📄 জ্বিনকে গালাগালি ও মারধর করা
কাউকে জ্বিন পেলে, তাকে সাহায্য করা উচিত। কারণ সে মযলুম। তবে সাহায্য হবে ইনসাফ মতো; যেমন মহান আল্লাহ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু উপদেশ ছলে কোন আদেশ-নিষেধ মানতে যদি সে জ্বিন রাজি না হয়, তাহলে তাকে ধমক দেওয়া, গালি দেওয়া, অভিশাপ করা, মারের হুমকি দেওয়া বৈধ। যেমন নবী এর মুখে শয়তান আগুন দিতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, 'আউযু বিল্লাহি মিনক্, আলআনুকা বিলা'নাতিল্লাহ।' (তোর থেকে আল্লাহর পানাহ চাচ্ছি, আল্লাহর অভিশাপে তোকে অভিশাপ দিচ্ছি।)
তাতেও যদি কাজ না হয়, তাহলে জ্বিন তাড়াবার জন্য প্রহারের প্রয়োজন পড়তে পারে। আর তখন রোগীকে মারলে আসলে মার পড়বে জ্বিনের উপর, সেই তার ব্যথা অনুভব করবে। অবশ্য সে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর অবশিষ্ট ব্যথার রেশ রোগী অনুভব করবে।
কিন্তু মারার আগে ওঝার উচিত সর্বাগ্রে রোগ নির্ণয় করা। সম্ভবতঃ রোগীর উন্মাদনা বা মস্তিষ্ক-বিকৃতি (ব্রেন ডিফেক্ট) অথবা মুচ্ছা (হিস্টিরিয়া) জাতীয় কোন রোগও হতে পারে। অতএব জ্বিন মনে করে শুধু শুধু মারধর করে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ দেওয়া উচিত নয়। আবার অনেক সময় রোগীর উপর কারো যাদুর প্রতিক্রিয়া, কিংবা তার কোন মানসিক রোগ অথবা কোন অভীষ্ট লাভের আশায় সুপরিকল্পিত অভিনয় (ছলা-কলা)ও হতে পারে। অভিজ্ঞ চিকিৎসক বা ওঝা তা সহজেই নির্ণয় করতে পারেন।
تَعْمَلُونَ
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে (হকের উপর) দীঢ় প্রতিষ্ঠিত (এবং) ন্যায়পরায়ণতার সাথে সাক্ষ্যদাতা হও। কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন কখনও সুবিচার না করাতে প্ররোচিত না করে। সুবিচার কর, এটা আত্মসংযমের নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন।"৪১৬
এই জন্য বাড়ির ভিতরে সাপ দেখলে তা হুট্ করে হত্যা করে বসা উচিত নয়। তাকে তিন দিন সতর্ক করার পরও থেকে গেলে হত্যা করা যাবে। আর তখন তা অন্যায় হবে না। সাধারণ সাপ হলে, সে মানুষের শত্রু, তাকে হত্যা করা বৈধ। আর জ্বিন হলে সে অবাধ্য এবং সাপরূপে মানুষকে কষ্ট দিতে বদ্ধপরিকর। তখন তার সাজা সে ভোগ করবে। নচেৎ অকারণে জ্বিন হত্যা বৈধ নয়।
টিকাঃ
৪১৬. সূরা মায়িদাহ-৫:৮
📄 দু'আ-যিকর ও কুরআনী আয়াত পড়ে জ্বিন ছাড়ানো
জ্বিন ছাড়ানোর সর্বশ্রেষ্ঠ ওষুধ হল, আল্লাহর যিক্র ও কুরআনী আয়াত। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় মন্ত্র হল আয়াতুল কুরসী। এর মাহাত্ম্য সম্বন্ধে খোদ শয়তান অবহিত। সেই বলেছে, এটা পাঠ করা হলে শয়তান নিকটবর্তী হয় না। আর তার সত্যায়ন করে নবী বলেছেন, ‘সে সত্যই বলেছে, অথচ সে ভীষণ মিথ্যুক।‘৪১৭
যারে’ নামক জনৈক সাহাবী তাঁর এক উন্মাদ ছেলে অথবা ভাগ্নেকে সঙ্গে নিয়ে রসূল এর নিকট এলেন এবং তার জন্য তাঁকে দু’আ করার আবেদন জানালেন। তিনি ছেলেটিকে তাঁর কাছে নিয়ে আসতে আদেশ করলেন এবং বললেন, ‘ওর পিঠের দিকটা আমার নিকট কর।’ তারপর তিনি ছেলেটির কাপড়ে ধরে পিঠে আঘাত করতে করতে বললেন, ‘বের হ’ আল্লাহর দুশমন, বের হ’ আল্লাহর দুশমন’। সাথে সাথে ছেলেটি সুস্থ ও স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখতে লাগল। তিনি পানি দ্বারা তার মুখ মুছে দিলেন এবং তার জন্য দু’আ করলেন।৪১৮
অনুরূপভাবে অপর এক ঘটনায় তিনি এক শিশুর মুখে থুথু দিয়ে জিন বিতাড়িত করেছেন।৪১৯ প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, এই শ্রেণীর রোগে যদি ধৈর্যধারণ করে, তাহলে তার বিনিময়ে রয়েছে জান্নাত।
টিকাঃ
৪১৭. বুখারী ইফা, অনুচ্ছেদ, ১৪৩৮, তাও. হা/২৩১১
৪১৮. ইবনে মাজাহ তাও. হা/৩৫৪৮
৪১৯. মুসনাদে আহমাদ মাশা, হা/৪/১৭০-১৭১, সিলসিলা আহাদীসুস সহীহা মাশা. হা/৪৮৫, ২৯১৮
📄 জ্বিন ছাড়াবার জন্য ঈমানী শক্তি সবল চাই
সম্ভবতঃ জ্বিন ওঝার চেয়ে বেশী জবরও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ঈমানী শক্তি ও অধিক দু'আ-দরূদকে কার্যকরী করতে হবে। খবীস জ্বিন অধিক মিথ্যা বুলি এবং ঝুটা ভয় দেখিয়ে থাকে, তাতে কারো ভয় করা চলবে না। ঈমানী শক্তি সবল থাকলে কেবল আদেশ করলেই জ্বিন ভয়ে পলায়ন করবে। যেমন নবী এর অভিশাপ ও আদেশে শয়তান ভেগে গেছে।
তেমন কোন পরহেযগার প্রসিদ্ধ বান্দা থাকলে, তাঁর আদেশেও জ্বিন ভয়ে পালাবে। বর্ণিত আছে যে, একদা ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল মসজিদে বসে ছিলেন। এমন সময় খলীফা মুতাওয়াক্কিলের পক্ষ থেকে একজন লোক এসে বলল, 'আমীরুল মু'মিনীনের ঘরে একটি দাসীকে জ্বিন পেয়েছে। তিনি আমাকে আপনার কাছে পাঠালেন, যাতে আপনি তার জন্য রোগ নিরাময়ের দু'আ করেন।'
সুতরাং ইমাম তাকে কাঠের দুটি খরম দিয়ে বললেন, 'আমীরুল মু'মিনীনের ঘরে যাও এবং দাসীটির শিথানে বসে তার জ্বিনকে বল, আহমাদ তোমাকে বলছেন, তোমার কাছে কোন্টা বেশি প্রিয়, এই দাসীকে ছেড়ে বেরিয়ে যাবে, নাকি এই খরম দ্বারা সত্তর আঘাত খাবে?'
সুতরাং লোকটি ফিরে গিয়ে ইমামের বলা মতো বলল। জ্বিনটি দাসীটির মুখে বলল, 'আহমাদের আদেশ শুনলাম ও মান্য করলাম। তিনি যদি আমাকে ইরাক ছেড়ে চলে যেতে বলেন, তাহলে আমি তাও করব।' অতঃপর সে দাসীকে ছেড়ে বের হয়ে গেল। ইমাম ছিলেন আল্লাহর অনুগত। আর যে আল্লাহর আনুগত্য করে, সব কিছু তার অনুগত হয়ে যায়। দাসীটি মুক্তি পেল এবং তার সন্তানও হল।
পরবর্তীতে ইমাম আহমাদ ইন্তিকাল করলে সেই জ্বিন আবার ঐ দাসীর কাছে ফিরে আসে। অতঃপর আমীর ইমামের কোন ছাত্রকে ডেকে পাঠালেন। তিনি উক্ত খরম নিয়ে উপস্থিত হয়ে বললেন, 'বের হয়ে যাও, নাহলে এই খরম দিয়ে তোমাকে প্রহার করব।'
জ্বিনটি বলল, 'তোমার কথামতো আমি বের হব না। ইমাম আল্লাহর অনুগত ছিলেন, তাই আমরা তাঁর আনুগত্য করতে বাধ্য ছিলাম।'
বলা বাহুল্য, ব্যাপার যখন আধ্যাত্মিক, তখন ওঝাকেও আধ্যাত্মিক ব্যাপারে সবল হতে হবে। মজবুত ঈমানের সাথে আল্লাহর উপর নির্ভরশীল হতে হবে। দু'আ ও কুরআনী আয়াতের প্রভাবে পূর্ণ আস্থাশীল হবে। তার ঈমান ও তাওয়াক্কুল যত বেশি হবে, জ্বিন তত তাড়াতাড়ি তার আনুগত্য করবে। পক্ষান্তরে দুর্বল হলে জ্বিন তো পালাবেই না, উল্টা তাকে কষ্ট দিতে চেষ্টা করবে। আর আল্লাহই তওফীকদাতা।
আত্মা ইবনে আবী রাবাহ বলেন, একদা ইবনে আব্বাস আমাকে বললেন, 'আমি কি তোমাকে একটি জান্নাতী মহিলা দেখাব না!' আমি বললাম, 'হ্যাঁ!' তিনি বললেন, 'এই কৃষ্ণকায় মহিলাটি নবী এর নিকটে এসে বলল যে, আমার মৃগী (বা জ্বিন-পাওয়া) রোগ আছে, আর সে কারণে আমার দেহ থেকে কাপড় সরে যায়। সুতরাং আপনি আমার জন্য দু'আ করুন।' তিনি বললেন, "তুমি যদি চাও তাহলে সবর কর; এর বিনিময়ে তোমার জন্য জান্নাত রয়েছে। আর যদি চাও তাহলে আমি তোমার রোগ নিরাময়ের জন্য আল্লাহ তাআলার নিকটে দু'আ করব।" স্ত্রীলোকটি বলল, 'আমি সবর করব।' অতঃপর সে বলল, '(রোগ উঠার সময়) আমার দেহ থেকে কাপড় সরে যায়, সুতরাং আপনি আল্লাহর কাছে দু'আ করুন, যেন আমার দেহ থেকে কাপড় সরে না যায়।' ফলে নবী তার জন্য দু'আ করলেন। ৪২০
উক্ত মহিলার নাম উম্মে যুফার। আত্মা বলেন, 'আমি তাকে কা'বাগৃহের পর্দার সাথে দেখেছি।'
ইবনে আব্বাস বলেন, মেয়েটি বলেছে, 'খবীস আমাকে উলঙ্গ করতে চায়! '৪২১
টিকাঃ
৪২০. বুখারী ইফা, হা/৫১৩৬, আপ্র. হা/৫২৪০, তাও. হা/৫৬৫২, মুসলিম মাশা. হা/৬৭৩৬
৪২১. ফাতহুল বারী ১০/১১৫
📄 জ্বিন ছাড়াতে ঝাড়ফুঁক
একদা আবু হাবেস জুহনী কে নবী বললেন, "হে আবু হাবেস! আমি তোমাকে উত্তম ঝাড়-ফুঁকের কথা বলে দেব না কি, যার মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনাকারীরা আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকে?" তিনি বললেন, 'অবশ্যই বলে দিন।' নবী এই (ফালাক ও নাস) সূরা দুটিকে উল্লেখ করে বললেন, "এ সূরা দুটি হল মুআব্বিযাতান (ঝাড়-ফুঁকের মন্ত্র)। "৪২২
নবী মানুষ ও জ্বিনের বদ নজর থেকে (আল্লাহর) নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। যখন এই দুটি সূরা অবতীর্ণ হল, তখন থেকে তিনি ঐ দুটিকে প্রত্যহ পড়ার অভ্যাস বানিয়ে নিলেন এবং বাকী অন্যান্য (দু'আ) বর্জন করলেন।
* প্রথমতঃ যেন তা কুরআনী আয়াত, (সহীহ) দু'আয়ে রসূল অথবা আল্লাহর আসমা ও সিফাত (নাম ও গুণাবলী) দ্বারা হয়।
* দ্বিতীয়তঃ আরবী ভাষায় এবং তার অর্থ বোধগম্য হয়।
* তৃতীয়তঃ যেন রোগী ও ঝাড়ফুঁককারী এই বিশ্বাস রাখে যে, ঝাড়ফুঁকের (অনুরূপভাবে ঔষধের) নিজস্ব কোন শক্তি বা তাসীর নেই। বরং (তা আল্লাহর দানে) আরোগ্য তাঁর ইচ্ছা ও তকদীরের উপর হয়। অতএব কোন ফিরিশতা, জ্বিন বা কোন দেবতার নামের যিক্র নিয়ে অথবা কোন অর্থহীন মনগড়া হিজিবিজি মন্ত্রতন্ত্র দ্বারা ঝাড়ফুঁক করা বা করানো শির্কের অন্তর্ভুক্ত। রসূল বলেছেন,
إِنَّ الرُّقَى وَالتَّمَائِمَ وَالتَّوَلَةَ شِرْكٌ
"নিশ্চয়ই মন্ত্র-তন্ত্র, তাবীয-কবচ এবং যোগ-যাদু ব্যবহার করা শির্ক।”৪২৩ একদা তিনি সাহাবাগণকে বললেন,
اعْرِضُوا عَلَى رُقَاكُمْ، لَا بَأْسَ بِالرُّقَى مَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ شِرْكٌ
"তোমরা তোমাদের ঝাড়-ফুঁকের মন্ত্রগুলি আমার নিকট পেশ কর। ঝাড়-ফুঁক করায় দোষ নেই; যতক্ষণ তাতে শির্ক না থাকে। "৪২৪
তিনি আরো বলেছেন, "যে ব্যক্তি তার ভাইকে উপকৃত করতে সক্ষম, সে যেন তার উপকার করে। "৪২৫
চিকিৎসার জন্য কুরআনী আয়াত পাঠ করে পানিতে দম করে অথবা পবিত্র পাত্রে লিখে তা ধৌত করে পান করানো যায়। ৪২৬ পানিতে ফুঁক দেওয়া নিষিদ্ধ হলেও কুরআনী আয়াতের বর্কতমিশ্রিত থুথু উপকারী হবে ইনশা-আল্লাহ।
এ ছাড়া কুরআনী আয়াত লিখে তাবীয বানিয়ে ব্যবহার করাও বৈধ নয়। পরন্তু আবজাদী না বানিয়ে, ফিরিশতা বা শয়তানের নাম দিয়ে অথবা তেলেস্মাতি কবচ তৈরী করে ব্যবহার শির্ক তা সর্বদা মনে রাখা দরকার। চিকিৎসককে (এবং রোগীকেও) এসব বিষয়ে অধিক সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত, যাতে কোন শির্ক না করে বসে। আর রোগীর পরিবারের উচিত, তারা যেন রোগীর জন্য কোন শির্কী চিকিৎসা বা মুশরিক চিকিৎসক ব্যবহার না করে।
টিকাঃ
৪২২. নাসাঈ মাথ, হা/৫০২০
৪২৩. ইবনে মাজাহ তাও. হা/৩৫৩০, সিলসিলাহ আহাদীসুস সহীহাহ মাশা. হা/৩৩১
৪২৪. মুসলিম মাশা. হা/৫৮৬২
৪২৫. মুসলিম মাশা. হা/৫৮৬১
৪২৬. ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ ১৯/৬৪