📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 জিনের আসমানী কথা চুরি

📄 জিনের আসমানী কথা চুরি


মুসলিম শরীফে ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একজন আনসার সাহাবী আমাকে বলেছেন, তাঁরা এক রাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে বসা ছিলেন। তখন একটি উল্কাপিণ্ড নিক্ষিপ্ত হয়ে আলোকিত হয়ে উঠল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে প্রশ্ন করেন, জাহেলিয়াত যুগে এ জাতীয় উল্কাপিণ্ড খসে পড়লে তোমরা কি বলতে? তাঁরা উত্তর দেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সর্বাধিক জ্ঞাত আছেন। তবে আমরা বলতাম, 'আজ রাতে কোন মহান ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করেছে কিংবা মৃত্যুবরণ করেছে।' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন: এটা কোন ব্যক্তির জন্ম ও মৃত্যুর জন্য ঘটে না। বরং মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যখন কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন আরশ বহনকারী ফেরেশতারা তাসবীহ পাঠ করেন। তারপর আরশের নিকটবর্তী আসমানের বাসিন্দারা তাসবীহ পাঠ করেন। এভাবে দুনিয়ার আসমানের বাসিন্দারা পর্যন্ত তাসবীহ পাঠ করেন। তারপর আরশের নিকটবর্তী আসমানের বাসিন্দারা আরশ বহনকারী ফেরেশতাদেরকে জিজ্ঞেস করেন। আপনাদের রব কি বলেছেন? তারা তখন আল্লাহর বার্তা পৌছে দেন। এরপর বিভিন্ন আসমানের অধিবাসীরা পরস্পরকে এভাবে জিজ্ঞেস করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত দুনিয়ার আসমানের বাসিন্দাদের কাছে খবরটি পৌঁছে যায়। তখন জিনেরা ঐ খবর ছোঁ মেরে শুনে ফেলে এবং তাদের অনুসারীদের কাছে তা পৌঁছে দেয়। তারা যা বহন করে নিয়ে এসেছে তা সত্য। কিন্তু তারা তাতে বহু মিথ্যা যোগ করে প্রকাশ করে।
বোখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, গণকেরা যেসব কথা বলে আমরা সেগুলোকে সত্য দেখতে পাই। তিনি উত্তরে বলেন, ঐ বাণী তো সত্য। জিন সেটাকে সংরক্ষণ করে এবং তার অনুসারীদের কানে তা ঢেলে দেয়। সাথে আরো এক'শ মিথ্যা যোগ করে।
রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াত লাভের পর শয়তানের আসমানী কথা চুরি বাধাগ্রস্ত হয়। আল্লাহ কোরআন মজীদে জিনদের জবানীতে একথা প্রকাশ করেছেন যে,
وَأَنَّا لَمَسْنَا السَّمَاءَ فَوَجَدْنَاهَا مُلِئَتْ حَرَسًا شَدِيدًا وَشُهَبًا * وَأَنَّا كُنَّا نَقْعُدُ مِنْهَا مَقَاعِدَ لِلسَّمِعِ ، فَمَنْ يَسْتَمِعِ الْآنَ يَجِدُ لَهُ شِهَابًا رَصَدًا *
(জিনেরা বলেছে) "আমরা আকাশ পর্যবেক্ষণ করেছি এবং দেখতে পেয়েছি যে, কঠোর প্রহরী ও উল্কাপিণ্ড দ্বারা আকাশ পরিপূর্ণ। আমরা আকাশের বিভিন্ন ঘাঁটিতে সংবাদ শুনার জন্য বসতাম। এখন কেউ সংবাদ শুনতে চাইলে সে জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ডকে ওঁৎপেতে থাকতে দেখবে।” (সূরা জিন-৮-৯)
শয়তান যেন অহী চুরি করতে না পারে সেজন্য এ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যোবায়ের বিন বাককার এবং ইবনু আসাকের মা'রুফ বিন খাররাবুজ থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবলিশ সাত আসমান পর্যন্ত বিচরণ করত। হযরত ঈসা (আঃ)-এর জন্মের পর তিন আসমানে তার বিচরণ বন্ধ হয়ে যায় এবং অবশিষ্ট চার আসমানে বিচরণ অব্যাহত থাকে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্মের পর সাত আসমানেই তার বিচরণ বন্ধ হয়ে যায়। ইবনু আব্দুল বার, আবু দাউদে বর্ণিত সনদ দ্বারা শাবী থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যখন নবী করে পাঠানো হল, তখন শয়তানকে উল্কাপিণ্ড দ্বারা তাড়ানো শুরু হল, ইতিপূর্বে কখনও এরূপ করা হত না। লোকেরা আবদু ইয়ালিল বিন আমর সাকাফীর কাছে এসে বলল: জনগণ উল্কাপিণ্ডের খসে পড়া দেখে ভয় পেয়ে গেছে, নিজ নিজ দাসদেরকে মুক্ত করে দিয়েছে এবং পশুদেরকে ছেড়ে দিয়েছে। আবদু বলল, তড়িঘড়ি করনা বরং অপেক্ষা কর। যদি উল্কাপিণ্ড আকাশের পরিচিত কোন তারকা হয় তাহলে তা মানুষ ধ্বংসের লক্ষণ। আর যদি অপরিচিত হয় তাহলে তা কোন ঘটনার ইঙ্গিতবাহী। তারা লক্ষ্য করে দেখল সেটা ছিল অপরিচিত। তাই তারা বলল, এটা কোন ঘটনার ইঙ্গিতবাহী। তাদের আর বেশি অপেক্ষা করতে হয় নি। অল্প পরেই তারা মহানবী (সঃ)-এর নবুওয়াতের খবর পেল।
আবুদ দুনিয়া তাঁর 'কিতাবুল আশরাফ' এবং আবু আবদুর রহমান হারাওয়ী তাঁর 'আল-আকায়েব' বইতে লিখেছেন, জারীর বিন আব্দুল্লাহ বাজালী বলেন, একদিন আমি গোপনে রাস্তায় চলার সময় বললাম: لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ مَا شَاءَ اللَّهُ كَانَ . একথাটি হারবাজ নামক একজন জিন শুনে বলল: "আমি আসমান থেকে একথা শুনার পর আজ পর্যন্ত কারো মুখে তা শুনতে পাইনি।" বাজালী বলেন, আমি রোম ও পারস্য সম্রাট কাইজার ও কেসরাসহ বিভিন্ন রাজা বাদশাহর দরবারে হাজির হয়েছি। একবার আমি পারস্য সম্রাট কেসরার দরবারে হাজির হই। শয়তান আমার পরিবারে আমার স্থলাভিষিক্ত হয়। সে আমার বেশ ধারণ করেই আমার পরিবারে আগমন করে। আমি সফর থেকে ফিরে আসলে আমার পরিবার আমার প্রতি মুসাফির সফর থেকে ফিরে আসলে যেরূপ ঔৎসুক্য প্রকাশ করে সেরূপ ঔৎসুক্য প্রকাশ না করায় আমি প্রশ্ন করি, তোমাদের কি হয়েছে? পরিবারের সদস্যরা জবাবে বলে: আপনি তো আমাদের কাছ থেকে দূরে ছিলেন না। আমি বললাম, এটা কেমন কথা? তখন শয়তান আমার কাছে হাজির হল। সে প্রস্তাব করল, তোমার স্ত্রীর কাছে আমি একদিন এবং তুমি একদিন থাকবে।
সে আরো বলল, সে আসমানী কথা চুরি করে। আসমানী কথা চুরির ব্যাপারে তার পালা রাত্রে পড়েছে। সে বলল, তুমি আসমানী কথা চুরি দেখতে চাইলে আমার সাথে চল। আমি রাজী হলে এক সন্ধ্যায় সে আমার কাছে আসল। আমাকে তার পিঠে তুলে চলল। তার ঘাড়ে শূকরের পশমের মত পশম রয়েছে। সে বলল, আমাকে ভাল করে ধর। তুমি অনেক জিনিস এবং বহু ভয়াল বিষয় দেখবে। কিন্তু আমাকে ছাড়বে না। তাহলে ধ্বংস হয়ে যাবে। তারা উপরে উঠে গেল এবং একেবারে আসমান স্পর্শ করল। তখন আমি একজনকে নিম্নোক্ত জিকর করতে শুনলাম:
لَا حَولَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ مَا شَاءَ اللَّهُ كَانَ وَمَا لَمْ يَشَأْ لَمْ يَكُن *
তখন আকাশ থেকে আগুন নিক্ষেপ করা হল। জিনটি এক বন-জঙ্গলে এসে পড়ল। আমি উপরোক্ত জিকরটি মনে রাখলাম। সকালে আমি আমার পরিবারে ফিরে আসি। যখন জিনটি আসত তখন আমি উপরোক্ত জিকরটি উচ্চারণ করতাম। সে তখন অস্বস্তি বোধ করত এবং ঘর থেকে বেরিয়ে যেত। আমি তা পড়া অব্যাহত রাখলাম যে পর্যন্ত না সে আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেল।
বায়হাকী তাঁর 'দালায়েল আন নবুয়াহ' গ্রন্থে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, শয়তান আসমানী কথা চুরি করত। অহীর একটি বাণীর সাথে আরো ৯টি কথা যোগ করত। জমীনের অধিবাসীরা এর মধ্যে একটিকে সত্য এবং অবশিষ্ট ৯ টাকে মিথ্যা দেখতে পেত। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতের আগ পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। তারপর তাদেরকে সে সকল আসনে বসে আসমানী কথা চুরির সুযোগ বন্ধ করে দেয়া হল। তারা ইবলিশের কাছে এ বিষয়টি উল্লেখ করায় সে বলল, জমীনে হয়তো কোন ঘটনা ঘটেছে। সে তাদেরকে বিশ্বব্যাপী তদন্ত মিশনে পাঠাল। একটি তদন্তকারী দল নাখলায় রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে কোরআন শুনে বলল, আসলে এটাই সে ঘটনা যে কারণে তাদের প্রতি আগুন নিক্ষিপ্ত হয়। উল্কাপিণ্ড যদি তোমাদের দৃষ্টিগোচর না হয় তাহলে তা শয়তানের উপর পড়ে এবং তা কখনও লক্ষ্যচ্যুত হয় না। কিন্তু উল্কাপিণ্ড শয়তানকে হত্যা করে না বরং তার মুখ, হাত ও পার্শ্বদেশ জ্বালিয়ে দেয়।
আবু নাঈম ও বায়হাকী ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, প্রত্যেক জিন গোত্রের আসমানী কথা চুরির জন্য আসমানে একটি আসন ছিল। তারা সেখান থেকে অহী চুরি করে গণকের কাছে এসে বর্ণনা করে। কিন্তু হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-কে নবী করে পাঠানোর পর তাদেরকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়।
বায়হাকী ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, হযরত ঈসা ও মোহাম্মদ (সঃ)-এর মধ্যবর্তী সময় আসমানে কোন পাহারা ছিল না। শয়তানেরা সেখানে নিজ নিজ আসনে বসে কথা চুরি করত। কিন্তু মোহাম্মদ (সঃ)-কে নবুওয়াত দানের পর আসমানে কঠোর প্রহরা নিয়োজিত করা হয় এবং শয়তানকে লক্ষ্য করে উল্কাপিণ্ড নিক্ষেপ করা হয়।
আবু নাঈম উবাই বিন কা'ব থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ঈসা (আঃ)-কে আসমানে তুলে নেয়ার পর থেকে মোহাম্মদ (সঃ)-এর নবুওয়াতের আগ পর্যন্ত উল্কাপিণ্ড নিক্ষেপ করা হত না। পরে তা শুরু হল।

📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 জিনের হাদীস বর্ণনা

📄 জিনের হাদীস বর্ণনা


আবু নাঈম তাঁর 'দালায়েল আন নবুয়াহ' গ্রন্থে হযরত উবাই বিন কা'ব থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: একদল লোক মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা করার পর রাস্তা ভুলে গেছে। তারা মৃত্যু অনিবার্য দেখে কিংবা শীঘ্রই মরে যাওয়ার মত পরিস্থিতি বুঝতে পেরে কাফন পরে মৃত্যুর জন্য শুয়ে পড়েছে। গাছ থেকে এক জিন বেরিয়ে এসে বলল: রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে কোরআন শ্রবণকারী জ্বিনদের মধ্যে আমি 'অবশিষ্ট আছি।' আমি মহানবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছি, الْمُؤْمِنُ أَخُوا الْمُؤْمِنِ وَدَلِيلُهُ لَا يَخْذِلُهُ.
'এক মুমিন অপর মুমিনের ভাই, তার পথ প্রদর্শক তাকে লজ্জিত করে না।' সামনে প্রানি আছে। আর ঐদিকে যাওয়ার পথ হল এটা। জিনটি তাদেরকে পথের সন্ধান দিল। ১
ইবনু আবিদ দুনিয়া আবদুর রহমান বিন বিশরের গোলাম থেকে বর্ণনা করেছেন। হযরত ওসমান (রাঃ)-এর খেলাফতের আমলে, একদল হাজী হজ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে তারা তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েন। তারা লবণাক্ত পানির কাছে গিয়ে পৌঁছাল। একজন বলল, অগ্রসর হোন; আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে পানিই আমাদের ধ্বংসের কারণ হবে। আপনাদের সামনে পানি রয়েছে। চলতে চলতে সন্ধ্যা হল। কিন্তু তারা পানি পেলেন না। এরপর তারা পরস্পর বলাবলি করতে থাকলেন যে, যদি আপনারা ঐ পানির কাছে আবার ফিরে যেতেন, তাহলে ভাল হত। তারা শেষ রাত্রে পথ চলা শুরু করলেন এবং একটি খেজুর গাছের কাছে এসে পৌঁছান। তাদের কাছে ভীষণ কাল এক মোটা লোক উপস্থিত হল এবং বলল: হে কাফেলা! আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি, "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতকে ভালবাসে, সে যেন অপরের জন্য তাই পসন্দ করে যা নিজের জন্য পসন্দ করে এবং নিজের জন্য যা অপসন্দ করে তা যেন অপরের জন্যও অপসন্দ করে।" আপনারা পাহাড় পর্যন্ত এগিয়ে যান। তারপর বামদিকে ফিরলেই পানি পাবেন। কেউ কেউ বলল: আল্লাহর কসম, আমার মতে সে শয়তান। অন্যরা বলল: শয়তান এভাবে কথা বলে না, সে যেভাবে কথা বলল। সে মুমিন জিন। তারা তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী রওনা হলেন এবং পানি পেলেন। ১
আল্লামা খারায়েতী তাঁর 'মাকারেমুল আখলাক' বইতে লিখেছেন, ইবনে হিব্বান নিজ পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন। ইয়েমেনের একদল লোক কোন জায়গায় যান এবং তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েন। তারা একজন আওয়াজ দানকারীকে বলতে শুনলেন: রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই এবং সাহায্যকারী, অমুক জায়গায় কিছু পানি জমা আছে। তারা তার কথামত সেখানে গেলেন এবং পানি পেলেন। ২
ইবনু আবিদ দুনিয়া লিখেছেন, একদিন ওমার বিন আব্দুল আযীয (রঃ) খচ্চরের উপর আরোহণ করে নিজ সাথীদেরকে নিয়ে রওনা করেন। তিনি রাস্তার পাশে একটি মৃত জিন দেখতে পান। তিনি খচ্চর থেকে নামেন, জিনটিকে রাস্তা থেকে সরান এবং একটি গর্ত করে তাকে মাটি চাপা দেন। এবার তিনি রওনা দেন। তিনি উঁচু স্বরে একটি আওয়াজ শুনেন। কিন্তু কাউকে দেখেন না। আওয়াজদানকারী বলল: হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি যার লাশ দাফন করলেন তিনি সে সকল জিনের অন্তর্ভুক্ত যাদের সম্পর্কে আল্লাহ কোরআন শুনার বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। আমরা যখন ঈমান আনলাম ও মুসলমান হলাম, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার এই সাথীকে লক্ষ্য করে বলেন: তুমি প্রবাসে মৃত্যুবরণ করবে এবং তোমাকে পৃথিবীর তখনকার সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি দাফন করবে। অন্য আরেক বর্ণনায় এসেছে। ওমার বিন আব্দুল আযীয জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি নিজে রাসূলুল্লাহ (সঃ) থেকে তা শুনেছ? সে বলে, 'হাঁ'। তখন ওমারের চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠে এবং তারা সেখান থেকে বিদায় নেন।
আল্লামা ফাকেহী তাঁর 'আখবারে মক্কা' বইতে লিখেছেন: আমের বিন রাবীআ, ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, আমরা ইসলামের প্রথমদিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মক্কায় ছিলাম। তখন মক্কার এক পাহাড় থেকে এক অদৃশ্য আওয়াজদানকারী মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য অন্যদেরকে উদ্বুদ্ধ করল। তখন নবী (সঃ) বলেন: এটা হল শয়তান। কোন শয়তান আল্লাহর কোন নবীর বিরুদ্ধে কাউকে ক্ষেপিয়ে তুললে আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন। পরে একদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) জানান যে, আল্লাহ সামহাজ নামক এক জিন দৈত্যের হাতে ঐ শয়তানটিকে হত্যা করিয়েছেন। আমি দৈত্যটির নাম রেখেছি আব্দুল্লাহ। সন্ধ্যায় আমরা ঐ জায়গায় এক অদৃশ্য আওয়াজদানকারীর নিম্নোক্ত আওয়াজ শুনতে পেলাম।
'মোসয়ের গর্ব-অহংকার ও সীমা লঙ্ঘন করায় আমরা তাকে হত্যা করেছি। সে সত্যকে খাট করে দেখেছিল এবং আমাদের বিজয়ী নবীকে গাল দিয়ে অত্যন্ত মন্দ কাজ করেছিল।'
মোহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান বিন আউফ নিজ পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নবুওয়াত প্রাপ্তির পর মোসয়ের নামক এক জিন অদৃশ্য আওয়াজের মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে লোকদেরকে উত্তেজিত করল। তখন কোরাইশ কাফেররা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরুদ্ধে নিপীড়ণ বাড়িয়ে দিল। পরের রাতে একই জায়গায় সামহাজ নামক এক দৈত্য জিন সম্পর্কে আগের ঘটনার অনুরূপ তথ্য বর্ণনা করল। ১০
তাবরানী তাঁর 'আল-কবীর' গ্রন্থে লিখেছেন। আব্দুল্লাহ বিন হোসেন বলেন, আমি সিরিয়ার তারসুস শহরে গেলাম। আমাকে বলা হল যে, এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে জিনদের প্রতিনিধি দলকে দেখার মত একজন মহিলা আছেন। আমি তার কাছে গেলাম। একজন মহিলাকে পিঠের উপর চিত হয়ে শুয়ে থাকতে দেখলাম। তার চারপাশে আছে একদল লোক। আমি তাকে তার নাম জিজ্ঞেস করলাম। সে বলল, তার নাম মানুষ। আমি তাকে বললাম, হে মানুষ। তুমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে গমনকারী জিনের প্রতিনিধি দলের কাউকে দেখেছ? সে বলল, 'হাঁ'। সামহাজ আমাকে বলেছে, নবী (সঃ) তার নাম রেখেছেন 'আব্দুল্লাহ'। সামহাজ বলেছে, আমি নবী (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, আসমান সৃষ্টির আগে আমাদের রব কোথায় ছিলেন? তিনি উত্তরে বলেন: আল্লাহ নূরের টাওয়ারে নূরের মধ্যে দেদীপ্যমান ছিলেন।
মহিলাটি আরো বলল: আব্দুল্লাহ বিন সামহাজ আমার কাছে বলেছে যে, রাসূলূল্লাহ (সঃ) বলেছেন: যে ব্যক্তি এশরাকের নামাজ পড়ত কিন্তু পরে তা ছেড়ে দিল, সে ব্যক্তিকে আল্লাহর কাছে নেয়া হলে এশরাকের নামাজ বলবে, হে আল্লাহ! আমাকে যে হেফাজত করেছে, তুমি তার হেফাজত কর, আর অমুক আমাকে ছেড়ে দিয়েছে, তুমিও তাকে ছেড়ে দাও। ২ ১.
তাবরানী বর্ণনা করেছেন, ইবনে সালেহ বর্ণনা করেছেন যে, আমর নামক জিন আমার কাছে বলেছেন, আমি নবী (সঃ)-এর কাছে ছিলাম। তিনি সূরা নাজম পড়ে সাজদা করেন। আমিও তাঁর সাথে সাজদা করি।
ইবনে উদয় 'আল-কামেল' গ্রন্থে লিখেছেন, ওসমান বিন সালেহ বলেছেন, আমি আমর বিন তলক নামক জিনকে দেখেছি। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেখেছেন? তিনি বলেন, 'হাঁ'। আমি তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেছি, মুসলমান হয়েছি এবং তাঁর পেছনে ফজরের নামাজ পড়েছি। তিনি সূরা হজ্জ পড়েছেন এবং তাতে দু'টো তেলাওয়াতে সাজদা করেছেন।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী তাঁর 'এসাবা' গ্রন্থে নূরুদ্দিন আলী বিন মোহাম্মদ সম্পর্কে মোহাম্মদ বিন নোমান আনসারীর বর্ণনার উল্লেখ করে লিখেছেন, নূরুদ্দিন একবার নিজ ঘরে একটি ভয়ানক সাপ দেখে ভয় পেয়ে যান। তিনি সাপটিকে মেরে ফেলেন। সাথে সাথে তাঁকে সেখান থেকে তুলে নেয়া হয়। তিনি নিজ পরিবার থেকে নিখোঁজ হন। জিনেরা তাঁকে তাদের বিচারকের কাছে বিচারের জন্য পেশ করে। নিহত জিনের একজন অভিভাবক বিচার প্রার্থনা করে। কিন্তু নূরুদ্দিন জিন হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন। বিচারক জিজ্ঞেস করেন, নিহত প্রাণীটি কোন্ আকৃতিসম্পন্ন ছিল? বলা হল, সাপের আকৃতি। বিচারক তাঁর পাশে যে বসা ছিল তার দিকে তাকান এবং বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি: 'তোমাদের কাছে এরকম কোন প্রাণী উপস্থিত হলে তাকে হত্যা কর।' তখন বিচারক তাঁকে মুক্তির আদেশ দেন। তিনি তাঁর পরিবারে ফিরে আসেন।
ইবনে আসাকের উল্লেখ করেছেন, আবু মোহাম্মদ হাসান বিন আহমদ বিন মোহাম্মদ হেমস বলেছেন, আমাদের এক শিক্ষক তাঁর এক শেখের বরাত দিয়ে বলেছেন, তিনি তাঁর এক সাথীসহ ভ্রমণে বের হলেন। তিনি তাকে এক কাজে পাঠালেন। আসতে তার অনেক দেরী হল। পরের দিন পর্যন্ত সে আর আসল না। এরপরে সে জ্ঞানহীন অবস্থায় ফিরে আসল। সবাই তার সাথে আলাপ করল। কিন্তু সে কিছুক্ষণ পর কথা বলতে পারল। তারা তার অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইল। সে বলল, আমি পুরাতন ধ্বংসপ্রাপ্ত এক ঘরে পেশাব করার জন্য প্রবেশ করলাম। আমি সেখানে একটি সাপ দেখলাম এবং তাকে মেরে ফেললাম। তারপর আমাকে যেন একটি জিনিস ধরল, এক জমীনে আমাকে অবতরণ করাল এবং একদল লোক আমাকে ঘিরে ফেলল। তারা বলল, এ ব্যক্তি অমুকের হত্যাকারী। আমরা কি তাকে হত্যা করবো? তাদের কেউ কেউ বলল, তাকে আমাদের শেখের কাছে নিয়ে চল। তারা আমাকে নিয়ে চলল। সেই শেখের চেহারা খুবই সুন্দর ও বড় এবং দাঁড়ি সাদা। আমি যখন তার সামনে দাঁড়ালাম, তখন তিনি জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের ঘটনা কি? তারা ঘটনা বলল। শেখ জিজ্ঞেস করলেন, জিনটি কিসের আকৃতি ধারণ করেছিল? তারা বলল: সাপের আকৃতি। তখন তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি জিনদের সাথে যে রাত্রে কথা বলেছেন, সে রাত্রে তিনি বলেছেন: 'তোমাদের মধ্যে কেউ যদি নিজ আকৃতির পরিবর্তে অন্য আকার ধারণ করে এবং নিহত হয়, তাহলে হত্যাকারীর বিরুদ্ধে কোন শাস্তি নেই। তাকে তোমরা ছেড়ে দাও এবং আমাকেও ছেড়ে যাও।
তাবরানী আব্দুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: শীঘ্রই তোমাদের মধ্যে সেই শয়তানগুলো বেরিয়ে আসবে যাদেরকে হযরত সোলায়মান (আঃ) সাগরে বেঁধে রেখেছিলেন। তারা মসজিদে তোমাদের সাথে নামাজ পড়বে এবং কোরআন পড়বে, আর দীনের বিষয়ে তোমাদের সাথে ঝগড়া করবে। তারা মানুষের আকৃতি ধারণকারী শয়তান।
শিরাজী তাঁর 'আলকাব' গ্রন্থে আব্দুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ সোলায়মান বিন দাউদ অনেক শয়তানকে সাগরে বেঁধে রেখেছেন। ১৩৫ হিজরীতে, তারা মানুষের আকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করবে। তারা মুসলমানদের মসজিদ ও মজলিশে বসবে এবং তাদের সাথে কোরআন ও হাদীস নিয়ে ঝগড়া করবে।
অর্থাৎ তারা কুরআন ও হাদীসের উল্টো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে মুসলমানদেরকে গোমরাহ করার চেষ্টা করবে। বায়হাকী তাঁর 'দালায়েল-আন-নবুয়াহ' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। সুফিয়ান বলেন, এক ব্যক্তি আমাকে বলল যে, সে মিনার মসজিদে খায়ফে এক ব্যক্তিকে কিসসা বর্ণনা করতে দেখেছে। সুফিয়ান বলেন, আমি তার সন্ধান নিয়ে দেখি যে, সে ছিল শয়তান।
শয়তান মানুষকে ইসলামের নামে গোমরাহ করার প্রয়াস চালায়। ইবনে আদী বলেন, ইবনে ইয়ামান সুফিয়ান সাওরীর কাছে শুনেছেন যে, এক ব্যক্তি তাঁকে জিন দেখেছে বলে জানাল। তিনি বলেন, শয়তান আমার বেশে মসজিদে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীস বর্ণনা করছে এবং লোকেরা তা লিখে নিচ্ছে।
শয়তান এভাবেও হাদীসের সাথে দুশমনী করে থাকে। এ দুশমনী বুঝার উপায় হল, যখনই হাদীসের বর্ণনা সহীহ হাদীসের কিংবা কোরআনের পরিপন্থী হবে তখনই তাকে শয়তানের কারসাজী ধরে নিতে হবে।
বায়হাকী 'দালায়েল আন নবুয়াহ' গ্রন্থে আরো উল্লেখ করেছেন, ঈসা বিন আবু ফাতেমা আল-ফোজারী বলেন, আমি মসজিদে হারামে এক শেখের কাছে বসা। তার কাছ থেকে যা শুনছি তা লিখছি। শেখ বলেন, শায়বানী বলেছেন। অন্য একজন বলল, শায়বানী আমার কাছেও বলেছেন। শেখ বলল, ইমাম শাবী থেকে বর্ণিত। লোকটি বলল, শাবী আমাকেও বলেছেন। শেখ বলল, জিন থেকে বর্ণিত। লোকটি বলল, আল্লাহর কসম, আমি ঘটনা দেখেছি এবং তার কাছ থেকে শুনেছি। শেখ বলল, আলী থেকে বর্ণিত। লোকটি বলল: আল্লাহর কসম, আমি আলীকে দেখেছি এবং সিফফীন যুদ্ধে তাঁর সাথে শরীক ছিলাম। ঈসা বিন আবু ফাতেমা ফোজারী বলেন, আমি সব কাণ্ড দেখে আয়াতুল কুরসী পড়লাম। আমি যখন وَلَا يَؤُدُهُ حِفْظُهُمَا পর্যন্ত পৌঁছলাম, তখন তাদের দিকে তাকিয়ে দেখলাম যে তাদের কেউ নেই।
আয়াতুল কুরসী পড়লে শয়তান থাকতে পারে না। তারা ছিল শয়তান। তাই ভেগে গেছে।

টিকাঃ
১. লাকতুল মারজান ফি আহকামিল জান-হাফেজ জালালুদ্দিন সুয়ূতী
১. ঐ
২. ঐ
১. ঐ
২. মোসনাদ আল ফেরদাউস- দাইলামী।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00