📄 জিন শব্দের অর্থ
জনের অর্থ ঢাকা ও আচ্ছন্ন করা। যেমন বলা হয় جَنَّ اللَّيْلُ النَّهَارَ 'রাত দিনকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। যে জিনিস দেখা যায় না বা যা আচ্ছন্ন হয়ে যায় তাকে জিন বলে। আল্লাহ মোমেনদের জন্য যে জান্নাত সৃষ্টি করেছেন, সে জান্নাত শব্দের উৎসও একই। তাও দৃশ্যগোচর নয়। আইয়ামে জাহেলিয়াতের লোকেরা অদৃশ্য হওয়ার কারণে ফেরেশতাকেও জিন বলত।
আল্লামা জাওহারী বলেছেন, জিনের আদি পুরুষ হচ্ছে ৩। তার থেকে উৎপত্তির কারণে তার বংশধরকে জিন বলা হয়। ইবনু আকীল হাম্বলী বলেছেন: জিনকে জিন বলার কারণ হল, তা মানুষের চোখ থেকে অদৃশ্য। এর প্রমাণ হিসেবে আল্লাহ বলেছেন:
إِنَّهُ يَرَاكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمْ .
"সে এবং তার দলবল (শয়তান) তোমাদেরকে দেখে, কিন্তু তোমরা তাদেরকে দেখ না।" (সূরা আরাফ-২৭)
গর্ভবর্তী মায়ের পেটের ভ্রূণকেও একই কারণে জুনিন বলা হয়, যা সাধারণত দেখা যায় না। যুদ্ধের সময় যোদ্ধাকে অন্যের আক্রমণের হাত থেকে আড়াল করার জন্য ঢালকে জুন্নাহ বলে। এসকল শব্দের উৎস এক ও অভিন্ন।
পরিভাষায় জিন বলা হয় এমন সত্তাকে যার বিবেক ও ইচ্ছাশক্তি আছে, মানুষের মতই সে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালনের জন্য সৃষ্ট, জড় উপাদানমুক্ত, মানুষের ইন্দ্রিয় শক্তি বহির্ভূত, স্বরূপে তাকে দেখা যায় না, বিভিন্ন আকার-আকৃতি ধারনে সক্ষম, যারা পানাহার করে, বিয়ে-শাদী করে, যাদের সন্তান সন্তুতি রয়েছে এবং যাদেরকে আখেরাতে নিজ নিজ কর্মের হিসেব দিতে হবে। ১
এ সংজ্ঞার আলোকে জিন জাতি আকৃতি ও মৌল পদার্থের দিক থেকে মানব বৈশিষ্ট্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। জিন আগুনের মৌলিক উপাদান থেকে তৈরি হলেও সে বিভিন্ন রূপ ও আকৃতি ধারণ করতে পারে, যা মানুষ পারে না। তারা দ্রুত চলাচলে সক্ষম। এমর্মে আল্লাহ বলেন:
قَالَ عِفْرِيْتٌ مِّنَ الْجِنِّ أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَنْ تَقُومَ مِنْ مَقَامِكَ : وَإِنِّي عَلَيْهِ لَقَوِيٌّ أَمِينٌ *
"এক দৈত্য-জিন হযরত সোলায়মান (আঃ)-কে বলল, আপনি আপনার স্থান থেকে উঠার আগে আমি বিলকিসের সিংহাসন এনে দেব এবং আমি এ কাজে শক্তিবাণ ও বিশ্বস্ত।" -(সূরা নামল-৩৯)
জিনেরা কঠোর কাজ করতে সক্ষম। আল্লাহ বলেন: "কিছু জিন সোলায়মানের সামনে কাজ করত তার পালনকর্তার আদেশে। তাদের যে কেউ আমার আদেশ অমান্য করবে, আমি তাকে জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি ভোগ করাবো। তারা সোলায়মানের ইচ্ছানুযায়ী দুর্গ, ভাস্কর্য, হাউজের মত বড় বড় পাত্র এবং চুল্লীর উপর স্থাপিত বিশাল ডেপসমূহ তৈরি করত।" -(সূরা সাবা-১২-১৩)
টিকাঃ
১. আল আকায়েদ আল ইসলামিয়া-সাইয়েদ সাবেক।
📄 জিন সৃষ্টির উপাদান
আল্লাহ জিন সৃষ্টির মূল উপাদান সম্পর্কে বলেছেন: وَالْجَانَّ خَلَقْنَاهُ مِنْ قَبْلُ مِنْ نَّارِ السَّمَومِ .
“এবং জিনকে আগে লু-এর আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছি।" -(সূরা হিজর-২৭) সামূম (লু) দ্বারা, আগুনের কঠোরতা বুঝানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন- وَخَلَقَ الْجَانَّ مِّنْ مَّارِجٍ مِّنْ نَّارٍ .
"তিনি জিনকে অগ্নিশিখা থেকে সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা আর-রাহমান-১৫) আল্লাহ ইবলিশের বক্তব্য প্রকাশ করে বলেন: خَلَقْتَنِي مِنْ نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ .
"আপনি আমাকে আগুন থেকে এবং তাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন।" -(সূরা আরাফ-১২)
আবুল ওয়াফা বিন আকীল তাঁর আলফুনুন বইতে লিখেছেন, এক ব্যক্তি জিন সম্পর্কে জানতে চাইল এবং বলল, আল্লাহ বলেছেন, তিনি তাদেরকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং আরো বলেছেন যে, অগ্নিশিখা তাদের ক্ষতি করে ও জ্বালিয়ে দেয়। প্রশ্ন হল, আগুন কি করে আগুনকে জ্বালিয়ে দেয়? এ প্রশ্নের জবাব হল, আল্লাহ শয়তান এবং জিনকে আগুনের প্রতি সম্বোধন করেছেন। যেমন তিনি মানুষকে মাটি, কাদা ও শক্ত মাটির প্রতি সম্বোধন করেছেন। এর অর্থ এ নয় যে, মানুষ বাস্তবে মাটি কিন্তু তার আসল উপাদান হল মাটি। তেমনি জিনের আসল উপাদান আগুন। যদি সে কেবলমাত্র আগুনই হয়, তাহলে নবী (সঃ) শয়তানকে নামাজে গলাটিপে ধরায় তার জিহবার আর্দ্রতা কিভাবে অনুভব করলেন? আগুন হলে তো জিহবায় আর্দ্রতা থাকারও কথা নয়।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিনকে 'নাবাতে'র সাথে তুলনা করেছেন। 'নাবাত' হল বিভিন্ন ধরনের সাধারণ মানুষ। যদি তাদের আকার-আকৃতি না থাকত এবং শুধু আগুন হত, তাহলে, তিনি তাদের স্বরূপ ও আকৃতির কথা উল্লেখ না করে কেবল অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ও অগ্নিশিখার কথাই উল্লেখ করতেন।
আরেক হাদীসে এসেছে, মহানবী (সঃ) বলেছেন, আমি একদিন শয়তানকে দেখলাম সে জ্বলন্ত অগ্নিশিখা নিয়ে আমাকে জ্বালিয়ে দেয়ার জন্য অগ্রসর হচ্ছিল। আমি আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে তিনবার আশ্রয় চাইলাম। এরপর তাকে ধরে ফেলার ইচ্ছা করলাম। কিন্তু হযরত সোলায়মান (আঃ)-এর দোআর কথা মনে পড়ায় আমি আর তাকে ধরলাম না। নচেৎ, আমি তাকে মসজিদের খুঁটির সাথে বেঁধে রাখতাম এবং মদীনার শিশুরা তার সাথে খেলা করত। -(মুসলিম) যদি শয়তান নিজেই জ্বলন্ত আগুন হয়, তাহলে সে কেন আগুনের শিখা নিয়ে এসেছিল?
কাজী আবু বকর বলেছেন, জিনকে আগুন থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তারপর আল্লাহ তাদেরকে বিভিন্ন আকৃতি দিয়েছেন। তাদের শরীর আগুনের তুলনায় ভারী করেছেন এবং আগুনের অতিরিক্ত কিছু উপাদান যোগ করে দিয়েছেন। ফলে, তারা শুধু আর আগুন হিসেবে অবশিষ্ট থাকেনি। ১. জিনের শরীর যেমন সুক্ষ্ম তেমনি ভারীও।
টিকাঃ
১. আল আকায়েদ আল ইসলামিয়া-সাইয়েদ সাবেক।
📄 জিনের প্রকারভেদ ও রূপ পরিবর্তন
আবুল কাসেম সোহাইলী বলেছেন: হাদীসে এসেছে, জিন তিন প্রকার। ১. সাপের আকৃতি ২. কাল কুকুরের আকৃতি ৩. প্রবাহমান বাতাসের মত। তাদের পাখা আছে। কোন কোন রাবী বলেছেন, আরেক প্রকার জিন আছে যারা ভ্রাম্যমান! তাদের নাম হচ্ছে সোআলী। সম্ভবত: শেষ প্রকারের জিনেরা পানাহার করে না।
ইবনু আবিদ দুনিয়া তার মাকায়েদুশ শায়তান বইতে আবুদ দারদা থেকে বর্ণিত হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: আল্লাহ তিন প্রকার জিন সৃষ্টি করেছেন। এক প্রকার হল: মাটিতে বাসকারী বিষাক্ত সাপ ও বিচ্ছু ইত্যাদি। ২. বাতাসের মত প্রবাহমান এবং ৩. যাদের হিসেব নিকেশ হবে। (হাদীসটি দুর্বল)
ইবনু আবিদ দুনিয়া আরো লিখেছেন, আরেক প্রকার জিন আছে যাদের শরীর মানবিক কিন্তু আত্মা হচ্ছে শয়তানের। আরো একপ্রকার জিন আছে যারা হাশরের দিদ আল্লাহর ছায়ায় থাকবে এবং সেদিন আল্লাহর ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না।
আল্লামা যামাখশারী কিছু আরবকে বলতে শুনেছেন: এক ধরনের জিন আছে যারা অর্ধেক মানববেশি। তাদেরকে শাক্ক বলা হয়। এ জিন মুসাফির একাকী হলে তার ক্ষতি করে এবং কোন সময় তাকে হত্যাও করে। আবু কেলাবা থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, কুকুর যদি একটি জাতি না হত, তাহলে আমি তাদেরকে হত্যার আদেশ দিতাম। কিন্তু আমার ভয় হল, আমি যেন একটা জাতিকে বিনাশ না করি। তোমরা এদের মধ্যে কাল কুকুরকে হত্যা কর। (আবু দাউদ, তিরমিযী) ১.
'রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, নামাজের সামনে দিয়ে কাল কুকুর অতিক্রম করলে নামাজ বাতিল হয়ে যায়। লাল ও সাদা কুকুর ব্যতীত শুধু কাল কুকুর অতিক্রম করলে কেন নামাজ বাতিল হয়, তাঁকে এ প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেন, কাল কুকুর হচ্ছে শয়তান। (মোসনাদে আহমদ)
অর্থাৎ শয়তানের মত বেশী ক্ষতিকর। কাল কুকুরের ক্ষতি বেশী এবং উপকার কম। তাই জিন বেশীরভাগ কাল কুকুরের আকৃতি ধারণ করে।
জিন বহু কিছুর বেশ ধরণ করে। তারা মানুষ, পশু, সাপ, বিচ্ছু, উট, গরু, ছাগল, ঘোড়া, গাধা, খচ্চর ও পাখী প্রভৃতির আকার ধারণ করে। জিন কাল বিড়ালের আকৃতিও ধারণ করে।
আবু সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন 'নিশ্চয়ই মদীনাতে মুসলমান জিন আছে। যদি তোমরা সাপ ও বিচ্ছু জাতীয় বিষাক্ত প্রাণী দেখ, তাদেরকে তিনবার চলে যাওয়ার জন্য বল। তারপরও যদি না যায়, তাহলে, তাদেরকে মেরে ফেল। (তিরমিজী, নাসাঈ)
কাজী আবু ইয়ালী বলেছেন, জিনের পক্ষে আপন সত্তার পরিবর্তন করা সম্ভব নয় এবং বিভিন্ন আকার ও রূপ পরিবর্তন করাও সম্ভব নয়। তবে এটা হতে পারে যে, আল্লাহ তাদেরকে এমন কিছু শব্দ ও কাজ শিক্ষা দিয়েছেন, যখন তারা সেটা বলে বা করে, তখন আল্লাহ তাদেরকে এক রূপ থেকে আরেক রূপে পরিবর্তন করেন। তখনই একথা বলা যায় যে, তারা এমন কথা ও কাজ করতে সক্ষম যা করলে ও বললে তারা বিভিন্ন রূপে রূপান্তরিত হতে পারে। তবে তাদের নিজেদের পক্ষ থেকে রূপ পরিবর্তন সম্ভব নয়। কেননা, রূপ পরিবর্তনের ফলে কাঠামোর ভাঙ্গন, বিভিন্ন অঙ্গের বিচ্ছেদ এবং তাদের জীবনের অবসান বুঝায়। তাই তাদের নিজেদের পক্ষ থেকে আল্লাহর বিশেষ কোন কুদরত ব্যতীত বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করা সম্ভব নয়।
বদর যুদ্ধে শয়তান কর্তৃক সুরাকা বিন মালেকের বেশ ধারণ এবং জিবরীল (আঃ) কর্তৃক দেহইয়া কালবীর বেশ ধারণকে এ ব্যাখ্যার আলোকে বিচার করতে হবে। মানুষের বেশ ধারণের ব্যাপারে জিবরীল সম্পর্কে আল্লাহ কোরআনে বলেছেন,
فَأَرْسَلْنَا إِلَيْهَا رُوْحَنَا فَتَمَثَّلَ لَهَا بَشَرًا سَوِيًّا .
"অতঃপর আমি মরিয়মের কাছে আমার ফেরেশতা জিবরীলকে পাঠিয়েছি। তিনি তার কাছে মানুষের বেশে হাজির হয়েছেন।"
উপরোক্ত পরিবর্তন ও রূপান্তর আল্লাহ নিজেই করেছেন। ফেরেশতা ও শয়তান ইচ্ছা করে করতে পারেনি।
ইয়াসির বিন আমার থেকে বর্ণিত। আমরা ওমর (রাঃ)-এর কাছে মরুভূমির বহুরূপী ও বিভিন্ন আকৃতি সম্পন্ন জিন সম্পর্কে আলোচনা করলাম। তিনি বলেন: আল্লাহ যাকে যে আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন সে তার পরিবর্তন করতে পারে না। তোমাদের মত তাদের মধ্যেও যাদুকর আছে তোমরা তা দেখলে তাকে চলে যাওয়ার আহবান জানাবে। ১
ওবায়েদ বিন ওমাইর থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মরুভূমির বহুরূপী ও বিভিন্ন আকৃতি ধারণকারী জিন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এরা হচ্ছে জিনের যাদুকর। ২.
সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস থেকে বর্ণিত। আমরা মরুভূমির বিভিন্ন আকৃতি ধারণকারী জিন দেখলে আমাদেরকে নামাজের আজান দেয়ার নিদেশ দেয়া হয়েছে। ৩.
'মোজাহিদ থেকে বর্ণিত। আমি নামাজে দাঁড়ালে শয়তান সর্বদা আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের আকৃতিতে আমার কাছে হাজির হয়। তিনি বলেন এ বিষয়ে ইবনে আব্বাসের একটি কথা আমার মনে পড়ে গেল। আমি আমার কাছে একটি চাকু রাখলাম। যখন সে ঐ বেশ ধারণ করে হাজির হল, তখন আমি তাকে ছুরিকাঘাত করি। এতে করে সে ঠাস করে পড়ে যায়। এরপর আমি আর তাকে কখনও দেখিনি। ৪.
আতবী থেকে বর্ণিত। ইবনু জোবায়ের নিজ সওয়ারীর পেছনে এক হাত লম্বা এক ব্যক্তিকে দেখে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কে? সে জবাব দেয়: 'এজব'। তিনি জিজ্ঞেস করেন: 'এজব' কি? সে বলে জিনের এক ব্যক্তি। তিনি তাকে লাঠি দিয়ে মারেন। ফলে সে ভেগে যায়।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, জিনের রূপ পরিবর্তন হয়। অনেকেই বলেছেন: জিন ও ফেরেশতার আকৃতি ধারণ ও রূপ পরিবর্তনের অর্থ হল, তারা দর্শকের কাছে রূপ পরিবর্তনের একটা ধারণা বা কল্পনা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। ফলে দর্শক মনে করে যে ঐটা জিন বা ফেরেশতা। অথচ, এটা আল্লাহর এমন কাজ যা দর্শকের চোখের মধ্যে তিনি জিন বা ফেরেশতার রূপ পরিবর্তনের মত ধারণা সৃষ্টি করে দেন। এছাড়া, মূল আকৃতি পরিবর্তন করা কারো পক্ষে এজন্য সম্ভব নয় যে, এটা তার অস্তিত্বহীনতার সমান।
ঈমাম শাফেঈ (রঃ) বলেছেন: কেউ যদি বলে যে, আমি জিন দেখেছি, তাহলে, তার স্বাক্ষ্য বাতিল ও অগ্রহণযোগ্য। কেননা, আল্লাহ কোরআনে বলেছেন:
'সে এবং তার সম্প্রদায় তোমাদেরকে দেখে, কিন্তু তোমরা তাদেরকে দেখতে পারনা। (সূরা আরাফ-২৭)
কেননা, সে তার ঐ বক্তব্য দ্বারা আল্লাহর কোরআনের উপরোক্ত আয়াতের পরিপন্থী কথা বলছে। অর্থাৎ জিনকে তার আসল আকৃতিতে দেখা সম্ভব নয়। পরিবর্তিত আকৃতিতে দেখা যেতে পারে।
টিকাঃ
১. ঐ
১. মাকায়েদুশ শয়তান-ইবনু আবিদ দুনিয়া।
২. ঐ
৩. ঐ
৪. আকামুল মারজান-কাজী বদরুদ্দিন শিবলী।
📄 জিনের বাসস্থান
জিনের বাসস্থান সম্পর্কে আবুল শেখ ইস্পাহানী তাঁর 'আল আজামাহ' বইতে লিখেছেন। বেলাল বিন হারেস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা কোন এক সফরে রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে ছিলাম। তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের জন্য বেরিয়ে গেলেন। তিনি যখন পেশাব-পায়খানা করতে বের হতেন, তখন একটু দুরে চলে যেতেন। আমি তাঁর জন্য একপাত্র পানি নিয়ে গেলাম। তিনি তা নিয়ে চলে গেলেন। আমি তাঁর কাছে কিছু পুরুষ লোকের দুর্বোধ্য ঝগড়া শুনলাম এবং এরকম বাক্য আর কখনও শুনিনি। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করায় তিনি জবাবে বলেন: আমার কাছে মুসলমান জিন ও মোশরেক জিনরা এসে তাদের বাসস্থান ঠিক করে দেয়ার আহবান জানায়। আমি মুসলমান জিনদেরকে গ্রাম ও পাহাড়ে এবং মোশরেক জিনদেরকে পাহাড় ও সাগরের মাঝে বাস করার নির্দেশ দিয়েছি।
হাদীসের বর্ণনাকারী কাসীর বলেন: আমি কাউকে গ্রাম ও পাহাড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সুস্থ ও নিরাপদ না হতে দেখিনি; আর পাহাড় ও সাগরের মাঝে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকেও তেমন সুস্থ ও নিরাপদ হতে দেখিনি।
ইমাম মালেক মোআত্তায় বর্ণনা করেছেন, ওমর বিন খাত্তাব (রাঃ) ইরাক সফরের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কা'ব'আল আহবার তাঁকে বারণ করে বলেন: হে আমীরুল মোমেনীন আপনি সেখানে যাবেন না। সেখানে ১০ ভাগের ৯ ভাগই যাদু ও মন্দ, এবং সেখানে পাপীজিন বাস করে ও দুরারোগ্য রোগ ব্যধি রয়েছে। ১.
ইয়াযিদ বিন জাবের থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: এমন কোন মুসলমান নেই যার ঘরের ছাদে মুসলমান জিন নেই। মুসলমানরা যখন দুপুর ও রাত্রের খাবার তৈরি করে তখন সে মুসলমান জিনেরা ও ছাদ থকে নেমে এসে যায়। আল্লাহ তাদের মাধ্যমে মুসলমানদের হেফাজত করেন। ২.
ইবনু আবু দাউদ বলেন: আবু আবদুর রহমান আযরামী হেশাম থেকে, তিনি মুগীরা থেকে এবং তিনি ইবরাহীম থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবরাহীম বলেছেন, গর্তের মুখে পেশাব করবে না। যদি তা থেকে কোন কিছু বের হয়, তাহলে, এর চিকিৎসা কঠিন হবে। ১. অর্থাৎ গর্তে-গুহায়ও জিন থাকে।
জিন সাধারণতঃ গোসলখানা, উটের আস্তাবল অজুখানা, ডাষ্টবিন ও ময়লা নোংরা জায়গায় বাস করে। কেননা, এগুলো তাদের পছন্দনীয়।
তাই নবী করীম (সঃ) আমাদেরকে এসকল স্থানে জিনের ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য কিছু দোআ শিক্ষা দিয়েছেন। যায়েদ বিন আরকাম থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: إِنَّ هَذِهِ الْحُشُوشَ مُحْتَضِرَةً فَإِذَا أَنِّي أَحَدُكُمُ الْخَلَاءَ فَلْيَقُلْ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُبِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ .
"নিশ্চয়ই অজুখানা ও গোসলখানায় জিনেরা বিদ্যমান থাকে।" তোমরা কেউ টয়লেটে গেলে বলবে: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُبِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ .
"হে আল্লাহ আমি তোমার কাছে নারী ও পুরুষ জিনের ক্ষতি থেকে পানাহ চাই।” (তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ)
বনু হিব্বানের বর্ণনায় এভাবে এসেছে, أعوذُ بِاللَّهِ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ .
ইবনুস সুন্নী হযরত আনাস থেকে বর্ণনা করেছেন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তোমরা টয়লেটে বিসমিল্লাহ বলবে। দোআ টয়লেটে ব্যক্তির সতরের জন্য আড়াল হয়ে যায় এবং জিন শয়তানেরা আর তার সতর বা লজ্জাস্থান দেখতে পায় না। তিরমিজী শরীফে আলী বিন আবি তালেব থেকে বর্ণিত। মহানবী (সঃ) বলেছেন: তোমাদের কেউ পেশাবখানা ও পায়খানায় ঢুকে বিসমিল্লাহ বললে তার সতর ও জিনের চোখের মধ্যে আড়াল সৃষ্টি হয়।
জাবের থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেন: বনি আদমের সতর ও শয়তানের দৃষ্টির মধ্যে পর্দা হচ্ছে, কোন মুসলমান কাপড় খোলার সময় যদি এ দোআ পড়ে بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ সেই আল্লাহর নামে কাপড় খুলছি যিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই। (সুনানে দাইলামী)
কাতাদাহ আবদুল্লাহ বিন সারজান থেকে বর্ণনা করেছেন: إِنَّ النَّبِيَّ ﷺ نَهَى أَنْ تُبَالَ فِي الْجُحْرِ.
'নবী (সঃ) গর্তে পেশাব করতে নিষেধ করেছেন (আবু দাউদ) কাতাদাকে জিজ্ঞেস করা হল, গর্তে পেশাব করার ব্যাপারে কি বলা হয়েছে? তিনি বলেন, গর্ত জিনের বাসস্থান।
পানিতে জিন বাস করে। আবদুর রায়েক তাঁর মোসান্নাফ গ্রন্থে আবু জাফর মোহাম্মদ বিন আলী থেকে বর্ণনা করেছেন, 'হাসান ও হোসেন ফোরাত নদীতে নামেন, তাদের পরনে ছিল ইজার বা লুঙ্গি। তাঁরা বলেন, 'পানির রয়েছে বিশেষ অধিবাসী।' অর্থাৎ জিন।
আবু না'মী তার শরহ গ্রন্থে লিখেছেন কথিত আছে যে, পানি রাত্রে জিনের জন্য। কেউ যেন পানিতে পেশাব না করে কিংবা গোসল না করে। জিনের পক্ষ থেকে বিপদ নেমে আসার সম্ভাবনা আছে।
ইবনু আদী তাঁর 'কামেল' গ্রন্থে লিখেছেন, আবু হোরায়রা থেকে বর্ণিত। 'রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফসলের ক্ষেতে পায়খানা করতে নিষেধ করেছেন। কেননা তা তোমাদের ভাই জিনদের বাসস্থান।
ইবনুর রাফআহ তাঁর কেনায়া গ্রন্থে লিখেছেন, জিনের কারণে টয়লেটে খালি মাথায় না যাওয়া উত্তম। মাথা ঢাকার জন্য কিছু না পেলে অন্তত জামার হাত হলেও মাথার উপর দেয়া ভাল।
নাপাক জায়গা শয়তানের আড্ডা। তাই ফেকাহবিদগণ গরু ও ঘোড়ার আস্তাবলে কিংবা টয়লেটে নামাজ পড়াকে নাজায়েয বলেছেন।
কবরস্থানেও শয়তান থাকে। যারা কবরকে কেন্দ্র করে শিরক করে শয়তান তাদেরকে সাহায্য করে। কবরপূজা, কবরে ওরস অনুষ্ঠান, খাওয়া-দাওয়া, বাতি জ্বালানো, ফুল ও আতরদান, কবরে ঘর তৈরি সহ কবর ভিত্তিক যাবতীয় কার্যক্রম শিরক। কবর শিরকের বিরাট মাধ্যম। শয়তান কবরপুজারীদের সাথে কথা বলে, বিভিন্ন ইশারা-ইঙ্গিত দিয়ে বিভ্রান্ত করে, কবরপুজারীরা সেগুলোকে বুজুর্গী ও কারামত মনে করে শরীয়তের শত নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তা থেকে বিরত হয় না। উল্টো বিরোধীদেরকে কম ঈমানদার বলে বিবেচনা করে। অনুরূপভাবে শয়তান গণক, ভবিষ্যদ্বক্তা এবং মুর্তি পূজারীদের সাথেও কথা বলে এবং তথাকথিত বুজুর্গীর আলামত ও নমুনা দেখায়। যাদুকর, সূর্য ও চন্দ্র পুজারী এবং তারকাপুজারীদেরও একই অবস্থা। শয়তান তাদের বিভিন্ন প্রয়োজন ও মতলব পূরণ করে। যেমন, কাউকে হত্যা করা, কাউকে অসুস্থ করে তোলা, কাউকে অর্থ-সম্পদ দান এবং কাউকে সন্তান ধারণে সাহায্য করে, ইত্যাদি। কেননা, তারা শক্তির মালিক নয়, সকল শক্তির মালিক হলেন আল্লাহ
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা বুঝা গেল, জিনেরা নীচু ভূমি, পেশাবখানা, পায়খানা, ময়লা আবর্জনার স্থান, গরু, ছাগল, উট, গাধা, ঘোড়া ও হাতীর আস্তাবল, কবরস্থান, ঘর-বাড়ী ও গাছপালা ইত্যাদিতে বাস করে। তাদের বাসের জন্য আলাদা কোন ভূখন্ড নেই। তারা মানব সমাজেই বাস করে।
টিকাঃ
১. আকামুল মারজান-কাজী বদরুদ্দীন শিবলী।
২. ঐ
১. ঐ