📄 চিকিৎসকের কর্তব্য
এ কথা বিদিত যে, জ্বিনদের মধ্যে কাফের ও মুসলিম আছে। মুসলিমের শরীয়ত আছে। সুতরাং আকৃষ্ট জ্বিন যদি মুসলিম হয়, তাহলে তাকে আল্লাহর ভয় ও শরীয়তের কথা বলে চলে যেতে বলা কর্তব্য। সে যদি প্রথমোক্ত কারণে আকৃষ্ট হয়ে থাকে, তাহলে তাকে বোঝানো উচিত, এ হল অবৈধ প্রণয় ও অবৈধ সহাবস্থান। এটা সেই অশ্লীলতা যা মহান প্রতিপালক জ্বিন-ইনসান সকলের জন্য হারাম ঘোষণা করেছেন। পরন্তু যদি মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হয়, তাহলে তা অশ্লীলতা যুক্ত যুলুম। এটা সীমা লংঘন ও অন্যায়। একজনের অসম্মতিতে জোরপূর্বক তার কাছে অবস্থান করা মহা অপরাধ। মানুষে-মানুষে এমন ঘটলে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিচারে তার শাস্তি কী, তা তাকে জানানো উচিত। যাতে তার উপর হুজ্জত কায়েম হয়。
সে যদি দ্বিতীয় কারণে আসে, অর্থাৎ কষ্টদানের প্রতিশোধ নিতে তার ঘাড়ে চেপে বসে, তাহলে জানতে হবে, রোগী কি তাকে জেনেশুনে কষ্ট দিয়েছে?
যদি না জেনে কোন কষ্ট দিয়েছে, তাহলে সেই জ্বিনকে বুঝানো উচিত যে, তোমরা অদৃশ্য জাতি। আর ও তোমাকে না দেখে বা না জেনে কোন কষ্ট দিয়েছে। আর না জেনে কষ্ট দিলে কেউ সাজা পাওয়ার উপযুক্ত হয় না। সুতরাং তোমার এভাবে প্রতিশোধ নেওয়া অন্যায়। পরন্তু সে যদি নিজের বাড়িতে, নিজের মালিকানাধীন স্থানে তোমাকে কোন কষ্ট দিয়েছে, তাহলে তুমি সেখানে উপস্থিত ছিলে কেন? অন্যায় তো তোমারই।
📄 জ্বিন হত্যা করা
আমাদের উচিত নয়, অকারণে জ্বিন হত্যা করা। যেহেতু তা অন্যায় ও মহাপাপ। যেমন মানুষ হত্যা করা মহাপাপ। কারো প্রতি অন্যায়াচরণ করা কোনক্রমেই বৈধ নয়, যদিও সে কাফের হয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاء بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِللَّتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا
তোমাদের বাসা মানুষের বাসস্থান নয়। অন্যায়ভাবে বাস করতে আসবে, আবার অজান্তে কোন কষ্ট পেলে তার বদলা নেবে কেন?
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ) বলেন, "উদ্দেশ্য হল, জ্বিন মানুষের উপর অত্যাচার করলে, তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিধান জানিয়ে দিতে হবে। তাদের উপর হুজ্জত কায়েম করতে হবে। সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে বাধা দানের কর্তব্য পালন করতে হবে; যেমন মানুষের সাথে করা হয়। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولاً
“আমি রসূল না পাঠানো পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দিই না।”৪১৪
তিনি আরো বলেছেন,
يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ وَالإِنسِ أَلَمْ يَأْتِكُمْ رُسُلٌ مِّنكُمْ يَقُصُّونَ عَلَيْكُمْ آيَاتِي وَيُنذِرُونَكُمْ لِقَاء يَوْمِكُمْ هَذَا
(আমি ওদেরকে বলব,) 'হে জিন ও মানব-সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্য হতে কি রসূলগণ তোমাদের নিকট আসেননি, যারা আমার নিদর্শন তোমাদের নিকট বিবৃত করত এবং তোমাদেরকে এদিনের সম্মুখীন হওয়া সম্বন্ধে সতর্ক করত?'৪১৫
টিকাঃ
৪১৪. সূরা বানী ইসরাঈল-১৭:১৫
৪১৫. সূরা আল আন'আম-৬:১৩০
📄 জ্বিনকে গালাগালি ও মারধর করা
কাউকে জ্বিন পেলে, তাকে সাহায্য করা উচিত। কারণ সে মযলুম। তবে সাহায্য হবে ইনসাফ মতো; যেমন মহান আল্লাহ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু উপদেশ ছলে কোন আদেশ-নিষেধ মানতে যদি সে জ্বিন রাজি না হয়, তাহলে তাকে ধমক দেওয়া, গালি দেওয়া, অভিশাপ করা, মারের হুমকি দেওয়া বৈধ। যেমন নবী এর মুখে শয়তান আগুন দিতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, 'আউযু বিল্লাহি মিনক্, আলআনুকা বিলা'নাতিল্লাহ।' (তোর থেকে আল্লাহর পানাহ চাচ্ছি, আল্লাহর অভিশাপে তোকে অভিশাপ দিচ্ছি।)
তাতেও যদি কাজ না হয়, তাহলে জ্বিন তাড়াবার জন্য প্রহারের প্রয়োজন পড়তে পারে। আর তখন রোগীকে মারলে আসলে মার পড়বে জ্বিনের উপর, সেই তার ব্যথা অনুভব করবে। অবশ্য সে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর অবশিষ্ট ব্যথার রেশ রোগী অনুভব করবে।
কিন্তু মারার আগে ওঝার উচিত সর্বাগ্রে রোগ নির্ণয় করা। সম্ভবতঃ রোগীর উন্মাদনা বা মস্তিষ্ক-বিকৃতি (ব্রেন ডিফেক্ট) অথবা মুচ্ছা (হিস্টিরিয়া) জাতীয় কোন রোগও হতে পারে। অতএব জ্বিন মনে করে শুধু শুধু মারধর করে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ দেওয়া উচিত নয়। আবার অনেক সময় রোগীর উপর কারো যাদুর প্রতিক্রিয়া, কিংবা তার কোন মানসিক রোগ অথবা কোন অভীষ্ট লাভের আশায় সুপরিকল্পিত অভিনয় (ছলা-কলা)ও হতে পারে। অভিজ্ঞ চিকিৎসক বা ওঝা তা সহজেই নির্ণয় করতে পারেন।
تَعْمَلُونَ
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে (হকের উপর) দীঢ় প্রতিষ্ঠিত (এবং) ন্যায়পরায়ণতার সাথে সাক্ষ্যদাতা হও। কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন কখনও সুবিচার না করাতে প্ররোচিত না করে। সুবিচার কর, এটা আত্মসংযমের নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন।"৪১৬
এই জন্য বাড়ির ভিতরে সাপ দেখলে তা হুট্ করে হত্যা করে বসা উচিত নয়। তাকে তিন দিন সতর্ক করার পরও থেকে গেলে হত্যা করা যাবে। আর তখন তা অন্যায় হবে না। সাধারণ সাপ হলে, সে মানুষের শত্রু, তাকে হত্যা করা বৈধ। আর জ্বিন হলে সে অবাধ্য এবং সাপরূপে মানুষকে কষ্ট দিতে বদ্ধপরিকর। তখন তার সাজা সে ভোগ করবে। নচেৎ অকারণে জ্বিন হত্যা বৈধ নয়।
টিকাঃ
৪১৬. সূরা মায়িদাহ-৫:৮
📄 দু'আ-যিকর ও কুরআনী আয়াত পড়ে জ্বিন ছাড়ানো
জ্বিন ছাড়ানোর সর্বশ্রেষ্ঠ ওষুধ হল, আল্লাহর যিক্র ও কুরআনী আয়াত। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় মন্ত্র হল আয়াতুল কুরসী। এর মাহাত্ম্য সম্বন্ধে খোদ শয়তান অবহিত। সেই বলেছে, এটা পাঠ করা হলে শয়তান নিকটবর্তী হয় না। আর তার সত্যায়ন করে নবী বলেছেন, ‘সে সত্যই বলেছে, অথচ সে ভীষণ মিথ্যুক।‘৪১৭
যারে’ নামক জনৈক সাহাবী তাঁর এক উন্মাদ ছেলে অথবা ভাগ্নেকে সঙ্গে নিয়ে রসূল এর নিকট এলেন এবং তার জন্য তাঁকে দু’আ করার আবেদন জানালেন। তিনি ছেলেটিকে তাঁর কাছে নিয়ে আসতে আদেশ করলেন এবং বললেন, ‘ওর পিঠের দিকটা আমার নিকট কর।’ তারপর তিনি ছেলেটির কাপড়ে ধরে পিঠে আঘাত করতে করতে বললেন, ‘বের হ’ আল্লাহর দুশমন, বের হ’ আল্লাহর দুশমন’। সাথে সাথে ছেলেটি সুস্থ ও স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখতে লাগল। তিনি পানি দ্বারা তার মুখ মুছে দিলেন এবং তার জন্য দু’আ করলেন।৪১৮
অনুরূপভাবে অপর এক ঘটনায় তিনি এক শিশুর মুখে থুথু দিয়ে জিন বিতাড়িত করেছেন।৪১৯ প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, এই শ্রেণীর রোগে যদি ধৈর্যধারণ করে, তাহলে তার বিনিময়ে রয়েছে জান্নাত।
টিকাঃ
৪১৭. বুখারী ইফা, অনুচ্ছেদ, ১৪৩৮, তাও. হা/২৩১১
৪১৮. ইবনে মাজাহ তাও. হা/৩৫৪৮
৪১৯. মুসনাদে আহমাদ মাশা, হা/৪/১৭০-১৭১, সিলসিলা আহাদীসুস সহীহা মাশা. হা/৪৮৫, ২৯১৮