📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 নেক ও পাপের জন্য জিনের সওয়াব ও শাস্তি লাভ

📄 নেক ও পাপের জন্য জিনের সওয়াব ও শাস্তি লাভ


ওলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে একমত যে, কাফের জিনদের জন্য পরকালে শাস্তি রয়েছে। আল্লাহ বলেছেন: قَالَ النَّارُ مَثْوَاكُمْ তিনি বলেন, দোজখই তোমাদের ঠিকানা।' -(সূরা আন 'আম ১২৮)
এখানে আল্লাহ কাফের জিনদেরকে লক্ষ্য করে একথা বলেছেন। وَأَمَّا الْقَاسِطُونَ فَكَانُوا لِجَهَنَّمَ حَطَبًا - তিনি আরো বলেন : 'আর পাপী জিনেরা জাহান্নামের ইন্ধন। (সূরা জিন-১৫) এ মর্মে আল্লাহ আরো বলেন: وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ وَلَهُمْ قُلُوبٌ لا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانُ لَا يَسْمَعُونَ بِهَا أُولَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُولَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ "আর আমরা সৃষ্টি করেছি দোজখের জন্য বহু জিন ও মানুষ। তাদের অন্তর রয়েছে, এর দ্বারা তা বুঝে না এবং চিন্তা ভাবনা করে না; তাদের চোখ রয়েছে, এর দ্বারা তারা দেখে না; আর তাদের কান রয়েছে, এর দ্বারা তারা শুনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং তাদের চাইতেও নিকৃষ্ট। তারাই হল উদাসীন এবং শৈথিল্যপরায়ণ। (সূরা আরাফ-১৭৯).
এ আয়াতে দোজখের জন্য বহু সংখ্যক জিন ও মানুষ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে।
এতো গেল কাফের জিনের কথা। মোমেন জিনের ব্যাপারে কয়েকটি মত রয়েছে।
(১) তাদের কোন সওয়াব নেই। শুধুমাত্র দোজখ থেকে মুক্তি পাবে। তারপর তাদেরকে বলা হবে তোমরা পশুদের ন্যায় মাটি হয়ে যাও। এটা হচ্ছে ইমাম আবু হানিফার মত। ইবনু হেজাম তা উল্লেখ করেছেন।
ইবনে আবিদ দুনিয়া মাইস বিন সালেম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, জিনদের সওয়াব হল দোজখ থেকে মুক্তি পাওয়া। তারপর তাদেরকে মাটি হয়ে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হবে।
ইবনু হোমাইদ, ইবনুল মোন্জের এবং ইবনু শাহীন তাঁর 'কিতাবুল আজায়ের ওয়ালগারায়েব'-এ আবুষ যেনাদ থেকে লিখেছেন যে, তিনি বলেছেন যখন বেহেশতবাসীরা বেহেশতের এবং দোজখবাসীরা দোজখে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ মোমেন জিন ও অন্যান্য সকল জাতিকে বলবেন: তোমরা মাটি হয়ে যাও তারা সবাই মাটি হয়ে যাবে। তখন কাফেরগণ বলবে يَالَيْتَنِي كُنْتُ تَرَابًا 'হায়, আমি যদি মাটি হয়ে যেতাম। (সূরা নাবা-৪০)
২. তাদেরকে নেক কাজের সওয়াব এবং পাপ কাজের আজাব দেয়া হবে। এটা হচ্ছে, ইবনু আবি লায়লা, মালেক, আওযাঈ, শাফেঈ, আহমদ, তাঁদের সাথীগণ ইমাম আবু হানিফা এবং তাঁর দুই সাথীর মত। ইবনু হাজম তাঁর 'আল- মেলাল ওয়ান নেহাল' গ্রন্থে লিখেছেন, অধিকাংশ লোকের মতে, তারা বেহেশতে প্রবেশ করবে।
ইবনু আবু হাতেম ইয়াকুব থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবনু আবি লায়লা বলেছেন, জিনেরা নেক কাজের সওয়াব পাবে। কোরআনের নিম্নোক্ত আয়াত একথার সত্যতা প্রমাণ করে। وَلِكُلِّ دَرَجَاتٌ مِّمَّا عَمِلُوا
"তারা যে যা আমল করেছে সে অনুযায়ী প্রত্যেকের জন্য মর্যাদা নির্ধারিত হবে।" -(সূরা আন'আম-১৩৩)
আবুশ শেখ তাঁর 'আজামা' গ্রন্থে খোযাইমা থেকে লিখেছেন, ইবনু ওহাবকে যখন জিনদের সওয়াব ও শাস্তির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হল, তখন আমি তা শুনছিলাম। তিনি জবাবে বলেন: আল্লাহ বলেছেন: وَحَقَّ عَلَيْهِمُ الْقَوْلُ فِي أُمَمٍ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِمْ مِّنَ الْجِنِّ والانس : إِنَّهُمْ كَانُوا خَاسِرِينَ .
"তাদের ব্যাপারেও শাস্তির আদেশ বাস্তবায়িত হল, যা বাস্তবায়িত হয়েছিল তাদের পূর্ববতী জিন ও মানুষের ব্যাপারে। নিশ্চয়ই তারা ক্ষতিগ্রস্ত।" -(সূরা হা-মীম সাজদাহ-২৫)
وَلِكُلِّ دَرَجَاتٍ مِّمَّا عَمِلُوا : অর্থাৎ প্রত্যেক কাজের
'প্রত্যেকের জন্য তাদের কর্মের আনুপাতিক মর্যাদা রয়েছে।' (সূরা আনআম-১৩০) ১ম আয়াতে মানুষ ও জিনের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা উল্লেখ আছে। গুনাহর শাস্তিই হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ। ২য় আয়াতে জিন ও মানুষের প্রত্যেকের আমলের মর্যাদার কথা উল্লেখ আছে। অর্থাৎ তারা সওয়াব লাভ করবে।
আবুশ শেখ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন। ৪ প্রকারের সৃষ্টি আছে। ১ম প্রকার, সৃষ্টির সকলেই বেহেশতে যাবে। ২য় প্রকার, সৃষ্টির সকলেই দোজখে যাবে। আর অন্য দু'প্রকার সৃষ্টি বেহেশত ও দোজখ উভয়টিতে যাবে। যাদের সকলেই বেহেশতে যাবে তারা হল, ফেরেশতা, যাদের সকলেই দোজখে যাবে তারা হল শয়তান আর যারা বেহেশত ও দোজখে যাবে তারা হল মানুষ ও জিন। তাদের জন্য রয়েছে সওয়াব ও শাস্তি।১. ইবনু আবু হাতেম ও আবুশ শেখ হাসান থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: জিনেরা হচ্ছে, ইবলিশের সন্তান আর মানুষ হচ্ছে, আদমের সন্তান। তাদের মধ্যে রয়েছে মোমেন মুসলমান।

টিকাঃ
১. লাকুতুল মারজান ফি আহকামিল জিন- জালালুদ্দিন সুযুতী।

📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 মোমেন জিনের বেহেশতে প্রবেশ

📄 মোমেন জিনের বেহেশতে প্রবেশ


মোমেন জিনের বেহেশতে প্রবেশের বিষয়ে চারটি মত রয়েছে।
(১) তারা বেহেশতে যাবে। অধিকাংশ আলেমের মত তাই। ইবনে হাজম তাঁর 'আল মেলাল' গ্রন্থে আবু লায়লা ও আবু ইউসুফ এর বরাত দিয়ে একথা উল্লেখ করেছেন। মোমেন জিনদের বেহেশতে প্রবেশের পর পানাহার সম্পর্কে তাদের মতভেদ আছে।
ইবনু আবিদ দুনিয়া উল্লেখ করেছেন যে, মুজাহিদকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মোমেন জিনেরা কি বেহেশতে যাবে? তিনি বলেন, তারা বেহেশতে যাবে কিন্তু পানাহার করবে না। বেহেশতী মানুষ খানা-পিনার যে নেয়ামত ভোগ করবে, তারা তা করবে না। হারেস আল-মোহাসেবী বলেছেন, জিনেরা কেয়ামতের দিন বেহেশতে প্রবেশের পর আমরা তাদেরকে দেখবো, কিন্তু তারা আমাদেরকে দেখবে না। অর্থাৎ দুনিয়ার বিপরীত অবস্থা হবে।
(২) জিনেরা বেহেশতে প্রবেশ করবে না, বরং তারা বেহেশতের উপকণ্ঠে থাকবে। মানুষ তাদেরকে দেখবে, কিন্তু তারা মানুষদেরকে দেখবে না। এটা হচ্ছে, ইমাম মালেক, শাফেঈ, আহমদ, আবু ইউসুফ ও মোহাম্মদের মত। ইবনে তাইমিয়া ইবনে মোরাইর জবাবে একথা বলেন। এটা ইবনে হাজমের বর্ণনার বিপরীত। আবুশ শেখ বলেন: লাইস বিন আবু সলিম বলেছেন: মুসলমান জিনেরা না বেহেশতে, না দোজখে প্রবেশ করবে। আল্লাহ তাদের পিতা ইবলিশকে বেহেশত থেকে বের করে দিয়েছেন। তাই তাকে এবং তার সন্তানদেরকে আবারো বেহেশতে প্রবেশ করাবেন না।
(৩) জিনেরা আরাফে থাকবে। আবুশ শেখ এবং বায়হাকী তাঁর আল বায়ছ কিতাবে আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, মোমেন জিনদের জন্য সওয়াব ও শাস্তি উভয়টাই রয়েছে। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, তাদের সওয়াবের বিনিময় কি হবে? তিনি বলেন: তারা আরাফে যাবে, উম্মতে মোহাম্মদীর সাথে বেহেশতে যাবে না। আমরা জিজ্ঞেস করলাম আরাফ কি? তিনি উত্তরে বলেন: আরাফ হচ্ছে বেহেশতের দেয়াল যার নীচ দিয়ে ঝর্নাধারা প্রবাহিত হয় এবং তাতে গাছ ও ফল-ফলাদি উৎপন্ন হয়।
আল্লামা হাফেজ আজ-জাহাবী এটাকে মোনকার হাদীস বলেছেন।
(৪) জিনদের বেহেশতে যাওয়ার বিষয়ে চুপচাপ থাকা।
এখন আমরা ১ম মতের পক্ষের যুক্তিগুলো আলোচনা করবো।
১. বেহেশত লাভের যোগ্যতা সম্পর্কে বর্ণিত আয়াতগুলো এর প্রমাণ। وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ غَيْرَ بَعِيدٍ 'বেহেশতকে আল্লাহভীরুদের অদূরে উপস্থিত করা হবে।' (সূরা ক্বাফ ৩১)
আল্লাহ আরো বলেন: وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمُوتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ "তোমরা বেহেশতের দিকে ছুটে যাও যার সীমানা হচ্ছে আসমান ও যমীন, যা তৈরি করা হয়েছে মোত্তাকীদের জন্য।" (সূরা আলে-ইমরান-১৩৩)
রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন:
مَنْ شَهِدَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ خَالِصًا دَخَلَ الْجَنَّةَ.
'যে ব্যক্তি খালেস নিয়তে স্বাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই। সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' (বাজ্জার এবং জামে' আস-সুয়ূতী) আল্লাহ কোরআন মজীদে আরো বলেছেনঃ
وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ فَبِأَيِّ الْآءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ .
"যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সামনে হাজির হওয়ার ভয় করে তার জন্য রয়েছে দু'টো বাগান। অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের পালনকর্তার কোম্ কোন্ অবদানকে অস্বীকার করবে।" (সূরা আর রাহমান-৪৬-৪৭) এ আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ জিন ও মানুষ উভয়ন্ত্রক সম্বোধন করেছেন এবং তাদেরকে বিনিময় হিসেবে জান্নাত দানের কথা উল্লেখ করে বেহেশতের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে চেয়েছেন। তারা সত্যিকার ঈমান আনলে আল্লাহ তাদেরকে অনুগ্রহ দান করবেন বলে জানিয়েছেন। এক হাদীসে এসেছে নবী করীম (সঃ) সাহাবাদের কাছে এ সূরা পাঠ করে বলেন, জিনেরা তোমাদের তুলনায় উত্তম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। আমি যখনই তাদের কাছে সূরা আর-রাহমানের একটি আয়াত তেলাওয়াত করেছি তখনই তারা বলেছে,
وَلَا بِشَيْ مِنْ الْآئِكَ رَبَّنَا نُكَذِبَ .
'হে প্রভু, আমরা তোমার কোন নেয়ামতকেই অস্বীকার করিনা।' (তিরমিযী) (২) ইবনু হাজম নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা মোমেন জিনদের বেহেশতী হওয়ার প্রমাণ উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেন: أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ "মোমেনদের জন্য বেহেশত তৈরি করা হয়েছে।" -(সূরা আল ইমরান-১৩৩) জিনেরা ঈমান এনেছে মর্মে সূরা জিনের ১নং আয়াত অর্থাৎ তারা মোমেন হয়েছে। আর মোমেনদের জন্য পুরস্কার হল, এমন বেহেশত যার পাশ দিয়ে নদী প্রবাহিত হয়েছে। (সূরা বাইয়েনা ৭-৮) ইবনু হাজম বলেছেন: বেহেশতে প্রবেশের গুণ জিন ও মানুষ সবার জন্যই সমান। তাই দুই জাতির মধ্যে এক জাতিকে জান্নাত থেকে বাদ রাখা যায় না। আল্লাহ উভয় জাতির বিষয়ে বেহেশত সম্পর্কে একটি সাধারণ ঘোষণা দেয়ার পর পরবর্তীতে এ সম্পর্কে আর কোন বক্তব্য প্রদান না করে এক জাতিকে তা থেকে বঞ্চিত রাখবেন এ চিন্তা মোটেই করা যায় না। বরং এটা তাঁর ঘোষিত বর্ণনার পরিপন্থী। অর্থাৎ মোমেন হলে জিন হোক, আর মানুষ হোক-সবাই জান্নাতে যাবে।
(৩) মোনজের ও ইবনু আবি হাতেম নিজ নিজ তাফসীরে মোবাশ্বের বিন ইসমাইল থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আমরা হামজা বিন হাবিবের সাথে আলোচনার সময় জিজ্ঞেস করলাম, জিনেরা কি জান্নাতে যাবে? তিনি বলেন: 'হ্যাঁ। কোরআনের নিম্নোক্ত আয়াত এ বিষয়টির সত্যতা প্রমাণ করে,
وَلَمْ يَطْمِثْهُنَّ إِنْسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانَ .
'ইতিপূর্বে হুরদেরকে কোন মানুষ ও জিন স্পর্শ করেনি।' (সূরা আর রাহমান-৫৬)
এ আয়াতটি জিনের হুর স্পর্শ ও ব্যবহার করার প্রমাণ বহন করে। কেননা, কেবলমাত্র বেহেশতেই হুর ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। জিন বেহেশতী না হলে তাদের ব্যাপারে এ আয়াত কিভাবে প্রযোজ্য হবে?
(৪) আবুশ শেখ বলেছেন, ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত। সৃষ্টি ৪ প্রকার। এক প্রকারের সৃষ্টি সবাই বেহেশতে যাবে। আর এক প্রকারের সৃষ্টি সবাই দোজখে যাবে। অন্য এক প্রকারের সৃষ্টি বেহেশত ও দোজখে যাবে। যে সৃষ্টির সবাই বেহেশতে যাবে তারা হলেন ফেরেশতা। আর যে সৃষ্টির সবাই দোজখে যাবে তারা হল শয়তান। আর যে সৃষ্টি বেহেশত ও দোজখে যাবে তারা হল, মানুষ ও জিন। তাদের জন্য রয়েছে সওয়াব ও আজাব। ওলামায়ে কেরামের বিশুদ্ধ মত হল, ফেরেশতারা বেহেশত পাবে না, তবে তারা তাদের উপযোগী নেয়ামত লাভ করবে।
(৫) বিবেক বুদ্ধিও জিনদের বেহেশতে যাওয়ার ধারণাকে জোরদার করে। অবশ্য বিবেক বুদ্ধি কোন জিনিসকে জরুরী বা বাধ্যতামূলক করতে পারে না। সেটা একমাত্র আল্লাহর কাজ। বিবেকের দাবী হল আল্লাহ তাঁর নাফরমান বান্দাহদেরকে দোজখের অঙ্গীকার করেছেন। অথচ যে তাঁর আনুগত্য করবে সে কি করে বেহেশতে যাবে না? তিনি তো মহান ন্যায় বিচারক এবং সম্মানিত।

📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 বেহেশতে প্রবেশের পর জিনেরা কি আল্লাহকে দেখবে?

📄 বেহেশতে প্রবেশের পর জিনেরা কি আল্লাহকে দেখবে?


এজুদিন ইবনু আবদুস সালাম তাঁর 'আল কাওয়ায়েদ আস-সোগরা' বইতে লিখেছেন: মোমেন জিনেরা বেহেশতে প্রবেশ করলে আল্লাহকে দেখতে পাবে না। মানুষের মধ্যে যারা মোমেন কেবলমাত্র তারাই বেহেশতী হলে আল্লাহকে দেখতে পাবে। তিনি বলেছেন, ফেরেশতারা বেহেশতে আল্লাহকে দেখতে পাবেনা। তাই জিনদেরও আল্লাহকে দেখার কথা নয়।
এদিকে ইমাম বায়হাকী 'কিতাব-আর রুইয়াহ' বইতে 'আল্লাহকে দেখা' নামক অধ্যায়ে জিনেরা আল্লাহকে দেখতে পাবে এ বিষয়ের উপর জোর দিয়েছেন। অপরদিকে কাজী জালালুদ্দিন বালকিনী বলেছেন, সাধারণ প্রমাণাদির ভিত্তিতে বলা যায় যে, জিনেরা আল্লাহকে দেখবে। কিন্তু 'আসয়েলাতুস সাফা' বইতে উল্লেখ আছে যে হানাফী ইমামদের মতে জিনেরা আল্লাহকে দেখতে পাবে না।
এ আলোচনায় দেখা যায় যে, জিনদের আল্লাহকে দেখার বিষয়টি মতভেদপূর্ণ। শক্তিশালী মত হচ্ছে, জিনেরা বেহেশতে আল্লাহকে দেখবে। তবে মূল বিষয়টি আল্লাহর উপরই নির্ভরশীল।

📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 জিন কি গায়েব জানে?

📄 জিন কি গায়েব জানে?


গায়েব বা অদৃশ্য আল্লাহর সৃষ্টি। এর জ্ঞান তিনি নিজের কাছে রেখেছেন। কাউকে কাউকে তিনি কিছু কিছু গায়েবী জ্ঞান দান করেছেন। যাকে যতটুকু জ্ঞান দেয়া হয়েছে তিনি তা অপেক্ষা বেশী জানেন না। আল্লাহ বলেন: هُوَ اللَّهَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ هَوَ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمُ *
"মহান আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই। তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্য সম্পর্কে জ্ঞাত। তিনি অত্যন্ত দয়াবান ও মেহেরবান।" (সূরা হাশর-২২)
জিন জাতি মানুষ থেকে অদৃশ্য। অনেক মানুষের ধারণা জিনেরা গায়েব জানে। সেজন্য জিনের সমর্থনপুষ্ট গণক, যাদুকর ও দরবেশের কাছে মানুষের ভীড়। জিনকে সন্তুষ্ট করার জন্য কুফরী, শিরক ও বেদআত করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। অথচ জিন মানুষের মতই আল্লাহর আরেকটি সৃষ্টি। মানুষ যেমন গায়েব জানে না, তেমনি জিনেরাও গায়েব জানে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষ ভাগ্য অন্বেষণ, ভবিষ্যতের কল্যাণ ও নিরাপত্তা লাভের উদ্দেশ্যে এ গোলক ধাঁধার পেছনে ঘুরছে। যে মহান আল্লাহ গায়েব জানেন তাঁর দরবারে না গিয়ে এবং তাঁর কাছে না চেয়ে তাঁর সমান আরেক অসহায় অক্ষম সৃষ্টির কাছে চাওয়া-পাওয়ার নজরানা পেশ করে।
নিজেরা গায়েব জানেনা আল্লাহ একটি প্রামাণ্য ঘটনার মাধ্যমে তা বর্ণনা করেছেন। হযরত দাউদ (আঃ) যখন বায়তুল মাকদেস মসজিদ তৈরি শুরু করেন। সোলায়মান (আঃ) তা শেষ করেন, তিনি জিন শ্রমিককেও কাজে লাগান। মসজিদ তৈরির কাজ শুরু হলে তাঁর মৃত্যু উপস্থিত হয়। তিনি আল্লাহর কাছে দোআ করেন, হে আল্লাহ, কাজ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত জিনেরা যেন আমার মৃত্যু সম্পর্কে জানতে না পারে। তাই হল, মসজিদ তৈরিতে আরো এক বছর সময় লাগল। হাতের লাঠি ভর দেয়া অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হল। কিন্তু জিনেরা তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে টের পেল না। মসজিদ নির্মাণ শেষ হলে, উইপোকা সে লাঠি খেয়ে ফেলল। তখন লাঠিটি ভেঙ্গে পড়ে গেল। সাথে সাথে সোলায়মান (আঃ) এর মৃতদেহ মাটিতে ঢলে পড়ল। তখন জিনেরা দেখল যে, সোলায়মান (আঃ) ইন্তেকাল করেছেন। তারপর জিনেরা যে কথা বলল সেটাই কোরআন আমাদেরকে জানিয়েছে। فَلَمَّا قَضَيْنَا عَلَيْهِ الْمَوْتَ مَا دَلَّهُمْ عَلَى مَوْتِهِ إِلَّا دَابَّةَ الْأَرْضِ تَأْكُلَ مِنْسَانَهُ ، فَلَمَّا خَرَّ تَبَيَّنَتِ الْجِنَّ أَنْ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ الْغَيْبَ مَا لَبِثُوا فِي الْعَذَابِ الْمُهِينِ * "যখন আমি সোলায়মানের মৃত্যু দিলাম। তখন ঘুন পোকাই জিনদেরকে তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করল। সোলায়মানের লাঠি খেয়ে যাচ্ছিল। যখন তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন, তখন জিনেরা বুঝতে পারল যে, গায়েবী জ্ঞান জানা থাকলে তারা এ লাঞ্ছনাপূর্ণ শাস্তিতে আবদ্ধ থাকত না। -(সূরা সাবা-১৪) মৃত্যু উপস্থিত হলে কারো নিস্তার নেই। স্বয়ং মসজিদ নির্মাণ অসমাপ্ত অবস্থায় নবী সোলায়মানও তা থেকে রক্ষা পাননি। তাঁর মৃত্যুর পূর্বে কিছু কাজ বাকী ছিল। কাজটি জিনদের উপর ন্যস্ত ছিল। তারা তাঁর মৃত্যু সংবাদ জানতে পারলে কাজ ছেড়ে দিত। তাই আল্লাহর নির্দেশে সোলায়মান (আঃ) মৃত্যুর আগ দিয়ে মৃত্যুর জন্য তৈরি হয়ে তাঁর মেহরাবে প্রবেশ করেন। মেহরাবটি স্বচ্ছ কাঁচের নির্মিত ছিল। বাইর থেকে ভেতরের সব কিছু দেখা যেত। তিনি নিয়ম অনুযায়ী ইবাদতের উদ্দেশ্যে লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। ফলে আত্মা বের হয়ে যাওয়ার পরও দেহ লাঠির সাহায্যে অনড় থাকল। বাইর থেকে মনে হত যে তিনি ইবাদতে মশগুল আছেন। তারা তাঁকে জীবিত মনে করে দিনের পর দিন কাজ করতে থাকে। অবশেষে এক বছর পর মসজিদের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। উঁইপোকা লাঠি খেয়ে ফেলে। তখন তিনি মাটিতে পড়ে যান। তখন থেকেই জিনেরা উই পোকাকে ভালবাসা শুরু করে। জিনেরা উই পোকাকে বলেছে, যদি আমরা জানতাম যে, তুমি খাও, ও পান কর, তাহলে যে কোন জায়গায় আমরা তোমার জন্য খাদ্য ও পানীয় পৌছে দিতাম। ১. সোলায়মান (আঃ)-এর এ পদক্ষেপের দু'টো লক্ষ্য ছিল। এক মসজিদ নির্মাণ সমাপ্ত করণ, দুই জিনেরা গায়েব জানে না, এ বিষয়টি সবাইকে জানিয়ে দেয়া, যেন কেউ তাদেরকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ না করে। অতীত ঘটনা জানা জায়েয, তবে জিনের কাছে অতীতের খবর জিজ্ঞেস করা যায়। আবদুল্লাহ বিন আহমদ বিন হাম্বল সাহাবায়ে কেরামের ফযীলতের ব্যাপারে বলেন: বসরার গভর্নর আবু মূসা আশআরীর কাছে খলীফা ওমর বিন খাত্তাবের খবর পৌঁছতে বিলম্ব হচ্ছিল। শহরে এক মহিলা ছিল যার কাছে একটি জিন শয়তান ছিল। তিনি মহিলাটিকে বলেন: তুমি তোমার সাথীকে বল আমাকে যেন আমীরুল মোমেনীনের খবর এনে দেয়। শয়তানটি বলল: বর্তমানে খলীফা ইয়েমেন আছেন। সহসাই তিনি চলে আসবেন। তিনি বেশী দিন অপেক্ষা না করে আবার জিনের মাধ্যমে খলীফার খবর আনার জন্য মহিলার কাছে আবেদন জানান। তখন জিন শয়তান বলে, খলীফা ওমর এমন এক ব্যক্তি যার কাছে যাওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। তার দু'চোখের মাঝখানে আছে জিরবীল, যে কোন শয়তান তার শব্দ শুনলে বেহুশ হয়ে পড়ে যায়। এ কথার মধ্যে কোন • সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ জিনকে বিরাট দূরত্ব অল্প সময়ে পাড়ি দেয়ার ক্ষমতা দিয়েছেন। একথা কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন:
قَالَ عِفْرِيْتٌ مِّنَ الْجِنِّ أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَنْ تَقَوْمَ مِنْ مَقَامِكَ
"এক দৈত্য জিন বলল: আপনি আপনার স্থান থেকে উঠার আগেই আমি তা (বিলকিসের সিংহাসন) হাজির করবো।" (সূরা নামল ৩৯)
দূরবর্তী কোন জায়গায় কোন ঘটনা ঘটলে জিন আল্লাহ প্রদত্ত দ্রুততা সহকারে সে খবর সংগ্রহ করে দিতে পারে। কেউ জিনের মাধ্যমে সে খবর সংগ্রহ করতে চাইলে তা নাজায়েয হবে না। নাজায়েয হল, ভবিষ্যতের গায়েবী খবর জানার চেষ্টা করা যেটা জিনের সাধ্যের বাইরে। এক্ষেত্রে জিন ও মানুষ উভয়েই সমান।
জিনেরা অতীত বহু ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। অগ্নিপুজারী পারস্যবাহিনীর সাথে কাদেসিয়ার ময়দানে মুসলমান বাহিনীর যুদ্ধের খবর জিনেরা দিয়েছে। সে যুদ্ধে নাখয় নামক একজন মুসলিম, সৈন্যের শাহাদতের খবর দিয়েছে জিনেরা ইয়েমেনে। ১
হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন: আমরা মক্কার মোহাসসাব উপত্যকায় ছিলাম, তখন একজন লোক হযরত ওমর (রাঃ) এর ছুরিকাহত হবার খবর দিল। এরপর আর তাকে দেখা গেল না। আমরা মদীনায় পৌঁছে তা সত্যই দেখতে পাই। তিনি তখন শহীদ। ২.
জিনেরা হযরত ওসমান (রাঃ) এর শাহাদতের খবরও দিয়েছে। মদীনার হাররায় সহস্রাধিক লোকের হত্যাকান্ড সম্পর্কে মক্কায় জিনেরা খবর দিয়েছে। ৩ এছাড়াও আরো বহু ঘটনা এমন আছে যে, জিনেরা সংঘটিত ঘটনার খবর দিয়েছে। ৪.

টিকাঃ
১. দৈনিক আল-মদীনা, জেদ্দা, ৫ই রবিউস সানী, ১৪২০ হিঃ (১৯৯৯ খৃঃ)
১. ঐ
২. ঐ
৩. ঐ
৪. ঐ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00