📄 জিনদের বিভিন্ন দল ও আকীদা-বিশ্বাস এবং ইবাদত
প্রখ্যাত তাফসীরকার মুজাহিদ বলেছেন, সূরা জিনের ১১নং আয়াতে كنا طَرَائِقَ قِرَدًا “আমরা জিনেরা বিভিন্ন মত ও পথের অনুসারী ছিলাম” আয়াতের অর্থ হল, তারা মোমেন, আহলে সুন্নাত, কাফের ও বেদআতপন্থী ছিল। ইমাম আহমদ তাঁর 'আন-নাসেখ আল-মানসুখ' কিতাব এবং আবুশ শেখ তাঁর 'আল-জাজামাহ' কিতাবে লিখেছেন, জিনদের মধ্যে কাদরিয়াহ মোরজেআহ, রাফেজী, শিয়া এবং ইহুদী খৃস্টানও আছে। আল্লাহ জিনদের জবানীতে বলেছেন, وَانَّا مِنَّا الْمُسْلِمُونَ وَمِنَّا الْقَاسِطُونَ ، فَمَنْ أَسْلَمَ فَأَوْلَئِكَ تَحَرَّوْا رَشَدًا ، وَأَمَّا الْقَاسِطُونَ فَكَانُوا لِجَهَنَّمَ حَطَبًا .
"আমাদের মধ্যে মুসলমান আছে, আর আছে জালেম। যারা মুসলমান হয়েছে, তারাই সত্যের সন্ধান পেয়েছে। আর যারা জালেম, তারা হবে জাহান্নামের ইন্ধন।” (সূরা জিন: ১৪-১৫)
হাতেব বিন আবি বালতাআর বর্ণিত হাদীসে মহানবী (সঃ) বলেছেন, নিহত জিনটি হচ্ছে আমর বিন জাওমানা যাকে মোহসেন বিন জাওশান নামক খ্রিস্টান জিন হত্যা করেছে।
আবু নসর আশ শে'রী 'এবানা' গ্রন্থে হাম্মাদ বিন শোআইব থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি জিনের সাথে আলোচনাকারী এক ব্যক্তির বরাত দিয়ে লিখেছেন। জিনেরা তাকে বলেছে, আমাদের মধ্যে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অনুসারী কোন ব্যক্তি নেই।
জিনদের ইবাদত সম্পর্কে বহু বর্ণনা এবং প্রমাণ আছে। ইবনু আবিদ দুনিয়া উল্লেখ করেছেন যে, সাফওয়ান বিন মোহরেজ আল মাজেনী রাত্রে যখন তাহাজ্জুদের নামাজের জন্য দাঁড়াতেন, তাঁর সাথে তাঁর ঘরের বাসিন্দা জিনেরাও নামাজে দাঁড়িয়ে যেত। তারা জামাতে নামাজ পড়ত এবং কোরআন তেলাওয়াত শুনত। বর্ণনাকারী সেররী অপর বর্ণনাকারী ইয়াযীদকে প্রশ্ন করেন, তিনি কিভাবে তাদের উপস্থিতি টের পেতেন? ইয়াযীদ বলেন, তিনি নামাজে দাঁড়ালে তাদের শব্দ ও আওয়াজ শুনতেন এবং ভয় পেয়ে যেতেন। তাঁকে আওয়াজ দিয়ে বলা হল, হে আবদাল্লাহ, ভয় পাবেন না, আমরা আপনার ভাই, আপনার সাথে তাহাজ্জুদের নামাজে শরীক হই। আপনি আপনার নামাজ পড়ুন। এরপর থেকে তিনি তাদের নড়াচড়ার ভয় থেকে নিরাপদ হয়ে যান।১.
মুআ'জ বিন জাবাল থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তোমাদের কেউ রাত্রে নামাজ পড়লে সে যেন প্রকাশ্যে কেরাত পড়ে। ফেরেশতারা তার সাথে নামাজে শরীক হয় এবং কেরাত শুনে। অনুরূপভাবে বাতাসে বিচরণকারী জিন এবং তার নিজ ঘরে বসবাসকারী মোমেন জিনেরাও তার সাথে নামাজ পড়ে এবং কোরআনের কেরাত শুনে। কোরআনের কেরাত তার নিজ ঘর ও পার্শ্ববর্তী ঘরসমূহের ফাসেক ও আল্লাহদ্রোহী জিনগুলোকে তাড়িয়ে দেয়। (বাজ্জার)
ইবনুস সালাহকে এক ব্যক্তির নিম্নোক্ত প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হল : শয়তান কি কোরআন এবং নিজ বাহিনী নিয়ে নামাজ পড়তে পারে? তিনি জবাব দেন : বর্ণিত রেওয়াতের বাহ্যিক অর্থ অনুসারে বাস্তবে তাদের কোরআন পড়া প্রমাণিত নয়। তাই নামাজ পড়াও সম্ভব নয়। কেননা, নামাজে কোরআন পড়তে হয়। বর্ণিত আছে যে, ফেরেশতাদেরকে কোরআন তেলাওয়াত করার মর্যাদা দেয়া হয়নি। তাই তারা সর্বদা মানুষের কাছে কোরআন শুনতে আগ্রহী। ফলে, কোরআন এমন এক সম্মানের বিষয় যা দ্বারা আল্লাহ শুধু মানুষকেই সম্মানিত করেছেন। তবে মোমেন জিনেরা কোরআন পড়ে বলে আমরা জানতে পেরেছি।
আল্লামা সুফিয়ান সাওরী নিজ তাফসীরে সাঈদ বিন জোবায়ের থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, জিনেরা নবী (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করল, আমরা কি দূর থেকে এসে আপনার সাথে মসজিদে নামাজ পড়তে পারি? এ প্রশ্নের উত্তরে কোরআনের এ আয়াতটি নাজিল হয়: وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعَوْا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا .
"মসজিদসমূহ কেবল আল্লাহর জন্য, আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ডেকো না।” (সূরা জিন-১৮)
আবুজ যোবায়ের থেকে বর্ণিত। একবার আবদুল্লাহ বিন সাফওয়ান কা'বা শরীফের নিকটে বসা ছিলেন। তখন বাবে ইরাকী দিয়ে একটি সাপ ঢুকল এবং কা'বা শরীফের চারদিকে সাত চক্কর তওয়াফ করল। তারপর হাজারে আসওয়াদের কাছে এসে তাকে চুমু দিল। আবদুল্লাহ বিন সাফওয়ান সাপটিকে দেখে বলল, হে জিন! তুমি ওমরাহ শেষ করেছ। আমাদের আশংকা হয় যে, বালকেরা তোমার ক্ষতি করতে পারে। তুমি চলে যাও। সাপটি যে পথ দিয়ে এসেছিল সে পথ ধরে চলে গেল। ১.
তালাক বিন হাবিব থেকে বর্ণিত। আমরা আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস সহ কা'বা শরীফের পাশে বসা ছিলাম। কা'বার ছায়া ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়ে আসল এবং মজলিশ সমূহ বসল। বাবে বনি শায়বা দিয়ে একটি পুরুষ সাপ ঢুকল। সাপটি নিজ গর্দান লম্বা করে এবং মাথা উঁচু করে দেখল। তার চোখ ছিল মানুষের মত। সে কা'বা শরীফের সাত চক্কর তওয়াফ করল এবং মাকামে ইবরাহীমের পেছনে দু'রাকাত নামাজ পড়ল। আমরা তার কাছে গেলাম এবং বললাম: হে ওমরাহকারী। আল্লাহ তোমার ওমরাহ পূর্ণ করেছেন। আমাদের এ জায়গায় কিছু বোকা কাল বালক আছে। আমাদের আশংকা তারা তোমার কোন ক্ষতি করতে পারে। সাপটি মাথা ও লেজ দিয়ে একটি কুণ্ডলী পাকাল এবং আকাশে এতদূরে অদৃশ্য হয়ে গেল যে, আমরা তাকে আর দেখতে পেলাম না। ১
আল্লামা আযরাকীর ছেলে, আবুত্ তোফায়েল থেকে বর্ণনা করেছেন। জাহেলিয়াতের যুগে এক পরী-জিন মক্কার জু-তওয়ায় বাস করত। তার একটি মাত্র ছেলে ছিল। সে ছেলেটিকে অত্যধিক ভালবাসত। ছেলেটি অত্যন্ত ভদ্র ছিল এবং বিয়ে করেছিল। বিয়ের ৭ম দিনে সে তার মাকে বলল, সে দিনে সাতচক্কর কা'বার তওয়াফ করতে চায়। মা বলল, হে বালক, আমি তোমার উপর কোরাইশ বংশের নির্বোধ লোকদের ক্ষতির আশংকা করছি। ছেলে বলল, ইনশাআল্লাহ, আমি নিরাপদ থাকবো। মা তাকে অনুমতি দিল। সে এক সাপের আকৃতিতে কা'বা শরীফে গেল, সাত চক্কর তওয়াফ করল এবং মাকামে ইবরাহীমের পেছনে নামাজ পড়ল। নামাজ শেষ হলে বনি সাহাম গোত্রের এক যুবক সাপটিকে হত্যা করে ফেলল। ফলে জিনদের সাথে বনি সাহাম গোত্রের যুদ্ধ শুরু হল এবং ধূলা-বালুতে মক্কার পাহাড়সমূহ দেখা গেল না। আবুড় তোফায়েল বলেন, কোন বড় জিনের মৃত্যুতেই কেবল এরকম ধুলা-বালি উড়তে পারে। বনি সাহام গোত্রের লোকেরা জিনদের তুলনায় বেশী মারা গেল এবং যুবকদের ছাড়াই কেবলমাত্র ৭০জন বয়স্ক লোক নিহত হল। ২.
দাইনুরী তাঁর 'মোজালাসা' বইতে লিখেছেন ইবনে এমরান বলেন: আমি একদিন ভোর রাত সোবহে সাদেকের আগে হাসান বসরীর মজলিশে গিয়ে দেখি মসজিদের দরজা বন্ধ। মসজিদের ভেতর ঢুকে দেখি, একজন লোক দোআ করছেন, অন্যরা তাঁর সাথে 'আমীন' বলছেন। আমি মসজিদের বাইরে বসে অপেক্ষা করলাম। মোয়াজ্জিন এসে আজান দিল এবং মসজিদের দরজা খুলল। আমি ভেতরে প্রবেশ করলাম। দেখি হাসান বসরী কেবলামুখী হয়ে একা বসে আছেন। আমি তাঁকে বললাম, আমি ভোর রাত্রে এসে দেখি, আপনি দোআ করছেন এবং একদল লোক আপনার সাথে 'আমীন' বলছে। তারপর প্রবেশ করে দেখি আপনি ছাড়া আর কেউ নেই। তিনি বলেন: তারা ছিল নাসীবীন এলাকার জিন। তারা প্রত্যেক জুমআর রাতে আমার সাথে খতমে কোরআনে অংশগ্রহণ করে এবং পরে চলে যায়। ১.
খতীব বাগদাদী মালেকের এক রেওয়ায়েতে জাবের থেকে বর্ণনা করেন। আমরা একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে চলার সময় একটি কাল কোবরা সাপকে নবী করীম (সঃ)-এর কানে নিজ মাথা এবং সাপের কানে নবী (সঃ) এর মুখ রাখতে দেখলাম। তিনি সাপটির সাথে গোপনে কথা বললেন। সাপটি যেন মাটি গিলল। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার জীবনের আশংকা করেছিলাম। তিনি বলেন: এ হচ্ছে জিনের এক প্রতিনিধি। তারা কোরআনের একটি সূরা ভুলে গিয়েছিল। আমি তাদের কাছে কোরআন পড়ে শুনালাম।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, খায়বার থেকে এক ব্যক্তি রওনা হল। অন্য দু'জন তাকে অনুসরণ করল। তৃতীয় আরেক ব্যক্তি ঐ দু'জনের পেছনে আসল এবং তাদেরকে থামতে বলল। তিনি ঐ দু'ব্যক্তিকে ফেরত পাঠালেন এবং প্রথম ব্যক্তির সাথে মিলিত হয়ে তাকে বললেনঃ ঐ দু'জন ছিল আপনার পেছনে লাগা শয়তান। আমি তাদেরকে দূর করে দিয়েছি। আপনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে গেলে তাঁকে আমার সালাম দেবেন এবং বলবেন, আমরা আমাদের যাকাত সংগ্রহ করছি। তিনি চাইলে আমরা যাকাত তাঁর কাছে পাঠাতে পারি। লোকটি মদীনায় এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সাক্ষাত করে ঘটনাটি বলেন। তখন তিনি একা চলতে নিষেধ করেন। (মুসনাদে আহমদ, বায়হাকী)
এ বর্ণনায় শয়তান দূরকারী ব্যক্তি হচ্ছে মোমেন জিন। ইবনু আবিদ দুনিয়া ওহাব বিন মোনাব্বেহ থেকে বর্ণনা করেন। তিনি প্রত্যেক হজ্জ মওসুমে মিনার মসজিদে খায়েফে হাসান বসরীর সাথে সাক্ষাত করেন। লোকেরা ঘুমিয়ে পড়েছে, চারদিকে শান্তভাব বিরাজ করছে। কিন্তু তাদের দু'জনের রয়েছে মজলিশের সাথী এবং তাঁরা তাঁদের সাথে কথা বলছেন। এক রাতে মজলিশে আলোচনার সময় ওহাবের পাশে একটি পাখী এসে পড়ল এবং সালাম দিল। ওহাব সালামের জবাব দেন। তিনি বুঝতে পারেন যে এটি জিন। পাখীটি ওহাবের কাছে এগিয়ে গিয়ে আলাপ করল। ওহাব জিজ্ঞেস করল আপনি কে? সে উত্তরে বলে আমি মুসলমান জিন। সে বলল, আপনার কি প্রয়োজন? সে বলে: আপনি কি আপনার মজলিশে আমাদের বসা এবং এলেম অর্জন করাকে অপছন্দ করেন? আমাদের মধ্যে আপনাদের কাছ থেকে এলেম সংগ্রহকারী বহু বর্ণনাকারী আছে। আমরা আপনাদের মজলিশ থেকে নামাজ, জেহাদ, রোগী দেখা, জানাযায় অংশগ্রহণ, হজ্জ এবং ওমরাহ সহ বহু বিষয়ে এলেম অর্জন করি এবং কোরআন শুনি। ওহাব জিজ্ঞেস করেন: আপনাদের কোন্ বর্ণনাকারীরা শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত? সে বলে ঐ শেখ অর্থাৎ হাসান বসরীর কাছ থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত বর্ণনাকারীগণ। হাসান ওহাবকে অবসর দেখে জিজ্ঞেস করেন, হে আবু আবদুল্লাহ, আপনি কার সাথে কথা বলছেন? তিনি বলেন: মজলিশের এক সাথীর সাথে। উভয়ে মজলিশ শেষে উঠে পড়লে হাসান আবারও ওহাবকে একই বিষয়ে প্রশ্ন করেন। ওহাব তাঁকে জিনের আগমন ও প্রশ্ন সম্পর্কে অবগত করান। ওহাব বলেন: প্রত্যেক বছর হজ্জের সময় এ জিনটির সাথে আমার দেখা হয়। সে আমাকে বিভিন্ন বিষয়ে, প্রশ্ন করে, আমি উত্তর দেই। একবার আমি তাকে তওয়াফের সময় দেখতে পাই। তওয়াফ শেষে সে এবং আমি মসজিদে হারামের এক প্রান্তে বসি। আমি তাকে বলি, আমার দিকে তোমার হাত বাড়াও। হাতের পাঞ্জা ছিল সদ্য প্রসূত ঘোড়ার বা গৃহপালিত গাধার বাচ্চার মত কচি এবং তাতে ছিল পশম। তারপর আমি তার কাঁধ পর্যন্ত হাত দিয়ে বাহু দেখি এবং হাত দিয়ে একটা খোঁচা মারি। তারপর কিছুক্ষণ পর্যন্ত কথা বলি। এবার সে বলে: আবু আবদুল্লাহ! আমি যেরূপ আপনাকে হাত দেখিয়েছি, সেরূপ আপনিও আমাকে আপনার হাত দেখান। আমি দু'হাত বাড়ালাম। সে আমার হাতে এমন জোরে চাপ দিল, যেন আমাকে ভীষণ কষ্ট দিতে চায়। তারপর হেসে দিল। আমি প্রত্যেক হজ্জে তার সাথে সাক্ষাত করি। তারপর আর তাকে পাইনি। আমি মনে করেছিলাম যে, হয়তো সে মরে গেছে। ওহাব জিনটিকে জিজ্ঞেস করেন, আপনাদের মধ্যে কোন জেহাদ উত্তম? সে বললঃ আমাদের নিজেদের মধ্যকার অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে জেহাদ।
ইমাম বায়হাকী এক সাহাবী থেকে বর্ণনা করেছেন। সাহাবী বলেন: আমি একবার এক অন্ধকার রাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে পথ চলছিলাম। তখন তিনি এক ব্যক্তিকে সূরা কাফিরুন পড়তে শুনে বললেন: এ ব্যক্তিটি শিরক থেকে মুক্ত। তারপর আমরা চলতে থাকলাম। এবার আমরা আরেক ব্যক্তিকে সূরা এখলাস পড়তে শুনলাম। তিনি বলেন: এ ব্যক্তি ক্ষমাপ্রাপ্ত। আমি সওয়ারী থামিয়ে ঐ ব্যক্তিদ্বয়কে দেখার জন্য ডানে ও বাঁয়ে তাকালাম কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলাম না।১ এর দ্বারা বুঝা যায় যে তারা ছিল জিন।
ইবনু জারীর সা'দ বিন হাবীব থেকে বর্ণনা করেছেন, যখন ইবরাহীম (আঃ) কা'বা শরীফ নির্মাণ শেষ করেন, তখন আল্লাহ তাঁর কাছে এ মর্মে অহী পাঠান যে, আপনি লোকদেরকে হজ্জের জন্য আহবান জানান। তিনি বের হলেন এবং আওয়াজ দিলেন। হে লোকেরা! তোমাদের রবের একটি ঘর তৈরি হয়েছে তোমরা এ ঘরকে কেন্দ্র করে হজ্জ কর। সেদিন এমন কোন মানুষ ও জিন ছিল না যে, এ আওয়াজ শুনে একথা বলেনি: লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাইব্বাইক।
ইবনু আকীল তাঁর, ফুনুন কিতাবে' লিখেছেন বাগদাদের জাফরিয়া এলাকায়, আমাদের একটি ঘর ছিল। কেউ সে' ঘরে বাস করলে মারা যেত। একবার মরক্কোর এক লোক ঘরটি ক্রয় করে রাত যাপন করে এবং সকালে নিরাপদ অবস্থায় জাগে। প্রতিবেশীরা তা দেখে আশ্চর্য হয়ে যায়। লোকটি বেশ কিছুদিন বাস করার পর সেখান থেকে সরে যান। তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আমি এক রাত্রে এশার নামাজ পড়ার পর কোরআন তেলাওয়াত করি। একটি যুবক কূপ বেয়ে উপরে উঠে আসল এবং আমাকে সালাম দিল। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। সে আমাকে অভয় দিয়ে বললঃ আমাকে কিছু কোরআন শিক্ষা দিন। আমি তাকে কোরআন শিক্ষা দেয়া শুরু করলাম। তারপর আমি তাকে এঘরের রহস্য সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম সে বললঃ আমরা মুসলমান জিন, কোরআন তেলাওয়াত করি এবং নামাজ পড়ি। এঘরটি কেবল পাপী ফাসেকরাই ভাড়া নিত। তারা সম্মিলিতভাবে মদপান করত। আমরা তাদেরকে গলা টিপে হত্যা করতাম। আমি বললাম আমি রাত্রে আপনাকে দেখে ভয় পাচ্ছি, আপনি দিনে আসুন। সে বললঃ ঠিক আছে। সে দিনে কূপ বেয়ে উপরে আসল। এবার আমি ভয় পেলাম না। তার কোরআন পাঠের সময় রাস্তায় একজন ঝাড় ফুঁক কারীর আওয়াজ শুনতে পেলাম। সে বলল: আমি চোখ লাগা, জিন এবং সাপ-বিচ্ছুর দংশনের জন্য ঝাড়-ফুঁক করি। যুবকটি বলল: একি আবু শিমা? আমি বললামঃ সে ঝাড়-ফুঁককারী, সে বলল: তাকে ডাকুন। আমি তখন ঐ ঝাড়-ফুঁককারীকে ভেতরে নিয়ে আসলাম। এমন সময় হঠাৎ করে জিনটি সাপ হয়ে ছাদে উঠে গেল। লোকটি ঝাড়-ফুঁক করল। সাপটি ছাদে ঝুলন্ত ছিল এবং সেখান থেকে ঘরের মাঝখানে পড়ে গেল। লোকটি সাপটিকে নিজ ব্যাগে ঢুকাতে চাইল। আমি নিষেধ করলাম। সে প্রশ্ন করল আপনি কি আমার শিকারে বাধা দিচ্ছেন? আমি তাকে একটি দীনার দিয়ে বিদায় করলাম। সাপটি এবার নড়াচড়া করল কিন্তু খুব দুর্বল ও ফ্যাকাশে রং ধারণ করল, এবং বেরিয়ে যেতে লাগল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কি হয়েছে? সে বলল, ঝাড়-ফুঁককারী আমাকে এসকল নাম দিয়ে হত্যা করেছে। আমি বাঁচবো বলে মনে হয় না। আপনি কূপে কোন আওয়াজ শুনলে মনে করবেন যে, আমি শেষ। লোকটি বললঃ আমি রাত্রে কূপে মৃত্যুর ঘোষণা শুনলাম। ইবনু আকীল বলেন: এরপর থেকে আর কেউ ঐ ঘরে বাস করেনি।
ইবনুস সাইরাফী আল হাররানী হাম্বলী তাঁর 'ফাওয়ায়েদ' গ্রন্থে লিখেছেন, তাঁর শেখ আবুল বাকা হাম্বলীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, জিনের পেছনে তাদের ইমামতিতে নামাজ পড়া জায়েয আছে কিনা। তিনি জবাবে বলেছেন: হ্যাঁ কেননা, শরীয়তের হুকুম তাদের জন্যও প্রযোজ্য এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাদের প্রতিও নবী হিসেবে পাঠানো হয়েছে।
জিনের সাথে নামাজের জামাআত অনুষ্ঠানের বিষয়ে ইবনু মাসউদ (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, মক্কার উঁচু স্থানে রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিনদের সাথে আলাপ করেন। ফজরের সময় তিনি ফিরে এসে আমার কাছে পানি চান। পানি নিয়ে অজু করে নামাজে দাঁড়ান। এ সময় (জিনদের) দু'ব্যক্তি থেকে যায় ও তাঁর পেছনে জামাআতে নামাজ পড়তে চায়। নবী (সঃ) তাদের ইমামতি করেন। (তাবরানী, আবু নাঈম)
বোখারী আবু সা'সা থেকে বর্ণনা করেন যে, আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) তাঁকে বলেন: আমি আপনাকে বকরী, দুম্বা এবং গ্রামীন জীবন ভালবাসতে দেখতে পাই। আপনি যখন আপনার বকরী পালে কিংবা গ্রামে থাকেন এবং নামাজের জন্য আজান দেন, তখন জোরে আজান দেবেন। কোন মানুষ, জিন ও জিনিস মোয়াজ্জিনের আজান শুনলে তারা এর পক্ষে কেয়ামতের দিন স্বাক্ষ্য দেবে। আবু সাঈদ বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) থেকে এরূপ কথা শুনেছি। (বোখারী- আজান অধ্যায়)
টিকাঃ
১. ঐ
১. ঐ
১. লাকতুল মারজান ফি আহকামিল জান- হাফেজ জালালুদ্দিন সুযুতী।।
২. ঐ
১. ঐ
১. দালায়েল আন-নবুআহ- বায়হাকী।
📄 নেক ও পাপের জন্য জিনের সওয়াব ও শাস্তি লাভ
ওলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে একমত যে, কাফের জিনদের জন্য পরকালে শাস্তি রয়েছে। আল্লাহ বলেছেন: قَالَ النَّارُ مَثْوَاكُمْ তিনি বলেন, দোজখই তোমাদের ঠিকানা।' -(সূরা আন 'আম ১২৮)
এখানে আল্লাহ কাফের জিনদেরকে লক্ষ্য করে একথা বলেছেন। وَأَمَّا الْقَاسِطُونَ فَكَانُوا لِجَهَنَّمَ حَطَبًا - তিনি আরো বলেন : 'আর পাপী জিনেরা জাহান্নামের ইন্ধন। (সূরা জিন-১৫) এ মর্মে আল্লাহ আরো বলেন: وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ وَلَهُمْ قُلُوبٌ لا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانُ لَا يَسْمَعُونَ بِهَا أُولَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُولَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ "আর আমরা সৃষ্টি করেছি দোজখের জন্য বহু জিন ও মানুষ। তাদের অন্তর রয়েছে, এর দ্বারা তা বুঝে না এবং চিন্তা ভাবনা করে না; তাদের চোখ রয়েছে, এর দ্বারা তারা দেখে না; আর তাদের কান রয়েছে, এর দ্বারা তারা শুনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং তাদের চাইতেও নিকৃষ্ট। তারাই হল উদাসীন এবং শৈথিল্যপরায়ণ। (সূরা আরাফ-১৭৯).
এ আয়াতে দোজখের জন্য বহু সংখ্যক জিন ও মানুষ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে।
এতো গেল কাফের জিনের কথা। মোমেন জিনের ব্যাপারে কয়েকটি মত রয়েছে।
(১) তাদের কোন সওয়াব নেই। শুধুমাত্র দোজখ থেকে মুক্তি পাবে। তারপর তাদেরকে বলা হবে তোমরা পশুদের ন্যায় মাটি হয়ে যাও। এটা হচ্ছে ইমাম আবু হানিফার মত। ইবনু হেজাম তা উল্লেখ করেছেন।
ইবনে আবিদ দুনিয়া মাইস বিন সালেম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, জিনদের সওয়াব হল দোজখ থেকে মুক্তি পাওয়া। তারপর তাদেরকে মাটি হয়ে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হবে।
ইবনু হোমাইদ, ইবনুল মোন্জের এবং ইবনু শাহীন তাঁর 'কিতাবুল আজায়ের ওয়ালগারায়েব'-এ আবুষ যেনাদ থেকে লিখেছেন যে, তিনি বলেছেন যখন বেহেশতবাসীরা বেহেশতের এবং দোজখবাসীরা দোজখে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ মোমেন জিন ও অন্যান্য সকল জাতিকে বলবেন: তোমরা মাটি হয়ে যাও তারা সবাই মাটি হয়ে যাবে। তখন কাফেরগণ বলবে يَالَيْتَنِي كُنْتُ تَرَابًا 'হায়, আমি যদি মাটি হয়ে যেতাম। (সূরা নাবা-৪০)
২. তাদেরকে নেক কাজের সওয়াব এবং পাপ কাজের আজাব দেয়া হবে। এটা হচ্ছে, ইবনু আবি লায়লা, মালেক, আওযাঈ, শাফেঈ, আহমদ, তাঁদের সাথীগণ ইমাম আবু হানিফা এবং তাঁর দুই সাথীর মত। ইবনু হাজম তাঁর 'আল- মেলাল ওয়ান নেহাল' গ্রন্থে লিখেছেন, অধিকাংশ লোকের মতে, তারা বেহেশতে প্রবেশ করবে।
ইবনু আবু হাতেম ইয়াকুব থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবনু আবি লায়লা বলেছেন, জিনেরা নেক কাজের সওয়াব পাবে। কোরআনের নিম্নোক্ত আয়াত একথার সত্যতা প্রমাণ করে। وَلِكُلِّ دَرَجَاتٌ مِّمَّا عَمِلُوا
"তারা যে যা আমল করেছে সে অনুযায়ী প্রত্যেকের জন্য মর্যাদা নির্ধারিত হবে।" -(সূরা আন'আম-১৩৩)
আবুশ শেখ তাঁর 'আজামা' গ্রন্থে খোযাইমা থেকে লিখেছেন, ইবনু ওহাবকে যখন জিনদের সওয়াব ও শাস্তির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হল, তখন আমি তা শুনছিলাম। তিনি জবাবে বলেন: আল্লাহ বলেছেন: وَحَقَّ عَلَيْهِمُ الْقَوْلُ فِي أُمَمٍ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِمْ مِّنَ الْجِنِّ والانس : إِنَّهُمْ كَانُوا خَاسِرِينَ .
"তাদের ব্যাপারেও শাস্তির আদেশ বাস্তবায়িত হল, যা বাস্তবায়িত হয়েছিল তাদের পূর্ববতী জিন ও মানুষের ব্যাপারে। নিশ্চয়ই তারা ক্ষতিগ্রস্ত।" -(সূরা হা-মীম সাজদাহ-২৫)
وَلِكُلِّ دَرَجَاتٍ مِّمَّا عَمِلُوا : অর্থাৎ প্রত্যেক কাজের
'প্রত্যেকের জন্য তাদের কর্মের আনুপাতিক মর্যাদা রয়েছে।' (সূরা আনআম-১৩০) ১ম আয়াতে মানুষ ও জিনের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা উল্লেখ আছে। গুনাহর শাস্তিই হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ। ২য় আয়াতে জিন ও মানুষের প্রত্যেকের আমলের মর্যাদার কথা উল্লেখ আছে। অর্থাৎ তারা সওয়াব লাভ করবে।
আবুশ শেখ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন। ৪ প্রকারের সৃষ্টি আছে। ১ম প্রকার, সৃষ্টির সকলেই বেহেশতে যাবে। ২য় প্রকার, সৃষ্টির সকলেই দোজখে যাবে। আর অন্য দু'প্রকার সৃষ্টি বেহেশত ও দোজখ উভয়টিতে যাবে। যাদের সকলেই বেহেশতে যাবে তারা হল, ফেরেশতা, যাদের সকলেই দোজখে যাবে তারা হল শয়তান আর যারা বেহেশত ও দোজখে যাবে তারা হল মানুষ ও জিন। তাদের জন্য রয়েছে সওয়াব ও শাস্তি।১. ইবনু আবু হাতেম ও আবুশ শেখ হাসান থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: জিনেরা হচ্ছে, ইবলিশের সন্তান আর মানুষ হচ্ছে, আদমের সন্তান। তাদের মধ্যে রয়েছে মোমেন মুসলমান।
টিকাঃ
১. লাকুতুল মারজান ফি আহকামিল জিন- জালালুদ্দিন সুযুতী।
📄 মোমেন জিনের বেহেশতে প্রবেশ
মোমেন জিনের বেহেশতে প্রবেশের বিষয়ে চারটি মত রয়েছে।
(১) তারা বেহেশতে যাবে। অধিকাংশ আলেমের মত তাই। ইবনে হাজম তাঁর 'আল মেলাল' গ্রন্থে আবু লায়লা ও আবু ইউসুফ এর বরাত দিয়ে একথা উল্লেখ করেছেন। মোমেন জিনদের বেহেশতে প্রবেশের পর পানাহার সম্পর্কে তাদের মতভেদ আছে।
ইবনু আবিদ দুনিয়া উল্লেখ করেছেন যে, মুজাহিদকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মোমেন জিনেরা কি বেহেশতে যাবে? তিনি বলেন, তারা বেহেশতে যাবে কিন্তু পানাহার করবে না। বেহেশতী মানুষ খানা-পিনার যে নেয়ামত ভোগ করবে, তারা তা করবে না। হারেস আল-মোহাসেবী বলেছেন, জিনেরা কেয়ামতের দিন বেহেশতে প্রবেশের পর আমরা তাদেরকে দেখবো, কিন্তু তারা আমাদেরকে দেখবে না। অর্থাৎ দুনিয়ার বিপরীত অবস্থা হবে।
(২) জিনেরা বেহেশতে প্রবেশ করবে না, বরং তারা বেহেশতের উপকণ্ঠে থাকবে। মানুষ তাদেরকে দেখবে, কিন্তু তারা মানুষদেরকে দেখবে না। এটা হচ্ছে, ইমাম মালেক, শাফেঈ, আহমদ, আবু ইউসুফ ও মোহাম্মদের মত। ইবনে তাইমিয়া ইবনে মোরাইর জবাবে একথা বলেন। এটা ইবনে হাজমের বর্ণনার বিপরীত। আবুশ শেখ বলেন: লাইস বিন আবু সলিম বলেছেন: মুসলমান জিনেরা না বেহেশতে, না দোজখে প্রবেশ করবে। আল্লাহ তাদের পিতা ইবলিশকে বেহেশত থেকে বের করে দিয়েছেন। তাই তাকে এবং তার সন্তানদেরকে আবারো বেহেশতে প্রবেশ করাবেন না।
(৩) জিনেরা আরাফে থাকবে। আবুশ শেখ এবং বায়হাকী তাঁর আল বায়ছ কিতাবে আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, মোমেন জিনদের জন্য সওয়াব ও শাস্তি উভয়টাই রয়েছে। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, তাদের সওয়াবের বিনিময় কি হবে? তিনি বলেন: তারা আরাফে যাবে, উম্মতে মোহাম্মদীর সাথে বেহেশতে যাবে না। আমরা জিজ্ঞেস করলাম আরাফ কি? তিনি উত্তরে বলেন: আরাফ হচ্ছে বেহেশতের দেয়াল যার নীচ দিয়ে ঝর্নাধারা প্রবাহিত হয় এবং তাতে গাছ ও ফল-ফলাদি উৎপন্ন হয়।
আল্লামা হাফেজ আজ-জাহাবী এটাকে মোনকার হাদীস বলেছেন।
(৪) জিনদের বেহেশতে যাওয়ার বিষয়ে চুপচাপ থাকা।
এখন আমরা ১ম মতের পক্ষের যুক্তিগুলো আলোচনা করবো।
১. বেহেশত লাভের যোগ্যতা সম্পর্কে বর্ণিত আয়াতগুলো এর প্রমাণ। وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ غَيْرَ بَعِيدٍ 'বেহেশতকে আল্লাহভীরুদের অদূরে উপস্থিত করা হবে।' (সূরা ক্বাফ ৩১)
আল্লাহ আরো বলেন: وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمُوتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ "তোমরা বেহেশতের দিকে ছুটে যাও যার সীমানা হচ্ছে আসমান ও যমীন, যা তৈরি করা হয়েছে মোত্তাকীদের জন্য।" (সূরা আলে-ইমরান-১৩৩)
রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন:
مَنْ شَهِدَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ خَالِصًا دَخَلَ الْجَنَّةَ.
'যে ব্যক্তি খালেস নিয়তে স্বাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই। সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' (বাজ্জার এবং জামে' আস-সুয়ূতী) আল্লাহ কোরআন মজীদে আরো বলেছেনঃ
وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ فَبِأَيِّ الْآءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ .
"যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সামনে হাজির হওয়ার ভয় করে তার জন্য রয়েছে দু'টো বাগান। অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের পালনকর্তার কোম্ কোন্ অবদানকে অস্বীকার করবে।" (সূরা আর রাহমান-৪৬-৪৭) এ আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ জিন ও মানুষ উভয়ন্ত্রক সম্বোধন করেছেন এবং তাদেরকে বিনিময় হিসেবে জান্নাত দানের কথা উল্লেখ করে বেহেশতের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে চেয়েছেন। তারা সত্যিকার ঈমান আনলে আল্লাহ তাদেরকে অনুগ্রহ দান করবেন বলে জানিয়েছেন। এক হাদীসে এসেছে নবী করীম (সঃ) সাহাবাদের কাছে এ সূরা পাঠ করে বলেন, জিনেরা তোমাদের তুলনায় উত্তম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। আমি যখনই তাদের কাছে সূরা আর-রাহমানের একটি আয়াত তেলাওয়াত করেছি তখনই তারা বলেছে,
وَلَا بِشَيْ مِنْ الْآئِكَ رَبَّنَا نُكَذِبَ .
'হে প্রভু, আমরা তোমার কোন নেয়ামতকেই অস্বীকার করিনা।' (তিরমিযী) (২) ইবনু হাজম নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা মোমেন জিনদের বেহেশতী হওয়ার প্রমাণ উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেন: أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ "মোমেনদের জন্য বেহেশত তৈরি করা হয়েছে।" -(সূরা আল ইমরান-১৩৩) জিনেরা ঈমান এনেছে মর্মে সূরা জিনের ১নং আয়াত অর্থাৎ তারা মোমেন হয়েছে। আর মোমেনদের জন্য পুরস্কার হল, এমন বেহেশত যার পাশ দিয়ে নদী প্রবাহিত হয়েছে। (সূরা বাইয়েনা ৭-৮) ইবনু হাজম বলেছেন: বেহেশতে প্রবেশের গুণ জিন ও মানুষ সবার জন্যই সমান। তাই দুই জাতির মধ্যে এক জাতিকে জান্নাত থেকে বাদ রাখা যায় না। আল্লাহ উভয় জাতির বিষয়ে বেহেশত সম্পর্কে একটি সাধারণ ঘোষণা দেয়ার পর পরবর্তীতে এ সম্পর্কে আর কোন বক্তব্য প্রদান না করে এক জাতিকে তা থেকে বঞ্চিত রাখবেন এ চিন্তা মোটেই করা যায় না। বরং এটা তাঁর ঘোষিত বর্ণনার পরিপন্থী। অর্থাৎ মোমেন হলে জিন হোক, আর মানুষ হোক-সবাই জান্নাতে যাবে।
(৩) মোনজের ও ইবনু আবি হাতেম নিজ নিজ তাফসীরে মোবাশ্বের বিন ইসমাইল থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আমরা হামজা বিন হাবিবের সাথে আলোচনার সময় জিজ্ঞেস করলাম, জিনেরা কি জান্নাতে যাবে? তিনি বলেন: 'হ্যাঁ। কোরআনের নিম্নোক্ত আয়াত এ বিষয়টির সত্যতা প্রমাণ করে,
وَلَمْ يَطْمِثْهُنَّ إِنْسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانَ .
'ইতিপূর্বে হুরদেরকে কোন মানুষ ও জিন স্পর্শ করেনি।' (সূরা আর রাহমান-৫৬)
এ আয়াতটি জিনের হুর স্পর্শ ও ব্যবহার করার প্রমাণ বহন করে। কেননা, কেবলমাত্র বেহেশতেই হুর ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। জিন বেহেশতী না হলে তাদের ব্যাপারে এ আয়াত কিভাবে প্রযোজ্য হবে?
(৪) আবুশ শেখ বলেছেন, ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত। সৃষ্টি ৪ প্রকার। এক প্রকারের সৃষ্টি সবাই বেহেশতে যাবে। আর এক প্রকারের সৃষ্টি সবাই দোজখে যাবে। অন্য এক প্রকারের সৃষ্টি বেহেশত ও দোজখে যাবে। যে সৃষ্টির সবাই বেহেশতে যাবে তারা হলেন ফেরেশতা। আর যে সৃষ্টির সবাই দোজখে যাবে তারা হল শয়তান। আর যে সৃষ্টি বেহেশত ও দোজখে যাবে তারা হল, মানুষ ও জিন। তাদের জন্য রয়েছে সওয়াব ও আজাব। ওলামায়ে কেরামের বিশুদ্ধ মত হল, ফেরেশতারা বেহেশত পাবে না, তবে তারা তাদের উপযোগী নেয়ামত লাভ করবে।
(৫) বিবেক বুদ্ধিও জিনদের বেহেশতে যাওয়ার ধারণাকে জোরদার করে। অবশ্য বিবেক বুদ্ধি কোন জিনিসকে জরুরী বা বাধ্যতামূলক করতে পারে না। সেটা একমাত্র আল্লাহর কাজ। বিবেকের দাবী হল আল্লাহ তাঁর নাফরমান বান্দাহদেরকে দোজখের অঙ্গীকার করেছেন। অথচ যে তাঁর আনুগত্য করবে সে কি করে বেহেশতে যাবে না? তিনি তো মহান ন্যায় বিচারক এবং সম্মানিত।
📄 বেহেশতে প্রবেশের পর জিনেরা কি আল্লাহকে দেখবে?
এজুদিন ইবনু আবদুস সালাম তাঁর 'আল কাওয়ায়েদ আস-সোগরা' বইতে লিখেছেন: মোমেন জিনেরা বেহেশতে প্রবেশ করলে আল্লাহকে দেখতে পাবে না। মানুষের মধ্যে যারা মোমেন কেবলমাত্র তারাই বেহেশতী হলে আল্লাহকে দেখতে পাবে। তিনি বলেছেন, ফেরেশতারা বেহেশতে আল্লাহকে দেখতে পাবেনা। তাই জিনদেরও আল্লাহকে দেখার কথা নয়।
এদিকে ইমাম বায়হাকী 'কিতাব-আর রুইয়াহ' বইতে 'আল্লাহকে দেখা' নামক অধ্যায়ে জিনেরা আল্লাহকে দেখতে পাবে এ বিষয়ের উপর জোর দিয়েছেন। অপরদিকে কাজী জালালুদ্দিন বালকিনী বলেছেন, সাধারণ প্রমাণাদির ভিত্তিতে বলা যায় যে, জিনেরা আল্লাহকে দেখবে। কিন্তু 'আসয়েলাতুস সাফা' বইতে উল্লেখ আছে যে হানাফী ইমামদের মতে জিনেরা আল্লাহকে দেখতে পাবে না।
এ আলোচনায় দেখা যায় যে, জিনদের আল্লাহকে দেখার বিষয়টি মতভেদপূর্ণ। শক্তিশালী মত হচ্ছে, জিনেরা বেহেশতে আল্লাহকে দেখবে। তবে মূল বিষয়টি আল্লাহর উপরই নির্ভরশীল।