📄 জিনের বিয়ে-শাদী
জিন জাতির মধ্যে বিয়ে শাদী প্রচলিত আছে। এর পক্ষে কোরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি উত্তম প্রমাণ। আল্লাহ বলেন:
افَتَتَّخِذُونَهُ وَذُرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِي وَهُمْ لَكُمْ عَدُوٌّ
'অতঃপর তোমরা কি আমার পরিবর্তে উহাকে (ইবলিশ) এবং তার বংশধরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করছ? অথচ তারা তোমাদের শত্রু।' (সূরা কাহফ-৫০)
ইবলিশ সম্পর্কে একই আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, 'সে ছিল জিন। আয়াতটির অর্থ হল 'যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বললাম: আদমকে সেজদা কর, তখন সবাই সেজদা করল- ইবলিশ ছাড়া। সে ছিল জিনদের একজন। সে তার পালনকর্তার আদেশ অমান্য করল।'
বংশধর ও সন্তান সন্তুতির জন্য জিনেরা বিয়ে-শাদী করে। ইবনু আবু হাতেম তাঁর নিজ গ্রন্থে এবং আবুশ শেখ তাঁর গ্রন্থ 'আজামা'য় কাতাদাহ থেকে বর্ণনা করেছেন, এই আয়াতে বর্ণিত ইবলিশের বংশধর ও সন্তান সন্তুতি দ্বারা বুঝা যায় যে, তারা মানব সন্তানের মতই জন্মগ্রহণ করে। বরং তাদের সংখ্যা অনেক বেশী।
ইবনু আবদুল বার, ইবনু জারীর, ইবনুল মোনজের ইবনু আবি হাতেম এবং হাকেম আবদুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ মোট ১০ ভাগ মানুষ ও জিন তৈরি করেছেন। তার মধ্যে ৯ ভাগ জিন আর এক ভাগ হচ্ছে মানুষ।
আল্লামা শাবী বলেন উল্লেখিত আয়াতটি জিনের বংশ বিস্তারের প্রমাণ। তিনি আরো বলেন, এক ব্যক্তি আমাকে ইবলিশের স্ত্রী আছে কিনা জিজ্ঞেস করল। তিনি বলেন, আমি তো ঐ কনে সম্পর্কে কিছু দেখতে পাইনি। তারপর আমার উপরোক্ত আয়াতটি স্মরণ হল। তখন আমি ভাবলাম যে, স্ত্রী ছাড়া সন্তান আসতে পারে না। তখন আমি বললাম যে, হাঁ, ইবলিশের স্ত্রী আছে। ১.
হাদীসের মধ্যে এসেছে, নবী (সঃ) পায়খানায় প্রবেশ করার সময় এ দোআ পড়তেন - اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُبِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ - 'হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে নারী ও পুরুষ শয়তান থেকে আশ্রয় চাই।' (বোখারী) ইবনু হাজার আসকালানী বলেছেন, এখানে 'খুবস' 'খাবীস' এর এবং 'খাবায়েস' 'খাবীসা-এর বহু বচন। খাবীস ও খাবীসাহ অর্থ হল, পুরুষ ও নারী শয়তান। নারী ও পুরুষ শয়তানের অস্তিত্বই তাদের মধ্যে বিয়ে শাদীর উত্তম প্রমাণ।
(ফাতহুল বারী ১ম খন্ড, ২৪২ পৃঃ)
কোরআন ও হাদীসে জিনের মৃত্যুর কথা প্রমাণিত। যদি তাদের বংশ বিস্তার না হয়, তাহলে মৃত্যুর কারণে জিনের অস্তিত্ব বিলোপ হয়ে যাবে। এ বিষয়টিও জিনের মধ্যে বিয়ে-শাদীর প্রমাণ বহন করে।
জিনের বিয়ে-শাদীর ব্যাপারে কোরআনের আরেকটি আয়াতকেও প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আয়াতটি হচ্ছে : لَمْ يَطْمِثْهَنَّ إِنْسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جان 'কোন মানুষ ও জিন ইতিপূর্বে তাদের (হুরদের) সাথে সহবাস করেনি।' আয়াতে বর্ণিত অ এর অর্থ হল, সহবাস করা কিংবা সতীত্বের পর্দা দূর করা। আয়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, জিনেরাও সহবাস করে কিংবা সতীত্বের পর্দা দূর করে। অবশ্য কেউ কেউ এই শব্দের অর্থ বলেছেন, স্পর্শ করা। এর দ্বারা তারা যে, বিয়ে শাদী করে তা স্পষ্ট বুঝা যায়।
ইমাম বায়হাকী তাঁর 'শোআবুল ঈমান' গ্রন্থে সাবেত থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ইবলিশ আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করল, হে রব! আপনি আদমকে তৈরি করে আমার সাথে তার শত্রুতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন; আমাকে তার উপর নিয়ন্ত্রণ শক্তি দান করুন। আল্লাহ বলেন: তাদের বুক হল তোর বাসস্থান। ইবলিশ বলল,
আরো বাড়ান। আল্লাহ বলেন, আদম সন্তান একজন জন্মগ্রহন করলে তোর সন্তান জন্মগ্রহন করবে ১০টি। তারপর ইবলিশ আরো বাড়ানোর প্রার্থনা জানায়। আল্লাহ বলেন :
وَاسْتَفْزِزْ مَنِ اسْتَطَعْتَ مِنْهُم بِصَوْتِكَ وَأَجْلِبْ عَلَيْهِم بِخَيْلِكَ وَرَجِلِكَ وَشَارِكْهُمْ فِى الْاَمْوَالِ وَالْاَوْلَادِ وَعِدْهُمْ وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَانُ إِلَّا غُرُوْرًا.
‘তুই তাদের মধ্য থেকে যাকে পারিস তাকে নিজ আওয়াজ দ্বারা এবং নিজ অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী দ্বারা আক্রমণ করে সত্যাস্ত কর, তাদের অর্থ সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে শরীক হয়ে যা এবং তাদেরকে (মিথ্যা) প্রতিশ্রুতি দে। ছলনা ছাড়া শয়তান তাদেরকে কোন প্রতিশ্রুতি দেয় না।
(সূরা বনি ইসরাইল-৬৪)
এ আয়াতে ইবলিশের অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনীর কথা উল্লেখ আছে। তারা তাদের সন্তান-সন্তুতি বা বংশধর। বিয়ে ছাড়া বংশধর হতে পারে না।
ইবনুল মুনজের শা’বী থেকে বর্ণনা করেছেন, তাঁকে প্রশ্ন করা হল, ইবলিসের স্ত্রী আছে কি? তিনি উত্তরে বলেন : এ ব্যাপারে আমি কিছু জানিনি।
কাজী আব্দুল জাব্বার বলেছেন : আয়াতে বর্ণিত “যুররিয়া” শব্দ দ্বারা সন্তান ও স্ত্রীকে বুঝানো হয়। তাদের সূক্ষ্মতা সূক্ষ্ম সন্তান উৎপাদনে পথে বাঁধা নয়। তিনি বলেন, আপনি কি এমন সূক্ষ্ম প্রাণী দেখেন না, যাকে গভীর পর্যবেক্ষণ বা অনুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া চোখে দেখা যায় না? কিন্তু তাদেরও বংশ আছে। আল্লাহর সৃষ্টিজগতে ক্ষুদ্রাতিসুক্ষ্ম প্রাণী রয়েছে। আল্লাহ বলেন : “তিনি পবিত্র যিনি যমীন থেকে উৎপন্ন উদ্ভিদ, মানুষ এবং যা তারা জানে না, তার প্রত্যেককে জোড়া জোড়া সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা ইয়াসিন-৩৬)
আল্লাহ জিন সহ অন্য যে কোন প্রাণীর বংশবৃদ্ধি এবং সৃষ্টি করতে সক্ষম।
সৃষ্টির জন্য তাঁর শুধু হুকুমই যথেষ্ট। এটাই তিনি কোরআন মজিদে বলেছেন-
إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُوْلَ لَهُ كُنْ فَيَكُوْنُ
“তিনি যখন কোন কিছু করার ইচ্ছা করেন, তখন তাকে কেবল বলে দেন ‘হও’ তখনই তা হয়ে যায়।” (সূরা ইয়াসিন-৮২)
টিকাঃ
১. মাকায়েশ শয়তান আবু বকর বিন দুনিয়া।
১. তাফসীর, আফওয়া-আল বায়ান-আল্লামা শাওকানী ৪র্থ খন্ড পৃঃ ১২২।
📄 জিনের মৃত্যু
জিনেরা মৃত্যু বরণ করে। এমর্মে আল্লাহ্ পবিত্র কোরআন মজীদে বলেছেন- أُولَئِكَ الَّذِينَ حَقَّ عَلَيْهِمُ الْقَوْلُ فِي أُمَمٍ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِمْ مِّنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ
"তাদের আগে যেসব জিন ও মানুষ গত হয়েছে, তাদের মধ্যে এ ধরনের লোকদের প্রতিও শাস্তিবাণী অবধারিত হয়ে গেছে।" (সূরা আহকাফ-১৮)
এ আয়াতে, মানুষ ও জিনের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। বর্ণিত আছে, এক সাহাবী এক সাপকে হত্যা করেছিলেন। সাপটি ছিল একটি জিন, সে বিষাক্ত সাপের আকৃতি ধারণ করেছিল।
আবুশ শেখ তাঁরা আজামাহ' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, এক ব্যক্তি ইবনে আব্বাসকে জিজ্ঞেস করল, জিনেরা কি মৃত্যু বরণ করে? তিনি বলেন, 'হাঁ, তবে ইবলিশ ব্যতীত। তারপর জিজ্ঞেস করল, জিন নামক সাপ সম্পর্কে আপনার মত কি? তিনি বলেন, 'তা হচ্ছে ছোট জিন'।
ইবনু শাহীন তাঁর 'গারায়েবুস সুনান' গ্রন্থে ইবনে আব্বাস থেকে উল্লেখ করেছেন, ইবলিশ যুগের আবর্তনে বৃদ্ধ হয়ে যায় তারপর আবার ৩০ বছরের যুবকে পরিণত হয়।
ইবনু আবিদ দুনিয়া আ'সেম আল-আহওয়াল থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি রবী' বিন আনাসকে জিজ্ঞেস করলাম, মানুষের সাথে মওজুদ শয়তানের মৃত্যু সম্পর্কে আপনার রায় কি?
তিনি বলেন, একজন মুসলমানের পেছনে একজন শয়তান লাগা থাকে। সে তাকে বিপদে ফেলার পর চালে যায়।
অর্থাৎ সর্বদাই একজন শয়তান সাথীর মত লাগা থাকে। কাজ শেষ হলে চলে যায়।
ইবনু আবিদ দুনিয়া নিজ গ্রন্থে এবং আবুশ শেখ তাঁর 'আজামাহ' গ্রন্থে আবদুল্লাহ বিন হারেস থেকে বর্ণনা করেছেন, 'জিনেরা মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু শয়তান মৃত্যু বরণ করে না।' অর্থাৎ ইবলিশ মরে না।
আল্লামা জুয়াইবার নিজ তাফসীরে দাহ্হাক থেকে এবং তিনি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, মৃত্যুর ফেরেশতাকে মানুষ ও ফেরেশতার রূহ হরন, জিনের রূহ হরণের জন্য এক ফেরেশতা, শয়তানের রূহ হরণের জন্য এক ফেরেশতা, পাখী, হিংস্র প্রাণী ও প্রাণীর রূহ হরণের জন্য এক ফেরেশতা এবং মাছের রূহ হরণের জন্য ৪ জন ফেরেশতাকে নিয়োজিত করা হয়েছে। অর্থাৎ জিন যে মরে, এ বক্তব্য তার প্রমাণ।
জিন যখন যে আকৃতি ধারণ করে তখন সে আকৃতিতে তাকে হত্যা করা সম্ভব। অনেকেই বিড়াল ও কাক, কুকুর ও সাপের আকৃতি ধারণকারী জিনকে হত্যা করেছে। জিন হত্যার কারণে বিভিন্ন সময় মানুষ ও জিনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। মক্কার বনি সাহাম গোত্রের সাথে একবার জিনের যুদ্ধ হয়েছিল। ১. ইবলিশ মরেনা, কিন্তু তার বংশধরগণ মরে।
টিকাঃ
১. আখবারে মক্কা আল-ফাকেহী
📄 জিনের ওপর শরীয়তের হুকুম প্রযোজ্য
মানুষের মত জিনের উপরও শরীয়তের হুকুম প্রযোজ্য। এজন্য তাদেরকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহী করতে হবে। অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম পালন করলে পুরস্কার পাবে এবং অমান্য করলে শাস্তি হবে। ইবনু আবদুল বার বলেছেন, নিম্নোক্ত দু'টো আয়াতে আল্লাহ মানুষের সাথে জিনদেরকেও সম্বোধন করেছেন। يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ . “হে জিন, ও মানুষ সম্প্রদায় তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন্ নেয়ামতটিকে অস্বীকার করবে?" ইমাম রাজী তাঁর তাফসীরে উল্লেখ করেছেন যে, সবাই এ বিষয় একমত যে, সকল জিনের উপর শরীয়তের পাবন্দী জরুরী।
কাজী আবদুল জাব্বার বলেছেন, জিনের জন্য শরীয়তের হুকুম প্রযোজ্য হওয়ার বিষয়ে চিন্তাবিদদের মধ্যে কোন মতভেদ আছে বলে আমরা জানি না। যারকান ও গাস্সান উল্লেখ করেছেন যে, জিনেরা নিজ নিজ কাজ করতে বাধ্য, তাদের উপর শরীয়তের হুকুম প্রযোজ্য নয়। পক্ষান্তরে যারা বলেন যে, জিনের জন্য শরীয়তের হুকুম প্রযোজ্য, তাদের প্রমাণ হচ্ছে পবিত্র কোরআন মজীদ শয়তানের মন্দ ও খারাপ কাজের নিন্দা করে অভিশাপের কথা ঘোষণা করেছে এবং তাদের জন্য প্রস্তুত আজাবের কথা জানিয়ে দিয়েছে। যারা আল্লাহর আদেশ-নিষেধ লংঘন করে, গুনাহ কবীরা করে এবং নিষিদ্ধ কাজ করে বেড়ায়, অথচ এগুলো না করার শক্তি ও এখতিয়ার রাখে, আল্লাহ কেবল তাদের জন্যই শাস্তি ও অভিশাপের কথা ঘোষণা করে থাকেন। এছাড়াও শয়তানকে অভিশাপ দেয়া তাদের অবস্থা বর্ণনা করা, মন্দ ও গুনাহর কাজের প্রতি তাদের আহবান ও ওয়াসওয়াসার বিষয়ে নবী (সঃ)-এর শরীয়তের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। এসব কিছুই জিনের জন্য শরীয়ত প্রযোজ্য হওয়ার প্রমাণ।
আরো প্রমাণ হল, আল্লাহ পবিত্র কোরআন মজীদে বলেছেন: قُلْ أُوحِيَ إِلَى أَنَّهُ اسْتَمَعَ نَفَر مِنَ الْجِنِّ فَقَالُوا إِنَّا سَمِعْنَا قرآنا عَجَبًا - يَهْدِى إِلَى الرَّشْدِ فَأَمَنَّا بِهِ ، وَلَنْ نُّشْرِكَ بِرَبِّنَا أَحَدًا .
“(হে নবী!) আপনি বলুন যে, একদল জিন কোরআন শুনেছে। অতঃপর তারা বলেছে, আমরা আশ্চর্যজনক কোরআন শুনেছি। যা সৎপথ দেখায়। ফলে, আমরা এর উপর ঈমান এনেছি, আমরা কখনও আমাদের প্রতিপালকের সাথে কাউকে শরীক করবো না।" (সূরা জিন : ১-২)
এ আয়াতে জিনদের হেদায়েত গ্রহণ এবং শিরক না করার অঙ্গীকার ব্যক্ত হয়েছে। শরীয়তের পাবন্দ না হলে তারা এরকম বলবে কেন?
হাদীসে আরো এসেছে, নবী করীম (সঃ) একবার হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদকে সাথে নিয়ে বের হন। বর্তমানে মক্কায় মসজিদে জিনের কাছে একটি দাগ দিয়ে তিনি তাঁকে সেখানে অপেক্ষা করতে বলেন। সেখানেই জিনেরা এসে তাঁর কাছে দীন শিক্ষা করেছে। তাদের জন্য শরীয়ত প্রযোজ্য না হলে তারা দীন শিখতে আসবে কেন?
আল্লামা, ইজুদিন্ন বিন জামাআ'হ 'বাদউল আমানী'র ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেছেন, শরীয়তের পাবন্দ লোক তিন প্রকার। ১ম প্রকার হচ্ছে, যাদেরকে সৃষ্টির ১ম দিন থেকেই নিশ্চিতভাবে শরীয়তের পাবন্দ বানানো হয়েছে। তারা হলেন, ফেরেশতা এবং আদম ও হাওয়া। ২য় প্রকার হচ্ছে, প্রথমেই শরীয়তের পাবন্দ বানানো হয় না বরং পরে অর্থাৎ বালেগ হলে বানানো হয়। তারা হল, আদম সন্তান। ৩য় প্রকার হল, মতভেদপূর্ণ। তবে এটা সুস্পষ্ট যে, তারা ১ম থেকেই শরীয়তের পাবন্দ। তারা হল জিন।
পরকালে, জিনের ভাল ও মন্দ কাজের হিসেব নেয়া হবে এবং তাদেরকে শাস্তি ও পুরস্কার দেয়া হবে। সেজন্যই জিনদের মধ্যে ভাল ও মুসলমান জিনের অস্তিত্ব রয়েছে। যারা মানুষের কোন ক্ষতি করে না। তারাই হচ্ছে নেক জিন।
ইবনে মোফলেহ হাম্বলী তাঁর কিতাবুল ফরু' গ্রন্থে লিখেছেন, জিনদের উপর শরীয়তের হুকুম প্রযোজ্য। তাদের মধ্যে মোমেন জিনেরা বেহেশতে এবং কাফের জিনেরা দোজখে যাবে। তারা পশুর মত মাটি হয়ে যাবে না। তারা তাদের সওয়াব ও গুনাহ অনুসারে পুরস্কার ও শান্তি পাবে।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন: 'জিন বিভিন্ন সীমারেখা এবং বাস্তব সত্যের ক্ষেত্রে মানুষের মত নয়। তাই আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ পালনের ক্ষেত্রে জিনেরা কখনও মানুষের সমান হতে পারে না। তবে তারাও শরীয়তের আদেশ নিষেধ এবং হালাল-হারামের অংশীদার। যেমন বিয়ে-শাদী ইত্যাদি। আমাদের কোন কোন সাথীর মতে, সকল বিষয়েই তারা মানুষের সমান। মুগনী কিতাবে উল্লেখ আছে, জিনের জন্য অসিয়ত করা জায়েয নেই। তারা কোন জিনিসের মালিক হতে পারে না। যেমন দান বা হেবা ইত্যাদি।
ইবনে হামেদ এবং আবুল বাকা বলেছেন মানুষের নামাজ সহীহ-শুদ্ধ হওয়ার জন্য যা শর্ত জিনের জন্যও তা শর্ত। ইবনু হামেদের বক্তব্য দ্বারা এটাও বুঝা যায় যে, মানুষের মত জিনের উপরও যাকাত ফরজ। তারা মানুষের মতই অজু, নামাজ, হজ্জ, যাকাত ও রোজার ক্ষেত্রে সমান।
অনুরূপভাবে জুলুম মানুষ এবং জিনের উভয়ের জন্যই হারাম। কেউ যেন কারো উপর জুলুম না করে। মহানবী (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ বলেন: يَا عِبَادِي إِنِّي حَرَّمْتُ الظُّلْمَ عَلَى نَفْسِي وَجَعَلْتُهُ بَيْنَكُمْ مُحَرَّمًا فَلَا تَظَالَمُوا .
"হে আমার বান্দাহগণ। আমি আমার নিজের উপর জুলুমকে হারাম করেছি, তোমাদের উপরও তাকে হারাম করলাম। তোমরা কেউ কারো উপর জুলুম করো না।” (মুসলিম ও আহমদ) কেউ জুলুম করলে সাধ্যমত সেই জুলুমের প্রতিরোধ করা জরুরী। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রঃ) ভুতে পাওয়া লোকের কাছে এসে তাকে ওয়াজ-নসীহত করতেন এবং সৎকাজের আদেশ করতেন ও মন্দ কাজ থেকে বারণের উপদেশ দিতেন। তাতেই যদি ভূত রোগীকে ছেড়ে চলে যেতে চায়, তিনি তার কাছ থেকে পুনরায় ফিরে না আসার অঙ্গীকার আদায় করতেন। আর ছেড়ে যেতে না চাইলে তাকে মার দিতেন যে পর্যন্ত না ভূত চলে যায়। মার বাহ্যতঃ মানুষের উপর পড়ে। কিন্তু আসলে তা ভূতের উপরই পড়ে। এজন্য সে ব্যথা পায় ও চীৎকার করে। হুঁশ ফিরে এলে ভুত রোগীকে বলে আমি মারের ব্যথা অনুভব করিনি। এটা আসলে মিথ্যা কথা।
আবুল মা'আলী বলেন জিনেরা। শরীয়তের পাবন্দ হওয়ায় তাদের কাছে মানুষের সতর ঢাকা ফরজ। যেহেতু তারা অপরিচিত লোক। কোন জিন কোন মৃত মানুষের গোসল দিলে মুর্দারের গোসলের ফরজ আদায় হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে নিজের জবেহ করা পশু-বিসমিল্লাহ বলে জবেহ করলে খাওয়াও জায়েয হবে। ১.
টিকাঃ
১. আকামুল মারজান-কাজী বদরুদ্দিন শিবলী।
📄 জিনদের বিভিন্ন দল ও আকীদা-বিশ্বাস এবং ইবাদত
প্রখ্যাত তাফসীরকার মুজাহিদ বলেছেন, সূরা জিনের ১১নং আয়াতে كنا طَرَائِقَ قِرَدًا “আমরা জিনেরা বিভিন্ন মত ও পথের অনুসারী ছিলাম” আয়াতের অর্থ হল, তারা মোমেন, আহলে সুন্নাত, কাফের ও বেদআতপন্থী ছিল। ইমাম আহমদ তাঁর 'আন-নাসেখ আল-মানসুখ' কিতাব এবং আবুশ শেখ তাঁর 'আল-জাজামাহ' কিতাবে লিখেছেন, জিনদের মধ্যে কাদরিয়াহ মোরজেআহ, রাফেজী, শিয়া এবং ইহুদী খৃস্টানও আছে। আল্লাহ জিনদের জবানীতে বলেছেন, وَانَّا مِنَّا الْمُسْلِمُونَ وَمِنَّا الْقَاسِطُونَ ، فَمَنْ أَسْلَمَ فَأَوْلَئِكَ تَحَرَّوْا رَشَدًا ، وَأَمَّا الْقَاسِطُونَ فَكَانُوا لِجَهَنَّمَ حَطَبًا .
"আমাদের মধ্যে মুসলমান আছে, আর আছে জালেম। যারা মুসলমান হয়েছে, তারাই সত্যের সন্ধান পেয়েছে। আর যারা জালেম, তারা হবে জাহান্নামের ইন্ধন।” (সূরা জিন: ১৪-১৫)
হাতেব বিন আবি বালতাআর বর্ণিত হাদীসে মহানবী (সঃ) বলেছেন, নিহত জিনটি হচ্ছে আমর বিন জাওমানা যাকে মোহসেন বিন জাওশান নামক খ্রিস্টান জিন হত্যা করেছে।
আবু নসর আশ শে'রী 'এবানা' গ্রন্থে হাম্মাদ বিন শোআইব থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি জিনের সাথে আলোচনাকারী এক ব্যক্তির বরাত দিয়ে লিখেছেন। জিনেরা তাকে বলেছে, আমাদের মধ্যে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অনুসারী কোন ব্যক্তি নেই।
জিনদের ইবাদত সম্পর্কে বহু বর্ণনা এবং প্রমাণ আছে। ইবনু আবিদ দুনিয়া উল্লেখ করেছেন যে, সাফওয়ান বিন মোহরেজ আল মাজেনী রাত্রে যখন তাহাজ্জুদের নামাজের জন্য দাঁড়াতেন, তাঁর সাথে তাঁর ঘরের বাসিন্দা জিনেরাও নামাজে দাঁড়িয়ে যেত। তারা জামাতে নামাজ পড়ত এবং কোরআন তেলাওয়াত শুনত। বর্ণনাকারী সেররী অপর বর্ণনাকারী ইয়াযীদকে প্রশ্ন করেন, তিনি কিভাবে তাদের উপস্থিতি টের পেতেন? ইয়াযীদ বলেন, তিনি নামাজে দাঁড়ালে তাদের শব্দ ও আওয়াজ শুনতেন এবং ভয় পেয়ে যেতেন। তাঁকে আওয়াজ দিয়ে বলা হল, হে আবদাল্লাহ, ভয় পাবেন না, আমরা আপনার ভাই, আপনার সাথে তাহাজ্জুদের নামাজে শরীক হই। আপনি আপনার নামাজ পড়ুন। এরপর থেকে তিনি তাদের নড়াচড়ার ভয় থেকে নিরাপদ হয়ে যান।১.
মুআ'জ বিন জাবাল থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তোমাদের কেউ রাত্রে নামাজ পড়লে সে যেন প্রকাশ্যে কেরাত পড়ে। ফেরেশতারা তার সাথে নামাজে শরীক হয় এবং কেরাত শুনে। অনুরূপভাবে বাতাসে বিচরণকারী জিন এবং তার নিজ ঘরে বসবাসকারী মোমেন জিনেরাও তার সাথে নামাজ পড়ে এবং কোরআনের কেরাত শুনে। কোরআনের কেরাত তার নিজ ঘর ও পার্শ্ববর্তী ঘরসমূহের ফাসেক ও আল্লাহদ্রোহী জিনগুলোকে তাড়িয়ে দেয়। (বাজ্জার)
ইবনুস সালাহকে এক ব্যক্তির নিম্নোক্ত প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হল : শয়তান কি কোরআন এবং নিজ বাহিনী নিয়ে নামাজ পড়তে পারে? তিনি জবাব দেন : বর্ণিত রেওয়াতের বাহ্যিক অর্থ অনুসারে বাস্তবে তাদের কোরআন পড়া প্রমাণিত নয়। তাই নামাজ পড়াও সম্ভব নয়। কেননা, নামাজে কোরআন পড়তে হয়। বর্ণিত আছে যে, ফেরেশতাদেরকে কোরআন তেলাওয়াত করার মর্যাদা দেয়া হয়নি। তাই তারা সর্বদা মানুষের কাছে কোরআন শুনতে আগ্রহী। ফলে, কোরআন এমন এক সম্মানের বিষয় যা দ্বারা আল্লাহ শুধু মানুষকেই সম্মানিত করেছেন। তবে মোমেন জিনেরা কোরআন পড়ে বলে আমরা জানতে পেরেছি।
আল্লামা সুফিয়ান সাওরী নিজ তাফসীরে সাঈদ বিন জোবায়ের থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, জিনেরা নবী (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করল, আমরা কি দূর থেকে এসে আপনার সাথে মসজিদে নামাজ পড়তে পারি? এ প্রশ্নের উত্তরে কোরআনের এ আয়াতটি নাজিল হয়: وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعَوْا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا .
"মসজিদসমূহ কেবল আল্লাহর জন্য, আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ডেকো না।” (সূরা জিন-১৮)
আবুজ যোবায়ের থেকে বর্ণিত। একবার আবদুল্লাহ বিন সাফওয়ান কা'বা শরীফের নিকটে বসা ছিলেন। তখন বাবে ইরাকী দিয়ে একটি সাপ ঢুকল এবং কা'বা শরীফের চারদিকে সাত চক্কর তওয়াফ করল। তারপর হাজারে আসওয়াদের কাছে এসে তাকে চুমু দিল। আবদুল্লাহ বিন সাফওয়ান সাপটিকে দেখে বলল, হে জিন! তুমি ওমরাহ শেষ করেছ। আমাদের আশংকা হয় যে, বালকেরা তোমার ক্ষতি করতে পারে। তুমি চলে যাও। সাপটি যে পথ দিয়ে এসেছিল সে পথ ধরে চলে গেল। ১.
তালাক বিন হাবিব থেকে বর্ণিত। আমরা আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস সহ কা'বা শরীফের পাশে বসা ছিলাম। কা'বার ছায়া ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়ে আসল এবং মজলিশ সমূহ বসল। বাবে বনি শায়বা দিয়ে একটি পুরুষ সাপ ঢুকল। সাপটি নিজ গর্দান লম্বা করে এবং মাথা উঁচু করে দেখল। তার চোখ ছিল মানুষের মত। সে কা'বা শরীফের সাত চক্কর তওয়াফ করল এবং মাকামে ইবরাহীমের পেছনে দু'রাকাত নামাজ পড়ল। আমরা তার কাছে গেলাম এবং বললাম: হে ওমরাহকারী। আল্লাহ তোমার ওমরাহ পূর্ণ করেছেন। আমাদের এ জায়গায় কিছু বোকা কাল বালক আছে। আমাদের আশংকা তারা তোমার কোন ক্ষতি করতে পারে। সাপটি মাথা ও লেজ দিয়ে একটি কুণ্ডলী পাকাল এবং আকাশে এতদূরে অদৃশ্য হয়ে গেল যে, আমরা তাকে আর দেখতে পেলাম না। ১
আল্লামা আযরাকীর ছেলে, আবুত্ তোফায়েল থেকে বর্ণনা করেছেন। জাহেলিয়াতের যুগে এক পরী-জিন মক্কার জু-তওয়ায় বাস করত। তার একটি মাত্র ছেলে ছিল। সে ছেলেটিকে অত্যধিক ভালবাসত। ছেলেটি অত্যন্ত ভদ্র ছিল এবং বিয়ে করেছিল। বিয়ের ৭ম দিনে সে তার মাকে বলল, সে দিনে সাতচক্কর কা'বার তওয়াফ করতে চায়। মা বলল, হে বালক, আমি তোমার উপর কোরাইশ বংশের নির্বোধ লোকদের ক্ষতির আশংকা করছি। ছেলে বলল, ইনশাআল্লাহ, আমি নিরাপদ থাকবো। মা তাকে অনুমতি দিল। সে এক সাপের আকৃতিতে কা'বা শরীফে গেল, সাত চক্কর তওয়াফ করল এবং মাকামে ইবরাহীমের পেছনে নামাজ পড়ল। নামাজ শেষ হলে বনি সাহাম গোত্রের এক যুবক সাপটিকে হত্যা করে ফেলল। ফলে জিনদের সাথে বনি সাহাম গোত্রের যুদ্ধ শুরু হল এবং ধূলা-বালুতে মক্কার পাহাড়সমূহ দেখা গেল না। আবুড় তোফায়েল বলেন, কোন বড় জিনের মৃত্যুতেই কেবল এরকম ধুলা-বালি উড়তে পারে। বনি সাহام গোত্রের লোকেরা জিনদের তুলনায় বেশী মারা গেল এবং যুবকদের ছাড়াই কেবলমাত্র ৭০জন বয়স্ক লোক নিহত হল। ২.
দাইনুরী তাঁর 'মোজালাসা' বইতে লিখেছেন ইবনে এমরান বলেন: আমি একদিন ভোর রাত সোবহে সাদেকের আগে হাসান বসরীর মজলিশে গিয়ে দেখি মসজিদের দরজা বন্ধ। মসজিদের ভেতর ঢুকে দেখি, একজন লোক দোআ করছেন, অন্যরা তাঁর সাথে 'আমীন' বলছেন। আমি মসজিদের বাইরে বসে অপেক্ষা করলাম। মোয়াজ্জিন এসে আজান দিল এবং মসজিদের দরজা খুলল। আমি ভেতরে প্রবেশ করলাম। দেখি হাসান বসরী কেবলামুখী হয়ে একা বসে আছেন। আমি তাঁকে বললাম, আমি ভোর রাত্রে এসে দেখি, আপনি দোআ করছেন এবং একদল লোক আপনার সাথে 'আমীন' বলছে। তারপর প্রবেশ করে দেখি আপনি ছাড়া আর কেউ নেই। তিনি বলেন: তারা ছিল নাসীবীন এলাকার জিন। তারা প্রত্যেক জুমআর রাতে আমার সাথে খতমে কোরআনে অংশগ্রহণ করে এবং পরে চলে যায়। ১.
খতীব বাগদাদী মালেকের এক রেওয়ায়েতে জাবের থেকে বর্ণনা করেন। আমরা একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে চলার সময় একটি কাল কোবরা সাপকে নবী করীম (সঃ)-এর কানে নিজ মাথা এবং সাপের কানে নবী (সঃ) এর মুখ রাখতে দেখলাম। তিনি সাপটির সাথে গোপনে কথা বললেন। সাপটি যেন মাটি গিলল। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার জীবনের আশংকা করেছিলাম। তিনি বলেন: এ হচ্ছে জিনের এক প্রতিনিধি। তারা কোরআনের একটি সূরা ভুলে গিয়েছিল। আমি তাদের কাছে কোরআন পড়ে শুনালাম।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, খায়বার থেকে এক ব্যক্তি রওনা হল। অন্য দু'জন তাকে অনুসরণ করল। তৃতীয় আরেক ব্যক্তি ঐ দু'জনের পেছনে আসল এবং তাদেরকে থামতে বলল। তিনি ঐ দু'ব্যক্তিকে ফেরত পাঠালেন এবং প্রথম ব্যক্তির সাথে মিলিত হয়ে তাকে বললেনঃ ঐ দু'জন ছিল আপনার পেছনে লাগা শয়তান। আমি তাদেরকে দূর করে দিয়েছি। আপনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে গেলে তাঁকে আমার সালাম দেবেন এবং বলবেন, আমরা আমাদের যাকাত সংগ্রহ করছি। তিনি চাইলে আমরা যাকাত তাঁর কাছে পাঠাতে পারি। লোকটি মদীনায় এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সাক্ষাত করে ঘটনাটি বলেন। তখন তিনি একা চলতে নিষেধ করেন। (মুসনাদে আহমদ, বায়হাকী)
এ বর্ণনায় শয়তান দূরকারী ব্যক্তি হচ্ছে মোমেন জিন। ইবনু আবিদ দুনিয়া ওহাব বিন মোনাব্বেহ থেকে বর্ণনা করেন। তিনি প্রত্যেক হজ্জ মওসুমে মিনার মসজিদে খায়েফে হাসান বসরীর সাথে সাক্ষাত করেন। লোকেরা ঘুমিয়ে পড়েছে, চারদিকে শান্তভাব বিরাজ করছে। কিন্তু তাদের দু'জনের রয়েছে মজলিশের সাথী এবং তাঁরা তাঁদের সাথে কথা বলছেন। এক রাতে মজলিশে আলোচনার সময় ওহাবের পাশে একটি পাখী এসে পড়ল এবং সালাম দিল। ওহাব সালামের জবাব দেন। তিনি বুঝতে পারেন যে এটি জিন। পাখীটি ওহাবের কাছে এগিয়ে গিয়ে আলাপ করল। ওহাব জিজ্ঞেস করল আপনি কে? সে উত্তরে বলে আমি মুসলমান জিন। সে বলল, আপনার কি প্রয়োজন? সে বলে: আপনি কি আপনার মজলিশে আমাদের বসা এবং এলেম অর্জন করাকে অপছন্দ করেন? আমাদের মধ্যে আপনাদের কাছ থেকে এলেম সংগ্রহকারী বহু বর্ণনাকারী আছে। আমরা আপনাদের মজলিশ থেকে নামাজ, জেহাদ, রোগী দেখা, জানাযায় অংশগ্রহণ, হজ্জ এবং ওমরাহ সহ বহু বিষয়ে এলেম অর্জন করি এবং কোরআন শুনি। ওহাব জিজ্ঞেস করেন: আপনাদের কোন্ বর্ণনাকারীরা শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত? সে বলে ঐ শেখ অর্থাৎ হাসান বসরীর কাছ থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত বর্ণনাকারীগণ। হাসান ওহাবকে অবসর দেখে জিজ্ঞেস করেন, হে আবু আবদুল্লাহ, আপনি কার সাথে কথা বলছেন? তিনি বলেন: মজলিশের এক সাথীর সাথে। উভয়ে মজলিশ শেষে উঠে পড়লে হাসান আবারও ওহাবকে একই বিষয়ে প্রশ্ন করেন। ওহাব তাঁকে জিনের আগমন ও প্রশ্ন সম্পর্কে অবগত করান। ওহাব বলেন: প্রত্যেক বছর হজ্জের সময় এ জিনটির সাথে আমার দেখা হয়। সে আমাকে বিভিন্ন বিষয়ে, প্রশ্ন করে, আমি উত্তর দেই। একবার আমি তাকে তওয়াফের সময় দেখতে পাই। তওয়াফ শেষে সে এবং আমি মসজিদে হারামের এক প্রান্তে বসি। আমি তাকে বলি, আমার দিকে তোমার হাত বাড়াও। হাতের পাঞ্জা ছিল সদ্য প্রসূত ঘোড়ার বা গৃহপালিত গাধার বাচ্চার মত কচি এবং তাতে ছিল পশম। তারপর আমি তার কাঁধ পর্যন্ত হাত দিয়ে বাহু দেখি এবং হাত দিয়ে একটা খোঁচা মারি। তারপর কিছুক্ষণ পর্যন্ত কথা বলি। এবার সে বলে: আবু আবদুল্লাহ! আমি যেরূপ আপনাকে হাত দেখিয়েছি, সেরূপ আপনিও আমাকে আপনার হাত দেখান। আমি দু'হাত বাড়ালাম। সে আমার হাতে এমন জোরে চাপ দিল, যেন আমাকে ভীষণ কষ্ট দিতে চায়। তারপর হেসে দিল। আমি প্রত্যেক হজ্জে তার সাথে সাক্ষাত করি। তারপর আর তাকে পাইনি। আমি মনে করেছিলাম যে, হয়তো সে মরে গেছে। ওহাব জিনটিকে জিজ্ঞেস করেন, আপনাদের মধ্যে কোন জেহাদ উত্তম? সে বললঃ আমাদের নিজেদের মধ্যকার অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে জেহাদ।
ইমাম বায়হাকী এক সাহাবী থেকে বর্ণনা করেছেন। সাহাবী বলেন: আমি একবার এক অন্ধকার রাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে পথ চলছিলাম। তখন তিনি এক ব্যক্তিকে সূরা কাফিরুন পড়তে শুনে বললেন: এ ব্যক্তিটি শিরক থেকে মুক্ত। তারপর আমরা চলতে থাকলাম। এবার আমরা আরেক ব্যক্তিকে সূরা এখলাস পড়তে শুনলাম। তিনি বলেন: এ ব্যক্তি ক্ষমাপ্রাপ্ত। আমি সওয়ারী থামিয়ে ঐ ব্যক্তিদ্বয়কে দেখার জন্য ডানে ও বাঁয়ে তাকালাম কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলাম না।১ এর দ্বারা বুঝা যায় যে তারা ছিল জিন।
ইবনু জারীর সা'দ বিন হাবীব থেকে বর্ণনা করেছেন, যখন ইবরাহীম (আঃ) কা'বা শরীফ নির্মাণ শেষ করেন, তখন আল্লাহ তাঁর কাছে এ মর্মে অহী পাঠান যে, আপনি লোকদেরকে হজ্জের জন্য আহবান জানান। তিনি বের হলেন এবং আওয়াজ দিলেন। হে লোকেরা! তোমাদের রবের একটি ঘর তৈরি হয়েছে তোমরা এ ঘরকে কেন্দ্র করে হজ্জ কর। সেদিন এমন কোন মানুষ ও জিন ছিল না যে, এ আওয়াজ শুনে একথা বলেনি: লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাইব্বাইক।
ইবনু আকীল তাঁর, ফুনুন কিতাবে' লিখেছেন বাগদাদের জাফরিয়া এলাকায়, আমাদের একটি ঘর ছিল। কেউ সে' ঘরে বাস করলে মারা যেত। একবার মরক্কোর এক লোক ঘরটি ক্রয় করে রাত যাপন করে এবং সকালে নিরাপদ অবস্থায় জাগে। প্রতিবেশীরা তা দেখে আশ্চর্য হয়ে যায়। লোকটি বেশ কিছুদিন বাস করার পর সেখান থেকে সরে যান। তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আমি এক রাত্রে এশার নামাজ পড়ার পর কোরআন তেলাওয়াত করি। একটি যুবক কূপ বেয়ে উপরে উঠে আসল এবং আমাকে সালাম দিল। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। সে আমাকে অভয় দিয়ে বললঃ আমাকে কিছু কোরআন শিক্ষা দিন। আমি তাকে কোরআন শিক্ষা দেয়া শুরু করলাম। তারপর আমি তাকে এঘরের রহস্য সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম সে বললঃ আমরা মুসলমান জিন, কোরআন তেলাওয়াত করি এবং নামাজ পড়ি। এঘরটি কেবল পাপী ফাসেকরাই ভাড়া নিত। তারা সম্মিলিতভাবে মদপান করত। আমরা তাদেরকে গলা টিপে হত্যা করতাম। আমি বললাম আমি রাত্রে আপনাকে দেখে ভয় পাচ্ছি, আপনি দিনে আসুন। সে বললঃ ঠিক আছে। সে দিনে কূপ বেয়ে উপরে আসল। এবার আমি ভয় পেলাম না। তার কোরআন পাঠের সময় রাস্তায় একজন ঝাড় ফুঁক কারীর আওয়াজ শুনতে পেলাম। সে বলল: আমি চোখ লাগা, জিন এবং সাপ-বিচ্ছুর দংশনের জন্য ঝাড়-ফুঁক করি। যুবকটি বলল: একি আবু শিমা? আমি বললামঃ সে ঝাড়-ফুঁককারী, সে বলল: তাকে ডাকুন। আমি তখন ঐ ঝাড়-ফুঁককারীকে ভেতরে নিয়ে আসলাম। এমন সময় হঠাৎ করে জিনটি সাপ হয়ে ছাদে উঠে গেল। লোকটি ঝাড়-ফুঁক করল। সাপটি ছাদে ঝুলন্ত ছিল এবং সেখান থেকে ঘরের মাঝখানে পড়ে গেল। লোকটি সাপটিকে নিজ ব্যাগে ঢুকাতে চাইল। আমি নিষেধ করলাম। সে প্রশ্ন করল আপনি কি আমার শিকারে বাধা দিচ্ছেন? আমি তাকে একটি দীনার দিয়ে বিদায় করলাম। সাপটি এবার নড়াচড়া করল কিন্তু খুব দুর্বল ও ফ্যাকাশে রং ধারণ করল, এবং বেরিয়ে যেতে লাগল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কি হয়েছে? সে বলল, ঝাড়-ফুঁককারী আমাকে এসকল নাম দিয়ে হত্যা করেছে। আমি বাঁচবো বলে মনে হয় না। আপনি কূপে কোন আওয়াজ শুনলে মনে করবেন যে, আমি শেষ। লোকটি বললঃ আমি রাত্রে কূপে মৃত্যুর ঘোষণা শুনলাম। ইবনু আকীল বলেন: এরপর থেকে আর কেউ ঐ ঘরে বাস করেনি।
ইবনুস সাইরাফী আল হাররানী হাম্বলী তাঁর 'ফাওয়ায়েদ' গ্রন্থে লিখেছেন, তাঁর শেখ আবুল বাকা হাম্বলীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, জিনের পেছনে তাদের ইমামতিতে নামাজ পড়া জায়েয আছে কিনা। তিনি জবাবে বলেছেন: হ্যাঁ কেননা, শরীয়তের হুকুম তাদের জন্যও প্রযোজ্য এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাদের প্রতিও নবী হিসেবে পাঠানো হয়েছে।
জিনের সাথে নামাজের জামাআত অনুষ্ঠানের বিষয়ে ইবনু মাসউদ (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, মক্কার উঁচু স্থানে রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিনদের সাথে আলাপ করেন। ফজরের সময় তিনি ফিরে এসে আমার কাছে পানি চান। পানি নিয়ে অজু করে নামাজে দাঁড়ান। এ সময় (জিনদের) দু'ব্যক্তি থেকে যায় ও তাঁর পেছনে জামাআতে নামাজ পড়তে চায়। নবী (সঃ) তাদের ইমামতি করেন। (তাবরানী, আবু নাঈম)
বোখারী আবু সা'সা থেকে বর্ণনা করেন যে, আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) তাঁকে বলেন: আমি আপনাকে বকরী, দুম্বা এবং গ্রামীন জীবন ভালবাসতে দেখতে পাই। আপনি যখন আপনার বকরী পালে কিংবা গ্রামে থাকেন এবং নামাজের জন্য আজান দেন, তখন জোরে আজান দেবেন। কোন মানুষ, জিন ও জিনিস মোয়াজ্জিনের আজান শুনলে তারা এর পক্ষে কেয়ামতের দিন স্বাক্ষ্য দেবে। আবু সাঈদ বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) থেকে এরূপ কথা শুনেছি। (বোখারী- আজান অধ্যায়)
টিকাঃ
১. ঐ
১. ঐ
১. লাকতুল মারজান ফি আহকামিল জান- হাফেজ জালালুদ্দিন সুযুতী।।
২. ঐ
১. ঐ
১. দালায়েল আন-নবুআহ- বায়হাকী।