📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 জিনদের মধ্যে কোন নবী রাসুল ছিল কি?

📄 জিনদের মধ্যে কোন নবী রাসুল ছিল কি?


আগের ও পরের অধিকাংশ ওলামায়ে কেরামের মতে, জিনদের মধ্যে কোন নবী-রাসূল আসেনি। একমাত্র মানবজাতির মধ্য থেকেই রাসূলের আগমন ঘটেছে। এটাই ইবনে আব্বাস, ইবনু জোরাইজ, মোজাহিদ, কালবী, আবু ওবায়েদ এবং ওয়াহেদী থেকে বর্ণিত হয়েছে।
পক্ষান্তরে, আমরা জিন সৃষ্টির অধ্যায়ে জোয়াইবার এবং দাহ্হাকের বরাত দিয়ে ইবনে আব্বাস থেকে একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছি। সে বর্ণনায় আছে: জিনেরা আদম (আঃ)-এর আগে জমীনে ইউসুফ নামক তাদের এক নবীকে হত্যা করেছে। তারপর আল্লাহ তাদের কাছে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন এবং তাঁর আনুগত্য করার জন্য জিনদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি তাদেরকে শির্ক না করা এবং পরস্পর লড়াই না করার আদেশও দিয়েছেন।
ইবনু জরীর আতাবারী লিখেছেন, ইবনে হোমাইদ ইয়াহইয়া বিন ওয়াদেহ থেকে এবং তিনি ওবায়েদ বিন সোলায়মান থেকে বর্ণনা করেছেন যে, দাহ্হাককে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মোহাম্মদ (সঃ)-এর আগে কি জিনদের মধ্যে কোন নবী ছিল? তখন তিনি উত্তরে বলেন: আপনি কি আল্লাহর এই বাণীটি শুনেন নি?
يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ أَلَمْ يَأْتِكُمْ رَسُلٌ مِنْكُمْ يَقْصُّونَ عَلَيْكُمْ آيَاتِي وَيُنْذِرُونَكُمْ لِقَاءَ يَوْمِكُمْ هَذَا ء
"হে জিন ও মানব সম্প্রদায়, তোমাদের কাছে কি তোমাদের মধ্য থেকে রাসূলগণ আগমন করেন নি, যাঁরা তোমাদের কাছে আমার নির্দেশাবলী বর্ণনা করতেন এবং তোমাদেরকে আজকের এ দিনের সাক্ষাতের ভয় প্রদর্শন করতেন।" (সূরা আন'আম-১৩১)
এ আয়াতে মানব ও জিন উভয় জাতির মধ্যে রাসূল আসার কথা উল্লেখ আছে। ইবনু হাজম বলেছেন, মোহাম্মদ (সঃ)-এর আগে জিনের কাছে কখনও কোন মানব নবীকে পাঠানো হয় নি। জিন মানব সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত নয়। নবী (সঃ) বলেছেন, وَكَانَ النَّبِيُّ يُبْعَثَ إِلَى قَوْمِمٍ خَاصَّةً 'নবীদেরকে তাদের নিজ নিজ সম্প্রদায়ের কাছেই পাঠানো হয়।' (বোখারী, মুসলিম) অথচ, আমরা নিশ্চিত যে, জিনদেরকে আল্লাহর আজাবের ভয় দেখানো হয়েছিল। অর্থাৎ তাদের কাছে নবী এসেছিল। ওলামায়ে কেরাম এ প্রশ্নের এরূপ ব্যাখ্যা করেছেন যে, মানব রাসূলই জিনদেরও রাসূল। জিনেরা মানব রাসূলদের কাছে দীন শিক্ষা করে জিনদের কাছে গিয়ে আল্লাহর ভয় প্রদর্শন করেছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে জিনদের মধ্যে রাসূলের পক্ষ থেকে نذیر এসেছে যারা নিজ সম্প্রদায়কে ভয় দেখায়। তারা এ ব্যাখ্যার সমর্থনে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতকে প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। فَلَمَّا قَضِيَ وَلَوْا إِلَى قَوْمِهِمْ مُنْذِرِينَ 'যখন নবী (সঃ) কর্তৃক কুরআন পাঠ সমাপ্ত হল, তখন তারা নিজ সম্প্রদায়ের কাছে সতর্ককারীরূপে ফিরে গেল।' (সূরা আহকাফ-২৯)
দাহ্হাকের বর্ণনায়, যে 'রাসূল' শব্দের উল্লেখ হয়েছে তা হচ্ছে رسل الرسل অর্থাৎ রাসূলের প্রতিনিধি বা রাসুল। কিন্তু দাহ্হাক বলেন, আয়াতে রাসূল মানে আল্লাহর রাসূল একথা সুস্পষ্ট।
আল্লামা সাক্বী তাঁর ফতোয়ায় বলেছেন এবং যামাখশারী কালবীর বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, মোহাম্মদ (সঃ)-এর আগে শুধুমাত্র মানুষের প্রতি রাসূল পাঠানো হত। কিন্তু হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-কে জিন এবং মানুষ উভয় সম্প্রদায়ের প্রতিই রাসূল করে পাঠানো হয়েছে। এজন্যই তিনি জিনদেরকে কোরআন পড়ে শুনিয়েছেন।
দাহ্হাক যা বলেছেন, সেটা কোরআনের আয়াতের বাহ্যিক অর্থ। পক্ষান্তরে, যারা ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তারা কুরআনের অন্য আয়াতের কারণেই এরূপ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
অপরদিকে, মহানবীর কাছে কুরআন শুনে জিনেরা বলেছিল: إِنَّا سَمِعْنَا كِتَابًا أُنْزِلَ مِنْ بَعْدِ مُوسَى 'নিশ্চয়ই আমরা এমন এক কিতাব শুনেছি যা হযরত মূসা (আঃ)-এর পর অবতীর্ণ হয়েছে।' (সূরা আহকাফ-৩০) এর দ্বারা বুঝা যায় যে, ঐ জিনেরা হযরত মূসা (আঃ)-এর শরীয়তের অনুসারী ছিল। এছাড়া আল্লাহ যে সকল জিনকে হযরত সোলায়মান (আঃ)-এর নিয়ন্ত্রণাধীন করে দিয়েছিলেন তারাও তাঁর শরীয়তেরই অনুসারী ছিল।
ইবনু আবু হাতেম কাতাদাহ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, গোটা জিন জাতি সোলায়মান (আঃ)-এর নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল না। আল্লাহ বলেন:
وَمِنَ الْجِنِّ مَنْ يَعْمَلُ بَيْنَ يَدَيْهِ بِإِذْنِ رَبِّهِ .
'কতিপয় জিন তাঁর সামনে কাজ করত তাঁর পালনকর্তার আদেশে।' (সূরা সাবা-১২)
কিন্তু মূল সমস্যা থেকেই যাচ্ছে যে, জিন জাতির কাছে কোন জিন নবী পাঠানো হয়েছে কি না? কেননা, আল্লাহ কুরআন মজীদে বলেছেন:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونَ .
'আমি জিন ও মানবজাতিকে কেবলমাত্র আমারই ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছি।'
নবীগণই ইবাদতের পদ্ধতি বাতলান। মানবজাতিকে আল্লাহ মানব-নবী পাঠিয়ে ইবাদতের পদ্ধতি শিক্ষা ও হেদায়াত দিয়েছেন। কিন্তু জিন জাতি কার কাছ থেকে ঐ হেদায়াত লাভ করেছে! মানুষের বহু আগে জিন জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। যদি ধরে নেয়া যায় যে, মানব নবী থেকে জিন জাতি হেদায়েত লাভ করেছে তাহলে মানব সৃষ্টির আগে জিনেরা কার কাছ থেকে হেদায়েত লাভ করেছে? পক্ষান্তরে, অন্য বর্ণনায় এসেছে যে, জিনেরা তাদের ইউসুফ নামক একজন নবীকে হত্যা করেছে। আর এটা ঘটেছে, মানব সৃষ্টির আগে।
আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস বলেছেন, আল্লাহ জিন জাতিকে আদম সৃষ্টির দুই হাজার বছর পূর্বে সৃষ্টি করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, জিন জাতি মানুষের আগে দুই হাজার বছর পর্যন্ত পৃথিবী আবাদ করেছে। আবার কারো মতে, জিন জাতির আদি পিতা সুমিয়া। অন্যদের মতে, ইবলিশ হচ্ছে, আদি পিতা, তবে সর্বসম্মত মত হচ্ছে, জিন শয়তান ও মানুষ শয়তানের নেতা হচ্ছে ইবলিশ।
উল্লেখিত মতভেদের আলোকে এ উপসংহারে আসা যায় যে, ১. আদম সৃষ্টির আগে জিনদের মধ্যে জিন নবী প্রেরিত হয়েছেন। ২. জিনদের মধ্যে কোন সময়ই জিন নবী আসেনি। এটা দুর্বল মত। ৩. হযরত মোহাম্মদ (সঃ) থেকে কেয়ামত পর্যন্ত তিনিই মানুষ ও জিনের নবী। মানুষ ও জিনের জন্য আর কোন নবী আসবে না।

📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 হযরত মোহাম্মদ (সঃ) জিনেরও নবী

📄 হযরত মোহাম্মদ (সঃ) জিনেরও নবী


মুসলমানের কোন দল ও সম্প্রদায়ের মধ্যে এ বিষয়ে কোন মতভেদ নেই যে, মোহাম্মদ (সঃ) মানুষ ও জিন উভয় সম্প্রদায়ের প্রতিই প্রেরিত নবী।
জাবের বিন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ
أعطِيتَ خَمْسًا لَمْ يُعْطَهُنَّ أَحَدٌ مِنَ الْأَنْبِيَاءِ قَبْلِي وَكَانَ النَّبِيُّ يُبْعَثُ إِلَى قَوْمِهِ وَبُعِثْتُ إِلَى النَّاسِ عَامَّةٌ .
'আমাকে এমন পাঁচটি বৈশিষ্ট্য দান করা হয়েছে, যা ইতিপূর্বে আর কোন নবীকে দান করা হয় নি, অন্যান্য নবীরা নিজ নিজ সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরিত হয়েছিলেন, আর আমি প্রেরিত হয়েছি সকল মানুষের প্রতি।' (বোখারী ও মুসলিম)
ইবনু আকীল বলেছেন, আভিধানিকভাবে এ হাদীসে نَاسٌ বা 'মানুষ' শব্দের ভেতর জিনেরাও শামিল আছে। কেননা, অভিধানে 'নাস' মানে 'চলাচলকারী'। আল্লামا রাগেব ইস্পাহানী বলেছেন, 'নাস' হল চিন্তা ও দৃষ্টিশক্তির অধিকারী জীব। এ অর্থে জিনেরাও 'নাস' শব্দের অন্তর্ভুক্ত।
আল্লামা জাওহারী বলেছেন, 'নাস' কখনও মানুষ এবং কখনও জিনের জন্য ব্যবহার হয়।
আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: بعثت إِلَى الْأَحْمَرِ وَالْأَسْوَدِ 'আমি সকল লাল ও কাল সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছি।' (বোখারী-মুসলিম)
এ হাদীসে লাল ও কাল সম্প্রদায় বলতে কাদেরকে বুঝানো হয়েছে তা নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। কারো মতে তাতে আরব ও অনারব সম্প্রদায়কে বুঝানো হয়েছে। কেননা, সাধারণত আরবদের মধ্যে লালবর্ণ এবং অনারবদের মধ্যে কৃষ্ণবর্ণ রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন। এর অর্থ হল, জিন ও মানুষ সম্প্রদায়। এখানে 'লাল' শব্দকে মানুষের জন্য এবং 'কাল' শব্দকে জিনের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। জিনকে 'কাল' শব্দ দিয়ে প্রকাশের অর্থ হল, রূহ বা আত্মার সাথে জিনের সাদৃশ্য রয়েছে। মে'রাজের হাদীসে এসেছে,
أَنَّهُ رَأَى أَدَمَ وَعَنْ يَمِينِهِ أَسْوِدَةً وَعَنْ شِمَالِهِ أَسْوِدَةً .
'নবী (সঃ) আদমকে দেখেন, তাঁর ডানে রয়েছে রূহ এবং বামেও রয়েছে রূহ।' আব্দুল্লাহ বিন মাসউদের হাদীসেও একই অর্থ প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেন-
لَيْلَةَ الْجِنِّ فَغَشِيَتُهُ أَسْوِدَةٌ حَالَتْ بَيْنِي وَبَيْنَهُ .
'জিনের রাতের ঘটনায় নবী (সঃ)-কে অনেক জিন ঢেকে ফেলেছে। ফলে আমার ও তাঁর মধ্যে আড়াল সৃষ্টি হয়ে গেছে।' এখানেও أَسْوِدَةً বা 'কাল' শব্দ দ্বারা জিনকে বুঝানো হয়েছে।
ওয়াসমা বিন মুসা বিন ফোরাত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ أُرْسِلْتُ إِلَى الْجِنِّ وَالْإِنْسِ وَإِلَى كُلِّ أَحْمَرَ وَاسْوَدَ .
'আমি জিন, মানুষ এবং সকল লাল ও কাল সম্প্রদায়ের প্রতি রাসূল প্রেরিত হয়েছি।'
ইবনু আবদুল বার বলেছেন: এ বিষয়ে কোন মতভেদ নেই যে, মহানবী (সঃ) সকল মানুষ ও জিনের প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরিত হয়েছেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁকে অন্য সকল নবীর উপর বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। অন্য কোন নবীকে সকল মানুষ ও জিনের প্রতি পাঠানো হয় নি। ইবনু হাজম বিভিন্ন গ্রন্থরাজির বরাত দিয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ বলেছেন, আল্লাহ হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-কে সকল মানুষ ও জিনের প্রতি রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছেন। মানুষ ও জিনের মধ্যে কারো কাছে হযরত মোহাম্মদের নবুওয়াতের খবর পৌঁছার পর তাঁর উপর ঈমান না আনলে সে আল্লাহর শাস্তির যোগ্য হবে। যেমন অন্যান্য নবীদের উপর ঈমান না আনার কারণে কাফেররা শাস্তির যোগ্য হয়। তিনি বলেন, এ বিষয়ে সকল সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈ, মুসলমানদের ইমামগণ এবং আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের অনুসারীরা একমত।
আল্লাহ কোরআনে তো এ বিষয়ে জানিয়েই দিয়েছেন যে, وَإِذْ صَرَفْنَا إِلَيْكَ نَفَرَّامِنَ الْجِنِّ يَسْتَمِعُونَ الْقُرْآنَ أُولَئِكَ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ .
'যখন আমি একদল জিনকে আপনার প্রতি আকৃষ্ট করেছিলাম, তারা কুরআন পাঠ শুনছিল। তারা যখন কুরআন পাঠের জায়গায় উপস্থিত হল, তখন পরস্পর বলল, চুপ থাক। অতঃপর যখন পাঠ শেষ হল তখন তারা তাদের সম্প্রদায়ের কাছে সতর্ককারীরূপে ফিরে গেল। তারা বলল, হে আমাদের সম্প্রদায়। আমরা এমন এক কিতাব শুনেছি, যা মুসার উপর অবতীর্ণ হয়েছে। এ কিতাব পূর্ববর্তী সব কিতাবের সত্যায়ন করে, সত্যধর্ম ও সরলপথের দিকে পরিচালিত করে। হে আমাদের সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর কথা মান্য কর এবং তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তিনি তোমাদের গুনাহ মাফ করবেন এবং তোমাদেরকে বেদনাদায়ক আজাব থেকে রক্ষা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর কথা মানবে না, সে পৃথিবীতে আল্লাহকে অপারগ করতে পারবে না এবং আল্লাহ ব্যতীত তার কোন সাহায্যকারী থাকবে না। এ ধরনের লোকই প্রকাশ্য গোমরাহীতে লিপ্ত।' (সূরা আহকাফ-২৯-৩২)
তারপর আল্লাহ মহানবীকে তার কাছে জিনদের কুরআন শুনার ঘটনা প্রকাশ করার নির্দেশ দেন। আল্লাহ বলেন,
قُلْ أُوحِيَ إِلَيَّ أَنَّهُ اسْتَمَعَ نَفَرٌ مِّنَ الْجِنِّ .
'আপনি বলুন, আমার কাছে অহী এসেছে যে, একদল জিন কুরআন শুনেছে।' (সূরা জিন-১)
সূরা জ্বিনের মধ্যে আল্লাহ মানুষকে জিনদের সম্পর্কে অনেক খবর জানিয়েছেন।। তিনি আরো জানিয়েছেন যে, মহানবী (সঃ) মানুষ ও জিন উভয় সম্প্রদায়ের প্রতিই রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। জিনের সাথে শিরক না করারও নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন:
وَأَنَّهُ كَانَ رِجَالٌ مِّنَ الإِنْسِ يَعُوذُونَ بِرِجَالٍ مِّنَ الْجِنِّ فَزَادُوهُمْ رَهَقًا .
'অনেক মানুষ অনেক জিনের আশ্রয় নিত, ফলে তারা জিনদের আত্মম্ভরিতা বাড়িয়ে দিত।' (সূরা জিন-৬)
ঘটনা এরূপ ছিল যে, কোন ব্যক্তি উপত্যকায় যায় এবং সেটাকে জিনদের থাকার জায়গা মনে করে বলে: আমি এই উপত্যকার প্রধানের কাছে এখানকার বোকাদের কাছ থেকে পানাহ চাই। এর ফলে জিনদের দেমাগ ও আত্মম্ভরিতা বেড়ে যায়। ফলে, তাদের নামে তন্ত্র-মন্ত্র পড়ে ঝাড়-ফুঁক করলে তারা মানুষের চাওয়া-পাওয়া কিছুটা পূরণ করে দেয়।
তাদের এই কথোপকথন থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, মোহাম্মদ (সঃ) তাদের প্রতি রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। আল্লাহ তাদের কথোপকথন এভাবে উল্লেখ করেছেন,
"হে আমাদের সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর কথা মান্য কর এবং তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তিনি তোমাদের গুনাহ মাফ করবেন এবং তোমাদেরকে বেদনাদায়ক আজাব থেকে রক্ষা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর কথা মানবে না, সে পৃথিবীতে আল্লাহকে অপারগ করতে পারবে না এবং আল্লাহ ব্যতিত তার কোন সাহায্যকারী থাকবে না। এ ধরনের লোকই প্রকাশ্য গোমরাহীতে লিপ্ত।" -(সূরা আহকাফ ৩১-৩২)

📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 মোহাম্মদ (সঃ)-এর কাছে জিনদের আগমন ও কোরআন শ্রবণ

📄 মোহাম্মদ (সঃ)-এর কাছে জিনদের আগমন ও কোরআন শ্রবণ


ইবনে এসহাক বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাকীফ গোত্রের মুসলমান হওয়ার ব্যাপারে নৈরাশ হয়ে গেলেন এবং তায়েফ থেকে মক্কা ফিরে আসার পথে নাখলায় অবস্থান করেন। তিনি সেখানে রাতের শেষাংশে নামাজ পড়েন। জিনেরা তা শুনেছে বলে আল্লাহ উল্লেখ করেন। তারা মোট সাতজন ছিল। তিনজন হাররান এলাকার এবং চার জন ছিল নাসিবীন এলাকার। তাদের নাম হল, হাসা, মাসা, শাছের, মাছের, আরব, নায়ান এবং আহকাব। সাওরী আসেম থেকে এবং তিনি যার থেকে জিনের সংখ্যা ৯ এবং একরামার বর্ণনায় ১২ হাজারের কথা উল্লেখ আছে। সূরা আহকাফে আল্লাহ জিনদের এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন। সূরা জিনেও এই ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাসের বরাত দিয়ে বোখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে, নবী (সঃ) জিনদের কাছে কুরআন পড়েন নি এবং তিনি তাদেরকে দেখেনও নি। বরং তিনি তাঁর একদল সাহাবী সহকারে ওকায বাজারে যান। ইতিমধ্যে আসমানী খবরও জিন শয়তানদের মধ্যে বাধার প্রাচীর তৈরি হয়। তাদের উপর জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ড নিক্ষিপ্ত হয়। তারা নিজ সম্প্রদায়ের কাছে এ খবর জানায়। সিদ্ধান্ত হয় যে, প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যের সর্বত্র ঘুরে এর কারণ খুঁজে বের করা হবে। ফলে, তিহামা আগমনকারী জিনেরা ওকায বাজারের উদ্দেশ্যে রওনাকারী মহানবী (সঃ) ও তাঁর সাথীদেরকে নাখলায় ফজরের নামাজ পড়তে এবং কুরআন শুনে বলল, এটাই সে জিনিস- যার ফলে আমরা আসমান থেকে খবর সংগ্রহে বাধার সম্মুখীন হই। পরবর্তীতে নবী (সঃ) তাদেরকে নিজ সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে সতর্ককারীরূপে পাঠান।
ইবনু আব্বাসের বর্ণনা ফজরের নামাজের ঐ ঘটনার মধ্যেই সীমিত। অর্থাৎ নবী (সঃ) তখন তাদেরকে আলাদা করে কুরআন শুনাননি এবং দেখেনও নি। এ বর্ণনা দ্বারা পরের ঘটনাবলীর অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয় না। নবী (সঃ) পরে তাদের সাথে কথা বলেছেন এবং তাদেরকে নিজ সম্প্রদায়ের প্রতি সতর্ককারীরূপে পাঠিয়েছেন। কথা না বললে তিনি তাদেরকে কিভাবে তাদের সম্প্রদায়ের প্রতি হেদায়েতকারী হিসেবে পাঠান?
পরবর্তীতে লাইলাতুল জিনে অর্থাৎ জিনদের সাথে সাক্ষাতের রাতের ঘটনায় হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেন, নবী (সঃ) আমাকে সাথে নিয়ে যান এবং একটি রেখা টেনে বলেন, আমি না আসা পর্যন্ত এখান থেকে সরবে না। তারপর তিনি তাদের কাছে যান এবং তাদেরকে কুরআন পড়ে শুনান। নাখলার ঘটনাটি আগে ঘটেছিল বলে ইবনে আব্বাস অনুরূপ বলেছিলেন। ইবনু মাসউদের বর্ণিত ঘটনা পরে সংঘটিত হয়েছে। ইবনু মাসউদ বলেন, এরপর নবী (সঃ) আমাকে তাদের এবং আগুনের নিদর্শন দেখান।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, ইবনু আব্বাস শুধু কুরআনে বর্ণিত ঘটনাই জানেন। তিনি নবী (সঃ)-এর কাছে জিনদের আগমন ও ভাষণ শুনার বিষয়ে ইবনু মাসউদ ও আবু হোরায়রা কর্তৃক বর্ণিত হাদীস সম্পর্কে জানেন না। সে বর্ণনায় এসেছে, নবী (সঃ) জিনের কাছে সূরা রাহমান পড়েন। যখনই তিনি বলতেন: فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ .
'তোমরা উভয় সম্প্রদায়, আল্লাহর কোন্ নেয়ামতকে অস্বীকার কর?' তারা তখন বলত, وَلَا بِشَيْ مِنَ الآءِ رَبِّنَا نُكَذَّبُ فَلَكَ الْحَمْد .
'আমাদের প্রতিপালকের কোন নেয়ামতকেই আমরা অস্বীকার করি না, সকল প্রশংসা প্রভু তোমারই জন্য।'
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন, আমি জিনের বিষয়ে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস অপেক্ষা বেশি অবগত। ইবনে মাসউদ জিনের ঘটনায় স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। আর ইবনু আব্বাস ছিলেন তখন দুগ্ধপোষ্য শিশু। জিনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল হিজরতের তিন বছর পূর্বে। পক্ষান্তরে ১০ম হিজরী সনে বিদায় হজ্জের সময় ইবনু আব্বাস সবে মাত্র সাবালক হন।
আবু আলী গাস্সানী 'ফাদায়েল ওমার বিন আবদুল আযীয' গ্রন্থে লিখেছেন, একবার খলীফা ওমার বিন আব্দুল আযীয মক্কায় এক মাঠে হাঁটার সময় একটি মৃত সাপ দেখতে পান। তিনি তাকে নিজ চাদরের এক অংশ দিয়ে দাফন-কাফন করে দেন। তখন এক আওয়াজদানকারী আওয়াজ দিয়ে উঠল, হে সোব্রাক, তুমি স্বাক্ষী থাক, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তোমার ব্যাপারে বলতে শুনেছি, তুমি এক মাঠে মারা যাবে এবং তোমাকে এক নেক ব্যক্তি দাফন করবে। ওমার বিন আবদুল আযীয জিজ্ঞেস করেন, আল্লাহ তোমাকে রহম করুন, তুমি কে? তখন আওয়াজদানকারী বলে, আমি সেই জিনদের অন্তর্ভুক্ত যারা নবী (সঃ)-এর কাছে কোরআন শুনেছিল, আমি এবং সোৱাক ছাড়া ঐ দলের আর কেউ জীবিত নেই।
আজ সেই সোৱাক মৃত্যুবরণ করেছে। ইবনু আবিদ দুনিয়ার বর্ণনায় এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সোরাককে বলেছেন, 'তুমি এক মাঠে মারা যাবে এবং তোমাকে সে সময়কার দুনিয়ার সর্বোত্তম ব্যক্তি দাফন করবে।'১.
ইবনু আবিদ দুনিয়া আবু এসহাক থেকে বর্ণনা করেছেন যে, একদল সাহাবায়ে কেরাম সফরে বের হন। দু'টো সাপ পরস্পর লড়াই করে এবং একটি আরেকটিকে হত্যা করে। তাঁরা তাঁর সুঘ্রাণ ও সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে যান। তাঁদের একজন একটা ন্যাকড়ায় সাপটিকে পেঁচিয়ে দাফন করেন। তখন এক অদৃশ্য সম্প্রদায় বলতে লাগল: আসসালামু আলাইকুম, আসসালামু আলাইকুম। তারা আরো বলল, আপনারা আমরকে দাফন করেছেন। আমাদের মধ্যকার মুসলমান ও কাফের জিনদের মধ্যে লড়াইতে নিহত মুসলমান জিনটিকে আপনারা দাফন করলেন। তিনি নবী (সঃ)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
ইবনু সালাম আবু এসহাক সোবাইয়ী, তিনি তাঁর ওস্তাদের বরাতে ইয়নু মাসউদ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি একদল সাহাবায়ে কেরামের সাথে সফরে পথ চলার সময় একটি ঘূর্ণিবায়ুর সম্মুখীন হন। তারপর আরেকটি বৃহত্তর ঘূর্ণিবায়ু আসে। কিছুক্ষণ পর ঘূর্ণিবায়ু দু'টো শেষ হয়ে যায়। হঠাৎ একটা নিহত সাপ দেখা গেল। তিনি বলেন, তখন আমাদের এক ব্যক্তি নিজ চাদর ছিঁড়ে এক অংশ দিয়ে সাপটিকে কাফন-দাফন করে। রাত হলে দুই স্ত্রীলোক জিজ্ঞেস করে, আপনাদের মধ্যে কে আমর বিন জাবেরকে দাফন করেছে? আমরা জবাব দিলাম, আমর বিন জাবের কে আমরা তাকে চিনি না। স্ত্রীলোক দু'টো আরো বলল, আপনারা যদি এর পুরস্কার চান তাহলে, আপনারা তা পেয়েও গেছেন। আমাদের মধ্যকার ফাসেক জিনেরা মোমেন জিনদের সাথে লড়াই করেছে। সেই লড়াইতে আমর নিহত হয়েছে। আপনারা যে সাপটিকে দেখেছেন সেই হচ্ছে আমর। আমর মহানবীর কাছে কোরআন শ্রবণকারী জিনদের অন্তর্ভুক্ত ছিল, যারা নিজ সম্প্রদায়ের কাছে ভীতি প্রদর্শনকারী হিসেবে প্রেরিত হয়েছিল।
ইবনু আবিদ দুনিয়া আবু জাহাম বিন হোজায়ফা আল-আদাওয়ী থেকে বর্ণনা করেছেন। হাতেব বিন আবি বালতাআহ কেরান নামক একটি দেয়াল ঘেরা স্থান থেকে বের হলেন। তিনি নবী করীম (সঃ)-এর কাছে রওনা হয়েছিলেন। তিনি ছোট পাথরকুচি বিশিষ্ট সমতল ভূমিতে পৌঁছার পর হঠাৎ ধূয়া ও বালু উড়তে দেখেন। পরে তা সরে যায়। তাতে মসৃণ চামড়া বিশিষ্ট একটি মরা সাপ ছিল। তিনি সওয়ারী থেকে নামেন এবং নিজ ধনুকের দুই পাশ দিয়ে তা উল্টিয়ে দেখেন। পরে তাকে মাটি দিয়ে ঢেকে ফেলেন। রাত হলে এক অদৃশ্য আওয়াজদানকারী আওয়াজ দিয়ে বলে : 'হে চতুষ্পদ জন্তুর উপর সওয়ার, বিনিময় প্রাপ্ত ব্যক্তি, আপনার উপর অমুখাপেক্ষী আল্লাহর শাস্তি বর্ষিত হোক:
আপনি আমরকে মাটি চাপা দিয়েছেন, যাকে তার দলীয় লোকেরা নিজ গোত্রের সামনে মেরে ফেলে দিয়েছিল।'
হাতেব নবী করীম (সঃ)-কে বিষয়টি জানান। তিনি শুনে বলেন, সে হচ্ছে নাসীবীনের প্রতিনিধি আমর বিন হাওমায়াহ। তাকে খ্রিষ্টান জিন- মাহাস বিন জাওশান হত্যা করেছে। আমি নাসীবীন এলাকা দেখেছি যাকে জিবরীলের কাছে উপরে উত্তোলন করা হয়েছিল। আমি আল্লাহর কাছে সে এলাকার পানিকে মিষ্ট এবং ফলের প্রাচুর্যের জন্য দো'আ করেছি। ১.
ইবনু আবিদ দুনিয়া বর্ণনা করেছেন এবং আবু নাঈম ও তাঁর 'আদ্‌দালায়েল' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে কাসীর বিন আবদুল্লাহ নাজী বলেন, আমরা আবু রাজা আতারেদীর কাছে প্রবেশ করে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে বায়আত গ্রহণকারী জিনদের সম্পর্কে আপনার কি কিছু জানা আছে? তিনি মুচকী হেসে বলেন, আমি নিজে যা দেখেছি ও শুনেছি সে রকম একটি ঘটনাই এখন বলব। "আমরা এক সফরে একটি পানির কূপের কাছে তাঁবু খাটালাম। আমি দুপুরে খাওয়ার পর একটু বিশ্রাম নেয়ার জন্য গেলাম। তখন একটি সাপ আমার তাঁবুতে অসহায় ভঙ্গীতে প্রবেশ করল। আমি পাত্র থেকে এর উপর কিছু পানি ছিটিয়ে দিলাম। তাতে সে শান্ত হয়ে পড়ল, আসর পড়ার পর দেখলাম সাপটি মরে গেছে। আমি আমার কাপড়ের পুটলী থেকে এক টুকরা সাদা কাপড় বের করে তাতে সাপটিকে মুড়িয়ে গর্ত করে দাফন করলাম। তারপর আমরা বিকেল থেকে সারারাত ভোর পর্যন্ত চলতে থাকলাম। ভোরে আমরা একটি পানির কূপের কাছে অবতরণ করি এবং সেখানে তাঁবু খাটাই। আমি দুপুরে খাওয়ার পর একটু বিশ্রাম নেয়ার জন্য গেলে নিম্নোক্ত অদৃশ্য আওয়াজগুলো দু'বার শুনতে পাই : 'আপনাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক' একবার নয়, ১০ বার নয়, ১০০ বা এক হাজার বারও নয়, বরং আরো অধিক।' 'আমি প্রশ্ন করলাম, আপনারা কে?' তারা উত্তরে বলল, 'আমরা জিন। আপনি আমাদের যে উপকার করেছেন, সেজন্য আল্লাহ আপনাকে বরকত দান করুন, আমরা এর কোন বিনিময় দিতে সক্ষম নই।' আমি আবারও প্রশ্ন করলাম, 'আমি আপনাদের কি উপকার করেছি।' তারা উত্তর দিল, 'আপনার কাছে যে সাপটি মারা গেছে, সেটি ছিল নবী করীম (সঃ)-এর হাতে বাইআত গ্রহণকারী দলের সর্বশেষ জিন।”২.
উপরের বর্ণনাগুলোতে নিহত জিনের ব্যাপারে বলা হয়েছে, সোব্রাক নবী (সঃ)-এর কাছে কোরআন শুনেছিল। আরেক বর্ণনায় বলা হয়েছে, আমর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং কোরআন শুনেছিল। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, তারা তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণকারী সর্বশেষ জিন ছিল। এ সকল বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, একাধিকবার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে জিনদের আগমন ঘটেছিল।
আবু নাঈম তাঁর 'দালায়েল' গ্রন্থে ইবরাহীম নাখঈ' থেকে বর্ণনা করেছেন, আব্দুল্লাহর একদল সঙ্গী হজ্জের উদ্দেশ্যে বের হয়েছেন। তাঁরা কিছু পথ অতিক্রম করার পর রাস্তার উপর একটি সাদা সাপ দেখতে পান। সাপের শরীর থেকে খুব সুঘ্রাণ বের হচ্ছিল। আমি আমার সাথীদেরকে বললাম, তোমরা যাও, আমি সাপটির শেষ অবস্থা দেখার আগ পর্যন্ত এ জায়গা ত্যাগ করব না। কিছুক্ষণ পরেই সাপটি মারা গেল। আমি এক টুকরো সাদা কাপড় দিয়ে সাপটিকে পেঁচিয়ে রাস্তা থেকে সরিয়ে মাটির নিচে পুঁতে রাখলাম। তারপর আমার সঙ্গীদেরকে গিয়ে ধরলাম। আল্লাহর শপথ, আমরা এক জায়গায় বসা ছিলাম। পশ্চিম দিক থেকে চার জন মহিলা আসল। তাদের একজন জিজ্ঞেস করল, 'তোমাদের মধ্যে কে আমরকে দাফন করেছে?' আমরা জিজ্ঞেস ক্রলাম, 'আমর কে?' মহিলাটি প্রশ্ন করল, 'তোমাদের কোন ব্যক্তি সাপটিকে মাটির নিচে পুঁতেছে?' আমি জবাব দিলাম, 'আমি।' মহিলাটি বলল, আল্লাহর কসম; তুমি অত্যধিক রোজাদার, নামাজী এবং আল্লাহর অবতীর্ণ বাণীর আদেশ দানকারীকেই দাফন করেছ। সে তোমাদের নবীর উপর ঈমান এনেছিল এবং মোহাম্মদ (সঃ)-এর নবুওয়াতের চার'শ বছর আগে আসমানে তাঁর গুণাবলী শুনেছিল।' আমরা একথা শুনে আল্লাহর প্রশংসা করলাম এবং হজ্জ শেষ করলাম। মদীনা ফিরে এসে হযরত ওমর বিন খাত্তাবকে বিষয়টি জানালাম। তিনি বলেন, মহিলাটি সত্য বলেছে। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি: 'আমর আমার নবুওয়াতের চারশ বছর আগে আমার উপর ঈমান এনেছে।'
হাফেজ আবু নাঈম' ইবনে এসহাকের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। জিনের প্রতিনিধি দলে অংশগ্রহণকারীদের নাম হল, ১. হাচ্চা ২. মাচ্চা ৩. শাচের ৪. মাচের ৫. ইবনুল আযব ৬. আনীন ৭. আখচাম। এছাড়াও নবী করীম (সঃ) হাতেব বিন আবি বালতাআহ কর্তৃক দাফনকৃত জিনের নাম ৮. আমর বিন জাওমানা বলে উল্লেখ করেছেন। ওমর বিন আব্দুল আযীয কর্তৃক দাফনকৃত জিনের নাম হচ্ছে, ৯. সোরাক, ১০. এছাড়াও রয়েছে যোবেআহ ১১. এবং আব্দুল্লাহ বিন মাসউদের হাদীসে উল্লেখিত জিনের নাম হচ্ছে, আমর বিন জাবের। ১.
অন্যদিকে, আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস সূরা আহকাফের ৯০ নং আয়াতের তাফসীরে ('যখন আমি একদল জিনকে আপনার কাছে হাজির করালাম') বলেছেন, সেই দলের মধ্যে ৯ জন জিন ছিল। তাদের নাম হচ্ছে, ১. শালিজ ২. সাহের ৩. মাহের ৪. হাচ্চা ৫. মাচ্চা ৬. গোনাইম ৭. আরকাম ৮. আদরাস ৯. হাচের। ২.
উপরোক্ত বর্ণনায় কিছু সংখ্যক মুসলিম জিনের নাম পাওয়া যায়, যারা স্বজাতির পক্ষে মহানবী (সঃ)-এর কাছে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

টিকাঃ
১. দালায়েলুন নবুওয়াহ-বায়হাকী।
১. লাকতুল মারজান ফি আহকামিল জান-আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ূতী।
২. ঐ
১. গারায়েব ওয়া আজায়েবুল জিন-কাজী বদরুদ্দিন শিবলী।
২. লাকতুল মারজান ফি আহকামিল জান-জালালুদ্দিন সুযুতী।

📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 মক্কা ও মদীনায় জিনদের সাথে মহানবী (সঃ)-এর সাক্ষাত ও কোরআন পাঠ

📄 মক্কা ও মদীনায় জিনদের সাথে মহানবী (সঃ)-এর সাক্ষাত ও কোরআন পাঠ


জিনের বিভিন্ন প্রতিনিধি দল নবী করীম (সঃ)-এর কাছে বিভিন্ন সময় আগমন করেছিল। মুসলিম ও আবু দাউদ আলকামা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আমি আব্দুল্লাহ বিন মাসউদকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের কেউ কি জিনের রাতে নবী (সঃ)-এর সাথে ছিলেন? তিনি বলেন, আমরা কেউ তাঁর সাথে ছিলাম না। কিন্তু এক রাতে আমরা তাঁকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমরা তাঁকে বিভিন্ন উপত্যকা ও পর্বতের পাদদেশে খুঁজলাম। না পেয়ে আমরা বললাম, তিনি হয়তো কোন আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছেন। এভাবে আমরা খুবই একটি নিকৃষ্ট রাত অতিবাহিত করলাম। ভোরে আমরা তাঁকে হেরা পাহাড়ের দিক থেকে আসতে দেখে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনাকে না পেয়ে খুঁজলাম। খুঁজে না পেয়ে খুবই একটি মন্দ রাত অতিবাহিত করলাম। তিনি বলেন, আমার কাছে জিনের পক্ষ থেকে একজন আহ্বানকারী এসেছিল। আমি তাদের কাছে কোরআন পাঠ করেছি। তারপর তিনি আমাদেরকে তাঁর সাথে নিয়ে যান এবং তাদের আগুনের চিহ্নসহ অন্যান্য চিহ্ন দেখান। তারা তাঁর কাছে তাদের খাবার নির্দিষ্ট করার আহ্বান জানায়। তিনি বলেন, তোমাদের জন্য সেই হাড় নির্দিষ্ট করা হল, যা বিসমিল্লাহ পড়ে খাওয়া হয়েছে এবং তা তোমাদের হাতে পড়ামাত্র গোশতে পূর্ণ হয়ে যাবে। আরও নির্দিষ্ট করা হল, তোমাদের পশুর খাবার থেকে সৃষ্ট বিষ্ঠা বা গোবর। এটা দ্বারা এস্তেঞ্জা করবে না। এ দু'টো তোমাদের ভাইদের খাবার।
ইমাম আহমদ এ হাদীসটি বর্ণনা করে আরো কিছু বেশি যোগ করে বলেছেন, 'জিনেরা মক্কায় নবী (সঃ)-কে তাদের খাদ্য- খাবার নির্দিষ্ট করার আবেদন জানায়। তারা ছিল আরব দ্বীপের অধিবাসী।'
এ হাদীসে বর্ণিত ঘটনা প্রমাণ করে যে, আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ এ রাতে জিনদের কাছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে যান নি। তিনি যে রাতে তাঁর সাথে জিনদের কাছে গিয়েছিলেন সেটি ভিন্ন রাতের ঘটনা। সে ঘটনাটি ইমাম বায়হাকী তাঁর دلائل النبوة গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন, একদিন নবী (সঃ) মক্কায় তাঁর সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বলেন: 'তোমাদের যে ব্যক্তি আমার সাথে রাত্রে জিনদের সাথে সাক্ষাতের ঘটনায় হাজির হতে চায়, সে যেন হাজির হয়। তিনি বলেন, আমি ছাড়া আর কেউ হাজির হয় নি। আমরা উভয়ে মক্কার উপরিভাগে (হুজুনে) পৌঁছলাম। তিনি নিজ পা দ্বারা একটা রেখা টেনে দিয়ে বলেন, এখানে বস। তারপর তিনি অগ্রসর হলেন এবং দাঁড়িয়ে কুরআন পাঠ শুরু করলেন। জিনেরা চারদিক থেকে তাঁকে ঘিরে ফেলেছে এবং আমার ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মাঝে আড়াল সৃষ্টি হয়ে গেছে। ফলে, আমি তাঁর শব্দ পর্যন্ত শুনতে পাচ্ছিলাম না। তারপর তারা যেন বিদায়ী মেঘের বিক্ষিপ্ত টুকরার মত বিদায় নিল। কিন্তু একদল অবশিষ্ট ছিল। ভোর রাত- সোবহে সাদেকের সময় তিনি অবসর হন। তিনি এবার দৃষ্টিগোচর হন এবং আমার কাছে আসেন ও জিজ্ঞেস করেন, জিনের দলটি কি করেছে? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! ঐতো তারা। তারপর তিনি হাড় ও গোবর নিলেন এবং তা তাদেরকে খাবার হিসেবে দিলেন। তিনি বললেন, কেউ যেন হাড় ও গোবর দিয়ে এস্তেঞ্জা না করে।
অন্যান্য বর্ণনায় আরো এসেছে যে, ইবনু মাসউদ বলেন, আমি নবী (সঃ)-এর কাছে জিনদেরকে বলতে শুনেছি, 'আপনি যে আল্লাহর রাসূল এর সাক্ষী কে? তিনি অবশ্য তখন একটি গাছের কাছে দাঁড়ানো ছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেন, যদি গাছটি স্বাক্ষ্য দেয় তাহলে কি তোমরা ঈমান আনবে? জিনেরা বলল, 'হাঁ।' এবার নবী করীম (সঃ) আমাকে ডাকলেন, আমি তাঁর কাছে গেলাম এবং গাছটিকে নিজ শাখা টানতে দেখলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, আমি যে আল্লাহর রাসূল তুমি কি একথার স্বাক্ষ্য দেবে? গাছটি উত্তর দিল, আমি স্বাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল।
উপরোক্ত ঘটনা দু'টো মক্কায় ঘটেছে। এবার আমরা মদীনায় সংঘটিত ঘটনা সম্পর্কে আলোচনা করব। এ ঘটনায়ও হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ নবী (সঃ)-এর সাথে ছিলেন। আমর বিন গালান সাকাফী বলেন, আমি আব্দুল্লাহ বিন মাসউদের কাছে আসলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম, জিনদের প্রতিনিধিরা যে রাতে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কাছে এসেছিল সে রাতে আপনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলেন বলে আলোচনা করেছেন, এটা কি সত্য? তিনি বলেন: 'হাঁ।' আমি বললাম, সে ঘটনাটি আমাকে বলুন। তিনি বলেন, একরাতে প্রত্যেক আহলে সুফফাকে এক একজন মেজবান রাত্রের মেহমানদারীর জন্য নিয়ে গেল। আমি বাকি থাকলাম। আমাকে কেউ নিল না। তখন নবী (সঃ) আমার পাশ দিয়ে যান এবং জিজ্ঞেস করেন, কে এ ব্যক্তি? আমি জবাব দিলাম, 'আমি ইবনে মাসউদ।' তিনি প্রশ্ন করেন, তোমাকে কি কেউ রাত্রের খাবারের জন্য নিয়ে যায় নি? আমি জবাব দিলাম, 'না'। তিনি বললেন, চল, দেখি তোমার জন্য কোন কিছু পাই কি না। ইবনে মাসউদ বলেন, আমরা হযরত উম্মে সালামার কক্ষ পর্যন্ত পৌঁছলে, তিনি আমাকে দাঁড়াতে বলে নিজ স্ত্রীর কাছে যান। তারপর একটি বালিকা বেরিয়ে এসে বলে, হে ইবনু মাসউদ! রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনার জন্য কোন খাবার পান নি, আপনি আপনার শয়নগাহে ফিরে যান। আমি মসজিদে ফিরে আসলাম। কঙ্কর যোগাড় করে বালিশের মত উঁচু করলাম এবং কাপড় মুড়ি দিয়ে শুয়ে রইলাম।
একটু পরেই বালিকাটি এসে বলল, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনাকে ডাকছেন, আসুন। আমি রাত্রের খাবারের আশায় বালিকাটির পেছনে চললাম। আমি ঐ স্থানে পৌঁছামাত্রই রাসূলুল্লাহ (সঃ) বের হলেন। তাঁর হাতে ছিল একটি খেজুরের ডাল। তিনি এটা দিয়ে আমার বুকে খোঁচা লাগিয়ে বললেন, আমি যে পর্যন্ত যাই, সে পর্যন্ত আমার সাথে সাথে চল। আমি বললাম, মাশাআল্লাহ। তিনি তিনবার ঐ কথা বললেন। আমি প্রত্যেকবারেই মাশাআল্লাহ বললাম। আমরা 'বাকি' কবরস্থান পর্যন্ত আসলাম। তিনি নিজ লাঠি দিয়ে একটা রেখা এঁকে বললেন: 'এখানে বস এবং আমি না আসা পর্যন্ত এ স্থান ত্যাগ করবে না।' তিনি অগ্রসর হতে থাকলেন। আমি খেজুর গাছের মধ্য দিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
আমার মনে হল যেন কাল ধোঁয়া ছেয়ে গেছে এবং পরে তা দূরও হয়ে গেছে। আমি মনে মনে ভাবলাম, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে গিয়ে মিলিত হই। আমার আশঙ্কা হয়েছিল যে, হাওয়াযেন গোত্রের লোকেরা তাঁকে হত্যা করার কোন চক্রান্ত করেছে। আমি আরও ভাবলাম, আমি দ্রুত ঘরে যাই এবং লোকদের সাহায্য কামনা করি। কিন্তু আমার মনে পড়ে গেল যে, তিনি আমাকে এই স্থান ত্যাগ করতে নিষেধ করেছেন। তারপর শুনতে পেলাম, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে লাঠি দিয়ে ধমক দিচ্ছেন এবং বলছেন, তোমরা বসে পড়। তারা বসে পড়ল। আকাশে ভোরের লালিমা ফুটে উঠার সময় হয়ে এল। তারপর তারা গমগম করে উঠল এবং চলে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার কাছে আসেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, আমি চলে যাওয়ার পর তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছিলে? আমি বললাম: 'না',। কিন্তু আমি প্রথমে ভয় পেয়ে গেলাম এবং ভাবলাম যে, ঘরে ফিরে আসি এবং লোকদেরকে ডেকে নিয়ে যাই। সে মুহূর্তেই আমি শুনতে পেলাম, আপনি লাঠি দিয়ে তাদেরকে ধমক দিচ্ছেন। আমার আশঙ্কা হয়েছিল যে, হাওয়াযেন গোত্রের লোকেরা আপনাকে হত্যা করার কোন ষড়যন্ত্র করেছিল।
তিনি বলেন, তুমি যদি ঐ রেখাবৃত্ত থেকে বের হতে, তাহলে আমি তোমাকে কোন নিরাপত্তা দিতে পারতাম না এবং কোন জিন হয়তো তোমাকে ছিনিয়ে নিয়ে যেত। তিনি আরো জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি কিছু দেখেছ? আমি বললাম, আমি সাদা কাপড় পরা কতগুলো কাল লোক দেখেছি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, তারা হল, নাসিবীন এলাকার জিনদের প্রতিনিধি দল। তারা আমার কাছে তাদের খাদ্য সম্ভারের আবেদন জানায়। আমি হাড় ও গোবরকে তাদের খাদ্য হিসেবে নির্দিষ্ট করেছি। আমি প্রশ্ন করলাম, এর দ্বারা তাদের কি ফায়দা হবে? তিনি বলেন:
তারা যখন কোন হাড়-হাড্ডি পাবে, তাতে খাওয়ার সময়কার প্রথম গোশতসহ পাবে এবং যখন কোন গোবর ও বিষ্ঠা পাবে তাতে প্রথমে খাওয়ার সময় যে দানা বা বীজ ছিল তা সহ পাবে। তোমাদের কেউ যেন হাড় ও গোবর দিয়ে এস্তেঞ্জা না করে।
রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে জিনের। মদীনায় আরেক দফা এসেছিল। সে দফায় তাঁর সাথে ছিলেন হযরত যোবায়ের বিন আ'ওয়াম। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে নিয়ে ফজরের নামাজ পড়েন। নামাজ শেষে বলেন: আজ রাতে জিনের প্রতিনিধি দলের সাথে সাক্ষাতের সময় আমার সাথে তোমাদের মধ্য থেকে কে যাবে? কেউ কথা বলল না। তিনি একথা তিনবার বললেন। তারপর (রাত্রে) আমার কাছ দিয়ে অতিক্রমের সময় আমাকে নিয়ে চললেন। আমি তাঁর সাথে চলতে থাকলাম। মনে হল যেন, মদীনার সকল পাহাড়কে আমাদের জন্য গায়েব করা হয়েছে। আমরা এক খালি মাঠে উপস্থিত হলাম। সেখানে তীরের মত লম্বা লম্বা লোকদেরকে দেখতে পেলাম। তারা পা পর্যন্ত সাদা কাপড় পরিহিত ছিল। তাদেরকে দেখামাত্র আমার মনে কঠিন ভয় জাগল। এমনকি ভয়ে আমার দু'পা ঠক্ করে কাঁপতে লাগল। আমরা তাদের নিকটবর্তী হওয়ার পর নবী করীম (সঃ) নিজ পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে আমার জন্য একটা রেখা টেনে বললেন: "এ রেখার মধ্যখানে বস।" সেখানে বসার পর আমার মনের সকল ভয়-ভীতি দূর হয়ে গেল। নবী (সঃ) আমার কাছ থেকে তাদের দিকে এগিয়ে গেলেন, তাদের কাছে কোরআন তেলাওয়াত করেন এবং সোবহে সাদেক পর্যন্ত তাদের কাছে অবস্থান করেন। তারপর তিনি এগিয়ে আসেন এবং কাছে এসে বলেন, আমার সাথে চল। আমি তাঁর সাথে চললাম। সামান্য পথ অতিক্রম করার পর তিনি আমাকে বলেন: “দেখ, ওখানে কি কেউ আছে?” আমি বললাম, আমি সেখানে এক বিরাট দল দেখছি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মাথা মোবারক নিচু করেন এবং গোবরসহ একটি হাড় যোগাড় করে তাদের দিকে নিক্ষেপ করেন। তিনি বলেন, তারা হল নাসীবীন এলাকার জিনদের প্রতিনিধি দল। তারা আমার কাছে তাদের খাদ্যসম্ভার দাবী করেছে। আমি তাদের জন্য হাড় এবং গোবরকে খাদ্য হিসেবে নির্দিষ্ট করলাম। যোবায়ের (রাঃ) বলেন- তাই হাড় ও গোবর দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করা নাজায়েয। (তাবরানী)
যোবায়ের (রাঃ)-এর বর্ণিত এ ঘটনাটি ঘটেছিল মদীনার পাহাড়সমূহ থেকে দূরবর্তী খোলা ময়দানে। আর আব্দুল্লাহ বিন মাসউদের ঘটনা ঘটেছিল মদীনার 'বাকী' গোরস্থানে।
রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচা আবু তালেবের মৃত্যুর পর তিনি তাঁর সর্বশেষ আশ্রয়স্থল হারিয়ে ফেলেন। মক্কার কাফের কোরাইশদের কাছে তাঁর দাওয়াত ও আশ্রয় প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তিনি তায়েফে যান। কিন্তু সেখানেও তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যাত হয়। তিনি দুঃখ ভরা হৃদয়ে ফিরে আসেন। আল্লাহ জিবরীল (আঃ)-এর সাথে পাহাড়ের ফেরেশতাকে তাঁর সাহায্যার্থে পাঠান। পাহাড়ের ফেরেশতা পাহাড় চাপিয়ে তায়েফবাসীকে ধ্বংস করার জন্য নবী (সঃ)-এর অনুমতি চান। কিন্তু নির্যাতিত অথচ দয়ালু নবী তাদের ধ্বংসের পরিবর্তে হেদায়েত ও রহমতের দোআ করেন। সে কঠিন মুহূর্তেই আল্লাহ একদল জিনকে তাঁর কাছে কোরআন শুনার জন্য পাঠান। একটি গাছ নবী (সঃ)-এর আনুগত্য স্বীকারের নিমিত্ত জিনদের আগমনের বার্তা ঘোষণা করে। আল্লাহ জিনের কোরআন শুনা ও গাছের ঘোষণার মাধ্যমে নবী (সঃ)-কে জানিয়ে দেন যে, বিজয় তাঁর সুনিশ্চিত। লোকেরা তাঁর দাওয়াত কবুল করবে এবং মানুষ ও জিন তাঁর মিল্লাতের অন্তর্ভুক্ত হবে। এ ঘটনাটি তায়েফ থেকে মক্কা ফিরার পথে 'নাখলায়' সংঘটিত হয়। জিনদের আসমানী কথাবার্তা চুরি করে শুনার বিরুদ্ধে কঠোর প্রহরার কারণে তারা এর রহস্য জানার জন্য বিশ্বব্যাপী অভিযানে বের হয়। 'তেহামা' অভিযানে আগমনকারী জিনের এই প্রতিনিধি দলটি নাখলায় নবী (সঃ)-এর কাছে নামাজে কোরআন শুনার পর মুসলমান হয়ে যায়। আল্লাহ এই ঘটনার মাধ্যমে বিরোধী কাফেরদের অত্যাচার নির্যাতনের মোকাবিলায় ধৈর্য্য ধারনের আহ্বান জানান। মানুষের মন যেহেতু আশঙ্কাপূর্ণ, তাই আল্লাহ তাঁর মনের মজবুতির জন্য জিনদেরকে দিয়ে কোরআন শুনার ব্যবস্থা করেন। আল্লাহ বলেন:
وَكُلًّا نَقَصُّ عَلَيْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الرُّسُلِ مَا نَثَبِّتْ بِهِ فُؤَادَكَ .
"আমি আপনার কাছে নবীগণের কাহিনী বর্ণনার মাধ্যমে আপনার মনকে দৃঢ় করি।"
এই প্রতিনিধি দলে তিনশত জিন ছিল বলে এক বর্ণনায় এসেছে। তারা নিজ সম্প্রদায়ের কাছে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছে। তিন মাস পর তারা এক রাতে পুনরায় মক্কায় তাঁর সাথে মিলিত হওয়ার জন্য আসে। তিনি পুরো রাত তাদের কাছে কোরআন তেলাওয়াত করেন। এছাড়াও তাদের মধ্যে সম্পৃতি ও সম্ভাব সৃষ্টির জন্য তিনি একই রাতে তাদের বহু বিবাদ- বিসম্বাদ মিটমাট করে দেন।
এরপর বিভিন্ন সময় মক্কা ও মদীনায় জিনদের বিভিন্ন দল নবী (সঃ)-এর কাছে আসতে থাকে। তিনি প্রত্যেক গোত্রের জিনদের কাছে কোরআন তেলাওয়াত করে শুনান। তা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে কিছু জিন কাফের থেকে যায়। যেমন, মানুষের মধ্যেও কাফের রয়েছে। একদিন এক দৈত্য জিন নবী (সঃ)-এর নামাজের সামনে দিয়ে অতিক্রমের সময় তিনি তাকে ধরে ফেলেন। সে তাঁর নামাজ নষ্ট করতে এসেছিল। হযরত সোলায়মান (আঃ)-এর দোআর কথা মনে পড়ায় তিনি সে কাফের জিনটাকে অপমানিত অবস্থায় ছেড়ে দেন।
হাফেজ আবু নাঈম তাঁর গ্রন্থে বেলাল বিন হারেস থেকে বর্ণনা করেছেন। বেলাল বলেন: আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে এক সফরে বের হলাম। তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের জন্য রওনা হলেন। তাঁর নিয়ম ছিল, প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের জন্য তিনি দূরে যেতেন। আমি একটি পাত্রে করে তাঁর এস্তেঞ্জার পানি নিয়ে গেলাম, তিনি দূরে চলে গেলেন। আমি তাঁর কাছে লোকদের দুর্বোধ্য কথাবার্তার জটলা শুনতে পেলাম। ইতিপূর্বে কখনও এরূপ আর শুনিনি। এরপর তিনি আসেন এবং বলেন: বেলাল, তোমার কাছে কি পানি আছে? আমি বললাম, জ্বি, আছে। তিনি মন্তব্য করলেন, ঠিক কাজ করেছ। তিনি আমার কাছ থেকে পানি নিয়ে গেলেন এবং অজু করলেন। আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর নবী। আমি আপনার কাছে লোকদের দুর্বোধ্য কথাবার্তার জটলা শুনলাম। তিনি উত্তরে বলেন, আমার কাছে মুসলমান জিন ও কাফের জিনরা এসেছিল। তারা আমার কাছে তাদের বাসস্থান নির্ধারণের আহ্বান জানায়। আমি মুসলমান জিনদেরকে সমতলভূমি এবং মোশরেক জিনদেরকে নিম্নভূমিতে বাস করার নির্দেশ দিয়েছি। হাফেজ আবু নাঈম তাঁর গ্রন্থে এবং তাবরানী উল্লেখ করেছেন যে, ইবনে মাসউদ মক্কার হুজন ছাড়াও আরেক রাতে জিনদের ঘটনায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে উপস্থিত ছিলেন। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেন : এক রাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে তাঁর সাথে জিনদের কাছে নিয়ে গেলেন। আমি তাঁর সাথে চলতে থাকলাম। যখন আমরা মক্কার উঁচু ভাগে পৌঁছলাম, তখন নবী (সঃ) আমার জন্য একটা রেখা টেনে বললেন: 'এখান থেকে সরবে না।' তারপর তিনি পাহাড়ের ভেতরে কিছুটা দূরে চলে গেলেন। আমি দেখলাম যে, লোকেরা পাহাড়ের উপর থেকে নামছে এবং আমার ও তাঁর মধ্যে আড়াল সৃষ্টি করেছে। ভোর রাত সোবহে সাদেক পর্যন্ত এ অবস্থা অব্যাহত ছিল। পরে নবী (সঃ) আসলেন এবং বললেনঃ আমাকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে যে, জিন ও মানুষ আমার উপর ঈমান আনবে। মানুষতো ঈমান এনেছে। জিনদেরকে আমি দেখলাম।'
বায়হাকী ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি জিনের সাথে সাক্ষাতের রাত্রে নবী (সঃ)-এর সাথে 'হুজুন' পর্যন্ত আসি। তিনি আমার জন্য রেখা টানেন। তারপর তিনি জিনদের দিকে এগিয়ে যান। তারা তাঁর কাছে এসে ভীড় জমায়। তাদের নেতা ওয়ারদান বলেন, তাদেরকে আপনার কাছ থেকে বিদায় দিচ্ছি। আল্লাহর কাছ থেকে আমাকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না।
বায়হাকী ও আবু নাঈম, ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে সাথে নিলেন এবং বললেন, বনি ইখওয়াহ গোত্র ও বনি আ'ম গোত্রের ১৫ জন জিন আজ রাতে আমার কাছে আসবে। আমি তাদেরকে কোরআন শুনাব। ইবনে মাসউদ বলেন, আমি তাঁর সাথে ইন্সিত স্থানে গেলাম। তিনি আমার জন্য একটি দাগ টেনে তার ভেতর বসতে বললেন। তিনি আরো বললেন, তুমি এখান থেকে বের হবে না। আমি সেখানেই রাত কাটিয়ে দিলাম। ভোরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার কাছে ফিরে আসলেন। সকাল হলে আমি ৬০টি উটের বসার স্থান ও চিহ্ন দেখতে পেলাম।
তিরমিজী, হাকেম ও বায়হাকী জাবের বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবায়ে কেরামের কাছে সূরা আর-রাহমান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়েন। সাহাবায়ে কেরাম চুপ রইলেন। তা দেখে তিনি প্রশ্ন করেন: তোমাদের কি হল, তোমাদেরকে চুপচাপ দেখছি? আমি জিনদের সাথে রাত্রে যখন সাক্ষাত করি তখন তারা তোমাদের চাইতে উত্তম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। আমি যখনই ( فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ) তোমরা উভয় সম্প্রদায় জিন ও মানুষ, তোমাদের প্রতিপালকের কোন্ নেয়ামতটিকে অস্বীকার করতে পার?) পড়েছি, তখনই তারা জবাবে বলেছে:
وَلَا بِشَيْ مِنْ نِعْمَةِ رَبِّنَا نُكَذِّبُ، فَلَكَ الْحَمْدُ .
"আমরা আমাদের প্রতিপালকের কোন নেয়ামতকে অস্বীকার করি না, হে রব! সকল প্রশংসা আপনারই।"
উল্লেখিত হাদীসসমূহ থেকে জানা যায় যে, নবী করীম (সঃ)-এর কাছে ৬ বার জিনদের প্রতিনিধিরা এসেছিল। ১. যখন সন্দেহ করা হল যে, তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছেন এবং যখন তাঁর সন্ধান করা হয়েছিল। সে রাতে তিনি ছিলেন একাকী, কেউ তাঁর সাথে ছিল না। ২. হুজুনে ৩. মক্কার উঁচু অংশে পাহাড়ের ভেতর। ৪. মদীনার বাকী গারকাদ কবরস্থানে। এই তিন রাত হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) নবী (সঃ)-এর সাথে উপস্থিত ছিলেন। ৫. মদীনার বাইরে- যাতে হযরত যোবায়ের বিন আওয়াম উপস্থিত ছিলেন। ৬. এক সফরে সংঘটিত ঘটনায় বেলাল বিন হারেস উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়াও বিক্ষিপ্তভাবে তাঁর সাথে জিনদের আরো তিনবার সাক্ষাত হয়েছিল। একবার এক দৈত্য জিন তাঁর নামাজের সামনে দিয়ে যেতে চেয়েছিল। তিনি তাকে ধরে ফেলেন। ২য় বার, এক জিন তাঁর মুখে অগ্নিশিখা নিক্ষেপ করে তাঁকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। তিনি আল্লাহর কাছে তিনবার আশ্রয় চান ও তাকে তিনবার অভিশাপ দেন। তারপর তাকে ধরার ইচ্ছা করেন। হযরত সোলায়মান (আঃ)-এর ব্যাপক সাম্রাজ্যের দোআর কথা মনে পড়ায় তাকে ধরার ইচ্ছা ত্যাগ করেন। ৩য় বারের ঘটনাটি আবু নাঈম ও বায়হাকী হযরত ওমর থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমরা একবার 'তেহামা' অঞ্চলের একটি পাহাড়ের ওপর নবী করীম (সঃ)-এর সাথে বসা ছিলাম। তখন এক বৃদ্ধ শেখ আসলে। তার হাতে ছিল একটা ছড়ি। তিনি নবী (সঃ)-কে সালাম দেন। তিনি (সঃ) সালামের জবাব দেন। শেখ বলল : জিনেরা তাঁর জন্য পেরেশান। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন : তুমি কে? শেখ উত্তর দিল, আমি হাম্মাহ বিন আল-ওহাইম বিন আল-আকইয়াস বিন ইবলিশ। নবী (সঃ) বললেনঃ তোমার ও ইবলিশের মধ্যে মাত্র দুই পূর্ব-পুরুষের ব্যবধান। তোমার বয়স কত? শেখ বলল : দুনিয়ার বয়স আর বেশি বাকি নেই। আদম-সন্তান কাবীল যে রাতে হাবীলকে হত্যা করেছিল, তখন আমি মাত্র কয়েক বছরের বালক, লোকদের কথা বুঝতাম, পাহাড়ে থাকতাম, খাদ্য নষ্ট এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার হুকুম দিতাম। তখন নবী করীম (সঃ) বলেন: কল্যাণ সমৃদ্ধ বৃদ্ধ এবং ভাল যুবকের জন্য এটি অত্যন্ত নিকৃষ্ট কাজ। শেখ বলল, আমাকে আরো কিছু বলুন। আমি আল্লাহর কাছে তাওবাকারী। শেখ আরো বলল, আমি হযরত নূহ (আঃ)-এর মসজিদে তাঁর কাওমের মুমিন ব্যক্তিদের সাথে উপস্থিত ছিলাম। আমি তাঁকে তাঁর কওমের প্রতি দাওয়াতের ব্যাপারে বহু গঠনমূলক সমালোচনা করেছি। তিনি কেঁদেছেন, আমিও কেঁদেছি। আমি আমার কাজের জন্য লজ্জিত এবং আল্লাহর কাছে অজ্ঞ লোকদের মধ্যে শামিল হওয়ার কারণে পানাহ চাই। আমি নূহ (আঃ)-কে বললাম, আমি আদম সন্তান শহীদ হাবিলের রক্তে অংশগ্রহণ করেছি। আপনার রবের কাছে কি আমার তওবার কোন সুযোগ আছে? নূহ বলেনঃ হে হাম্মাহ! ভাল কাজের ইচ্ছা কর এবং আফসোস ও লজ্জিত হওয়ার আগেই তা কর। আল্লাহ আমার কাছে যা নাযিল করেছেন, তাতে আমি পড়েছি, বান্দাহর গুনাহ যত বেশিই হোক না কেন, সে যদি আল্লাহর কাছে তওবা করে, আল্লাহ তার তওবাহ কবুল করেন। তাই তুমি উঠ, অজু কর এবং দু'টো সাজদা দাও। আমি সাথে সাথেই তা করি। তিনি আমাকে ডাক দিয়ে বলেন, তোমার মাথা তোল, আসমান থেকে তোমার তওবা কবুল হয়েছে। আমি আল্লাহর কাছে এক বছর সাজদায় পড়ে রইলাম।
আমি হযরত হুদ (আঃ)-এর সাথে তাঁর মসজিদে, তাঁর কওমের ঈমানদার ব্যক্তিদের সাথে উপস্থিত ছিলাম। আমি তাঁকে তাঁর কওমের প্রতি দাওয়াতের ব্যাপারে গঠনমূলক সমালোচনা করতে থাকি, যে পর্যন্ত না তিনি এবং আমি কেঁদেছি।
শেখ বলল, আমি হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর সাক্ষাত পেয়েছি এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর সাথেও নিরাপদ জায়গায় অবস্থান করেছি। আমি হযরত ইলিয়াস (আঃ)-এর সাথে উপত্যকাসমূহে সাক্ষাত করেছি এবং এখনও করছি। আমি হযরত মূসা বিন এমরানের সাক্ষাতও পেয়েছি। তিনি আমাকে তাওরাত শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি আমাকে বলেছেন, হযরত ঈসা বিন মরিয়মের সাক্ষাত পেলে তাঁকে আমার সালাম পৌঁছাবে। আমি তাঁকে মূসা (আঃ)-এর সালাম পৌছিঁয়েছি। হযরত ঈসা (আঃ) আমাকে বলেছেন : তুমি হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর দেখা পেলে তাঁর কাছে আমার সালাম পৌঁছাবে। একথা শুনে নবী করীম (সঃ) দু'চোখ মেলে কাঁদতে লাগলেন। তারপর সালামের উত্তরে বলেন:
وَعَلَى عِيسَى السَّلَامُ مَا دَامَتِ الدُّنْيَا وَعَلَيْكَ السَّلَامُ يَاهَامَّةٌ بِأَدَائِكَ الْأَمَانَةَ .
"যতদিন পর্যন্ত দুনিয়া অবশিষ্ট আছে ততদিন পর্যন্ত হযরত ঈসার উপর সালাম ও শান্তি বর্ষিত হোক। হে হাম্মাহ, আমানত আদায়ের কারণে তোমার উপরও আল্লাহর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক।” শেখ বলল, হে আল্লাহর রাসূল। হযরত মূসা যা করেছেন, আপনিও আমার সাথে সেরূপ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে সূরা ওয়াকেআ, সূরা মুরসালাত, সূরা নাবা, সূরা তাকবীর, সূরা মোআওযেজাতাইন এবং সূরা এখলাস শিক্ষা দেন। তিনি আরো বলেন। হে হাম্মা, আমাদের কাছে তোমার প্রয়োজন তুলে ধর এবং আমাদের সাক্ষাত ত্যাগ করোনা। হযরত ওমর বলেন : রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইন্তেকাল হয়েছে কিন্তু তার মৃত্যুর খবর আমরা পাইনি। আমি জানিনা যে সে এখন জীবিত আছে না মরে গেছে।১. এই হাদীসটি আব্দুল্লাহ বিন আহমদ তাঁর 'যোহদ' গ্রন্থে, শিরাজী তাঁর 'আলকাব' গ্রন্থে, আবু নাঈম, ইবনু মারদুইয়া এবং ফাকেহী তাঁর 'আখবার মক্কা' গ্রন্থে ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হওয়ায় হাদীসটির মর্যাদা হাসানের রূপ নিয়েছে।
আবু আলী বিন আশআস তাঁর 'আস-সুনান' গ্রন্থে হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন,
إِنَّ هَامَةَ بْنَ الْأَقْيْسِ فِي الْجَنَّةِ
'নিশ্চয়ই হাম্মাহ বিন আফইয়াস বেহেশতী।'
ইবনুল জাওযী তাঁর 'সফওয়াতুস সফওয়াহ' গ্রন্থে সহল বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন। সহল বলেন: আমি 'কওমে আদের' এলাকার এক প্রান্তে একটি পাথর খোদাই করা শহর দেখতে পাই। এর মাঝখানে রয়েছে পাথরের তৈরি এক বালাখানা। তাতে জিনেরা বাস করে। আমি তাতে প্রবেশ করে দেখি, এক বিরাট বৃদ্ধ শেখ কেবলামুখী হয়ে নামাজ পড়ছেন। তার গায়ে রয়েছে ভীষণ সুন্দর এক জুববা। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি সালামের জবাব দিলেন। শেখ বললেন, হে সহল! দেহ কাপড়কে পুরাতন করে না, বরং গুনাহর দুর্গন্ধ এবং হারাম খাদ্যই তাকে পুরাতন করে। আমার গায়ে এ জুব্বা দীর্ঘ সাতশ' বছর ব্যাপী বিদ্যমান রয়েছে। এ জুব্বা পরেই আমি হযরত ঈসা এবং হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর সাথে মিলিত হয়েছি এবং তাঁদের দু'জনের উপর ঈমান এনেছি। সহল বলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কে? শেখ উত্তর দেন: আমি তাদের মধ্যকার একজন যাদের ব্যাপারে নিম্নোক্ত আয়াতটি নাজিল হয়েছে:
قُلْ أُوحِيَ إِلَى أَنَّهُ اسْتَمَعَ نَفَرٌ مِّنَ الْجِنِّ .
"আপনি বলুন, আমার কাছে এ মর্মে অহী নাজিল হয়েছে যে, একদল জিন কোরআন শুনেছে।” (সূরা জিন-১)
মহানবী (সঃ) জিনদেরও নবী হওয়ায় দীন শিক্ষার জন্য তাদেরকে তাঁর কাছে আসতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, পরবর্তী যুগে দেখা গেছে, বহু জিন ছাত্র বহু দীনি প্রতিষ্ঠানে ছাত্র হিসেবেও লেখাপড়া শিখেছে। অনেক বুজুর্গ লোকের দরসের অনুষ্ঠানেও জিনদের আগমন ঘটেছে। দ্বীনদার জিনেরা সর্বদাই দীন শিখে তা নিজ সম্প্রদায়ের কাছে প্রচার প্রসারের দায়িত্ব পালন করে। মানব সমাজের মত ফাসেক ও গুনাহগার জিনেরাই কেবল দীনি শিক্ষা থেকে দূরে থাকে।

টিকাঃ
১. ঐ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00