📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 মক্কা ও মদীনায় জিনদের সাথে মহানবী (সঃ)-এর সাক্ষাত ও কোরআন পাঠ

📄 মক্কা ও মদীনায় জিনদের সাথে মহানবী (সঃ)-এর সাক্ষাত ও কোরআন পাঠ


জিনের বিভিন্ন প্রতিনিধি দল নবী করীম (সঃ)-এর কাছে বিভিন্ন সময় আগমন করেছিল। মুসলিম ও আবু দাউদ আলকামা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আমি আব্দুল্লাহ বিন মাসউদকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের কেউ কি জিনের রাতে নবী (সঃ)-এর সাথে ছিলেন? তিনি বলেন, আমরা কেউ তাঁর সাথে ছিলাম না। কিন্তু এক রাতে আমরা তাঁকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমরা তাঁকে বিভিন্ন উপত্যকা ও পর্বতের পাদদেশে খুঁজলাম। না পেয়ে আমরা বললাম, তিনি হয়তো কোন আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছেন। এভাবে আমরা খুবই একটি নিকৃষ্ট রাত অতিবাহিত করলাম। ভোরে আমরা তাঁকে হেরা পাহাড়ের দিক থেকে আসতে দেখে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনাকে না পেয়ে খুঁজলাম। খুঁজে না পেয়ে খুবই একটি মন্দ রাত অতিবাহিত করলাম। তিনি বলেন, আমার কাছে জিনের পক্ষ থেকে একজন আহ্বানকারী এসেছিল। আমি তাদের কাছে কোরআন পাঠ করেছি। তারপর তিনি আমাদেরকে তাঁর সাথে নিয়ে যান এবং তাদের আগুনের চিহ্নসহ অন্যান্য চিহ্ন দেখান। তারা তাঁর কাছে তাদের খাবার নির্দিষ্ট করার আহ্বান জানায়। তিনি বলেন, তোমাদের জন্য সেই হাড় নির্দিষ্ট করা হল, যা বিসমিল্লাহ পড়ে খাওয়া হয়েছে এবং তা তোমাদের হাতে পড়ামাত্র গোশতে পূর্ণ হয়ে যাবে। আরও নির্দিষ্ট করা হল, তোমাদের পশুর খাবার থেকে সৃষ্ট বিষ্ঠা বা গোবর। এটা দ্বারা এস্তেঞ্জা করবে না। এ দু'টো তোমাদের ভাইদের খাবার।
ইমাম আহমদ এ হাদীসটি বর্ণনা করে আরো কিছু বেশি যোগ করে বলেছেন, 'জিনেরা মক্কায় নবী (সঃ)-কে তাদের খাদ্য- খাবার নির্দিষ্ট করার আবেদন জানায়। তারা ছিল আরব দ্বীপের অধিবাসী।'
এ হাদীসে বর্ণিত ঘটনা প্রমাণ করে যে, আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ এ রাতে জিনদের কাছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে যান নি। তিনি যে রাতে তাঁর সাথে জিনদের কাছে গিয়েছিলেন সেটি ভিন্ন রাতের ঘটনা। সে ঘটনাটি ইমাম বায়হাকী তাঁর دلائل النبوة গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন, একদিন নবী (সঃ) মক্কায় তাঁর সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বলেন: 'তোমাদের যে ব্যক্তি আমার সাথে রাত্রে জিনদের সাথে সাক্ষাতের ঘটনায় হাজির হতে চায়, সে যেন হাজির হয়। তিনি বলেন, আমি ছাড়া আর কেউ হাজির হয় নি। আমরা উভয়ে মক্কার উপরিভাগে (হুজুনে) পৌঁছলাম। তিনি নিজ পা দ্বারা একটা রেখা টেনে দিয়ে বলেন, এখানে বস। তারপর তিনি অগ্রসর হলেন এবং দাঁড়িয়ে কুরআন পাঠ শুরু করলেন। জিনেরা চারদিক থেকে তাঁকে ঘিরে ফেলেছে এবং আমার ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মাঝে আড়াল সৃষ্টি হয়ে গেছে। ফলে, আমি তাঁর শব্দ পর্যন্ত শুনতে পাচ্ছিলাম না। তারপর তারা যেন বিদায়ী মেঘের বিক্ষিপ্ত টুকরার মত বিদায় নিল। কিন্তু একদল অবশিষ্ট ছিল। ভোর রাত- সোবহে সাদেকের সময় তিনি অবসর হন। তিনি এবার দৃষ্টিগোচর হন এবং আমার কাছে আসেন ও জিজ্ঞেস করেন, জিনের দলটি কি করেছে? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! ঐতো তারা। তারপর তিনি হাড় ও গোবর নিলেন এবং তা তাদেরকে খাবার হিসেবে দিলেন। তিনি বললেন, কেউ যেন হাড় ও গোবর দিয়ে এস্তেঞ্জা না করে।
অন্যান্য বর্ণনায় আরো এসেছে যে, ইবনু মাসউদ বলেন, আমি নবী (সঃ)-এর কাছে জিনদেরকে বলতে শুনেছি, 'আপনি যে আল্লাহর রাসূল এর সাক্ষী কে? তিনি অবশ্য তখন একটি গাছের কাছে দাঁড়ানো ছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেন, যদি গাছটি স্বাক্ষ্য দেয় তাহলে কি তোমরা ঈমান আনবে? জিনেরা বলল, 'হাঁ।' এবার নবী করীম (সঃ) আমাকে ডাকলেন, আমি তাঁর কাছে গেলাম এবং গাছটিকে নিজ শাখা টানতে দেখলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, আমি যে আল্লাহর রাসূল তুমি কি একথার স্বাক্ষ্য দেবে? গাছটি উত্তর দিল, আমি স্বাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল।
উপরোক্ত ঘটনা দু'টো মক্কায় ঘটেছে। এবার আমরা মদীনায় সংঘটিত ঘটনা সম্পর্কে আলোচনা করব। এ ঘটনায়ও হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ নবী (সঃ)-এর সাথে ছিলেন। আমর বিন গালান সাকাফী বলেন, আমি আব্দুল্লাহ বিন মাসউদের কাছে আসলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম, জিনদের প্রতিনিধিরা যে রাতে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কাছে এসেছিল সে রাতে আপনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলেন বলে আলোচনা করেছেন, এটা কি সত্য? তিনি বলেন: 'হাঁ।' আমি বললাম, সে ঘটনাটি আমাকে বলুন। তিনি বলেন, একরাতে প্রত্যেক আহলে সুফফাকে এক একজন মেজবান রাত্রের মেহমানদারীর জন্য নিয়ে গেল। আমি বাকি থাকলাম। আমাকে কেউ নিল না। তখন নবী (সঃ) আমার পাশ দিয়ে যান এবং জিজ্ঞেস করেন, কে এ ব্যক্তি? আমি জবাব দিলাম, 'আমি ইবনে মাসউদ।' তিনি প্রশ্ন করেন, তোমাকে কি কেউ রাত্রের খাবারের জন্য নিয়ে যায় নি? আমি জবাব দিলাম, 'না'। তিনি বললেন, চল, দেখি তোমার জন্য কোন কিছু পাই কি না। ইবনে মাসউদ বলেন, আমরা হযরত উম্মে সালামার কক্ষ পর্যন্ত পৌঁছলে, তিনি আমাকে দাঁড়াতে বলে নিজ স্ত্রীর কাছে যান। তারপর একটি বালিকা বেরিয়ে এসে বলে, হে ইবনু মাসউদ! রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনার জন্য কোন খাবার পান নি, আপনি আপনার শয়নগাহে ফিরে যান। আমি মসজিদে ফিরে আসলাম। কঙ্কর যোগাড় করে বালিশের মত উঁচু করলাম এবং কাপড় মুড়ি দিয়ে শুয়ে রইলাম।
একটু পরেই বালিকাটি এসে বলল, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনাকে ডাকছেন, আসুন। আমি রাত্রের খাবারের আশায় বালিকাটির পেছনে চললাম। আমি ঐ স্থানে পৌঁছামাত্রই রাসূলুল্লাহ (সঃ) বের হলেন। তাঁর হাতে ছিল একটি খেজুরের ডাল। তিনি এটা দিয়ে আমার বুকে খোঁচা লাগিয়ে বললেন, আমি যে পর্যন্ত যাই, সে পর্যন্ত আমার সাথে সাথে চল। আমি বললাম, মাশাআল্লাহ। তিনি তিনবার ঐ কথা বললেন। আমি প্রত্যেকবারেই মাশাআল্লাহ বললাম। আমরা 'বাকি' কবরস্থান পর্যন্ত আসলাম। তিনি নিজ লাঠি দিয়ে একটা রেখা এঁকে বললেন: 'এখানে বস এবং আমি না আসা পর্যন্ত এ স্থান ত্যাগ করবে না।' তিনি অগ্রসর হতে থাকলেন। আমি খেজুর গাছের মধ্য দিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
আমার মনে হল যেন কাল ধোঁয়া ছেয়ে গেছে এবং পরে তা দূরও হয়ে গেছে। আমি মনে মনে ভাবলাম, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে গিয়ে মিলিত হই। আমার আশঙ্কা হয়েছিল যে, হাওয়াযেন গোত্রের লোকেরা তাঁকে হত্যা করার কোন চক্রান্ত করেছে। আমি আরও ভাবলাম, আমি দ্রুত ঘরে যাই এবং লোকদের সাহায্য কামনা করি। কিন্তু আমার মনে পড়ে গেল যে, তিনি আমাকে এই স্থান ত্যাগ করতে নিষেধ করেছেন। তারপর শুনতে পেলাম, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে লাঠি দিয়ে ধমক দিচ্ছেন এবং বলছেন, তোমরা বসে পড়। তারা বসে পড়ল। আকাশে ভোরের লালিমা ফুটে উঠার সময় হয়ে এল। তারপর তারা গমগম করে উঠল এবং চলে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার কাছে আসেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, আমি চলে যাওয়ার পর তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছিলে? আমি বললাম: 'না',। কিন্তু আমি প্রথমে ভয় পেয়ে গেলাম এবং ভাবলাম যে, ঘরে ফিরে আসি এবং লোকদেরকে ডেকে নিয়ে যাই। সে মুহূর্তেই আমি শুনতে পেলাম, আপনি লাঠি দিয়ে তাদেরকে ধমক দিচ্ছেন। আমার আশঙ্কা হয়েছিল যে, হাওয়াযেন গোত্রের লোকেরা আপনাকে হত্যা করার কোন ষড়যন্ত্র করেছিল।
তিনি বলেন, তুমি যদি ঐ রেখাবৃত্ত থেকে বের হতে, তাহলে আমি তোমাকে কোন নিরাপত্তা দিতে পারতাম না এবং কোন জিন হয়তো তোমাকে ছিনিয়ে নিয়ে যেত। তিনি আরো জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি কিছু দেখেছ? আমি বললাম, আমি সাদা কাপড় পরা কতগুলো কাল লোক দেখেছি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, তারা হল, নাসিবীন এলাকার জিনদের প্রতিনিধি দল। তারা আমার কাছে তাদের খাদ্য সম্ভারের আবেদন জানায়। আমি হাড় ও গোবরকে তাদের খাদ্য হিসেবে নির্দিষ্ট করেছি। আমি প্রশ্ন করলাম, এর দ্বারা তাদের কি ফায়দা হবে? তিনি বলেন:
তারা যখন কোন হাড়-হাড্ডি পাবে, তাতে খাওয়ার সময়কার প্রথম গোশতসহ পাবে এবং যখন কোন গোবর ও বিষ্ঠা পাবে তাতে প্রথমে খাওয়ার সময় যে দানা বা বীজ ছিল তা সহ পাবে। তোমাদের কেউ যেন হাড় ও গোবর দিয়ে এস্তেঞ্জা না করে।
রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে জিনের। মদীনায় আরেক দফা এসেছিল। সে দফায় তাঁর সাথে ছিলেন হযরত যোবায়ের বিন আ'ওয়াম। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে নিয়ে ফজরের নামাজ পড়েন। নামাজ শেষে বলেন: আজ রাতে জিনের প্রতিনিধি দলের সাথে সাক্ষাতের সময় আমার সাথে তোমাদের মধ্য থেকে কে যাবে? কেউ কথা বলল না। তিনি একথা তিনবার বললেন। তারপর (রাত্রে) আমার কাছ দিয়ে অতিক্রমের সময় আমাকে নিয়ে চললেন। আমি তাঁর সাথে চলতে থাকলাম। মনে হল যেন, মদীনার সকল পাহাড়কে আমাদের জন্য গায়েব করা হয়েছে। আমরা এক খালি মাঠে উপস্থিত হলাম। সেখানে তীরের মত লম্বা লম্বা লোকদেরকে দেখতে পেলাম। তারা পা পর্যন্ত সাদা কাপড় পরিহিত ছিল। তাদেরকে দেখামাত্র আমার মনে কঠিন ভয় জাগল। এমনকি ভয়ে আমার দু'পা ঠক্ করে কাঁপতে লাগল। আমরা তাদের নিকটবর্তী হওয়ার পর নবী করীম (সঃ) নিজ পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে আমার জন্য একটা রেখা টেনে বললেন: "এ রেখার মধ্যখানে বস।" সেখানে বসার পর আমার মনের সকল ভয়-ভীতি দূর হয়ে গেল। নবী (সঃ) আমার কাছ থেকে তাদের দিকে এগিয়ে গেলেন, তাদের কাছে কোরআন তেলাওয়াত করেন এবং সোবহে সাদেক পর্যন্ত তাদের কাছে অবস্থান করেন। তারপর তিনি এগিয়ে আসেন এবং কাছে এসে বলেন, আমার সাথে চল। আমি তাঁর সাথে চললাম। সামান্য পথ অতিক্রম করার পর তিনি আমাকে বলেন: “দেখ, ওখানে কি কেউ আছে?” আমি বললাম, আমি সেখানে এক বিরাট দল দেখছি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মাথা মোবারক নিচু করেন এবং গোবরসহ একটি হাড় যোগাড় করে তাদের দিকে নিক্ষেপ করেন। তিনি বলেন, তারা হল নাসীবীন এলাকার জিনদের প্রতিনিধি দল। তারা আমার কাছে তাদের খাদ্যসম্ভার দাবী করেছে। আমি তাদের জন্য হাড় এবং গোবরকে খাদ্য হিসেবে নির্দিষ্ট করলাম। যোবায়ের (রাঃ) বলেন- তাই হাড় ও গোবর দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করা নাজায়েয। (তাবরানী)
যোবায়ের (রাঃ)-এর বর্ণিত এ ঘটনাটি ঘটেছিল মদীনার পাহাড়সমূহ থেকে দূরবর্তী খোলা ময়দানে। আর আব্দুল্লাহ বিন মাসউদের ঘটনা ঘটেছিল মদীনার 'বাকী' গোরস্থানে।
রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচা আবু তালেবের মৃত্যুর পর তিনি তাঁর সর্বশেষ আশ্রয়স্থল হারিয়ে ফেলেন। মক্কার কাফের কোরাইশদের কাছে তাঁর দাওয়াত ও আশ্রয় প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তিনি তায়েফে যান। কিন্তু সেখানেও তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যাত হয়। তিনি দুঃখ ভরা হৃদয়ে ফিরে আসেন। আল্লাহ জিবরীল (আঃ)-এর সাথে পাহাড়ের ফেরেশতাকে তাঁর সাহায্যার্থে পাঠান। পাহাড়ের ফেরেশতা পাহাড় চাপিয়ে তায়েফবাসীকে ধ্বংস করার জন্য নবী (সঃ)-এর অনুমতি চান। কিন্তু নির্যাতিত অথচ দয়ালু নবী তাদের ধ্বংসের পরিবর্তে হেদায়েত ও রহমতের দোআ করেন। সে কঠিন মুহূর্তেই আল্লাহ একদল জিনকে তাঁর কাছে কোরআন শুনার জন্য পাঠান। একটি গাছ নবী (সঃ)-এর আনুগত্য স্বীকারের নিমিত্ত জিনদের আগমনের বার্তা ঘোষণা করে। আল্লাহ জিনের কোরআন শুনা ও গাছের ঘোষণার মাধ্যমে নবী (সঃ)-কে জানিয়ে দেন যে, বিজয় তাঁর সুনিশ্চিত। লোকেরা তাঁর দাওয়াত কবুল করবে এবং মানুষ ও জিন তাঁর মিল্লাতের অন্তর্ভুক্ত হবে। এ ঘটনাটি তায়েফ থেকে মক্কা ফিরার পথে 'নাখলায়' সংঘটিত হয়। জিনদের আসমানী কথাবার্তা চুরি করে শুনার বিরুদ্ধে কঠোর প্রহরার কারণে তারা এর রহস্য জানার জন্য বিশ্বব্যাপী অভিযানে বের হয়। 'তেহামা' অভিযানে আগমনকারী জিনের এই প্রতিনিধি দলটি নাখলায় নবী (সঃ)-এর কাছে নামাজে কোরআন শুনার পর মুসলমান হয়ে যায়। আল্লাহ এই ঘটনার মাধ্যমে বিরোধী কাফেরদের অত্যাচার নির্যাতনের মোকাবিলায় ধৈর্য্য ধারনের আহ্বান জানান। মানুষের মন যেহেতু আশঙ্কাপূর্ণ, তাই আল্লাহ তাঁর মনের মজবুতির জন্য জিনদেরকে দিয়ে কোরআন শুনার ব্যবস্থা করেন। আল্লাহ বলেন:
وَكُلًّا نَقَصُّ عَلَيْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الرُّسُلِ مَا نَثَبِّتْ بِهِ فُؤَادَكَ .
"আমি আপনার কাছে নবীগণের কাহিনী বর্ণনার মাধ্যমে আপনার মনকে দৃঢ় করি।"
এই প্রতিনিধি দলে তিনশত জিন ছিল বলে এক বর্ণনায় এসেছে। তারা নিজ সম্প্রদায়ের কাছে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছে। তিন মাস পর তারা এক রাতে পুনরায় মক্কায় তাঁর সাথে মিলিত হওয়ার জন্য আসে। তিনি পুরো রাত তাদের কাছে কোরআন তেলাওয়াত করেন। এছাড়াও তাদের মধ্যে সম্পৃতি ও সম্ভাব সৃষ্টির জন্য তিনি একই রাতে তাদের বহু বিবাদ- বিসম্বাদ মিটমাট করে দেন।
এরপর বিভিন্ন সময় মক্কা ও মদীনায় জিনদের বিভিন্ন দল নবী (সঃ)-এর কাছে আসতে থাকে। তিনি প্রত্যেক গোত্রের জিনদের কাছে কোরআন তেলাওয়াত করে শুনান। তা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে কিছু জিন কাফের থেকে যায়। যেমন, মানুষের মধ্যেও কাফের রয়েছে। একদিন এক দৈত্য জিন নবী (সঃ)-এর নামাজের সামনে দিয়ে অতিক্রমের সময় তিনি তাকে ধরে ফেলেন। সে তাঁর নামাজ নষ্ট করতে এসেছিল। হযরত সোলায়মান (আঃ)-এর দোআর কথা মনে পড়ায় তিনি সে কাফের জিনটাকে অপমানিত অবস্থায় ছেড়ে দেন।
হাফেজ আবু নাঈম তাঁর গ্রন্থে বেলাল বিন হারেস থেকে বর্ণনা করেছেন। বেলাল বলেন: আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে এক সফরে বের হলাম। তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের জন্য রওনা হলেন। তাঁর নিয়ম ছিল, প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের জন্য তিনি দূরে যেতেন। আমি একটি পাত্রে করে তাঁর এস্তেঞ্জার পানি নিয়ে গেলাম, তিনি দূরে চলে গেলেন। আমি তাঁর কাছে লোকদের দুর্বোধ্য কথাবার্তার জটলা শুনতে পেলাম। ইতিপূর্বে কখনও এরূপ আর শুনিনি। এরপর তিনি আসেন এবং বলেন: বেলাল, তোমার কাছে কি পানি আছে? আমি বললাম, জ্বি, আছে। তিনি মন্তব্য করলেন, ঠিক কাজ করেছ। তিনি আমার কাছ থেকে পানি নিয়ে গেলেন এবং অজু করলেন। আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর নবী। আমি আপনার কাছে লোকদের দুর্বোধ্য কথাবার্তার জটলা শুনলাম। তিনি উত্তরে বলেন, আমার কাছে মুসলমান জিন ও কাফের জিনরা এসেছিল। তারা আমার কাছে তাদের বাসস্থান নির্ধারণের আহ্বান জানায়। আমি মুসলমান জিনদেরকে সমতলভূমি এবং মোশরেক জিনদেরকে নিম্নভূমিতে বাস করার নির্দেশ দিয়েছি। হাফেজ আবু নাঈম তাঁর গ্রন্থে এবং তাবরানী উল্লেখ করেছেন যে, ইবনে মাসউদ মক্কার হুজন ছাড়াও আরেক রাতে জিনদের ঘটনায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে উপস্থিত ছিলেন। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেন : এক রাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে তাঁর সাথে জিনদের কাছে নিয়ে গেলেন। আমি তাঁর সাথে চলতে থাকলাম। যখন আমরা মক্কার উঁচু ভাগে পৌঁছলাম, তখন নবী (সঃ) আমার জন্য একটা রেখা টেনে বললেন: 'এখান থেকে সরবে না।' তারপর তিনি পাহাড়ের ভেতরে কিছুটা দূরে চলে গেলেন। আমি দেখলাম যে, লোকেরা পাহাড়ের উপর থেকে নামছে এবং আমার ও তাঁর মধ্যে আড়াল সৃষ্টি করেছে। ভোর রাত সোবহে সাদেক পর্যন্ত এ অবস্থা অব্যাহত ছিল। পরে নবী (সঃ) আসলেন এবং বললেনঃ আমাকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে যে, জিন ও মানুষ আমার উপর ঈমান আনবে। মানুষতো ঈমান এনেছে। জিনদেরকে আমি দেখলাম।'
বায়হাকী ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি জিনের সাথে সাক্ষাতের রাত্রে নবী (সঃ)-এর সাথে 'হুজুন' পর্যন্ত আসি। তিনি আমার জন্য রেখা টানেন। তারপর তিনি জিনদের দিকে এগিয়ে যান। তারা তাঁর কাছে এসে ভীড় জমায়। তাদের নেতা ওয়ারদান বলেন, তাদেরকে আপনার কাছ থেকে বিদায় দিচ্ছি। আল্লাহর কাছ থেকে আমাকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না।
বায়হাকী ও আবু নাঈম, ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে সাথে নিলেন এবং বললেন, বনি ইখওয়াহ গোত্র ও বনি আ'ম গোত্রের ১৫ জন জিন আজ রাতে আমার কাছে আসবে। আমি তাদেরকে কোরআন শুনাব। ইবনে মাসউদ বলেন, আমি তাঁর সাথে ইন্সিত স্থানে গেলাম। তিনি আমার জন্য একটি দাগ টেনে তার ভেতর বসতে বললেন। তিনি আরো বললেন, তুমি এখান থেকে বের হবে না। আমি সেখানেই রাত কাটিয়ে দিলাম। ভোরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার কাছে ফিরে আসলেন। সকাল হলে আমি ৬০টি উটের বসার স্থান ও চিহ্ন দেখতে পেলাম।
তিরমিজী, হাকেম ও বায়হাকী জাবের বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবায়ে কেরামের কাছে সূরা আর-রাহমান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়েন। সাহাবায়ে কেরাম চুপ রইলেন। তা দেখে তিনি প্রশ্ন করেন: তোমাদের কি হল, তোমাদেরকে চুপচাপ দেখছি? আমি জিনদের সাথে রাত্রে যখন সাক্ষাত করি তখন তারা তোমাদের চাইতে উত্তম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। আমি যখনই ( فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ) তোমরা উভয় সম্প্রদায় জিন ও মানুষ, তোমাদের প্রতিপালকের কোন্ নেয়ামতটিকে অস্বীকার করতে পার?) পড়েছি, তখনই তারা জবাবে বলেছে:
وَلَا بِشَيْ مِنْ نِعْمَةِ رَبِّنَا نُكَذِّبُ، فَلَكَ الْحَمْدُ .
"আমরা আমাদের প্রতিপালকের কোন নেয়ামতকে অস্বীকার করি না, হে রব! সকল প্রশংসা আপনারই।"
উল্লেখিত হাদীসসমূহ থেকে জানা যায় যে, নবী করীম (সঃ)-এর কাছে ৬ বার জিনদের প্রতিনিধিরা এসেছিল। ১. যখন সন্দেহ করা হল যে, তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছেন এবং যখন তাঁর সন্ধান করা হয়েছিল। সে রাতে তিনি ছিলেন একাকী, কেউ তাঁর সাথে ছিল না। ২. হুজুনে ৩. মক্কার উঁচু অংশে পাহাড়ের ভেতর। ৪. মদীনার বাকী গারকাদ কবরস্থানে। এই তিন রাত হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) নবী (সঃ)-এর সাথে উপস্থিত ছিলেন। ৫. মদীনার বাইরে- যাতে হযরত যোবায়ের বিন আওয়াম উপস্থিত ছিলেন। ৬. এক সফরে সংঘটিত ঘটনায় বেলাল বিন হারেস উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়াও বিক্ষিপ্তভাবে তাঁর সাথে জিনদের আরো তিনবার সাক্ষাত হয়েছিল। একবার এক দৈত্য জিন তাঁর নামাজের সামনে দিয়ে যেতে চেয়েছিল। তিনি তাকে ধরে ফেলেন। ২য় বার, এক জিন তাঁর মুখে অগ্নিশিখা নিক্ষেপ করে তাঁকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। তিনি আল্লাহর কাছে তিনবার আশ্রয় চান ও তাকে তিনবার অভিশাপ দেন। তারপর তাকে ধরার ইচ্ছা করেন। হযরত সোলায়মান (আঃ)-এর ব্যাপক সাম্রাজ্যের দোআর কথা মনে পড়ায় তাকে ধরার ইচ্ছা ত্যাগ করেন। ৩য় বারের ঘটনাটি আবু নাঈম ও বায়হাকী হযরত ওমর থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমরা একবার 'তেহামা' অঞ্চলের একটি পাহাড়ের ওপর নবী করীম (সঃ)-এর সাথে বসা ছিলাম। তখন এক বৃদ্ধ শেখ আসলে। তার হাতে ছিল একটা ছড়ি। তিনি নবী (সঃ)-কে সালাম দেন। তিনি (সঃ) সালামের জবাব দেন। শেখ বলল : জিনেরা তাঁর জন্য পেরেশান। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন : তুমি কে? শেখ উত্তর দিল, আমি হাম্মাহ বিন আল-ওহাইম বিন আল-আকইয়াস বিন ইবলিশ। নবী (সঃ) বললেনঃ তোমার ও ইবলিশের মধ্যে মাত্র দুই পূর্ব-পুরুষের ব্যবধান। তোমার বয়স কত? শেখ বলল : দুনিয়ার বয়স আর বেশি বাকি নেই। আদম-সন্তান কাবীল যে রাতে হাবীলকে হত্যা করেছিল, তখন আমি মাত্র কয়েক বছরের বালক, লোকদের কথা বুঝতাম, পাহাড়ে থাকতাম, খাদ্য নষ্ট এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার হুকুম দিতাম। তখন নবী করীম (সঃ) বলেন: কল্যাণ সমৃদ্ধ বৃদ্ধ এবং ভাল যুবকের জন্য এটি অত্যন্ত নিকৃষ্ট কাজ। শেখ বলল, আমাকে আরো কিছু বলুন। আমি আল্লাহর কাছে তাওবাকারী। শেখ আরো বলল, আমি হযরত নূহ (আঃ)-এর মসজিদে তাঁর কাওমের মুমিন ব্যক্তিদের সাথে উপস্থিত ছিলাম। আমি তাঁকে তাঁর কওমের প্রতি দাওয়াতের ব্যাপারে বহু গঠনমূলক সমালোচনা করেছি। তিনি কেঁদেছেন, আমিও কেঁদেছি। আমি আমার কাজের জন্য লজ্জিত এবং আল্লাহর কাছে অজ্ঞ লোকদের মধ্যে শামিল হওয়ার কারণে পানাহ চাই। আমি নূহ (আঃ)-কে বললাম, আমি আদম সন্তান শহীদ হাবিলের রক্তে অংশগ্রহণ করেছি। আপনার রবের কাছে কি আমার তওবার কোন সুযোগ আছে? নূহ বলেনঃ হে হাম্মাহ! ভাল কাজের ইচ্ছা কর এবং আফসোস ও লজ্জিত হওয়ার আগেই তা কর। আল্লাহ আমার কাছে যা নাযিল করেছেন, তাতে আমি পড়েছি, বান্দাহর গুনাহ যত বেশিই হোক না কেন, সে যদি আল্লাহর কাছে তওবা করে, আল্লাহ তার তওবাহ কবুল করেন। তাই তুমি উঠ, অজু কর এবং দু'টো সাজদা দাও। আমি সাথে সাথেই তা করি। তিনি আমাকে ডাক দিয়ে বলেন, তোমার মাথা তোল, আসমান থেকে তোমার তওবা কবুল হয়েছে। আমি আল্লাহর কাছে এক বছর সাজদায় পড়ে রইলাম।
আমি হযরত হুদ (আঃ)-এর সাথে তাঁর মসজিদে, তাঁর কওমের ঈমানদার ব্যক্তিদের সাথে উপস্থিত ছিলাম। আমি তাঁকে তাঁর কওমের প্রতি দাওয়াতের ব্যাপারে গঠনমূলক সমালোচনা করতে থাকি, যে পর্যন্ত না তিনি এবং আমি কেঁদেছি।
শেখ বলল, আমি হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর সাক্ষাত পেয়েছি এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর সাথেও নিরাপদ জায়গায় অবস্থান করেছি। আমি হযরত ইলিয়াস (আঃ)-এর সাথে উপত্যকাসমূহে সাক্ষাত করেছি এবং এখনও করছি। আমি হযরত মূসা বিন এমরানের সাক্ষাতও পেয়েছি। তিনি আমাকে তাওরাত শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি আমাকে বলেছেন, হযরত ঈসা বিন মরিয়মের সাক্ষাত পেলে তাঁকে আমার সালাম পৌঁছাবে। আমি তাঁকে মূসা (আঃ)-এর সালাম পৌছিঁয়েছি। হযরত ঈসা (আঃ) আমাকে বলেছেন : তুমি হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর দেখা পেলে তাঁর কাছে আমার সালাম পৌঁছাবে। একথা শুনে নবী করীম (সঃ) দু'চোখ মেলে কাঁদতে লাগলেন। তারপর সালামের উত্তরে বলেন:
وَعَلَى عِيسَى السَّلَامُ مَا دَامَتِ الدُّنْيَا وَعَلَيْكَ السَّلَامُ يَاهَامَّةٌ بِأَدَائِكَ الْأَمَانَةَ .
"যতদিন পর্যন্ত দুনিয়া অবশিষ্ট আছে ততদিন পর্যন্ত হযরত ঈসার উপর সালাম ও শান্তি বর্ষিত হোক। হে হাম্মাহ, আমানত আদায়ের কারণে তোমার উপরও আল্লাহর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক।” শেখ বলল, হে আল্লাহর রাসূল। হযরত মূসা যা করেছেন, আপনিও আমার সাথে সেরূপ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে সূরা ওয়াকেআ, সূরা মুরসালাত, সূরা নাবা, সূরা তাকবীর, সূরা মোআওযেজাতাইন এবং সূরা এখলাস শিক্ষা দেন। তিনি আরো বলেন। হে হাম্মা, আমাদের কাছে তোমার প্রয়োজন তুলে ধর এবং আমাদের সাক্ষাত ত্যাগ করোনা। হযরত ওমর বলেন : রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইন্তেকাল হয়েছে কিন্তু তার মৃত্যুর খবর আমরা পাইনি। আমি জানিনা যে সে এখন জীবিত আছে না মরে গেছে।১. এই হাদীসটি আব্দুল্লাহ বিন আহমদ তাঁর 'যোহদ' গ্রন্থে, শিরাজী তাঁর 'আলকাব' গ্রন্থে, আবু নাঈম, ইবনু মারদুইয়া এবং ফাকেহী তাঁর 'আখবার মক্কা' গ্রন্থে ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হওয়ায় হাদীসটির মর্যাদা হাসানের রূপ নিয়েছে।
আবু আলী বিন আশআস তাঁর 'আস-সুনান' গ্রন্থে হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন,
إِنَّ هَامَةَ بْنَ الْأَقْيْسِ فِي الْجَنَّةِ
'নিশ্চয়ই হাম্মাহ বিন আফইয়াস বেহেশতী।'
ইবনুল জাওযী তাঁর 'সফওয়াতুস সফওয়াহ' গ্রন্থে সহল বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন। সহল বলেন: আমি 'কওমে আদের' এলাকার এক প্রান্তে একটি পাথর খোদাই করা শহর দেখতে পাই। এর মাঝখানে রয়েছে পাথরের তৈরি এক বালাখানা। তাতে জিনেরা বাস করে। আমি তাতে প্রবেশ করে দেখি, এক বিরাট বৃদ্ধ শেখ কেবলামুখী হয়ে নামাজ পড়ছেন। তার গায়ে রয়েছে ভীষণ সুন্দর এক জুববা। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি সালামের জবাব দিলেন। শেখ বললেন, হে সহল! দেহ কাপড়কে পুরাতন করে না, বরং গুনাহর দুর্গন্ধ এবং হারাম খাদ্যই তাকে পুরাতন করে। আমার গায়ে এ জুব্বা দীর্ঘ সাতশ' বছর ব্যাপী বিদ্যমান রয়েছে। এ জুব্বা পরেই আমি হযরত ঈসা এবং হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর সাথে মিলিত হয়েছি এবং তাঁদের দু'জনের উপর ঈমান এনেছি। সহল বলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কে? শেখ উত্তর দেন: আমি তাদের মধ্যকার একজন যাদের ব্যাপারে নিম্নোক্ত আয়াতটি নাজিল হয়েছে:
قُلْ أُوحِيَ إِلَى أَنَّهُ اسْتَمَعَ نَفَرٌ مِّنَ الْجِنِّ .
"আপনি বলুন, আমার কাছে এ মর্মে অহী নাজিল হয়েছে যে, একদল জিন কোরআন শুনেছে।” (সূরা জিন-১)
মহানবী (সঃ) জিনদেরও নবী হওয়ায় দীন শিক্ষার জন্য তাদেরকে তাঁর কাছে আসতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, পরবর্তী যুগে দেখা গেছে, বহু জিন ছাত্র বহু দীনি প্রতিষ্ঠানে ছাত্র হিসেবেও লেখাপড়া শিখেছে। অনেক বুজুর্গ লোকের দরসের অনুষ্ঠানেও জিনদের আগমন ঘটেছে। দ্বীনদার জিনেরা সর্বদাই দীন শিখে তা নিজ সম্প্রদায়ের কাছে প্রচার প্রসারের দায়িত্ব পালন করে। মানব সমাজের মত ফাসেক ও গুনাহগার জিনেরাই কেবল দীনি শিক্ষা থেকে দূরে থাকে।

টিকাঃ
১. ঐ

📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 জিনের আসমানী কথা চুরি

📄 জিনের আসমানী কথা চুরি


মুসলিম শরীফে ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একজন আনসার সাহাবী আমাকে বলেছেন, তাঁরা এক রাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে বসা ছিলেন। তখন একটি উল্কাপিণ্ড নিক্ষিপ্ত হয়ে আলোকিত হয়ে উঠল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে প্রশ্ন করেন, জাহেলিয়াত যুগে এ জাতীয় উল্কাপিণ্ড খসে পড়লে তোমরা কি বলতে? তাঁরা উত্তর দেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সর্বাধিক জ্ঞাত আছেন। তবে আমরা বলতাম, 'আজ রাতে কোন মহান ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করেছে কিংবা মৃত্যুবরণ করেছে।' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন: এটা কোন ব্যক্তির জন্ম ও মৃত্যুর জন্য ঘটে না। বরং মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যখন কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন আরশ বহনকারী ফেরেশতারা তাসবীহ পাঠ করেন। তারপর আরশের নিকটবর্তী আসমানের বাসিন্দারা তাসবীহ পাঠ করেন। এভাবে দুনিয়ার আসমানের বাসিন্দারা পর্যন্ত তাসবীহ পাঠ করেন। তারপর আরশের নিকটবর্তী আসমানের বাসিন্দারা আরশ বহনকারী ফেরেশতাদেরকে জিজ্ঞেস করেন। আপনাদের রব কি বলেছেন? তারা তখন আল্লাহর বার্তা পৌছে দেন। এরপর বিভিন্ন আসমানের অধিবাসীরা পরস্পরকে এভাবে জিজ্ঞেস করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত দুনিয়ার আসমানের বাসিন্দাদের কাছে খবরটি পৌঁছে যায়। তখন জিনেরা ঐ খবর ছোঁ মেরে শুনে ফেলে এবং তাদের অনুসারীদের কাছে তা পৌঁছে দেয়। তারা যা বহন করে নিয়ে এসেছে তা সত্য। কিন্তু তারা তাতে বহু মিথ্যা যোগ করে প্রকাশ করে।
বোখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, গণকেরা যেসব কথা বলে আমরা সেগুলোকে সত্য দেখতে পাই। তিনি উত্তরে বলেন, ঐ বাণী তো সত্য। জিন সেটাকে সংরক্ষণ করে এবং তার অনুসারীদের কানে তা ঢেলে দেয়। সাথে আরো এক'শ মিথ্যা যোগ করে।
রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াত লাভের পর শয়তানের আসমানী কথা চুরি বাধাগ্রস্ত হয়। আল্লাহ কোরআন মজীদে জিনদের জবানীতে একথা প্রকাশ করেছেন যে,
وَأَنَّا لَمَسْنَا السَّمَاءَ فَوَجَدْنَاهَا مُلِئَتْ حَرَسًا شَدِيدًا وَشُهَبًا * وَأَنَّا كُنَّا نَقْعُدُ مِنْهَا مَقَاعِدَ لِلسَّمِعِ ، فَمَنْ يَسْتَمِعِ الْآنَ يَجِدُ لَهُ شِهَابًا رَصَدًا *
(জিনেরা বলেছে) "আমরা আকাশ পর্যবেক্ষণ করেছি এবং দেখতে পেয়েছি যে, কঠোর প্রহরী ও উল্কাপিণ্ড দ্বারা আকাশ পরিপূর্ণ। আমরা আকাশের বিভিন্ন ঘাঁটিতে সংবাদ শুনার জন্য বসতাম। এখন কেউ সংবাদ শুনতে চাইলে সে জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ডকে ওঁৎপেতে থাকতে দেখবে।” (সূরা জিন-৮-৯)
শয়তান যেন অহী চুরি করতে না পারে সেজন্য এ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যোবায়ের বিন বাককার এবং ইবনু আসাকের মা'রুফ বিন খাররাবুজ থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবলিশ সাত আসমান পর্যন্ত বিচরণ করত। হযরত ঈসা (আঃ)-এর জন্মের পর তিন আসমানে তার বিচরণ বন্ধ হয়ে যায় এবং অবশিষ্ট চার আসমানে বিচরণ অব্যাহত থাকে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্মের পর সাত আসমানেই তার বিচরণ বন্ধ হয়ে যায়। ইবনু আব্দুল বার, আবু দাউদে বর্ণিত সনদ দ্বারা শাবী থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যখন নবী করে পাঠানো হল, তখন শয়তানকে উল্কাপিণ্ড দ্বারা তাড়ানো শুরু হল, ইতিপূর্বে কখনও এরূপ করা হত না। লোকেরা আবদু ইয়ালিল বিন আমর সাকাফীর কাছে এসে বলল: জনগণ উল্কাপিণ্ডের খসে পড়া দেখে ভয় পেয়ে গেছে, নিজ নিজ দাসদেরকে মুক্ত করে দিয়েছে এবং পশুদেরকে ছেড়ে দিয়েছে। আবদু বলল, তড়িঘড়ি করনা বরং অপেক্ষা কর। যদি উল্কাপিণ্ড আকাশের পরিচিত কোন তারকা হয় তাহলে তা মানুষ ধ্বংসের লক্ষণ। আর যদি অপরিচিত হয় তাহলে তা কোন ঘটনার ইঙ্গিতবাহী। তারা লক্ষ্য করে দেখল সেটা ছিল অপরিচিত। তাই তারা বলল, এটা কোন ঘটনার ইঙ্গিতবাহী। তাদের আর বেশি অপেক্ষা করতে হয় নি। অল্প পরেই তারা মহানবী (সঃ)-এর নবুওয়াতের খবর পেল।
আবুদ দুনিয়া তাঁর 'কিতাবুল আশরাফ' এবং আবু আবদুর রহমান হারাওয়ী তাঁর 'আল-আকায়েব' বইতে লিখেছেন, জারীর বিন আব্দুল্লাহ বাজালী বলেন, একদিন আমি গোপনে রাস্তায় চলার সময় বললাম: لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ مَا شَاءَ اللَّهُ كَانَ . একথাটি হারবাজ নামক একজন জিন শুনে বলল: "আমি আসমান থেকে একথা শুনার পর আজ পর্যন্ত কারো মুখে তা শুনতে পাইনি।" বাজালী বলেন, আমি রোম ও পারস্য সম্রাট কাইজার ও কেসরাসহ বিভিন্ন রাজা বাদশাহর দরবারে হাজির হয়েছি। একবার আমি পারস্য সম্রাট কেসরার দরবারে হাজির হই। শয়তান আমার পরিবারে আমার স্থলাভিষিক্ত হয়। সে আমার বেশ ধারণ করেই আমার পরিবারে আগমন করে। আমি সফর থেকে ফিরে আসলে আমার পরিবার আমার প্রতি মুসাফির সফর থেকে ফিরে আসলে যেরূপ ঔৎসুক্য প্রকাশ করে সেরূপ ঔৎসুক্য প্রকাশ না করায় আমি প্রশ্ন করি, তোমাদের কি হয়েছে? পরিবারের সদস্যরা জবাবে বলে: আপনি তো আমাদের কাছ থেকে দূরে ছিলেন না। আমি বললাম, এটা কেমন কথা? তখন শয়তান আমার কাছে হাজির হল। সে প্রস্তাব করল, তোমার স্ত্রীর কাছে আমি একদিন এবং তুমি একদিন থাকবে।
সে আরো বলল, সে আসমানী কথা চুরি করে। আসমানী কথা চুরির ব্যাপারে তার পালা রাত্রে পড়েছে। সে বলল, তুমি আসমানী কথা চুরি দেখতে চাইলে আমার সাথে চল। আমি রাজী হলে এক সন্ধ্যায় সে আমার কাছে আসল। আমাকে তার পিঠে তুলে চলল। তার ঘাড়ে শূকরের পশমের মত পশম রয়েছে। সে বলল, আমাকে ভাল করে ধর। তুমি অনেক জিনিস এবং বহু ভয়াল বিষয় দেখবে। কিন্তু আমাকে ছাড়বে না। তাহলে ধ্বংস হয়ে যাবে। তারা উপরে উঠে গেল এবং একেবারে আসমান স্পর্শ করল। তখন আমি একজনকে নিম্নোক্ত জিকর করতে শুনলাম:
لَا حَولَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ مَا شَاءَ اللَّهُ كَانَ وَمَا لَمْ يَشَأْ لَمْ يَكُن *
তখন আকাশ থেকে আগুন নিক্ষেপ করা হল। জিনটি এক বন-জঙ্গলে এসে পড়ল। আমি উপরোক্ত জিকরটি মনে রাখলাম। সকালে আমি আমার পরিবারে ফিরে আসি। যখন জিনটি আসত তখন আমি উপরোক্ত জিকরটি উচ্চারণ করতাম। সে তখন অস্বস্তি বোধ করত এবং ঘর থেকে বেরিয়ে যেত। আমি তা পড়া অব্যাহত রাখলাম যে পর্যন্ত না সে আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেল।
বায়হাকী তাঁর 'দালায়েল আন নবুয়াহ' গ্রন্থে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, শয়তান আসমানী কথা চুরি করত। অহীর একটি বাণীর সাথে আরো ৯টি কথা যোগ করত। জমীনের অধিবাসীরা এর মধ্যে একটিকে সত্য এবং অবশিষ্ট ৯ টাকে মিথ্যা দেখতে পেত। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতের আগ পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। তারপর তাদেরকে সে সকল আসনে বসে আসমানী কথা চুরির সুযোগ বন্ধ করে দেয়া হল। তারা ইবলিশের কাছে এ বিষয়টি উল্লেখ করায় সে বলল, জমীনে হয়তো কোন ঘটনা ঘটেছে। সে তাদেরকে বিশ্বব্যাপী তদন্ত মিশনে পাঠাল। একটি তদন্তকারী দল নাখলায় রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে কোরআন শুনে বলল, আসলে এটাই সে ঘটনা যে কারণে তাদের প্রতি আগুন নিক্ষিপ্ত হয়। উল্কাপিণ্ড যদি তোমাদের দৃষ্টিগোচর না হয় তাহলে তা শয়তানের উপর পড়ে এবং তা কখনও লক্ষ্যচ্যুত হয় না। কিন্তু উল্কাপিণ্ড শয়তানকে হত্যা করে না বরং তার মুখ, হাত ও পার্শ্বদেশ জ্বালিয়ে দেয়।
আবু নাঈম ও বায়হাকী ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, প্রত্যেক জিন গোত্রের আসমানী কথা চুরির জন্য আসমানে একটি আসন ছিল। তারা সেখান থেকে অহী চুরি করে গণকের কাছে এসে বর্ণনা করে। কিন্তু হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-কে নবী করে পাঠানোর পর তাদেরকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়।
বায়হাকী ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, হযরত ঈসা ও মোহাম্মদ (সঃ)-এর মধ্যবর্তী সময় আসমানে কোন পাহারা ছিল না। শয়তানেরা সেখানে নিজ নিজ আসনে বসে কথা চুরি করত। কিন্তু মোহাম্মদ (সঃ)-কে নবুওয়াত দানের পর আসমানে কঠোর প্রহরা নিয়োজিত করা হয় এবং শয়তানকে লক্ষ্য করে উল্কাপিণ্ড নিক্ষেপ করা হয়।
আবু নাঈম উবাই বিন কা'ব থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ঈসা (আঃ)-কে আসমানে তুলে নেয়ার পর থেকে মোহাম্মদ (সঃ)-এর নবুওয়াতের আগ পর্যন্ত উল্কাপিণ্ড নিক্ষেপ করা হত না। পরে তা শুরু হল।

📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 জিনের হাদীস বর্ণনা

📄 জিনের হাদীস বর্ণনা


আবু নাঈম তাঁর 'দালায়েল আন নবুয়াহ' গ্রন্থে হযরত উবাই বিন কা'ব থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: একদল লোক মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা করার পর রাস্তা ভুলে গেছে। তারা মৃত্যু অনিবার্য দেখে কিংবা শীঘ্রই মরে যাওয়ার মত পরিস্থিতি বুঝতে পেরে কাফন পরে মৃত্যুর জন্য শুয়ে পড়েছে। গাছ থেকে এক জিন বেরিয়ে এসে বলল: রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে কোরআন শ্রবণকারী জ্বিনদের মধ্যে আমি 'অবশিষ্ট আছি।' আমি মহানবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছি, الْمُؤْمِنُ أَخُوا الْمُؤْمِنِ وَدَلِيلُهُ لَا يَخْذِلُهُ.
'এক মুমিন অপর মুমিনের ভাই, তার পথ প্রদর্শক তাকে লজ্জিত করে না।' সামনে প্রানি আছে। আর ঐদিকে যাওয়ার পথ হল এটা। জিনটি তাদেরকে পথের সন্ধান দিল। ১
ইবনু আবিদ দুনিয়া আবদুর রহমান বিন বিশরের গোলাম থেকে বর্ণনা করেছেন। হযরত ওসমান (রাঃ)-এর খেলাফতের আমলে, একদল হাজী হজ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে তারা তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েন। তারা লবণাক্ত পানির কাছে গিয়ে পৌঁছাল। একজন বলল, অগ্রসর হোন; আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে পানিই আমাদের ধ্বংসের কারণ হবে। আপনাদের সামনে পানি রয়েছে। চলতে চলতে সন্ধ্যা হল। কিন্তু তারা পানি পেলেন না। এরপর তারা পরস্পর বলাবলি করতে থাকলেন যে, যদি আপনারা ঐ পানির কাছে আবার ফিরে যেতেন, তাহলে ভাল হত। তারা শেষ রাত্রে পথ চলা শুরু করলেন এবং একটি খেজুর গাছের কাছে এসে পৌঁছান। তাদের কাছে ভীষণ কাল এক মোটা লোক উপস্থিত হল এবং বলল: হে কাফেলা! আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি, "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতকে ভালবাসে, সে যেন অপরের জন্য তাই পসন্দ করে যা নিজের জন্য পসন্দ করে এবং নিজের জন্য যা অপসন্দ করে তা যেন অপরের জন্যও অপসন্দ করে।" আপনারা পাহাড় পর্যন্ত এগিয়ে যান। তারপর বামদিকে ফিরলেই পানি পাবেন। কেউ কেউ বলল: আল্লাহর কসম, আমার মতে সে শয়তান। অন্যরা বলল: শয়তান এভাবে কথা বলে না, সে যেভাবে কথা বলল। সে মুমিন জিন। তারা তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী রওনা হলেন এবং পানি পেলেন। ১
আল্লামা খারায়েতী তাঁর 'মাকারেমুল আখলাক' বইতে লিখেছেন, ইবনে হিব্বান নিজ পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন। ইয়েমেনের একদল লোক কোন জায়গায় যান এবং তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েন। তারা একজন আওয়াজ দানকারীকে বলতে শুনলেন: রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই এবং সাহায্যকারী, অমুক জায়গায় কিছু পানি জমা আছে। তারা তার কথামত সেখানে গেলেন এবং পানি পেলেন। ২
ইবনু আবিদ দুনিয়া লিখেছেন, একদিন ওমার বিন আব্দুল আযীয (রঃ) খচ্চরের উপর আরোহণ করে নিজ সাথীদেরকে নিয়ে রওনা করেন। তিনি রাস্তার পাশে একটি মৃত জিন দেখতে পান। তিনি খচ্চর থেকে নামেন, জিনটিকে রাস্তা থেকে সরান এবং একটি গর্ত করে তাকে মাটি চাপা দেন। এবার তিনি রওনা দেন। তিনি উঁচু স্বরে একটি আওয়াজ শুনেন। কিন্তু কাউকে দেখেন না। আওয়াজদানকারী বলল: হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি যার লাশ দাফন করলেন তিনি সে সকল জিনের অন্তর্ভুক্ত যাদের সম্পর্কে আল্লাহ কোরআন শুনার বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। আমরা যখন ঈমান আনলাম ও মুসলমান হলাম, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার এই সাথীকে লক্ষ্য করে বলেন: তুমি প্রবাসে মৃত্যুবরণ করবে এবং তোমাকে পৃথিবীর তখনকার সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি দাফন করবে। অন্য আরেক বর্ণনায় এসেছে। ওমার বিন আব্দুল আযীয জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি নিজে রাসূলুল্লাহ (সঃ) থেকে তা শুনেছ? সে বলে, 'হাঁ'। তখন ওমারের চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠে এবং তারা সেখান থেকে বিদায় নেন।
আল্লামা ফাকেহী তাঁর 'আখবারে মক্কা' বইতে লিখেছেন: আমের বিন রাবীআ, ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, আমরা ইসলামের প্রথমদিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মক্কায় ছিলাম। তখন মক্কার এক পাহাড় থেকে এক অদৃশ্য আওয়াজদানকারী মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য অন্যদেরকে উদ্বুদ্ধ করল। তখন নবী (সঃ) বলেন: এটা হল শয়তান। কোন শয়তান আল্লাহর কোন নবীর বিরুদ্ধে কাউকে ক্ষেপিয়ে তুললে আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন। পরে একদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) জানান যে, আল্লাহ সামহাজ নামক এক জিন দৈত্যের হাতে ঐ শয়তানটিকে হত্যা করিয়েছেন। আমি দৈত্যটির নাম রেখেছি আব্দুল্লাহ। সন্ধ্যায় আমরা ঐ জায়গায় এক অদৃশ্য আওয়াজদানকারীর নিম্নোক্ত আওয়াজ শুনতে পেলাম।
'মোসয়ের গর্ব-অহংকার ও সীমা লঙ্ঘন করায় আমরা তাকে হত্যা করেছি। সে সত্যকে খাট করে দেখেছিল এবং আমাদের বিজয়ী নবীকে গাল দিয়ে অত্যন্ত মন্দ কাজ করেছিল।'
মোহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান বিন আউফ নিজ পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নবুওয়াত প্রাপ্তির পর মোসয়ের নামক এক জিন অদৃশ্য আওয়াজের মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে লোকদেরকে উত্তেজিত করল। তখন কোরাইশ কাফেররা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরুদ্ধে নিপীড়ণ বাড়িয়ে দিল। পরের রাতে একই জায়গায় সামহাজ নামক এক দৈত্য জিন সম্পর্কে আগের ঘটনার অনুরূপ তথ্য বর্ণনা করল। ১০
তাবরানী তাঁর 'আল-কবীর' গ্রন্থে লিখেছেন। আব্দুল্লাহ বিন হোসেন বলেন, আমি সিরিয়ার তারসুস শহরে গেলাম। আমাকে বলা হল যে, এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে জিনদের প্রতিনিধি দলকে দেখার মত একজন মহিলা আছেন। আমি তার কাছে গেলাম। একজন মহিলাকে পিঠের উপর চিত হয়ে শুয়ে থাকতে দেখলাম। তার চারপাশে আছে একদল লোক। আমি তাকে তার নাম জিজ্ঞেস করলাম। সে বলল, তার নাম মানুষ। আমি তাকে বললাম, হে মানুষ। তুমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে গমনকারী জিনের প্রতিনিধি দলের কাউকে দেখেছ? সে বলল, 'হাঁ'। সামহাজ আমাকে বলেছে, নবী (সঃ) তার নাম রেখেছেন 'আব্দুল্লাহ'। সামহাজ বলেছে, আমি নবী (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, আসমান সৃষ্টির আগে আমাদের রব কোথায় ছিলেন? তিনি উত্তরে বলেন: আল্লাহ নূরের টাওয়ারে নূরের মধ্যে দেদীপ্যমান ছিলেন।
মহিলাটি আরো বলল: আব্দুল্লাহ বিন সামহাজ আমার কাছে বলেছে যে, রাসূলূল্লাহ (সঃ) বলেছেন: যে ব্যক্তি এশরাকের নামাজ পড়ত কিন্তু পরে তা ছেড়ে দিল, সে ব্যক্তিকে আল্লাহর কাছে নেয়া হলে এশরাকের নামাজ বলবে, হে আল্লাহ! আমাকে যে হেফাজত করেছে, তুমি তার হেফাজত কর, আর অমুক আমাকে ছেড়ে দিয়েছে, তুমিও তাকে ছেড়ে দাও। ২ ১.
তাবরানী বর্ণনা করেছেন, ইবনে সালেহ বর্ণনা করেছেন যে, আমর নামক জিন আমার কাছে বলেছেন, আমি নবী (সঃ)-এর কাছে ছিলাম। তিনি সূরা নাজম পড়ে সাজদা করেন। আমিও তাঁর সাথে সাজদা করি।
ইবনে উদয় 'আল-কামেল' গ্রন্থে লিখেছেন, ওসমান বিন সালেহ বলেছেন, আমি আমর বিন তলক নামক জিনকে দেখেছি। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেখেছেন? তিনি বলেন, 'হাঁ'। আমি তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেছি, মুসলমান হয়েছি এবং তাঁর পেছনে ফজরের নামাজ পড়েছি। তিনি সূরা হজ্জ পড়েছেন এবং তাতে দু'টো তেলাওয়াতে সাজদা করেছেন।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী তাঁর 'এসাবা' গ্রন্থে নূরুদ্দিন আলী বিন মোহাম্মদ সম্পর্কে মোহাম্মদ বিন নোমান আনসারীর বর্ণনার উল্লেখ করে লিখেছেন, নূরুদ্দিন একবার নিজ ঘরে একটি ভয়ানক সাপ দেখে ভয় পেয়ে যান। তিনি সাপটিকে মেরে ফেলেন। সাথে সাথে তাঁকে সেখান থেকে তুলে নেয়া হয়। তিনি নিজ পরিবার থেকে নিখোঁজ হন। জিনেরা তাঁকে তাদের বিচারকের কাছে বিচারের জন্য পেশ করে। নিহত জিনের একজন অভিভাবক বিচার প্রার্থনা করে। কিন্তু নূরুদ্দিন জিন হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন। বিচারক জিজ্ঞেস করেন, নিহত প্রাণীটি কোন্ আকৃতিসম্পন্ন ছিল? বলা হল, সাপের আকৃতি। বিচারক তাঁর পাশে যে বসা ছিল তার দিকে তাকান এবং বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি: 'তোমাদের কাছে এরকম কোন প্রাণী উপস্থিত হলে তাকে হত্যা কর।' তখন বিচারক তাঁকে মুক্তির আদেশ দেন। তিনি তাঁর পরিবারে ফিরে আসেন।
ইবনে আসাকের উল্লেখ করেছেন, আবু মোহাম্মদ হাসান বিন আহমদ বিন মোহাম্মদ হেমস বলেছেন, আমাদের এক শিক্ষক তাঁর এক শেখের বরাত দিয়ে বলেছেন, তিনি তাঁর এক সাথীসহ ভ্রমণে বের হলেন। তিনি তাকে এক কাজে পাঠালেন। আসতে তার অনেক দেরী হল। পরের দিন পর্যন্ত সে আর আসল না। এরপরে সে জ্ঞানহীন অবস্থায় ফিরে আসল। সবাই তার সাথে আলাপ করল। কিন্তু সে কিছুক্ষণ পর কথা বলতে পারল। তারা তার অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইল। সে বলল, আমি পুরাতন ধ্বংসপ্রাপ্ত এক ঘরে পেশাব করার জন্য প্রবেশ করলাম। আমি সেখানে একটি সাপ দেখলাম এবং তাকে মেরে ফেললাম। তারপর আমাকে যেন একটি জিনিস ধরল, এক জমীনে আমাকে অবতরণ করাল এবং একদল লোক আমাকে ঘিরে ফেলল। তারা বলল, এ ব্যক্তি অমুকের হত্যাকারী। আমরা কি তাকে হত্যা করবো? তাদের কেউ কেউ বলল, তাকে আমাদের শেখের কাছে নিয়ে চল। তারা আমাকে নিয়ে চলল। সেই শেখের চেহারা খুবই সুন্দর ও বড় এবং দাঁড়ি সাদা। আমি যখন তার সামনে দাঁড়ালাম, তখন তিনি জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের ঘটনা কি? তারা ঘটনা বলল। শেখ জিজ্ঞেস করলেন, জিনটি কিসের আকৃতি ধারণ করেছিল? তারা বলল: সাপের আকৃতি। তখন তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি জিনদের সাথে যে রাত্রে কথা বলেছেন, সে রাত্রে তিনি বলেছেন: 'তোমাদের মধ্যে কেউ যদি নিজ আকৃতির পরিবর্তে অন্য আকার ধারণ করে এবং নিহত হয়, তাহলে হত্যাকারীর বিরুদ্ধে কোন শাস্তি নেই। তাকে তোমরা ছেড়ে দাও এবং আমাকেও ছেড়ে যাও।
তাবরানী আব্দুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: শীঘ্রই তোমাদের মধ্যে সেই শয়তানগুলো বেরিয়ে আসবে যাদেরকে হযরত সোলায়মান (আঃ) সাগরে বেঁধে রেখেছিলেন। তারা মসজিদে তোমাদের সাথে নামাজ পড়বে এবং কোরআন পড়বে, আর দীনের বিষয়ে তোমাদের সাথে ঝগড়া করবে। তারা মানুষের আকৃতি ধারণকারী শয়তান।
শিরাজী তাঁর 'আলকাব' গ্রন্থে আব্দুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ সোলায়মান বিন দাউদ অনেক শয়তানকে সাগরে বেঁধে রেখেছেন। ১৩৫ হিজরীতে, তারা মানুষের আকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করবে। তারা মুসলমানদের মসজিদ ও মজলিশে বসবে এবং তাদের সাথে কোরআন ও হাদীস নিয়ে ঝগড়া করবে।
অর্থাৎ তারা কুরআন ও হাদীসের উল্টো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে মুসলমানদেরকে গোমরাহ করার চেষ্টা করবে। বায়হাকী তাঁর 'দালায়েল-আন-নবুয়াহ' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। সুফিয়ান বলেন, এক ব্যক্তি আমাকে বলল যে, সে মিনার মসজিদে খায়ফে এক ব্যক্তিকে কিসসা বর্ণনা করতে দেখেছে। সুফিয়ান বলেন, আমি তার সন্ধান নিয়ে দেখি যে, সে ছিল শয়তান।
শয়তান মানুষকে ইসলামের নামে গোমরাহ করার প্রয়াস চালায়। ইবনে আদী বলেন, ইবনে ইয়ামান সুফিয়ান সাওরীর কাছে শুনেছেন যে, এক ব্যক্তি তাঁকে জিন দেখেছে বলে জানাল। তিনি বলেন, শয়তান আমার বেশে মসজিদে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীস বর্ণনা করছে এবং লোকেরা তা লিখে নিচ্ছে।
শয়তান এভাবেও হাদীসের সাথে দুশমনী করে থাকে। এ দুশমনী বুঝার উপায় হল, যখনই হাদীসের বর্ণনা সহীহ হাদীসের কিংবা কোরআনের পরিপন্থী হবে তখনই তাকে শয়তানের কারসাজী ধরে নিতে হবে।
বায়হাকী 'দালায়েল আন নবুয়াহ' গ্রন্থে আরো উল্লেখ করেছেন, ঈসা বিন আবু ফাতেমা আল-ফোজারী বলেন, আমি মসজিদে হারামে এক শেখের কাছে বসা। তার কাছ থেকে যা শুনছি তা লিখছি। শেখ বলেন, শায়বানী বলেছেন। অন্য একজন বলল, শায়বানী আমার কাছেও বলেছেন। শেখ বলল, ইমাম শাবী থেকে বর্ণিত। লোকটি বলল, শাবী আমাকেও বলেছেন। শেখ বলল, জিন থেকে বর্ণিত। লোকটি বলল, আল্লাহর কসম, আমি ঘটনা দেখেছি এবং তার কাছ থেকে শুনেছি। শেখ বলল, আলী থেকে বর্ণিত। লোকটি বলল: আল্লাহর কসম, আমি আলীকে দেখেছি এবং সিফফীন যুদ্ধে তাঁর সাথে শরীক ছিলাম। ঈসা বিন আবু ফাতেমা ফোজারী বলেন, আমি সব কাণ্ড দেখে আয়াতুল কুরসী পড়লাম। আমি যখন وَلَا يَؤُدُهُ حِفْظُهُمَا পর্যন্ত পৌঁছলাম, তখন তাদের দিকে তাকিয়ে দেখলাম যে তাদের কেউ নেই।
আয়াতুল কুরসী পড়লে শয়তান থাকতে পারে না। তারা ছিল শয়তান। তাই ভেগে গেছে।

টিকাঃ
১. লাকতুল মারজান ফি আহকামিল জান-হাফেজ জালালুদ্দিন সুয়ূতী
১. ঐ
২. ঐ
১. ঐ
২. মোসনাদ আল ফেরদাউস- দাইলামী।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00