📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 জিন মানুষকে ভয় পায়

📄 জিন মানুষকে ভয় পায়


আবু বকর ইবনু আবিদ দুনিয়া বর্ণনাকারীদের সূত্র পরম্পরায় মোজাহিদ থেকে বর্ণনা করেছেন। মোজাহিদ বলেন একরাতে আমি নামাজ পড়ছি। আমার সামনে একটি বালক দাঁড়িয়ে গেল। আমি তাকে শক্তভাবে ধরার জন্য তৈরি হলাম। সে লাফ দিয়ে দেয়ালের ঐ পার্শ্বে পড়ে গেল। আমি তার পড়ার শব্দ শুনেছি। এরপর সে আর কখনও আসেনি। এটি ছিল জিন। মোজাহিদ বলেন তারা তোমাদেরকে সেরূপ ভয় পায় তোমরা তাদেরকে যে রূপ ভয় পাও।
ইবনু আবিদ দুনিয়া মোআসসার বিন কাদ্দাম এবং তিনি আবু শারাআহ নামক এক বৃদ্ধ লোক থেকে বর্ণনা করেন যে, ইয়াহইয়া বিন হাজ্জার আমাকে দেখলেন। আমি রাত্রে অলি-গলিতে ভয় পেতাম। তিনি বলেন: তুমি যাকে ভয় কর সে তোমাকে দেখে আরো কঠোর ভয় পায়। মোজাহিদ বলেন: শয়তান তোমাদেরকে দেখে ভীষণ ভয় পায়। সে তোমাদের কাছে আসলে তোমরা বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তাহলে সে তোমাদের উপর সওয়ার হবে। বরং তোমরা শক্ত হও, সে ভেগে যাবে।
জিন যে আকৃতি ধারণ করে তার মধ্যে সে পরিমাণ শক্তিই থাকে। আর এখানেই তার দুর্বলতা এবং এ কারণেই সে মানুষকে ভয় পায়।
এছাড়াও আল্লাহ কোরআন মজীদে বলেছেন: وَمَا كَانَ لَهُ عَلَيْهِمْ مِنْ سُلْطَانٍ إِلَّا لِنَعْلَمَ مَنْ يُؤْمِنُ بِالْآخِرَةِ مِمَّنْ هُوَ مِنْهَا فِي شَكٍّ .
"তাদের উপর শয়তানের কোন শক্তি নেই। কিন্তু আমরা শয়তানকে তাদের উপর প্রাধান্য বিস্তারের সুযোগ দিয়ে সন্দেহবাদী থেকে সত্যিকার মোমেন কে তা জেনে নেই।" মানুষ নিজেই নিজের কামনা-বাসনার কাছে দুর্বল হয়ে যায়। তখন শয়তান বিজয়ী হয়। ইবলিশ মানুষের কাছে নিজ ধারণাকে সত্য প্রমাণিত করে দেখায়। তখন শক্তিশালী মানুষ শয়তানের কাছে নিজশক্তি সত্ত্বেও দুর্বল হয়ে যায়। আসলে মানুষই শক্তিশালী। সে ইচ্ছা করলে শয়তানের কথা নাও শুনতে পারে। বরং শয়তানকেই সে দূরে সরিয়ে দিতে সক্ষম। কিন্তু ভোগ-বিলাস ও কামনা বাসনার কারণে মানুষের বিবেক লোপ পায়। আর এভাবেই গোমরাহী তাকে হাতছানি দেয়।
বহু নেক ও বুজুর্গ মানুষ দুনিয়ায় আছে যারা শয়তানের আনুগত্য ও ওয়াসওয়াসা থেকে বহু দূরে। এলেম ও আমলের কারণে তারা শয়তানী ওয়াসওয়াসা বুঝতে পারে এবং তা থেকে দূরেও থাকতে পারে। সকল মোমেনের এরূপ হওয়াই কাম্য।।

📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 জিন মানুষের অনুগত হয়

📄 জিন মানুষের অনুগত হয়


জিন মানুষের অনুগত ও বাধ্য হয়। এ মর্মে কোরআনে প্রমাণ আছে, আল্লাহ বলেন: وَمِنَ الشَّيَاطِينِ مَنْ يَغُوضُونَ لَهُ وَيَعْمَلُونَ عَمَلًا دُونَ ذَلِكَ وَكُنَّا لَهُمْ حَافِظِينَ .
"আর হযরত সোলায়মান (আঃ)-এর অধীন করেছি কিছু জিন শয়তানকে যারা তাঁর জন্য ডুবুরীর কাজ করত এবং এছাড়া আরও অনেকে অন্য কাজ করত। আমি তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখতাম।” (সূরা আম্বিয়া-৮২)
আল্লাহ বলেন: وَحُشِرَ لِسُلَيْمَانَ جُنُودُهُ مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ وَالطَّيْرِ فَهُمْ يُوزَعُونَ .
"সোলায়মানের সামনে তার সেনাবাহিনীকে সমবেত করা হল। জিন, মানুষ ও পক্ষীকূলকে, তারপর তাদেরকে বিভিন্ন ব্যুহে বিভক্ত করা হল।” (সূরা নামল-১৭) এ আয়াতে জিন সৈন্যরা হযরত সোলায়মানের নেতৃত্বাধীন ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আল্লাহ আরো বলেন: وَمِنَ الْجِنِّ مَنْ يَعْمَلُ بَيْنَ يَدَيْهِ بِإِذْنِ رَبِّهِ وَمَنْ يَزِغْ مِنْهُمْ عَنْ أَمْرِنَا نُذِقْهُ مِنْ عَذَابِ السَّعِيرِ ، يَعْمَلُونَ لَهُ مَا يَشَاءُ مِنْ مَّحَارِيبَ وَتَمَاثِيْلَ وَجِفَانِ كَا الْجَوَابِ وَقُدُورِ رَّاسِيَاتٍ .
"কিছু জিন তার সামনে কাজ করত তার পালনকর্তার আদেশে। তাদের যে কেউ আমার আদেশ অমান্য করবে, আমি তাকে জ্বলন্ত আগুনের শাস্তির স্বাদগ্রহণ করাবো। তারা সোলায়মানের ইচ্ছানুযায়ী দুর্গ, ভাস্কর্য, হাউজের মতবৃহদাকার পাত্র এবং চুল্লীর উপর স্থাপিত বিশাল ডেগ নির্মাণ করত।” (সূরা সাবা-১২) এ আয়াতে, জিনেরা আল্লাহর আদেশে হযরত সোলায়মান (আঃ) এর জন্য কাজ করত এবং তারা তার আদেশ মেনে চলত বলে স্পষ্ট হয়েছে।
আল্লাহ আরো বলেন: والشَّيَاطِينَ كُلَّ بَنَاءٍ وَغَوَاصٍ * وَاخِرِيْنَ مُقَرَّنِينَ فِي الْأَصْفَادِ .
"আর শয়তানগুলোকে তার (সোলায়মানের) অনুগত করে দিলাম অর্থাৎ যারা ছিল প্রাসাদ নির্মাণকারী ও ডুবুরী এবং অন্য আরো অনেককে অধীন করে দিলাম যারা শিকলে বাঁধা থাকত।" (সূরা ছোয়াদ: ৩৭-৩৮)
আল্লাহ আরো বলেনঃ قَالَ عِفْرِيْتُ مِنَ الْجِنِّ أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَنْ تَقَوْمٍ مَقَامِكَ .
"একজন জিন দৈত্য বলল: আপনি আপনার স্থান থেকে উঠার আগেই আমি বিলকিসের সিংহাসন হাজির করবো।" (সূরা-নামল-৩৯) এ আয়াতেও জিন হযরত সোলায়মান (আঃ)-এর ইচ্ছা পূরণে অনুগত্যের মনোভাব প্রকাশ করল।
শাকের তাঁর আজায়েব কিতাবের মধ্যে লিখেছেন। মূসা বিন নোসাইর ইহুদী ছিলেন। তিনি মুসলমান হন। তাঁকে মরক্কোর আমীর বানানো হয়। একবার তিনি যুদ্ধের উদ্দেশ্যে সাগর পথে রওনা হন। তিনি যখন অন্ধকার সাগরে পৌঁছান তখন জাহাজ গন্তব্যপথে চলতে থাকে। তিনি জাহাজে আওয়াজ শুনতে পান। হঠাৎ করে দেখেন যে, মোহর অংকিত কতগুলো সবুজ কলসী। তিনি এগুলোর মুখ খোলার ইচ্ছায় একটি কলসী নেন। আবারও ভাল করে দেখেন যে তা ছিল মোহর অংকিত। তিনি তার কিছু সাথীকে বলেন: কলসীটির তলা খুলে দেখ। তলা খুললে এক আওয়াজদানকারী আওয়াজ দিয়ে বললঃ হে আল্লাহর নবী! আমি আর আসবোনা। মূসা বলেন। এটা হযরত সোলায়মান (আঃ) কর্তৃক বন্দী শয়তান। কলসীর তলা বন্ধ করতে গিয়ে দেখেন জাহাজের পায়ের মধ্যে এক ব্যক্তি বসা। ব্যক্তিটি তাদেরকে লক্ষ্য করে বলল: আপনারা; আমার উপর যদি আপনাদের অনুগ্রহ না থাকত তাহলে আমি আপনাদেরকে ছিন্নভিন্ন করে দিতাম। কলসী খোলার সাথে সাথে বন্দী শয়তানটি বের হয়ে গেছে। তাকে পুনরায় কলসীতে বন্দী করা যায়নি। কিন্তু অন্যান্য কলসীগুলোতেও অন্যান্য বন্দী শয়তানরা রয়ে গেছে।
মূসা বিন নোসাইর হযরত মোআওইয়ার আমলে স্পেন জয় করেন এবং অনেক বিস্ময়কর ঘটনার সম্মুখীন হন।
এক বর্ণনায় এসেছে, মূসা বিন মুসাইর ১৭টি সবুজ কলসি দেখতে পান। এগুলোর উপর হযরত সোলায়মান (আঃ)-এর মোহর অংকিত ছিল। একটি কলসীর ঢাকনা খোলার পর শয়তান বলে: যে আল্লাহ আপনাকে নবুওয়াত দান করেছেন। তাঁর শপথ করে বলছি, আমি আর কখনও ফিরে আসবো না এবং ফেতনা ফ্যাসাদ সৃষ্টি করবো না। তারপর সে লক্ষ্য করে দেখে যে, সে তো সোলায়মান (আঃ) এবং তাঁর রাজত্ব দেখতে পাচ্ছে না। তারপর সে জমীনে ছড়িয়ে পড়ল।
এ ঘটনা দ্বারা প্রমাণ হয় যে, জিনেরা হযরত সোলায়মান (আঃ)-এর কাছে কি রূপ বশ্যতা স্বীকার করেছিল।
নবীগণ ছাড়াও জিনেরা অন্যান্য মানুষেরও বশ্যতা স্বীকার করে। যাদুকর গণক, ভণ্ডপীর ফকির ইত্যাদির সাথে জিনের সম্পর্ক আছে। তাদের শিরক ও কুফরী কাজ ও কথা-বার্তা দ্বারা শয়তানকে খুশী করা হয়। শয়তান খুশী হয়ে তাদেরকে তাদের বশ্যতা স্বীকার করে। এতে করে শয়তানের কাজ ও দায়িত্ব উত্তমরূপে আঞ্জাম দেয়া হয়।

📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 মানুষের জিন হত্যার হুকুম

📄 মানুষের জিন হত্যার হুকুম


মানুষ মানুষকে হত্যা করলে তার কেসাস হয়। অর্থাৎ জানের বদলে জান কিংবা বিভিন্ন অঙ্গের বদলে অঙ্গ কাটতে হয়। কিন্তু কোন মানুষ যদি জিন কিংবা কোন প্রাণীর আকৃতিধারী কোন জিনকে হত্যা করে তাহলে তার শাস্তি কি হবে? আবুশ শেখ তাঁর নিজ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ইবনু আবি মোলাইকা বলেছেন, এক জিন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ঘরে প্রবেশ করত। তিনি তাকে হত্যার আদেশ দেন। জিনটাকে হত্যা করা হল। হযরত আয়েশা স্বপ্নে দেখেন যে, তাকে কেউ বলছে, আপনি আবদুল্লাহ নামক এক মুসলমান জিনকে হত্যা করেছেন। তিনি উত্তরে বলেন। সে মুসলমান হলে, নবী পত্নীদের ঘরে প্রবেশ করতনা। তাঁকে তখন বলা হল, আপনি শরীরে কাপড় পরিধানের আগে সে ঘরে প্রবেশ করত না। সে শুধু আপনার কোরআন শুনার জন্য আসত। ভোর হলে, আয়েশা (রাঃ) ১২ হাজার দেরহাম রক্তপণ হিসেবে গরীবদের মধ্যে বণ্টনের আদেশ দেন।
আবু বকর বিন আবি শায়বা তাঁর মোসান্নাফ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। আয়েশা বিনতে সালেহা হযরত আয়েশা থেকে এরূপ একটি বর্ণনা দিয়েছেন।
আবু বকর বিন আবদুল্লাহ বিন মোহাম্মদ হাবীব থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন হযরত আয়েশা নিজ ঘরে একটি সাপ দেখতে পান। তিনি এটাকে হত্যার আদেশ দেন। সাপটিকে মেরে ফেলার পর সে রাতে তিনি স্বপ্নে দেখেন যে কেউ তাঁকে বলছে, নিহত সাপটি জিনদের অন্তর্ভুক্ত ছিল, যারা নবী করীম (সঃ)-এর কাছে এসে কোরআন শুনেছে। হযরত আয়েশা ইয়েমেনে লোক পাঠান এবং ৪০টি দাস কিনে তা আজাদ করে দেন।
তিরমিজী ও নাসাঈ আবুস সায়েবের দাস সাইফী থেকে এবং তিনি আবু সাঈদ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেন : মদীনাতে ইসলাম গ্রহণকারী কিছু জিন আছে। তোমরা যদি সাপ-বিচ্ছু জাতীয় কোন প্রাণী দেখ, তাদেরকে চলে যাওয়ার জন্য তিনবার আহবান জানাবে। এরপরও যদি না যায়, তাহলে তাদেরকে মেরে ফেলবে।
মুসলিম শরীফে হেশামের গোলাম আবুস সায়েব আবু সাঈদ থেকে বর্ণনা করেছেন। আমরাসহ এক নব বিবাহিত যুবক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে খন্দকের যুদ্ধের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। যুবকটি একদিন দুপুরে নিজ ঘরে যাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (সঃ) থেকে অনুমতি নিল। রাসুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেন: তুমি তোমার অস্ত্র সাথে নাও। আমি তোমার ব্যাপারে বনি কোরায়জার শত্রুতার আশংকা করছি। যুবকটি নিজ অস্ত্র সহ ঘরে ফিরে আসল। সে ঘরের দরজায় তার স্ত্রীকে দেখে রাগ ও অভিমানে তার দিকে লক্ষ্য করে তীর প্রস্তুত করল এবং তাকে হত্যার ইচ্ছা করল। স্ত্রী বলল, তীর বন্ধ কর এবং ঘরে এসে দেখ কোন্ জিনিস আমাকে ঘর থেকে বের করেছে। যুবকটি ভেতরে প্রবেশ করে বিছানায় এক বিরাট সাপকে দণ্ডায়মান দেখল। সে সাপের দিকে তীর ছুঁড়ল এবং ঘর থেকে বেরিয়ে আসল। এবার সাপটি তাকে জড়িয়ে ধরল। আমরা জানিনা, সাপ ও যুবকের মধ্যে কে আগে মরেছে।
অন্যায়ভাবে কোন কাফেরকেও হত্যা করা যায় না। এমর্মে আল্লাহ বলেছেন: وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَانٌ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى "কোন সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায় বিচার ত্যাগ করো না। সুবিচার ও ইনসাফ কর। ইনসাফ তাকওয়ার অধিকতর নিকটবর্তী জিনিস।" (সূরা মায়েদা-৮)
জিনেরা বিভিন্ন আকার আকৃতি ধারণ করে। ঘরের সাপ কখনও জিন হতে পারে। তাই তাদেরকে তিনবার চলে যাওয়ার কথা বলতে হবে। না গেলে হত্যা করতে হবে আসল সাপ হলে তাকে হত্যা করা হল। আর জিন হলে আক্রমনের জন্য সে থেকে যেতে চাইল এবং সাপের আকৃতিতে মানুষকে ভয়-ভীতি দেখাতে ইচ্ছা করল। এক্ষেত্রে নীতি হল, ক্ষতিকর প্রাণীর ক্ষতির আগেই তার ক্ষতি প্রতিরোধ করা। তা হত্যা করেই হোকনা কেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00