📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 জিনের সৃষ্টি

📄 জিনের সৃষ্টি


জিন ও মানুষ আল্লাহর অনন্য সৃষ্টি। মানুষের সৃষ্টি সম্পর্কে মানুষের কিছু তথ্য জানা আছে। কিন্তু জিন সম্পর্কে বলতে গেলে তেমন কিছু জানা নেই। তাই মানব মনে জিন সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রশ্ন উঁকি-ঝুঁকি মারে। জিন কোথা থেকে আসল, কিভাবে আসল, জিনের উপাদান ও বৈশিষ্ট্য কি, তাদের সৃষ্টি ব্যতিক্রমধর্মী কেন? তারা তো অদৃশ্য। তা সত্ত্বেও তাদের আছর ও আক্রমণ দৃশ্যগোচর! তাহলে, জিন কি মানুষের একতরফা ক্ষতি সাধন করবে আর মানুষ তাদের অসহায় শিকারে পরিণত হতে থাকবে? জিনের ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য মানুষের কি কোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই? জিন আল্লাহর এক সৃষ্টি রহস্য। এখন আমরা এ সম্পর্কে ধারাবাহিক আলোচনা করবো।
আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ মানুষ সৃষ্টির দু'হাজার বছর আগে জিন সৃষ্টি করেছেন। আবদুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে বর্ণিত। জমীনের অধিবাসী ছিল জিন। আর আসমানের অধিবাসী ছিল ফেরেশতা। নীচ আসমানের চাইতে উপরের আসমানের ফেরেশতারা অধিকতর ইবাদত, দোআ, নামাজ ও তাসবীহতে ব্যস্ত থাকে। ১.
ইবনে আব্বাস থেকে আরো বর্ণিত। আল্লাহ জিন জাতির আদি পুরুষ সুমিয়াকে আগুনের জ্বলন্ত শিখা থেকে সৃষ্টি করেন। এরপর আল্লাহ বলেন : তুমি ইচ্ছা প্রকাশ কর। তখন সে ইচ্ছা প্রকাশ করে বলল, আমরা যেন দেখি এবং আমাদেরকে যেন কেউ না দেখে। আল্লাহ তার সে ইচ্ছা কবুল করেন। এরপর তার বংশধরকে জমীনে পাঠান। তাদের মধ্যে ইউসুফ নামক এক ফেরেশতা ছিল। তারা তাকে হত্যা করল। তখন আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে মওজুদ ফেরেশতা বাহিনীকে পাঠান। তাদের নাম ছিল জিন। ইবলিশও তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফেরেশতা বাহিনীর সংখ্যা ছিল ৪ হাজার। তারা জমীনের অধিবাসীদেরকে পরাজিত করল এবং সাগরের দ্বীপসমূহে তাদেরকে নির্বাসিত করল। তখন ইবলিশসহ অন্যান্য ফেরেশতা বাহিনী জমীনে বাস করা শুরু করল। তারা এখানে বাস করা পছন্দ করল। ২.
মোজাহিদ থেকে বর্ণিত। ইবলিশ বলে: জমীন এবং দুনিয়ার আসমানের উপর ছিল আমার কর্তৃত্ব। অপরদিকে আল্লাহর কাছে ঊর্ধ্বজগতে লেখা ছিল যে, তিনি জমীনে নিজ খলীফা সৃষ্টি করবেন। ইবলিশ তা দেখেছে যা অন্য কোন ফেরেশতার পক্ষে দেখা সম্ভব হয়নি। ইবলিশ তখনই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, সে কখনও আদমকে সাজদা করবে না। ইবলিশ অন্যান্য ফেরেশতাদেরকে বলেছে যে, এই খলিফারা দুনিয়ায় ফেতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করবে। তাই আল্লাহ যখন ফেরেশতাদের কাছে মানুষ-খলিফা সৃষ্টির ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তখন ফেরেশতারা বলে যে, আপনি কি এমন কিছু সৃষ্টি করবেন যারা জমীনে ফেতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করবে? যেমন জিনেরা ইতিপূর্বে করেছিল, তারা ইতিপূর্বে তাদেরই এক ব্যক্তি ইউসুফকে হত্যা করেছিল। ১.
আল্লাহ তাদের প্রশ্নের জবাবে বলেন: إِنِّي أَعْلَمُ مَا لَا تَعْلَمُونَ "নিশ্চয়ই আমি যা জানি, তোমরা তা জান না।" এরপর আল্লাহ আদম (আঃ)-কে সকল কিছুর নাম শিক্ষা দেন এবং ফেরেশতাদেরকে সে সকল নাম বলার জন্য পরীক্ষা করেন। ফেরেশতারা অপারগতা প্রকাশ করায় আদম (আঃ)-কে নির্দেশ দেন। তিনি নাম বলতে সক্ষম হন। তাদের উপর আদমের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়।

টিকাঃ
১. আকামুল মারজান ফি আহকামিল জান্ন-কাজী বদরুদ্দিন শিবলী।
২. ঐ
১. ঐ

📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 জিনের অস্তিত্ব

📄 জিনের অস্তিত্ব


আল্লামা শেখ তকি উদ্দিন ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, মুসলমানের কোন সম্প্রদায় জিনের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে না। অনুরূপ অমুসলমানরাও তা অবিশ্বাস করেনা। কেননা, জিনের তথ্যাবলী নবীগণ থেকে অব্যাহতভাবে বর্ণিত হয়েছে এবং সাধারণ ও অসাধারণ সকল লোক সে সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। অজ্ঞ কিছু সংখ্যক দার্শনিক ও গোমরাহ ব্যক্তি ছাড়া কেউ তা অস্বীকার করে না। পৃথিবীর নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক জিনকে স্বীকার করে। ইহুদী এবং খ্রীস্টানরাও জিনকে স্বীকার করে। জোহমিয়া ও মোতাজেলা সম্প্রদায় জিনকে স্বীকার করে না। অন্যান্য সকল কাফের-মোশরেকরাও জিনের অস্তিত্ব স্বীকার করে।
যারা জিনের অস্তিত্ব স্বীকার করে না তারা মুসলমান হতে পারে না। কেননা, জিনের অস্তিত্বের কথা স্বয়ং কোরআন ও হাদীস দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত। পবিত্র কোরআনে মহানবী (সঃ)-এর কাছে জিনদের কোরআন শুনার ঘটনা বর্ণিত আছে। জিনেরা আগে আসমান থেকে কর্তব্যরত ফেরেশতাদের কিছু কথাবার্তা চুরি করে শুনতো এবং পৃথিবীতে এসে লোকদেরকে বিভ্রান্ত করত। যখন কোরআন নাজিল হল, তখন কোরআনের সর্বাধিক হেফাজতের লক্ষ্যে জিনদের আসমানী কথা চুরি করে শোনা বন্ধ করে দেয়া হল। তারা বুঝতে পারলনা যে, তাদের এ সুযোগ বন্ধের পেছনে কারণ কি? তারা নিজেরা বলাবলি করল: "আমরা আকাশ পর্যবেক্ষণ করছি, আমরা দেখতে পেয়েছি যে, কঠোর প্রহরী ও উল্কাপিণ্ড দ্বারা আকাশ পরিপূর্ণ। আমরা আকাশের বিভিন্ন ঘাঁটিতে সংবাদ শুনার জন্য বসতাম। এখন কেউ সংবাদ শুনতে চাইলে সে জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ডকে ওঁৎ পেতে থাকতে দেখে। আমরা জানি না, পৃথিবীবাসীর অকল্যাণ সাধন করা লক্ষ্য, না তাদের পালনকর্তা তাদের কল্যাণ সাধনের ইচ্ছা রাখেন।" -(সূরা জিন: ৯-১১)
"আল্লাহ জিনদের কোরআন শোনা সম্পর্কে বলেছেন: "বলুন, আমার প্রতি অহী নাজিল করা হয়েছে যে, জিনদের একটি দল কোরআন শুনেছে। এরপর তারা বলেছে, আমরা আশ্চর্য কোরআন শুনেছি যা সৎপথ দেখায়। আমরা তা বিশ্বাস করেছি ও ঈমান এনেছি। আমরা আর কখনও আমাদের রবের সাথে কাউকে শরীক করবো না।" -(সূরা জিন: ১-৩)
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ আরো বলেন: "আমি যখন একদল জিনকে আপনার প্রতি আকৃষ্ট করেছিলাম এবং তারা কোরআন শুনছিল। তারা সেখানে উপস্থিত হয়ে পরস্পরকে বলল, চুপ থাক। কোরআন শোনার পর তারা তাদের সম্প্রদায়ের কাছে সতর্ককারীরূপে ফিরে গেল। তারা বলল, হে আমাদের সম্প্রদায়! আমরা এমন এক কিতাব শুনেছি যা মূসার পরে অবতীর্ণ হয়েছে এবং তা আগের সকল কিতাবের সত্যায়ণ করে, সত্য ও সরল পথের দিকে পরিচালিত করে। হে আমাদের সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর দিকে আহবানকারীর কথা মেনে নাও এবং তাঁর প্রতি ঈমান আন। আল্লাহ তোমাদের গুনাহ মাফ করবেন এবং তোমাদেরকে কষ্টদায়ক আজাব থেকে রক্ষা করবেন।" -(সূরা আহকাফ-২৯-৩১)
কোরআনের এ প্রকাশ্য বর্ণনা থাকা সত্ত্বেও জিনকে অস্বীকারকারী ব্যক্তি কিভাবে মুসলমান থাকতে পারে?
একদল গোমরাহ লোক কোরআনে বর্ণিত জিনকে জংলী মানুষ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তাদের দৃষ্টিতে জিন বলতে মূলতঃ অশিক্ষিত বন্য মানুষকে বুঝানো হয়েছে, এর আর কোন অর্থ নেই। অথচ, সূরা জিনের প্রথম তিন আয়াতে আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাঁর কাছ থেকে জিনদের কোরআন শোনার ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। জিনরা কখন মহানবীর কাছ থেকে কোরআন শুনেছে তিনি নিজেও তা জানতেন না। যদি তারা বন্য-মানুষ হত, তাহলে, তিনি অবশ্যই তাদেরকে দেখতেন। এর দ্বারা তাদের ভ্রান্ত চিন্তার খোলস উন্মোচিত হয়ে যায়।
অবশ্য পরবর্তীতে জিনেরা মহানবীর কাছে এসেছে এবং কোরআন শুনেছে। তাদের অনুরোধে তিনি তাদেরকে দীন ও কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন।
জিনকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। জাতি হিসেবে বলা হয় জিন জাতি। ক্ষতিকর জিনকে ভূত-প্রেত বলা হয়। মহিলা জিনকে পরী বলা হয়। অধিক শক্তিধর ও দাপট বিশিষ্ট জিনকে দৈত্য-দানব বলা হয়। নেক কাজ, যেমন- নামাজ, রোজা, হজ্জ ও জিকর-আযকারে বাধাসৃষ্টিকারী জিনকে শয়তান বলা হয়। দুষ্ট জিনকে খান্নাসও বলা হয়। ইবলিশ হচ্ছে জিনের সরদার। নেক্কার জিনের সংখ্যাও প্রচুর। তাদেরকে শয়তান বলা হয় না।
নাফরমান জিনেরা ইবলিশেরই সন্তান। অনুরূপভাবে কট্টর নাফরমান ও বেশী দুষ্ট জিনেরাও ইবলিশের সন্তান। তারাই তার সহযোগী। সকল খারাপ ও মন্দ কাজে তারা তার সাহায্য সহযোগীতা করে। আল্লামা জাওহারী বলেছেন, সকল খোদাদ্রোহী ও নাফরমান এবং ক্ষতিকর মানুষ, জিন ও পশুকে শয়তান বলা হয়। একারণে আরবরা সাপকেও শয়তান বলে থাকে।
ইবনু আবিদ দুনিয়া ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, ইবলিশ যখন ফেরেশতাদের সাথে ছিল তখন তার নাম ছিল আযাযীল। সে ডানা বিশিষ্ট ৪ ফেরেশতার একজন ছিল। আল্লাহর লা'নতের পর সে রহমত থেকে বঞ্চিত হল এবং তার নাম হল ইবলিশ। কেননা, ইবলিশ মানে রহমত থেকে বঞ্চিত।
আবুল মোসান্না থেকে বর্ণিত। ইবলিশের আগের নাম ছিল নায়েল। আল্লাহর গযব নাজিলের পর তার নাম হল শয়তান। ইবনু আব্বাসের এক বর্ণনায় এসেছে, ইবলিশ যখন নাফরমানী করল, তার উপর লা'নত বর্ষিত হল এবং সে শয়তান হয়ে গেল।
আবুশ শেখ তাঁর আ'জামা কিতাবে লিখেছেন: ওহাব, ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহ দোজখের আগে বেহেশত, ক্রোধের আগে দয়া, জমীনের আগে আসমান, তারকার আগে চাঁদ- সূর্য, রাতের আগে দিন, স্থলের আগে সাগর, পাহাড়ের আগে জমীন, জিনের আগে ফেরেশতা, মানুষের আগে জিন এবং নারীর আগে পুরুষ সৃষ্টি করেছেন।১.
জিনের অস্তিত্বের বাস্তব সত্যতার অগণিত নজীর আছে। জিন-ভূত তাড়ানোর কাজে পেশাদার কবিরাজ ও চিকিৎসকদের অধীন জিন থাকে। তারা এই চিকিৎসার কাজে সেগুলোকে ব্যবহার করে। যদিও একাজে জিনের সাহায্যে চাওয়া কোরআন বিরোধী, তথাপি তারা একাজ করে থাকে। যারা তাদের কাছে জিন দেখার আবদার করেছে সে রকম প্রত্যক্ষদর্শীরা আমাকে বলেছেন, তারা রাত্রে এক ঘরে বসা। কবিরাজ তার জিনকে ডাকলেন। জিন আসল। কিন্তু ঘরকে ভীষণ এক নাড়া দিল। ঘরের উপর যে গাছটি ছিল তাকে যেন উপড়ে ফেলার মত কঠোর ঝাঁকি দিল। আলো জ্বালানো নিষিদ্ধ করা হল। তারপর জিন ঘরের ভেতর ঢুকল। অন্ধকারের মধ্যে হাত দিয়ে দেখা গেল তার শরীরে বিড়ালের পশমের মত লোম রয়েছে।
ভারতের প্রখ্যাত মাদ্রাসা দেওবন্দ। সে মাদ্রাসায় অধ্যয়নকারী এক জিন ছাত্র মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে থাকত। একদিন তাকে উপরতলা থেকে নীচের আঙ্গিনায় শুকানোর জন্য দেয়া কাপড় লম্বা-হাত দিয়ে নিতে অন্যরা দেখল। ঘটনা প্রকাশের পর পরই ছাত্রটি নিরুদ্দেশ হয়ে গেল।
সাদা পোশাক ও পাগড়ী পরিহিত মোসল্লীকে গভীর রাতে মসজিদে নামাজরত দেখা গেল। কিন্তু পরক্ষণেই আর নেই। এছাড়া একদিন জিনেরা দোআ-দরুদ পড়ল এবং মিষ্টি খেল। যে মসজিদে তারা মিলিত হয়েছে, সে মসজিদের ইমাম সাহেবকেও তারা মিষ্টি দিল। সে ইমাম সাহেব আমার আত্মীয়। তাঁর কাছেই আমরা এ দু'টো ঘটনা শুনেছি। এছাড়াও তিনি একদিন সন্ধ্যায় এক বিজন মাঠ অতিক্রমের সময় যেখানে কিছু গাছ-গাছালি ছিল— সেখানে একটা মুরগী অনেকগুলো বাচ্চা নিয়ে তাঁর পথে বসে আওয়াজ দিচ্ছিল। তিনি বিভিন্ন দোআ পড়ার পর সেগুলো চলে গেল।
আমার আরেক নিকটাত্মীয়া জানিয়েছেন, তাঁর বাড়ীতে ভোর বেলায় তিনি বহুদিন বাঁশঝাড়সহ অন্যান্য গাছের মাথায় বেশ কিছু শিয়ালকে চলাচল করতে দেখেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই সেগুলো অস্তিত্বহীন হয়ে যায়।
আমার আরেক আত্মীয় সন্ধ্যায় ঘরে ফিরার পথে মাঠে এক গাভী এসে হাঁ করে তাকে বলে, 'আমার পেটে প্রবেশ কর।' তারপর গাভীটি চলে যায়। এতে সে আত্মীয়টি ভয় পেয়ে যায়।
আমার আরেক বন্ধু এক মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। তার কাছে এক জিন ছাত্র পড়ত। তিনি জানেন না যে, কে সে ছাত্র। কিন্তু ছাত্রটির জিন ভাই শিক্ষকের ঘরে এসে অদৃশ্য থেকে বলেছে যে, আমার এক ভাই আপনার ছাত্র। তারপর তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন যাবত নিয়মিত চিঠি বিনিময় হয়। হঠাৎ করে তার সামনে একটি চিঠি পড়ত। তিনি তা পড়তেন। তারপর তিনি একটা চিঠি লিখে ঝুলিয়ে রাখতেন। জিনটি এসে নিয়ে যেত। মূলতঃ জিনটি ঐ শিক্ষককে খুব শ্রদ্ধা করত। শিক্ষক নিজেই আমাকে একথা বলেছেন।
ভূতে ধরেছে এমন রোগীর সংখ্যা মোটেই কম নয়। কম-বেশী প্রত্যেক এলাকায় তার অস্তিত্ব রয়েছে। জিন-ভূত না থাকলে তা কিভাবে মানুষকে ধরে?
ভূতে ধরার পর রোগী বকাবকি করে এবং এমন সব তথ্য প্রকাশ করে যা স্বভাবতই তার পক্ষে প্রকাশ করা অসম্ভব। ছোট বালক-বালিকা জিন-ভূতের প্রভাবে রোগী হলে তারা বয়স্ক লোকদের মত বিজ্ঞ কথা-বার্তা বলে। এগুলো কি জিনের অস্তিত্বের প্রমাণ নয়?
এমনও দেখা গেছে, ভূতগ্রস্তরোগী হঠাৎ করে উধাও হয়ে গেছে কিংবা ওপরে উঠে গেছে এবং গাছের বা ঘরের ছাদে সিঁড়ি ছাড়াই উঠে গেছে। এটা কিভাবে সম্ভব হয়? জিনের সহযোগীতা ছাড়া তা হতে পারে না।
হযরত সোলায়মান (আঃ) জিনদেরকে দিয়ে মসজিদে আকসা নির্মাণ করেছেন। কোরআনে তার বর্ণনা রয়েছে।
সৌদী আরবের জেনারেল মুফতী শেখ আবদুল আযীয বিন বায (রঃ) এক ভূতগ্রস্ত রোগী থেকে একজন মোশরেক জিনকে তাড়িয়েছেন। জিনটি নিজেই তাঁর কাছে এ স্বীকারোক্তি করেছে। এ জাতীয় আরো অগণিত প্রমাণ রয়েছে। জিন যে বাস্তব সত্য একথা কোরআন মজীদে একাধিক জায়গায় এসেছে। আল্লাহ বলেছেন:
لَمْ يَطْمِثْهُنَّ إِنْسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانٌّ .
"বেহেশতী হুরদেরকে ইতিপূর্বে কোন মানুষ বা জিন স্পর্শ করেনি।" -(সূরা আর-রাহমান ৫৬)
আল্লাহ আরো বলেন:
فَيَوْمَئِذٍ لَا يُسْأَلُ عَنْ ذَنْبِهِ إِنْسٌ وَلَا جَانٌ .
"সেদিন মানুষ এবং জিনকে তাদের গুনাহ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে না। কেননা, তাদের আমলনামাই এজন্য যথেষ্ট।" -(সূরা আর-রাহমান-৩৯)

টিকাঃ
১. লাড্ডুল মারজান ফি আহকামিল জান-জালালুদ্দিন সুয়তী।

📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 জিন শব্দের অর্থ

📄 জিন শব্দের অর্থ


জনের অর্থ ঢাকা ও আচ্ছন্ন করা। যেমন বলা হয় جَنَّ اللَّيْلُ النَّهَارَ 'রাত দিনকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। যে জিনিস দেখা যায় না বা যা আচ্ছন্ন হয়ে যায় তাকে জিন বলে। আল্লাহ মোমেনদের জন্য যে জান্নাত সৃষ্টি করেছেন, সে জান্নাত শব্দের উৎসও একই। তাও দৃশ্যগোচর নয়। আইয়ামে জাহেলিয়াতের লোকেরা অদৃশ্য হওয়ার কারণে ফেরেশতাকেও জিন বলত।
আল্লামা জাওহারী বলেছেন, জিনের আদি পুরুষ হচ্ছে ৩। তার থেকে উৎপত্তির কারণে তার বংশধরকে জিন বলা হয়। ইবনু আকীল হাম্বলী বলেছেন: জিনকে জিন বলার কারণ হল, তা মানুষের চোখ থেকে অদৃশ্য। এর প্রমাণ হিসেবে আল্লাহ বলেছেন:
إِنَّهُ يَرَاكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمْ .
"সে এবং তার দলবল (শয়তান) তোমাদেরকে দেখে, কিন্তু তোমরা তাদেরকে দেখ না।" (সূরা আরাফ-২৭)
গর্ভবর্তী মায়ের পেটের ভ্রূণকেও একই কারণে জুনিন বলা হয়, যা সাধারণত দেখা যায় না। যুদ্ধের সময় যোদ্ধাকে অন্যের আক্রমণের হাত থেকে আড়াল করার জন্য ঢালকে জুন্নাহ বলে। এসকল শব্দের উৎস এক ও অভিন্ন।
পরিভাষায় জিন বলা হয় এমন সত্তাকে যার বিবেক ও ইচ্ছাশক্তি আছে, মানুষের মতই সে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালনের জন্য সৃষ্ট, জড় উপাদানমুক্ত, মানুষের ইন্দ্রিয় শক্তি বহির্ভূত, স্বরূপে তাকে দেখা যায় না, বিভিন্ন আকার-আকৃতি ধারনে সক্ষম, যারা পানাহার করে, বিয়ে-শাদী করে, যাদের সন্তান সন্তুতি রয়েছে এবং যাদেরকে আখেরাতে নিজ নিজ কর্মের হিসেব দিতে হবে। ১
এ সংজ্ঞার আলোকে জিন জাতি আকৃতি ও মৌল পদার্থের দিক থেকে মানব বৈশিষ্ট্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। জিন আগুনের মৌলিক উপাদান থেকে তৈরি হলেও সে বিভিন্ন রূপ ও আকৃতি ধারণ করতে পারে, যা মানুষ পারে না। তারা দ্রুত চলাচলে সক্ষম। এমর্মে আল্লাহ বলেন:
قَالَ عِفْرِيْتٌ مِّنَ الْجِنِّ أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَنْ تَقُومَ مِنْ مَقَامِكَ : وَإِنِّي عَلَيْهِ لَقَوِيٌّ أَمِينٌ *
"এক দৈত্য-জিন হযরত সোলায়মান (আঃ)-কে বলল, আপনি আপনার স্থান থেকে উঠার আগে আমি বিলকিসের সিংহাসন এনে দেব এবং আমি এ কাজে শক্তিবাণ ও বিশ্বস্ত।" -(সূরা নামল-৩৯)
জিনেরা কঠোর কাজ করতে সক্ষম। আল্লাহ বলেন: "কিছু জিন সোলায়মানের সামনে কাজ করত তার পালনকর্তার আদেশে। তাদের যে কেউ আমার আদেশ অমান্য করবে, আমি তাকে জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি ভোগ করাবো। তারা সোলায়মানের ইচ্ছানুযায়ী দুর্গ, ভাস্কর্য, হাউজের মত বড় বড় পাত্র এবং চুল্লীর উপর স্থাপিত বিশাল ডেপসমূহ তৈরি করত।" -(সূরা সাবা-১২-১৩)

টিকাঃ
১. আল আকায়েদ আল ইসলামিয়া-সাইয়েদ সাবেক।

📘 জ্বিন ও শয়তানের ইতিকথা > 📄 জিন সৃষ্টির উপাদান

📄 জিন সৃষ্টির উপাদান


আল্লাহ জিন সৃষ্টির মূল উপাদান সম্পর্কে বলেছেন: وَالْجَانَّ خَلَقْنَاهُ مِنْ قَبْلُ مِنْ نَّارِ السَّمَومِ .
“এবং জিনকে আগে লু-এর আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছি।" -(সূরা হিজর-২৭) সামূম (লু) দ্বারা, আগুনের কঠোরতা বুঝানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন- وَخَلَقَ الْجَانَّ مِّنْ مَّارِجٍ مِّنْ نَّارٍ .
"তিনি জিনকে অগ্নিশিখা থেকে সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা আর-রাহমান-১৫) আল্লাহ ইবলিশের বক্তব্য প্রকাশ করে বলেন: خَلَقْتَنِي مِنْ نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ .
"আপনি আমাকে আগুন থেকে এবং তাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন।" -(সূরা আরাফ-১২)
আবুল ওয়াফা বিন আকীল তাঁর আলফুনুন বইতে লিখেছেন, এক ব্যক্তি জিন সম্পর্কে জানতে চাইল এবং বলল, আল্লাহ বলেছেন, তিনি তাদেরকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং আরো বলেছেন যে, অগ্নিশিখা তাদের ক্ষতি করে ও জ্বালিয়ে দেয়। প্রশ্ন হল, আগুন কি করে আগুনকে জ্বালিয়ে দেয়? এ প্রশ্নের জবাব হল, আল্লাহ শয়তান এবং জিনকে আগুনের প্রতি সম্বোধন করেছেন। যেমন তিনি মানুষকে মাটি, কাদা ও শক্ত মাটির প্রতি সম্বোধন করেছেন। এর অর্থ এ নয় যে, মানুষ বাস্তবে মাটি কিন্তু তার আসল উপাদান হল মাটি। তেমনি জিনের আসল উপাদান আগুন। যদি সে কেবলমাত্র আগুনই হয়, তাহলে নবী (সঃ) শয়তানকে নামাজে গলাটিপে ধরায় তার জিহবার আর্দ্রতা কিভাবে অনুভব করলেন? আগুন হলে তো জিহবায় আর্দ্রতা থাকারও কথা নয়।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিনকে 'নাবাতে'র সাথে তুলনা করেছেন। 'নাবাত' হল বিভিন্ন ধরনের সাধারণ মানুষ। যদি তাদের আকার-আকৃতি না থাকত এবং শুধু আগুন হত, তাহলে, তিনি তাদের স্বরূপ ও আকৃতির কথা উল্লেখ না করে কেবল অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ও অগ্নিশিখার কথাই উল্লেখ করতেন।
আরেক হাদীসে এসেছে, মহানবী (সঃ) বলেছেন, আমি একদিন শয়তানকে দেখলাম সে জ্বলন্ত অগ্নিশিখা নিয়ে আমাকে জ্বালিয়ে দেয়ার জন্য অগ্রসর হচ্ছিল। আমি আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে তিনবার আশ্রয় চাইলাম। এরপর তাকে ধরে ফেলার ইচ্ছা করলাম। কিন্তু হযরত সোলায়মান (আঃ)-এর দোআর কথা মনে পড়ায় আমি আর তাকে ধরলাম না। নচেৎ, আমি তাকে মসজিদের খুঁটির সাথে বেঁধে রাখতাম এবং মদীনার শিশুরা তার সাথে খেলা করত। -(মুসলিম) যদি শয়তান নিজেই জ্বলন্ত আগুন হয়, তাহলে সে কেন আগুনের শিখা নিয়ে এসেছিল?
কাজী আবু বকর বলেছেন, জিনকে আগুন থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তারপর আল্লাহ তাদেরকে বিভিন্ন আকৃতি দিয়েছেন। তাদের শরীর আগুনের তুলনায় ভারী করেছেন এবং আগুনের অতিরিক্ত কিছু উপাদান যোগ করে দিয়েছেন। ফলে, তারা শুধু আর আগুন হিসেবে অবশিষ্ট থাকেনি। ১. জিনের শরীর যেমন সুক্ষ্ম তেমনি ভারীও।

টিকাঃ
১. আল আকায়েদ আল ইসলামিয়া-সাইয়েদ সাবেক।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00