📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 জিন সৃষ্টির উপাদান

📄 জিন সৃষ্টির উপাদান


আল্লাহ জিন সৃষ্টির মূল উপাদান সম্পর্কে বলেছেন: وَالْجَانَّ خَلَقْنَاهُ مِنْ قَبْلُ مِنْ نَّارِ السَّمَومِ .
“এবং জিনকে আগে লু-এর আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছি।" -(সূরা হিজর-২৭) সামূম (লু) দ্বারা, আগুনের কঠোরতা বুঝানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন- وَخَلَقَ الْجَانَّ مِّنْ مَّارِجٍ مِّنْ نَّارٍ .
"তিনি জিনকে অগ্নিশিখা থেকে সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা আর-রাহমান-১৫) আল্লাহ ইবলিশের বক্তব্য প্রকাশ করে বলেন: خَلَقْتَنِي مِنْ نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ .
"আপনি আমাকে আগুন থেকে এবং তাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন।" -(সূরা আরাফ-১২)
আবুল ওয়াফা বিন আকীল তাঁর আলফুনুন বইতে লিখেছেন, এক ব্যক্তি জিন সম্পর্কে জানতে চাইল এবং বলল, আল্লাহ বলেছেন, তিনি তাদেরকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং আরো বলেছেন যে, অগ্নিশিখা তাদের ক্ষতি করে ও জ্বালিয়ে দেয়। প্রশ্ন হল, আগুন কি করে আগুনকে জ্বালিয়ে দেয়? এ প্রশ্নের জবাব হল, আল্লাহ শয়তান এবং জিনকে আগুনের প্রতি সম্বোধন করেছেন। যেমন তিনি মানুষকে মাটি, কাদা ও শক্ত মাটির প্রতি সম্বোধন করেছেন। এর অর্থ এ নয় যে, মানুষ বাস্তবে মাটি কিন্তু তার আসল উপাদান হল মাটি। তেমনি জিনের আসল উপাদান আগুন। যদি সে কেবলমাত্র আগুনই হয়, তাহলে নবী (সঃ) শয়তানকে নামাজে গলাটিপে ধরায় তার জিহবার আর্দ্রতা কিভাবে অনুভব করলেন? আগুন হলে তো জিহবায় আর্দ্রতা থাকারও কথা নয়।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিনকে 'নাবাতে'র সাথে তুলনা করেছেন। 'নাবাত' হল বিভিন্ন ধরনের সাধারণ মানুষ। যদি তাদের আকার-আকৃতি না থাকত এবং শুধু আগুন হত, তাহলে, তিনি তাদের স্বরূপ ও আকৃতির কথা উল্লেখ না করে কেবল অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ও অগ্নিশিখার কথাই উল্লেখ করতেন।
আরেক হাদীসে এসেছে, মহানবী (সঃ) বলেছেন, আমি একদিন শয়তানকে দেখলাম সে জ্বলন্ত অগ্নিশিখা নিয়ে আমাকে জ্বালিয়ে দেয়ার জন্য অগ্রসর হচ্ছিল। আমি আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে তিনবার আশ্রয় চাইলাম। এরপর তাকে ধরে ফেলার ইচ্ছা করলাম। কিন্তু হযরত সোলায়মান (আঃ)-এর দোআর কথা মনে পড়ায় আমি আর তাকে ধরলাম না। নচেৎ, আমি তাকে মসজিদের খুঁটির সাথে বেঁধে রাখতাম এবং মদীনার শিশুরা তার সাথে খেলা করত। -(মুসলিম) যদি শয়তান নিজেই জ্বলন্ত আগুন হয়, তাহলে সে কেন আগুনের শিখা নিয়ে এসেছিল?
কাজী আবু বকর বলেছেন, জিনকে আগুন থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তারপর আল্লাহ তাদেরকে বিভিন্ন আকৃতি দিয়েছেন। তাদের শরীর আগুনের তুলনায় ভারী করেছেন এবং আগুনের অতিরিক্ত কিছু উপাদান যোগ করে দিয়েছেন। ফলে, তারা শুধু আর আগুন হিসেবে অবশিষ্ট থাকেনি। ১. জিনের শরীর যেমন সুক্ষ্ম তেমনি ভারীও।

টিকাঃ
১. আল আকায়েদ আল ইসলামিয়া-সাইয়েদ সাবেক।

📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 জিনের প্রকারভেদ ও রূপ পরিবর্তন

📄 জিনের প্রকারভেদ ও রূপ পরিবর্তন


আবুল কাসেম সোহাইলী বলেছেন: হাদীসে এসেছে, জিন তিন প্রকার। ১. সাপের আকৃতি ২. কাল কুকুরের আকৃতি ৩. প্রবাহমান বাতাসের মত। তাদের পাখা আছে। কোন কোন রাবী বলেছেন, আরেক প্রকার জিন আছে যারা ভ্রাম্যমান! তাদের নাম হচ্ছে সোআলী। সম্ভবত: শেষ প্রকারের জিনেরা পানাহার করে না।
ইবনু আবিদ দুনিয়া তার মাকায়েদুশ শায়তান বইতে আবুদ দারদা থেকে বর্ণিত হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: আল্লাহ তিন প্রকার জিন সৃষ্টি করেছেন। এক প্রকার হল: মাটিতে বাসকারী বিষাক্ত সাপ ও বিচ্ছু ইত্যাদি। ২. বাতাসের মত প্রবাহমান এবং ৩. যাদের হিসেব নিকেশ হবে। (হাদীসটি দুর্বল)
ইবনু আবিদ দুনিয়া আরো লিখেছেন, আরেক প্রকার জিন আছে যাদের শরীর মানবিক কিন্তু আত্মা হচ্ছে শয়তানের। আরো একপ্রকার জিন আছে যারা হাশরের দিদ আল্লাহর ছায়ায় থাকবে এবং সেদিন আল্লাহর ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না।
আল্লামা যামাখশারী কিছু আরবকে বলতে শুনেছেন: এক ধরনের জিন আছে যারা অর্ধেক মানববেশি। তাদেরকে শাক্ক বলা হয়। এ জিন মুসাফির একাকী হলে তার ক্ষতি করে এবং কোন সময় তাকে হত্যাও করে। আবু কেলাবা থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, কুকুর যদি একটি জাতি না হত, তাহলে আমি তাদেরকে হত্যার আদেশ দিতাম। কিন্তু আমার ভয় হল, আমি যেন একটা জাতিকে বিনাশ না করি। তোমরা এদের মধ্যে কাল কুকুরকে হত্যা কর। (আবু দাউদ, তিরমিযী) ১.
'রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, নামাজের সামনে দিয়ে কাল কুকুর অতিক্রম করলে নামাজ বাতিল হয়ে যায়। লাল ও সাদা কুকুর ব্যতীত শুধু কাল কুকুর অতিক্রম করলে কেন নামাজ বাতিল হয়, তাঁকে এ প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেন, কাল কুকুর হচ্ছে শয়তান। (মোসনাদে আহমদ)
অর্থাৎ শয়তানের মত বেশী ক্ষতিকর। কাল কুকুরের ক্ষতি বেশী এবং উপকার কম। তাই জিন বেশীরভাগ কাল কুকুরের আকৃতি ধারণ করে।
জিন বহু কিছুর বেশ ধরণ করে। তারা মানুষ, পশু, সাপ, বিচ্ছু, উট, গরু, ছাগল, ঘোড়া, গাধা, খচ্চর ও পাখী প্রভৃতির আকার ধারণ করে। জিন কাল বিড়ালের আকৃতিও ধারণ করে।
আবু সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন 'নিশ্চয়ই মদীনাতে মুসলমান জিন আছে। যদি তোমরা সাপ ও বিচ্ছু জাতীয় বিষাক্ত প্রাণী দেখ, তাদেরকে তিনবার চলে যাওয়ার জন্য বল। তারপরও যদি না যায়, তাহলে, তাদেরকে মেরে ফেল। (তিরমিজী, নাসাঈ)
কাজী আবু ইয়ালী বলেছেন, জিনের পক্ষে আপন সত্তার পরিবর্তন করা সম্ভব নয় এবং বিভিন্ন আকার ও রূপ পরিবর্তন করাও সম্ভব নয়। তবে এটা হতে পারে যে, আল্লাহ তাদেরকে এমন কিছু শব্দ ও কাজ শিক্ষা দিয়েছেন, যখন তারা সেটা বলে বা করে, তখন আল্লাহ তাদেরকে এক রূপ থেকে আরেক রূপে পরিবর্তন করেন। তখনই একথা বলা যায় যে, তারা এমন কথা ও কাজ করতে সক্ষম যা করলে ও বললে তারা বিভিন্ন রূপে রূপান্তরিত হতে পারে। তবে তাদের নিজেদের পক্ষ থেকে রূপ পরিবর্তন সম্ভব নয়। কেননা, রূপ পরিবর্তনের ফলে কাঠামোর ভাঙ্গন, বিভিন্ন অঙ্গের বিচ্ছেদ এবং তাদের জীবনের অবসান বুঝায়। তাই তাদের নিজেদের পক্ষ থেকে আল্লাহর বিশেষ কোন কুদরত ব্যতীত বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করা সম্ভব নয়।
বদর যুদ্ধে শয়তান কর্তৃক সুরাকা বিন মালেকের বেশ ধারণ এবং জিবরীল (আঃ) কর্তৃক দেহইয়া কালবীর বেশ ধারণকে এ ব্যাখ্যার আলোকে বিচার করতে হবে। মানুষের বেশ ধারণের ব্যাপারে জিবরীল সম্পর্কে আল্লাহ কোরআনে বলেছেন,
فَأَرْسَلْنَا إِلَيْهَا رُوْحَنَا فَتَمَثَّلَ لَهَا بَشَرًا سَوِيًّا .
"অতঃপর আমি মরিয়মের কাছে আমার ফেরেশতা জিবরীলকে পাঠিয়েছি। তিনি তার কাছে মানুষের বেশে হাজির হয়েছেন।"
উপরোক্ত পরিবর্তন ও রূপান্তর আল্লাহ নিজেই করেছেন। ফেরেশতা ও শয়তান ইচ্ছা করে করতে পারেনি।
ইয়াসির বিন আমার থেকে বর্ণিত। আমরা ওমর (রাঃ)-এর কাছে মরুভূমির বহুরূপী ও বিভিন্ন আকৃতি সম্পন্ন জিন সম্পর্কে আলোচনা করলাম। তিনি বলেন: আল্লাহ যাকে যে আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন সে তার পরিবর্তন করতে পারে না। তোমাদের মত তাদের মধ্যেও যাদুকর আছে তোমরা তা দেখলে তাকে চলে যাওয়ার আহবান জানাবে। ১
ওবায়েদ বিন ওমাইর থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মরুভূমির বহুরূপী ও বিভিন্ন আকৃতি ধারণকারী জিন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এরা হচ্ছে জিনের যাদুকর। ২.
সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস থেকে বর্ণিত। আমরা মরুভূমির বিভিন্ন আকৃতি ধারণকারী জিন দেখলে আমাদেরকে নামাজের আজান দেয়ার নিদেশ দেয়া হয়েছে। ৩.
'মোজাহিদ থেকে বর্ণিত। আমি নামাজে দাঁড়ালে শয়তান সর্বদা আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের আকৃতিতে আমার কাছে হাজির হয়। তিনি বলেন এ বিষয়ে ইবনে আব্বাসের একটি কথা আমার মনে পড়ে গেল। আমি আমার কাছে একটি চাকু রাখলাম। যখন সে ঐ বেশ ধারণ করে হাজির হল, তখন আমি তাকে ছুরিকাঘাত করি। এতে করে সে ঠাস করে পড়ে যায়। এরপর আমি আর তাকে কখনও দেখিনি। ৪.
আতবী থেকে বর্ণিত। ইবনু জোবায়ের নিজ সওয়ারীর পেছনে এক হাত লম্বা এক ব্যক্তিকে দেখে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কে? সে জবাব দেয়: 'এজব'। তিনি জিজ্ঞেস করেন: 'এজব' কি? সে বলে জিনের এক ব্যক্তি। তিনি তাকে লাঠি দিয়ে মারেন। ফলে সে ভেগে যায়।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, জিনের রূপ পরিবর্তন হয়। অনেকেই বলেছেন: জিন ও ফেরেশতার আকৃতি ধারণ ও রূপ পরিবর্তনের অর্থ হল, তারা দর্শকের কাছে রূপ পরিবর্তনের একটা ধারণা বা কল্পনা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। ফলে দর্শক মনে করে যে ঐটা জিন বা ফেরেশতা। অথচ, এটা আল্লাহর এমন কাজ যা দর্শকের চোখের মধ্যে তিনি জিন বা ফেরেশতার রূপ পরিবর্তনের মত ধারণা সৃষ্টি করে দেন। এছাড়া, মূল আকৃতি পরিবর্তন করা কারো পক্ষে এজন্য সম্ভব নয় যে, এটা তার অস্তিত্বহীনতার সমান।
ঈমাম শাফেঈ (রঃ) বলেছেন: কেউ যদি বলে যে, আমি জিন দেখেছি, তাহলে, তার স্বাক্ষ্য বাতিল ও অগ্রহণযোগ্য। কেননা, আল্লাহ কোরআনে বলেছেন:
'সে এবং তার সম্প্রদায় তোমাদেরকে দেখে, কিন্তু তোমরা তাদেরকে দেখতে পারনা। (সূরা আরাফ-২৭)
কেননা, সে তার ঐ বক্তব্য দ্বারা আল্লাহর কোরআনের উপরোক্ত আয়াতের পরিপন্থী কথা বলছে। অর্থাৎ জিনকে তার আসল আকৃতিতে দেখা সম্ভব নয়। পরিবর্তিত আকৃতিতে দেখা যেতে পারে।

টিকাঃ
১. ঐ
১. মাকায়েদুশ শয়তান-ইবনু আবিদ দুনিয়া।
২. ঐ
৩. ঐ
৪. আকামুল মারজান-কাজী বদরুদ্দিন শিবলী।

📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 জিনের বাসস্থান

📄 জিনের বাসস্থান


জিনের বাসস্থান সম্পর্কে আবুল শেখ ইস্পাহানী তাঁর 'আল আজামাহ' বইতে লিখেছেন। বেলাল বিন হারেস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা কোন এক সফরে রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে ছিলাম। তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের জন্য বেরিয়ে গেলেন। তিনি যখন পেশাব-পায়খানা করতে বের হতেন, তখন একটু দুরে চলে যেতেন। আমি তাঁর জন্য একপাত্র পানি নিয়ে গেলাম। তিনি তা নিয়ে চলে গেলেন। আমি তাঁর কাছে কিছু পুরুষ লোকের দুর্বোধ্য ঝগড়া শুনলাম এবং এরকম বাক্য আর কখনও শুনিনি। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করায় তিনি জবাবে বলেন: আমার কাছে মুসলমান জিন ও মোশরেক জিনরা এসে তাদের বাসস্থান ঠিক করে দেয়ার আহবান জানায়। আমি মুসলমান জিনদেরকে গ্রাম ও পাহাড়ে এবং মোশরেক জিনদেরকে পাহাড় ও সাগরের মাঝে বাস করার নির্দেশ দিয়েছি।
হাদীসের বর্ণনাকারী কাসীর বলেন: আমি কাউকে গ্রাম ও পাহাড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সুস্থ ও নিরাপদ না হতে দেখিনি; আর পাহাড় ও সাগরের মাঝে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকেও তেমন সুস্থ ও নিরাপদ হতে দেখিনি।
ইমাম মালেক মোআত্তায় বর্ণনা করেছেন, ওমর বিন খাত্তাব (রাঃ) ইরাক সফরের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কা'ব'আল আহবার তাঁকে বারণ করে বলেন: হে আমীরুল মোমেনীন আপনি সেখানে যাবেন না। সেখানে ১০ ভাগের ৯ ভাগই যাদু ও মন্দ, এবং সেখানে পাপীজিন বাস করে ও দুরারোগ্য রোগ ব্যধি রয়েছে। ১.
ইয়াযিদ বিন জাবের থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: এমন কোন মুসলমান নেই যার ঘরের ছাদে মুসলমান জিন নেই। মুসলমানরা যখন দুপুর ও রাত্রের খাবার তৈরি করে তখন সে মুসলমান জিনেরা ও ছাদ থকে নেমে এসে যায়। আল্লাহ তাদের মাধ্যমে মুসলমানদের হেফাজত করেন। ২.
ইবনু আবু দাউদ বলেন: আবু আবদুর রহমান আযরামী হেশাম থেকে, তিনি মুগীরা থেকে এবং তিনি ইবরাহীম থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবরাহীম বলেছেন, গর্তের মুখে পেশাব করবে না। যদি তা থেকে কোন কিছু বের হয়, তাহলে, এর চিকিৎসা কঠিন হবে। ১. অর্থাৎ গর্তে-গুহায়ও জিন থাকে।
জিন সাধারণতঃ গোসলখানা, উটের আস্তাবল অজুখানা, ডাষ্টবিন ও ময়লা নোংরা জায়গায় বাস করে। কেননা, এগুলো তাদের পছন্দনীয়।
তাই নবী করীম (সঃ) আমাদেরকে এসকল স্থানে জিনের ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য কিছু দোআ শিক্ষা দিয়েছেন। যায়েদ বিন আরকাম থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: إِنَّ هَذِهِ الْحُشُوشَ مُحْتَضِرَةً فَإِذَا أَنِّي أَحَدُكُمُ الْخَلَاءَ فَلْيَقُلْ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُبِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ .
"নিশ্চয়ই অজুখানা ও গোসলখানায় জিনেরা বিদ্যমান থাকে।" তোমরা কেউ টয়লেটে গেলে বলবে: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُبِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ .
"হে আল্লাহ আমি তোমার কাছে নারী ও পুরুষ জিনের ক্ষতি থেকে পানাহ চাই।” (তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ)
বনু হিব্বানের বর্ণনায় এভাবে এসেছে, أعوذُ بِاللَّهِ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ .
ইবনুস সুন্নী হযরত আনাস থেকে বর্ণনা করেছেন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তোমরা টয়লেটে বিসমিল্লাহ বলবে। দোআ টয়লেটে ব্যক্তির সতরের জন্য আড়াল হয়ে যায় এবং জিন শয়তানেরা আর তার সতর বা লজ্জাস্থান দেখতে পায় না। তিরমিজী শরীফে আলী বিন আবি তালেব থেকে বর্ণিত। মহানবী (সঃ) বলেছেন: তোমাদের কেউ পেশাবখানা ও পায়খানায় ঢুকে বিসমিল্লাহ বললে তার সতর ও জিনের চোখের মধ্যে আড়াল সৃষ্টি হয়।
জাবের থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেন: বনি আদমের সতর ও শয়তানের দৃষ্টির মধ্যে পর্দা হচ্ছে, কোন মুসলমান কাপড় খোলার সময় যদি এ দোআ পড়ে بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ সেই আল্লাহর নামে কাপড় খুলছি যিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই। (সুনানে দাইলামী)
কাতাদাহ আবদুল্লাহ বিন সারজান থেকে বর্ণনা করেছেন: إِنَّ النَّبِيَّ ﷺ نَهَى أَنْ تُبَالَ فِي الْجُحْرِ.
'নবী (সঃ) গর্তে পেশাব করতে নিষেধ করেছেন (আবু দাউদ) কাতাদাকে জিজ্ঞেস করা হল, গর্তে পেশাব করার ব্যাপারে কি বলা হয়েছে? তিনি বলেন, গর্ত জিনের বাসস্থান।
পানিতে জিন বাস করে। আবদুর রায়েক তাঁর মোসান্নাফ গ্রন্থে আবু জাফর মোহাম্মদ বিন আলী থেকে বর্ণনা করেছেন, 'হাসান ও হোসেন ফোরাত নদীতে নামেন, তাদের পরনে ছিল ইজার বা লুঙ্গি। তাঁরা বলেন, 'পানির রয়েছে বিশেষ অধিবাসী।' অর্থাৎ জিন।
আবু না'মী তার শরহ গ্রন্থে লিখেছেন কথিত আছে যে, পানি রাত্রে জিনের জন্য। কেউ যেন পানিতে পেশাব না করে কিংবা গোসল না করে। জিনের পক্ষ থেকে বিপদ নেমে আসার সম্ভাবনা আছে।
ইবনু আদী তাঁর 'কামেল' গ্রন্থে লিখেছেন, আবু হোরায়রা থেকে বর্ণিত। 'রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফসলের ক্ষেতে পায়খানা করতে নিষেধ করেছেন। কেননা তা তোমাদের ভাই জিনদের বাসস্থান।
ইবনুর রাফআহ তাঁর কেনায়া গ্রন্থে লিখেছেন, জিনের কারণে টয়লেটে খালি মাথায় না যাওয়া উত্তম। মাথা ঢাকার জন্য কিছু না পেলে অন্তত জামার হাত হলেও মাথার উপর দেয়া ভাল।
নাপাক জায়গা শয়তানের আড্ডা। তাই ফেকাহবিদগণ গরু ও ঘোড়ার আস্তাবলে কিংবা টয়লেটে নামাজ পড়াকে নাজায়েয বলেছেন।
কবরস্থানেও শয়তান থাকে। যারা কবরকে কেন্দ্র করে শিরক করে শয়তান তাদেরকে সাহায্য করে। কবরপূজা, কবরে ওরস অনুষ্ঠান, খাওয়া-দাওয়া, বাতি জ্বালানো, ফুল ও আতরদান, কবরে ঘর তৈরি সহ কবর ভিত্তিক যাবতীয় কার্যক্রম শিরক। কবর শিরকের বিরাট মাধ্যম। শয়তান কবরপুজারীদের সাথে কথা বলে, বিভিন্ন ইশারা-ইঙ্গিত দিয়ে বিভ্রান্ত করে, কবরপুজারীরা সেগুলোকে বুজুর্গী ও কারামত মনে করে শরীয়তের শত নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তা থেকে বিরত হয় না। উল্টো বিরোধীদেরকে কম ঈমানদার বলে বিবেচনা করে। অনুরূপভাবে শয়তান গণক, ভবিষ্যদ্বক্তা এবং মুর্তি পূজারীদের সাথেও কথা বলে এবং তথাকথিত বুজুর্গীর আলামত ও নমুনা দেখায়। যাদুকর, সূর্য ও চন্দ্র পুজারী এবং তারকাপুজারীদেরও একই অবস্থা। শয়তান তাদের বিভিন্ন প্রয়োজন ও মতলব পূরণ করে। যেমন, কাউকে হত্যা করা, কাউকে অসুস্থ করে তোলা, কাউকে অর্থ-সম্পদ দান এবং কাউকে সন্তান ধারণে সাহায্য করে, ইত্যাদি। কেননা, তারা শক্তির মালিক নয়, সকল শক্তির মালিক হলেন আল্লাহ
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা বুঝা গেল, জিনেরা নীচু ভূমি, পেশাবখানা, পায়খানা, ময়লা আবর্জনার স্থান, গরু, ছাগল, উট, গাধা, ঘোড়া ও হাতীর আস্তাবল, কবরস্থান, ঘর-বাড়ী ও গাছপালা ইত্যাদিতে বাস করে। তাদের বাসের জন্য আলাদা কোন ভূখন্ড নেই। তারা মানব সমাজেই বাস করে।

টিকাঃ
১. আকামুল মারজান-কাজী বদরুদ্দীন শিবলী।
২. ঐ
১. ঐ

📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 জিনের পানাহার

📄 জিনের পানাহার


কাজী আবু ইয়া'লী বলেছেন: 'জিনেরা আমাদের মতই পানাহার করে ও বিয়ে শাদী করে।' জিমের খাওয়া-দাওয়ার বিষয়ে মোট তিনটি মত আছে।
১. জিনেরা মোটেই পানাহার করে না। এমত বাতিল।
২. এক প্রকার জিন পানাহার করে। অন্য এক প্রকার পানাহার করে না। এমতের সমর্থনে সামনে তাবেঈদের বক্তব্য পেশ করা হবে।
৩. সকল জিন পানাহার করে। এমতের কোন কোন অনুসারী বলেনঃ জিনের পানাহার হচ্ছে ঘ্রাণ নেয়া ও স্বাদ গ্রহণ করা। তারা চিবিয়ে এবং গিলে খায় না। একথার সমর্থনে কোন প্রমাণ নেই। তবে এদলের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের মতে জিন চিবিয়ে ও গিলে খায়। তাদের সমর্থনেই বিশুদ্ধ হাদীস এবং প্রকাশ্য প্রমাণ রয়েছে। আবু দাউদ শরীফ উমাইয়া বিন মাখশীর হাদীস এর প্রমাণ। তাতে উল্লেখ আছে যে, শয়তান এক ব্যক্তির সাথে খানা খাচ্ছিল। যখন তিনি আল্লাহর নাম স্মরণ করলেন, তখন সে যা খেয়েছিল, সব বমি করে দিল।
আবদুস সামাদ বিন মা'কাল বলেন: ওহাব বিন মোনাব্বেহকে জিজ্ঞেস করা হল, জিনেরা কি? তারা কি পানাহার করে? তিনি জবাবে বলেন: জিনেরা বিভিন্ন ধরনের। তাদের মধ্যে আসল জিন হচ্ছে বায়ু; তারা পানাহার করে না এবং বংশ বিস্তারও করে না। আরেক প্রকার জিন আছে যারা পানাহার করে, বিয়ে করে ও বংশ বিস্তার করে। যেমন, সোআ'লী, গাওল, কোতরোব ইত্যাদি।
ইবনু আবিদ দুনিয়া 'মাকায়েদুশ শায়তান' গ্রন্থে এবং আবুশ শেখ 'আজামা' গ্রন্থে ইয়াযিদ বিন জাবের থেকে বর্ণনা করেছেন, 'এমন কোন মুসলমানের ঘর নেই যাদের ঘরের ছাদে মুসলমান জিন বাস করে না। যখন মুসলমানেরা দুপুরের খাদ্য প্রস্তুত করে তখন মুসলমান জিনেরাও তাদের সাথে শরীক হয়। অনুরূপভাবে, তারা যখন রাত্রের খাবার তৈরি করে, মুসলমান জিনেরাও তাদের সাথে বসে পড়ে। আল্লাহ এই জিনদেরকে দিয়েই মানুষের হেফাজতের ব্যবস্থা করেছেন।
আহমদ, আবুশ শেখ ও তিরমিযী আলকমা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি ইবনে মাসউদকে জিজ্ঞেস করলাম, জিনের ঘটনার রাতে নবী (সঃ) এর সাথে আপনারা কি কেউ ছিলেন? তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে কেউ তাঁর সাথে ছিল না। কিন্তু একরাতে আমরা তাঁকে মক্কায় খুঁজে পাচ্ছিলামনা। আমাদের ধারণা, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু ভোরে তিনি হেরা পাহাড়ের দিক থেকে আসেন। সাহাবায়ে কেরাম, তাদের আশংকা সম্পর্কে তাঁকে বলেন। তখন নবী (সঃ) বলেন: 'আমার কাছে এক জিন এসে আমন্ত্রণ জানায়। আমি তার সাথে যাই এবং তাদের কাছে কোরআন পড়ি।' এরপর তিনি আমাদেরকে নিয়ে গেলেন এবং তাদের ও-আগুনের চিহ্ন দেখালেন। আরব দ্বীপের জিনেরা তাঁকে তাদের সম্বল সম্পর্কে প্রশ্ন করেন্। তিনি উত্তরে বলেন: 'তোমাদের জন্য আল্লাহর নাম উচ্চারিত হাড় নির্দিষ্ট করা হল।'
বোখারী ও মুসলিম শরীফে বার্ণিত হাদীসে এসেছে, জিনেরা নবী (সঃ)-কে তাদের খাবার সম্পর্কে প্রশ্ন করে। তিনি বলেন, যে হাড়ের উপর বিসমিল্লাহ বলা হয়েছে তা যদি তাদের হাতে পড়ে তাহলে তা গোশতে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে এবং গোবর তাদের পশুদের খাবারে পরিণত হবে।
ইবনু সালাম তাঁর তাফসীরে বলেছেন, গোবর তাদের পশুদের জন্য সবুজ খাবারে পরিণত হয়।
এ বর্ণনাতেই কেবল পশুর বিষ্ঠাকে জিনের পশুর খাবার হিসেবে বলা হয়েছে। অন্যান্য বর্ণনায় হাড় এবং বিষ্ঠা এ দু'টোকেই জিনের খাবার বলা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, فَلَا تَسْتَنْجُو بِهِمَا فَإِنَّهُمَا طَعَامُ إِخْوَانِكُمُ الْجِنِّ .
'তোমরা ঐ দু'টো জিনিস (হাড় ও গোবর) দিয়ে এস্তেঞ্জা করো না। কেননা, তা তোমাদের ভাই জিনের খাবার।' (মুসলিম)
মুসলিম শরীফে সালমান আল-ফারেসীর বর্ণনায় এসেছে, 'রাসূলুল্লাহ (স) আমাদেরকে কেবলামুখী হয়ে পেশাব-পায়খানা করতে, ডান হাত দিয়ে কিংবা তিনটি পাথরের কমে এস্তেঞ্জা করতে অথবা গোবর ও হাড় দিয়ে এস্তেঞ্জা করতে নিষেধ করেছেন।'
• ইবনুল আচারী জাবের বিন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন, আমি রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে ছিলাম। তখন একটি সাপ আসল, নিজ কোমরের উপর ভর দিয়ে দাঁড়াল এবং নিজ মুখকে কানের কাছে নিয়ে আসল যেন সে মুনাজাত করছে। তখন নবী (সঃ) বলেন, 'হাঁ'। তারপর সে চলে গেল। আমি তাঁকে প্রশ্ন করায় তিনি বলেন, এটা ছিল এক পুরুষ জিন। সে আবেদন জানাল, আপনি আপনার উম্মতকে হাঁড় ও গোবর দিয়ে এস্তেঞ্জা করতে নিষেধ করুন। কেননা, আল্লাহ তাতে আমাদের জন্য রিজক রেখেছেন।
আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী (সঃ) তাঁকে ইস্তেঞ্জার জন্য পাথর আনার হুকুম করেন এবং বলেন, হাঁড় ও গোবর আনবেনা। আবু হোরায়রা বলেন আমি জিজ্ঞেস করলাম, হাঁড় ও গোবরের ব্যাপারটি কি? নবী (সঃ) উত্তরে বলেন, এ দু'টো হচ্ছে জিনের খাবার, আমার কাছে নাসীধীন এলাকার জিনেরা এসেছিল। তারা খুবই ভাল জিন। তারা আমাকে তাদের খাদ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করায় আমি তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোআ করি, তারা যেন এমন কোন হাঁড় ও গোবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম না করে, যাকে তারা খাবার হিসেবে না পায়। (বোখারী) অর্থাৎ আল্লাহ যেন তাদেরকে হাঁড় ও গোবরে খাদ্য দান করেন।
আবু নাঈম তাঁর 'দালায়েলুন্নবুওয়াত' গ্রন্থে ইবনে মাসউদ থেকে উল্লেখ করেছেন, হিজরতের আগে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কার এক প্রান্তের উদ্দেশ্যে বের হলেন। তিনি আমার জন্য একটা রেখা টানেন এবং বলেন, আমি আসার আগে তুমি কারো সাথে কথা বলবে না। তিনি আরো বলেন, তুমি কোন জিনিস দেখলে ভয় পাবে না এবং এ জায়গা ছেড়ে যাবে না। তারপর তিনি কিছু সামনে এগিয়ে যান এবং বসেন। তখন কিছু কৃষ্ণাঙ্গ লোক আসল এবং তাঁর কাছে ভীড় জমাল। পরে তারা চলে গেল। ইবনু মাসউদ বলেন, আমি তাদেরকে বলতে শুনেছি, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা বহু দূর থেকে এসেছি, আমরা রওনা করলাম, আমাদেরকে সম্বল দিন। তখন নবী (সঃ) বলেন: তোমাদের জন্য গোবর বা পশুর বিষ্ঠা খাদ্য হিসেবে নির্দিষ্ট করলাম। আর তোমরা যদি হাঁড় পাও, তাতে গোশতও পাবে। আর গোবর বা পশুর বিষ্ঠা তোমাদের জন্য খেজুর হবে। তারা চলে যাওয়ার পর আমি জিজ্ঞেস করলাম, তারা কে? তিনি উত্তরে বলেন, তারা হল, নাসীবী এলাকার জিন।
এতো গেল জিনের খাদ্যের ব্যাপার। অর্থাৎ তারাও খায়। কিন্তু কোন্ হাতে খায়? এমর্মে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে।
মুসলিম, মালেক, আবু দাউদ ও তিরমিজী আবদুল্লাহ বিন জুমার থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: "তোমাদের কেউ যেন বাম হাতে না খায় এবং কিছু পান না করে। কেননা, শয়তান বাম হাতে খায় ও পান করে। নাফে' আরো একটু যোগ করেছেন। তিনি বলেছেন, বাম হাতে যেন কিছু না ধরে এবং না দেয়।” মুসলিমের আরেক বর্ণনায় এসেছে, "তোমাদের কেউ খানা খেলে যেন ডান হাতে খায় এবং পান করলেও যেন ডান হাতে পান করে। কেননা, শয়তান বাম হাতে খায় ও পান করে।"
ইবনু আবদুল বার বলেছেন, শয়তান যে পানাহার করে- এ হাদীস তার প্রমাণ। যারা বলেন যে, শয়তান খায় না, তারা এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, বাম হাতে পানাহার করাকে শয়তান পছন্দ করে। যারা বলেন যে, শয়তান পানাহার করে না, সহীহ হাদীসের পরিপন্থী হওয়ায় তাদের কথা গ্রহণযোগ্য নয়।
অপরদিকে, কাজী আবদুল জাব্বার বলেছেন, সুক্ষ্ম দেহের অধিকারী হওয়াটা পানাহারের পথে কোন বাধা নয়। যেমন করে সুক্ষ্ম হওয়াটাও সুক্ষ্মভার পরিপন্থী নয়। এক্ষেত্রে ফেরেশতারা সুক্ষ্ম সত্তা হওয়ার কারণে পানাহার না করার যুক্তি প্রদর্শন করা যাবে না। তাদের পানাহার না করাটাই আল্লাহর সিদ্ধান্ত।
মুসলিম জাবের থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: "শয়তান তোমাদের প্রতিটা কাজে হাজির থাকে, এমনকি খানা পরিবেশনের মধ্যেও। যদি তোমাদের কারো হাত থেকে এক লোকমা খাবার পড়ে যায় তাহলে, তার থেকে ময়লা দূর করে তা খেয়ে ফেল। শয়তানের জন্য রেখে দিও না।"
মুসলিম ও আবু দাউদ হোজায়ফা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন- "আমরা রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে খাবারে উপস্থিত থাকলে তিনি খানা শুরু না করলে আমরা কেউ খানায় হাত দিতাম না। হঠাৎ এক বেদুইন ছুটে আসল এবং খাদ্যে হাত দিতে উদ্যত হল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার হাত ধরে ফেলেন। তারপর এক বালিকা ছুটে আসল এবং খাদ্যে হাত দিতে উদ্যত হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার হাতও ধরে ফেলেন। এরপর তিনি বলেন: 'শয়তান বেদুইনের মাধ্যমে খানাকে হালাল করতে চেয়েছিল। আমি তার হাত ধরে ফেললাম। তারপর এ বালিকাটিকে নিয়ে আসল পুনরায় খাদ্যকে বৈধ করার জন্য। এবার আমি তার হাত ধরে ফেললাম। যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ করে বলছি, শয়তানের হাত তাদের উভয়ের হাতের সাথে আমার হাতের মধ্যে রয়েছে।"
উমাইয়া বিন মাখশী থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বসা ছিলেন। তখন এক ব্যক্তি খানা খাচ্ছিল। কিন্তু সে বিসমিল্লাহ বলেনি। তার খানা মাত্র এক লোকমা বাকী। সে বিসমিল্লাহি আউয়ালাহু ওয়া আখিরাহু বলে তা মুখে দিল। নবী (সঃ) হাসলেন এবং বললেন: 'শয়তান এতক্ষণ তার সাথে খানা খাচ্ছিল। কিন্তু বিসমিল্লাহ বলায় শয়তান যা খেয়েছিল পেট থেকে তা বমি করে দিল।'- (আবু দাউদ)
আবু হোরায়রা থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'শয়তান অত্যন্ত অনুভূতি সম্পন্ন ও সংবেদনশীল। তোমরা তার থেকে নিজেদেরকে সতর্ক রাখ। কেউ রাত্রি যাপন করলে এবং হাতে ঘ্রাণ থাকার কারণে কোন ক্ষতি হলে, নিজেকে ছাড়া আর কাউকে দোষারোপ করতে পারবে না।' (তিরমিয়ী, হাকেম)
এ হাদীসে খাওয়ার পর হাত ধোয়ার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। তা না হয় হাতে খাদ্যের ঘ্রাণ থেকে কোন রোগ বা অনিষ্ট হতে পারে। হাত ধোয়া হচ্ছে সে অনিষ্টের প্রতিষেধক।
আ'ম্বাসা বিন সাঈদ কাজী সা'লাবা বিন সোহাইলকে বলেন, আমি এক অদ্ভুত জিনিস দেখেছি। আ'ম্বাসা বলেন, আমি ভোর রাত্রে পান করার জন্য কিছু শরবত রাখতাম। কিন্তু ভোর রাত্রে উঠে তা পেতাম না, আমি এবার শরবত রাখলাম এবং এর উপর সূরা ইয়াসিন পড়ে ফুঁ দিলাম। ভোরে আমি শরবত হুবহু দেখতে পাই এবং শয়তানকে দেখি সে অন্ধের মত ঘরে ঘুরছে।১০
মুসলিম, ও আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'ব্যক্তি ঘরে প্রবেশের সময় এবং খাওয়ার সময় আল্লাহকে স্মরণ করলে শয়তান নিজ সাথীদেরকে বলে: তোমরা এ ঘরে রাত যাপন ও রাতের খানায় অংশগ্রহণ করতে পারবে না। ব্যক্তি প্রবেশের সময় আল্লাহকে স্মরণ না করলে শয়তান নিজ সাথীদেরকে বলে, তোমরা এঘরে রাত যাপনের সুযোগ পেলে। আর খাওয়ার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ না করলে বলে, তোমরা রাত্রি যাপন সহ রাতের খাবারে অংশ নিতে পারবে, এসকল হাদীস প্রমাণ করে যে শয়তান খানা খায়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00