📄 জিনের সাথে যৌন মিলনের পর গোসলের হুকুম
ফতওয়া জোহাইরিয়াতে উল্লেখ আছে, এক মহিলা বলে, আমার কাছে এক জিন দিনে কয়েকবার আসে। সে আমার সাথে আমার স্বামীর মত মিলিত হয়। ফতোয়ায় বলা হয়েছে, তার উপর গোসল ফরজ হবে না।
আবুল মাআ'লী বিন মোনজী হাম্বলী বলেছেন, ইবনুল হাম্বল খাত্তাবী শরহুল হেদায়া গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, এক মহিলা বলল, 'আমার কাছে এক জিন আসে, যেমন কোন স্বামী তার স্ত্রীর কাছে যায়- প্রশ্ন হল, তার উপর কি গোসল ফরজ? এক হানাফী আলেম বলেছেন, তার গোসলের দরকার নেই। আবুল মা'আলী বলেছেন, কোন মহিলা যদি বলে যে, আমার সাথে স্বামীর মত এক জিন আছে অহলে তার উপরও গোসল ফরজ হবে না। কেননা, গোসল ফরজ হওয়ার শর্ত এখানে অনুপস্থিত। এটা হল বীর্যপাতহীন স্বপ্নদোষের মত। তারপরও বিষয়টির জটিলতা অবশিষ্ট থেকেই যায়।
📄 জিন কর্তৃক স্বামীকে অপহরণের পর স্ত্রীর হুকুম
আবু বকর ইবনু আবিদ দুনিয়া উল্লেখ করেছেন যে, আবদুর রহমান বিনাবি লায়লা বলেন: এক ব্যক্তি নিজ সম্প্রদায়ের লোকদের সাথে এশার নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে বের হল। এরপর সে নিখোঁজ হয়ে গেল। তার স্ত্রী খলীফা ওমর বিন খাত্তাবের নিকট বিষয়টি উত্থাপন করল। খলীফা তার সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে জিজ্ঞেস করায় তারা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করল। খলীফা স্ত্রীকে ৪ বছর অপেক্ষার আদেশ দেন। চার বছর পর স্ত্রীলোকটি পুনরায় খলিফার কাছে এসে বলেন, তার স্বামী ফিরেনি। খলীফা তার সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে জিজ্ঞেস করায় তারা এর সত্যতার স্বাক্ষ্য দেয়। খলিফা স্ত্রী লোকটিকে অন্যত্র বিয়ের অনুমতি দেন। তারপর স্ত্রীলোকটির ১ম স্বামী ফিরে আসে। ঘটনাটি হযরত ওমরের কাছে পুনরায় উত্থাপন করায় বলেন তোমরা কেন দীর্ঘদিন ব্যাপী নিজ স্ত্রীদের কাছ থেকে দূরে থাক এবং তারা তোমাদের কোন খবর জানে না? লোকটি বলল, আমার ওজর ছিল। ওমর বলেন: তোমার কি ওজর? সে বলল, আমি আমার সম্প্রদায়ের সাথে এশার নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে বের হলে জিন আমাকে ধরে বসে। আমি জিনদের কাছে দীর্ঘদিন ছিলাম। তারপর মোমেন জিনেরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়লাভ করে এবং কিছু যুদ্ধবন্দীকে নিয়ে আসে। আমিও সে যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে ছিলাম। মোমেন জিনেরা আমাকে আমার দীন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। আমি বললাম, আমি মুসলমান। তারা বলল, তুমি আমাদের একই দলের অনুসারী হওয়ায় আমাদের দীনি ভাই। তাই তোমাকে দাস হিসেবে রাখা জায়েয নেই। তারা আমাকে তাদের কাছে থাকা কিংবা নিজ পরিবারে প্রত্যাবর্তনের এখতিয়ার দেয়। আমি নিজ পরিবারে ফিরে আসার প্রস্তাব গ্রহণ করি। তারা রাত্রে আমার সাথে মানুষের মত কথা বলতে বলতে আসতে থাকে এবং দিনে ঝড়ের রূপ ধারণ করে এগুতে থাকে। আমি তাদেরকে অনুসরণ করি। এভাবে আমি নিজ পরিবারে পৌঁছি। তাতে তার খাবার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল। সে বলল: সেগুলোই ছিল আমার খাবার যে গুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করা হয় না। এর পর তার পানীয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে বলে: নেশা সৃষ্টিকারী নয় এমন পানীয় পান করেছি। যাক, এরপর হযরত ওমর (রাঃ) তাকে স্ত্রী ও দেন-মোহর এ দু'টোর যে কোন একটা ফেরত পাবার এখতিয়ার দেন।
হাদীসে উল্লেখ আছে, পানাহারের সময় বিসমিল্লাহ বলে না খেলে শয়তান তা খায় এবং রাত্রে ঘরে প্রবেশের সময় বিসমিল্লাহ বলে প্রবেশ না করলে শয়তান ঘরে রাত্রি জাগরণ করে।
📄 জিনের জন্য বা নামে জবাই করা প্রাণী খাওয়া নিষেধ
ওহাব বিন মোনাব্বেহ বলেছেন: এক খলীফা একটা পানির ঝর্ণা প্রবাহিত করার উদ্যোগ নেয়। তিনি এজন্য জিনের উদ্দেশ্যে পশু জবাই করে লোকদেরকে খাওয়ান যেন জিনেরা ঝর্ণার পানি প্রবাহে বাধা না দেয়। ইবনে শিহাব তা জানতে পেরে বলেন, এই জবাই ও মেহমানদারী কোনটাই হালাল নয়। রাসূলুল্লাহ (সা) জিনের জন্য জবাই করা পশুর গোশত খেতে নিষেধ করেছেন।
শামসুদ্দিন ইবনুল কাইয়েম হাম্বলী লিখেছেন: কূপ থেকে পানির নহর মক্কায় প্রবাহিত করার সময় ঐ ঘটনাই ঘটেছিল। হাম্বলী মাযহাবের অন্যতম ইমাম নাজমুদ্দিন খলিফা বিন মাহমুদ কিলানী আমাকে বলেন: আমরা যখন খনন কাজ এক জায়গা পর্যন্ত পৌছলাম তখন একজন শ্রমিক হঠাৎ করে নির্বাক হয়ে গেল। সে কোন কথা বলে না। এভাবে দীর্ঘ সময় রইল। তারপর আমরা তারমুখে জিনের কথা শুনতে পেলাম। হে মুসলমানগণ! আমাদের উপর আপনাদের জুলুম জায়েয নেই। আমি বললাম আমরা কি জুলুম করেছি? সে বললঃ আমরা এ ভূমির বাসিন্দা। আল্লাহর কসম, আমি ছাড়া এখানে আর কোন মুসলমান নেই। আমি অন্য জিনকে শিকলে বেঁধে রেখে এসেছি। তা নাহয়, তারা আপনাদের ক্ষতি করত। তারা আমাকে আপনাদের প্রতি এ বাণী দিয়ে পাঠিয়েছে, তারা তাদের অধিকার পূরণ করা ব্যতীত আপনাদেরকে এ ভূমির উপর দিয়ে পানি নিতে দেবে না। আমি জিজ্ঞেস করলাম তাদের অধিকার কি? সে বলল, একটা বলদ কিনে সেটাকে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে পরিয়ে, মক্কা থেকে এ পর্যন্ত আনতে হবে। তারা এভাবে বলদটাকে এনে জবেহ করল এবং নিকটবর্তী আবদুস সামাদ কূপে বলদের রক্ত, পা ও মাথা নিক্ষেপ করল। জিনটি বলল, বলদ গরুর বাকী গোশত আপনাদের। এরপর ভূতে পাওয়া লোকটির হুশ ফিরে এল। কিলানী বলেন, আমরা সে জায়গায় গিয়ে দেখি নহরে পানি গড়াচ্ছে। আমরা জানিনা, পানি কোথায় যাচ্ছে এবং আমরা সেখানে কূপ বা কূপের কোন নিদর্শন দেখতে পেলাম না। হঠাৎ করে অনুভব করলাম, কে যেন আমার হাত ধরে একটি জায়গায় নিয়ে দাঁড় করিয়ে বলল, আপনারা এখানে আসুন। আমরা ঐ জায়গায় খনন শুরু করায় পানি উথলে উঠল। সে পানি মক্কায় আনা হল।
আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিনের উদ্দেশ্যে পশু জবেহ করতে নিষেধ করেছেন। (ইবনে হাইয়ান- তারীখ আদ দো'আফা)
📄 মানুষ থেকে জিনের শিক্ষা ও মানুষের উদ্দেশ্যে জিনের ফতোয়া
আবু বকর কোরাইশী ওহাব বিন মোনাববেহ থেকে বর্ণনা পরম্পরায় উল্লেখ করেছেন। ওহাব বলেন: তিনি ও হাসান বসরী প্রত্যেক হজ্জ মওসুমে মিনার মসজিদে খায়েফে মিলিত হতেন। যখন লোকেরা শান্ত হত এবং ঘুমিয়ে পড়ত তখন তাদের সাথে কিছু সঙ্গী বসে বসে আলাপ করতেন। এক রাতে তাঁরা দু'জন মজলিশের লোকদের সাথে কথা বলার সময় একটি পাখি মজলিশে ওহাবের কাছে এসে বসল। পাখীটি সালাম দিল। ওহাব সালামের জবাব দিলেন তিনি জানতেন যে এটা ছিল জিন। পাখিটি তার কাছে এসে কথা বলা শুরু করল। ওহাব জিজ্ঞেস করেন, তুমি কে? পাখিটি বলল, আমি একজন মুসলমান জিন। ওহাব জিজ্ঞেস করেন, তোমার প্রয়োজন কি? সে উত্তর দিল। আপনারা কি চাননা যে আমরা আপনাদের মজলিশে বসি এবং আপনাদের কাছ থেকে এলেম শিক্ষা করি? আমাদের মধ্যে আপনাদের কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণকারী অনেক বর্ণনাকারী আছে। আমরা আপনাদের সাথে নামাজ, জেহাদ, রোগী দেখা, জানায়ায় উপস্থিত হওয়া, হজ্জ ও ওমরাসহ আরো বহু কাজে শরীক হই। শুধু তাই নয়, আমরা আপনাদের কাছ থেকে জ্ঞান লাভ করি ও কোরআন শুনি। ওহাব প্রশ্ন করেন, তোমাদের মধ্যে কোন্ শিক্ষক উত্তম বলে বিবেচিত? পাখিটি উত্তর দিল, এই শেখ অর্থাৎ হাসান বসরী। হাসান বসরী ওহাবকে তার থেকে বিরত দেখে জিজ্ঞেস করেন, হে আবু আবদুল্লাহ! আপনি কার সাথে কথা বলছেন? তিনি জওয়াব দেন মজলিশের এক সাথীর সাথে। তারপর দু'জন মজলিশ থেকে উঠে দাঁড়ান। তখন হাসান ওহাবকে পুনরায় জিজ্ঞেস করেন। ওহাব তাকে জিনের খবর দেন এবং বলেন, জিনেরা হাসানের কাছ থেকে অর্জিত এলেমের চর্চা বেশী করে। হাসান বলেন : আমি আপনাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি। আপনি একথা কারো কাছে বলবেন না। আমি কাউকে এমন মর্যাদা দেয়ার ব্যাপরটি নিরাপদ বোধ করি না। ওহাব বলেন, আমি প্রতি হজ্জ মওসুমে এ জিনটির সাথে মিলিত হই। সে আমার খোঁজ খবর নেয়। আমি তাকে আমার খোঁজ খবর দেই। একবার তওয়াফে তার সাথে আমার সাক্ষাত হয়। আমাদের তওয়াফ শেষ হলে আমি এবং সে মসজিদের পার্শ্বে বসে আলাপ করি। আমি তাকে তার হাত বাড়ানোর অনুরোধ করি। হাত ধরে দেখি তা বিড়ালের পাঞ্জা এবং তাতে রয়েছে লোম। তারপর আমি তার কাঁধ পর্যন্ত হাত বাড়ালাম এবং বাহুর গোড়া অনুভব করলাম। আমি তার হাতে খোঁচা দিলাম। এরপর আমরা কিছুক্ষণ আলাপ করলাম। তারপর সে বলল, হে আবু আবদুল্লাহ! আমি যেরূপ আমার হাত বাড়িয়েছি, আপনিও আপনার হাত বাড়ান। আল্লাহর কসম, সে আমার হাতে এমন জোরে খোঁচা দিল যে, আমি প্রায় চীৎকার দেই। এরপর সে হেসে দিল। ওহাব বলল : আমি প্রত্যেক হজ্জে তার সাক্ষাত পাই। কিন্তু এরপর আর পেলামনা। আমার আশংকা হল যে, হয় সে মৃত্যু বরণ করেছে কিংবা নিহত হয়েছে। ওহাব তাকে জিনদের মধ্যে উত্তম জিহাদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলো। সে বলল 'আমাদের উত্তম জেহাদ হল, অন্যায়ের বিরুদ্ধে পরস্পরের সাথে পরস্পরের জেহাদ। ১
ইয়াহইয়া বিন সাবেত বলেন: আমি তায়েফের হাফসের সাথে মিনায় ছিলাম। সাদা দাঁড়িবিশিষ্ট এক শেখকে লোকদের উদ্দেশ্যে ফতোয়া দিতে দেখলাম। হাফস আমাকে বলেন: হে আবু আইউব! এই যে ফতোয়াদানকারী শেখ, সে হল দৈত্য। এরপর হাফস এবং আমি শেখের নিকটবর্তী হলাম। দৈত্যটি হাফসকে দেখে হাতে জুতা নিয়ে জোরে চলে গেল। লোকেরা তার পিছে পিছে চলতে লাগল। হাফস বলতে লাগলেন: হে লোকেরা। এ হচ্ছে দৈত্য। ২.
ইবনু আবিদ দুনিয়া আবু খোলাইফা আবদী থেকে বর্ণনা করেছেন। আবদী বলেন: আমার একটি শিশু সন্তান মারা যাওয়ায় আমি খুব শোকাভিভূত হলাম। ফলে আমার ঘুম-নিদ্রা দূর হয়ে গেল। এক রাত আমি খাটের উপর শুয়ে আছি। ঘরে কেউ নেই। আমি আমার ছেলের বিষয়ে চিন্তা করছি। ঘরের পাশ থেকে কে যেন বললঃ হে আবু খোলাইফা, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। আমি তার সালামের জবাব দিলাম। সে সূরা আলে ইমরানের শেষ কয়েকটি আয়াত পড়ল। সে শেষ আয়াতটি ছিল:
وَمَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ لِلْأَبْرَارِ .
"আল্লাহর কাছে যা আছে নেক লোকদের জন্য তা উত্তম।" -(সূরা আল-ইমরান ১৯৮)
তারপর বললঃ হে আবু খোলাইফা! আমি বললাম, হাজির, বলুন। সে বলল : তুমি কি চাও? তুমি কি অন্যান্য সকল লোক বাদ দিয়ে কেবলমাত্র তোমার সন্তানকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতে চাও? আল্লাহর কাছে কে অধিকতর মর্যাদাবান তুমি, না হযরত মোহাম্মদ? তাঁর ছেলে ইবরাহীমও মারা গেছে। তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়েছে, মন পেরেশান হয়েছে। আমরা এমন কোন কথা বলবোনা যার দ্বারা আল্লাহ অসন্তুষ্ট হতে পারেন। তুমি কি তোমার ছেলের মৃত্যু ঠেকাতে চাও অথচ, সকল সৃষ্টির জন্য মৃত্যু নির্ধারিত? নাকি তুমি আল্লাহর উপর অসন্তুষ্ট এবং তার সৃষ্টি পরিকল্পনা বাতিল করতে চাও? আল্লাহর কসম, মৃত্যু না হলে জমীনে মানুষের জায়গা হত না এবং দুঃখ না থাকলে মানুষ জীবন দ্বারা উপকৃত হতে পারতনা। তারপর সে জিজ্ঞেস করল, তোমার কোন প্রয়োজন আছে? খোলাইফা বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, আল্লাহ তোমার উপর রহম করুন, তুমি কে? সে উত্তরে বলল- আমি তোমার প্রতিবেশী জিন। ১. এ বর্ণনায় মানুষের প্রতি জিনের ওয়াজ নসীহত ও উপদেশ ফুটে উঠেছে।
টিকাঃ
১. গারায়েব ওয়া আজায়েবুল জিন- কাযী বদরুদ্দিন শিবলী।
২. ঐ
১. ঐ