনি আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দ্বারা। আল্লাহ বলেন: তুই এখান থেকে নেমে যা। এখানে তোর অহঙ্কার করার কোন অধিকার নেই। বের হয়ে যা এখান থেকে। তুই নিকৃষ্টদের অন্যতম। সে বলল: আমাকে হাশরের দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকার অবকাশ দিন। আল্লাহ বলেনঃ তোকে অবকাশ দেয়া হল। সে বলল: যেহেতু আপনি আমাকে গোমরাহ ও বিভ্রান্ত করেছেন, সেহেতু আমি অবশ্যই আপনার সহজ-সরল পথ সিরাতুল মোস্তাকীমের উপর আপনার বান্দাহদের বিরুদ্ধে বাধাদানকারী হয়ে বসব। আর আমি তাদেরকে সামনে ও পেছন থেকে এবং ডান ও বাম থেকে ধোঁকা দেব। ফলে, তাদের অধিকাংশকেই আপনার কৃতজ্ঞ বান্দাহ হিসেবে পাবেন না। আল্লাহ বললেন: এখান থেকে বের হয়ে যা লাঞ্ছিত-অপমানিত হয়ে। আর তাদের মধ্য থেকে যে তোর অনুসরণ করবে আমি অবশ্যই তাদের সকলকে দিয়ে জাহান্নাম পূরণ করব।' (সূরা আরাফ: ১১-১৮)
উপরোক্ত আয়াতসমূহে বর্ণিত ঘটনাই শয়তানের সূচনা। একজন বিশিষ্ট নেক ও অনুগত বান্দাহ, যে অন্যান্য সকল নেক বান্দাহর নেতা ছিল, সেই হচ্ছে, আলোচ্য শয়তান। মাত্র একটি আদেশ অমান্য করার ফলে, তার অতীতের সকল নেক ইবাদত বরবাদ হয়ে গেল। আমরা যারা অহরহ আল্লাহর বহু আদেশ অমান্য করে চলেছি, আমাদের কি উপায় হবে? কোরআনের ভাষায় আমরা হলাম মানুষ শয়তান। আল্লাহ বলেন : مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ জিন ও মানুষ শয়তান থেকে' -(সূরা নাস)
অহঙ্কার ও আল্লাহর আদেশ না মানার কারণে আল্লাহ শয়তানকে অভিশপ্ত করেন। অথচ, সে আদেশ অমান্য করার পর তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারত। কিন্তু তা করেনি যা মুমিনগণ করে থাকেন। বরং সে আরো একধাপ অগ্রসর হয়ে মানুষ খলীফার বিরুদ্ধে শত্রুতার অগ্নিশপথ গ্রহণ করল। এ কাজের জন্য সে কেয়ামত দিবস পর্যন্ত দীর্ঘায়ু প্রার্থনা করল এবং আদম সন্তান ও তাদের নেক কাজের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অঙ্গীকার করল। এভাবে একদিনের অত্যন্ত নেক বান্দা সর্বনিকৃষ্ট পর্যায়ে পৌঁছে গেল এবং বেহেশতের পরিবর্তে দোজখে নিজের ও অনুসারীদের ঠিকানা নির্দিষ্ট করে নিল। এদিকে আল্লাহ নেক বান্দাহদের হেফাজতের দায়িত্ব ঘোষণা করে বলেন: إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانُ إِلَّا مَن تَبَعَكَ مِنَ الْغَاوِينَ ।
"নিশ্চয়ই আমার (খাঁটি) বান্দাহদের উপর তোর কোন কর্তৃত্ব খাটবে না কেবলমাত্র গোমরাহ অনুসারী ছাড়া।" (সূরা হিজর-৪২)
নেক বান্দাহদের কোন দুশ্চিন্তা নেই। শয়তান যতই শপথ নিক না কেন, কেউ আল্লাহর পথে টিকে থাকতে চাইলে সে টিকে থাকতে পারবে। আল্লহ বলেনঃ أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَاهُمْ يَحْزَنُونَ ।
"নিশ্চয়ই আল্লাহর বন্ধুদের না কোন ভয় আছে, আর না তারা পেরেশান হবে।"
শয়তানের পরিচয় স্বয়ং আল্লাহই দিয়েছেন। তিনি বলেন: وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيْسَ كَانَ مِنَ الْجِنِّ فَفَسَقَ عَنْ أَمْرِ رَبِّهِ - أَفَتَتَّخِذُوْنَهُ وَذَرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِي وَهُمْ لَكُمْ عَدُوٌّ
"যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বললাম, আদমকে সাজদা কর, তখন সবাই সাজদা করল, ইবলিশ ব্যতীত। সে ছিল জিন। সে তার পালনকর্তার আদেশ অমান্য করল। অতএব তোমরা কি আমার পরিবর্তে তাকে এবং তার বংশধরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করছ? অথচ তারা তোমাদের শত্রু।' (সূরা কাহাফ-৫০)
এ আয়াতে শয়তানের পরিচয় প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেছেন, সে ছিল জিন। প্রশ্ন হল জিন কি করে ফেরেশতাদের সারিতে স্থান পেল? আল্লাহ তো কেবল ফেরেশতাদেরকেই সাজদার নির্দেশ দিয়েছেন।
এ প্রশ্নের এক উত্তর আগেই আলোচনা করা হয়েছে। আর তাহল, ইবনে আব্বাসের মতে১, জিন জাতি ফেরেশতাদের একটি শাখা ছিল যাদরেকে আগে দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। ফলে ইবলিশও ঐ আদেশের আওতায় ফেরেশতাদের দলভুক্ত ছিল। আমরা এ বক্তব্যের সমর্থনে বলতে পারি যে, ফেরেশতার মত জিনও অদৃশ্য।
তাউস ইবনে আব্বাসের বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছেন, ইবলিশ আল্লাহর নাফরমানীর আগে ফেরেশতা ছিল। তার নাম ছিল আযাযীল। সে দুনিয়ার 'জিন্না' নামক স্থানে বাস করত। সে ছিল ফেরেশতাদের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী ও আবেদ।
টিকাঃ
১. লাকতুল মারজান ফি আহকামিল জান্ন-জালালুদ্দিন সুযুতী।
১ঐ
📄 ইবলিশের অহংকারের কারণ
ইবনে জরীর বলেছেন, সাহাবা ও তাবেঈনদের মধ্যে ইবলিশের অহঙ্কারের কারণের বিষয়ে মতভেদ আছে। এ বিষয়ে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে কয়েকটি বর্ণনা আছে।
(১) দাহ্হাক বর্ণনা করেছেন। ইবলিশ যখন যমীনে ফেতনা সৃষ্টিকারী ও আল্লাহর নাফরমান জিনদেরকে হত্যা করল এবং তাদেরকে বিক্ষিপ্ত করে দিল, তখন সে মনে মনে গর্ববোধ করল এবং ভাবল, তার এমন মর্যাদা রয়েছে যা আর কারো নেই।
(২) ইবলিশ ছিল আসমানের ফেরেশতা, আসমান এবং আসমান ও জমীনের মাঝের নেতা এবং বেহেশতের কোষাগারের রক্ষক। অধিক ইবাদতের কারণে সে এ মর্যাদা লাভ করেছে। কিন্তু এ মর্যাদার কারণে তার মনে অহঙ্কার এসে যায় এবং নিজেকে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করতে থাকে। তাই সে আল্লাহর কাছেও নিজ গর্ব প্রকাশ করে বসেছে এবং আদমকে সাজদা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ইবনে মাসউদসহ আরো কিছু সংখ্যক সাহাবায়ে কেরাম থেকে বর্ণিত। আল্লাহ নিজ পছন্দমত সৃষ্টি শেষে আরশে সমাসীন হন এবং ইবলিশকে দুনিয়ার আসমানের ফেরেশতা নিযুক্ত করেন। ইবলিশ ছিল জিন গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। জান্নাতের কোষাগারের রক্ষক হিসেবে জিনের নামকরণ করা হয়েছে। আরবীতে বেহেশতকে জান্নাত বলে। এ দু'শব্দের অর্থাৎ জান্নাত ও জিনের মূল এক ও অভিন্ন। তার অন্তরে এ মর্মে অহঙ্কার জাগে যে, বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছাড়া আল্লাহ আমাকে সকল ফেরেশতার উপর এ মর্যাদা দেননি। তার এ মনোভাব জানতে পেরে আল্লাহ ফেরেশতাদের কাছে মানুষ প্রতিনিধি পাঠানোর প্রস্তাব করেন।
(৩) ইবলিশ হচ্ছে সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ের অবশিষ্ট ব্যক্তি যারা আল্লাহর আনুগত্য করতে অস্বীকার করায় আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। ইবনে আব্বাস বলেন, আল্লাহ একদলকে সৃষ্টি করে আদমকে সাজদা করার আদেশ দেন। তারা সাজদা করতে অস্বীকার করায় আল্লাহ তাদেরকে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে ফেলেন। তারপর তিনি আরেক দলকে সৃষ্টি করে বলেন। আমি মাটি থেকে আদম সৃষ্টি করেছি। তাকে সাজদা কর। তারা সাজদা করতে অস্বীকার করে। আল্লাহ আগুন পাঠিয়ে তাদেরকে ধ্বংস করে দেন। তারপর আরেক দলকে সৃষ্টি করে আদমকে সাজদা করার নির্দেশ দেন। তখন তারা সাজদা করতে ইতিবাচক জবাব দেয়। কিন্তু ইবলিশ আদমকে সাজদা করতে অস্বীকারকারী দলের অবশিষ্ট ব্যক্তি ছিল। সে আদমকে সেজদা করেনি। ইবনু কাসীর এ বর্ণনাটিকে গরীব এবং প্রমাণের অযোগ্য বলে আখ্যায়িত করেছেন।১
অন্যদের মতে, ইবলিশ জমীনে বসবাসকারী জিনদের মধ্যেকার অবশিষ্ট ব্যক্তি। জিনেরা জমীনে খুন-খারাবী ও ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করে এবং আল্লাহর নাফরমানী করে। তখন ফেরেশতারা তাদের সাথে যুদ্ধ করে। শাহর বিন হাওশাব বলেন, আল্লাহ ইবলিশ সম্পর্কে বলেছেন: ّٰمِنَ الْجِنِّ সে জিনদের অন্তর্ভুক্ত ছিল'। ইবলিশ ফেরেশতাগণ কর্তৃক বিতাড়িত ছিল। কিছু ফেরেশতারা পরে তাকে আটক করে আসমানে নিয়ে যায়। সা'দ বিন মাসউদ বলেন, ফেরেশতারা জিনদের সাথে লড়াই করে ইবলিশকে বন্দী করে নিয়ে যায়। তখন ইবলিশ বয়সে ছোট ছিল। সে ফেরেশতাদের সাথে থেকে আল্লাহর ইবাদত করতে থাকে। যখন ফেরেশতাদেরকে আদমকে সাজদা করার নির্দেশ দেয়া হল, ফেরেশতারা আদমকে সাজদা করে, কিন্তু ইবলিশ সাজদা করতে অস্বীকার করে নাফরমানী করে।
জিন হওয়ার কারণেও সে আল্লাহর এ আদেশ অমান্য কিংবা কঠোর ইবাদত ও অধিক জ্ঞানের কারণেও সে আল্লাহর হুকুম অমান্য করে থাকতে পারে। তাকে দুনিয়ার আসমানের ও জমীনের কর্তৃত্ব এবং জান্নাতের কোষাগারের রক্ষকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।
আরেক বর্ণনায় এসেছে, আদম ও মানবজাতির আগে পৃথিবীতে জিন সম্প্রদায় বাস করত। আল্লাহ ইবলিশকে বিচারক হিসেবে পৃথিবীতে পাঠান। সে দীর্ঘ ১ হাজার বছর পর্যন্ত ইনসাফ সহকারে বিচার করে। আল্লাহ এ নামে তার নামকরণ করে তার কাছে অহী পাঠান। তখনই তার মধ্যে অহঙ্কার দানা বেঁধে উঠে। তখন সে জিনদের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ ও লড়াই-ঝগড়া লাগায়। দু'হাজার বছর এভাবে লড়াই ঝগড়ার মধ্যে কেটে যায়। এমনকি তাদের যুদ্ধের ঘোড়া তাদের রক্তের মধ্যে চলাচল করতে থাকে। এ প্রেক্ষিতেই আল্লাহ কোরআনে মানব সৃষ্টির ব্যাপারে ফেরেশতাদের বাণী উদ্ধৃত করে বলেন: اتَجْعَلُ فِيهَا مَنْ يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاءَ
"আপনি কি জমিনে এমন লোক সৃষ্টি করবেন যারা ফেতনা ফ্যাসাদ সৃষ্টি করবে ও রক্তপ্রবাহ করবে?"-তখন আল্লাহ আগুন পাঠান। এ আগুন তাদেরকে জ্বালিয়ে দেয়। ইবলিশ এ শাস্তি দেখে আসমানে চলে যায় এবং ফেরেশতাদের কাছে থেকে গভীর ইবাদতে মনোনিবেশ করে যা আর কোন সৃষ্টি করতে পারে নি। আদম সৃষ্টি পর্যন্ত সে এভাবে গভীর ইবাদত করতে থাকে। কিন্তু আদমকে সাজদার ব্যাপারে সে আল্লাহর আদেশ অমান্য করে।
ইবনে আব্বাস বলেন, ফেরেশতারা জমীনে জিনদের ফেতনা-ফ্যাসাদ, লড়াই ও রক্তপাত দেখেই মানব সৃষ্টির বিরুদ্ধে আপত্তি তুলেছিল যে, আবার সে লড়াই ও রক্তপাতের দরকার কি? আমরাই তো আপনার তাসবীহ-তাহলীল ও পবিত্রতা বর্ণনা করছি। তখন আল্লাহ বলেন, আমি যা জানি, তোমরা তা জান না।
আল্লাহ যখন ফেরেশতাদেরকে আদমকে সাজদা করার নির্দেশ দেন, তখন ইবলিশ ফেরেশতাদের দলভুক্ত ছিল এবং সে আল্লাহর আদেশ অমান্য করল। ২
কোরআনের বক্তব্য অনুযায়ী, ইবলিশ ছিল জিন। الا ابلیس বলে যে ব্যতিক্রম করা হয়েছে তাকে যদি এক ধর্মী জিনিস থেকে ব্যতিক্রম ধরতে হয় তাহলে, বলতে হয়, জিন ছিল অন্য এক ধরনের ফেরেশতা। ফলে, ব্যাকরণগত আর কোন সমস্যা থাকছে না। ১ ইবনু আব্বাস বলতেন, ইবলিশ ফেরেশতা না হলে, আদমকে সাজদা করার জন্য তাকে বলা হত না। ২. আরেক দল আলেমের মতে হল, ইবলিশ ফেরেশতা ছিল না৩ ইবনে জারীর ও আবুশ শেখ হাসান বসরী থেকে বর্ণনা করেছেন, ইবলিশ এক মুহূর্তের জন্যও ফেরেশতা ছিল না। বরং সে হচ্ছে, জিনের আদি পিতা বা প্রথম পুরুষ। যেমন আদম (আঃ) মানুষের আদি পিতা ও প্রথম মানুষ।
ইবনু জরীর ও ইবনু আবু হাতেম শাহর বিন হাওশাব থেকে বর্ণনা করেছেন: ইবলিশ ছিল জিন, যাকে ফেরেশতারা তাড়িয়ে দিয়েছিল। অন্য কিছু ফেরেশতা তাকে আটক করে আসমানে নিয়ে যায়। আর সেখানেই আদমকে সাজদার পরীক্ষার সম্মুখীন হয়।
ইবনু জরীর ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, ইবলিশকে ইবলিশ নামকরণের কারণ হল, 'আবলাসা' অর্থ বঞ্চিত হওয়া। অর্থাৎ তাকে সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
শয়তান শব্দের মূল হল شطن। অর্থ দূরে অবস্থান করা। অর্থাৎ সে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে অবস্থান করে। মোটকথা, ইবলিশ শয়তান সকল কল্যাণ, সওয়াব ও রহমত থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত।
শয়তানের অনুসারীদেরও একই অবস্থা। তারাও সকল কল্যাণ ও রহমত থেকে বঞ্চিত হবে। মানুষের গুনাহর কাজকে শয়তানী ওয়াসওয়াসা বলা হয়েছে। তাই মুমিনদের উচিত, শয়তানের অনুসরণ ও অনুকরণ থেকে দূরে থাকা।
টিকাঃ
১. ঐ
২. ঐ
৩. ঐ
১. গারায়েব ও আজ্জায়েবুল জিন-কাজী বদরুদ্দিন শিবলী।
📄 জিন শয়তানের বিভ্রান্তি সম্পর্কে কোরআন
অভিশপ্ত শয়তান মানবজাতিকে বিভ্রান্ত করার শপথ গ্রহণ করেছে। সে মানুষের শরীরের শিরা-উপশিরায় ও রক্তে-মজ্জায় প্রবেশাধিকার লাভ করেছে। আর মানুষকে গোমরাহ করে যাচ্ছে। নিজ অভিশপ্ত হওয়া প্রতিশোধের লক্ষ্যে সে মানবজাতিকেও ধ্বংস করার দৃঢ় শপথ নিয়েছে। আল্লাহ শয়তানের ঐ শপথ ও তৎপরতা সম্পর্কে বলেছেন:
إِنْ يَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ إِلَّا إِنَاثًا ، وَإِنْ يَدْعُوْنَ إِلَّا شَيْطَانًا مَرِيدًا * لَّعْنَهُ اللهُم وَقَالَ لَاتَّخِذَنَّ مِنْ عِبَادِكَ نَصِيبًا مَّفْرُوضًا * وَلَا ضِلَّنَّهُمْ وَلَا مُنِيَنَّهُمْ وَلَا مُرَنَّهُمْ فَلَيُبَتِّكُنَّ أَذَانَ الْأَنْعَامِ وَلَا مُرَنَّهُمْ فَلَيُغَيِّرُنَّ خَلْقَ اللَّهِ ، وَمَنْ يَتَّخِذِ الشَّيْطَانَ وَلِيًّا مِنْ دُونِ اللَّهِ فَقَدْ خَسِرَ خُسْرَانًا مُّبِينًا * يَعِدُهُمْ وَيُمَنِيْهِمْ وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَانُ إِلَّا غُرُورًا .
"তারা (শিরককারীরা) আল্লাহকে ত্যাগ করে শুধু নারীর উপাসনা করে এবং শুধু অবাধ্য শয়তানের পূজা করে যার প্রতি আল্লাহ অভিশাপ দিয়েছেন। শয়তান বলল: আমি অবশ্যই তোমার বান্দাদের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট অংশগ্রহণ করব, তাদেরকে পথভ্রষ্ট ও গোমরাহ করব, তাদেরকে আশ্বাস দেব, তাদেরকে পশুদের কান ছেদ করতে বলব এবং তাদেরকে আল্লাহর সৃষ্ট আকৃতি পরিবর্তন করতে আদেশ দেব। যে কেউ আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, সে প্রকাশ্য ক্ষতিতে পতিত হয়। সে তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং আশ্বাস দেয়। শয়তান তাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেয়, তা সব প্রতারণা বৈ নয়।" (সূরা নেসা-১১৭-১২০)
আল্লাহদ্রোহীদের প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে নারী পূজা। শয়তান এ হাতিয়ারসহ মিথ্যা আশ্বাস, পশুদের কান ছেদন এবং আল্লাহর সৃষ্ট আকৃতি পরিবর্তনের মাধ্যমে মানুষকে গোমরাহ করা অগ্নিশপথ গ্রহণ করেছে। এছাড়াও তার আরো অনেক উপায় রয়েছে।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানবজাতিকে সাবধান করে দিয়ে বলেছেন: إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ - فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا ।
“নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন, তাকে তোমরা দুশমন হিসেবে গ্রহণ কর।” -(সূরা ফাতের-৬)
আল্লাহ যদি আমাদেরকে শয়তানের কারসাজি ও দুশমনী সম্পর্কে না জানাতেন, তাহলে আমাদের পক্ষে হয়তো কোনদিন হেদায়েত লাভ করা সম্ভব হত না। দুশমন সম্পর্কে সতর্ক না হওয়া যুক্তিবিরোধী কাজ।
আল্লাহ আরো বলেন : اَلَمْ أَعْهَدُ إِلَيْكُمْ يَا بَنِي آدَمَ أَنْ لَا تَعْبُدُوا الشَّيْطَانَ ، إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ * وَأَنِ اعْبُدُونِي ، هَذَا صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٌ * وَلَقَدْ أَضَلَّ مِنْكُمْ جِبِلا كَثِيرًا أَفَلَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُونَ *
“হে বনি আদম! আমি কি তোমাদেরকে বলে রাখিনি যে, শয়তানের ইবাদত করো না, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু এবং আমার ইবাদত কর। এটাই সরল পথ!’ শয়তান তোমাদের অনেক দলকে পথভ্রষ্ট করেছে। তবুও কি তোমরা বুঝ না?” -(সূরা ইয়াসিন: ৬০-৬২)
وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يَضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا
“শয়তান মানুষকে সুদূরপ্রসারী গোমরাহ করতে চায়।” (সূরা নেসা) সে মানুষকে দোজখ পর্যন্ত নিয়ে ছাড়বে।
وَمَنْ يَكُنِ الشَّيْطَانُ قَرِينًا فَسَأَ قَرِينًا :
“শয়তানকে সে সাথী বানায়, তা কতই না নিকৃষ্ট সাথী।” (সূরা নেসা) শয়তানকে সাথী বানিয়ে তার বিভ্রান্তি থেকে কিভাবে রক্ষা পাবে? আল্লাহ আদম সন্তানকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন:
يَا بَنِي آدَمَ لَا يَفْتِنَنَّكُمُ الشَّيْطَانُ كَمَا أَخْرَجَ أَبَوَيْكُمْ مِنَ الْجَنَّةِ ..
“হে আদম সন্তান! শয়তান তোমাদের যেন এমন পরীক্ষায় না ফেলে যেমন করে তোমাদের পিতা-মাতাকে বেহেশত থেকে বের করে দিয়েছিল।” -(সূরা আরাফ-২৭)
মূলত আমরা অহরহ শয়তানের পরীক্ষার সম্মুখীন। শুধু তাই নয়, হযরত আদম ও হাওয়া (আঃ) শুধুমাত্র শয়তানের একটি প্ররোচনায় একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেন নি। তাদেরকে বেহেশত থেকে দুনিয়ায় বের হয়ে আসতে হল। আর আমরা প্রতিনিয়ত কত পরীক্ষার সম্মুখীন হচ্ছি এবং আল্লাহর কত অগণিত আদেশ-নিষেধ লঙ্ঘন করে চলেছি!' একটি মাত্র আদেশ লঙ্ঘন করে যদি বেহেশত চ্যুত হতে হয়, তাহলে, এত অগণিত আদেশ লঙ্ঘন করে আমরা কিভাবে বেহেশতে যাব? আল্লাহ শয়তানের শত্রুতা সম্পর্কে আরো বলেন:
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِي عَدُوًّا شَيَاطِينَ الْإِنْسِ وَالْجِنِّ .
"অনুরূপভাবে আমরা সকল নবীর জন্য মানুষ ও জিন শয়তানকে শত্রু বানিয়েছি।" -(সূরা আল-আন'আম-১১৩)
আর এটা পরিস্কার যে, শত্রু সর্বদা ক্ষতি সাধন করে থাকে। শয়তানের প্রধান কাজ হল, নাফরমানী ও গুনাহর কাজগুলোকে মানুষের সামনে কৃত্রিমভাবে সুন্দর করে তুলে ধরা। যদিও এর পরিণতি ভয়াবহ। কিন্তু মানুষ পরিণতির কথা চিন্তা করার সুযোগ পায় না। এর আগেই শয়তানের জালে আটকা পড়ে এবং গুনাহ করে বসে। আল্লাহ বলেন: وَإِذْ زَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانَ أَعْمَالَهُمْ .
"স্মরণ কর, যখন শয়তান মানুষের মন্দ আমলকে সুন্দর করে দেখায়।" -(সূরা আনফال-৪৮)
وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ .
"শয়তান তাদের মন্দ আমলকে সুন্দর করে দেখিয়েছে।" (সূরা: আল-আনআ'ম) মূলতঃ মন্দ মন্দই, তা কোনদিন সুন্দর হয় না।
আল্লাহ বলেনঃ وَمَنْ يَعْشَ عَنْ ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نَفَيْضُ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينَ .
“যে ব্যক্তি দয়ালু আল্লাহর স্মরণ থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার জন্য শয়তান নিয়োজিত করে দেই, তারপর সে হয় তার সঙ্গী।" (সূরা যুখরুফ-৩৬)
মানুষ আল্লাহর স্মরণ এবং ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে সে একাকী থাকবে না। শয়তান তার সঙ্গী হবে। তাই আল্লাহর স্মরণ ও জিকর থেকে উদাসীন হওয়া সমূহ বিপদের কারণ। শয়তানের সঙ্গদানকারীকে শয়তানের সাথী ছাড়া আর কি বলা যাবে? নিঃসন্দেহে শয়তানের ধোঁকাবাজি, হীন ও ঘৃণিত। আল্লাহ বলেন: - إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا -
"নিঃসন্দেহে, শয়তানের ষড়যন্ত্র দুর্বল।" (সূরা : নেসা-৭৬)
শয়তানী তৎপরতা বাহ্যিকভাবে জোরদার মনে হলেও আসলে তা দুর্বল। শয়তান কোন মুমিনের বন্ধু হতে পারে না। সে হল কাফেরের বন্ধু। শয়তানের কাজ হল, মুমিনদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন- إِنَّمَا يُرِيدَ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَوَةَ وَالْبَغْضَاءَ.
'শয়তান তোমাদের মধ্যে কেবলমাত্র শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে।' (সূরা আল-মায়েদাহ-৯১)
শয়তান মানুষকে অভাব-অনটনের ভয় দেখায় এবং মন্দ ও অশ্লীল কাজের আদেশ দেয়। সে কিছুতেই কোন মুমিনের কল্যাণকামী হতে পারে না। আল্লাহ বলেন: الشَّيْطَانَ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُمْ بِالْفَحْشَاءِ .
"শয়তান তোমাদেরকে অভাব ও দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং তোমাদেরকে অশ্লীল কাজের আদেশ দেয়।" (সূরা বাকারা-২৬৮)
দুনিয়ার সকল অশ্লীল ও বেহায়পনার পেছনে শয়তানের শক্তিশালী হাত রয়েছে। শয়তানের দেখানো প্রাচুর্য আসলেই দারিদ্র্য। এটা মুমিনকে বুঝতে হবে।
আল্লাহ আরো বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ وَمَنْ يَتَّبِعُ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ فَإِنَّهُ يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ .
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। যে ব্যক্তি শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে নিঃসন্দেহে শয়তান তাকে অন্যায় ও অশ্লীল কাজের আদশে দেয়।" -(সূরা নূর-২১)
মন্দ ও খারাপ কাজের জন্য কানা-ঘুষা এক বড় হাতিয়ার। আল্লাহ এটাকে শয়তানের অস্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেনঃ إِنَّمَا النَّجْوَى مِنَ الشَّيْطَانِ لِيَحْزَنَ الَّذِينَ آمَنُوا وَلَيْسَ بِضَارِهِمْ شَيْئًا إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ ، وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُوْنَ *
"কানা-ঘুষা শয়তানের কাজ। মুমিনদেরকে কষ্ট দেয়ার জন্য তা করা হয়। তবে আল্লাহর হুকুম ছাড়া সে তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। মুমিনদের উচিত, আল্লাহর উপর ভরসা করা।" -(সূরা মোজাদালা-১০)
এ আয়াতে পরিষ্কার বলা হয়েছে, আল্লাহর হুকুম ছাড়া শয়তান কারো ক্ষতি করতে পারে না। তাই মুমিনদেরকে আল্লাহর উপর নির্ভর করতে বলা হয়েছে। আল্লাহর উপর নির্ভরকারী মুমিন শয়তান দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। যার তাওয়াক্কুলের পরিমাণ যতবেশি সে শয়তান দ্বারা তত কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আল্লাহ বলেছেন, ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ . "তোমরা ইসলামে পূর্ণ প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করনা।" -(সূরা বাকারা-২০৮)
আল্লাহ আরো বলেন: وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَانِ إِلَّا غَرُورًا - "তাদের প্রতি শয়তানের ওয়াদা প্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই নয়।" -(সূরা বনি ইসরাঈল)
আল্লাহ বলেন: إِنْ يَدْعُوْنَ مِنْ دُوْنِهِ إِلَّا إِنَاثًا وَإِنْ يَدْعُوْنَ إِلَّا شَيْطَانًا مَّرِيدًا لَعَنَهُ اللهُ .
"তারা আল্লাহ ব্যতীত নারীদের কাছে প্রার্থনা করে। মূলতঃ তারা বিদ্রোহী। শয়তানের কাছে দোআ করে। তার উপর আল্লাহর অভিশাপ।" -(সূরা নেসা)
শয়তান মানুষকে ভুলায়। ফলে, মানুষ ভুল করে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালন করে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন: وَإِمَّا يَنْسِيَنَّكَ الشَّيْطَانَ فَلَا تَقْعُدُ بَعْدَ الذِّكْرَى مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ .
"যদি শয়তান তোমাকে ভুলিয়ে দেয়, তাহলে তা স্মরণ হওয়ার পর তুমি পুনরায় জালেম সম্প্রদায়ের সাথে উঠা-বসা করনা।" -(সূরা আনআম)
তাই একই ভুলের যেন পুনরাবৃত্তি না হয় সেটা দেখা দরকার। শয়তানের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে সময় লাগে না। মুমিনের জোরদার ঈমান ও তাওয়াক্কুলের কাছে সে হেরে যায়। আল্লাহ সূরা ইবরাহীমে বলেছেন:
وَقَالَ الشَّيْطَانَ لَمَّا قُضِيَ الْأَمْرُ إِنَّ اللَّهَ وَعَدَكُمْ وَعْدَ الْحَقِّ وَّوَعَدْتُكُمْ فَاَخْلَفْتُكُمْ
“ফয়সালা কার্যকর হবার পর শয়তান বলে : নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সাথে সত্য ওয়াদা করেছেন। আমিও তোমাদের সাথে ওয়াদা করেছি, কিন্তু আমি তা ভঙ্গ করেছি।” আল্লাহর ফয়সালার মোকাবিলা করা শয়তানের সাধ্যাতীত ব্যাপার। সে কারণে তার ঐ ফয়সালা পরিবর্তনের ওয়াদা অর্থহীন।
শয়তানের কাজ হচ্ছে মানুষের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টির জন্য উস্কানী দেয়। এর ফলে, মানব সমাজে বিভিন্ন বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। আল্লাহ বলেন : إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْزِغُ بَيْنَهُمْ * إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلْإِنْسَانِ عَدُوًّا مُبِيْنًا
“নিশ্চয়ই শয়তান তাদের মধ্যে উস্কিয়ে দেয়। নিঃসন্দেহে সে মানুষের প্রকাশ্য দুশমন।” -(সূরা বনি ইসরাঈল)
এ উস্কানীর ফলেই ইউসুফ (আঃ)-এর প্রতি তাঁর ভাইদের বিদ্বেষভাব সৃষ্টি হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ সূরা ইউসুফে হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর জবানীতে বর্ণনা করেছেন : مِّنْ بَعْدِ نَزَغَ الشَّيْطَانُ بَيْنِي وَبَيْنَ إِخْوَتِي
“আমার ও আমার ভাইদের মধ্যে শয়তানের উস্কানীর পর।”
সেজন্য আল্লাহ কোরআন মজীদে উস্কানীর চিকিৎসা হিসেবে বলেছেন : وَاِمَّا يَنْزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ
“যখন শয়তান তোমাকে উস্কায় বা ফুঁসলায়। তখন আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও।” -(সূরা আরাফ-২০০)
শয়তানের উস্কানী ও খোঁচাদান থেকে বাঁচার একমাত্র পথ হচ্ছে আল্লাহর কাছে পানাহ চাওয়া। পানাহ চাইলে শয়তান কাবু হয়ে যায়। সে আর মানুষের ক্ষতি করতে পারে না।
وَحَفِظْنَاهَا مِنْ كُلِّ شَيْطَانِ رَّحِيمٍ - আল্লাহ বলেন : “আমরা একে সকল অভিশপ্ত শয়তান থেকে হেফাজত করেছি।” -(সূরা হিজর)
শয়তান আল্লাহর চিরন্তন নাফরমান। কোরআন মজীদে নিজ বাপ আজরের প্রতি ইবরাহীম (আঃ)-এর জবানীতে উপদেশমূলক এ সত্য বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন,
يَا أَبَتِ لَا تَعْبُدِ الشَّيْطَانَ إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلرَّحْمَنِ عِصِيًّا .
"হে পিতা! আপনি শয়তানের পূজা করবেন না। নিশ্চয়ই শয়তান দয়াবান আল্লাহর নাফরমান।" (সূরা মরিয়ম)
তিনি আরো বলেন, শয়তানের পূজা মানুষকে শয়তানের বন্ধু বানিয়ে দেয়।
يَا أَبَتِ إِنِّي أَخَافُ أَنْ يَمَسَّكَ عَذَابٌ مِّنَ الرَّحْمَنِ فَتَكَوْنَ لِلشَّيْطَانِ وَلِيًّا ..
"হে পিতা! অবশ্যই আমি ভয় করি যে, দয়াবান আল্লাহর শাস্তি আপনাকে পেয়ে বসবে। তখন আপনি শয়তানের বন্ধুতে পরিণত হবেন।" -(সূরা মরিয়ম)
আল্লাহ সে মানুষের জন্য আফসোস করেন, যারা শয়তানের কুমন্ত্রণায় অজ্ঞের মত বিতর্ক করে। আল্লাহ বলেনঃ
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يُجَادِلُ فِي اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّبِعْ كُلَّ شَيْطَانٍ مَّرِيدٍ .
"এমন লোকও আছে যারা জ্ঞান বর্জিত উপায়ে আল্লাহর বিষয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয় এবং সকল বিদ্রোহী শয়তানের অনুসরণ করে।” (সূরা-হজ্জ)
শয়তানের অনুসরণ- জ্ঞানী লোকের জন্য পরিস্কার পদস্খলন। এ মর্মে আল্লাহ বলেন:
وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ فَصَدَّهُمْ عَنِ السَّبِيلِ وَكَانُوا مُسْتَبْصِرِينَ .
'শয়তান তাদের কাজকে সুন্দর করে দেখিয়েছি এবং তাদেরকে সঠিক পথ থেকে বাধা দিয়েছে। অথচ তারা ছিল আলোর সন্ধানী।' (সূরা আনকাবুত-)
অর্থাৎ যুক্তিবাদী জ্ঞানী মানুষ ও শয়তানের কারণে সত্যের অনুসন্ধান ও সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়। তাই দেখা যায়, বহু জ্ঞানী-গুণী ও পণ্ডিত ব্যক্তিরাও বিভ্রান্ত।
আল্লাহ শয়তানের ভয়-ভীতিকে তোয়াক্কা না করার জন্য মুমিনদেরকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন: إِنَّمَا ذُلِكُمُ الشَّيْطَانُ يَخَوِّفُ أَوْلِيَاءَهُ فَلَا تَخَافُوهُمْ - وَخَافُونِ إِن كُنتُمْ مُؤْمِنِينَ .
"এরা যে রয়েছে, এরাই হল শয়তান, এরা নিজেদের বন্ধুদের ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে। সুতরাং তোমরা তাদের ভয় করো না। আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।" (সূরা আল-এমরান-১৭৫)
আল্লাহ শয়তানের গোমরাহী ও অপকর্ম সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। তাই তিনি মুমিনদেরকে আল্লাহর বিধান ও আদেশ-নিষেধ মেনে চলার হুকুম করেছেন। এতে করেই তারা শয়তানের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পাবে। আল্লাহ বলেন: فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ مِّنَى هُدًى فَمَنْ تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنَوْنَ .
"যখন তোমাদের প্রতি আমার হেদায়েত আসবে এবং যে তা অনুসরণ করবে, তাদের না কোন ভয় আছে, আর না তারা পেরেশান হবে।" -(সূরা বাকারা-৩৮)
তারপরও মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কিছু কিছু শয়তানী নিদর্শন উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন: إِنَّمَا الْخَمْرَ وَالْمَيْسِرَ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ .
"নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ধারক তীরসমূহ শয়তানের অপবিত্র কাজ।" -(সূরা মায়েদাহ-৯০)
আল্লাহ অপচয়কেও শয়তানের কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন- إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ .
"নিঃসন্দেহে অপচয়কারী শয়তানের ভাই।" (সূরা বনি ইসরাঈল-২৭)
আল্লাহ শয়তানের গোমরাহী ও ক্ষতিসাধন থেকে বাঁচার জন্য আমাদেরকে তার কাছে আশ্রয় চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
وَقُلْ رَّبِّ أَعُوْذُبِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ তিনি বলেছেন : "বলুন: হে আমার পালনকর্তা! আমি শয়তানের প্ররোচনা থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি।" (সূরা মুমিনূন-৯৭)
আল্লাহ আরো বলেন: فَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ .
"তুমি যখন কুরআন পড়, তখন শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও।" -(সূরা নহল)
আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে মুক্তির জন্য সর্বদা পানাহ চাওয়া মুমিনের জন্য জরুরী।
আল্লাহ শয়তানের অনুসারীকে শয়তানের দল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বিপরীত দিকে, তিনি নিজের অনুসারীদেরকে আল্লাহর দল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। আল্লাহর দলভুক্ত হওয়াই কল্যাণকর ও যুক্তিসঙ্গত। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন: اسْتَحْوَذَ عَلَيْهِمُ الشَّيْطَانُ فَأَنْسَاهُمْ ذِكْرَ اللَّهِ ، أُولَئِكَ حِزْبُ الشَّيْطَانِ ، أَلَّا إِنَّ حِزْبُ الشَّيْطَانِ هُمُ الْخَاسِرُونَ .
"শয়তান তাদেরকে বশীভূত করে নিয়েছে, অতঃপর আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে। তারা শয়তানের দল। সাবধান, শয়তানের দলই ক্ষতিগ্রস্ত।” -(সূরা মোজাদালা-১৯)
একই সূরার ২২নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেনঃ "যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, ভাই অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠী হয়। তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর অদৃশ্য শক্তি দ্বারা। তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তারা তথায় চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট।"
أُولَئِكَ حِرْبُ اللَّهِ - أَلَّا إِنَّ حِزْبُ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ .
"তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখ, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।"
শয়তানের অনুসারীদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন: هَلْ انَبِّئُكُمْ عَلَى مَنْ تَنَزَّلَ الشَّيَاطِينَ - تَنَزَّلَ عَلَى كُلِّ أَفَّاكِ أَثِيمٍ * يُلْقَوْنَ السَّمْعَ وَأَكْثَرَهُمْ كَاذِبُونَ .
"আমি কি তোমাদেরকে, যাদের কাছে শয়তান অবতীর্ণ হয় তাদের সম্পর্কে বলব না? শয়তান সকল মিথ্যুক-পাপীর কাছে অবতীর্ণ হয়, তাদের কাছে কান কথা বলে এবং তাদের অধিকাংশই মিথ্যুক।"
এ আয়াতের প্রেক্ষিতে ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, শয়তানের অনুসারীদের মধ্যে মিথ্যা হচ্ছে প্রধান উপাদান। তারা শরীয়তের পরিপন্থী লোক। তারা গুনাহ ও প্রতারনার মধ্যে ডুবে আছে। তারা যে পরিমাণ আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ থেকে দূরে অবস্থান করছে, সে পরিমাণেই গুনাহ করছে। গোমরাহী, শিরক, বেদআত, অজ্ঞতা ও কুফরীই হচ্ছে এ সকল কাজের মূল। যেখানে কুফরী, ফাসেকী, নাফরমানী ও খোদাদ্রোহীতা বিদ্যমান সেখানে শয়তানের রকমারি তৎপরতার পরিমাণও অনেক বেশি। কিন্তু এর মোকাবিলায় যেখানে ঈমান, তাওহীদ ও সত্যের আলো শক্তিশালী, সেখানে শয়তানী তৎপরতা দুর্বল। যেমন, যে মোশরেকগণ মুসলমান হয়নি তাদের সমাজে শিরক ও নাফরমানী সর্বাধিক। পক্ষান্তরে, ইসলামে প্রবেশকারীদের মধ্যে যদি তাওহীদ ও আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য কম হয় তাহলে, সে পরিমাণ নাফরমানী তাদের মধ্যে পাওয়া যাবে। মোটকথা, শয়তানের অনুসরণ করা না করা হচ্ছে, ব্যক্তির এখতিয়ার। এই এখতিয়ারের কঠিন হিসেব নেয়া হবে।
📄 হাদীসের আলোকে শয়তানী ওয়াসওয়াসার ধরন ও প্রকৃতি
শয়তানী, গোমরাহীর নমুনা অগণিত। আমরা এখানে কয়েকটি নমুনা উল্লেখ করব। শয়তান প্রতিটি মুহূর্তে আদম সন্তানকে গোমরাহ করার কাজে ব্যস্ত। ঈমান-আকীদায় বিভ্রান্তসহ আমল-আখলাকে ব্যাপক বিকৃতি ঘটায়। আল্লাহর সাথে শিরক করার জন্য উদ্বুদ্ধ করে এবং গায়রুল্লাহকে সাজদা করা, বুজুর্গ ব্যক্তির কাছে কোন নিয়ত ও মকসুদ পূরণের জন্য প্রার্থনা করা, আল্লাহর কাছে চাওয়ার জন্য কোন জীবিত কিংবা মৃতকে উসিলা বানানো, কোন মানুষ, প্রাণী, গাছ, পাহাড় ও অন্য কিছুর পুজা করার জন্য উৎসাহিত করে। এগুলো সবই শিরক।
১. কবরভিত্তিক গোমরাহী: কবরকে কেন্দ্র করে শয়তানের তৎপরতা বহুমুখী। কবর থেকে মৃত ব্যক্তির কথা বলা, কবর যেয়ারতকারীদের সাথে মৃতের সাক্ষাত কিংবা অন্য কোন ইশারা-ইঙ্গিত লাভ ইত্যাদি। এগুলো আদৌ সত্য নয়। শয়তান কবরের মৃত ও বুজুর্গ ব্যক্তিদের রূপ ধারণ করে জীবিতদের সামনে হাজির হয়, তাদের সাথে কথা বলে, তাদেরকে কবরের গায়েবী কথা-বার্তার নামে মিথ্যা কথা শুনায় এবং বিশেষ কোন নসীহত করে। এতে যেয়ারতকারীর আনন্দের শেষ নেই। সে নিজেকে বুজুর্গ এবং আল্লাহর অলী হিসেবে এটাকে বিরাট কারামত ও অলৌকিক কাজ মনে করে। অথচ এগুলো হচ্ছে শিরক।
নজর-মান্নত নাজায়েয নয়, যদি তা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ও তাঁর নামে হয়। তবে তা ইসলামের আকাঙ্খিত বিষয়ও নয়। ইসলাম বলে, নজর-মান্নত দ্বারা ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না। বরং এর দ্বারা কৃপণের পকেট থেকে কিছু অর্থ বের হয়। কিন্তু সে মান্নত যদি কোন ব্যক্তি, মাজার ও মৃতের জন্য হয়, তাহলে সেটা হারাম। দুঃখের বিষয়, আমাদের সমাজের বেশির ভাগ নজর-মান্নত খানকাহ, মাজার, মৃত ব্যক্তি ও নেক বেশধারী লোকের উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে। আর সে নজর-মান্নতের সুফলের দায়িত্ব নেয় শয়তান। সন্তানের জন্য, ব্যবসায় উন্নতির জন্য, ফসল বৃদ্ধির জন্য, ফল রক্ষার জন্য ও পশুর বাচ্চা প্রসব এবং মানুষের রোগমুক্তিসহ সকল মকসুদ পূরণের দায়িত্ব শয়তান পালন করে। সে অনুসারীদেরকে এ হারাম কাজের দিকে আকৃষ্ট করে এবং তাদেরকে বুঝায় যে, মকসুদ পূরণের এটাই উপযুক্ত পন্থা। মকসুদ পূরণ হয় বলে মানুষ ঈমান-আকীদার কথা মোটেও চিন্তা করে না। একজনের কাছে শুনে অন্যজন ঐদিকে ঝুঁকে পড়ে। যেমন, ইঁদুর থেকে ফল ও ফসল রক্ষা, মায়ের পেট পাহারা দিয়ে ত্রুটি-বিচ্যুতির অনুপ্রবেশ রোধ করে সন্তান ধারণ, ব্যবসার ক্ষতিকর স্থানে পাহারা দিয়ে ব্যবসায়ীকে লোকসান থেকে রক্ষা এবং রোগমুক্তির জন্য শুভাকাঙ্খীর বেশে মান্নতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিকল্প চিকিৎসার আয়োজন করে। এজন্য শয়তান সাফল্যের গর্ব করে। পক্ষান্তরে, স্বার্থবাদী মানুষ পরকালের বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভুলে গিয়ে দুনিয়ার স্বল্পমেয়াদী সংকীর্ণ স্বার্থের গোলক ধাঁধায় ঘুরপাক খায়। ধ্বংস হয় তার ঈমান-আকীদা।
ঈমান-আকীদার স্থান হচ্ছে অন্তর। শয়তান সে অন্তরেও হানা দেয়। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন:
إِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِى مِنْ ابْنِ أَدَمَ فِي الْعُرُوقِ مَجْرَى الدَّمِ حَتَّى إِنَّهُ يَأْتِي أَحَدَكُمْ وَهُوَ فِي الصَّلَاةِ فَيَنْفُخَ فِي دَبَرِهِ وَيَبِلَ إِحْلِيلَة ثُمَّ يَقُولُ : قَدْ أَحْدَثَتْ فَلَا يَنْصَرَفَنْ أَحَدَكُمْ حَتَّى يَجْدَ رِيحًا أَوْ يَسْمَعَ صَوْتًا أَوْ يَجْدَ بَلَلا .
'নিশ্চয়ই শয়তান আদম, সন্তানের ধমনী ও শিরা-উপশিরায় দৌড়াদৌড়ি করে। এমনকি তোমাদের কারো নামাজ পড়া অবস্থায় পশ্চাদ্বারে ফুঁ দেয় এবং প্রস্রাব যন্ত্রের মুখ ভিজিয়ে দিয়ে বলে: আমি অজু ভেঙ্গে দিয়েছি। এমতাবস্থায় তোমরা বায়ুর দুর্গন্ধ কিংবা শব্দ পাওয়ার আগ পর্যন্ত অথবা পেশাব যন্ত্রের মুখ বরাবর কাপড় ভেজা না দেখলে নামাজ ছেড়ে দেবে না। ১
এ হাদীসের বক্তব্য হল, শয়তান নামাজ নষ্ট করার জন্য এ সকল কাজ করে। পক্ষান্তরে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতিকার বাতলিয়ে দিয়েছেন যে, নামাজে এ জাতীয় সন্দেহ সৃষ্টি শয়তানের কাজ। শয়তানকে এ সুযোগ দেয়া যাবে না। তাই নিশ্চত না হয়ে নামাজ ছাড়া যাবে না।
এ হাদীস দ্বারা আরো বুঝা যায় যে, শয়তান হচ্ছে আত্মসর্বস্ব। শারীরিক সত্ত্বা নয়। সে মানবদেহে রক্তের ধমনী ও শিরা-উপশিরায় চলাচল করে। এই পথে সে মানুষের অন্তরে প্রবেশ করে। সে অন্তরে নানারকম কুমন্ত্রণা ও ওয়াসওয়াসা এবং বিভিন্ন প্রকার কল্পনার জন্ম দেয়। আল্লাহ বলেছেন:
الَّذِي يُوَسْوِسَ فِي صُدُورِ النَّاسِ .
"শয়তান মানুষের অন্তরে ওয়াসওয়াসা দেয়।" (সূরা নাস) এটা মারাত্মক বিষয়।
কারো কারো মতে, তা রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। শয়তানের অধিক কুমন্ত্রণার প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে যেন সে রক্ত থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না। সর্বদা মানুষের সাথে লেগেই আছে এবং ধমনীতে চলাফেরা করছে। এজন্য হৃদয় ও অন্তরকে বিশুদ্ধ ও পূত-পবিত্র রাখা অত্যন্ত জরুরী। তা অপবিত্র হলে পুরো শরীর ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খারাপ কাজের মাধ্যমে অপবিত্র হয়ে যাবে। এজন্য মহানবী (সঃ) বলেছেন:
أَلَا وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدَ كُلَّهُ وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدَ كَلَهَ إِلَّا وَهِيَ الْقَلْبُ .
"সাবধান, শরীরের মধ্যে এক টুকরা গোস্ত এমন আছে যা ঠিক ও সংশোধিত হলে, গোটা শরীর ঠিক ও সংশোধিত থাকে এবং তা খারাপ হলে, গোটা শরীর খারাপ হয়ে যায়। সাবধান, সেটি হচ্ছে হৃদয়।" (বোখারী, মুসলিম)
শয়তানের এ অবাধ বিচরণ থেকে কোন মানুষই মুক্ত নয়। মহানবী (সঃ) বলেছেন, একমাত্র মহান আল্লাহ আমাকে তার হাত থেকে রক্ষা করেছেন। নচেত, সেও আমার ধমনীতে চলাচল করত এবং ওয়াসওয়াসা দিত। আল্লাহর বিশেষ হেফাজতের কারণে শয়তান মহানবী (সঃ)-এর ধমনীতে চলাচল করতে পারে না।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, হৃদযন্ত্রের কাজ হল, ধমনীর মাধ্যমে সারা শরীরে রক্ত সরবরাহ করা এবং সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সচল রাখা। হৃদযন্ত্রের এ কাজ বন্ধ হলে হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মানুষ মারা যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞান হৃদযন্ত্রের আর কোন ভূমিকা ও তৎপরতার কথা বলে না। অথচ, উল্লেখিত হাদীসে একে নেক ও পাপের উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শয়তান ঐ দৈহিক প্রক্রিয়ার উপর প্রভাব বিস্তার করে চোখ, কান, নাক, জিহ্বা, হাত-পা ও লজ্জাস্থানের মাধ্যমে গুনাহর কাজ করায়।
যারা কাফের, তাদের মন-মগজ ও চিন্তা-ভাবনা শয়তানের প্ররোচনা দ্বারা প্রভাবিত। তাই তারা কুফরী ও শিরকে লিপ্ত। শয়তান তাদের নিয়ন্ত্রণকারী। সকল বাতিল মত ও পথ এবং সকল মানব রচিত মতাদর্শ ও জীবন ব্যবস্থা আল্লাহর দ্বীনের সাথে সংঘর্ষমুখর। আল্লাহ বলেন:
وَمَنْ يَبْتَغِى غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يَقْبَلَ مِنْهُ .
"যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন মতাদর্শকে দ্বীন বা জীবন ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করে তার কাছ থেকে তা গ্রহণ করা হবে না।"
إِنَّ الَّذِينَ عِنْدَ اللهِ الْإِسْلَام - তিনি আরো বলেন .
"নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে একমাত্র মনোনীত দ্বীন হচ্ছে ইসলাম।"
শয়তান যদিও হৃদয়ে ওয়াসওয়াসা দেয়, কিন্তু এর মূল মালিক হলেন আল্লাহ। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইলে তিনি সাহায্য করেন। মহানবী (সঃ) বলেছেন, বান্দার অন্তর আল্লাহর দুই আঙ্গুলের মধ্যে। তিনি যে দিকে ইচ্ছা সে দিকে এটাকে ঘুরিয়ে দিতে পারেন। তাই মহানবী (সঃ) আল্লাহর কাছে দোআ করতেন:
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ قَلِبْ قُلُوبَنَا عَلَى دِينِكَ، يَا مُصَرِفَ الْقُلُوْبِ صَرَفَ قُلُوبَنَا عَلَى طَاعَتِكَ .
"হে অন্তরের পরিবর্তনকারী! আমাদের অন্তরকে তোমার দ্বীনের দিকে ঘুরিয়ে দাও; হে অন্তরের গতি নিয়ন্ত্রণকারী! আমাদের হৃদয়কে তোমার ইবাদত ও আনুগত্যের অনুসারী করে দাও।"
তিনি এ দোআও করেছেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُبِكَ مِنْ قَلْبِ لَا يَخْشَعُ وَمِنْهَ عَيْنَ لَا تَدْمَعُ وَمِنْ دُعَاءِ لَا يَسْمَعُ :
"হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে পানাহ চাই সে অন্তর থেকে যে অন্তর বিনয়ী নয়, যে চোখ অশ্রু প্রবাহিত করে না এবং যে দোআ কবুল হয় না।"
আল্লাহ শয়তানের উপর সত্যিকার মুমিনের বিজয়ের নিশ্চয়তা দিয়ে বলেছেন,
إِنَّهُ لَيْسَ لَهُ سَلْطَانُ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ إِنَّمَا سَلْطَانَهُ عَلَى الَّذِينَ يَتَوَلَّوْنَهُ وَالَّذِينَ هُمْ بِهِ مُشْرِكُونَ .
"নিশ্চয়ই শয়তানের আধিপত্য চলে না তাদের উপর যারা ঈমান এনেছে এবং আপন রবের উপর ভরসা করে। তার আধিপত্য তো তাদের উপরই চলে, যারা তাকে বন্ধু মনে করে এবং যারা তাকে অংশীদার মানে।" (সূরা নাহল: ৯৯-১০০) মজবুত মুমিনকে শয়তান ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে না। দুর্বলদের ক্ষতি করতে পারে। তখন আল্লাহ বান্দার অন্তরে নেক কাজের আড়াল হয়ে যান। তিনি বলেন-
وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ .
"জেনে রাখ, আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মাঝে আড়াল হয়ে যান।" (সূরা আনফাল-২৪)
শয়তান হিতাকাঙ্খী ও উপদেশদানকারীর বেশে এসে ওয়াসওয়াসা দেয়। শয়তান বেহেশতে হযরত আদম ও হাওয়াকে এই বলে ওয়াসওয়াসা দিয়েছে যে,
وَقَاسَمَهُمَا إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ النَّاصِحِيْنَ
"সে তাদের দু'জনকে শপথ করে বলেছে, আমি অবশ্যই তোমাদের হিতাকাঙ্খী।” (সূরা আরাফ-২১)
সে আরো বলেছে:
هَلْ أَدُلُّكَ عَلَى شَجَرَةِ الْخَلْدِ وَمَلْكٍ لَا يَبْلى .
"আমি কি তোমাকে চিরস্থায়ী জীবন ও রাজত্বের নিশ্চয়তা দানকারী গাছের সন্ধান দেব যা কোন দিন ধ্বংস হবে না?" (সূরা ত্বোহা-১২০)
শয়তান ওয়াসওয়াসা দেয় সত্য, কিন্তু কাউকে পাপকাজে বাধ্য করতে পারে না। বরং মানুষ পাপ কাজ করা- না করার বিষয়ে স্বাধীন। কেয়ামতের দিন উল্টো শয়তান মানুষকে লক্ষ্য করে বলবেঃ
وَمَا كَانَ لِي عَلَيْكُمْ مِّنْ سُلْطَانٍ إِلَّا أَنْ دَعَوْتُكُمْ فَاسْتَجَبْتُمْ لي : فَلَا تَلُومُونِي وَلَوْمُوا أَنْفُسَكُمْ ، مَا أَنَا بِمُصْرِخِكُمْ وَمَا انْتُمْ بِمُصْرِخِي .
"তোমাদের উপর তো আমার কোন ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু এতটুকু যে, আমি তোমাদেরকে ডেকেছি, তারপর তোমরা আমার কথা মেনে নিয়েছ। সুতরাং তোমরা আমাকে তিরস্কার করো না এবং নিজেদেরকেই ভর্ৎসনা কর। আমি তোমাদের উদ্ধারে সাহায্যকারী নই এবং তোমরাও আমার উদ্ধারে সাহায্যকারী নও।' (সুরা ইবরাহীম-২২)
এর দ্বারা বুঝা যায় যে, শয়তান কাউকে পাপকাজে বাধ্য করার ক্ষমতা রাখে না। সে শুধু কুমন্ত্রণা দেয়। ২. ইবাদতভিত্তিক গোমরাহী: মানুষ ও জিন সৃষ্টির উদ্দেশ্য হল, আল্লাহর ইবাদত করা। আল্লাহ বলেছেন:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبَدُونَ .
"আমি জিন এবং মানুষকে কেবলমাত্র আমার ইবাদতের উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছি।".
যদি মানুষ সৃষ্টির মূল লক্ষ্য এ ইবাদতকে নষ্ট করা যায়, তাতেই শয়তানের সাফল্য। এ কারণেই শয়তান মানুষের ইবাদতের পেছনে লাগা থাকে। নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত, জিকর, তাসবীহ-তাহলীল ও নফল ইবাদতগুলোকে নস্যাত করার জন্য সে সর্বদা সচেষ্ট।
শয়তান ঈমানদার লোকদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য মৃত ব্যক্তি কিংবা বুজুর্গ ব্যক্তির বেশ ধারণ করে হাজির হয় এবং লোকদেরকে শরীয়ত বিরোধী হুকুম দেয়। লোকেরা মনে করে, তারা শরীয়তের বিশেষ একটি স্তরে পৌঁছে গেছে। তাই কবরের নেক ও বুজুর্গ ব্যক্তিরা তাদের সামনে হাজির হয়েছে। এজন্য সাধারণ মানুষের জন্য যে শরীয়ত, এটা তাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। এমন কি, কোন অনুসারীও যদি তাকে অনুসরণ করে তাহলেও সাফল্য লাভে কোন ব্যাঘাত ঘটবে না। ইমাম ইবনে তাইমিয়া তাঁর 'মাজমুউল ফাতাওয়া' গ্রন্থে লিখেছেন, "শয়তান বহু আবেদ ও নেক মানুষকে কা'বা শরীফ ও তার চারদিকে তওয়াফ করতে দেখায়। বহু ইবাদতকারীকে এও দেখায় যে, বিরাট এক সিংহাসন, তাতে রয়েছে এক বিশাল মহান ছবি। অনেক লোক তাতে উঠানামা করছে। সে এগুলোকে ফেরেশতা, ছবিকে আল্লাহ এবং সিংহাসনকে আল্লাহর আরশ মনে করছে, অথচ, এগুলো সবই শয়তান। বহু লোকের সাথে এরূপ দৃশ্যের অবতারণা করা হয়েছে। অথচ, আল্লাহ ও ফেরেশতার কোন রূপ বা আকৃতি নেই। তাঁরা নিরাকার।
যারা এ সকল কাজ-কর্মকে শয়তানী কাজ এবং এ জাতীয় নাটকের অভিনেতাদেরকে শয়তান হিসেবে বুঝতে পেরেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ব্যক্তিত্ব হলেন, শেখ আব্দুল কাদের জিলানী (রঃ)। তিনি ছিলেন বিরাট আলেমে দীন এবং অত্যন্ত নেক ও বুজুর্গ লোক। ঈমানের মজবুতি ও দীনী এলেম-জ্ঞানের কারণে তিনি শয়তান থেকে রক্ষা পেয়েছেন। তাঁর সম্পর্কে এক প্রসিদ্ধ ঘটনা আছে। তিনি বলেন, আমি একবার ইবাদতে মশগুল ছিলাম। তখন একটি মহান আরশ বা সিংহাসন দেখি। তাতে রয়েছে নূর। নূরটি আমাকে বলল : 'হে আব্দুল কাদের! আমি তোমার প্রতিপালক। আমি অন্যদের জন্য যা হারাম করেছি, তা তোমার জন্য হালাল করলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম :', 'তুমি কি সেই আল্লাহ যিনি ছাড়া আর অন্য কোন মাবুদ নেই? হে আল্লাহর দুশমন! দূর হও।' তখন সে নূর তাসের ঘরের মত খান খান হয়ে ভেঙ্গে পড়ল এবং অন্ধকার নেমে আসল। অন্ধকার থেকে একটি আওয়াজ আসল, হে আব্দুল কাদের! তুমি তোমার ঈমান, এলেম ও দ্বীন সম্পর্কিত বুঝ-জ্ঞানের কারণে আজকে রক্ষা পেলে। আমি ইতিপূর্বে এ ঘটনার মাধ্যমে ৭০ জন বুজুর্গকে গোমরাহ করেছি। শেখ আব্দুল কাদেরকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনি কিভাবে জানলেন, সে শয়তান ছিল? তিনি উত্তরে বলেন: তার একথা দ্বারা বুঝতে পেরিছি 'অন্যদের জন্য যা হারাম করেছি, আপনার জন্য তা হালাল করলাম।' আমি জানি যে, হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর শরীয়ত বাতিল কিংবা পরিবর্তিত হবে না। সে বলেছে, 'আমি তোমার প্রতিপালক। কিন্তু তার একথা বলার শক্তি নেই যে, 'আমি ঐ আল্লাহ যিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই।' আল্লাহ তাকে একথার বলার শক্তি দেন নি।
৩. গায়েব বিষয়ক গোমরাহী :
ইমাম ইবনে তাইমিয়া আরো বলেছেন : 'যারা মনে করে যে জাগ্রত অবস্থায় আল্লাহকে দেখা সম্ভব তারাও এ দলের অন্তর্ভুক্ত। নিজেদের দেখাটাই তাদের বড় প্রমাণ। এটাকে তারা সত্য মনে করে। অথচ, তারা বুঝে না যে এটা আসলে শয়তান।
বহু মুর্খ ইবাদতকারীর ধারণা, আল্লাহকে দুনিয়ায় দেখা সম্ভব। কেননা, তারা অনেকেই নিজেদের ধারণা অনুযায়ী আল্লাহকে জাগ্রত অবস্থায় দেখেছে। অথচ, তা ছিল শয়তান। কেননা, কোরআনে এসেছে, আল্লাহকে দুনিয়ায় দেখা সম্ভব নয়। এছাড়াও তাদের অনেকেই কোন নবী কিংবা বুজুর্গ অথবা খিযির (আঃ)-কে দেখেছে বলে ধারণা করে। অথচ সেটাও ছিল শয়তানের কারসাজি।
মহানবী (সঃ)-কে স্বপ্নে দেখা সত্য ঘটনা। তবে শর্ত হল, মহানবী (সঃ)-এর আকৃতির সাথে স্বপ্নের সামঞ্জস্য থাকতে হবে। যদি সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে, তা শয়তানের প্রতারণা। শয়তান মহানবীর বেশ ধরতে পারবে না। কিন্তু অন্য কারো বেশ ধরে বলতে পারে যে, 'আমিই মহানবী।' যদি তা না হয়, তাহলে মহানবীর আকৃতি কি অগণিত? অগণিত মানুষ তাঁকে অগণিত আকৃতিতে কিভাবে দেখতে পারে? হাদীসের কিতাবে মহানবীর আকৃতির বর্ণনা স্বপ্নের আকৃতিকে কিতাবের আকৃতির সাথে মিলালেই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে।
মহানবীকে স্বপ্নে দেখা সত্য হলেও জাগ্রত অবস্থায় দেখা কিছুতেই সত্য হতে পারে না। যারা মৃত্যুবরণ করেছে তারা কখনো আবার জীবিত হতে পারে না।
অনেকে জাগ্রত অবস্থায় বিভিন্ন নেক ও বুজুর্গ লোকের হাত দেখে এবং তাদের সাথে হাত মিলায়। এটাও তেমনি শয়তানী নাটক। মৃত লোক জীবিত হতে পারে না। তাই এদের হাত দেখা ও হাত মিলানোর কোন প্রশ্নই উঠে না। আল্লাহ সকল প্রাণের জন্য মৃত্যু অবধারিত করে রেখেছেন। তিনি বলেন : كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ “সকল মানুষ মরণশীল।” তাদেরকে কেবল হাশরের দিন পুনর্জীবিত করা হবে। দুনিয়ায় আর পুনর্জীবনের কোন সম্ভাবনা নেই। তাই এ হাতগুলোও অবশ্যই শয়তানের হাত। এক পর্যায়ে এগুলো থেকেই শরীয়ত বিরোধী বিশেষ নির্দেশ আসবে। আর সে মনে করবে, এটা তার বিশেষত্ব যে, গায়েব থেকে তাকে নির্দেশ দেয়া হয়। এরকম অবস্থার শিকার বহু পীর-ফকীর। যাদের অনুসারীর সংখ্যা মোটেই কম নয়। তাদের ঈমান ধ্বংসের জন্য শয়তানের এ খেলা খুবই চিত্তাকর্ষক ও জমজমাট।
শেখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন: 'অনেক লোক এ সকল শয়তানী নাটকের নায়কদেরকে ফেরেশতা হিসেবে গণ্য করে।' অথচ, কোরআন ও হাদীস পাঠ করলে বুঝা যায় যে, ফেরেশতাদের কাজ তা নয়। আল্লাহ বিভিন্ন ফেরেশতাকে বিভিন্ন কাজে নিয়োগ করেছেন। তারা প্রতিনিয়ত নিজ নিজ কাজে রত। এক মুহূর্তের জন্যও আল্লাহর আদেশ অমান্য করার কোন সুযোগ নেই। তাই তাদের পক্ষে এ সকল অতিরিক্ত কাজ করার সুযোগ কোথায়?
৪. বেদআতভিত্তিক গোমরাহী:
বেদআতপন্থীরা সবচাইতে বড় গোমরাহ। তারা দ্বীনের মধ্যে এমন সব জিনিস যোগ করে যা এ দ্বীনের অংশ নয়। এ বিষয়ে ভারতবর্ষে হাদীসশাস্ত্র আনয়নকারী ও প্রচলনকারী শেখ আব্দুল হক মোহাদ্দেসে দেহলবীর একটা ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ছিলেন বড় ধরনের আলেম ও বুজুর্গ। তিনি কোরআন ও হাদীসের যথার্থ অনুসারী ছিলেন। তিনি প্রতি রাতে স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেখতেন এবং তিনি সহ তাঁর সাহাবী সমভিব্যাহারে সময় কাটাতেন। একথা তিনি ছাড়া আর কেউ জানে না। তখন দিল্লীতে এক বেদআতী দরবেশের আবির্ভাব ঘটে। সে অনৈসলামী কাজ করে ও মদপান করে। সে অনুসারীদেরকে মদপানসহ গুনাহর কাজের আদেশ করে। শেখ আব্দুল হক তাকে দ্বীনের সঠিক দাওয়াত দেন এবং ভণ্ডামী বন্ধের আহ্বান জানান। কিন্তু সে উত্তরে বলে: আব্দুল হক, মদ পান কর, নচেত, যেয়ারত হবে না। তিনি ফকীরের মন্দ আহ্বান ত্যাগ করে ফিরে আসেন। কিন্তু আজ রাতে রাসূলুল্লাহর সাথে স্বপ্নে তাঁর সাক্ষাত হয়নি। কেননা, সে ভণ্ড দরবেশ লাঠি নিয়ে পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং তাঁকে সামনে অগ্রসর হতে দেয় নি। তাঁর ঘুম ভেঙ্গে যায় এবং তিনি অত্যন্ত পেরেশান হন। তিনি পরের দিন আবার দরবেশের কাছে যান এবং তাকে গুনাহ ও বেদআতী কাজ বাদ দিয়ে সঠিক দ্বীন গ্রহণের আহ্বান জানান। কিন্তু আজও তার একই প্রস্তাব। আর তাহল, মদ পান না করলে যেয়ারত হবে না। তিনি আজও তাকে দ্বীনের সঠিক দাওয়াত দিয়ে ফিরে আসেন। কিন্তু আজকে রাতও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। সেই দরবেশ লাঠি হাতে রাস্তায় তাঁকে বাঁধা দিচ্ছে এবং তিনি আজও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাক্ষাত লাভ করতে ব্যর্থ হন। পেরেশান অবস্থায় রাত কাটানোর পর তিনি পরের দিন আবার দরবেশের কাছে গিয়ে তাকে আগের দাওয়াতের পুনরাবৃত্তি করেন। পক্ষান্তরে দরবেশও তার একই আহ্বানের পুনরাবৃত্তি করে। তিনি স্বপ্নে জানতে পারেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাথীদেরকে জিজ্ঞেস করছেন, আব্দুল হকের কি হল? আজ ২ দিন পর্যন্ত সে আমার দরবারে অনুপস্থিত কেন? তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সেই বেদআতী দরবেশের সাথে আব্দুল হকের ঘটনা জানানো হয়। তিনি ঘটনা শুনে দরবেশকে লক্ষ্য করে বলেন, হে কুকুর! রাস্তা ছেড়ে দে। দরবেশ কুকুরের বেশ ধারণ করে রাস্তা থেকে সরে যায়। শেখ আব্দুল হক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-সহ তাঁর সাহাবীদের সাথে সাক্ষাত করেন। রাত শেষ হলে তিনি পরের দিন দরবেশের কাছে যান। কিন্তু দরবেশ ঘরে নেই। তিনি জিজ্ঞেস করেন যে, দরবেশ কোথায়? মুরীদেরা বলে হুজুরতো ঘরেই ছিল। তখন তিনি জিজ্ঞেস করেন, আমি আসার আগে কি ঘর থেকে একটি কুকুর বেরিয়ে গেছে? তারা বলল, "হাঁ।' তিনি বলেন, এটাই ছিল তোমাদের দরবেশ। এ ঘটনা থেকে আমরা শিরক-বিদআতের মারাত্মক পরিণতি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা লাভ করতে পারি।
আমাদের সমাজে ইবাদতের চাইতে বেদআতের পরিমাণ কম নয়। প্রায় সমান সমান। আব্দুল হক মোহাদ্দেসে দেহলবীর ঘটনা আমাদের চোখ খোলার জন্য যথেষ্ট। বেদআতী পীর-ফকীর ও ভণ্ড লোক কিংবা বেদআতী দল ও গোষ্ঠীর যত অলৌকিকতাই থাকুক, তারা যে শয়তানের চেলা, তাতে কোন সন্দেহ থাকা উচিত না। আপাততঃ দৃষ্টিতে কিংবা বাহ্যিকভাবে, বেদআতীর শৌর্য-বীর্য, শক্তি, প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং তার কাছে নগদ লাভের সম্ভাবনা সত্ত্বেও তার কাজকে মন্দ ও ইসলাম বিরোধী ভাবতে হবে। এমনকি তার অনুসারী যত বেশিই হোক না কেন এবং সমাজে তার জয়-জয়াকার যত প্রসারই লাভ করুক না কেন, কোরআন-হাদীসের দৃষ্টিতে তা বেদআত বিধায় তার থেকে দূরে থাকতে হবে এবং এগুলোর নিন্দা করতে হবে।
অনেক বেদআতীর অলৌকিক কাজ তাৎক্ষণিক প্রকাশ পায়। সে ফুঁ দিলে কিংবা স্পর্শ করলেই হয়তো রোগ দূর হয়ে যাচ্ছে, সান্নিধ্য দেয়ার কারণে হয়তো বিপদ শেষ হয়ে গেছে। কারো জন্য হাত উঠানোর সাথে সাথে তার মকসুদ পূরণ হয়ে যাচ্ছে। কেউ হয়তো বেদআতীর কাছে যাওয়া মাত্রই হারানো জিনিস বা চোরাই ও ছিনতাইকৃত জিনিসের সন্ধান পেয়ে যাচ্ছে অথবা গাছের ফল পঁচা বন্ধ হয়েছে এবং ইঁদুরের উপদ্রব শেষ হয়েছে, ফসলের পোকা দূর হয়ে গেছে, খরা ও অনাবৃষ্টির অবসান হয়েছে, বন্ধ্যা স্ত্রী সন্তান লাভ করছে, ব্যবসায়ীর লাভ বেশি হচ্ছে, বেকার চাকরি লাভ করেছে ইত্যাদি। এগুলো সবই বেদআতীর প্রতি শয়তানের সাহায্য-সহযোগিতার ফলে হচ্ছে। মানুষের ঈমান নষ্ট করার লক্ষ্যে বেদআতীর প্রতি মানুষের ভক্তি সৃষ্টির জন্য শয়তান তা আঞ্জাম দিচ্ছে।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন: 'শয়তান শিরক, গুনাহ ও অন্যায়কারীদেরকে পসন্দ করে। এজন্য সে তাদেরকে কোন কোন সময় গায়েবী কিছু কথা শুনায়। যাতে করে তারা নিজেকে খুবই বুজুর্গ মনে করতে পারে। কেননা, গায়েবী জানা সাধারণ লোকের ব্যাপার নয়, বরং বিশেষ লোকের বিষয়। কোন সময় অন্যায়কারী ব্যক্তি কারো ক্ষতি কিংবা কাউকে হত্যা করতে চায় অথবা কারো রোগ কামনা করে তখন শয়তান তা বাস্তবায়িত করে দেয়। এতে করে সে নিজেকে ক্ষতি ও কল্যাণের হোতা বলে অহমিকা বোধ করতে থাকে। কোন সময় সে পাপী ব্যক্তির লক্ষ্যবস্তু হাজির করে দেয়। কোন সময় শয়তান অন্য মানুষের অর্থ-সম্পদ-খাদ্য ও কাপড় চুরি করে তার খেদমতে হাজির করে। তখন তারা এটাকে বুজুর্গ ব্যক্তি হিসেবে নিজ কারামাত বা অলৌকিক কাজ বিবেচনা করে এবং আত্মগর্বে ফুলে উঠে।' কেননা তারা যখন যা ইচ্ছা করে, তাই প্রতিফলিত হয়ে যায়। একথা চিন্তা করে তাদের মাথা ঠিক থাকার কথা নয়।
ইসলামী আদর্শে এ জাতীয় অলৌকিকতার কোন স্থান নেই। কোরআন ও হাদীসে এবং ঈমামগণের পক্ষ থেকে এ জাতীয় গায়েবের সমর্থনে কোন প্রমাণ নেই। এ জাতীয় কাজ করার জন্য আমাদেরকে আদেশ দেয়া হয় নি এবং এগুলোকে ঈমান-ইসলাম কিংবা তাকওয়ার মাপকাঠিও ঘোষণা করা হয় নি। বরং তা শয়তানের গোমরাহীর প্রধান অস্ত্র। এ অস্ত্র দ্বারা যেকোন মুমিনকে কাবু করা শয়তানের জন্য খুব সহজ কাজ। দীনদার লোকদেরকে নতুন নতুন ইবাদত কিংবা বেশি ইবাদতের প্রতি লোভ সৃষ্টির মাধ্যমে শয়তান বেদআতের জন্ম দেয়। ফলে যা নবী (সঃ), সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈ ও তাবয়ে' তাবেঈদের সর্বোত্তম যুগের দীন ছিল না, তা দীনের নতুন অংশ হিসেবে সংযোজিত হয়। বেদআতীরা এর মাধ্যমে বেশি বেশি সওয়াব লাভের চিন্তা করলেও এ বেদআত তাদেরকে দোজখের দিকে নিয়ে যায়। বেদআতের বিরুদ্ধে মহানবী (সঃ) আমাদেরকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন: إِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأَمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةً وَكُلَّ ضَلَالَةٍ فِي النَّارِ.
'সাবধান! তোমরা দ্বীনের মধ্যে নতুন বিষয় সম্পর্কে সতর্ক থাকবে। নিশ্চয়ই সকল নতুন বিষয় বেদআত; সকল বেদআত গোমরাহী এবং সকল গোমরাহী দোজখের দিকে নিয়ে যাবে।' (নাসাঈ) তিনি আরো বলেছেন: مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدَّ.
'যে ব্যক্তি আমাদের এ দীনের অংশ নয়- এমন কোন নতুন জিনিস তাতে যোগ করে- তা বাতিল।' (বোখারী-মুসলিম)
হাদীস দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণ হয়ে গেল, বেদআত হারাম এবং তা মানুষকে কুফরী ও শিরক পর্যন্ত নিয়ে পৌঁছায়। আর এর অনিবার্য পরিণতি দোজখ, বেহেশত নয়।
বেদআতের আরো লক্ষ্য হল, জেহাদের মত কঠিন ইবাদত থেকে পালিয়ে বেড়ানো এবং সস্তায় বেহেশত লাভের চেষ্টা। এ চেষ্টার পেছনে হন্যে হয়ে বেড়ানো লোকের সংখ্যা অনেক বেশি।
বেদআতপন্থীদের আরো কিছু বক্তব্য মশহুর। তারা পানির উপর হাঁটে, আগুন স্পর্শ করলে জ্বলে না এবং আরো অনেক অলৌকিক কাজ করে। তারা বাতাসে ভর করে দূরে কোথাও চলে যায়। শয়তান তাদেরকে এভাবে নিয়ে যায়। এতে করে অনুসারীদের মধ্যে তার প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা অনেক গুণ বেড়ে যায়।
কেউ কেউ হজ্জের দিন মক্কা যায় এবং ফিরে আসে। মুসলমানদের সাথে হজ্জ না করে, এহরাম না পরে, তলবিয়া পাঠ ও তাওয়াফ-সাঈ' না করে ফিরে আসাকে কারামাত বলে জাহির করে। হজ্জের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত এ হতভাগাকে শয়তান এভাবে কানে ধরে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বহন করে নিয়ে যায়। এটা নিঃসন্দেহে বিরাট গোমরাহী।
এ উম্মাহর যে কেউ যদি কোন নবী কিংবা অলীর কবরে সাহায্য চায়, সে সাহায্য পাবে এবং তার মকসুদ পূরণ হবে। এটা যত বড় শিরক ও গোমরাহীই হোক না কেন। অনুরূপভাবে, তাদের অনুপস্থিতিতেও তাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলে, হয় তাদের রূপধারী ব্যক্তিকে দেখতে পাবে নতুবা লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি জিনিস পেয়ে যাবে। হয়তো সে অদৃশ্য ব্যক্তি সামনে নতুন বেশে এসে কথা বলবে এবং নিজ পরিচয়ও দেবে। তারপর বেদআতী ব্যক্তির ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাও পূরণ করবে। সেটি যে শয়তান একথা বুঝার শক্তি এ জাতীয় বোকা ঈমানদারের নেই। সে তো এসব দেখে নিজেকে সবার ঊর্ধ্বে বুজুর্গ ব্যক্তি বলে আত্মতৃপ্তি লাভ করছে। কিন্তু কোরআন-হাদীসের নিয়ম-নীতি এবং আদেশ-নিষেধের বিরোধীতা সত্ত্বেও এ আত্মতৃপ্তি যে বোকার স্বর্গে বাস করার নামান্তর একথা বুঝার তার শক্তি নেই।
সবচাইতে বড় সমস্যা হল অনুসারীদের। তারা এ লোককে বুজুর্গ মনে করে তার খেদমতকে জীবনের বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করে। যদিও বেদআতী ব্যক্তি ফরজ-ওয়াজিব লঙ্ঘন করে এবং হারাম ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকে না। সে বুজুর্গ হওয়াতো দূরের কথা, মুমিন থাকারও প্রশ্ন উঠে না। অলী হওয়ার জন্য ইলম, আমল ও তাকওয়ার প্রয়োজন।
৫. অন্যায় বিচার: আল্লাহ ন্যায় বিচারককে পছন্দ করেন। তিনি বলেছেন: اليْسَ اللَّهُ بِأَحْكَمِ الْحَاكِمِينَ .
"আল্লাহ কি সর্বোত্তম বিচারক নয়?" (সূরা ত্বীন-৮) তিনি আরো বলেছেন : إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِين
"নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফকারীদেরকে ভালবাসেন।" মহান আল্লাহ বলেছেন : اعْدِلُوا هُوَ اقْرَبُ لِلتَّقوى
"তোমরা ন্যায়বিচার কর। তা তাকওয়া অর্জনের জন্য নিকটতর বিষয়।"
হাদীসে এসেছে, ৭ ব্যক্তিকে আল্লাহ হাশরের দিন নিজ আরশের নিচে স্থান দিবেন। তার মধ্যে ন্যায়পরায়ণ শাসকও রয়েছেন। আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ সেইদিন নিজ (আরশের) ছায়াদান করবেন যে দিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না।
১. ন্যায়পরায়ণ শাসক, নেতা ও সরকার ২. আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে গড়ে উঠা যুবক-যুবতী ৩. যে ব্যক্তির মন জামাআতে নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে লেগে থাকে ৪. যে দুই ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে পরস্পরকে ভালবাসে, পরস্পর পরস্পরের সাথে মিলিত হয় এবং শেষে আলাদা হয় ৫. যে ব্যক্তি খারাপ উদ্দেশ্যে সম্ভ্রান্ত ও সুন্দরী নারীর ডাকে এ জবাব দেয়, নিশ্চয়ই আমি আল্লাহকে ভয় করি ৬. যে ব্যক্তি গোপনে দান করে, বাম হাত জানে না ডান হাত কি দান করেছে ৭. যে ব্যক্তি আল্লাহকে নীরবে স্মরণ করে ও দু'চোখ বেয়ে পানি গড়ায়।' -(বোখারী, মুসলিম)
ন্যায়বিচার না করলে সমাজে অন্যায়-জুলুমের পাহাড় সৃষ্টি হবে এবং অরাজকতা ও নৈরাজ্য দেখা দেবে। মূলতঃ শাসক কিংবা বিচারকের ন্যায় ফয়সালার উপরই সমাজের শান্তি ও শৃঙ্খলা নির্ভর করে এবং তখন সমাজে আল্লাহর রহমত বিরাজ করে। পক্ষান্তরে, সে অন্যায় ও জুলুম করলে শয়তান তার সাথী হয় এবং ন্যায়বিচারক হিসেবে সে আল্লাহর পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হয়। এ মর্মে আব্দুল্লাহ বিন আবি আওফা থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: إِنَّ اللَّهَ مَعَ الْقَاضِي مَالَمْ يَجْرُ فَإِذَا جَارَ تَخَلَّى عَنْهُ وَلَزِمَهُ الشيطان .
'নিশ্চয়ই আল্লাহ জুলুম করার আগ পর্যন্ত বিচারকের সাথে থাকেন। যখন সে জুলুম ও অন্যায় করে, তখন আল্লাহ তাকে ছেড়ে দেন এবং শয়তান তার সাথী হয়।' (তিরমিজী)
৬. জন্ম ও মৃত্যুতে শয়তানের ওয়াসওয়াসা : শয়তান মানব শিশুর জন্মের প্রথম লগ্নেই নিজ তৎপরতা শুরু করে। ১ম মুহূর্তেই সে শয়তানের গোমরাহী ও ক্ষতির টার্গেট হয়। এ মর্মে আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: مَا مِنْ بَنِي آدَمَ مَوْلُودٌ إِلَّا يَمُسُّهُ الشَّيْطَانُ حِيْنَ يَوْلَدُ فَيَسْتَهِلَ صَارِخًا مِّنْ مَّسَ الشَّيْطَانِ غَيْرَ مَرْيَمَ وَابْنِهَا .
'কোন মানব সন্তান এমন নেই, যাকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর শয়তান স্পর্শ করেনি এবং সে শয়তানের স্পর্শ দ্বারা চিৎকার করে নি। একমাত্র মরিয়ম ও তাঁর ছেলে ঈসা এর ব্যতিক্রম।' এরপর আবু হোরায়রা বলেন: তুমি ইচ্ছা করলে এ আয়াতটি পড়তে পার:
وَإِنِّي أُعِيذُهَا بِكَ وَذُرِّيَّتَهَا مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ .
"নিশ্চয়ই আমি তোমার কাছে অভিশপ্ত শয়তান থেকে তার (মরিয়ম) ও তার সন্তানের আশ্রয় প্রার্থনা করি।" এ দোআর কবুল হওয়ার কারণে আল্লাহ মরিয়ম তনয়কে শয়তানের খোঁচা থেকে রক্ষা করেছেন।
আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে আরো বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: كُلُّ بَنِي آدَمَ يَطْعَنَ الشَّيْطَانُ فِي جِنْبَيْهِ بِإِصْبَعِهِ حِيْنَ يُولَدُ غَيْرَ عِيسَى بْنَ مَرْيَمَ ذَهَبَ يَطْعَنَ فَطَعَنَ فِي الْحِجَابِ .
'শয়তান সকল আদম সন্তানকে জন্মের পর আঙ্গুল দিয়ে তার দুই পাঁজরে খোঁচা মারে। মরিয়ম পুত্র ঈসা (আঃ) এর ব্যতিক্রম। শয়তান তাকে খোঁচা মারতে গিয়েছিল। খোঁচাটি পড়েছিল পর্দার মধ্যে।' (বোখারী)
কিন্তু ইমাম নওয়ী মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, কাজী আয়াদ বলেছেন, অন্যান্য সকল নবী হযরত ঈসা (আঃ)-এর মত উক্ত বৈশিষ্ট্যের সমান অংশীদার ছিলেন।
এত গেল ভূমিষ্ঠ হবার পর শয়তানের আক্রমণ। এরপর শয়তান ব্যক্তির সারাজীবনে ওয়াসওয়াসা দেয় ও বিভ্রান্তির চেষ্টা চালায়। ব্যক্তিকে আল্লাহর নাফরমানী ও গুনাহর সাগরে নিমজ্জিত করে। মৃত্যু শয্যায় মুমিন ব্যক্তি 'শেষ ফল ভাল যার, সে সফল' এ নীতির উপর আমল করার লক্ষ্যে যখন তওবা-এস্তেগফার করে ও মৃত্যুর জন্য তৈরি হয়, তখন শয়তান সর্বশেষ মারাত্মক আক্রমণ চালায়। ঈমান নষ্ট করার জন্য শয়তানের মারাত্মক চক্রান্ত শুরু হয়। আল্লাহর রহমত পেলে সে চক্রান্ত প্রতিহত করা সম্ভব।
হাদীসে এসেছে, মহানবী (সঃ) বলেছেন: "কোন ব্যক্তির মৃত্যু উপস্থিত হলে শয়তান এসে তার কাছে বসে। ডানদিকের শয়তান রোগির বাপের চেহারায় আবির্ভূত হয়ে বলে: 'হে আমার প্রিয় সন্তান! আমি তোমাকে অনেক ভালবাসতাম। তুমি খ্রিষ্টানধর্মের উপর মৃত্যুবরণ কর। এটা সর্বোত্তম ধর্ম।'
পক্ষান্তরে, বামদিকের শয়তান রোগির মায়ের চেহারায় আবির্ভূত হয়ে বলে: "আমার প্রিয় সন্তান! আমার পেট ছিল তোমার থাকার জায়গা, আমার দুধ ছিল তোমার পানীয় বরং আমার উরু ছিল তোমার বিছানা। তুমি ইহুদী ধর্মের উপর মৃত্যুবরণ কর। সেটা সর্বোত্তম ধর্ম।"
আব্দুল্লাহ বিন আহমদ 'খাওয়ায়েদ আয-যোহদ' কিতাবে আব্দুল আযীয বিন রাফী' থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: মুমিনের রূহ আসমানে নেয়া হলে ফেরেশতারা বলেন: 'আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করছি যিনি তাঁর এ বান্দাহকে অভিশপ্ত শয়তান থেকে মুক্তি দিয়েছেন। আশ্চর্য যে সে নাজাত পেয়েছে! ১...
ওয়াসেলা বিন আসকা' থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'তোমরা তোমাদের মৃত্যু আসন্ন ব্যক্তির কাছে হাজির থাক, তাদেরকে কালেমা 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' শিক্ষা দাও এবং তাদেরকে বেহেশতের সুসংবাদ দাও। কেননা, অত্যন্ত বিজ্ঞ ব্যক্তিরাও সে সময় পেরেশান হয়ে যায়। নিশ্চয়ই শয়তান ঐ মুমূর্ষ অবস্থায় আদম সন্তানের সর্বাধিক নিকটে অবস্থান করে।' যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ করে বলছি মৃত্যুর ফেরেশতাকে একবার দেখা হাজার বার তলোয়ারের আঘাত অপেক্ষা অধিক কষ্টকর।' ২
ইবনু আবু হাতেম জা'ফর বিন মোহাম্মদ থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি জানতে পেরেছি, নামাজের সময় হলে মৃত্যুর ফেরেশতা মানুষকে সাহায্য করে। তিনি তখন তার মৃত্যুর সময়ের দিকে তাকান এবং যদি দেখেন যে, ঐ ব্যক্তি নিয়মিত নামাজ পড়ে তাহলে, তিনি তার কাছে যান, তার থেকে শয়তানকে তাড়ান এবং তাকে কালেমা উচ্চারণ করতে সাহায্য করেন।
আল্লামা কোরতুবী আবুল হাসান আলকাবেসীসহ অন্যান্যদের কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন; মৃত্যু আসন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। ইবলিশ ঐ ব্যক্তির কাছে নিজ সাথীদেরকে লাগিয়ে রাখে। তারা ঐ সময় তাঁর কাছে আসে এবং দুনিয়ায় তার হিতাকাঙ্খী মৃত লোক যেমন, মা-বাপ, ভাই-বোন ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুর আকৃতিতে হাজির হয়ে বলে, আমরা আগে মৃত্যুবরণ করেছি। আর তুমি এখন মরতে যাচ্ছ। তুমি ইহুদী ধর্মের উপর মৃত্যুবরণ কর। সেটা আল্লাহর মনোনীত দীন। যদি সে তা অস্বীকার করে তখন তার কাছে অন্য একদল আসে এবং বলে: তুমি খ্রিস্টান হয়ে মর। কেননা, ঈসা (আঃ)-এর মাধ্যমে মূসা (আঃ)-এর দীনকে রহিত করা হয়েছে। তারা তার কাছে সকল মিল্লাতের আকীদা বিশ্বাস পেশ করবে। এর ফলে অনেক লোক গোমরাহ হবে এবং ঈমানসহকারে মৃত্যুবরণ করতে পারবে না। এটা একজন মুমিনের জন্য বিরাট দুঃখজনক বিষয়। এ অবস্থায় সাফল্যের জন্য আল্লাহর কাছে দোআ চাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। আল্লাহ নিজেই সে দোআ শিক্ষা দিয়েছেন। দোআটি হচ্ছে:
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً.
"হে আমাদের রব! আমাদের অন্তরকে হেদায়েত করার পর পুনরায় গোমরাহ করোনা, এবং তোমার পক্ষ থেকে রহমত নাজিল কর।" -(সূরা আলে-ইমরান-৮)
এ দোআ কবুল হলে মৃত্যুর সে কঠোর পরীক্ষার সময় আল্লাহ রহমত পাঠান এবং মুমিন বান্দাহ সকল কিছু বাদ দিয়ে কালেমা 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু' পড়ে শয়তানকে ব্যর্থ করে দেন। কারো মতে, আল্লাহ জিবরীল (আঃ)-কে পাঠান। তিনি শয়তানকে তাড়িয়ে দিয়ে মুমিনকে বিপদমুক্ত করেন। শুধু তাই নয়, তিনি মুমূর্ষ ব্যক্তির মুখের কালিমা মুছে দেন। তখন মুর্দারের চোখে-মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠে। তিনি তখন নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, আমি জিবরীল। তুমি ঈমান ও ইসলামী শরীয়ার উপর মৃত্যুবরণ কর। তখন ঐ ব্যক্তির কাছে জিবরীলের মত এত আনন্দদায়ক আর কোন কিছু হতে পারে না। এরপর তার রূহ হরণ করা হয়। ১.
জিবরীল হচ্ছেন রহমতের ফেরেশতা। আল্লাহর রহমত নাযিলের উদ্দেশ্যে দোআর মধ্যে জিবরীলের আগমন অন্যতম রহমত।
৭. নামাজ নষ্ট করাঃ
নামাজ ইসলামের অন্যতম খুঁটি এবং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য তা হচ্ছে মুমিনের মে'রাজ। অপরদিকে, নামাজের সর্বাধিক প্রিয় বিষয় হচ্ছে সাজদা। শয়তান সে সাজদাকে অত্যন্ত ভয় পায়। সেজন্য সে মুমিনের নামাজ নষ্টের জন্য মরিয়া হয়ে উঠে।
আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: إِذَا قَرَءَ ابْنُ أَدَمَ السِّجْدَةَ فَسَجَدَ اعْتَزَلَ الشَّيْطَانُ يَبْكِي يَقُولُ يَا وَيْلَهُ أُمِرَ ابْنَ أَدَمَ بِالسُّجُودِ فَسَجَدَ فَلَهُ الْجَنَّةُ وَأُمِرْتُ بالسُّجُودِ فَعَصَيْتُ فَلِيَ النَّارُ .
'যখন আদম সন্তান সাজদার আয়াত তেলাওয়াত করে, সাজদা করে; তখন শয়তান কাঁদতে কাঁদতে আলাদা হয়ে যায় এবং বলে: আমার ধ্বংস! আদম সন্তানকে সেজদার আদেশ দেয়া হয়েছে, সে সেজদা করেছে। তার জন্য রয়েছে বেহেশত। আর আমাকে সাজদার জন্য আদেশ করা হয়েছিল, আমি তা অমান্য করেছি। আমার জন্য রয়েছে দোজখ।' (মুসলিম, আহমদ, ইবনু মাজাহ)।
আবু নাঈম বর্ণনা করেছেন। নবী (সঃ) বলেছেন: কোন মুমিন ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে থাকলে শয়তান ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। সে নামাজ ছেড়ে দিলে শয়তান তার উপর সওয়ার হয়, তাকে দিয়ে বড় বড় গুনাহর কাজ করা ও এর প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করে।'১.
ওবাইদুল্লাহ বিন মোকসেম থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'তুমি শয়তানকে অভিশাপ দিলে সে বলে, তুমি অভিশপ্তকেই অভিশাপ দিয়েছ। আর তুমি শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাইলে সে বলে: তুমি আমার পিঠ কেটে দিয়েছ। তুমি যখন সাজদা কর, তখন সে বলে: আমার ধ্বংস! আদম সন্তানকে সাজদার আদেশ দেয়ায় সে হুকুম মান্য করেছে। আর শয়তানকে সাজদার আদেশ দেয়ায় সে তা অমান্য করেছে। আদম সন্তানের জন্য বেহেশত আর শয়তানের জন্য রয়েছে দোজখ।' (ইবনু আবিদ দুনিয়া)
শয়তান নামাজের মত শ্রেষ্ঠ ইবাদতকে বরবাদ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। সেজন্য সে মুসল্লীকে ওয়াসওয়াসা দেয় এবং নামাজ ভুলিয়ে দেয়। প্রায় সময় রাকাত সংখ্যা এবং রুকু-সাজদা ও কেরাতের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করে। এ সংকট থেকে বাঁচতে না পারলে নামাজ সুষ্ঠুভাবে আদায় করা সম্ভব হবে না। এ মর্মে হাদীস রয়েছে।
ওসমান বিন আবুল আ'স (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল! শয়তান আমার ও আমার নামাজের মধ্যে বাধা সৃষ্টি করে এবং আমার কেরাআতে ভুলভ্রান্তি ঘটায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন: এটা হচ্ছে শয়তান, এর নাম হচ্ছে খেনযাব। তুমি যখন শয়তানের ওয়াসওয়াসা অনুভব করবে, তখন তিনবার আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবে, অর্থাৎ 'আউজু বিল্লাহ' পড়বে এবং বামদিকে তিনবার (হালকা) থুথু নিক্ষেপ করবে। ওসমান বলেন, আমি ঐ রকম করি এবং আল্লাহ আমার কাছ থেকে শয়তানকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন।' (মুসলিম, আহমদ) এভাবেই নামাজকে ঠিক করতে হবে।
এ হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম নওয়ী বলেছেন, ওয়াসওয়াসার সময় শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়া এবং বামদিকে তিনবার থুথু নিক্ষেপ করা মোস্তাহাব। আন-নেহায়া গ্রন্থে উল্লেখ আছে, এখানে থুথু বলতে 'ফুঁ' বুঝানো হয়েছে, যাতে মাত্র থুথুর বিন্দু থাকবে।
নামাজে শয়তানের অবাধ আচরণ রয়েছে। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথেও একবার এরূপ ঘটনা ঘটেছে। আবু দারদা থেকে বর্ণিত। একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামাজ পড়ার জন্য দাঁড়ান। আমরা শুনতে পেলাম তিনি 'আউজু বিল্লাহ মিল্কা' এবং 'উলয়ে 'নুকা বিলা'নাতিল্লাহি' তিনবার বলেন। তারপর যেন কোন কিছু ধরার জন্য হাত বাড়ান। তিনি যখন নামাজ শেষ করেন, তখন আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনাকে আজ এমন কিছু পড়তে শুনলাম যা আগে কখনো শুনিনি। আমরা আপনাকে কোন কিছু ধরতে যাচ্ছেন বলে দেখতে পেলাম। তিনি উত্তরে বলেন, আল্লাহর দুশমন ইবলিশ আমার মুখে আগুন নিক্ষেপের জন্য এসেছিল। তখন আমি ৩ বার 'আউজু বিল্লাহ' বললাম। কিন্তু সে সরে না। তারপর আমি তিনবার বললাম, 'উলয়ে 'নুকা বিলা'নাতিল্লাহিত তাম্মাহ।' তাতেও সে সরে না। তারপর আমি তাকে ধরে ফেলতে চেয়েছিলাম। আল্লাহর শপথ, আমার ভাই নবী সোলায়মান (আঃ)-এর বিশেষ দোআ না থাকলে আমি তাকে বেঁধে রাখতাম এবং মদীনার শিশুরা তাকে দিয়ে তামাশা করত।' -(মুসলিম, নাসাঈ)
আহমদ ও দারু কোতনীর বর্ণনায় এভাবে এসেছে: 'একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফরজ নামাজ পড়ার সময় নিজ হাত একসাথে মিলান। তাঁর নামাজ শেষে সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল! নামাজে কি কিছু ঘটেছে? তিনি বলেন, না। তবে, শয়তান আমার নামাজের সামনে দিয়ে অতিক্রম করতে চাচ্ছিল। আমি তার গলা টিপে ধরি এবং হাতে তার জিহ্বার শীতলতা অনুভব করি। আল্লাহর কসম, যদি এ ব্যাপারে আমার ভাই নবী সোলায়মান (আঃ) আমার অগ্রগামী না হতেন, তাহলে আমি তাকে মসজিদের একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখতাম এবং মদীনার শিশুরা তাকে দেখার জন্য চক্কর লাগাত। কেউ যদি চায় যে, কেবলা ও তার মাঝে কোন বাধা সৃষ্টি না হোক, তাহলে, সক্ষম হলে সে যেন অনুরূপ বাধাদান করে।'
উভয় হাদীসেই নবী (সঃ)-এর কাছে শয়তানের উপস্থিতি ও নামাজে ব্যাঘাত সৃষ্টির চেষ্টার কথা উল্লেখ আছে। আল্লাহ মহানবীকে হেফাজত করেছেন। মোসনাদে আহমদের এক বর্ণনায় এসেছে, মহানবী (সঃ)-এর ফজরের নামাজে শয়তান কেরাত বিভ্রাট ঘটায়। তিনি শয়তানের গলা টিপে ধরেন। এতে শয়তানের জিহ্বা বেরিয়ে আসে এবং তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলী ও তর্জনীর মধ্যে শয়তানের জিহ্বার লালার আর্দ্রতা অনুভূত হয়। দুই ধরনের বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, সম্ভবতঃ শয়তানের সাথে এরূপ ঘটনা দু'বার ঘটেছিল। হযরত সোলায়মান (আঃ) আল্লাহর কাছে দোআ করেছিলেন,
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَهَبْ لِي مُلْكًا لَا يَنْبَغِي لِأَحَدٍ مِنْ بَعْدِي .
"হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করুন এবং এমন রাজত্ব দান করুন যা আমার পরে আর কেউ লাভ করতে পারবে না।” (সূরা সোয়াদ-৩৫)
সোলায়মান (আঃ) মানুষ ও জিনসহ সকল সৃষ্টির উপর ক্ষমতাবান ছিলেন। সে কারণে মহানবী (সঃ) শয়তানকে ধরে রাখেন নি। কেননা, তা সোলায়মান (আঃ)-এর কবুল দোআর ভিত্তিতে প্রাপ্য রাজত্বের উপর ভাগ বসানোর নামান্তর।
নামাজের কাতার খালি থাকলে শয়তান তাতে অনুপ্রবেশ করে এবং মুসল্লীদের নামাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। সেজন্য কাতারে কোন শূন্যতা রাখা যাবে না। এ মর্মে মহানবী (সঃ) বলেছেন: 'তোমরা কাতার সোজা কর, ঘেঁষে দাঁড়াও এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সোজা হও। যে সত্ত্বার হাতে মোহাম্মদের প্রাণ তাঁর শপথ করে বলছি, আমি শয়তানকে নামাজের কাতারে খালি স্থানে ছোট কাল বকরীর ন্যায় প্রবেশ করতে দেখতে পাই।' (আহমদ)
শয়তানের প্রবেশ পথগুলো বন্ধ করে দিলে তার ওয়াসওয়াসা অবশ্যই কমে আসবে।
সাফওয়ান বিন সোলাইম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: মদীনাবাসীরা বলে থাকেন যে, ফেরেশতাগণ কর্তৃক গোসলদানকৃত হানজালা বিন আমেরের ছেলে আব্দুল্লাহ মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর শয়তানের সাক্ষাত পান। শয়তান জিজ্ঞেস করে, হে ইবনে হানজালা! তুমি আমাকে চিনতে পারছ? আব্দুল্লাহ উত্তরে বলেন, হাঁ, তুমি শয়তান। শয়তান প্রশ্ন করল : তুমি কি করে তা জানতে পারলে? তিনি জবাবে বলেন, আমি মসজিদ থেকে বের হবার পর আল্লাহর জিকর করছিলাম। তোমার দিকে তাকানোর পর আমি তা থেকে বিরত হই। তখন আমি বুঝতে পারি, তুমি অবশ্যই শয়তান হবে। শয়তান বলে, হে ইবনে হানজালা, তুমি যথার্থই বুঝেছ.....।' (ইবনু আবিদ দুনিয়া)
এ ঘটনা থেকে এটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, যে জিনিস বা বস্তু আল্লাহর স্মরণ থেকে ফিরিয়ে রাখে, তাতে অবশ্যই শয়তানের হাত রয়েছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমাদেরকে খতিয়ে দেখতে হবে, কোন্ কোন্ জিনিস আমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে ফিরিয়ে রাখে। সেগুলো পরিহার করা হয়তো কষ্ট হবে, কিন্তু অসম্ভব হবে না। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি বিনা কষ্টে আসতে পারে না।
৮. এল্ম বা জ্ঞানের অভাবে শয়তানের ওয়াসওয়াসার আধিক্য: দীনি এল্ম থাকলে শয়তানের প্ররোচনার উপর বিজয়ী হওয়া যায়। কিন্তু তা না থাকলে যত বেশি ইবাদতই করুক না কেন, শয়তানের ষড়যন্ত্রের কাছে হার মানতে হয়। জ্ঞান ও এল্মবিহীন ইবাদতকারী শয়তান থেকে রক্ষা পাওয়া কষ্টকর। এজন্য সবাইকে দীনি জ্ঞান অর্জন করতে হবে। এ মর্মে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন:
فَقِيهُ وَاحِدٌ أَشَدُّ عَلَى الشَّيْطَانِ مِنْ أَلْفِ عَابِدٍ .
'দীনি জ্ঞান ও বুঝের অধিকারী একজন ব্যক্তি শয়তানের উপর এক হাজার (এল্মহীন) ইবাদতকারীর চাইতেও আরো বেশি কঠিন।' (তিরমিজী)
এ মর্মে একটি চমৎকার ঘটনা বর্ণিত আছে। আলী বিন আসেম বসরার জনৈক ব্যক্তির বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন, সেখানে ছিল এক আলেম এবং এক আবেদ। দুই জনের মধ্যে ছিল অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব। শয়তানরা ইবলিশকে গিয়ে বললঃ আমরা এ দু'জনকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করতে অক্ষম। ইবলিশ বলল, ঠিক আছে আমিই তা করব। সে আবেদের পথে অপেক্ষা করতে থাকল। আবেদ ব্যক্তি যখন ইবলিশের কাছে আসল তখন ইবলিশ এক বিরাট বুজুর্গের বেশে আবির্ভূত হল। তার দুচোখের মাঝে ছিল সাজদার চিহ্ন। ইবলিশ আনন্দে ব্যক্তিকে বলল, আমার মনে একটা প্রশ্ন জেগেছে। আমি আপনাকে প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করতে চাই। আবেদ ব্যক্তিটি বলল ঠিক আছে, বলুন। যদি আমার জানা থাকে তাহলে আমি উত্তর দেব। প্রশ্নটি হল, আল্লাহ কি আসমান-জমীন, পাহাড়-পর্বত এবং পানি রাশিকে একটা ডিমের মধ্যে ঢুকাতে পারবে? শর্ত হল ডিমটাকে বড় কিংবা ছোট করা যাবে না, অর্থাৎ যেভাবে আছে ঠিক সেভাবেই থাকবে। আবেদ ব্যক্তি অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে রইল। ইবলশি বলল ঠিক আছে, আপনি যান। তারপর সে নিজ সাথীদেরকে লক্ষ্য করে বলল: আমি আবেদ ব্যক্তিকে শেষ করে দিয়েছি এবং আল্লাহর ব্যাপারে তাকে সন্দিহান করে তুলেছি। তারপর ইবলিশ আলেম ব্যক্তির অপেক্ষা করতে থাকল। আলেম ব্যক্তিটি আসার পর ইবলিশ তাকে একই প্রশ্ন করল। আলেম ব্যক্তিটি বলল, 'হাঁ', আল্লাহ পারবেন, 'ইবলিশ এ উত্তর শুনে তা অস্বীকার করার ভঙ্গীতে পুনরায় বলল, কোন কিছু বেশ-কম করা ছাড়াই পারবে? আলেম ব্যক্তিটি শেষ পর্যায়ে ‘হাঁ’ বলে এ আয়াতটি পড়ল: إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ .
"আল্লাহর শান হচ্ছে, তিনি যখন কোন কিছু করার ইচ্ছা পোষণ করেন তখন বলেন : হয়ে যা; তখন তা হয়ে যায়।" (সূরা ইয়াসিন-৮২)
ইবলিশ তার সাথীদেরকে বলল : তোমরা তো আগে আলেমের কাছেই এসেছিলে। (ইবনু আবিদ দুনিয়া) আল্লাহর পক্ষে কোন কিছুই অসাধ্য নয়। তিনি বিন্দু থেকে সিন্ধু এবং এর বিপরীত সৃষ্টি করতে সক্ষম।
শয়তানের দল আগে আলেম ব্যক্তির কাছে এসে ব্যর্থ হয়েছে। ইবলিশের পদ্ধতিতে আগে আবেদের কাছে গেলে তাদের দু'জনের মধ্যকার ঈমানী ঐক্য ও সখ্যতা ভাংতে সক্ষম হত।
আলেম ব্যক্তিকে শয়তান ভয় পায়। কেননা, সে ওয়াসওয়াসা দিয়ে কোন কিছু বেঠিক করে দিলেও আলেম ব্যক্তি দীনি এল্ম দ্বারা তা পুনরায় সংশোধন করে নেবেন। শয়তান থেকে বাঁচার জন্য দীনি জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।' এ মর্মে আরেকটি 'চিত্তাকর্ষক' ঘটনা বর্ণিত আছে। একদা এক ব্যক্তি মসজিদে নামাজ পড়ছে। শয়তান তার নামাজ ভাঙ্গার জন্য ঘুরাফেরা করছে, কিন্তু নামাজ নষ্ট করছে না। মসজিদের এক পার্শ্বে এক আলেম ব্যক্তি ঘুমিয়েছিল। হঠাৎ করে তাঁর ঘুম ভেঙ্গে গেল। তিনি শয়তানকে পেরেশান হয়ে ইতস্ততঃ করতে দেখে জিজ্ঞেস করেন, তোমার কি হল? সে বলল, আমি লোকটির নামাজ ভঙ্গ করতে চাই। কিন্তু পারছি না। আলেম ব্যক্তি বললেন : কেন? শয়তান উত্তরে বলে, আপনি পার্শ্বে শোয়া আছেন সেজন্য আমি পারছি না। আমি নামাজ ভাঙ্গলে আপনি আবার মাসলা বাতলিয়ে ঠিক করে দেবেন। ফলে আমার পশুশ্রম হবে। তখন نَوْمُ الْعَالِمِ خَيْرٌ مِنْ عِبَادَةِ الْجَاهِلِ (আলেমের ঘুম মূর্খের ইবাদতের চেয়ে উত্তম।) কেউ কেউ এটিকে হাদীস এবং ঘটনাকে রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে সংশ্লিষ্ট করে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজেই শয়তানকে ইতস্ততঃ ঘুরতে দেখে প্রশ্ন করেন।
৯. শয়তান খানার বরকত কেড়ে নেয় : খাবারের মালিক হচ্ছেন আল্লাহ। তিনিই মানুষকে খাওয়ান। খাওয়ার মধ্যে রয়েছে বরকত। তিনি বরকতেরও মালিক। কিন্তু শয়তান মানুষকে আল্লাহর এ মহান নেয়ামত থেকে বঞ্চিত করতে আগ্রহী। একদিকে সে নেক কাজ করলে • অভাব ও দারিদ্র্যের ভয় দেখায়, অন্যদিকে, খাবারের বরকত তুলে নিয়েও এক ধরনের অভাব সৃষ্টি করে। তাই বিসমিল্লাহ বলে খাওয়া শুরু করতে হবে। শুরুতে বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে গেলে মাঝখানে বা শেষে মনে পড়লে তখন বলতে হবে 'বিসমিল্লাহি আউয়ালাহু ওয়া আখেরাহু।'
বিসমিল্লাহ না পড়লে শয়তান খাওয়ায় অংশ নেয় এবং তাতে খাওয়ার বরকত কমে যায়। এ মর্মে হোজায়ফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ 'আমরা কখনো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে খানায় একত্রিত হলে, তিনি যতক্ষণ পর্যন্ত খানা শুরু না করতেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা খানায় আগে হাত দিতাম না। একবারের ঘটনা। আমরা সবাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে খানা খেতে বসেছি। এমন সময় একটি মেয়ে এসে হাজির। সে এমনভাবে খানার উপর ঝুঁকে পড়ল (যেন সে ক্ষুধায় অত্যন্ত কাতর) সে খাবারে হাত রাখতে যাচ্ছিল। অমনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার হাত ধরে ফেললেন। তারপর এক বেদুইন আসল। সেও যেন খাবারের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার হাতও ধরে ফেললেন। তারপর রাসূলূল্লাহ (সঃ) বললেন: যে খাদ্যের উপর আল্লাহর নাম নেয়া হয় না শয়তান একে (নিজের জন্য) হালাল করে নেয়। শয়তান এ মেয়েটিকে নিয়ে এসেছিল এর দ্বারা তার নিজের জন্য খাদ্যকে হালাল করার জন্য। আমি তার হাত ধরে ফেললাম। তারপর শয়তান এ বেদুইনকে নিয়ে আসে, এর সাহায্যে তার নিজের জন্য খাদ্য হালাল করার উদ্দেশ্যে। আমি তারও হাত ধরে ফেললাম। যে সত্ত্বার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ করে বলছি: এ দু'জনের হাতের সাথে শয়তানের হাত ও আমার হাতের মধ্যে (মুষ্ঠিবদ্ধ) আছে। তারপর তিনি আল্লাহর নাম নিয়ে খানা খেলেন।' (মুসলিম)
জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী (সঃ) বলেছেন: 'শয়তান তোমাদের খাওয়াসহ সকল কাজে হাজির হয়। তোমাদের কারো খাবার নিচে পড়ে গেলে সে যেন ময়লা পরিষ্কার করে তা খেয়ে নেয় এবং শয়তানের জন্য ফেলে না রাখে। খানা শেষ হলে যেন আঙ্গুল চেটে খায়। সে জানে না কোন্ খাদ্যটুকুতে বরকত রয়েছে।' (মুসলিম, তিরমিজী)
বিসমিল্লাহ শয়তানের বিরুদ্ধে এক মারাত্মক অস্ত্র। তাতে সে কাবু হয়ে যায়। উমাইয়াহ বিন মাখশী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বসা ছিলেন। এক লোক বিসমিল্লাহ না বলেই খানা খাচ্ছিল। তার খানা শেষ হতে তখন মাত্র এক লোকমা বাকি। এ শেষ লোকমাটি মুখে তুলে দেয়ার সময় সে বলল: 'বিসমিল্লাহি আউয়ালাহু ওয়া আখেরাহু'। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেসে দিলেন। তিনি বললেন: শয়তানও তার সাথে খানা খাচ্ছিল। বিসমিল্লাহ বলামাত্র যা কিছু শয়তানের পেটে ছিল, সব বমি করে ফেলে দিল।' (আবু দাউদ, নাসাঈ)
জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেছেন: 'যখন কোন লোক ঘরে প্রবেশের সময় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং খানা খেতেও আল্লাহকে স্মরণ করে তখন শয়তান তার সাথীদেরকে বলে: চল, তোমাদের জন্য এ ঘরে রাত কাটানোর অবকাশ এবং খাওয়ার সুযোগ নেই। আর যখন সে আল্লাহর নাম না নিয়েই ঘরে প্রবেশ করে, তখন শয়তান বলে: তোমাদের রাতে থাকার জায়গার ব্যবস্থা হয়ে গেল। খানা খাওয়ার সময় আল্লাহর নাম না নিলে শয়তান বলে: যাক, তোমাদের থাকার ও খাওয়ার উভয়টারই ব্যবস্থা হয়ে গেল।' (মুসলিম)
এজন্য আমাদের উচিত, ঘরে প্রবেশ ও ঘর থেকে বের হওয়ার দোআ পড়া এবং খাওয়ার সময় বিসমিল্লাহ বলে খাওয়া শুরু করা। এতে করে আমরা শয়তানের অকল্যাণ থেকে রক্ষা পেতে পারি।
১০. শয়নে-স্বপনে শয়তানের অবাধ বিচরণ:
শয়তান যেমন মানুষকে জাগ্রত অবস্থায় সর্বদাই বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। তেমনি ঘুমের মধ্যেও মুমিনকে কষ্ট না দিয়ে ছাড়ে না। খারাপ স্বপ্ন দেখলে ঘুমের মধ্যে যে কষ্ট হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অনেকে কাঁদে, অনেকে চিৎকার দিয়ে উঠে, কারো মানসিক যন্ত্রণা হাজারগুণ বেড়ে যায়। মিথ্যা স্বপ্ন শয়তানের অন্যতম অস্ত্র। মহানবী (সঃ) খারাপ স্বপ্ন থেকে বাঁচার উপায় বাতলিয়ে দিয়েছেন।
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি নবী করীম (সঃ)-কে বলতে শুনেছেন: 'তোমাদের কেউ যখন এমন কোন স্বপ্ন দেখে যা সে ভালবাসে, তখন সেটা হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে। এ সময় তার এজন্য আল্লাহর প্রশংসা করা এবং বন্ধুদের কাছে তা বর্ণনা করা উচিত। অন্য এক বর্ণনায় বলা হয়েছে: তখন সে যাকে ভালবাসে তাকে ছাড়া আর কাউকে সেটা বলা উচিত নয়।
এছাড়া যদি এমন কোন জিনিসের স্বপ্ন দেখে যা সে অপসন্দ করে, তাহলে, এটা হয় শয়তানের পক্ষ থেকে। এমতাবস্থায় তার ক্ষতি থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া এবং কারো কাছে তা বর্ণনা করা উচিত। তাহলে, এ স্বপ্ন তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।' (বোখারী, মুসলিম)
আরেক হাদীসে এসেছে। আবু কাতাদাহ থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'ভাল স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে হয় আর খারাপ স্বপ্ন হয় শয়তানের পক্ষ থেকে। কাজেই কেউ যদি এমন কিছু স্বপ্নে দেখে যা সে অপসন্দ করে, তাহলে সে যেন বামদিকে তিনবার ফুঁ দেয় এবং শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চায়। তাহলে, এ স্বপ্ন তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। (বোখারী, মুসলিম) মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় এসেছে 'সে যেন পাশ বদলিয়ে শোয়।'
মুসলমান ঘুমালে শয়তান তার মাথায় গিরা লাগায় যেন ঘুম দীর্ঘ হয় এবং তাহাজ্জুদসহ ফজরের নামাজ পড়তে না পারে। এ মর্মে আৰু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'তোমরা ঘুমালে শয়তান তোমাদের মাথার কাছে তিনটি গিরা লাগায়। শয়তান বলে রাত আরো বাকি আছে, তুমি ঘুমাতে থাক। তারপর সে যদি জেগে আল্লাহকে স্মরণ করে তাহলে, একটি গিরা খুলে যায়। অজু করলে আরেকটি গিরা খুলে যায়। নামাজ পড়লে সর্বশেষ গিরাটিও খুলে যায়। তারপর সে উত্তম মনের অধিকারী ও কর্মমুখর হয়। অন্যথায় সে হবে নিকৃষ্ট মনের অধিকারী ও অলস।' (বোখারী, মুসলিম)
: আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'নবী করীম (সঃ)-এর কাছে এমন ব্যক্তির উল্লেখ করা হল, যে ফজরের নামাজের সময় শেষ হয়ে গেল, তথাপি ঘুম থেকে জাগে নি। নবী (সঃ) বলেন, শয়তান তার কানে পেশাব করে দিয়েছে।' (বোখারী, মুসলিম)
এ সকল হাদীস দ্বারা বুঝা যায়, শয়তান কাউকে জোর করে বা শক্তি প্রয়োগ করে পাপকাজে বাধ্য করে না। সে শুধুমাত্র ওয়াসওয়াসা দেয়। মুমিন ব্যক্তির ঈমানী চেতনা, দৃঢ়তা, জোরদার মনোবল ও ভাল কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ শক্তি দ্বারা শয়তানের সকল অপকর্ম নস্যাত করে দেয়া যায়।
শয়তানকে ব্যর্থ করে দেয়ার লক্ষ্যে হযরত ওমার বিন খাত্তাব বলেছেন: 'তোমরা দুপুরে বিশ্রাম নেবে ও ঘুমাবে। শয়তান দুপুরে ঘুমায় না।'১
১১. নামাজে হাই তোলা ও হাঁচি দেয়া :
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: 'নামাজে হাই তোলা, হাঁচি দেয়া শয়তানী ওয়াসওয়াসা।' (ইবনু আবি শাবা ও তাবরানী)
দীনার থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'নামাজে হাঁচি, তন্দ্রা ও হাই তোলা এবং স্ত্রীলোকের মাসিক, বমি ও নাকের রক্তক্ষরণ শয়তান থেকে হয়।' (তিরমিজী)
আব্দুর রহমান বিন ইয়াযীজ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: 'আমাকে জানানো হয়েছে যে, শয়তানের ১টি বোতল আছে, নামাজে মুসল্লীরা সে বোতলের ঘ্রাণ নেয় যেন তারা হাই তোলে।' (ইবনু আবি শায়েবা)
'যুদ্ধের ময়দানে তন্দ্রা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রশান্তি আর নামাজে তন্দ্রা শয়তানের পক্ষ থেকে হয়।' (তাবরানী)
নামাজে হাই তোলা, হাঁচি দেয়া ও তন্দ্রা সৃষ্টির মাধ্যমে শয়তান মুসল্লীর মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে চায়। এতে করে নামাজের বিনয় ও খুশু' নষ্ট করা যায়। এজন্য সে হাই-তোলার বোতল মুসল্লীর নাকে ধরে, যেন এর ঘ্রাণে হাই তুলতে পারে। এ সকল কাজের মাধ্যমে শয়তান নামাজে মনোযোগ নষ্ট করে।
নামাজের বাইরে হাই তোলার একই হুকুম। আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'আল্লাহ হাঁচিকে পছন্দ করেন এবং হাই তোলাকে অপছন্দ করেন। কেউ হাঁচি দিলে সে যেন হামদ বা আল্লাহর প্রশংসা করে। আর যে মুসলমান তা শুনে, তার দায়িত্ব হল এর জবাব দেয়া। অপরদিকে, হাই তোলা শয়তানের পক্ষ থেকে হয়। তাই যথাসাধ্য তা প্রতিরোধ করা উচিত। যখন সে 'হা' করে, শয়তান তা দেখে হাসে।' (বোখারী, আবু দাউদ, তিরমিজী)
আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'হাঁচি আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং হাই তোলা শয়তানের পক্ষ থেকে হয়। তোমাদের কেউ হাই তুললে সে যেন নিজ মুখে হাত দেয়। আর যদি (হাত না দিয়ে) আ-আ করে, তখন শয়তান তার পেটের ভেতর থেকে হাসে। আল্লাহ হাঁচিকে পসন্দ করেন এবং হাই তোলাকে অপসন্দ করেন। কোন ব্যক্তি যদি আ-আ করে, শয়তান তার পেটের ভেতর থেকে হাসতে থাকে।' (তিরমিজী)
আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'তোমাদের কেউ যদি হাই তোলে তাহলে সে যেন নিজ মুখে হাত দেয়। কেননা, শয়তান হাই তোলার মধ্য দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে।' (বোখারী, মুসলিম, আহমদ)
আবু দাউদ ইয়াযিদ বিন মোরশেদ থেকে বর্ণনা করেছেন। 'রাসূলুল্লাহ (সঃ) হাঁচি বড় শব্দসহকারে দিতে নিষেধ করেছেন। কেননা, শয়তান সে বড় আওয়াজকে ভালবাসে।' হাঁচি ও হাই তোলার ইসলামী নীতি না মানলে শয়তান এর মাধ্যমে আমাদের ক্ষতি করবেই।
১২. পেশাবখানা-পায়খানা ও গোসলখানা হচ্ছে শয়তানের বিচরণ ক্ষেত্র:
মানুষ গোসল ও পেশাব-পায়খানার সময় নিজেদের সতর উন্মুক্ত করে। এদিকে উলঙ্গপনা ও বেহায়াপনা হচ্ছে শয়তানের অন্যতম অস্ত্র। বিশেষ করে খোলা জায়গায় গোসল ও পেশাব-পায়খানা করলে শয়তান তাতে বেশি খুশী হয়। এজন্য খোলা জায়গায় পেশাব-পায়খানা করা ঠিক নয়। বরং গোসলখানা ও পায়খানার চার দেয়াল ও চাল বা ছাদ থাকা উচিত। মহানবী (সঃ) বলেছেন 'তোমরা ঘর বা বাড়ির ভেতর গোসলখানা ও পেশাবখানা-পায়খানা তৈরি কর। অন্যথায়, শয়তান তোমাদের সন্তানদেরকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।' -(হারব কারমানী)
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে বর্ণিত। নবী (সঃ) বলেছেন, তোমরা তোমাদের বাড়ি-ঘরে গোসলখানা এবং পেশাব-পায়খানা তৈরি কর। অন্যথায় জিন শয়তান তোমাদের সন্তানদেরকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ১. তিনি আরো বলেছেন: 'কেবলমাত্র গোসলের জন্য নির্ধারিত জায়গায় পেশাব করো না। কেননা, তা থেকেই ব্যাপক ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি হয়।' (নাসাই, তিরমিজী, আবু দাউদ) অজু-গোসল এবং পেশাব-পায়খানার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ ও দোআ পড়লে শয়তান আর কোন ক্ষতি করতে পারে না।
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সঃ) যখন পেশাবখানা ও পায়খানায় যেতেন তখন এ দোআ পড়তেন: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُبِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ .
'হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে নর-নারী উভয়রূপ শয়তান হতে আশ্রয় চাই।' (বোখারী, মুসলিম) এ দোআয় পেশাব-পায়খানার সময় সরাসরি শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে।
১৩. সকাল-সন্ধ্যায় শয়তানের বিচরণ ও শিশুদের নিয়ন্ত্রণ : ভোরে ও সন্ধ্যায় অর্থাৎ সূর্যোদয়ের আগে ও সূর্যাস্তের পরে শয়তানরা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তখনই তারা মানুষের অনেক ক্ষতি করে। বিশেষ করে শিশু ও নারীদের ক্ষতি করে। সে সময় নারী ও শিশুদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।
জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'ভোরে ও সন্ধ্যায় তোমাদের সন্তানদেরকে আটকে রাখ, তখন শয়তান ছড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যার পর কিছুক্ষণ অতিবাহিত হলে শিশুদেরকে ছেড়ে দাও, রাত্রে ঘরের দরজা বন্ধ রাখ এবং আল্লাহর নাম স্মরণ কর। শয়তান বন্ধ দরজা খুলতে পারে না। যদি পাত্র ও পাতিলে কোন খাবার থাকে, তাহলে তা ঢেকে দাও, আল্লাহর নাম স্মরণ কর এবং রাত্রে বাতি নিভিয়ে রাখবে।' (বোখারী, মুসলিম, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ)
এ হাদীসে শয়তানের বিস্তার লাভ ও তার ক্ষতি থেকে বাঁচার নির্দেশিকা দেয়া হয়েছে। উপরোক্ত প্রত্যেকটা কাজে 'বিসমিল্লাহ' পড়লে শয়তান থেকে বাঁচা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরো বলেছেন: 'তোমরা ঘরের দরজা বন্ধ রাখ, খাদ্য ও পান পাত্র ঢেকে রাখ এবং রাত্রে বাতি নিভিয়ে রাখ। শয়তানকে তোমাদের ঘর টপকানোর অনুমতি দেয়া হয় নি।'১.
শুধু তাই নয়, হাদীসে এসেছে, সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত এবং সূর্য যখন ঠিক মাথার উপরে থাকে তখন শয়তান বেশি তৎপর হয়। এ মর্মে আব্দুল্লাহ সুনাবাহহী থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'নিশ্চয়ই সূর্য যখন উঠে তখন এর সাথে শয়তানের শিং লাগা থাকে। সূর্য উঠলে শয়তান সরে যায়। সূর্য ঠিক মাথার উপর উঠলে শয়তান পুনরায় নিজ শিং এর সাথে লাগায়। যখন সূর্য হেলে যায় তখন সে সরে যায়। সূর্যাস্তের সময় সে আবারো নিজ শিং সূর্যের সাথে লাগায় এবং সূর্য ডুবে গেলে আবার সরে যায়। তোমরা এ তিন ওয়াক্তে নামাজ পড়বে না।' -(মালেক, আহমদ, ইবনে মাজাহ, বায়হাকী)
আমর বিন আবাসা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'নিশ্চয়ই সূর্য শয়তানের দুই শিং-এর উপর উঠে এবং দুই শিং-এর উপর অস্ত যায়।' (আবু দাউদ, নাসাঈ)
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত। একজন ফেরেশতা এসে হুকুম দেয়ার আগ পর্যন্ত কখনও সূর্যোদয় হয় না। কিন্তু শয়তান তা প্রতিহত করার জন্য চেষ্টা চালায়। তাই সূর্য তার দুই শিং-এর মাঝখানে উদিত হয়। আল্লাহ শয়তানকে এর নিচে জ্বালিয়ে দেন। আল্লাহকে সাজদা করা ছাড়া সূর্য কখনও অস্ত যায় না। শয়তান এসে সূর্যকে সাজদা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা চালায়। সূর্য শয়তানের দুই শিং-এর মাঝে অস্ত যায়। আল্লাহ তাকে সূর্যের নিচে জ্বালিয়ে দেন। এজন্যই রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: শয়তানের দুই শিং-এর মাঝে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত হয়।' ২.
১৪. শয়তানের আসন:
'আলো-ছায়ায় বসা শয়তানের অভ্যাস। মহানবী (সঃ) বসার আদব রক্ষার স্বার্থে আলো-ছায়ায় বসতে নিষেধ করে বলেছেন: তাহল শয়তানের মজলিশ।' (মোসনাদে আহমদ)
আব্দুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণিত। 'কিছু ছায়ায় এবং কিছু আলোতে বসা ঠিক নয়। এরকম হচ্ছে শয়তানের আসন।' (ইবনু আবি শায়বা)
১৫. বাজার শয়তানের আড্ডাখানা:
বাজার শয়তানের বড় আড্ডাখানা ও আক্রমণের চৌরাস্তা। এতে বসেই সে মানুষকে ব্যবসা-বাণিজ্যে মিথ্যা বলা, ধোঁকা দেয়া, মিথ্যা কসম করা, ভেজাল মিশানো, ঠকানো, ওজনে কম দেয়া, খারাপ শলা-পরামর্শ করা, নারী-পুরুষের সংমিশ্রণ ঘটানো, পর্দাহীনতার প্রসার, সুদী কাজ-কারবারের প্রসার, ব্যবসাকে নামাজের পথে বাঁধা সৃষ্টি, চুরি, রোজার দিনে খাবারের দোকান খোলা রাখা, পরনিন্দা, অপবাদ ও গান-বাজনাসহ অগণিত পাপের পথ খুলে দেয়।
সালমান থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন : 'বাজারে সর্বপ্রথম প্রবেশকারী ও সর্বশেষ প্রস্থানকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে না। কেননা, বাজার হচ্ছে, শয়তানের রণাঙ্গণ, সে সেখানে যুদ্ধের ঝাণ্ডা দাঁড় করায়।' (জামউল জাওয়ামে)
তাই প্রয়োজন না থাকলে বাজারে যাওয়া ও আড্ডা দেয়া উচিত নয়। প্রয়োজন থাকলে প্রয়োজন সেরে দ্রুত ফিরে আসা উচিত। কোন কাজকর্ম না থাকলে মুসলমানের উচিত, মসজিদে বেশি অবস্থান করা।
১৬. গান-বাজনা শয়তানের অস্ত্র:
গান-বাজনার মাধ্যমে শয়তান মানুষকে সর্বাধিক গোমরাহ করে। এর মাধ্যমে অন্তরে মরিচা পড়ে, ন্যায় ও ভাল কাজের প্রতি অনীহা দেখা দেয় এবং ইবাদতে মন বসে না। গান-বাজনা মানুষকে বাস্তব জগতের সীমনা পেরিয়ে কল্পনার জগতে বিচরণ করায়। তখন ব্যক্তি কাল্পনিক সত্ত্বায় পরিণত হয়। কেননা, গান-বাজনার বিষয়বস্তু হচ্ছে, কাল্পনিক। অবশ্য ইসলামী গান-গজল তার বিপরীত। এর মাধ্যমে শয়তান দূর হয়। জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন : 'সর্বপ্রথম শয়তান গান গেয়েছে।' (ইবনু আবি শায়বা)
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) বলেছেন : 'গান ও বাদ্যযন্ত্র শয়তানের হাতিয়ার। ১.
১৭. এক জুতায় হাঁটা শয়তানী কাজ: আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, 'তোমাদের কেউ যেন এক জুতা পরে না হাঁটে। কেননা, শয়তানও এক জুতা পরে হাঁটে।'১ এক জুতা পরে হাঁটলে পায়ের ব্যালেন্স রক্ষা না হওয়ায় পড়ে আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তদুপরি, তা দেখতেও বেমানান। ইসলাম বেমানান ও অসুন্দর কাজকে সমর্থন করে না। তাই এক পায়ে জুতা পরা ঠিক নয়।
১৮. তাড়াহুড়া শয়তানী ওয়াসওয়াসা: কোন কাজের ভাল পরিণতি তা ধীরস্থিরভাবে করার উপর নির্ভরশীল। তাড়াহুড়া করে কাজ করার পরিণতি কখনও ভাল হয় না। এর ফলে কাজও ভাল হয় না। তাই ধীরে-সুস্থে কাজ করার জন্য নবী (সঃ) উৎসাহিত করেছেন।
সহল বিন সা'দ থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'ধীরে-সুস্থে কাজ করা আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং তাড়াহুড়া শয়তানের পক্ষ থেকে। (তিরমিজী)
১৯. গাধা শয়তান দেখে আওয়াজ দেয়: আমরা শয়তানকে দেখি না। জিনেরা আমাদেরকে দেখে। গাধাও শয়তান দেখে। সে শয়তান দেখলে আওয়াজ দেয়। সেও শয়তানকে দেখতে অনিচ্ছুক। আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'তোমরা মোরগের আওয়াজ শুনলে আল্লাহর অনুগ্রহ চাইবে। কেননা, সে ফেরেশতাকে দেখে। আর গাধার আওয়াজ শুনলে শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাইবে। কেননা, সে শয়তানকে দেখে।' (বোখারী, মুসলিম)
গাধার আওয়াজ শুনলে শয়তানের উপস্থিতির কথা জেনে মুমিনের সতর্ক হওয়া উচিত। পশু-পাখির ডাকের বিশেষ তাৎপর্য আছে। আমরা তা বুঝি না। আল্লাহ তা বুঝেন। তিনি বলেছেন:
وَإِنْ مِنْ شَيْ إِلَّا يُسَبِّحُ لِلَّهِ وَلَكِنْ لَا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ .
'এমন কোন জিনিস নেই, যা আল্লাহর পবিত্রতা ও তাসবীহ বর্ণনা করে না। কিন্তু তোমরা তা বুঝ না।'
২০. নারী ও শয়তান:
শয়তান নারীকে গোমরাহীর শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। নারীদের মাধ্যমে পুরুষদেরকে বিভ্রান্ত করা তার পক্ষে খুবই সহজ। পুরুষকে বিভ্রান্ত করার আগেই সে নারীকে বিভ্রান্ত করে ফেলে। নারী ঘর থেকে বের হলেই শয়তানের ওয়াসওয়াসার সূচনা হয়। তাই মহানবী (সঃ) নারীদেরকে খুব বেশি সতর্ক করেছেন এবং বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হতে নিরুৎসাহিত করেছেন। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন:
الْمَرْأَةُ عَوْرَةً فَإِذَا خَرَجَتْ اسْتَشْرِفَهَا الشَّيْطَانُ .
'নারী হচ্ছে সতর। যখন সে ঘর থেকে বের হয় তখন শয়তান তার দিকে তাকাতে থাকে।' (তিরমিজী)
অর্থাৎ সতর যেমন প্রকাশ করা যায় না, তেমনি নারীও বিনা প্রয়োজনে ঘরের বাইরে নিজেকে প্রকাশ করবে না। বাইরে গেলে, প্রয়োজন সেরে তাড়াতাড়ি চলে আসা উচিত। বিনা প্রয়োজনে বাইরে আড্ডা দেয়া ঠিক নয়।
আবু উমামা থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'যখন ইবলিশকে পৃথিবীতে অবতরণ করানো হয়, সে আল্লাহকে জিজ্ঞেস করে, হে আমার রব! তুমি আমাকে জমীনে পাঠিয়েছ এবং অভিশপ্ত করেছ। আমার জন্য জমীনে একটি ঘর তৈরি করে দাও। আল্লাহ বলেন, সেটি হচ্ছে বাথরুম। সে বলল, আমার জন্য একটি মজলিশ চাই। আল্লাহ বলেন, সেটা হল বাজার ও চৌরাস্তা। সে বলল, আমার জন্য খাবার চাই। আল্লাহ বলেন, সেটা হল, যে খাবার বিসমিল্লাহ বলে খাওয়া হয় না তা। সে বলল, আমার জন্য একটি পড়ার বই চাই যেমন মানুষের জন্য রয়েছে কোরআন। আল্লাহ বলেন, সেটা হচ্ছে, বাজে কবিতা। শয়তান বলে, আমার জন্য লেখার বিষয় চাই। আল্লাহ বলেন, সেটা হচ্ছে, শরীরে রং খোদাই করা। শয়তান বলে, আমার জন্য কথা চাই। আল্লাহ বলেন, সেটা হচ্ছে মিথ্যা। শয়তান বলে, আমার জন্য দূত চাই। আল্লাহ বলেন, সেটা হচ্ছে গণক। শয়তান বলে, আমার জন্য শিকার চাই। আল্লাহ বলেন, সেটা হচ্ছে নারী।' (তাবরানী, ইবনু আবিদ দুনিয়া) এ হাদীসে, আমরা মানুষকে গোমরাহ করার বহু শয়তানী উপায়-উপকরণ সম্পর্কে জানতে পারলাম। সেগুলো হচ্ছে বাথরুম, বাজার, বিসমিল্লাহ্ না বলে খাবার গ্রহণ, বাজে কবিতা, শরীরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য রং খোদাই করা, মিথ্যা, গণক ও নারী। এ সকল ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশ মেনে না চললে, শয়তান এগুলো থেকে আমাদের বিরুদ্ধে আক্রমণের পথ রচনা করে। নারীর অশালীনতা, পর্দাহীনতা, নরম-কোমল কথাবার্তা, খারাপ আচরণ ও সৌন্দর্যের প্রকাশকে শয়তান যৌন সুড়সুড়ি সৃষ্টির কাজে ব্যবহার করে। আজকের সমাজে সিনেমা, ভিডিও, ভিসিআর, টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকা ও পর্ণ ম্যাগাজিনে নারীদের বেহেল্লাপনা, উগ্রতা, নগ্নতা ও বেহায়াপনা গোটা সমাজকে বিষায়িত করে তুলেছে এবং বহু সমস্যার জন্ম দিয়েছে। তাই নারীদের বিষয়ে অধিক সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে।
এখন আমরা নারী সংক্রান্ত একটি শিক্ষামূলক ঘটনা উল্লেখ করব। ওহাব বিন মোনাব্বেহ তাঁর 'তালবীসে ইবলিশ' কিতাবে উল্লেখ করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: অতীত উম্মতের এক আবেদ জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে মন্দিরে উপাসনা করত। বহু বছর যাবত সে এভাবে উপাসনা করে আসছে। সে কারো সাথে মিশত না। একদিন তিন ভাই জেহাদে রওনা হওয়ার আগে সে আবেদের কাছে এসে তার তত্ত্বাবধানে তাদের একমাত্র বোনকে রেখে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করল। এর আগে তিন ভাই তাদের বোনের যত্নের লক্ষ্যে সর্বাধিক নিরাপদ ব্যক্তি সম্পর্কে গ্রামবাসীকে জিজ্ঞেস করল। সকল লোক মন্দিরের ঐ আবেদকে পরামর্শ দিল। আবেদ ব্যক্তি এ প্রস্তাব সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করল। কিন্তু তিন ভাই নাছোড় বান্দাহ। শেষ পর্যন্ত আবেদ রাজী হল। কিন্তু সে শর্ত দিল, তারা যেন মন্দিরের নিকটে আলাদা একটি ঘরে মেয়েটিকে রাখার ব্যবস্থা করে।
তারা এভাবে ব্যবস্থা করে বোনকে রেখে চলে গেল। আবেদ প্রত্যেক দিন মেয়েটির জন্য খাবার তৈরি করে মন্দিরের দরজার বাইরে খাবার রেখে দরজা বন্ধ করে দেয়। মেয়েটি এসে খাবার নিয়ে যায়। একদিন শয়তান এসে অদৃশ্যে আওয়াজ দিয়ে আবেদকে বলল, তুমি ভাল করছ না। কেন মেয়েটি একা ঘর থেকে বের হয়ে তোমার মন্দির থেকে খানা নিয়ে যায়? এটা মেয়েটির জন্য ফেতনা ও বিপদ ডেকে আনতে পারে। উত্তম হল তুমি তার কক্ষের দরজার কাছে খানা রেখে চলে আসবে। আবেদ এটাকে ভাল ধারণা মনে করে সেভাবে কাজ শুরু করল। ইবলিশ কিছুদিন আবেদকে দিয়ে এভাবে কাজ করাতে থাকল। অন্য একদিন এসে বলল: মেয়েটি দীর্ঘদিন একাকী নিজেকে কারাবন্দী মনে করে ভয় পাচ্ছে। তুমি কেন তার সাথে আলাপ করে তার খোঁজ-খবর নিচ্ছ না?
এর ফলে মেয়েটির নির্জন একাকীত্বের কষ্ট দূর হবে এবং সে আনন্দ পাবে। আবেদ এটাকে উত্তম প্রস্তাব মনে করল। এখন থেকে সে মন্দিরের উপর দিয়ে মেয়েটির সাথে কথা বলে তার খোঁজ-খবর নিতে থাকে। কিছুদিন পর শয়তান এসে আবার বলল, উত্তম হত যদি তুমি তোমার উপাসনার দরজায় এবং মেয়েটি নিজ ঘরের দরজায় বসে মুখোমুখি আলোচনা করতে। এতে করে মেয়েটির নির্জনতার কষ্ট ভালভাবে দূর হত। আবেদ কিছুদিন তাই করল। এরপর ইবলিশ আবার তার কাছে এসে বলল, তুমি যদি তোমার দরজায় দাঁড়িয়ে ঘরের ভেতরে অবস্থিত মেয়েটির সাথে কথা বল, তাহলে তা একদিকে, তার জন্য প্রতিরক্ষা এবং তোমার জন্য বিরাট সওয়াবের কাজ। এভাবে আবেদটি কিছুদিন করতে থাকল। কিছুদিন পর আধার ইবলিশ এসে তাকে বলল: তুমি যদি মেয়েটির সাথে তার ঘরে গিয়ে কথা বল, তাহলে, দরজা থেকে তার মাথা বের করে তোমার সাথে কথা বলার দরকার হবে না। ফলে এখন থেকে সে মেয়েটির ঘরে গিয়ে দিনের অধিকাংশ সময় কথা বলতে থাকল। পরে নিজ উপাসনালয়ে ফিরে আসত। তারপর ইবলিশ এসে তার কাছে মেয়েটির রূপ-গুণ ও সৌন্দর্য স্মরণ করিয়ে দিল। ফলে, একদিন আবেদ মেয়েটির রানের মধ্যে হাত রাখল এবং তাকে চুমু খেল। শয়তান এভাবে আবেদের চোখে মেয়েটিকে সুন্দর করে দেখাতে থাকল যে পর্যন্ত না সে তার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হল। ব্যভিচারের ফলে মেয়েটি গর্ভবর্তী হল। সন্তান প্রসব করার পর শয়তান এসে আবেদকে তার এ কুকাজের জন্য ভয় প্রদর্শন করল এবং বলল: মেয়ের ভাইয়েরা ফিরে আসলে তোমার কি উপায় হবে? ইবলিশ সন্তানটিকে হত্যা করার পরামর্শ দিল, আবেদ শিশুটিকে জবাই করে দাফন করে ফেলল। ইবলিশ পুনরায় এসে মেয়েটির ব্যাপারে ভয় দেখাল যে, সে তার ভাইদের কাছে ঘটনা বলে দিতে পারে। তাই তাকেও হত্যা করা উচিত। তার ভাইয়েরা আসলে তাদেরকে তুমি বলবে যে মেয়েটি মারা গেছে। আবেদ মেয়েটিকে জবাই করে শিশুর গর্তে তাকেও দাফন করল। এরপর সে নিজ মন্দিরে ফিরে আসল। কিছুদিন পর ভাইয়েরা ফিরে আসলে সে তাদের কাছে তাদের বোনের মৃত্যু সংবাদ দিয়ে অনুশোচনা প্রকাশ করল এবং খুব কান্নাকাটি করল। তারপর তাদেরকে মেয়েটির কবর দেখাল। ভাইয়েরা ঘরে ফিরে আসল। ইবলিশ এবার তাদের প্রত্যেককে স্বপ্নে একজন মুসাফিরের আকৃতিতে তাদের বোন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। তারা তাকে বোনের মৃত্যু সংবাদ দিল। ইবলিশ তাদের প্রত্যেককে আবেদ ব্যক্তির ব্যভিচার এবং তাদের বোন ও তার সন্তান হত্যার কাহিনী জানাল, দাফনকৃত গর্তের সন্ধান দিল এবং কবর খুঁড়ে তাদের জবাইকৃত বোন ও সন্তানের লাশ বের করার পরামর্শ দিল। তারা ঘুম থেকে জেগে পরস্পরের স্বপ্ন এক ও অভিন্ন হওয়ায় আশ্চর্য হল। তারা কবর খোঁড়ার সিদ্ধান্ত নিল। কবরে জবাইকৃত বোন ও শিশুর লাশ পাওয়া গেল। তারা আবেদকে ধরায় সে সকল অপরাধ স্বীকার করল। সমসাময়িক রাজা আবেদকে ফাঁসিদানের নির্দেশ দিল। তাকে ফাঁসিকাষ্ঠে বাঁধার পর ইবলিশ এসে বললঃ তুমি জান যে, আমিই তোমার সে বন্ধু, যে তোমাকে নারী পরীক্ষায় লিপ্ত করেছি। ফলে তুমি তাকে গর্ভবতী করেছ, তার জারজ সন্তানকে জবাই করেছ, পরে তাকেও জবাই করেছ। যদি তুমি আমার আনুগত্য কর, তাহলে তুমি এখন যে বিপদে আছ, তা থেকে তোমাকে রক্ষা করতে পারি। তুমি আল্লাহকে অস্বীকার করে কুফরী করতে হবে। আবেদ আল্লাহর সাথে কুফরী করল। শয়তান এবার সরে গেল, কোন সাহায্য করল না। লোকেরা তাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে মারল।'
এ হচ্ছে, শয়তানের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি। সে সর্বদাই মুমিনের সাথে এরূপ মিথ্যা প্রতিশ্রুতিই করে থাকে।
এ ঘটনা প্রমাণ করে, শয়তান কত ভাবে ও কত ঢংয়ে মানুষের দুনিয়া ও আখেরাত ধ্বংস করে। যারা দুর্বল মুমিন, তাদেরকে কাবু করতে শয়তানের অল্প সময়ই লাগে। সহজেই তাদেরকে কাবু করে ফেলে। যেমন, অগণিত লোক গুনাহ কি, গুনাহর কাজ কি এবং গুনাহ থেকে দূরে থাকার আদৌ কোন প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না। তারা রাত-দিন সারাক্ষণ গুনাহ করেই চলেছে। এজন্য কোন চিন্তা ও পেরেশানী নেই। পক্ষান্তরে, যারা দীনদার-ঈমানদার, তাদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য শয়তান কঠিন পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং ধাপে ধাপে তার বাস্তবায়ন করতে থাকে। এ ঘটনা তারই প্রমাণ।
গুনাহর কাজে নারীকে টেনে আনা এবং এর মাধ্যমে গুনাহ সংঘটিত করা সবচাইতে বেশি সহজ ও সহায়ক। আর কোন পদ্ধতি এত বেশি কার্যকর নয়। আলোচ্য ঘটনায় দু'জন নেক পুরুষ ও নারীকে কিভাবে শয়তান ধ্বংস করল, প্রত্যেক নেককার মানুষের তা চিন্তা করে দেখা দরকার। ঈমানদারদের ভয়ই বেশি। শয়তান তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ ও ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এজন্য সর্বদা আল্লাহর কাছে পানাহ চাইতে হবে।
হাসান বিন সালেহ বলেন। আমি শুনেছি যে, শয়তান নারীকে বলেছে: তুমি আমার সেনাবাহিনীর অর্ধেক, তুমি আমার এমন তীর যা নিক্ষেপ করলে নির্ভুল লক্ষ্যে আঘাত হানে, তুমি আমার গোপন রহস্য এবং আমার প্রয়োজন পূরণে তুমি আমার দূত।' (ইবনু আবিদ দুনিয়া)
মালেক বিন দীনার বলেছেন: 'দুনিয়া প্রীতি গুনাহর চূড়া এবং নারী হচ্ছে শয়তানের রশি। তিনি আরো বলেন, ইবলিশ শয়তানের কাছে নারী অপেক্ষা অন্য কোন জিনিস এত নির্ভরযোগ্য নয়।' (ইবনু আবিদ দুনিয়া)
তাঁর এ বক্তব্য সে সকল নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা নিজেরা খারাপ এবং যারা পুরুষদেরকে খারাপ করার কাজে সর্বদা নিয়োজিত। কিন্তু নারীদের মধ্যে এমন বহু মহীয়সী নারীও আছেন, যারা পুরুষের চাইতেও উত্তম। হযরত মরিয়ম সম্পর্কে একথাই কুরআনে উল্লেখ আছে। কুরআনে উল্লেখ আছে। وليس الذكر كالانتى 'পুরুষ ও মহিলার মত নয়।'
ইবনু আবিদ দুনিয়া সাঈদ বিন মোসাইয়ের থেকে বর্ণনা করেছেন, 'আল্লাহ এমন কোন নবী পাঠাননি যাকে নারীর মাধ্যমে ধ্বংস করার বিষয়ে শয়তান কখনও নিরাশ হয় নি।' শয়তান যেখানে নবীদেরকে ধ্বংস করার জন্য নারীকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হতাশ হয় নি, সে তুলনায় সাধারণ মুসলমানকে গোমরাহ করার লক্ষ্যে শয়তান কর্তৃক নারীর ব্যবহার কত বেশি ও কত মারাত্মক তা সহজেই অনুমান করা যায়। বাস্তবেও তাই দেখা যায়।
ইবনে আবি আব্বাস থেকে বর্ণিত। 'শয়তান পুরুষের তিন স্থানে আশ্রয় নেয়। দুই চোখ, হৃদয় ও লজ্জাস্থান। সে স্ত্রীলোকেরও তিন স্থানে আশ্রয় নেয়। দুই চোখ, হৃদয় ও পশ্চাদ্বারে। ১.
যৌন চাহিদার অসদ্ব্যবহার শয়তানের অন্যতম অস্ত্র। ওবাইদুল্লাহ বিন ওহাব থেকে বর্ণিত। 'এক নবী ইবলিশকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কোন্ জিনিস দ্বারা তুমি মানুষের উপর বিজয় লাভ কর? সে উত্তরে বলে: আমি তার রাগ ও যৌন তাড়নাকে কাজে লাগিয়ে বিজয় লাভ করি।' (ইবনু আবিদ দুনিয়া)
আজকের দুনিয়ায় যত ফেতনা তার অধিকাংশের মূলে রয়েছে যৌন উচ্ছৃঙ্খলা ও পাশবিক চাহিদা। ইসলাম বিয়ের মাধ্যমে যৌন চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করে এর সদ্ব্যবহারের পথ নির্দেশ দেয়। কিন্তু বস্তুবাদী লোকেরা ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে যৌন তাড়নার পেছনে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ায়।
২১. মাদকতা শয়তানী ওয়াসওয়াসার বাহন: মাদকতার মাধ্যমে মানুষের বিবেক লোপ পায়। সে তখন যা ইচ্ছা তাই করে। ভাল-মন্দ ভেদাভেদ করতে পারে না। শয়তান এ সুযোগকে কাজে লাগায়। মাদকদ্রব্য সেবনের পর তাকে দিয়ে নামাজ ত্যাগ, গালি-গালাজ, অ্লীলতা, যেনা-ব্যভিচার-সমকামিতাসহ বিভিন্ন গর্হিত কাজ আঞ্জাম দেয়। ইসলাম মদসহ নেশা সৃষ্টিকারী অন্যান্য সকল জিনিস হারাম করেছে। যেমন, হিরোইন, কোকাইন, হাশিস ইত্যাদি। মানুষ সৃষ্টির সেরা হয়েছে বিবেকের কারণে। মানবদেহের সে শ্রেষ্ঠ জিনিসটিকে ধ্বংসকারী নেশা জাতীয় দ্রব্য কি করে হালাল হতে পারে?
কাতাদাহ বিন আইয়াস আল-জোরাসী থেকে বর্ণিত। 'রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: বান্দাহ যে পর্যন্ত মদ পান না করে, সে পর্যন্ত সে দীনের আঙ্গিনায় অবস্থান করে। যখন সে মদ পান করে, তখন আল্লাহ তার থেকে অন্যের দিকে ফিরে যান। তখন শয়তান হয় তার বন্ধু, কান, চোখ ও পা। শয়তান তাকে সকল খারাপ ও মন্দ কাজের দিকে নিয়ে যায় এবং সকল ভাল কাজ থেকে তাকে ফিরিয়ে রাখে।' (তাবরানী, সূযুতী)
মদসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্য সেবন করা দ্বীনের জন্য ক্ষতিকর। শয়তান মাদকতার পথ ধরে মানুষকে গোমরাহীর অতল তলে নিয়ে যায়। তাই এগুলো থেকে বাঁচা জরুরী। শুধু মদ পান নয় বরং সাধারণ পানীয়ের বিষয়েও মহানবীর অমূল্য উপদেশ রয়েছে। আমর বিন আবি সুফিয়ান থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'পানপাত্রের সর্বনিম্ন অংশের পানীয়টুকু পান করবে না। কেননা, শয়তান তা পান করে।'১.
২২. অধিক রক্তস্রাব শয়তানের কাজ:
মহিলাদের রক্তস্রাব হবে স্বাভাবিক ও যুক্তিসঙ্গত। যদি তা অধিক পরিমাণে হয় তাহলে শরীরের ক্ষতি হয়, বেশি দুর্বলতা অনুভব করে, ইবাদতে বিঘ্ন ঘটায়। এটা শয়তানের কাজ। কেননা, তা তার লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক।
হামনাহ বিনতে জাহাশ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার অত্যধিক রক্তস্রাব হয়। আমি তা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলি, তিনি উত্তরে বলেন: এটা শয়তানের খোঁচার ফলে হয়। (আবু দাউদ, তিরমিজী)
রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ কথার সাথে শয়তান যে, মানুষের রক্তে ও শিরা-উপশিরায় চলাচল করে তার মিল রয়েছে। শয়তান যখন ধমনীতে খোঁচা মারে তখন এ অধিক রক্তস্রাব হয়। ঋতুর রক্ত নাপাক ও হারাম। এ হারামের সাথেই শয়তানের সম্পর্ক বেশি। এ কারণে যাদুর জন্যও এ নাপাক রক্ত দরকার হয়। মোট কথা এ বিষয়ে শয়তানের বিশেষ চর্চা রয়েছে। কোন মহিলার এ জাতীয় সমস্যা হলে সে আল্লাহর কাছে শয়তানের বিরুদ্ধে আশ্রয় চাইবে। অর্থাৎ আউজুবিল্লাহ, সূরা নাস ও ফালাক পড়বে। সাথে চিকিৎসাও অব্যাহত রাখবে।
২৩. তালাক ঘটানোর জন্য সাগরে শয়তানের মজলিশ:
পরিবার হচ্ছে সমাজের প্রথম ও প্রধান ইউনিট। ইসলাম বংশ রক্ষা, যৌন চাহিদা পূরণ, সন্তান-সন্ততি গঠন ও সুষ্ঠু সমাজ গড়ার লক্ষ্যে পরিবার ব্যবস্থার উপর অত্যধিক জোর দেয়। স্বামী-স্ত্রীর মাধ্যমেই পরিবার গঠিত হয়। শয়তান সমাজের এ মৌলিক ভিত্তিতে আঘাত হেনে ইসলামী সমাজকে দুর্বল করে দিতে আগ্রহী। সেজন্য পারিবারিক ভাঙ্গন শয়তানের খুবই প্রিয় কাজ। ইসলামে তালাক হচ্ছে সর্বনিকৃষ্ট হালাল বিষয়। তাই ইসলাম তালাককে নিরুৎসাহিত করে। আপোষে সমস্যার সকল সমাধানের পথ রুদ্ধ হলেই কেবল তালাকের চিন্তা করা যাবে, এর আগে সম্ভাব্য সকল উপায়ে বিয়ে ঠিক রাখার চেষ্টা করতে হবে। পক্ষান্তরে নবী (সঃ) স্ত্রীদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, যে স্ত্রী স্বামীর কাছে তালাক চায় তার ঠিকানা হচ্ছে দোজখ।
জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, সাগরে ইবলিশের মজলিশ বসে। ইবলিশ তার বাহিনীকে লোকদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য পাঠায়। যে শয়তান সর্বাধিক বড় ফেতনা সৃষ্টি করতে পারে সেই ইবলিশের কাছে সর্বাধিক মর্যাদার অধিকারী। তাদের মধ্যে একজন এসে বলে, আমি এ কাজ করেছি। ইবলিশ বলে, তুমি কিছুই করনি। অন্য একজন এসে বলে, আমি অমুক স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করেছি। তখন ইবলিশ বলে, তুমি কতইনা উত্তম কাজ করেছ।' (মুসলিম, আহমদ)
এ হাদীস দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেছে, তালাকের পেছনে রয়েছে শয়তানের হাত। তাই তালাক থেকে বাঁচা মানে শয়তানের একটি কাজ থেকে বাঁচা।
২৪. খোলা কাপড়ে শয়তান আশ্রয় নেয়: কাপড় ভাঁজ করে রাখা রুচিসম্মত ব্যাপার। কারো কারো এ রুচিবোধের অভাব রয়েছে। তারা কাপড়-চোপড় ও পোশাক-আশাক ভাঁজ করে না। খোলা রেখে দেয়। জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তোমরা কাপড় ভাঁজ করে রাখ। শয়তান ভাঁজ করা কাপড় পরে না। খোলা পেলে পরে।' (তাবরানী) তাই কাপড় এলোমেলো রাখা উচিত নয়। সর্বদা কাপড়-চোপড় গুছিয়ে রাখা উচিত।
বায়হাকী তাউস থেকে বর্ণনা করেছেন, 'যে ব্যক্তি শুধু মাথায় পাগড়ী প্যাঁচায়, কিন্তু তাকে থুতনীর নিচে রাখে না সেটা হচ্ছে শয়তানের পাগড়ী।' এভাবে পাগড়ী পরা ঠিক নয়। পাগড়ীর এক মাথা থুতনীর নিচ পর্যন্ত থাকা বাঞ্ছনীয়।
২৫. এক শ্বাসে পানীয় পান করা শয়তানের অভ্যাস: এক শ্বাসে বা এক টানে কোন পানীয় পান করা উচিত নয়। এতে দম আটকে মানুষ মারা যাওয়ার আশঙ্কা আছে। তাই হাদীসে তিন শ্বাসে বা টানে পান করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'তোমাদের তিন শ্বাসে পানি পান করা উচিত। তিনি এক শ্বাসে পানি পান করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন: এটা হচ্ছে, শয়তানের পান পদ্ধতি।' (বায়হাকী)
নবী করীম (সঃ) আরো বলেছেন: 'যদি খাওয়ার পাত্র রাত্রে খোলা থাকে এবং ঢাকনা না থাকে, শয়তান তাতে থুথু দেয়।'১. এমনিতেও তো তাঅস্বাস্থ্যকর। শুধু ইবাদতে নয়, আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম, খানা-পিনা, যান-বাহন, ঘর-বাড়ি, পোশাক, কাপড়-চোপড় পরিধান, পেশাব-পায়খানাসহ সকল বিষয়ে শয়তান হস্তক্ষেপ করে। এগুলোকে ক্ষতিকর করা, বরকত দূর করা, এদের মঙ্গল থেকে মুমিনদেরকে বঞ্চিত করাই তার লক্ষ্য। কোন কোন সময় এগুলোকে ফেতনার উপাদানে পরিণত করে। তাই মহানবী (সঃ) শয়তানের ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য তাকিদ দিয়েছেন।
২৬. সুদ শয়তানের উন্মাদনা: সুদ হচ্ছে, “পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থার নিয়ামক এবং ইসলামী অর্থব্যবস্থার জন্য ধ্বংসাত্মক।” সুদ হচ্ছে শোষণের উপায়। সুদী ব্যবস্থা অসহায় মানুষের পকেট থেকে অর্থ শোষণ করে কিছুমাত্র ধনীর পকেটে অর্থ সরবরাহ করে। এর ফলে সমাজে অভাব ও দারিদ্র্য সৃষ্টি হয়। নবী (সঃ) বলেছেন, 'দারিদ্র্য মানুষকে কুফরী পর্যন্ত নিয়ে যায়।' তাই সুদ ও কুফরীর মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। আর সে কারণেই মুসলিম সমাজ ব্যতীত দুনিয়ার অন্যান্য সকল কুফরী সমাজের সুদ হচ্ছে অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসলাম সুদকে হারাম ঘোষণা করে বলেছে, এটা হচ্ছে শয়তানী কাজ ও শয়তানের ব্যধিগ্রস্ততা ও উন্মাদনা। আল্লাহ বলেন:
الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا إِنَّمَا الْبَيْعَ مِثْلُ الرِّبَا وَاحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا .
....."যারা সুদ খায় তারা হাশরের দিন এমনভাবে দাঁড়াবে যেমন করে শয়তানের মোহাবিষ্ট উন্মাদ লোক দাঁড়ায়। তাদের এ করুণ অবস্থার কারণ এই যে, তারা বলেছে: বেচা-কেনা তো সুদেরই মত। অথচ, আল্লাহ বেচা-কেনাকে হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।" (সূরা বাকারা-২৭৫)
সুদী কারবারীদের মতে, সুদী কারবার তো ব্যবসা-বাণিজ্যের মতই বৈধ হওয়া উচিত। তা হারাম হবে কেন? অথচ, তারা ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে সুদের সুক্ষ্ম পার্থক্যগুলোকে বুঝেও না বুঝার ভান করে। ব্যবসা-বাণিজ্যে লাভ-লোকসানের ঝুঁকি রয়েছে। আর সুদী কারবারে সে ঝুঁকি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। এতে কেবল লাভ আর লাভ। ফলে, সুদ দাতার অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গেলেও তাকে যে কোন মূল্যে সুদ দিতেই হবে। মানবতার বিরুদ্ধে এটা কতবড় জুলুম। তাই ইসলামে সুদের ছোট গুনাহ হচ্ছে নিজ মাকে বিয়ে করা আর সর্বাধিক বড় গুনাহ হচ্ছে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধ করা। নাউজুবিল্লাহ।
২৭. শয়তানের খাওয়ার পদ্ধতি: আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'এক আঙ্গুলে খাওয়া শয়তানের পদ্ধতি, দুই আঙ্গুলে খাওয়া অহঙ্কারী ও পরাক্রমশালীদের পদ্ধতি এবং তিন আঙ্গুলে খাওয়া নবীদের পদ্ধতি।' (দাইলামী) অপরদিকে, শয়তান কয়লা খায়। এ মর্মে রাফে' বিন ইয়াযীদ আস্সাকাফী থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, 'নিশ্চয়ই শয়তান কয়লা পসন্দ করে। তাই তোমরা কয়লার ব্যাপারে এবং খ্যাতিসম্পন্ন কাপড়ের ব্যাপারে সতর্ক হবে।' (আবু আহমদ, হাকেম, বায়হাকী)
অন্য আরেক হাদীসে নবী করীম (সঃ) হাড় দিয়ে এস্তেঞ্জা বা পবিত্রতা অর্জন করতে নিষেধ করে বলেছেন, এটা জিনের খাবার।
হযরত আলী (রাঃ) বলেছেন: 'প্লীহা শয়তানের খাবার।' (ইবনু আবি শায়বা)
২৮. মসজিদবাসীর প্রতি শয়তানের ওয়াসওয়াসা :
মসজিদ ও মসজিদের মুসল্লীর প্রতি শয়তানের হামলা অবিরত চলে। আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, 'তোমাদের কেউ মসজিদে অবস্থান করলে শয়তান তার কাছে আসে এবং মুসল্লীর সাথে এমন ভালবাসা সৃষ্টি করে যেমন, কোন লোক নিজ সওয়ারী পশুকে ভালবাসে। যখন শয়তান মুসল্লীর মনে আশ্রয় লাভ করে। তখন তাকে অন্যমনস্ক করে এবং মুখে লাগাম পরিয়ে দেয়।
আবু হোরায়রা (রাঃ) বলেন: আপনারা তা নিজেরাও দেখতে পান। অন্যমনস্ক ব্যক্তি বিভিন্ন বিষয়ের কল্পনায় বিভোর থাকে। আল্লাহর জিকর থেকে বিরত থাকে। আর মুখে লাগাম পরানো ব্যক্তি মুখ হা করে থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর জিকর করে না।' (মোসনাদে আহমদ)
এতো গেল মসজিদে প্রবেশকারী মুসল্লীর কথা। যে ব্যক্তি মসজিদ থেকে বের হয় তার ব্যাপারেও শয়তান সর্বোচ্চ সজাগ থাকে। আবু উমামা থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'তোমাদের কেউ মসজিদ থেকে বের হওয়ার ইচ্ছা করলে ইবলিশের বাহিনী এমনভাবে জড় হয় যেমন, মৌমাছিরা রাজা মৌমাছির চারদিকে ঘিরে দাঁড়ায়। তোমাদের কেউ যেন বের হওয়ার সময় মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে এ বলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়: 'আল্লাহুম্মা ইন্নি আ'উজুবিকা মিন্ ইবলিশ ওয়া জুনুদিহী' (হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে ইবলিশ ও তার বাহিনী থেকে পানাহ চাই) তাহলে শয়তান তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।' ১.
এ হাদীস থেকে জানা যায় শয়তান মসজিদে যেতে যেমন বাধা দেয়, ভেতরে ঢুকলে যেমন অন্যমনস্ক করে দেয়, তেমনি বের হলেও তাকে মসজিদের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত করা এবং মসজিদের শিক্ষাকে বাইরে বাস্তবায়নের পথে বাধা সৃষ্টির জন্য মোটেই ত্রুটি করে না।
ইয়াযীদ বিন কোসাইত থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: নবীদের নিজেদের এলাকার বাইরে তাদের জন্য মসজিদ থাকে। নবী যখন আল্লাহর কাছে কোন বিষয়ে জানতে চান তখন তিনি সে মসজিদের দিকে রওনা হন এবং ফরজ নামাজ আদায় করেন। তারপর যে বিষয়ে জানতে চান সে বিষয়ে প্রশ্ন করেন। একদিন এক নবী নিজ মসজিদে ছিলেন। তখন ইবলিশ তাঁর ও কেবলার মাঝে বসে পড়ে। তখন নবী তিন বার বলেন 'আউজুবিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজীম।' 'আমি আল্লাহর কাছে অভিশপ্ত শয়তান থেকে আশ্রয় চাই।' ইবলিশ বলে, আপনি আমাকে বলুন, আপনি আল্লাহর কাছে আমার কোন্ বিষয় থেকে পানাহ চান? নবী বলেন: 'তুই বনি আদমের উপর কিসের মাধ্যমে বিজয়ী হস্? উভয়েই উভয়কে এ বিষয়ে কঠোরভাবে পাকড়াও করেছে। নবী আরও বলেন: আল্লাহ বলেন: إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانُ إِلَّا مَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْغَاوِينَ.
"নিশ্চয়ই আমার বান্দাহদের উপর তোর কোন কর্তৃত্ব নেই। তবে যে বিভ্রান্তরা তোর অনুসারী তারা ব্যতীত।" শয়তান উত্তরে বলে, আপনার জন্মের আগেই আমি তা শুনেছি। তখন নবী বলেন: 'আল্লাহ আরো বলেছেন: وَإِمَّا يَتَزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ.
'আর শয়তান যদি আপনাকে উস্কায় তাহলে, আপনি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান।' আমি যখনই তোর উপস্থিতি অনুভব করি তখনই আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। ইবলিশ বলে, আপনি ঠিকই বলেছেন। এভাবেই আপনি আমার ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তি পেতে পারেন। নবী বলেন, এখন তুই বল, কি জিনিসের মাধ্যমে তুই বনি আদমের উপর বিজয় লাভ করিস? ইবলিশ জবাবে বলে, আমি তাদেরকে রাগ এবং নফসের (কু-প্রবৃত্তির) গোলামীর মধ্যে পাকড়াও করি। ১. (ইবনে জারীর)
২৯. ফেরেশতার বেশে শয়তান:
শয়তান মানুষকে ধোঁকা দেয়ার জন্য কখনও ফেরেশতার ভূমিকা পালন করে। কোন ব্যক্তির কাছে শয়তান আবির্ভূত হয় এবং বিশেষ ধরনের কিছু কাজ করে। ফলে, ব্যক্তি মনে করে, আমি বুজুর্গ হয়ে গেছি। সে কারণে আমার ইবাদতে কিংবা আচরণে সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ আমার কাছে ফেরেশতা পাঠিয়ে দিয়েছেন। এ কৃত্রিম বুজুর্গীর মনোভাব সৃষ্টি করার পর শয়তান ঐ ব্যক্তির মনে বিভিন্ন রকম ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করে এবং তাকে ইসলামী শরীয়তের বিভিন্ন হুকুম ও বিধান থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কৃত্রিম বুজুর্গ ব্যক্তি তা অনেক সময় বুঝতেই পারে না। এ প্রসঙ্গে আবু আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ শিরাজী 'হেকায়াতুস সুফিয়াহ' গ্রন্থে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন: আমাদের এক ব্যক্তি নিজ ঘরে রাত্রে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তেন। তিনি তাকবীর তাহরীমা দ্বারা নামাজ শুরু করলে সাদা কাপড় পরিহিত এক লোক আসে, তার সাথে নামাজে দাঁড়ায় এবং নামাজ পড়ে। সাদা কাপড় পরিহিত ব্যক্তির রুকু ও সাজদা তার রুকু-সাজদা থেকে অধিকতর ভাল ও সুন্দর। সে এ ঘটনা তার এক বন্ধুর কাছে প্রকাশ করে। তার ঐ বন্ধু আমার কাছে আসে এবং বিষয়টি বৈধ কি না এ বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করে। ইবনে আব্বাস বলেন: তাকে বল সাদা কাপড় পরিহিত ব্যক্তি আসার পর যেন সূরা বাকারা পড়ে। যদি সে ব্যক্তি টিকে থাকে ও নামাজ অব্যাহত রাখে, তাহলে সে ফেরেশতা। আর এজন্য তার সুখবর। আর যদি ভেগে যায়, তাহলে, সে শয়তান। তিনি গিয়ে তার কাছে এ পরামর্শ পেশ করেন। পরামর্শ অনুযায়ী তিনি নামাজে দাঁড়ালে সাদা পোশাক পরিহিত ব্যক্তিটিও নামাজে দাঁড়ায়। তখন তিনি সূরা বাকারা পড়া শুরু করলে শয়তান হাওয়া ছাড়তে ছাড়তে পালিয়ে যায়।' ১.
সূরা বাকারা পড়লে শয়তান থাকতে পারে না বলে হাদীসে এসেছে। এতো গেল ব্যক্তি পর্যায়ের ঘটনা। সামষ্টিক পর্যায়ে দেখা গেছে, বদরের যুদ্ধের দিন শয়তান কাফেরদের সাথে শুভাকাঙ্খীর বেশে ছিল এবং তাদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলল। যুদ্ধ যখন তুঙ্গে, তখন নবী (সঃ) আল্লাহর কাছে সাহায্যের জন্য দোআ করেন। আল্লাহ ফেরেশতা পাঠিয়ে মুমিনদেরকে সাহায্য করেন। শয়তান ফেরেশতাদেরকে দেখে পালিয়ে যায়। আল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন : "আর যখন শয়তান তাদের কাছে তাদের কার্যকলাপকে সুন্দর করে দেখাল এবং বলল যে, আজ কেউই তোমাদের উপর বিজয়ী হতে পারবে না। আর আমি হলাম তোমাদের সমর্থক। অতঃপর যখন উভয় বাহিনী সামনা সামনি হল, তখন সে দ্রুত পায়ে পেছন দিকে পালিয়ে গেল এবং বলল: আমি তোমাদের সাথে নেই, আমি যা দেখছি তোমরা তা দেখছ না। আমি আল্লাহকে ভয় করি। আর আল্লাহর আযাব অত্যন্ত কঠিন।" (সূরা আনফাল-৪৮)
শয়তান এভাবে মানব সমাজকে গোমরাহ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকে। একমাত্র কোরআন-হাদীসের সঠিক জ্ঞান ও আল্লাহর রহমত না হলে কারো পক্ষে সত্যের উপর টিকে থাকা সম্ভব নয়।
৩০. আল্লাহ সম্পর্কে বিভ্রান্তি: শয়তান প্রথমে আল্লাহ সম্পর্কে ওয়াসওয়াসা দেয়। এ মর্মে হযরত আয়েশা থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, "শয়তান তোমাদের কারো কাছে বসে বলে, তোমার স্রষ্টা কে? ব্যক্তি জবাবে বলে, আল্লাহ। তারপর শয়তান বলে, আল্লাহর স্রষ্টা কে? নবী (সঃ) বলেন, তোমাদের কারো মনে এরকম ওয়াসওয়াসা জাগলে সে যেন বলে, أَمَنْتُ بِاللَّهِ وَرَسُوله আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উপর ঈমান এনেছি।' এর ফলে ওয়াসওয়াসা দূর হয়ে যায়। (ইবনু আবিদ দুনিয়া)
'ইবনে ওমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) .-এর কাছে বসা ছিলাম। তখন খুবই বিশ্রী চেহারা ও পোশাক এবং দুর্গন্ধময় উচ্চ-খুষ্ক একটি লোক মানুষের গর্দান ডিঙ্গিয়ে রাসূলুল্লাহর কাছে গিয়ে বসে। লোকটি নবী (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করে, আপনার স্রষ্টা কে? তিনি বলেন, আল্লাহ। সে বলে, আসমানের স্রষ্টা কে? তিনি বলেন, আল্লাহ। সে জিজ্ঞেস করে, জমীনের স্রষ্টা কে? তিনি বলেন, আল্লাহ। তারপর সে জিজ্ঞেস করে, আল্লাহর স্রষ্টা কে? তিনি বলেন, 'সুবহানাল্লাহ', তিনি তার কপালে ধরেন এবং নিজ মাথা নিচু করেন। তারপর লোকটি উঠে দাঁড়াল এবং চলে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মাথা উত্তোলন করেন এবং বলেন, লোকটিকে আমার দরকার। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা লোকটিকে তালাশ করলাম। সে এমন উধাও হল, যেন ঐরকম কোন ব্যক্তিই নেই। তখন নবী (সঃ) বলেন, এ হচ্ছে, ইবলিশ। সে তোমাদের দ্বীনের বিষয়ে সন্দেহ সংশয় সৃষ্টি করতে এসেছে।' (বায়হাকী-দালায়েল)
৩১. মহানবীর উপর শয়তানের ক্ষ্যাপার কারণ : আবু নাঈম ইবনু আব্বাসের বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন। শয়তানেরা আগে চুরি করে আসমানী অহী শুনে নিত। হযরত মোহাম্মদ (সঃ) নবী হওয়ার পর তাদের চুরি করে অহী শুনা বন্ধ হয়ে গেল। তারা ইবলিশের কাছে এ ব্যাপারে অভিযোগ করল। তারা বলল, মক্কার আবু কোবাইস পাহাড়ের উপর বিশেষ কোন ঘটনা ঘটেছে। ইবলিশ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মাকামে ইবরাহীমের পেছনে নামাজ পড়তে দেখে তার বাহিনীকে নির্দেশ দিল, যাও তাঁর ঘাড় মটকিয়ে আস। তখন জিবরীল (আঃ) আসেন এবং শয়তানকে বহুদূরে তাড়িয়ে দেন। ১.
আল্লাহ কোরআন মজীদে বলেছেন: "নিশ্চয়ই আমি নিকটবর্তী আসমানকে তারকারাজি দ্বারা সুশোভিত করেছি এবং তাকে সংরক্ষিত করেছি প্রত্যেক অবাধ্য শয়তান থেকে। তারা ঊর্ধ্বজগতের কোন কিছু শুনতে পারে না এবং চারদিক থেকে তাদের প্রতি উল্কা নিক্ষেপ করা হয়- বিতাড়নের উদ্দেশ্যে। তাদের জন্য রয়েছে বিরামহীন শাস্তি। তবে কেউ ছোঁ মেরে কিছু শুনে ফেললে জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ড তার পেছনে ধাবিত হয়।" (সূরা সাফফাত: ৬-১১)
এ আয়াতসমূহে শয়তানের চুরি করে অহী শুনা বন্ধ করার ব্যবস্থা সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। আর এ কারণে শয়তান মহানবী (সঃ)-এর উপর ভীষণ ক্ষ্যাপা। কেননা এর ফলে শয়তানের বহু তৎপরতা সীমিত হয়ে এসেছে। সে আগে আসমান থেকে গায়েবী কথাবার্তা শুনে গণকদেরকে এসে বলত। এখন আর আগের মত বলতে পারে না।
ইয়াহ্ইয়া বিন সাঈদ থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মে'রাজের পথে জিনের এক দৈত্যকে দেখতে পেলেন। সে একটি অগ্নিশিখা হাতে নিয়ে মহানবীর অনুসন্ধানে বেরিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার দিকে তাকানো মাত্র সে তাঁকে দেখে ফেলল। তখন জিবরীল (আঃ) তাঁকে বলেন, আমি কি আপনাকে এমন বাণী শিক্ষা দেবো যা পাঠ করলে তার অগ্নিশিখা নিভে যাবে এবং হাত থেকে তা পড়ে যাবে? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, হাঁ, অবশ্যই। জিবরীল বলেন: আপনি এ দোআ পড়বেন:
اعُوْذُ بِوَجْهِ اللَّهِ الْكَرِيمِ وَبِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ اللَّاتِي لا يُجَاوِزُ هُنَّ بِرَّ وَلَا فَاجِرٌ مِّنْ شَرِّ مَا يَنْزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَشَرِّ مَا يَعْرُجُ فِيهَا وَشَرِّ مَا ذَرَءَ فِي الْأَرْضِ وَشَرِّ مَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمِنْ فِتَنِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَمِن طَوَارِقِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ إِلَّا طَارِقَا يَطْرُقُ بِخَيْرٍ يَا رَحْمَنُ . -(মোআত্তা মালেক)
৩২. শয়তানের কাছে প্রিয়তর কাজ:
আবু মূসা আশআরী থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সকাল হলে ইবলিশ নিজ বাহিনীকে ছড়িয়ে দেয় এবং ঘোষণা দেয়, যে শয়তান কোন মুসলমানকে গোমরাহ করতে পারবে, আমি তাকে মুকুট পরিয়ে দেবো। বর্ণনাকারী বলেন, এক শয়তান এসে বলে, আমি অমুক ব্যক্তির পেছনে লাগা ছিলাম যে পর্যন্ত না সে নিজ স্ত্রীকে তালাক দিয়েছে। ইবলিশ জবাব দেয়, শীঘ্রই সে আরেকটা বিয়ে করে ফেলবে। অন্য এক শয়তান এসে রিপোর্ট দেয় যে, আমি অমুককে তার মাতা-পিতার সাথে অবাধ্য করে ছেড়েছি। ইবলিশ উত্তর দেয়, সহসাই সে পুনরায় মাতা-পিতার বাধ্য ও অনুগত হয়ে যাবে। অন্য আরেক শয়তান এসে রিপোর্ট করে যে, আমি অমুককে মদপান করিয়েছি। ইবলিশ বলে, তুমিই (ঠিক করেছ) আরেক শয়তান এসে রিপোর্ট করে যে, আমি অমুককে দিয়ে যেনা-ব্যভিচার করিয়েছি। ইবলিশ বলে, তুমিই (যথার্থ কাজ করেছ) আরেক শয়তান এসে বলে। অমুককে হত্যা করিয়েছি। ইবলিশ বলে তুমিই-তুমিই (যথার্থ কাজ করেছ।) ১.
এ বর্ণনায় দেখা যায়, মাদকতা, যেনা-ব্যভিচার ও হত্যাকাণ্ড শয়তানের প্রিয়তম কাজ। সে এগুলো করানোর জন্য মানুষকে উৎসাহিত করে।
আল্লামা তারতুশী তাঁর 'তাহরীমুল ফাওয়াহেশ' গ্রন্থে শুজা বিন আরি নাসারের বরাত দিয়ে লিখেছেন। শুজা সিরিয়ার জনৈক ব্যক্তির কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর নবী সোলায়মান বিন দাউদ জিনের এক দৈত্যকে জিজ্ঞেস করেন, তোর ধ্বংস হোক, ইবলিশ কোথায়? সে উত্তরে বলে, হে আল্লাহর নবী! চলুন - আমি আপনাকে তার কাছে নিয়ে যাবো। দৈত্য সোলায়মান (আঃ)-কে সাথে নিয়ে সাগরে পৌঁছল। তখন ইবলিশ পানির উপর বিছানায় বসা। সোলায়মান (আঃ)-কে দেখে সে আতঙ্কিত ও ভীত হল এবং দাঁড়িয়ে সাক্ষাত করল। সে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর নবী! আমার প্রতি কি আপনার কোন আদেশ আছে? তিনি বলেন, না। কিন্তু আমি তোর কাছে এসেছি একটি বিষয়ে জানার জন্য। তোর কাছে কোন্ জিনিস সর্বাধিক প্রিয় যা আল্লাহর কাছে সর্বাধিক অপ্রিয়? ইবলিশ বলে, আল্লাহর কসম, আপনি আমার কাছে না আসলে আমি আপনাকে তা বলতাম না। আল্লাহর কাছে পুরুষে পুরুষে সমকামিতা এবং নারীতে নারীতে সমকামিতা অপেক্ষা সর্বাধিক অপ্রিয় জিনিস অন্য কিছু নেই। ১
আসেম আল-আহওয়াল হাসান বসরী থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, শয়তানের রয়েছে একটি চামচ ও সুরমাদানী। তার চামচ হচ্ছে মিথ্যা, আর সুরমাদানী হচ্ছে, জিকরের সময় ঘুম। ২
৩৩. দীনি মজলিশ ভাঙ্গার কৌশল:
ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'শয়তান জিকরের মজলিশের লোকদেরকে ফেতনায় ফেলার জন্য মজলিশে চক্কর লাগিয়ে তাদেরকে পৃথক করতে ব্যর্থ হয়। তারপর সে দুনিয়াবী আলোচনার মজলিশে হাজির হয়ে তাদের মধ্যে লড়াই-ঝগড়া শুরুর পাঁয়তারা চালায়। লড়াই শুরু হওয়ার পর জিকরের মজলিশের লোকেরা উঠে যায় এবং ঐ মজলিশে চলে যায়।' (আহমদ)
ওহাব বিন মোনাব্বেহ বলেছেন, এক ছিল রোজাদার আবেদ। শয়তান তাকে বিভ্রান্ত করতে ব্যর্থ হয়ে বলে, আমি মানুষকে কিভাবে গোমরাহ করি আপনি কি তা জানবেন না? তিনি বলেন, 'হাঁ'। তুই মানুষকে কিভাবে গোমরাহ করিস তা আমাকে বল্। শয়তান জবাব দেয়। আমি কার্পণ্য ও মাদকতা দ্বারা মানুষকে গোমরাহ করি। মানুষ যখন কৃপণ হয় তখন আমরা তার সম্পদকে তার চোখে কম দেখাই এবং অন্যের সম্পদের প্রতি তার লোভ সৃষ্টি করি। আর যদি মাতাল হয়, তাহলে আমরা তাকে তার নফসের চাহিদা পূরণের জন্য ছাগলকে যেভাবে কানে ধরে টেনে নেয়া হয় সেভাবে টেনে নিয়ে যাই। ১
খায়সামা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, লোকেরা বলে : শয়তান বলে, বনি আদম কিভাবে আমার উপর জয়লাভ করবে? যখন সে রাজী-খুশী অবস্থায় থাকে, তখন আমি তার হৃদয়ে আসন গ্রহণ করি। আর রাগ হলে তার মাথায় আসন গ্রহণ করি। ২. অর্থাৎ কোন অবস্থাতেই শয়তান আদম সন্তানকে ছাড়ে না। সকল অবস্থার সদ্ব্যবহার করে তাকে গোমরাহ করে।
এ বক্তব্যের সমর্থনে বোখারী শরীফে আবু হোরায়রা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীস উল্লেখ করা যায়। এক ব্যক্তি নবী (সঃ)-এর কাছে উপদেশ প্রার্থনা করেন। তিনি উপদেশ দেন যে, 'রাগ কর না।' তিনি একথা কয়েকবার বলেন।'
হাদীসে আরো এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, 'নিশ্চয়ই ক্রোধ শয়তান থেকে আসে। শয়তানের সৃষ্টি আগুন থেকে। পানি দ্বারা আগুন নিভানো হয়। তোমাদের কেউ রাগান্বিত হলে অজু করে আসবে।' (বোখারী, আহমদ, তিরমিজী, হাকেম)
৩৫. সাহাবায়ে কেরামের কাছে শয়তানের ব্যর্থতা :
সাবেত বানানী বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে রাসূল করে পাঠানো হল, তখন ইবলিশ নিজ শয়তান বাহিনীকে সাহাবায়ে কেরামের নিকট পাঠায়। তারা তাঁদের কাছে থেকে শূন্য রিপোর্ট নিয়ে ইবলিশের কাছে ফিরে যায়। ইবলিশ জিজ্ঞেস করে, তোমাদের কি হল? তোমরা কেন তাদেরকে ওয়াসওয়াসা দিতে ব্যর্থ হলে? শয়তানেরা জবাবে বলে : আমরা তাদের মত এমন সম্প্রদায় আর কখনো দেখিনি। তখন ইবলিশ বলে : তাদের সাথে ধীরে চল এবং দেখ, যখন তাদের জন্য দুনিয়া খুলে দেয়া হবে, তখন তোমরা তাদেরকে প্রতারিত করতে পারবে। ৩
৩৬. ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের মৃত্যুর সময় শয়তানের ওয়াসওয়াসা :
ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের ছেলে সালেহ বলেন, আমি আমার পিতাকে। মৃত্যুর সময় বারবার একথা বলতে শুনেছি 'না, এখন নয়, পরে।' তখন আমি আমার আব্বাকে জিজ্ঞেস করি, এটা কি? তিনি উত্তরে বলেন, এতো শয়তান আমার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সে আমাকে বলে, হে আহমদ। আমাকে মাসলা বলুন। আমি উত্তরে বলে যাচ্ছি: 'না, এখন নয়, পরে।' ৪.
৩৭. অপচয় শয়তানী কাজ: আল্লাহ অপচয়কে অপসন্দ করেন। তিনি কুরআনে বলেছেন: “নিশ্চয়ই অপচয়কারী শয়তানের ভাই।” খাওয়া-পরা, চলাফেরা ও সকল কাজে অপচয় নিন্দনীয়। এমনকি ঘরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিছানাও সেই অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'ঘরে একটি বিছানা স্বামীর জন্য, একটি স্ত্রীর জন্য, ৩য়টি মেহমানের জন্য এবং ৪র্থটি শয়তানের জন্য।' -(মুসলিম, আবু দাউদ, নাসাঈ)
ধনী ও বড় লোকদের বাড়িতে এ জাতীয় বাহুল্য ও অপচয় লক্ষ্যণীয়। অথচ, পৃথিবীতে বহু অভাবী লোক আছে, যাদেরকে অপচয়ের উদ্বৃত্ত অর্থ দান করলে সমাজের বিরাট কল্যাণ হয় এবং ব্যক্তি অপচয়কারীর মন্দ গুণে ভূষিত হওয়ার পরিবর্তে দাতার গুণে ভূষিত হতে পারে।
৩৮. ইবলিশের বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত ৫ সন্তান: মুজাহিদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, ইবলিশের বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত পাঁচ সন্তান আছে। সে তাদের প্রত্যেককে একটি বিশেষ কাজে নিয়োজিত রেখেছে। সম্ভানগুলোর নাম হচ্ছে: ১. সাবার ২. আও'য়ার ৩. মাসউত ৪. দাসেম ৫. যালাবনুর।
সাবার: বিপদ-মুসীবতগ্রস্ত লোকের নিকট যায় এবং তাদেরকে মাতম, হায়-হুতাশ এবং জাহেলিয়ার পদ্ধতি অনুযায়ী বুকের কাপড় ফাঁড়া ও গাল থাপড়ানোর আদেশ দেয়।
আও'য়ার: লোকদেরকে যেনা-ব্যভিচারের নির্দেশ দেয় এবং এ কাজটিকে আকর্ষণীয় করে দেখায়।
মাসউত: মিথ্যা খবর ছড়ায়। সে লোকদেরকে মিথ্যা খবর বলে। শয়তানের এক সন্তান মাসউত মিথ্যা খবর ছড়ায়। ফলে কোন লোক মিথ্যা খবর শুনে তা নিজ সম্প্রদায়ের কাছে গিয়ে এভাবে বলে যে, আমি এক লোককে এরূপ বলতে শুনেছি। আমি তার চেহারা চিনি, কিন্তু নাম জানি না।
দাসেম: ব্যক্তির সাথে তার পরিবারে প্রবেশ করে, তাদের মধ্যে দোষত্রুটি দেখায় এবং তাদের বিরুদ্ধে তাকে অসন্তুষ্ট করে তোলে।
বালাবনুর: বাজারের দায়িত্বে নিয়োজিত। সে বাজারে নিজ ঝাণ্ডা প্রোথিত করে। ১.
৩৯. বদরের যুদ্ধে কাফেরদের পক্ষে শয়তানের তৎপরতা: শয়তান বদর যুদ্ধের দিন কাফেরদের পক্ষে অংশগ্রহণ করে এবং তাদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উৎসাহ যোগায়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ কোরআন মজীদে বলেছেন: 'আর যখন শয়তান তাদের কার্যকলাপকে তাদের কাছে সুন্দর করে দেখাল এবং বলল যে, আজকের দিনে কোন মানুষই তোমাদের উপর বিজয়ী হতে পারবে না, আর আমি হলাম তোমাদের সমর্থক। অতঃপর যখন উভয় বাহিনী সামনা-সামনি হল, তখন সে দ্রুত পায়ে পেছন দিকে পালিয়ে গেল এবং বলল: "আমি তোমাদের সাথে নেই, আমি যা দেখছি, তোমরা তা দেখছ না। আমি আল্লাহকে ভয় করি। আর আল্লাহর আজাব অত্যন্ত কঠিন।" (সূরা আনফাল-৪৮)
শয়তান বদর যুদ্ধে সুরাকা বিন মালেক মোদলেজীর বেশে হাজির হল। সুরাকা বনি কানানা গোত্রের একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন। ইবলিশ তাদেরকে কানানা গোত্রের সাহায্যসহ বিজয়ের নিশ্চয়তা দেয়। যুদ্ধ শুরু হলে আল্লাহ মুসলমানদের উদ্দেশ্যে ফেরেশতা পাঠান। শয়তান তা দেখে ভেগে যায়। কাফেরদের পরাজয়ের পর তারা মক্কা ফিরে আসে এবং সোরাকাকে অভিযুক্ত করে বলে, আমাদের পরাজয়ের জন্য তুমিই দায়ী। সোরাকা জবাবে বলেন, আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের এ অভিযোগের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট নই, আমি বদর যুদ্ধে মোটেই অংশগ্রহণ করিনি এবং তোমাদের পরাজয়ের জন্য আদৌ দায়ী নই। তারা তার কথা মোটেই বিশ্বাস করল না, যে পর্যন্ত না তারা ইসলাম গ্রহণ করল। মুসলমান হওয়ার পর তারা কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে সোরাকার কথার সত্যতা বুঝতে পারল যে, সে দিন ইবলিশ তাঁর বেশ ধারণ করে ইসলামের মূলোৎপাটনের জন্য কাফেরদেরকে উৎসাহ যুগিয়েছিল। এভাবে শয়তান মুসলমানদের কঠিন মুহূর্তে দুশমনী প্রদর্শন করে কাফেরদেরকে মদদ যোগায়।
৪০. দারুন নাদওয়ায় কোরাইশদের সভায় ইблиশের উপস্থিতি: মক্কার কোরাইশরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়ে তাঁর ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মসজিদে হারামের পাশে অবস্থিত কুসাই বিন কেলাবের ঘরে মিলিত হয়। এটাই ছিল তাদের পার্লামেন্ট। এ ঘরে বসেই তারা যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত। তখন ইবলিশ নাজদের এক সম্ভ্রান্ত শেখের পরিচয় দিয়ে বলে, আমি মোহাম্মদের ব্যাপারে আপনাদের শলা-পরামর্শে অংশগ্রহণের জন্য এসেছি। আশাকরি আপনারা আমার মতামত শুনবেন। আলোচনা শুরু হল। একজন প্রস্তাব দিল, তাঁকে বন্দী করে রাখা হোক। ইতিপূর্বে মক্কার প্রখ্যাত কবি যোহাইর ও নাবেগাকেও এমনিভাবেই বন্দী করে রাখার পর তারা মৃত্যুবরণ করেছে। আল্লাহর দুশমন নাজদী শেখ বলল: আমি আপনাদের এ মতের সাথে দ্বিমত পোষণ করি। কেননা, পরে তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁকে বের করে নেবে, তাঁকে হেফাজত করবে এবং শেষ পর্যন্ত আপনাদেরকে মক্কা থেকে বহিষ্কার করবে। অন্য চিন্তা করুন। একজন বলল: মোহাম্মদকে আমাদের থেকে বহিষ্কার করে দিলেই সকল সংকট মিটে যাবে। তিনি মক্কা থেকে বের হয়ে চলে গেলে আমাদের আর কোন ক্ষতি করতে পারবেন না। তখন তাঁর সংকট অন্যদের সাথে শুরু হবে। নাজদী শেখ বলেন: আমি আপনাদের এ মতের প্রতিও সমর্থন দিতে পারছি না। আপনারা কি তাঁর সুমধুর তেলাওয়াত, ভাষার সাবলীলতা এবং মন মাতানো সূর লক্ষ্য করেন না? আপনারা তাঁকে বের করে দিলে তিনি অন্যান্য আরবদের কাছে তাঁর বাণী প্রচার করে তাদেরকে আকৃষ্ট করবেন। সকল আরব সম্মিলিতভাবে আপনাদেরকে মক্কা থেকে বের করে দেবে এবং সরদারদেরকে হত্যা করবে। উপস্থিত সদস্যরা তার কথাকে সত্য গণ্য করল। এবার আবু জাহল বলল: আমার প্রস্তাব হল, প্রত্যেক গোত্র থেকে একেকজন যুবক সতেজ তলোয়ার নিয়ে মোহাম্মদকে একসাথে আঘাত করে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলবে। তাঁকে হত্যা করলে পরে সকল গোত্র তাঁর রক্তপণের টাকা ভাগ করে পরিশোধ করবে। কেননা, আমার মতে, বনি হাশেমের পক্ষে সকল কোরাইশ গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা সম্ভব নয়। তখন তারা রক্তৃপণ গ্রহণ করতে বাধ্য হবে এবং আমরাও দুশ্চিন্তামুক্ত হবো। অভিশপ্ত নাজদী শেখ বলল: এটাই উত্তম প্রস্তাব। এরপর জিবরীল (আঃ) এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নিজ ঘরে রাত্রি যাপন করতে নিষেধ করেন এবং হিজরতের নির্দেশ দেন। তিনি হযরত আলীকে নিজের বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তাঁর কাছে মানুষের আমানত বুঝিয়ে দেন এবং ঘর ঘেরাওকারী ১২ জন কোরাইশ যুবকের প্রতি একমুষ্ঠি বালু নিক্ষেপ করে বেরিয়ে পড়েন। এভাবে, আল্লাহ ইবলিশ এবং কাফেরদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেন।
৪১. ওহুদ যুদ্ধে শয়তানের চিৎকার
ওহুদ যুদ্ধের প্রথম অংশে মুসলমানরা বিজয়ী হয়েছিল। পরের অংশে মহানবীর আদেশ লংঘন করায় মুসলমানদের দুঃখ-দুর্দশা চরমে পৌঁছেছিল। মোসআব বিন ওমাইর ছিলেন মহানবীর রক্ষী ও যুদ্ধের পতাকাবাহী। তিনি শহীদ হন। মহানবী (সঃ) হযরত আলীকে যুদ্ধের পতাকা দেন। ইবনে কামিআ লাইসী মোসআব (রাঃ)-কে শহীদ করার পর রটায় যে, সে মহানবীকে হত্যা করেছে। তখন শয়তান অত্যন্ত জোরে চিৎকার দিয়ে বলে, মোহাম্মদ নিহত হয়েছে। এতে মুসলমানরা হতোদ্যোম হয়ে যায়। কিন্তু সর্বপ্রথম কা'ব বিন মালেক মহানবীকে সনাক্ত করেন এবং জোরে বলেন: হে মুসলমানগণ! তিনি জীবিত আছেন। এরপর মুসলমানরা এসে মহানবীর চারপাশে জড় হন।
শয়তান এমন কঠোর বিপদের মুহূর্তে মুসলমানদেরকে হতাশ করার জন্য ঐ মিথ্যা আওয়াজ দিয়েছিল।
৪২. ওমর (রাঃ)-কে দেখে শয়তান ভয় পায়: সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস থেকে বর্ণিত। নবী (সঃ) ওমর (রাঃ)-কে বলেন: 'হে ইবনুল খাত্তাব। যার হাতে আমার প্রাণ সে সত্ত্বার শপথ করে বলছি: তুমি যে রাস্তায় চল, শয়তান তোমাকে দেখে অন্য রাস্তায় চলে যায়।' (বোখারী-মুসলিম) অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে হযরত ওমরের কঠোরতা শয়তানের হৃদকম্পন সৃষ্টি করে।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরো বলেছেন: 'হে ওমর। শয়তান তোমাকে দেখে ভয় পায়।' (নাসাঈ, তিরমিজী) হযরত আয়েশা থেকে বর্ণিত। 'রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: আমি মানুষ ও জিন শয়তানকে দেখি তারা ওমরকে দেখে ভেগে যায়।' (তিরমিজী) হযরত ওমরের মত মজবুত ঈমান দরকার। তাহলে শয়তান ভয় পাবে।
৪৩. আম্মার বিন ইয়াসারের সাথে শয়তানের যুদ্ধ: আম্মার বিন ইয়াসার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সমভিব্যাহারে জিন ও মানুষের সাথে লড়াই করেছি। প্রশ্ন করা হল, কিভাবে? তিনি বলেন: আমরা এক সফরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম। পথে এক জায়গায় অবতরণ করলাম। আমি বালতি ও মশক নিয়ে পানির জন্য বের হলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন: পানির স্থানে এক ব্যক্তি তোমাকে পানি আনতে বাধার সৃষ্টি করবে। আম্মার বলেন, আমি কূপে পৌঁছার পর এক কৃষ্ণাঙ্গকে দেখতে পেলাম, যেন সে ঘোড়ার মত। সে বলল, আল্লাহর কসম। আজ এক বালতি পানিও নিতে পারবে না। আমি তার সাথে লড়াই ও ধস্তাধস্তি শুরু করলাম। তারপর আমি একটি পাথর নিক্ষেপ করে তার নাক-মুখ ভেঙ্গে দিয়েছি এবং পানির মশক ভর্তি করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে পৌঁছেছি। তিনি জিজ্ঞেস করেন, তোমার কাছে কি কেউ এসেছিল? তিনি বলেন, 'হাঁ'। তারপর আমি তাঁর কাছে সকল ঘটনা বর্ণনা করি। তিনি জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি জান সে কে? আমি জবাব দেই, 'না।' তিনি বলেন: সেটা হচ্ছে, শয়তান। (ইবনু আবিদ দুনিয়া) অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, আম্মার বলেন, আমি যদি জানতাম যে, সে শয়তান, তাহলে তাকে হত্যা করতাম। তা না জানার কারণে আমি কেবল তার নাক বাঁকা করে দিয়েছি। ১ এ ঘটনা দ্বারা বুঝা যায় যে, শয়তান মানুষের সাধারণ কল্যাণেরও বিরোধী।
৪৪. আজান শুনলে শয়তান ভাগে:
আল্লাহর নাম শুনলে শয়তান থাকতে পারে না। সে পালিয়ে যায়। আজানে যেহেতু আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয়, সেজন্য সে আজান শুনে পালিয়ে যায়। আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'যখন নামাজের জন্য আজান দেয়া হয় তখন শয়তান পালিয়ে যায় এবং জোরে বাতাস ছাড়তে থাকে যেন আজানের আওয়াজ শুনতে না পায়। তারপর কেউ হাই তুললে সে তার কাছে আসে এবং তার মনে বিভিন্ন ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করে বলে: তুমি এটা-ওটা মনে কর, অথচ সে পূর্বে তা মনে করেনি তারপর ব্যক্তি ভুলে যায় যে, সে কত রাকাত নামাজ পড়েছে।' (বোখারী, মুসলিম) অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, আজান শেষ হলে সে পুনরায় ফিরে আসে। শয়তান তাড়ানোর জন্য আজান হচ্ছে মোক্ষম অস্ত্র।
৪৫. জামআতবিহীন লোকের সঙ্গী শয়তান:
হযরত ওমার বিন খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের উদ্দেশ্যে এক ভাষণে বলেন: তোমাদের কেউ যদি জান্নাত লাভ করতে চায়, সে যেন জামাআতের সাথে থাকে। নিশ্চয়ই, শয়তান একজনের সাথে থাকে। দু'জন হলে শয়তান তাদের থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে।' (আহমদ, তিরমিজী) এ হাদীসে একাকী জিন্দেগীর পরিবর্তে জামাআতী জিন্দেগী যাপনের তাকিদ দেয়া হয়েছে। দলীয় জিন্দেগীর প্রভাব ও বরকতের কারণে শয়তান সেখানে বেশি সুবিধে করতে পারে না। দল থেকে বিচ্ছিন্ন লোককে সে যে কোন সময় ঘাড় মটকাতে পারে।
উসামা বিন শরীক বলেন, আমি নবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ يَدُ اللَّهِ عَلَى الْجَمَاعَةِ فَإِذَا شَدَّ الشَّاذُّ مِنْهُمْ اخْتَطَفَتْهُ الشَّيَاطِينِ كَمَا يَخْطِفُ الذِّئْبُ الشَّاةَ مِنَ الْغَنَمِ .
'জামাআতের উপর আল্লাহর রহমতের হাত রয়েছে। কেউ জামআত থেকে দূরে অবস্থান করলে শয়তান তাকে এমনভাবে ছোঁ মারে যেমন করে পাল থেকে বিচ্ছিন্ন ভেড়া বকরীকে নেকড়ে বাঘ ছোঁ মারে।' (দারু কোতনী)
ওরওয়া থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'জামাআতের উপর আল্লাহর হাত। শয়তান জামআত বিরোধী লোকের সাথে আছে।' (জমউল জাওয়ামে'- আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ূতী) ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজ হাতে একটি রেখা টেনে বললেন: 'এটাই আল্লাহর সহজ সরল পথ, এরই অনুসরণ কর বিভিন্ন পথ ও মতের অনুসরণ করো না; তাহলে তোমরা তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে।' (আহমদ)
মুআ'জ বিন জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন : 'নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের নেকড়ে বাঘ। যেমন করে ভেড়া--বকরীর শত্রু হচ্ছে নেকড়ে বাঘ, যা দলচ্যুত ও দূরে অবস্থানকারী মেষকে ধরে ফেলে। তোমরা বিশেষ করে সংকীর্ণ গিরি পথে চলার ব্যাপার সতর্ক থাকবে। তোমরা অবশ্যই জামআত, দলীয় জীবন ও মসজিদে যাওয়া অব্যাহত রাখবে।' (আহমদ)
উপরোক্ত হাদীসসমূহে মুসলিম মিল্লাতের ঐক্যবদ্ধ সামষ্টিক জীবন বা জামাআতী জিন্দেগী এবং মসজিদে জামআতে নামাজ পড়ার ব্যাপারে তাকিদ রয়েছে। তাই দলীয় ও ঐক্যবদ্ধ জীবন-যাপন ছাড়া মুসলমানের ঈমান সুসংহত হতে পারে না এবং যে কোন ভাল ও ঈমানী কাজও সুসম্পন্ন হতে পারে না। এজন্য মুসলমানদেরক বিচ্ছিন্ন জীবন-যাপন করলে চলবে না।
৪৬. তিন জিনিস শয়তানের সাফল্যের হাতিয়ার : 'আযুরিয়াত' গ্রন্থে আমর বিন কায়েস আল-মালাঈ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন : 'ইবলিশ বলেছে, যার মধ্যে তিনটি বিষয় থাকবে আমি তার উপর বিজয় লাভ করবো। ১. যে নিজ আমলকে বেশি বেশি বলে ধারণা করে ২. যে নিজ গুনাহকে খাট করে দেখে এবং ৩. নিজ মতের শ্রেষ্ঠত্বের মনোভাব পোষণ করে। ১. এ তিনটি কারণের যেকোন একটি থাকলেই যেখানে মানুষ গোমরাহ হতে বাধ্য, সেখানে তিনটি কারণ থাকলে গোমরাহী চরমে পৌঁছবে তাতে আর কি সন্দেহ থাকতে পারে? কেননা, মানুষের উচিত, অধিক অধিক আমল করা সত্ত্বেও তার চাইতে উত্তম ব্যক্তিদের আমলের তুলনায় সেটাকে অপর্যাপ্ত মনে করা। যে নিজে গুনাহকে ছোট করে দেখে তার পক্ষে যেকোন গুনাহ করাই সম্ভব। আর কেউ অন্যের মতের তোয়াক্কা না করে নিজের মতকে শ্রেষ্ঠ বিবেচনা করলে তার পক্ষে ভাল পরামর্শ লাভ করা সম্ভব নয় যেহেতু তাকে খারাপ পরামর্শের উপরই চলতে হবে।
৪৭. শয়তানের তেলেসমাতি : আবু আবদুর রহমান মোহাম্মদ বিন মোনজের হারাওয়ী ওরফে শাকার তাঁর 'আল-আজায়েব' বইতে লিখেছেন, মোহাম্মদ বিন আসামা বলেছেন, আমি বাগদাদের এক শেখকে বলতে শুনেছি : 'একদিন আব্দুল্লাহ বিন হেলাল কুফার এক গলিতে চলছিলেন। এক ব্যক্তির মধু মাটিতে পড়ে যায় এবং বালকেরা সে মধু চেটে খাওয়া শুরু করে। তারা বলতে থাকে, 'আল্লাহ শয়তানকে অপমান করুন।' আব্দুল্লাহ বিন হেলাল তাদেরকে বলেন: হে বালকেরা। তোমরা শয়তানকে বদদোআ না করে বরং নেক দোআ কর এবং বল: 'আল্লাহ আমাদের পক্ষ থেকে শয়তানকে উত্তম বিনিময় দিন। কেননা, সে আমাদের জন্য মধু মাটিতে ফেলে দিয়েছে।' ইবলিশ আব্দুল্লাহ বিন হেলালের কাছে এসে বলে: আপনি আমাকে গালি না দেয়ার জন্য শিশুদেরকে নিষেধ করায় আপনার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আমি আপনাকে এর বিনিময় দিতে চাই। ইবলিশ তাকে একটি আংটি উপহার দিয়ে বলে: এ আংটির মাধ্যমে আপনি আপনার যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ করতে পারেন।
আমি এবং আমার বাহিনী আপনার কথা শুনতে ও আনুগত্য করতে বাধ্য। দেখা গেল, এরপর আব্দুল্লাহ বিন হেলাল যাই করতে চায় তাই হয়ে যায়। ঐ সময় শাসক হাজ্জাজের কাছে একটি বাঁদী ছিল। হাজ্জাজ তাকে খুব ভালবাসতেন। একদিন হাজ্জাজ নিজ প্রাসাদে এক লোককে কাজে নিয়োগ করেন। লোকটিও বাঁদীটিকে দেখে ভালবেসে ফেলে। এদিকে তার সাথে আব্দুল্লাহ বিন হেলালের বন্ধুত্ব ছিল। সে তাকে বিষয়টি জানাল। আব্দুল্লাহ বলেন, যাও ঘর সাজাও, আমি তাকে তোমার ঘরে নিয়ে আসবো। রাত হলে আব্দুল্লাহ বিন হেলাল বাঁদীকে নিয়ে হাজির হয় এবং ভোর পর্যন্ত বন্ধুর বাড়িতে থাকে। এভাবে অনেকদিন কেটে গেল। ভয়ে ও অনিদ্রায় বাঁদীর শরীরের রং হলুদ হয়ে গেল। হাজ্জাজ বাঁদীকে জিজ্ঞেস করল, তোর কি হল যে, দিনে বেশি বেশি ঘুমাস এবং শরীরের রং-ও হলুদ হয়ে গেছে। সে জবাবে বলে, লোকেরা রাত্রে ঘুমিয়ে পড়লে এক ব্যক্তি এসে আমাকে এক যুবকের ছোট একটি ঘরে নিয়ে যায় এবং আমি সেখানে তার সাথে ভোর পর্যন্ত কাটাই। আবার ভোরে আমি নিজেকে রাজপ্রাসাদে দেখতে পাই। হাজ্জাজ জিজ্ঞেস করল, এজন্য রাজপ্রাসাদের কেউ কি দায়ী? বাঁদী বলল, 'না'। হাজ্জাজ একটি পিরিচে কিছু সুগন্ধি নিয়ে আসার আদেশ দিল এবং বাঁদীকে বলল: তুই সুগন্ধির মধ্যে হাত ডুবিয়ে নে। যুবকের ঘরে পৌঁছার পর তার দরজায় তা মেখে দেবে। সকাল হওয়ার পর হাজ্জাজ দারোয়ানকে পাঠাল ঘরটি খুঁজে বের করার জন্য। তারা যুবকটির ঘর খুঁজে পেল এবং লোকটিকে হাজ্জাজের কাছে হাজির করল। হাজ্জাজ তাকে বলল: আমি তোমাকে নিরাপত্তা দিলাম। তোমার কাহিনীটি আমাকে বল। যুবকটি ঘটনা খুলে বলল। তারপর আব্দুল্লাহ বিন হেলালকেও হাজির করা হল। হাজ্জাজ বলল, হে আল্লাহর দুশমন। তুই দুনিয়ার অন্যান্য সবাইকে বাদ দিয়ে আমার সাথে এ কাজ করলি? হে দাসেরা! বেত ও তলোয়ার নিয়ে আস। আব্দুল্লাহ একটি সুতার গোল আঁটি বের করে হাজ্জাজকে একপাশ ধরার আহ্বান জানিয়ে বলল, আমাকে হত্যা করার আগে আমি আপনাকে একটি চমক দেখাই। আব্দুল্লাহ সুতার আঁটিটিকে বাতাসের প্রতি নিক্ষেপ করে এবং নিজে সুতা ধরে উপরের দিকে উঠে যায়। সে রাজপ্রাসাদের উপরে উঠার পর হাজ্জাজকে বলে, আমাকে কিছু আদেশ করার থাকলে করতে পারেন। তারপর সে অদৃশ্য হয়ে যায়। ১
বর্ণিত আছে, হাজ্জাজ এ ঘটনারও আগে আরেকবার আব্দুল্লাহকে আটক করেছিল। তখন আব্দুল্লাহ মাটির মধ্যে জাহাজের মত রেখা টেনে হাবসের অধিবাসীদেরকে বলল: কেউ বসরা যেতে চাইলে আমার সাথে চলুন। কেউ কেউ তার একথা শুনে ঠাট্টা করল এবং কেউ কেউ তার সাথে আরোহণ করল। এরপর আর কেউ তাকে হাবসে দেখেনি। ২. অর্থাৎ সে অদৃশ্য হয়ে গেল।
এ দু'ঘটনায় প্রমাণিত হল, শয়তান যে কোন গুনাহর কাজ সংঘটিত করার জন্য যেকোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ইতস্ততঃ করে না।
শাকার তাঁর 'আল-আজায়েب' গ্রন্থে আরো লিখেছেন: ইবলিশের বন্ধু হিসেবে খ্যাত আব্দুল্লাহ বিন হেলালের কাছে এক লোক আসল। আব্দুল্লাহ শয়তানের জন্য আসরের নামাজ ত্যাগ করত। ফলে শয়তানের কাছে তার সকল প্রয়োজন পূরণ হত।
একদিন এক লোক আব্দুল্লাহ বিন হেলালকে বলল: আমার এক ধনী প্রতিবেশী আছে। সে আমার উপর সর্বাধিক দয়া ও আনুকূল্য দেখায়। কিন্তু তার এক সুন্দরী মেয়ে আছে। আমি মেয়েটিকে ভালবাসি। আমি আশা করি যে, আপনি মেয়েটাকে অপহরণ করার লক্ষ্যে ইবলিশের কাছে লিখবেন। সে ইবলিশের কাছে লিখল যে, 'আপনি যদি আমার ও আপনার অপেক্ষা নিকৃষ্টতম কোন ব্যক্তিকে দেখতে চান তাহলে, এ পত্রগ্রাহককে দেখুন এবং তার প্রয়োজন পূরণ করে দিন।' ইবলিশ বলল: অমুক জায়গায় গিয়ে. তোমার চারপাশে একটি রেখা টানবে। সেখানে কোন লোক আসলে তাকে এ চিঠিটি দেখাবে। সে তাই করল। একদল লোক তার পাশ দিয়ে চলে গেল। শেষ পর্যন্ত ৪ জন লোক একজন শেখকে খাটে বহন করে নিয়ে আসল। সে দূর থেকে তাকে দেখে তার কাছ থেকে চিঠিটি আনতে নির্দেশ দিল। চিঠির ঠিকানা ও উৎসস্থল দেখে তাতে চুমু দিল, মাথার উপর রাখল ও পরে পড়ল। তারপর এক চিৎকার দিল। ফলে যারাগুলে গিয়েছিল তারা ফিরে আসল এবং অবশিষ্টরা তার অনুসরণ করল। তারা জিজ্ঞেস করল, এটা কি? সে উত্তরে বলল: এটা আমার বন্ধুর চিঠি। চিঠিতে লেখা আছে: 'আপনি যদি আমার ও আপনার অপেক্ষা নিকৃষ্টতম কোন ব্যক্তিকে দেখতে চান তাহলে এ পত্রবাহকের প্রতি তাকান এবং তার প্রয়োজন পূরণ করে দিন।' যাও, তোমরা অন্ধ, বধির ও বোবা শয়তানকে ডেকে আন এবং তাকে ঐ ব্যক্তির ঘরে পাঠাও। যেন তার মেয়েকে অপহরণ করে নিয়ে আসে। ১ এ ঘটনায় শয়তানের সাহায্য এবং তেলেসমাতি ফুটে উঠেছে।
হাফেজ মুহিব আত-তাবারী তাঁর 'আর-রিয়াদ আন্-নাদেরাহ ফি ফাদায়েল আল-আশারা' বইতে লিখেছেন, আ'মাস বলেন, আমি এক রাতে চাঁদের আলোর মধ্যে বের হই। তখন আমার শরীরে একটি জিনিস লাগে। আমি জিজ্ঞেস করি, তুমি মানুষ, না জিন? সে উত্তরে বলে : 'জিন।' আমি আরো জিজ্ঞেস করি, তুমি মুমিন না কাফের? সে বলে, 'মুমিন।' আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করি, তোমাদের মধ্যে কি বেদআত এবং নফসের পূজা আছে? সে বলল: 'আছে', তারপর জিনটি আমাকে বলল: একবার আমার ও এক দৈত্যের মধ্যে হযরত আবু বকর এবং ওমারের বিষয়ে মতবিরোধ হয়। দৈত্য বলে: তারা উভয়ে হযরত আলীর উপর জুলুম-অবিচার করেছে। তখন আমি বললাম, ঠিক আছে, এ মতবিরোধের জন্য কাকে ফয়সালাকারী মানবে? সে বলল, 'ইবলিশকে'। আমরা উভয়ে ইবলিশের কাছে যাই এবং মতবিরোধের ঘটনাটি ব্যক্ত করি। ইবলিশ তা শুনে হেসে দিল। সে বলল: তোমরা সবাই আমার দলের লোক ও সাহায্যকারী এবং ভালবাসার পাত্র। ইবলিশ বলল: আমি কি তোমাদেরকে একটা ঘটনা বলবো? আমরা জবাব দিলাম, 'হাঁ।' ইবলিশ বলল, আমি তোমাদেরকে জানাতে চাই যে, আমি দুনিয়ার আসমানে এক হাজার বছর আল্লাহর ইবাদত করেছি। ফলে আমাকে সেখানে 'আবেদ' (ইবাদতকারী) নামকরণ করা হয়েছে। ২য় আসমানে আমি আরও এক হাজার বছর আল্লাহর ইবাদত করেছি। সেখানে আমাকে 'রাগেব' (আগ্রহী) নামকরণ করা হয়েছে। তারপর আমাকে ৪র্থ আসমানে নেয়া হয়েছে। আমি সেখানে ফেরেশতাদের ১ হাজার সারিকে, আবু বকর ও ওমারের প্রতি ভালবাসা পোষণকারীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে দেখেছি। তারপর আমাকে ৫ম আসমানে নেয়া হয়েছে। সেখানে আমি ৭০ হাজার ফেরেশতার সারিকে আবু বকর ও ওমারের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীদের প্রতি অভিশাপ ও লানত বর্ষণ করতে দেখেছি। ২
৪৮. ইসলামের রাজনীতি-অর্থনীতি ও সংস্কৃতি থেকে দূরে থাকা বৃহত্তম শয়তানী ওয়াসওয়াসা:
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। ইসলামের রয়েছে ব্যক্তি, জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, রাজনৈতিক জীবন, অর্থনৈতিক জীবন ও সাংস্কৃতিক জীবন। ব্যক্তি জীবন থেকে সামষ্টিক জীবনের সর্বত্র ইসলামের আইন ও বিধান মেনে চলা ফরজ।
إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ
“নিঃসন্দেহে আল্লাহর কাছে দ্বীন ও জীবন ব্যবস্থা হিসেবে একমাত্র ইসলামই মনোনীত।” (সূরা আল ইমরান-১৯)
তাই কোন মুসলমান অন্য কোন মতাদর্শ মানতে পারে না। তিনি বিদায় হজ্জের দিন নাজিলকৃত কুরআনের সর্বশেষ আয়াতে ঘোষণা করেন : الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا .
“আজ আমি তোমাদের দীনকে পূর্ণ করে দিলাম, আমার নেয়ামত তোমাদের উপর সম্পন্ন করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দীন হিসেবে পসন্দ করলাম।” (সূরা আল মায়েদা-৩)
দীন পূর্ণাঙ্গ হওয়ায় অন্য কোন মতাদর্শ থেকে কোন কিছু ধার কর্জ করা চলবে না। তিনি আরো বলেন : هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِيْنِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ .
“তিনিই সে মহান সত্ত্বা, যিনি তার রাসূলকে হেদায়েত এবং সত্য দীন সহকারে পাঠিয়েছেন যেন তিনি অন্যান্য সকল জীবন ব্যবস্থার উপর এটাকে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন, যদিও মোশরেকরা তা অপসন্দ করে।” (সূরা সাফ-৯)
এ আয়াতে অন্যান্য জীবনাদর্শ ও মানব রচিত মতবাদের উপর ইসলামী জীবনাদর্শকে বিজয়ী করার কথা বলা হয়েছে।
দীন কায়েম করা ফরজ। আল্লাহর দীন সমাজে কায়েম না থাকলে সে স্থানে মানব রচিত বে-দীনী ব্যবস্থা অবশ্যই এর স্থলাভিষিক্ত হবে। তাই আল্লাহ বলেন : شَرَعَ لَكُمْ مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوْحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ.
“তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের ক্ষেত্রে সে পথই নির্ধারণ করেছেন, যার আদেশ দিয়েছিলেন নূহকে, যা আমি প্রত্যাদেশ করেছি আপনার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না।” (সূরা শুরা-১৩)
এ আয়াতে, একই কারণে দ্বীন কায়েমের জন্য আল্লাহ মহানবী হযরত মোহাম্মদ (আঃ)-সহ পূর্ববর্তী নবী ইবরাহীম, মূসা, ঈসা ও নূহ (আঃ)-কেও আদেশ দিয়েছেন। আর তা করতে হবে সবাইকে সম্মিলিতভাবে, বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে নয়।
আল্লাহ আরো বলেন: مَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ .
"যারা আল্লাহর নাযিলকৃত আইন-বিধান অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করে না, তারা কাফের।” (সূরা আল-মায়েদাহ-৪৪)
তিনি আরো বলেন: مَنْ لَّمْ يَحْكُمُ بِمَا انْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ .
"যে ব্যক্তি আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করে না সে জালেম।” (আল-মায়েদা-৪৫)
তিনি আরো বলেন: مَنْ لَمْ يَحْكُمُ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ .
"যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করে না তারা ফাসেক।” (আল মায়েদা-৪৭)
এ তিনটি আয়াতে, আল্লাহর বিধান ও আইন অনুযায়ী বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ ও রাষ্ট্রের সকল বিভাগের পরিচালনা না করাকে যথাক্রমে কুফরী, জুলুম ও ফিসক (গুনাহ) বলা হয়েছে। আর এটা শয়তানের সবচাইতে বড় ওয়াসওয়াসা।
আল্লাহ আরো বলেছেন: افَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَنْ يفْعَلُ ذَلِكَ مِنْكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَى أَشَدَّ الْعَذَابِ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ .
"তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশের উপর ঈমান আনবে, আর অন্য কিছু অংশের সাথে কুফরী করবে? তোমাদের মধ্যে যারা এরূপ করবে, দুনিয়ায় অপমান ব্যতীত তাদের কোন শাস্তি নেই এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে কঠোরতর আজাবের দিকে প্রত্যাবর্তন করানো হবে। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা থেকে বেখবর নন।” (সূরা-বাকারা-৮৫)
যে সকল মুসলমান শুধু নামাজ-রোজা ও হজ্জ-যাকাতসহ ইসলামের কিছু বিধান মানে, আর রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রদত্ত বিধান ও আইনগুলো মানে না, তাদের বিরুদ্ধেই এ আয়াত বিরাট সতর্কবাণী ঘোষণা করেছে। কোরআন ও হাদীসে এবং মহানবীর জীবনে ইসলামের ঐ সকল দিকের কথা উল্লেখ রয়েছে। তাই মহানবী (সঃ)-কে অনুসরণের জন্য আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُوا اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا .
"তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবনে রয়েছে উত্তম আদর্শ, যারা আল্লাহ ও আখেরাতের আশা করে এবং বেশি বেশি করে আল্লাহকে স্মরণ করি।" (সূরা আহযাব-২১)
মহানবী (সঃ) ইসলামী রাজনীতি ও রাষ্ট্রের কর্ণধার ছিলেন। তিনিই মদীনায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম ইসলামী রাষ্ট্রের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। অপরদিকে তিনি নবুওয়াত এবং রেসালতের দায়িত্বও পালন করেছেন। প্রতিটি মুসলমানকে তাঁর নবী-জীবনের সকল ফরজ-ওয়াজিব এবং সুন্নত পালনের চেষ্টা করতে হবে। রাজনীতি-অর্থনীতির সুন্নতকে বাদ দিয়ে কেবল অন্যান্য সুন্নতের উপর জোর দিলে তাঁর যথার্থ অনুসরণ হবে না।
তাই আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ، إِنَّهُ لَكُمْ cَدُوٌّ مُّبِينٌ .
“হে ঈমানদারগণ, ইসলামে পরিপূর্ণ দাখিল হও এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করোনা; নিঃসন্দেহে, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন।" (বাকারা-২০৮)
পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে হলে ইসলামে পূর্ণাঙ্গ প্রবেশ করতে হবে। আর পূর্ণাঙ্গ প্রবেশের জন্য রাষ্ট্রে ইসলাম কায়েম থাকতে হবে। তা না হয় অর্থনীতির ক্ষেত্রে সুদ, রাজনীতির ক্ষেত্রে মানুষের সার্বভৌমত্ব এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বেহায়াপনা ও বেলেল্লাপনার মোকাবিলা কিভাবে সম্ভব হবে? সরকার ছাড়া ইসলাম বিরোধী তৎপরতা পূর্ণ প্রতিরোধ করা যায় না। আর এগুলো থেকে দূরে থাকার অপর অর্থ হল, শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করা। তাই প্রবাদ আছে:
إِنَّ اللهَ يَزِعُ بِالسُّلْطَانِهِ حَالَا يَزِعُ بِالْقُرْآنِ .
"আল্লাহ সরকার দ্বারা এমন কাজ করান যা শুধু কোরআনের নীতিবাক্য দ্বারা করানো সম্ভব নয়।"
আল্লাহ কোরআন মজীদে বলেছেন:
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولَهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ، وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا .
'আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল কোন বিষয়ে হুকুম দিলে কোন ঈমানদার পুরুষ ও নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন কোন ক্ষমতা ও অধিকার নেই। যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ অমান্য করে সে প্রকাশ্য গোমরাহীতে পতিত হয়।' (সূরা আহযাব-৩৬)
রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং জীবনের অন্যান্য সকল বিভাগে আল্লাহর আদেশ অমান্য করার কোন সুযোগ নেই। তাই দেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে দিয়ে আল্লাহর সকল আইন বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে হবে। ফলে রাজনীতি-অর্থনীতি ও সামষ্টিক বিষয়াদি থেকে দূরে থাকা যাবে না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন:
مَنْ لَمْ يَهْتَمُ بِأَمْرِ الْمُسْلِمِينَ فَلَيْسَ مِنَّا .
"যে ব্যক্তি মুসলমানদের সামষ্টিক বিষয়াদির উপর গুরুত্ব আরোপ করে না, সে আমাদের মধ্যে শামিল নয়।"
এ হাদীস অনুযায়ী সকল মুসলমানকে ইসলামের রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ সকল সামাজিক বিষয়ে ভূমিকা পালন করতে হবে। শুধু নিজের ব্যক্তিগত আমল-ইবাদত করলে চলবে না। নবী (সঃ) আরো বলেছেন:
الْمُلْكُ وَالدِّينُ تُوَامَانِ .
'রাষ্ট্রীয় বিষয় ও দীন জমজ সন্তানের মত অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত।' কাজেই রাজনীতিসহ সকল সামষ্টিক বিষয় ইসলামেরই অংশ। ইসলামের এক অংশ বাদ দিয়ে অন্য অংশের উপর আমলকে সীমিত করা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী ছাড়া আর কিছুই নয়।
সমাজ ও রাষ্ট্রে আল্লাহর দ্বীন এবং কোরআন ও হাদীসের আইন কায়েম করা সব ফরজের বড় ফরজ। কারণ, এর উপরই অন্যান্য অনেক ফরজের বাস্তবায়ন নির্ভর করে। তাই নবী করীম (সঃ) এই দীন ও ইসলামী রাষ্ট্রকে কায়েম ও হেফাজতের জন্য জেহাদ করেছেন। পরবর্তীতে ৪ জন খোলাফায়ে রাশেদা ও, রাষ্ট্রে দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য আমরণ চেষ্টা করে গেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইন্তেকালের পর মুসলমানদের জন্য সর্বোত্তম যুগ বলে বিবেচিত সাহাবায়ে কেরামের যুগে এবং তাঁদেরই সমর্থনে, খেলাফতে রাশেদা নবুওয়াতের পদ্ধতিতে, ৩০ বছর ইসলামী সরকার পরিচালনা করেছে। তার পরবর্তী যুগে কোন তাবেঈ, তাবয়ে তাবেঈ এবং বড় বড় ওলামায়ে কেরাম এবং ইমামগণ এ প্রয়োজনকে অস্বীকার করেন নি। বরং তাঁরা প্রত্যেকেই এ জিহাদী কাফেলায় শরীক ছিলেন। শয়তান এ বিরাট ফরজ থেকেই মুসলমানদেরকে বিচ্যুত করার কাজে বেশি ব্যস্ত।
৪৯. শয়তানের ওয়াসওয়াসার সার্বক্ষণিক চিত্র:
শয়তানের ওয়াসওয়াসাগুলো পৃথক পৃথক শিরোনামে আলোচনার পর আমরা এখন এক হাদীসে শয়তানের গোমরাহীর যে একটি সার্বক্ষণিক চিত্র ফুটে উঠেছে। তা নিয়ে আলোচনা করব।
জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'তোমাদের কেউ নিজ কক্ষের দরজার কাছে আসলে সে যেন সালাম দেয়। এ সালাম তার সাথে বিদ্যমান শয়তানকে তাড়িয়ে দেয়। তারপর তোমরা কক্ষে প্রবেশ করে সালাম দেবে। ফলে কক্ষের মধ্যে বিদ্যমান শয়তান বেরিয়ে যাবে। যানবাহনে আরোহণ করলে প্রথমেই 'বিসমিল্লাহ' পড়বে। তাহলে, শয়তান তোমাদের সাথে সওয়ারীতে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। বিসমিল্লাহ না বললে শয়তান তাতে অংশগ্রহণ করবে। তোমরা বিসমিল্লাহ বলে খাওয়া শুরু করবে, যাতে করে শয়তান সে খাওয়ায় অংশগ্রহণ করতে না পারে। বিসমিল্লাহ না বললে শয়তান খাওয়ায় শরীক হবে। তোমরা নিজ কক্ষে পাগড়ীসহ রাত কাটাবে না। কেননা, তা রাত্রে ঐ অবস্থায় শয়তানের আসন। রুমাল সহকারে রাত কাটাবে না। তা ঐ অবস্থায় তার বিছানা হয়। (অর্থাৎ ঘুমের উপযোগী পোশাক ও পরিবেশে ঘুমাবে) সওয়ারীর পিঠে বিছানো চাদর শোয়ার জন্য বিছাবে না, দরজা বন্ধ না করে ঘরে শুবে না এবং দুর্বল ছাদে রাত যাপন করবে না। কুকুর ও গাধার আওয়াজ শুনলে 'আউজুবিল্লাহ' পড়ে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করবে। কেননা, শয়তানকে না দেখে কুকুর ও গাধা আওয়াজ দেয় না।'১.
এ হাদীস থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, শয়তান সার্বক্ষণিক আদম সন্তানের অকল্যাণ ও ক্ষতিসাধনে ব্যস্ত থাকে। শয়তান থেকে মুক্তি না পেলে মুমিনের দুনিয়া ও আখেরাতের ধ্বংস ছাড়া আর কিছু নেই।
টিকাঃ
১. মোসান্নাফ-আব্দুর রাজ্জাক।
১. হেলইয়া-আবু নাঈম
১. আকামুল মারজান ফি আহকামিল জান-আল্লামা জালালুদ্দিন সুযুতী।
১. আল-এসতেদাদ লিল মাওত, যাইনুদ্দিন আল-মোআব্বারী, মকতাবা আত্-তোরাস আল-ইসলাম। কায়রো, মিসর।
১. জমউল জাওয়ামে'-আল্লামা সুযুতী।
১. আল জামে-আস-সাগীর-আল্লামা সুযুতি। নাসেরুদ্দিন আলবাণী একে সহীহ হাদীস বলেছেন-হাদীস নং-৪৩০৭।
১. আল-আলকাব-শিরাজী: তারীখে বাগদাদ-খতীব: মোসনাদ-আল-ফেরদৌস-দাইলামী।
১. জমউল জাওয়ামে'- আল্লামা সুযুতী।
২. লাকতুল মারজান ফি আহকামিল জান্ন-হাফেজ জালালুদ্দিন সুযুতি।
১. তাওজীহাত ইলা আসহাবিল ফিদিউ ওয়াত্তাসঞ্জীলাত-শেখ আবদুল্লাহ জারুল্লাহ-সৌদী আরব।
১. মাসায়েল-হারব আল-কারমানী।
১. কিতাবুল কালায়েদ-আহমদ বিন আবি শায়বা।
১. হেলইয়া-আবু নাঈম: জমউল জাওয়ামে'-সুযুতী।
১. মোসান্নাফ-আবদুর রাসেক ও ইবনু আবি শায়বা।
১. আমলুল ইয়াওম ওয়াল্ লাইল-ইবনুস সুন্নী।
১. আকামুল মারজান-কাজী বদরুদ্দিন শিবলী
১. লাকতুল মারজান ফি আহকামিল জান-জালালুদ্দিন সুয়ূতী।
১. লাকতুল মারজান ফি আহকামিল জান-জালালুদ্দিন সুয়ুতী।
১. আকামুল মারজান ফি গারায়েবিল আখবার ওয়া আহকামিল জান-কাজী বদরুদ্দিন শিবলি।
১. গারায়েব ওয়া আজায়েবুল জিন-কাজী বদরুদ্দিন শিবলী।
২. ঐ
১. গারায়েব ওয়া আজায়েবুল জিন- কাজী, বদরুদ্দিন শিবলী।
২. ঐ
৩. ঐ
৪. আকামুল মারজান ফি আহকামিল জান- আল্লামা জালালুদ্দিন সুযুতী।
১. গারায়েব ওয়া আজায়েবুল জিন-কাজী বদরুদ্দিন শিবলী।
১. আকামুল মারজান ফি আহকামিল জান- আল্লামা জালালুদ্দিন সুযুতী।
১. লাকতুল মারজান ফি আহকামিল জান-আল্লামা জালালুদ্দিন সুযুতী।
২. ঐ
১. আকামুল মারজান ফি আহকামিল জান-আল্লামা সুয়ূতী।
২. ঐ
১. ঐ
২. ঐ
১. জমউল জাওয়ামে'-আল্লামা সুষুতী।