📄 জিন কি গায়েব জানে?
গায়েব বা অদৃশ্য আল্লাহর সৃষ্টি। এর জ্ঞান তিনি নিজের কাছে রেখেছেন। কাউকে কাউকে তিনি কিছু কিছু গায়েবী জ্ঞান দান করেছেন। যাকে যতটুকু জ্ঞান দেয়া হয়েছে তিনি তা অপেক্ষা বেশী জানেন না। আল্লাহ বলেন: هُوَ اللَّهَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ هَوَ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمُ *
"মহান আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই। তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্য সম্পর্কে জ্ঞাত। তিনি অত্যন্ত দয়াবান ও মেহেরবান।" (সূরা হাশর-২২)
জিন জাতি মানুষ থেকে অদৃশ্য। অনেক মানুষের ধারণা জিনেরা গায়েব জানে। সেজন্য জিনের সমর্থনপুষ্ট গণক, যাদুকর ও দরবেশের কাছে মানুষের ভীড়। জিনকে সন্তুষ্ট করার জন্য কুফরী, শিরক ও বেদআত করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। অথচ জিন মানুষের মতই আল্লাহর আরেকটি সৃষ্টি। মানুষ যেমন গায়েব জানে না, তেমনি জিনেরাও গায়েব জানে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষ ভাগ্য অন্বেষণ, ভবিষ্যতের কল্যাণ ও নিরাপত্তা লাভের উদ্দেশ্যে এ গোলক ধাঁধার পেছনে ঘুরছে। যে মহান আল্লাহ গায়েব জানেন তাঁর দরবারে না গিয়ে এবং তাঁর কাছে না চেয়ে তাঁর সমান আরেক অসহায় অক্ষম সৃষ্টির কাছে চাওয়া-পাওয়ার নজরানা পেশ করে।
নিজেরা গায়েব জানেনা আল্লাহ একটি প্রামাণ্য ঘটনার মাধ্যমে তা বর্ণনা করেছেন। হযরত দাউদ (আঃ) যখন বায়তুল মাকদেস মসজিদ তৈরি শুরু করেন। সোলায়মান (আঃ) তা শেষ করেন, তিনি জিন শ্রমিককেও কাজে লাগান। মসজিদ তৈরির কাজ শুরু হলে তাঁর মৃত্যু উপস্থিত হয়। তিনি আল্লাহর কাছে দোআ করেন, হে আল্লাহ, কাজ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত জিনেরা যেন আমার মৃত্যু সম্পর্কে জানতে না পারে। তাই হল, মসজিদ তৈরিতে আরো এক বছর সময় লাগল। হাতের লাঠি ভর দেয়া অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হল। কিন্তু জিনেরা তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে টের পেল না। মসজিদ নির্মাণ শেষ হলে, উইপোকা সে লাঠি খেয়ে ফেলল। তখন লাঠিটি ভেঙ্গে পড়ে গেল। সাথে সাথে সোলায়মান (আঃ) এর মৃতদেহ মাটিতে ঢলে পড়ল। তখন জিনেরা দেখল যে, সোলায়মান (আঃ) ইন্তেকাল করেছেন। তারপর জিনেরা যে কথা বলল সেটাই কোরআন আমাদেরকে জানিয়েছে। فَلَمَّا قَضَيْنَا عَلَيْهِ الْمَوْتَ مَا دَلَّهُمْ عَلَى مَوْتِهِ إِلَّا دَابَّةَ الْأَرْضِ تَأْكُلَ مِنْسَانَهُ ، فَلَمَّا خَرَّ تَبَيَّنَتِ الْجِنَّ أَنْ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ الْغَيْبَ مَا لَبِثُوا فِي الْعَذَابِ الْمُهِينِ * "যখন আমি সোলায়মানের মৃত্যু দিলাম। তখন ঘুন পোকাই জিনদেরকে তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করল। সোলায়মানের লাঠি খেয়ে যাচ্ছিল। যখন তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন, তখন জিনেরা বুঝতে পারল যে, গায়েবী জ্ঞান জানা থাকলে তারা এ লাঞ্ছনাপূর্ণ শাস্তিতে আবদ্ধ থাকত না। -(সূরা সাবা-১৪) মৃত্যু উপস্থিত হলে কারো নিস্তার নেই। স্বয়ং মসজিদ নির্মাণ অসমাপ্ত অবস্থায় নবী সোলায়মানও তা থেকে রক্ষা পাননি। তাঁর মৃত্যুর পূর্বে কিছু কাজ বাকী ছিল। কাজটি জিনদের উপর ন্যস্ত ছিল। তারা তাঁর মৃত্যু সংবাদ জানতে পারলে কাজ ছেড়ে দিত। তাই আল্লাহর নির্দেশে সোলায়মান (আঃ) মৃত্যুর আগ দিয়ে মৃত্যুর জন্য তৈরি হয়ে তাঁর মেহরাবে প্রবেশ করেন। মেহরাবটি স্বচ্ছ কাঁচের নির্মিত ছিল। বাইর থেকে ভেতরের সব কিছু দেখা যেত। তিনি নিয়ম অনুযায়ী ইবাদতের উদ্দেশ্যে লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। ফলে আত্মা বের হয়ে যাওয়ার পরও দেহ লাঠির সাহায্যে অনড় থাকল। বাইর থেকে মনে হত যে তিনি ইবাদতে মশগুল আছেন। তারা তাঁকে জীবিত মনে করে দিনের পর দিন কাজ করতে থাকে। অবশেষে এক বছর পর মসজিদের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। উঁইপোকা লাঠি খেয়ে ফেলে। তখন তিনি মাটিতে পড়ে যান। তখন থেকেই জিনেরা উই পোকাকে ভালবাসা শুরু করে। জিনেরা উই পোকাকে বলেছে, যদি আমরা জানতাম যে, তুমি খাও, ও পান কর, তাহলে যে কোন জায়গায় আমরা তোমার জন্য খাদ্য ও পানীয় পৌছে দিতাম। ১. সোলায়মান (আঃ)-এর এ পদক্ষেপের দু'টো লক্ষ্য ছিল। এক মসজিদ নির্মাণ সমাপ্ত করণ, দুই জিনেরা গায়েব জানে না, এ বিষয়টি সবাইকে জানিয়ে দেয়া, যেন কেউ তাদেরকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ না করে। অতীত ঘটনা জানা জায়েয, তবে জিনের কাছে অতীতের খবর জিজ্ঞেস করা যায়। আবদুল্লাহ বিন আহমদ বিন হাম্বল সাহাবায়ে কেরামের ফযীলতের ব্যাপারে বলেন: বসরার গভর্নর আবু মূসা আশআরীর কাছে খলীফা ওমর বিন খাত্তাবের খবর পৌঁছতে বিলম্ব হচ্ছিল। শহরে এক মহিলা ছিল যার কাছে একটি জিন শয়তান ছিল। তিনি মহিলাটিকে বলেন: তুমি তোমার সাথীকে বল আমাকে যেন আমীরুল মোমেনীনের খবর এনে দেয়। শয়তানটি বলল: বর্তমানে খলীফা ইয়েমেন আছেন। সহসাই তিনি চলে আসবেন। তিনি বেশী দিন অপেক্ষা না করে আবার জিনের মাধ্যমে খলীফার খবর আনার জন্য মহিলার কাছে আবেদন জানান। তখন জিন শয়তান বলে, খলীফা ওমর এমন এক ব্যক্তি যার কাছে যাওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। তার দু'চোখের মাঝখানে আছে জিরবীল, যে কোন শয়তান তার শব্দ শুনলে বেহুশ হয়ে পড়ে যায়। এ কথার মধ্যে কোন • সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ জিনকে বিরাট দূরত্ব অল্প সময়ে পাড়ি দেয়ার ক্ষমতা দিয়েছেন। একথা কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন:
قَالَ عِفْرِيْتٌ مِّنَ الْجِنِّ أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَنْ تَقَوْمَ مِنْ مَقَامِكَ
"এক দৈত্য জিন বলল: আপনি আপনার স্থান থেকে উঠার আগেই আমি তা (বিলকিসের সিংহাসন) হাজির করবো।" (সূরা নামল ৩৯)
দূরবর্তী কোন জায়গায় কোন ঘটনা ঘটলে জিন আল্লাহ প্রদত্ত দ্রুততা সহকারে সে খবর সংগ্রহ করে দিতে পারে। কেউ জিনের মাধ্যমে সে খবর সংগ্রহ করতে চাইলে তা নাজায়েয হবে না। নাজায়েয হল, ভবিষ্যতের গায়েবী খবর জানার চেষ্টা করা যেটা জিনের সাধ্যের বাইরে। এক্ষেত্রে জিন ও মানুষ উভয়েই সমান।
জিনেরা অতীত বহু ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। অগ্নিপুজারী পারস্যবাহিনীর সাথে কাদেসিয়ার ময়দানে মুসলমান বাহিনীর যুদ্ধের খবর জিনেরা দিয়েছে। সে যুদ্ধে নাখয় নামক একজন মুসলিম, সৈন্যের শাহাদতের খবর দিয়েছে জিনেরা ইয়েমেনে। ১
হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন: আমরা মক্কার মোহাসসাব উপত্যকায় ছিলাম, তখন একজন লোক হযরত ওমর (রাঃ) এর ছুরিকাহত হবার খবর দিল। এরপর আর তাকে দেখা গেল না। আমরা মদীনায় পৌঁছে তা সত্যই দেখতে পাই। তিনি তখন শহীদ। ২.
জিনেরা হযরত ওসমান (রাঃ) এর শাহাদতের খবরও দিয়েছে। মদীনার হাররায় সহস্রাধিক লোকের হত্যাকান্ড সম্পর্কে মক্কায় জিনেরা খবর দিয়েছে। ৩ এছাড়াও আরো বহু ঘটনা এমন আছে যে, জিনেরা সংঘটিত ঘটনার খবর দিয়েছে। ৪.
টিকাঃ
১. দৈনিক আল-মদীনা, জেদ্দা, ৫ই রবিউস সানী, ১৪২০ হিঃ (১৯৯৯ খৃঃ)
১. ঐ
২. ঐ
৩. ঐ
৪. ঐ